(৯২:১) রাতের কসম যখন তা ঢেকে যায়৷
(৯২:২) দিনের কসম যখন তা উজ্জ্বল হয়৷
(৯২:৩) আর সেই সত্তার কসম যিনি পুরুষ ও স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন ৷ 
(৯২:৪) আসলে তোমাদের প্রচেষ্টা নানা ধরনের৷
(৯২:৫) কাজেই যে ( আল্লাহর পথে ) ধন সম্পদ দান করেছে ,  
(৯২:৬) ( আল্লাহর নাফরমানি থেকে ) দূরে থেকেছে  
(৯২:৭) এবং সৎবৃত্তিতে সত্য বলে মেনে নিয়েছে , তাকে আমি সহজ পথের সুযোগ - সুবিধা দেবো৷
(৯২:৮) আর যে কৃপণতা করেছে , আল্লাহ থেকে বেপরোয়া হয়ে গেছে
(৯২:৯) এবং সৎবৃত্তিকে মিথ্যা গণ্য করেছে ,
(৯২:১০) তাকে আমি কঠিন পথের সুযোগ - সুবিধা দেবো৷
(৯২:১১) আর তার ধন - সম্পদ তার কোন কাজে লাগবে যখন সে ধবংস হয়ে যাবে ?
(৯২:১২) নিসন্দেহে পথনির্দেশ দেয়া তো আমার দায়িত্বের অন্তরভুক্ত৷
(৯২:১৩) আর আসলে আমি তো আখেরাত ও দুনিয়া উভয়েরই মালিক৷
(৯২:১৪) তাই আমি তোমাদের সাবধান করে দিয়েছি জ্বলন্ত আগুন থেকে৷
(৯২:১৫) যে চরম হতভাগ্য ব্যক্তি মিথ্যা আরোপ করেছে ও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে
(৯২:১৬) সে ছাড়া আর কেউ তাতে ঝলসে যাবে না৷ 
(৯২:১৭) আর যে পরম মুত্তাকী ব্যক্তি পবিত্রতা অর্জনের জন্য নিজের ধন - সম্পদ দান করে 
(৯২:১৮) তাকে তা থেকে দূরে রাখা হবে৷
(৯২:১৯) তার প্রতি কারো কোন অনুগ্রহ নেই যার প্রতিদান তাকে দিতে হবে৷
(৯২:২০) সেতো কেবলমাত্র নিজের রবের সন্তুষ্টিলাভের জন্য এ কাজ করে ৷১০
(৯২:২১) আর তিনি অবশ্যি ( তার প্রতি ) সন্তুষ্ট হবেন৷১১
১. এ কথার জন্যই রাত ও দিন এবং নারী ও পুরুষের জন্মের কসম খাওয়া হয়েছে৷ এর অর্থ হচ্ছে , যেভাবে রাত ও দিন এবং পুরুষ ও নারী পরস্পর থেকে ভিন্ন এবং তাদের প্রত্যেক জোড়ার প্রভাব ও ফলাফল পরস্পর বিরোধী , ঠিক তেমনি তোমরা যেসব পথে ও যেসব উদ্দেশ্যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছো সেগুলোও বিভিন্ন ধরনের এবং সেগুলোর পরিণাম বিভিন্ন বিপরীতধর্মী ফলাফলেরও উদ্ভব ঘটে৷ পরবর্তী আয়াতগুলোতে বলা হয়েছে : এসব বিভিন্ন প্রচেষ্টা দু'টি বড় বড় ভাগে বিভক্ত৷
২. এটি এক ধরনের মানবিক প্রচেষ্টা ৷ তিনটি জিনিসকে এর অংগীভূত করা হয়েছে৷ গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে , এগুলোর মধ্যে সব গুণাবলীর সমাবেশ ঘটেছে৷ এর মধ্যে একটি হচ্ছে , মানুষ যেন অর্থ লিপ্সায় ডুবে না যায়৷ বরং নিজের অর্থ - সম্পদ , যে পরিমাণ আল্লাহ তাকে দিয়েছেন , তা আল্লাহ ও তাঁর বান্দাদের অধিকার আদায়ে , সৎ কাজে এবং আল্লাহর সৃষ্টিকে সাহায্য করার কাজে ব্যয় করে৷ দ্বিতীয়টি হচ্ছে , তার মনে যেন আল্লাহর ভয় জাগরুক থাকে৷ সে যেন নিজের যাবতীয় কর্ম , আচার - আচরণ , সামাজিক , অর্থনৈতিক ইত্যাদি জীবনের প্রতিটি বিভাগে আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হতে পারে এমন প্রত্যেকটি কাজ থেকে দূরে থাকে৷ আর তৃতীয়টি হচ্ছে , সে যেন সৎবৃত্তি ও সৎকাজের সত্যতার স্বীকৃতি দেয়৷ সৎবৃত্তি ও সৎকাজ অত্যন্ত ব্যাপক অর্থবোধক৷ বিশ্বাস , নৈতিক চরিত্র ও কর্ম তিনটি সৎবৃত্তির অন্তরভুক্ত৷ বিশ্বাসের ক্ষেত্রে সৎবৃত্তির স্বীকৃতি হচ্ছে , শিরক , কুফরী ও নাস্তিক্যবাদ পরিত্যাগ করে মানুষ তাওহীদ , রিসালাত ও আখেরাতকে সত্য বলে মেনে নেবে৷ আর কর্ম ও নৈতিক চরিত্রের ক্ষেত্রে সৎবৃত্তির স্বীকৃতি হচ্ছে , কোন নির্দিষ্ট ব্যবস্থা ও পদ্ধতি ছাড়াই নিছক নিজের অজ্ঞাতসারে কোন সৎকাজ সম্পাদিত হওয়া নয় বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণ ও সৎবৃত্তির যে ব্যবস্থা দান করা হয়েছে মানুষ তার সত্যতার স্বীকৃতি দেবে৷ আল্লাহ শরীয়াত নামক যে ব্যাপকতর ব্যবস্থাটি দান করেছেন এবং যার মধ্যে সব ধরনের ও সকল প্রকার সৎবৃত্তি ও সৎকাজকে সুশৃংখলভাবে একটি ব্যবস্থার আওতাধীন করেছেন , মানুষ তাকে স্বীকার করে নিয়ে সেই অনুযায়ী সৎকাজ করবে৷
৩. এটি হচ্ছে এই ধরনের প্রচেষ্টার ফল৷ সহজ পথ মানে মানুষের স্বভাব ও প্রকৃতির সাথে মিল রয়েছে এমন পথ ৷ যে স্রষ্টা মানুষ ও এই সমগ্র বিশ্ব - জাহান সৃষ্টি করেছেন তিনি যেমন চান তেমন পথ৷ যে পথে নিজের বিবেকের সাথে লড়াই করে মানুষকে চলতে হয় না৷ যে পথে মানুষকে নিজের দেহ , প্রাণ , বুদ্ধি ও মনের শক্তিগুলোর ওপর জোর খাটিয়ে যে কাজের জন্যে তাদেরকে এ শক্তি দান করা হয়নি জবরদস্তি তাদের থেকে সেই কাজ আদায় করে নিতে হয় না৷ বরং তাদের থেকে এমন কাজ নেয় যে জন্য তাদেরকে প্রকৃত পক্ষে এই শক্তিগুলো দান করা হয়েছে৷ পাপপূর্ণ জীবনে চতুরদিকে যেমন প্রতি পদে পদে সংঘাত , সংঘর্ষ ও বাধা বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয় , এ পথে মানুষকে তেমনি ধরনের কোন বাধা ও সংঘাতের সম্মুখীন হতে হয় না৷ বরং মানুষের সমাজে প্রতি পদে পদে সে সহানুভূতি , সহযোগিতা , প্রেম , ভালোবাসা , মর্যাদা ও সম্মান লাভ করতে থাকে৷ একথা সুস্পষ্ট , যে ব্যক্তি নিজের ধন সম্পদ মানুষের সেবায় নিয়েজিত করে , সবার সাথে ভালো ব্যবহার করে , নিজের জীবনকে অশ্লীল কার্যকলাপ ও দুস্কৃতিমুক্ত রাখে , নিজের লেন-দেনের ব্যাপারে পরিচ্ছন্ন ও ন্যায় - নিষ্ঠ থাকে , কারো সাথে বেঈমানী , শপথ ভংগ ও বিশ্বাসঘাতকতা করে না , যার পক্ষ থেকে কারোর প্রতি জুলুম , নির্যাতন ও অন্যায় আচরণের আশংকা থাকে না, যে প্রত্যেক ব্যক্তির সাথে সদ্ব্যবহার করে এবং যার চরিত্র ও কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করার সুযোগ কারোর থাকে না , সে যতই নষ্ট ও ভ্রষ্ট সমাজে বাস করুক না কেন সেখানে অবশ্যি সে মর্যাদার আসনে সমাসীন থাকে৷ মানুষের মন তার দিকে আকৃষ্ট হতে থাকে ৷ মানুষের হৃদয়ে তার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় ৷ তার নিজের মন ও বিবেক ও নিশ্চিন্ত হয়ে যায় ৷ সমাজে তার এমন মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয় , যা কোন অসৎব্যক্তি ও দুস্কৃতিকারী কোন দিন লাভ করতে পারে না৷ এ কথাটিকেই সূরা আন নাহলে নিম্নোক্তভাবে বর্ণনা করা হয়েছে :

আরবী --------------------------------------------------------------------------------------

" যে ব্যক্তি সৎকাজ করে , সে পুরুষ হোক বা নারী , সে মু'মিন হলে আমি অবশ্যি তাকে ভালো জীবন যাপন করাবো৷ " ( ৯৭ আয়াত )

আবার একথাটি সূরা মারয়ামে নিম্নোক্তভাবে বলা হয়েছে :

আরবী -------------------------------------------------------------------------------------

" নিসন্দেহে যারা ইমান এনেছে এবং যারা সৎকাজ করেছে রহমান তাদের জন্য হৃদয়গুলোতে ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেবেন৷ " ( ৯৬ আয়াত )

তাছাড়া এটিই মানুষের জন্য দুনিয়া থেকে আখেরাত পর্যন্ত পূর্ণ আনন্দের একমাত্র পথ৷ একমাত্র এ পথেই আছে আরাম ও প্রশান্তি ৷ এর ফলাফল সাময়িক ও ক্ষণকালীন নয় বরং এটা হচ্ছে চিরন্তন ও চিরস্থায়ী ফল , এর কোন ক্ষয় নেই৷

এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেন , আমি তাকে এ পথে চলার সহজ সুযোগ দেবো৷ এর মানে হচেছ , যখন সে সৎবৃত্তিকে স্বীকার করে নিয়ে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে যে , এটিই তার উপযোগী পথ এবং দুষ্কৃতির পথ তার উপযোগী নয় , আর যখন সে কার্যত আর্থিক ত্যাগ ও তাকওয়ার জীবন অবলম্বর করে একথা প্রমাণ করবে যে , তার এই স্বীকৃতি সত্য তখন আল্লাহ এ পথে চলা তার জন্য সহজ করে দেবেন৷ এ অবস্থায় তার জন্য আবার গোনাহ করা কঠিন এবং নেকী করা সহজ হয়ে যাবে ৷ হারাম অর্থ - সম্পদ তার সামনে এলে সে তাকে লাভের সওদা মনে করবে না৷ বরং সে অনুভব করবে , এটা জ্বলন্ত অংগার , একে সে হাতের তালুতে উঠিয়ে নেতে পারে না৷ ব্যভিচারের সুযোগ সে পাবে৷ কিন্তু তাকে সে ইন্দ্রিয় লিপ্সা চরিতার্থ করার সুযোগ মনে করে সেদিকে পা বাড়াবে না৷ বরং জাহান্নামের দরজা মনে করে তা থেকে দূরে পালিয়ে যাবে৷ নামায তার কাছে কঠিন মনে হবে না বরং নামাযের সময় হয়ে গেলে নামায না পড়া পর্যন্ত তার মনে শান্তি আসবে না৷ যাকাত দিতে তার মনে কষ্ট হবে না৷ বরং যাকাত আদায় না করা পর্যন্ত নিজের ধন - সম্পদ তার কাছে নাপাক মনে হবে৷ মোটকথা , প্রতি পদে পদে আল্লাহর পক্ষ এই পথে চলার সুযোগ ও সুবিধা সে লাভ করতে থাকবে৷ অবস্থাকে তার উপযোগী বানিয়ে দেয়া হবে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে সাহায্য করা হবে৷

এখানে প্রশ্ন দেখা দেয় ইতিপূর্বে সূরা আল বালাদে এ পথটিকে দুর্গম পার্বত্য পথ বলা হয়েছিল আর এখানে একে বলা হচ্ছে , সহজ পথ৷ এই দু'টি কথাকে কিভাবে এক করা যাবে ? এর জবাব হচ্ছে , এই পথ অবলম্বন করার আগে এটা মানুষের কাছে দুর্গম পার্বত্য পথই মনে হতে থাকে৷ এ উঁচু দুর্গম পার্বত্য পথে চলার জন্য তাকে নিজের প্রবৃত্তির লালসা নিজের বৈষয়িক স্বার্থের অনুরাগী পরিবার পরিজন , নিজের আত্মীয় - স্বজন , বন্ধু - বান্ধব ও কাজ - কারবারের লোকজন এবং সবচেয়ে বেশী শয়তানের সাথে লড়াই করতে হয়৷ কারণ এদের প্রত্যেকেই তাকে এ পথে চলতে বাধা দেয় এবং একে ভীতিপ্রদ বানিয়ে তার সামনে হাযির করে ৷ কিন্তু যখন মানুষ সৎবৃত্তির স্বীকৃতি দিয়ে সে পথে চলার সংকল্প করে , নিজের ধন - সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করে এবং তাকওয়ার পথ অবলম্বন করে কার্যত এই সংকল্পকে পাকাপোক্ত করে নেয় , তখন এই দুর্গম পথ পাড়ি দেয়া তার জন্য সহজ এবং নৈতিক অবনতির গভীর খাদে গড়িয়ে পড়া কঠিন হয়ে পড়ে৷
৪. এটি দ্বিতীয় ধরনের মানসিক প্রচেষ্টা প্রথম ধরনের প্রচেষ্টাটির সাথে প্রতি পদে পদে রয়েছে এর অমিল৷ কৃপণতা মানে শুধুমাত্র প্রচলিত অর্থে যাকে কৃপণতা বলা হয় তা নয় ৷ অর্থাৎ এক একটি পয়সা গুণে গুণে রাখা , খরচ না করা , না নিজের জন্য , না নিজের ছেলেমেয়ের জন্য৷ বরং এখানে কৃপণতা বলতে আল্লাহর পথে এবং নেকী ও কল্যাণমূলক কাজে অর্থ ব্যয় না করা বুঝাচ্ছে ৷ এদিক দিয়ে বিচার করলে এমন ব্যক্তিকে ও কৃপণ বলা যায় , যে নিজের জন্য , নিজের আরাম - আয়েশ ও বিলাস - ব্যাসনের স্বার্থে এবং নিজের ইচ্ছামতো খুশী ও আনন্দ বিহারে দু'হাতে টাকা উড়ায় কিন্তু কোন ভালো কাজে তা পকেট থেকে একটি পয়সাও বের হয় না৷ অথবা কখনো বের হলেও তার পেছনে থাকে এর বিনিময়ে দুনিয়ার খ্যাতি , যশ , শাসকদের নৈকট্য লাভ বা অন্য কোন রকমের পার্থিব স্বার্থ উদ্ধার্৷ বেপরোয়া হয়ে যাওয়ার অর্থ দুনিয়ার বৈষয়িক লাভ ও স্বার্থকে নিজের যাবতীয় প্রচেষ্টা ও পরিশ্রমের লক্ষে পরিণত করা এবং আল্লাহর ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে যাওয়া৷ কোন কাজে আল্লাহ খুশী হন এবং কোন কাজে নাখোশ হন তার কোন তোয়াক্কা না করা ৷ আর সৎবৃত্তিকে মিথ্যা গণ্য করার মানে হচ্ছে , সৎকাজকে তার সকল বিস্তারিত আকারে সত্য বলে মেনে না নেয়া এখানে এর ব্যাখ্যার কোন প্রয়োজন নেই৷ কারণ ইতিপূর্বে সৎবৃত্তিকে সত্য বলে মেনে নেয়ার বিষয়টি আমি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছি৷
৫. এ পথকে কঠিন বলার কারণ হচ্ছে এই যে , এ পথে যে পাড়ি জামাতে চায় সে যদিও বৈষয়িক লাভ , পার্থিব ভোগ - বিলাস ও বাহ্যিক সাফল্যের লোভে এ দিকে এগিয়ে যায় কিন্তু এখানে সর্বক্ষণ তাকে নিজের প্রকৃতি , বিবেক , বিশ্ব জাহানের স্রষ্টার তৈরি করা আইন এবং তার চার পাশের সমাজ পরিবেশের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত থাকতে হয়৷ সততা , ন্যায় পরায়ণতা , বিশ্বস্ততা , ভদ্রতা , চারিত্রিক পরিচ্ছন্নতা ও নীতি - নৈতিকতার সীমালংঘন করে যখন সে সর্বপ্রকারে নিজের স্বার্থসিদ্ধি ও লোভ - লালসা পূর্ণ করা প্রচেষ্টা চালায় , যখন তার মাধ্যমে আল্লাহর সৃষ্টির কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণ হতে থাকে এবং সে অন্যের অধিকার ও মর্যাদার ওপর হস্তক্ষেপ করতে থাকে তখন নিজের চোখেই সে লাঞ্ছিত ও ঘৃণিত জীবে পরিণত হয় এবং সে সমাজে সে বাস করে সেখানেও তাকে প্রতি পদে পদে লড়াই করে এগিয়ে যেতে হয়৷ সে দুর্বল এসব কার্যকলাপের জন্য তাকে নানা ধরনের শাস্তি ভোগ করতে হয়৷ আর সে ধনী , শক্তিশালী ও প্রতাবশালী হলে সারা দুনিয়া তার শক্তির সামনে মাথা নত করলেও মনে মনে তার জন্য সামান্যতমও শুভাকাংক্ষা , সম্মানবোধ ও ভালোবাসার প্রবণতা জাগে না৷ এমন কি তার কাজের সাথী - সহযোগীরাও তাকে একজন বজ্জাত - দুর্বৃত্ত হিসেবেই গণ্য করতে থাকে৷ আর এ ব্যাপারটি কেবলমাত্র ব্যক্তি পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকে না৷ দুনিয়ার বড় বড় শক্তিশালী জাতিরাও যখন নৈতিকতার সীমানালংঘন করে নিজেদের শক্তি ও অর্থের বিভ্রমে পড়ে অসৎকাজে লিপ্ত হয় তখন একদিকে বাইরের জগত তাদের শত্রু হয়ে দাঁড়ায় এবং অন্যদিকে তাদের নিজেদের সমাজ অপরাধমূলক কার্যকলাপ , আত্মহত্যা , নেশাখোরী , দুরারোগ্য ব্যাধি , পারিবারিক জীবনের ধবংস , যুব সামাজের অসৎপথ অবলম্বন , শ্রেণী সংঘাত এবং জুলুম নিপীড়নের বিপুলাকার রোগে আক্রান্ত হয়৷ এমন কি উন্নতির উচ্চতম শিখর থেকে একবার পতন ঘটার পর ইতিহাসের পাতায় তাদের জন্য কলংক , লানত ও অভিশাপ ছাড়া আর কিছুই থাকেনি৷আর এ ধরনের লোককে আমি কঠিন পথে চলার সুবিধা দেবো , একথা বলার মানে হচ্ছে , তার থেকে সৎপথে চলার সুযোগ ছিনিয়ে নেয়া হবে৷ অসৎপথের দরজা তার জন্য খুলে দেয়া হবে৷ অসৎকাজ করার যাবতীয় উপকরণ ও কার্যকারণ তার জন্য সংগ্রহ করে দেয়া হবে৷ খারাপ কাজ করা তার জন্য সহজ হবে এবং ভালো কাজ করার চিন্তা মনে উদয় হওয়ার সাথে সাথেই সে মনে করবে এই বুঝি তার দম বন্ধ হয়ে যাবে৷ এই অবস্থাটিকেই কুরআনের অন্যত্র এভাবে বলা হয়েছে : "আল্লাহ যাকে পথ দেখাবার সংকল্প করেন তার বক্ষদেশ ইসলামের জন্য খুলে দেন৷ আর যাকে তিনি গোমরাহীর মধ্যে ঠেলে দেবার এরাদা করেন তার বক্ষদেশেকে সংকীর্ণ করে দেন৷ এবং তাকে এমনভাবে সংকুচিত করেন যার ফলে ( ইসলামের কথা মনে হলেই,) সে অনুভব করতে থাকে যেন তার প্রাণবায়ু উড়ে যাচ্ছে"৷ ( আনআম ১২৫ আয়াত ) আর এক জায়গায় বলা হয়েছে : নিসন্দেহে নামায একটি অত্যন্ত কঠিন কাজ , কিন্তু আল্লাহ অনুগত বান্দার জন্য নয় ৷ " ( আল বাকারাহ ৪৬ আয়াত ) আর মোনাফেকদের সম্পর্কে বলা হয়েছে : " তারা নামাযের দিকে এলেও গড়িমসি করে আসে এবং আল্লাহর পথে খরচ করলেও যেন মন চায় না তবুও খরচ করে৷ " ( আত তাওবাহ ৫৪ আয়াত ) আরো বলা হয়েছে : " তাদের মধ্যে এমন সব লোক রয়েছে যারা আল্লাহর পথে কিছু খরচ করলে তাকে নিজেদের ওপর জবরদস্তি আরোপিত জরিমানা মনে করে ৷ " ( আত তাওবাহ ৯৮ আয়াত )
৬. অন্য কথায় বলা যায় , একদিন তাকে অবশ্যি মরতে হবে৷ তখন এখানে আয়েশ আরামের জন্য সে যা কিছু সংগ্রহ করেছিল সব এই দুনিয়াতেই রেখে যেতে হবে৷ যদি নিজের আখেরাতের জন্য এখান থেকে কিছু কামাই করে না নিয়ে গিয়ে থাকে তাহলে দুনিয়ার এ ধন - সম্পদ তার কোন কাজে লাগবে ? সে তো কোন দালান কোঠা , মোটরগাড়ী , সম্পত্তি বা জমানো অর্থ সংগে করে কবরে যাবে না৷
৭. অর্থাৎ মানুষের স্রষ্টা হবার কারণে মহান আল্লাহ নিজের জ্ঞানপূর্ণ কর্মনীতি , ন্যায়নিষ্ঠা ও রহমতের ভিত্তিতে নিজেই মানুষকে এ দুনিয়ায় এমনভাবে ছেড়ে দেননি যে , সে কিছুই জাননে না৷ বরং সঠিক পথ কোনটি ও ভুল পথ কোনটি , নেকী , গোনাহ , হালাল ও হারাম কি , কোন কর্মনীতি তাকে নাফরমান বান্দার ভূমিকায় এনে বসাবে ------ এসব কথা জানিয়ে দেবার দায়িত্ব তিনি নিজেই গ্রহণ করেছেন৷ একথাটিকেই সূরা আন নাহলে এভাবে বলা হয়েছে :

আরবী ----------------------------

" আর সোজা পথ দেখাবার দায়িত্ব আল্লাহরই ওপর বার্তায়, যখন বাঁকা পথও রয়েছে৷" ( ৯ আয়াত ) ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমূল কুরআন , আন নাহল, ৯ টীকা ৷
৮. এ বক্তব্যটির কয়েকটি অর্থ হয়৷ সবগুলো অর্থই সঠিক৷ এক , দুনিয়া থেকে আখেরাত পর্যন্ত কোথাও তোমরা আমার নিয়ন্ত্রণ ও পাকড়াও এর বাইরে অবস্থান করছো না৷ কারণ আমিই উভয় জাহানের মালিক৷ দুই , তোমরা আমার দেখানো পথে চলো বা না চলো আসলে দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ের ওপর আমার মালিকানা প্রতিষ্ঠিত ৷ তোমরা ভুল পথে চললে তাতে আমার কোন ক্ষতি হবে না , তোমাদের ক্ষতি হবে৷ আর তোমরা সঠিক পথে চললে আমার কোন লাভ হবে না , তোমরাই লাভবান হবে৷ তোমাদের নাফরমানির আবরণে আমার মালিকানায় কোন কমতি দেখা দেবে না এবং তোমাদের আনুগত্য তার মধ্যে কোন বৃদ্ধিও ঘটাতে পারবে না৷ তিন , আমিই উভয় জাহানের মালিক৷ দুনিয়া তথা বৈষয়িক স্বার্থ চাইলে তা আমার কাছ থেকেই তোমরা পাবে৷ আবার আখেরাতের কল্যাণ চাইলে তাও দেবার ক্ষমতা একমাত্র আমারই আছে৷ একথাটিই সূরা আলে ইমরানের ১৪৫ আয়াতে এভাবে বলা হয়েছে :

আরবী -----------------------------------------------------------------------------------

" যে ব্যক্তি দুনিয়ায় সওয়াব হাসিলের সংকল্পে কাজ করবে আমি তাকে দুনিয়া থেকেই দেবো আর যে ব্যক্তি আখেরাতের সওয়াব হাসিলের সংকল্পে কাজ করবে আমি তাকে আখেরাত থেকে দেবো৷ "

সূরা শুরা ২০ আয়াতে একথাটি নিম্নোক্তভাবে বলা হয়েছে :

আরবী ------------------------------------------------------

" যে ব্যক্তি আখেরাতের কৃষি চায় তার কৃষিকে আমি বাড়িয়ে দেই আর যে দুনিয়ার কৃষি চায় তাকে দুনিয়া থেকেই দান করি , কিন্তু আখেরাতে তার কোন অংশ নেই৷"

আরো ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমূল কুরআন , আলে ইমরান ১০৫ টীকা এবং আশ শূরা ৩৫ টীকা ৷
৯. এর অর্থ এই নয় যে , চরম হতভাগ্য ছাড়া আর কেউ জাহান্নামে যাবে না এবং পরম মুত্তাকী ছাড়া আর কেউ তার হাত থেকে নিষ্কৃতি পাবে না৷ বরং দু'টি চরম পরস্পর বিরোধী চরিত্রকে পরস্পরের বিরুদ্ধে পেশ করে তাদের পরস্পর বিরোধী চরম পরিণাম বর্ণনা করাই এখানে উদ্দেশ্য৷ এক ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের শিক্ষাকে মিথ্যা বলে এবং আনুগত্যের পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়৷ আর দ্বিতীয় ব্যক্তি কেবল ঈমান এনেই ক্ষান্ত হয় না বরং পরম আন্তরিকতা সহকারে কোন প্রকার লোক দেখানো প্রবণতা , নাম যশ ও খ্যাতির মোহ ছাড়াই শুধুমাত্র আল্লাহর কাছে পাক - পবিত্র মানুষ হিসেবে গণ্য হবার আকাংখায় আল্লাহর পথে নিজের ধন - সম্পদ ব্যয় করে৷ এই দু' ধরনের চরিত্র সম্পন্ন লোক সে সময় মক্কার সমাজে সবার সামনে বর্তমান ছিল৷ তাই কারো নাম না নিয়ে লোকদের জানিয়ে দেয়া হয়েছে , জাহান্নামের আগুনে দ্বিতীয় ধরনের চরিত্র সম্পন্ন লোক নয় বরং প্রথম ধরনের চরিত্র সম্পন্ন লোকই পুড়বে৷ আর এই আগুন থেকে প্রথম ধরনের লোক নয় বরং দ্বিতীয় ধরনের লোককেই দূরে রাখা হবে৷
১০. এখানে সেই মুত্তাকী ও আল্লাহভীরু ব্যক্তির আন্তরিকাতার আরো বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে৷ সে নিজের অর্থ যাদের জন্য ব্যয় করে , আগে থেকেই তার কোন অনুগ্রহ তার ওপর ছিল না , যার বদলা সে এখন চুকাচ্ছে অথবা ভবিষ্যতে তাদের থেকে আরো স্বার্থ উদ্ধারের জন্য তাদেরকে উপহার উপঢৌকন ইত্যাদি দিচ্ছে এবং তাদেরকে দাওয়াত খাওয়াচ্ছে৷ বরং সে নিজের মহান ও সর্বশক্তিমান রবের সন্তুষ্টিলাভের জন্য এমন সব লোককে সাহায্য করছে , যার ইতিপূর্বে তার কোন উপকার করেনি এবং ভবিষ্যতেও তাদের উপকার করার কোন আশা নেই৷ এর সর্বোৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হচ্ছে হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহুর গোলাম ও বাঁদীদের আযাদ করার কাজটি৷ মক্কা মু'আযযমার সে অসহায় গোলাম ও বাঁদীরা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং এই অপরাধে তাদের মালিকরা তাদের ওপর চরম অকথ্য নির্যাতন ও নিপীড়ন চালাচ্ছিল হযরত আবু বকর ( রা) তাদেরকে মালিকদের জুলুম থেকে বাঁচাবার জন্য কিনে নিয়ে আযাদ করে দিচ্ছিলেন৷ ইবনে জারীর ও ইবনে আসাকির হযরত আমরে ইবনে আবদুল্লাহ যুবাইরের এই রেওয়ায়াতটি উদ্ধৃত করেছেন : হযরত আবু বকরকে এভাবে গরীব গোলাম ও বাঁদীদেরকে গোলামী মুক্ত করার জন্য অর্থ ব্যয় করতে দেখে তাঁর পিতা তাকে বলেন , হে পুত্র ! আমি দেখছি তুমি দুর্বল লোকদের মুক্ত করে দিচ্ছো , যদি এ টাকাটা তুমি শক্তিশালী জোয়ানদের মুক্ত করার জন্য খরচ করতে তাহলে তারা তোমার হাতকে শক্তিশালী করতো৷ একথায় হযরত আবু বকর ( রা) তাঁকে বলেন : আরবী ----------------------------------------------------------------------' আব্বাজান ! আমি তো আল্লাহর কাছে এর প্রতিদান চাই ৷"
১১. এ আয়াতের দু'টি অর্থ হতে পারে ৷ দু'টি অর্থই সঠিক৷ একটি অর্থ হচ্ছে , নিশ্চয়ই আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন ! আর দ্বিতীয় অর্থটি হচ্ছে , শীঘ্রই আল্লাহ এ ব্যক্তিকে এতসব কিছু দেবেন যার ফলে সে খুশী হয়ে যাবে৷