(৯:৩৮) হে ঈমানদারগণ!৩৮ তোমাদের কী হলো , যখনই তোমাদের আল্লাহর পথে বের হতে বলা হলো, অমনি তোমরা মাটি কামড়ে পড়ে থাকলে? তোমরা কি আখেরাতের মোকাবিলায় দুনিয়ার জীবন পছন্দ করে নিয়েছো? যদি তাই হয় তাহলে তোমরা মনে রেখো, দুনিয়ার জীবনের এমন সাজ সরঞ্জাম আখেরাতে খুব সামান্য বলে প্রমাণিত হবে৷৩৯
(৯:৩৯) তোমরা যদি না বের হও তাহলে আল্লাহ তোমাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেবেন ৪০ এবং তোমাদের জায়গায় আর একটি দলকে ওঠাবেন, ৪১ আর তোমরা আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারবে না৷ তিনি সব জিনিসের ওপর শক্তিশালী৷
(৯:৪০) তোমরা যদি নবীকে সাহায্য না কর, তাহলে কোন পরোয়া নেই৷ আল্লাহ তাকে এমন সময় সাহায্য করেছেন যখন কাফেররা তাকে বের করে দিয়েছিল, যখন সে ছিল মাত্র দু’জনের মধ্যে দ্বিতীয় জন, যখন তারা দু’জন গুহার মধ্যে ছিল, তখন সে তার সাথীকে বলেছিল, চিন্তিত হয়ো না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন৷ ৪২ সে সময় আল্লাহ নিজের পক্ষ থেকে তার ওপর মানসিক প্রশান্তি নাযিল করেন এবং এমন সেনাদল পাঠিয়ে তাকে সাহায্য করেন, যা তোমরা দেখনি এবং তিনি কাফেরদের বক্তব্যকে নীচু করে দেন৷ আর আল্লাহর কথা তো সমুন্নত আছেই৷আল্লাহ পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়৷
(৯:৪১) বের হও, হালকা, কিংবা ভারী যাই হওনা কেন, এবং জিহাদ করো আল্লাহর পথে নিজের ধন-প্রাণ দিয়ে৷ এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয় যদি তোমরা জানতে৷৪৩
(৯:৪২) হে নবী! যদি সহজ লাভের সম্ভবনা থাকতো এবং সফর হালকা হতো, তাহলে তারা নিশ্চয়ই তোমার পেছনে চলতে উদ্যত হতো৷ কিন্তু তাদের জন্য তো এ পথ বড়ই কঠিন হয়ে গেছে৷ ৪৪ এখন তারা আল্লাহর কসম খেয়ে খেয়ে বলবে, যদি আমরা চলতে পারতাম তাহলে অবশ্যি তোমাদের সাথে চলতাম৷ তারা নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে৷ আল্লাহ ভালো করেই জানেন তারা মিথ্যাবাদী৷
৩৮. তাবুক যুদ্ধের প্রস্তুতি চলাকালে যে ভাষণটি নাযিল হয়েছিল এখান থেকে সেটিই শুরু হচ্ছে৷
৩৯. এর দুটো অর্থ হতে পারে৷ এক, আখেরাতের অনন্ত জীবন ও সেখানকার সীমা-সংখ্যাহীন সাজ সরঞ্জাম দেখার পর তোমরা জানতে পারবে, দুনিয়ার সামান্য জীবনকালে সুঐশ্বর্য ভোগের যে বড় বড় সম্ভবনা তোমাদের করায়ত্ব ছিল এবং যে সর্বাধিক পরিমানে বিলাস সামগ্রী তোমরা লাভ করতে পেরেছিলে তা আখেরাতের সেই সীমাহীন সম্ভবনা এবং সেই অন্তহীন নিয়ামতে পরিপূর্ণ সুবিশাল রাজ্যের তুলনায় কিছুই নয়৷ তখন তোমরা নিজেদের সংকীর্ণ দৃষ্টি ও অদূরদর্শিতার জন্য এ মর্মে আফসোস করতে থাকবে, যে, আমরা হাজার বুঝানো সত্ত্বেও দুনিয়ার তুচ্ছ ও ক্ষণস্থায়ী লাভের মোহে তোমরা কেন নিজেদেরকে এ চিরন্তন ও বিপুল পরিমাণ লাভ থেকে বঞ্চিত রাখলে৷ দুই, দুনিয়ার জীবনের সামগ্রি আখেরাতে কোন কাজে লাগবে না৷ এখানে যতই ঐশ্বর্য সম্পদ ও সাজ-সরঞ্জাম তোমরা সংগ্রহ করো না কেন, শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করার সাথে সাথেই সব কিছু থেকে হাত গুটিয়ে নিতে হবে৷ মৃত্যুর পরপারে যে জগত রয়েছে এখানকার কোন জিনিসই সেখানে তোমাদের সাথে স্থানাস্তরিত হবে না৷ এখানকার জিনিসের যে অংশটুকু তোমরা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য কুরবানী করেছো এবং যে জিনিসকে ভালবাসার ওপর তোমরা আল্লাহ ও তাঁর দীনের প্রতি ভালোবাসাকে প্রাধান্য দিয়েছো একমাত্র সেই অংশই তোমরা সেখানে পেতে পারো৷
৪০. এ থেকেই শরীয়াতের এ বিধি জানা যায় যে, যতক্ষণ পর্যন্ত কোন সাধারণ ঘোষণা (যুদ্ধ করার জন্য সর্বসাধারণ মুসলমানদেরকে আহবান জানানো ) না দেয়া হবে কিংবা কোন এলাকার সকল মুসলিম অধিবাসীকে বা মূলসমানদের কোন দলকে জিহাদের জন্য বের হবার হুকুম দেয়া না হবে ততক্ষণ তো জিহাদ ফরযে কিফায়াই থাকে৷ অর্থাৎ যদি কিছু লোক জিহাদ করতে থাকে তাহলে বাদবাকি লোকদের ওপর থেকে ঐ ফরয রহিত হয়ে যাবে৷ কিন্তু যখন মুসলমানদের শাসকের পক্ষ থেকে মুসলমানদেরকে সর্বাত্মক জিহাদের জন্য আহবান জানানো হবে অথবা কোন বিশেষ দলকে বা বিশেষ এলাকার অধিবাসীদেরকে ডাকা হবে তখন যাদেরকে ডাকা হয়েছে তাদের ওপর জিহাদ ফরযে আইন হয়ে যাবেএমনকি যে ব্যক্তি কোন যথার্থ অসুবিধা বা ওযর ছাড়া জিহাদে অংশগ্রহণ করবে না তার ঈমানই গ্রহণযোগ্য হবে না৷
৪১. অর্থাৎ আল্লাহর কাজ তোমাদের উপর নির্ভরশিল নয়৷ তোমরা করলে তা হবে এবং তোমরা না করলে তা হবে না এমন নয়৷ আসলেআল্লাহ যে তোমাদের তাঁর দীনের খেদমতের সুযোগ দিচ্ছেন, এটা তাঁর মেহেরবানী ও অনুগ্রহ৷ যদি তোমরা নিজেদের অজ্ঞতার কারণে এ সুযোগ হারাও, তাহলে তিনি অন্য কোন জাতিকে এ সুযোগ দেবেন এবং তোমরা ব্যর্থ হয়ে যাবে৷
৪২. মক্কার কাফেররা যখন নবী (সা) কে হত্যা করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত করে ফেলেছিল, এটা সে সময়ের কথা৷ যে রাতে তাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সে রাতেই তিনি মক্কা থেকে বের হয়ে মদীনার দিকে হিজরত করেছিলেন৷ ইতিপূর্বে দুজন চারজন করে যেতে যেতে মুসলমানদের বেশীর ভাগ মদীনায় পৌছে গিয়েছিল৷ মক্কায় কেবলমাত্র তারাই থেকে গিয়েছিল যারা ছিল একেবারেই অসহায় অথবা যাদের ঈমানের মধ্যে মোনাফেকীর মিশ্রণ ছিল এবং তাদের ওপর কোন প্রকারে ভরসা করা যেতে পারতো না৷ এ অবস্থায় যখন তিনি জানতে পারলেন,তাকে হত্যা করার সিন্ধান্ত হয়ে গেছে, তখন তিনি শুধুমাত্র একজন সাথী হযরত আবু বকরকে(রা) সংগে নিয়ে মক্কা থেকে বের হয়ে পড়লেন৷ নিশ্চয়ই তার পেছনে ধাওয়া করা হবে, এ ধারণার বশবর্তী হয়ে তিনি মদিনার পথ ছেড়ে (যা ছিল উত্তরের দিকে) দক্ষিণের পথ অবলম্বন করলেন৷এখানে তিন দিন সাওর নামক পর্বত গুহায় আত্মগোপন করে থাকলেন৷ তাঁর রক্ত পিপাসু দুশমনেরা তাঁকে চারদিকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল৷ মক্কার আশপাশের উপত্যকগুলোর কোন জায়গা খুঁজতে তারা বাকী রাখেনি৷ এভাবে তাদের কয়েকজন খুঁজতে খুঁজতে যে গিরি গুহায় তিনি লুকিয়েছিলেন তার মুখে পৌছে গেলো৷ হযরত আবু বরক(রা) ভীষণ ভয় পেয়ে গেলেন৷ তিনি ভাবলেন, দুশমনদের একজন যদি একটু ভিতরে ঢুকে উকি দেয়, তাহলে তাদের দেখে ফেলবে ৷কিন্তু নবী (সা)একটুও বিচলিত না হয়ে হযরত আবু বকর(সা) কে এ বলে সান্তনা দিলেন, "চিন্তিত হয়ো না, মন খারাপ করো না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন"৷
৪৩. এখানে হালকা ও ভারী শব্দ দুটি ব্যাপক অর্থবোধক৷ এর অর্থ হচ্ছে , বের হবার হুকুম যখন হয়ে গেছে তখন তোমাদের বের হয়ে পড়তে হবে৷ স্বেচ্চায় ও সাগ্রহে হোক বা অনিচ্ছায় -অনাগ্রহে,সচ্ছলতায় ও সমৃদ্ধির মধ্যে হোক বা দারিদ্রের মধ্যে, বিপুল পরিমাণ সাজসরঞ্জাম থাক বা একাবারে নিঃসম্বল অবস্থায় হোক ,অনুকূল অবস্থা হোক বা প্রতিকূল অবস্থা, যৌবন ও সুস্বাস্থের অধিকরী হও, বা বৃদ্ধ দুর্বল হও, সর্বাবস্থায় বের হতে হবে৷
৪৪. অর্থাৎ মোকাবিলা রোমের মতো বড় শক্তির সাথে৷ একদিকে প্রচন্ড গ্রীষ্মের মওসুম এসে গেছে এবং দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে৷ তার ওপর নতুন বছরের বহু প্রত্যাশিত ফসল কাটার সময় এসে গেছে৷ এসব কারণে তাবুকের সফর তাদের কাছে বড়ই কঠিন ও চড়ামূল্যের বলে মনে হচ্ছিল৷