(৯৬:১) পড়ো ( হে নবী ) , তোমার রবের নামে ৷ যিনি সৃষ্টি করেছেন৷
(৯৬:২) জমাট বাঁধা রক্তের দলা থেকে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন৷
(৯৬:৩) পড়ো , এবং তোমার রব বড় মেহেরবান ,
(৯৬:৪) যিনি কলমের সাহায্যে জ্ঞান শিখিয়েছেন৷
(৯৬:৫) মানুষকে এমন জ্ঞান দিয়েছেন , যা সে জানতো না৷
(৯৬:৬) কখনই নয় , মানুষ সীমালংঘন করে৷
(৯৬:৭) কারণ সে নিজেকে দেখে অভাবমুক্ত৷
(৯৬:৮) (অথচ) নিশ্চিতভাবেই তোমার রবের দিকেই ফিরে আসতে হবে৷
(৯৬:৯) তুমি কি দেখেছো সেই ব্যক্তিকে
(৯৬:১০) যে এক বান্দাকে নিষেধ করে যখন সে নামায পড়ে৷১০
(৯৬:১১) তুমি কি মনে করো , যদি ( সেই বান্দা ) সঠিক পথে থাকে
(৯৬:১২) অথবা তাকওয়ার নির্দেশ দেয়?
(৯৬:১৩) তুমি কি মনে করো , যদি ( এই নিষেধকারী সত্যের প্রতি ) মিথ্যা আরোপ করে এবং মুখ ফিরিয়ে নেয় ?
(৯৬:১৪) সে কি জানে না , আল্লাহ দেখছেন ? ১১
(৯৬:১৫) কখনই নয় , ১২ যদি সে বিরত না হয় তাহলে আমি তার কপালের দিকে চুল ধরে তাকে টানবো ,
(৯৬:১৬) সেই কপালের চুল ( ওয়ালা ) যে মিথ্যুক ও কঠিন অপরাধকারী৷ ১৩
(৯৬:১৭) সে তার সমর্থক দলকে ডেকে নিক ১৪
(৯৬:১৮) আমি ডেকে নিই আযাবের ফেরেশতাদেরকে ৷ ১৫
(৯৬:১৯) কখনই নয়, তার কথা মেনে নিয়ো না , তুমি সিজদা করো এবং ( তোমার রবের ) নৈকট্য অর্জন করো৷১৬
১. ইতিপূর্বে ভূমিকায় বলে এসেছি , ফেরেশতা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, পড়ো৷ তিনি জবাবে দিলেন , আমি পড়া জানি না৷ এ থেকে জানা যায় ,ফেরেশতা অহীর এই শব্দগুলো লিখিত আকারে তাঁর সামনে পেশ করেছিলেন এবং তাঁকে সেগুলো পড়তে বলেছিলেন ৷ কারণ ফেরেশতার কথার অর্থ যদি এই হতো , আমি বলতে থাকি এবং আপনি পড়তে থাকুন তাহলে আমি পড়া জানি না একথা বলা তাঁর প্রয়োজন হতো না৷
২. অর্থাৎ তোমার রবের নাম নিয়ে পড়ো৷ অন্য কথায় , বিসমিল্লাহ বলো এবং পড়ো৷ এ থেকে একথাও জানা যায় যে , রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই অহী আসার আগে একমাত্র আল্লাহকেই জানতেন ও মানতেন৷ এ জন্যই তাঁর রবকে , একথা বলার প্রয়োজন হয়নি বরং বলতে হয়েছে , তোমার রবের নাম নিয়ে পড়ো৷
৩. শুধু বলা হয়েছে , "সৃষ্টি করেছেন৷ " কাকে সৃষ্টি করেছেন তা বলা হয়নি৷ এ থেকে আপনা আপনিই এ অর্থ বের হয়ে আসে, সেই রবের নাম নিয়ে পড়ো যিনি স্রষ্টা , যিনি সমগ্র বিশ্ব - জাহান এবং বিশ্ব - জাহানের প্রতিটি জিনিস সৃষ্টি করেছেন৷
৪. সাধারণ ভাবে বিশ্ব - জাহানের সৃষ্টি কথা বলার পর বিশেষ করে মানুষের কথা বলা হয়েছে যে , মহান আল্লাহ কেমন হীন অবস্থা থেকে তার সৃষ্টিপর্ব শুরু করে তাকে পূর্ণাংগ মানুষে রূপান্তরিত করেছেন৷ আলাক ( আলাক-------) হচ্ছে আলাকাহ ( আরবী----) শব্দের বহুবচন৷ এর মানে জমাট বাঁধা রক্ত ৷ গর্ভ সঞ্চারের পর প্রথম কয়েক দিনের মধ্যে যে অবস্থার সৃষ্টি হয় এটি হচ্ছে সেই প্রাথমিক অবস্থা৷ তারপর তা গোশতের আকৃতি ধারণ করে ৷ এরপর পর্যায়ক্রমে মানুষের আকৃতি লাভের কার্যক্রম শুরু হয়৷ ( বিস্তারিত ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন , সূরা আল হজ্জ ৫ আয়াত , ৫ থেকে ৭ টীকা )
৫. অর্থাৎ তাঁর অশেষ মেহেরবানী৷ এই হীণতম অবস্থা থেকে শুরু করে তিনি মানুষকে জ্ঞানের অধিকারী করেছেন এটি সৃষ্টি সবচেয়ে বড় গুণ হিসেবে স্বীকৃত৷ আর তিনি মানুষকে কেবল জ্ঞানের অধিকারীই করেননি , কলম ব্যবহার করে তাকে লেখার কৌশল শিখিয়েছেন৷ এর ফলে কলম জ্ঞানের ব্যাপক প্রসার , উন্নতি এবং বংশানুক্রমিক প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে৷ যদি তিনি ইলহামী চেতনায় সাহায্যে মানুষকে কসম ব্যবহার করার ও লেখার কৌশল না শেখাতেন তাহলে মানুষের জ্ঞানগত যোগ্যতা স্তব্ধ ও পংগু হয়ে যেতো৷ তার বিকশিত ও সম্প্রসারিত হবার এবং বংশানুক্রমিক অগ্রগতি তথা এক বংশের জ্ঞান আর এক বংশে পৌঁছে যাবার এবং সামনের দিকে আরো উন্নতি ও অগ্রগতি লাভ করার সুযোগই তিরোহিত হতো৷
৬. অর্থাৎ মানুষ আসলে ছিল সম্পূর্ণ জ্ঞানহীন৷ আল্লাহর কাছ থেকে সে যা কিছু জ্ঞান লাভ করেছে৷ আল্লাহ যে পর্যায়ে মানুষের জন্য জ্ঞানের দরজা যতটুকু খুলতে চেয়েছেন ততটুকুই তার জন্য খুলে গিয়েছে৷ আয়াতুল কুরসীতে একথাটি এভাবে বলা হয়েছে : আরবী --------------------------------------- "আর লোকেরা তাঁর জ্ঞান থেকে তিনি যতটুকু চান তার বেশী কিছুই আয়ত্ব করতে পারে না৷ " ( আল বাকারাহ ২৫৫ ) যেসব জিনিসকে মানুষ নিজের তাত্বিক আবিস্কার বলে মনে করে সেগুলো আসলে প্রথমে তার জ্ঞানের আওতায় ছিল না৷ আল্লাহ যখন চেয়েছেন তখনই তার জ্ঞান তাকে দিয়েছে৷ মানুষ কোনক্রমেই অনুভব করতে পারেনি যে , আল্লাহ তাকে এ জ্ঞান দান করছেন৷ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর সর্বপ্রথম যে আয়াতগুলো নাযিল হয়েছিল সেগুলোর আলোচনা এখান পর্যন্ত শেষ৷ যেমন হযরত আয়েশার ( রা) হাদীস থেকে জানা যায় : এই প্রথম অভিজ্ঞাতটি খুব বেশী কঠিন ছিল৷ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর চাইতে বেশী বরদাশত করতে পারতেন না৷ তাই তখন কেবল এতটুকু বলাই যথেষ্ট মনে করা হয়েছে যে , তিনি যে রবকে প্রথম থেকে জানেন ও মানেন তিনি সরাসরি তাঁকে সম্বোধন করছেন৷ তাঁর পক্ষ থেকে অহীর সিলসিলা শুরু হয়ে গেছে এবং তাঁকে তিনি নিজের নবী বানিয়ে নিয়েছেন৷ এর বেশ কিছুকাল পরে সূরা আল মুদদাসসিরের প্রথম দিকের আয়াতগুলো নাযিল হয়৷ সেখানে তাঁকে বলা হয়েছে, নবুওয়াত লাভ করার পর এখন কি কি কাজ করতে হবে৷ ( আরো ব্যাখ্যার জন্য পড়ুন তাফহীমূল কুরআন আল মুদদাসসিরের ভূমিকা )৷
৭. অর্থাৎ যে মেহেরবান আল্লাহ এত বড় মেহেরবানী করেছেন তাঁর মোকাবেলায় মূর্খতার বশবর্তী হয়ে কখনো এমন কর্মনীতি অবলম্বন করা উচিত নয় যা সামনের দিকে বর্ণনা করা হচ্ছে৷
৮. অর্থাৎ দুনিয়ায় ধন - দৌলত , সম্মান - প্রতিপত্তি যা কিছু সে চাইতো তার সবই সে লাভ করেছে এ দৃশ্য দেখে সে কৃতজ্ঞ হবার পরিবর্তে বরং বিদ্রোহের পথ অবলম্বন করেছে এবং সীমালংঘন করতে শুরু করেছে৷
৯. অর্থাৎ দুনিয়ায় সে যাই কিছু অর্জন করে থাকুক না কেন এবং তার ভিত্তিতে অহংকার ও বিদ্রোহ করে ফিরুক না কেন , অবশেষে তাকে তোমার রবের কাছেই ফিরে যেতে হবে ৷ তখন এই মনোভাব ও কর্মনীতির পরিণাম সে জানতে পারবে৷
১০. বান্দা বলতে এখানে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বুঝানো হয়েছে ৷ এ পদ্ধতিতে কুরআনের কয়েক জায়গায় তাঁর উল্লেখ করা হয়েছে ৷ যেমন

আরবী ------------------------------------------------------------------------------------

"পবিত্র সেই সত্তা যিনি তাঁর বান্দাকে নিয়ে গিয়েছেন এক রাতে মসজিদে হারম থেকে মসজিদে আকসার দিকে৷ " ( বনি ইসরাঈল ১ )

আরবী ---------------------------------------------------------------------------------

"সমস্ত প্রশংসা সেই সত্তার যিনি তাঁর বান্দার ওপর নাযিল করেছেন কিতাব ৷" ( আল কাহফ ১ )

আরবী ---------------------------------------------------------------------------------

" আর আল্লাহর বান্দা যখন তাকে ডাকার জন্য দাঁড়ালো তখন লোকেরা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন তৈরি হলো৷ " ( আল জিন ১৯)

এ থেকে জানা যায় , এটা ভালোবাসার একটা বিশেষ ধরনের প্রকাশভংগী ৷ এ পদ্ধতিতে আল্লাহ তাঁর কিতাবে তাঁর রসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা উল্লেখ করেছেন৷ এ ছাড়াও এ থেকে জানা যায় , মহান আল্লাহ নবুওয়াতের দায়িত্বে নিযুক্ত করা পর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নামায পড়ার পদ্ধতি শিখিয়ে দিয়েছিলেন ৷ কুরআনের কোথাও এই পদ্ধতির কথা বলা হয়নি৷ কোথাও বলা হযনি , হে নবী ! তুমি এভাবে নামায পড়ো৷ কাজেই কুরআনের যে অহী লিখিত হয়েছে কেবলমাত্র এই অহীটুকুই যে রসূলের ( সা) ওপর নাযিল হতো না --- এটি তার আর একটি প্রমাণ ৷ বরং এরপরও অহীর মাধ্যমে আরো এমন সব বিষয়ের তালিম দেয়া হতো যা কুরআনে লিখিত হয়নি৷
১১. বাহ্যত মনে হয় , এখানে প্রত্যেকটি ন্যয়নিষ্ঠ ব্যক্তিকে সম্বোধন করা হয়েছে৷ তাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে , তুমি কি সেই ব্যক্তির কর্যকলাপ দেখেছো যে আল্লাহর এক বান্দাকে ইবাদাত করা থেকে বিরত রাখছে ? যদি সেই বান্দা সঠিক পথে থাকে অথবা মানুষকে আল্লাহর ভয় দেখায় এবং খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করে , আর এই ইবাদাতে বাধা প্রদানকারী সত্যের প্রতি মিথ্যা আরোপ করে এবং তার তকে মুখ ফিরিয়ে নেয় , তাহলে তার এই তৎপরতা সম্পর্কে তুমি কি মনে করো৷ যে ব্যক্তি এই কর্মনীতি অবলম্বন করেছে সে যদি জানতো , যে বান্দা নেকীর কাজ করে আল্লাহ তাকেও দেখেন আবার যে সত্যের প্রতি মিথ্যা আরো করে এবং তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে সচেষ্ট তাকেও দেখেন তাহলে সে কি এই কর্মনীতি অবলম্বন করতে পারতো ? আল্লাহ জালেমের জুলুম দেখছেন এবং মজলুমের মজলুমীও দেখছেন ৷ তাঁর এই দেখা এ বিষয়টিকে অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছে যে , তিনি জালেমের শাস্তি দেবেন এবং মজলুমের ফরিয়াদ শুনবেন৷
১২. অর্থাৎ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি নামায পড়েন তাহলে এই ব্যক্তি নিজের পায়ের চাপে তার ঘাড় পিষে ফেলবে বলে যে হুমকি দিচ্ছে তা কখনো সম্ভবপর হবে না৷ সে কখনো এমনটি করতে পারবে না৷
১৩. কপালের দিক বলে এখানে যার কপাল তাকে বুঝানো হয়েছে৷
১৪. যেমন ভুমিকায় আমরা বলেছি , আবু জেহেলের হুমকির জবাবে যখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ধমক দিয়েছিলেন তখন সে বলেছিল , হে মুহাম্মাদ ! তুমি কিসের জোরে আমাকে ভয় দেখাচ্ছো ? আল্লাহর কসম , এই উপত্যকায় আমার সমর্থকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশী৷ তার এই কথায় এখানে বলা হচ্ছে : নাও , এখন তাহলে তোমার সেই সমর্থকদের ডেকে নাও৷
১৫. মূলে ' যাবানীয়াহ ' ( আরবী ----------------------) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ কাতাদাহর ব্যাখ্যা অনুযায়ী এটি আরবী ভাষায় পুলিশের প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়৷ আর " যাবান " ( আরবী ----) শব্দের আসল মানে হচেছ , ধাক্কা দেয়া৷ রাজা বাদশাহদের দরবারে লাঠিদারী চোবদার থাকতো ৷ তাদের কাজ হতো যার প্রতি বাদশাহ নারাজ হতেন তাকে ধাক্কা দিয়ে দরবার থেকে বের করে দেয়া ৷ কাজেই এখানে আল্লাহর বাণীর অর্থ হচ্ছে , সে তার সমর্থকদেরকে ডেকে আনুক , আর আমি আমার পুলিশ বাহিনী তথা আযাবের ফেরেশতাদেরকে ডেকে আনি ৷ এই আযাবের ফেরেশতারা তার সমর্থকদেরকে ঠাণ্ডা করে দিক৷
১৬. সিজদা করা মানে নামায পড়া৷ অর্থাৎ হে নবী ! তুমি নির্ভয়ে আগের মতো নামায পড়তে থাকো৷ এর মাধ্যমে নিজের রবের নৈকট্য লাভ করো ৷ সহীহ মুসলিম ইত্যাদি গ্রন্থে হযরত আবু হুরাইরা ( রা) বর্ণিত হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে৷ তাতে বলা হয়েছে : " বান্দা সিজদায় থাকা অবস্থায় তার রবের সবচেয়ে বেশী নিকটবর্তী হয়৷ " আবার মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরার ( রা) এ রেওয়ায়তটিও উদ্ধৃত হয়েছে যে , রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন এ আয়াতটি পড়তেন তখন তেলাওয়াতে সিজদা করতেন৷