(৯:৪৩) হে নবী! আল্লাহ তোমাকে মাফ করুন, তুমি তাদের অব্যাহতি দিলে কেন? (তোমরা নিজের তাদের অব্যাহতি না দেয়া উচিত ছিল) এভাবে তুমি জানতে পারতে কারা সত্যবাদী এবং কারা মিথ্যুক৷ ৪৫
(৯:৪৪) যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, তারা কখনো তোমার কাছে তাদের ধনও প্রাণ দিয়ে জিহাদ করা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য আবেদন জানাবে না৷ আল্লাহ মুত্তাকীদের খুব ভাল করে জানেন৷
(৯:৪৫) এমন আবেদন তো একমাত্র তারাই করে, যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে না, যাদের মনে রয়েছে সন্দেহ এবং এ সন্দেহের দোলায় তারা দোদুল্যমান৷ ৪৬
(৯:৪৬) যদি সত্যি সত্যিই তাদের বের হবার ইচ্ছা থাকতো তাহলে তারা সে জন্য কিছু প্রস্তুতি গ্রহণ করতো৷ কিন্তু তাদের অংশগ্রহণ আল্লাহ কাছে পছন্দনীয় ছিল না৷ ৪৭ তাই তিনি তাদের শিথিল করে দিলেন এবং বলে দেয়া হলোঃ বসে থাকো, যারা বসে আছে তাদের সাথে ৷
(৯:৪৭) যদি তারা তোমাদের সাথে বের হতো তাহলে তোমাদের মধ্যে অনিষ্ট ছাড়া আর কিছুই বাড়াতো না ৷ তারা ফিতনা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তোমাদের মধ্যে প্রচেষ্টা চালাতো৷ আর তোমাদের লোকদের অবস্থা হচ্ছে, তাদের মধ্যে এখনো এমন লোক আছে যারা তাদের কথা আড়ি পেতে শোনে৷ আল্লাহ এ জালেমদের খুব ভাল করেই চেনেন৷
(৯:৪৮) এর আগেও এরা ফিতনা সৃষ্টির চেষ্টা করেছে এবং তোমাদের ব্যর্থ করার জন্য ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বিভিন্ন ধরনের কৌশল খাটিয়েছে৷ এ সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সত্য এসে গেছে এবং আল্লাহ উদ্দেশ্য সফল হয়েছে৷
(৯:৪৯) তাদের মধ্যে এমন লোকও আছে, যে বলে আমাকে অব্যাহতি দিন এবং আমাকে পাপের ঝুঁকির মধ্যে ফেলবেন না ৷ ৪৮ শুনে রাখো, এরা তো ঝুঁকির মধ্যেই পড়ে আছে ৪৯ এবং জাহান্নাম এ কাফেরদের ঘিরে রেখেছে৷ ৫০
(৯:৫০) তোমরা ভাল কিছু হলে তা তাদের কষ্ট দেয় এবং তোমার ওপর কোন বিপদ এলে তারা খুশী মনে সরে পড়ে এবং বলতে থাকে, “ভালই হয়েছে, আমরা আগে ভাগেই আমাদের ব্যাপার সেরে নিয়েছি”৷
(৯:৫১) তাদের বলে দাও, “আল্লাহ আমাদের জন্য যা লিখে দিয়েছেন, তা ছাড়া আর কোন (ভাল বা মন্দ )কিছুই আমাদের হয় না৷ আল্লাহই আমাদের অভিভাবক ও কার্যনির্বাহক এবং ঈমানদরদের তাঁর ওপরই ভরসা করা উচিত”৷ ৫১
(৯:৫২) তাদের বলে দাও, “তোমরা আমাদের ব্যাপারে যে জিনিসের অপেক্ষায় আছো তা দুটি ভালর একটি ছাড়া আর কি? ৫২ অন্যদিকে আমরা তোমাদের ব্যাপারে যে জিনিসের অপেক্ষায় আছি তা হচ্চে এই যে আল্লাহ হয় নিজেই তোমাদের শাস্তি দেবেন, না হয় আমাদের হাত দিয়ে দেয়াবেন? তাহলে এখন তোমরা অপেক্ষা করোএবং আমরা ও তোমাদের সাথে অপেক্ষায় থাকছি”৷
(৯:৫৩) তাদের বলে দাও, “তোমরা নিজেদের ধন-সম্পদ স্বেচ্ছায় ও সানন্দে ব্যয় কর অথবা অনিচ্ছাকৃতভাবে ব্যয় কর, ৫৩ তা গৃহীত হবে না৷ কারণ তোমরা ফাসেক গোষ্ঠী”৷
(৯:৫৪) তাদের দেয়া সম্পদ গৃহীত না হবার এ ছাড়া আর কোন কারন নেই যে, তারা আল্লাহ ও তার রসূলের সাথে কুফরী করেছে, নামাযের জন্য যখন আসে আড়মোড় ভাংতে ভাংতে আসে এবং আল্লাহর পথে খরচ করলে তা করে অনিচ্ছাকৃতভাবে ৷
(৯:৫৫) তাদের ধন-দৌলত ও সন্তানের আধিক্য দেখে তোমরা প্রতারিত হয়ো না৷ আল্লাহ চান , এ জিনিসগুলোর মাধ্যমে দুনিয়ার জীবনে তাদের শাস্তি দিতে৷ ৫৪ আর তারা যদি প্রাণও দিয়ে দেয়, তাহলে তখন তারা থাকবে সত্য অস্বীকার করার অবস্থায়৷ ৫৫
(৯:৫৬) তারা আল্লাহর কসম খেয়ে খেয়ে বলে, আমরা তোমাদেরই লোক৷ অথচ তারা মোটেই তোমাদের অন্তরভুক্ত নয়৷ আসলে তারা এমন একদল লোক যারা তোমাদের ভয় করে৷
(৯:৫৭) যদি তারা কোন আশ্রয় পেয়ে যায় অথবা কোন গিরি -গুহা কিংবা ভিতরে প্রবেশ করার মত কোন জায়গা , তাহলে দৌড়ে গিয়ে সেখানে লুকিয়ে থাকবে৷ ৫৬
(৯:৫৮) হে নবী! তাদের কেউ কেউ সাদকাহ বন্টনের ব্যাপারে তোমার বিরুদ্ধে আপত্তি জানাচ্ছে৷ এ সম্পদ থেকে যদি তাদের কিছু দেয়া হয় তাহলে তারা খুশী হয়ে যায়, আর না দেয়া হলে বিগড়ে যেতে থাকে৷ ৫৭
(৯:৫৯) কতই না ভাল হতো, আল্লাহ ও তার রসূল যা কিছুই তাদের দিয়েছিলেন তাতে যদি তারা সন্তুষ্ট থাকতো৷ ৫৮ এবং বলতো, “আল্লাহ আমাদের জন্য যথেষ্ঠ৷ তিনি নিজের অনুগ্রহ থেকে আমাদের আরো অনেক কিছু দেবেন এবং তাঁর রসূলও আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করবেন৷ ৫৯ আমরা আল্লাহরই প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রেখেছি”৷ ৬০
৪৫. কোন কোন মুনাফিক বানোয়াট ওযর পেশ করে নবী (সা) এর কাছে যুদ্ধে যাওয়া থেকে অব্যাহতি চেয়েছিল৷ তিনিও নিজের স্বভাবগত কোমলতা ও উদারতার ভিত্তিতে তারা যে নিছক ভাওতাবাজী করেছে, তা জান সত্ত্বেও তাদের অব্যাহতি দিয়েছিলেন৷কিন্তু আল্লাহ এটা পছন্দ করেননি৷ এ ধরনের উদার নীতি সংগত নয় বলে তাকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন৷অব্যাহতি দেবার কারণে এ মুনাফিকরা নিজেদের মুনাফীকী ও প্রতারণামূলক কার্যকলাপ গোপন করার সুযোগ পেয়ে গেলো৷ যদি তাদের অব্যহতি না দেয়া হতো এবং তারপর তারা ঘরে বসে থাকতো তাহলে তখন তাদের মিথ্যা ঈমানের দাবী সর্বসমক্ষে প্রকাশ হয়ে পড়তো৷
৪৬. এ থেকে জানা যায়, ইসলাম ও কুফরীর দ্বন্ধ একটি মাপকাঠি স্বরূপ৷এর মাধ্যমে খাঁটি মুমিন ও নকল ঈমানের দাবীদারের পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে উঠে৷এ দ্বন্ধ ও সংঘাতে যে ব্যক্তি মনপ্রাণ দিয়ে ইসলামকে সমর্থন করে এবং নিজের সমস্ত শক্তি সামর্থ ও উপায় উপকরণ তাকে বিজয়ী করার সংগ্রামে নিয়োজিত করে এবং এ পথে কোন প্রকার ত্যাগ স্বীকারে কুণ্ঠিত হয় না, সেই সাচ্চা মুমিন৷ পক্ষান্তরে এ দ্বন্দ্ব ও সংঘাতে যে ব্যক্তি ইসলামের সাথে সহযোগিতা করতে ইতস্তত করে এবং কুফরের শির উচু হবার বিপদ সামনে দেখেও ইসলামের বিজয়ের জন্য জান-মালের কুরবানী করতে কুণ্ঠিত হয়, তার মনোভাব ও কার্যকলাপ এ সত্যটিকে সুষ্পষ্ট করে দেয়, যে তার অন্তরে ঈমান নেই৷
৪৭. অর্থাৎ মনের তাগিদ ছাড়া অনিচ্ছায় যুদ্ধযাত্রা আল্লাহর কাছে পছন্দনীয় ছিল না৷কারণ তাদের মধ্যে যখন জিহাদে অংশগ্রহণ করার প্রেরণা ও সংকল্প অনুপস্থিত ছিল এবং ইসলামের বিজয়ের জন্য প্রাণপাত করার কোন ইচ্চাই তাদের ছিল না তখন শুধুমাত্র মুসলমানদের সামনে লজ্জিত হবার ভয়ে অসন্তুষ্ট মনে অথবা কোন অনিষ্ট করার উদ্দেশ্যে তারা জোরেশোরে এগিয়ে আসতো এবং এটা সমূহ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতো৷ পরবর্তী আয়াতে বিষয়টি পরিস্কার করে বলা হয়েছে৷
৪৮. যেসব মুনাফিক মিথ্যা বানিয়ে পিছনে থেকে যাবার অনুমতি চাচ্ছিল, তাদের মধ্যে কেউ কেউ এতই বেপরোয়া ছিল যে, আল্লাহর পথ থেকে পেছনে সরে যাবার জন্য ধর্মীয় ও নৈতিক ধরনের বাহানাবাজীর আশ্রয় নিতো৷ জাদ্দ ইবনে কায়েস নামক তাদের একজনের সম্পর্কে হাদীসে বলা হয়েছেঃ সে নবী (সা) এর খেদমতে হাযির হয়ে আরয করলো, আমি একজন সৌন্দর্য পিপাসু লোক আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা আমার এ দুর্বলতা জানে যে , মেয়েদের ব্যাপারে আমি সবর করতে পারি না৷ আমার ভয় হয়, রোমান মেয়েদের দেখে আমার পদস্খলন না হয়ে যায়৷ কাজেই আপনি আমাকে ঝুকির মধ্যে ঠেলে দেবেন না৷ এবং এ অক্ষমতার কারণে আমাকে এ জিহাদে অংশগ্রহণ করা থেকে রেহাই দিন৷
৪৯. অর্থাৎ তারা তো ফিতনা বা পাপের ঝুঁকি থেকে রেহাই পাওয়ার দুহাই দিচ্ছে কিন্তু আসলে তারা আকন্ঠ্ ডুবে আছে মুনাফিকী, মিথ্যাচার ও রিয়াকারীর মত জঘন্য পাপের মধ্যে৷ নিজেদের ধারণা মতে তারা মনে করেছে, ছোট ছোট ফিতনার সম্ভবনার ব্যাপারে ভয় ও পেরেশানি প্রকাশ করে তারা নিজেদের বড় ধরনের মুত্তাকী হবার প্রামাণ পেশ করে যাচ্ছে৷ অথচ কুফর ও ইসলামের চুড়ান্ত ও সিদ্ধান্তকর সংঘর্ষকালে ইসলামের পক্ষ সমর্থনে ইতস্তত করে তারা আরো বড় পাপ এবং আরো বড় ফিতনার মধ্যে নিজেদের ফেলে দিচ্ছে যার চাইতে বড় কোন ফিতনার কথা কল্পনাই করা যায় না৷
৫০. অর্থাৎ তাকওয়ার এ প্রদর্শনী তাদের জাহান্নাম থেকে দূরে সরিয়ে রাখেনি ৷ বরং মুনাফিকী লানতই তাদেরকে জাহান্নামের করাল গ্রাসে নিক্ষেপ করেছে৷
৫১. এখানে দুনিয়াপূজারী ও আল্লাহ বিশ্বাসী মানসিকতার পার্থক্য সুস্পষ্ট করে তূলে ধারা হয়েছে৷ দুনিয়া পূজারী নিজের প্রবৃত্তির আকাংখা পূর্ণ করার জন্য সবকিছু করে৷ কোন বৈষয়িক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার ওপরই তার প্রবৃত্তির সুখ ও আনন্দ নির্ভর করে৷এ উদ্দেশ্য লাভে সক্ষম হলেই সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে৷ আর উদ্দেশ্য লাভে ব্যার্থ হলে সে ম্রিয়মান হয়ে পড়ে৷ তারপর বস্তুগত কার্যকারণই প্রায় তার সমস্ত সহায় অবলম্বনের কাজ করে৷ সেগুলো অনুকূল হলে তা মনোবল বেড়ে যেতে থাকে৷ আর প্রতিকূল হলে সে হিম্মত হারাতে থাকে৷ অন্যদিকে আল্লাহে বিশ্বাসী মানুষ আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্যই সবকিছু করে৷ এ কাজে সে নিজের শক্তি বা বস্তুগত উপায়-উপকরণের ওপর ভরসা করে না বরং সে পুরোপুরি নির্ভর করে আল্লাহর সত্তার ওপর৷ সত্যের পথে কাজ করতে গিয়ে সে বিপদ -আপদের সম্মুখীন হলে অথবা সাফল্যের বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করলে, উভয় অবস্থায় সে মনে করে আল্লাহর ইচ্ছাই পূর্ণ হচ্ছে৷ বিপদ আপদ তার মনোবল ভাংতে পারে না৷ আবার সাফল্যও তাকে অহংকারে লিপ্ত করতে পারে না৷ কারণ, প্রথমত সে উভয়কে আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত বলে মনে করে৷ সব অবস্থায় সে আল্লাহর সৃষ্ট এ পরীক্ষায় নিরাপদে উত্তীর্ণ হতে চায়৷ দ্বিতীয়ত তার সামনে কোন বৈষয়িক উদ্দেশ্য থাকে না এবং তার মাধ্যমে সে নিজের সাফল্য ও ব্যর্থতার বিচার করে না৷ তার সামনে থাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের একটি মাত্র উদ্দেশ্য৷ বৈষয়িক সাফল্য লাভ করা বা না করার মাধ্যমে তার এ উদ্দেশ্যের নিকটবর্তী হওয়া বা দূরে অবস্থান করার ব্যাপাটি পরিমাপ করা যায় না৷বরং আল্লাহর পথে জান ও মাল উৎসর্গ করার যে দায়িত্ব তার ওপর অর্পিত হয়েছিল তা সে কতদূর পালন করেছে৷ তার ভিত্তিতেই তার পরিমাপ করা যায়৷ যদি এ দায়িত্ব সে পালন করে থাকে তাহলে দুনিয়ায় সে সম্পূর্ণরূপে হেরে গেলেও তার পূর্ণ আস্থা থাকে যে, সে যে আল্লাহর জন্য ধন-প্রাণ উৎসর্গ করেছে তিনি তার প্রতিদান নষ্ট করে দেবেন না৷তারপর বৈষয়িক কার্যকারণ ও উপায় -উপকরণের আশায় সে বসে থাকে না৷ সেগুলোর অনুকূল ও প্রতিকূল হওয়া তাকে আনন্দিত ও নিরানন্দ করে না৷ সে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা রাখে৷ তিনিই কার্যকারণ ও উপায়-উপকরণ রাজ্যের একচ্ছত্র মালিক৷ কাজেই তার ওপর ভরসা করে সে প্রতিকূল অবস্থায়ও এমন হিম্মত ও দৃঢ় সংকল্প সহকারে কাজ করে যায় যে, দুনিয়া পূজারীরা একমাত্র অনুকূল অবস্থায়ই সেভাবে কাজ করতে পারে ৷তাই মহান আল্লাহ বলেন ঐসব দুনিয়া পুজারী মুনাফিকদের বলে দাও, আমাদের ব্যাপারটা তোমাদের থেকে মূলগতভাবে ভিন্ন৷ তোমাদের আনন্দ ও নিরানন্দের রীতি-পদ্ধতি আমাদের থেকে আলাদা৷ তোমাদের নিশ্চিন্ততা ও অস্থিরতার উৎস এক, আমাদের অন্য৷
৫২. মুনাফিকরা তাদের অভাস অনুযায়ী এ সময়ও কুফর ও ইসলামের সংঘাতে অংশ না নিয়ে নিজেরা চরম বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিচ্ছে বলে মনে করেছিল৷এ সংঘাতের পরিণামে রসূল ও তার সাহাবীরা বিজয়ীর বেশে ফিরে আসেন , না রোমীদের সামরিক শক্তির সাথে সংঘর্ষে ছিন্নভিন্ন হয়ে যান, দূরে বসে তারা তা দেখতে চাচ্ছিল৷ এখানে তাদের প্রত্যাশার জবাব দেয়া হয়েছিল৷ বলা হয়েছে , দুটি ফলাফলের মধ্যে তোমরা একটির প্রকাশের অপেক্ষা করছো৷ অথচ ঈমানদারদের জন্য উভয় ফলাফলই যথার্থ ভাল ও কল্যাণ ছাড়া আর কিছুই নয়৷ তারা বিজয়ী হলে, এটা যে তাদের জন্য ভাল একথা সবার জানা ৷ কিন্তু নিজেদের উদ্দেশ্য সম্পাদনের পথে প্রাণ দান করে যদি তারা মাটিতে বিলীন হয়ে যায়, তাহলে দুনিয়াবাসীরা তাদের চরম ব্যর্থ বলে মনে করলেও প্রকৃতপক্ষে এটিও আর এক রকমের সাফল্য৷ কারণ মুমিন একটি দেশ জয় করলো কি করলো না অথবা কোন সরকার প্রতিষ্ঠিত করলো কি না, এটা তার সাফল্য ও ব্যর্থতার মাপকাঠি নয়৷ বরং মুমিন তার আল্লাহর কালেমা বুলন্দ করার জন্য নিজের মন, মস্তিস্ক ,দেহ ও প্রাণের সমুদয় শক্তি নিয়োজিত করেছে কিনা, এটাই তার মাপকাঠি ৷ এ কাজ যদি সে করে থাকে তাহলে দুনিয়ার বিচারে তার ফলাফল শূণ্য হলেও আসলে সে সফলকাম ৷
৫৩. কোন কোন মুনাফিক এমনও ছিল, যারা নিজেদেরকে বিপদের মধ্যে ঠেলে দিতে যদিও প্রস্তুত ছিল না, তবে তারা এ জিহাদ ও এ প্রচেষ্টা -সাধনা থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন থেকে মুসলমানদের দৃষ্টিতে নিজেদের সমস্ত মর্যাদা খুইয়ে ফেলতে এবং নিজেদের মুনাফিকীকে সর্বসমক্ষে প্রকাশ করে দিতেও চাচ্ছিল না৷ তাই তারা বলছিল,বর্তমানে আমরা যদিও অক্ষমতার কারণে যুদ্ধ থেকে অব্যাহতি চাচ্ছি৷ কিন্তু যুদ্ধের জন্য অর্থ সাহায্য করতে আমরা প্রস্তুত৷
৫৪. অর্থাৎ এ ধন-সম্পদ ও সন্তান সন্তুতির মায়ার ডোরে আবদ্ধ হয়ে তারা সে মুনাফিকী নীতি অবলম্বন করেছে, সে জন্য মুসলিম সমাজে তারা চরমভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে৷ এতদিনকার আরবীয় সমাজে তাদের যে প্রভাব-প্রতিপত্তি, মান-মর্যাদা, নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব ছিল নব্য ইসলামী সামাজ ব্যবস্থায় তা সম্পূর্ণ মাটিতে মিশে যাবে৷ যেসব নগন্য দাস ও দাস পুত্ররা এবং মামুলী কৃষক ও রাখালরা ঈমানী নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার প্রমাণ পেশ করেছে ,এ নতুন সমাজে তারা হবে মর্যাদাশীল অন্যদিকে বংশানুক্রমিক সমাজনেতা ও সমাজপতিরা নিজেদের দুনিয়া প্রীতির কারণে মর্যাদাহীন হয়ে পড়বে৷ হযরত উমরের (রা) মসজলিসে একবার একটি ঘটনা ঘটেছিল৷ সেটি ছিল এ অবস্থার একটি চমকপ্রদ চিত্র৷ সুহাইল ইবনে আমর ও হারেস ইবনে হিশামের মতো বড় বড় কুরাইশী সরদাররা হযরত উমরের (রা) সাথে সাক্ষাত করতে গিয়েছিলেন৷ সেখানে আনসার ও মুহিজিরদের মধ্যে থেকে মামুলী পর্যায়ের কোন লোক হলেও হযরত উমর (রা)তাকে ডেকে নিজের কাছে বসাচ্ছিলেন এবং এ সমাজপতিদের সরে তার জন্য জায়গা করে দিতে বলেছিলেন৷ কিছুক্ষনের মধ্যে সমাজপতিরা সরতে সরতে একেবারে মজলিসের কিনারে গিয়ে পৌছলেন৷বাইরে বের হয়ে এসে হারেস ইবনে হিশাম নিজের সাথীদের বললেন, তোমরা দেখলে তো আজ আমাদের সাথে কি ব্যবহার করা হলো? সুহাইল ইবনে আমর বললেন, এতে উমরের কোন দোষ নেই৷ দোষ আমাদের ৷ কারণ আমাদের যখন এ দীনের দিকে ডাকা হয়েছিল তখন আমরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলাম এবং এ লোকেরা দৌড়ে এসেছিল৷ তারপর এ দু সমাজপতি দ্বিতীয়বার হযরত উমরের কাছে হাযির হলেন৷ এবার তারা বললেন, আজ আমরা আপনার আচরণ দেখলাম৷ আমরা জানি, আমাদের ত্রুটির কারণেই এ অবস্থা হয়েছে৷ কিন্তু এখন এর প্রতিবিধানের কোন উপায় আছে কি? হযরত উমর(রা) মুখে কোন জবাব দিলেন না৷ তিনি শুধু রোম সীমান্তের দিকে ইশারা করলেন৷ মানে, তিনি বলতে চাচ্ছিলেন, এখন জিহাদের ময়দানে জান-মাল উৎসর্গ করো, তাহলে হয়তো তোমরা নিজেদের হারানো মর্যাদা আবার ফিরে পাবে৷
৫৫. অর্থাৎ এতসব লাঞ্ছনা-গাঞ্জনার মধ্যেও তাদের জন্য আরো বড় বিপদ হবে এই যে, তারা নিজেদের মধ্যে যে মুনাফিকী চরিত্র বৈশিষ্ট্য লালন করছে তার বদৌলতে মরার আগ পর্যন্ত তারা সত্যিকার ঈমানলাভের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত থাকবে এবং নিজেদের পার্থিব সুখ-সুবিধা ধ্বংস করার পর দুনিয়া থেকেএমন অবস্থায় বিদায় নেবে যে, তাদের আখেরাত হবে এর চাইতেও অনেক বেশী খারাপ৷
৫৬. মদীনার এ মুনাফিকদের বেশীরভাগই ধনী ও বয়স্ক৷ ইবনে কাসির তার আল বেদায়া ওয়ান নেহায়া গ্রন্থে তাদের যে তালিকা দিয়েছেন তাতে শুধুমাত্র একজন যুবকের নাম পাওয়া যায়৷ তাদের একজনও গরীব নয়৷ এরা মদীনায় বিপুল -ভূ-সম্পত্তি ও চারদিকে ছড়িয়ে থাকা বিরাট কারবারের মালিক ছিল৷ সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও বহুদর্শিতা এদের সুযোগ-সন্ধানী ও সুবিধাবাদী বানিয়ে দিয়েছিল৷ ইসলাম যখন মদীনায় পৌছলো এবং জনবসতির একটি বড় অংশ পূর্ণ আন্তরিকতা ও ঈমানী জোশের সাথে ইসলাম গ্রহন করলো তখন এ শ্রেনীটি পড়লো উভয় সংকটে৷তারা দেখলো এ নতুন দীন একদিকে তাদের নিজেদের গোত্রের অধিকাংশ বরং তাদের ছেলেমেয়েদের পর্যন্ত ঈমানের নেশায় মাতিয়ে তুলেছে৷ তাদের বিপরীত সারিতে দাঁড়িয়ে তারা যদি এখন কুফরী ও অস্বীকারের ঝাণ্ডা উত্তোলিত করে রাখে, তাহলে তাদের নেতৃত্ব -সরদারী, প্রভাব-প্রতিপত্তি, মান-সম্মান,সুনাম-সুখ্যাতি, সব্কিছুই হারিয়ে যাবে৷ এমনকি তাদের নিজেদের পারিবারিক পরিমণ্ডলেই তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষনার আশংকা দেখা দেবে৷ অন্যদিকেএ দীনের সাথে সহযোগিতা করার অর্থ হবে, তাদেরকে সমগ্র আরবের এমনকি চারপাশের সমস্ত জাতি -গোত্র ও রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত থাকা৷ সত্য ও ন্যায় যে আসলেই একটি মূল্যবান জিনিস তার প্রেমসুধা পান করে যে মানুষ সব রকমের বিপদ আপদ মাথা পেতে নিতে পারে, এমনকি প্রয়োজনে নিজের জান-মালও পর্যন্ত কুরবানী করতে পারে৷ পার্থিব স্বার্থে মোহ ও প্রবৃত্তির গোলামীতে আকণ্ঠ ডুবে থাকার কারণে সে কথা উপলব্ধি করার যোগ্যতা তারা হারিয়ে ফেলেছিল৷ তারা দুনিয়ার যাবতীয় বিষয়কে শুধুমাত্র স্বার্থ ও সুবিধাবাদের দৃষ্টিতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল৷ তাই ঈমানের দাবী করার মধ্যই তারা নিজেদের বৈষয়িক স্বার্থ সংরক্ষণের সবচেয়ে অনুকূল ও উপযোগী পথ খুঁজে পেয়েছিল৷ কারণ তারা এভাবে একদিকে নিজেদের জাতি -সম্প্রদায়ের মধ্যে নিজেদের বাহ্যিক মান-সম্ভ্রম, সহায়-সম্পদ ও ব্যবসা-বাণিজ্য যথাযথ ভাবে টিকিয়ে রাখতে পারবে৷অন্যদিকে মুমিন হওয়াটাও তাদের এড়িয়ে যাওয়া দরকার, যাতে আন্তরিকতার পথ অবলম্বন করার ফলে অনিবার্যভাবে যেসব বিপদ আপদ ও ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়, তার হাত থেকে রেহাই পেতে পারে৷ তাদের এ মানসিক অবস্থাকে এখানে বর্ণনা করা হয়েছে যে, আসলে তারা তোমাদের সাথে নেই৷ বরং ক্ষতির ভয় তাদের কে জবরদস্তি তোমাদের সাথে বেধে দিয়েছে৷ যে জিনিসটি তাদের নিজেদের কে মুসলমানদের মধ্যে গণ করাতে বাধ্য করেছে তা হচ্ছে এই ভীতি যে, মদীনায় থাকা অবস্থায় যদি তারা প্রকাশ্যে অমুসলিম হয়ে বাস করতে থাকে তহলে তাদের সমস্ত মর্যাদা ও প্রতিপত্তি খতম হয়ে যাবে এমনকি স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের সাথেও তাদের সম্পর্কেচ্ছেদ ঘটবে৷ আর যদি তারা মদীনা ত্যাগ করে তাহলে নিজেদের সম্পদ -সম্পত্তি ও ব্যবসা-বাণিজ্য ত্যাগ করতে হবে৷ আবার কুফরীর প্রতিও তাদের এতটা আন্তরিকতা ছিল না যে, তার জন্য তারা এসব ক্ষতি বরদাশত করতে পারতো৷ এ উভয় সংকটে পড়ে তারা বাধ্য হয়ে মদীনায় থেকে গিয়েছে৷ মন না চাইলেও অনিচ্ছা সত্ত্বেও নামায পড়তো৷ এবং যাকাতকে জরিমানা ভেবে হলেও অগত্যা আদায় করতো৷নয়তো প্রতিদান জিহাদ, প্রতিদান কোন না কোন ভয়াবহ দুশমনের সাথে পাঞ্জা কষাকষি এবং প্রতিদান জান-ও মাল কুরবানীর যে বিপদ ঘাড়ে চেপে আছে তার হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য তারা এত বেশী অস্থির যে, যদি তারা সাধারণ কোন সুড়াংগ তথা কোন গর্তও দেখতে পেতো এবং সেখানে গেলে নিরাপদ আশ্রয় লাভের সম্ভবনা থাকতো তাহলে দৌড়ে গিয়ে তার মধ্যে ঢুকে পড়তো৷
৫৭. এ প্রথমবার আরবে একটি নির্দিষ্ট পরমাণের বেশী ধন-সম্পদের অধিকারী লোকদের উপর যথারীতি যাকাত ধার্য করা হয়েছিল৷তাদের কৃষি উৎপাদন ,গবাদিপশু ও ব্যবসায় পন্য এবং খনিজ দ্রব্য ও সোনা রূপার সঞ্চয় থেকে আড়াই ভাগ ,৫ভাগ ,১০ভাগ ,ও ২০ ভাগ আদায় করা হতো৷ একটি বিধিবদ্ধ পদ্ধতিতে এসব যাকাতের সম্পদ সংগ্রহ করা হতো এবং একটি কেন্দ্রে জমা করে বিধিবদ্ধ পদ্ধতিতে খরচ করা হতো৷ এভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নবী (সা) এর কাছে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদ সংগৃহীত হয়ে আসতো এবং তার হাত দিয়ে তা লোকদের মধ্যে বিতরণ করা হতো,যা ইতিপূর্বে আরবের লোকেরা কখনো এক জন লোকের হাতে একই সংগে সংগৃহিত হতে এবং তার হাত দিয়ে খরচ হতে দেখেনি৷ এ সম্পদ দেখে দুনিয়া পূজারী মুনাফিকদের জিভ দিয়ে লালা ঝরতো৷ তারা চাইতো, এ প্রবহমান নদী থেকে তারা যেন আশ মিটিয়ে পানি পান করতে পারে৷ কিন্তু এখানে তো ব্যাপার ছিল সম্পূর্ণ অন্য রকম ৷এখানে যিনি পানি পান করাচ্ছিলেন তিনি নিজের জন্য এবং নিজের সংশ্লিষ্টেদের জন্য এ নদীর প্রতি বিন্দু পানি হারাম করে দিয়েছিলেন৷ কেউ আশা করতে পারে না , তার হাতের পানির পেয়ালা হকদার ছাড়া আর কারোর ঠোঁট স্পর্শ করতে পারে৷ এ কারণেই নবী (সা) এর সদকা বিতরণের অবস্থা দেখে মুনাফিকরা চাপা আক্রোশে গুমরে মরছিল৷ বন্টনের সময় তারা নানা অভিযোগে , তাকে অভিযুক্ত করতো৷ তাদের আসল অভিযোগ ছিল এ সম্পদের ওপর কর্তৃত্ব করার সুযোগ আমাদের দেয়া হচ্ছে না৷ কিন্তু এ আসল অভিযোগ গোপন করে তারা এ মর্মে অভিযোগ উত্থাপন করতো যে, ইনসাফের সাথে সম্পদ বন্টন করা হচ্ছে না এবং এ ব্যাপারে পক্ষপাতিত্ব করা হচ্ছে৷
৫৮. অর্থাৎ গনীমাতের মাল থেকে যা কিছু নবী (সা) তাদের দেন, তাই নিয়ে তারা সন্তুষ্ট থাকতো৷ অন্যদিকে আল্লাহর অনুগ্রহে তারা যা কিছু উপার্জন করে এবং অর্থ উপার্জনের আল্লাহ প্রদত্ত উপকরণের মাধ্যমে যে ধরনের সচ্ছলতা ও সমৃদ্ধির তারা লাভ করছে তাকেই নিজেদের জন্য যথেষ্ট মনে করতো৷
৫৯. অর্থাৎ যাকাত ছাড়াও অন্য যে সমস্ত ধন-সম্পদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে আসবে তা থেকে নিজ নিজ প্রাপ্য অনুযায়ী আমরা অংশ লাভ করতে থাকবো,যেমন ইতিপূর্বে করে এসেছি৷
৬০. অর্থাৎ দুনিয়া ও তার তুচ্ছ সম্পদের প্রতি আমাদের দৃষ্টি নেই৷ বরং আমাদের দৃষ্টি রয়েছে আল্লাহ ও তাঁর অনুগ্রহের ওপর৷ তাঁরই সন্তুষ্টি আমরা চাই৷ আমাদের সমস্ত আশা আকাংখা তাঁকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে৷ তিনি যা দেন তাতেই আমরা সন্তুষ্ট৷