(৯:২৫) এর আগে আল্লাহ বহু ক্ষেত্রে তোমাদের সাহায্য করছেন৷ এই তো সেদিন, হুনায়েন যুদ্ধের দিন (তাঁর সাহায্যের অভাবনীয় রূপ তোমরা দেখছো), ২৩ সেদিন তোমাদের মনে তোমাদের সংখ্যাধিক্যের অহমিকা ছিল৷ কিন্তু তা তোমাদের কোন কাজে আসেনি ৷ আর এত বড় বিশাল পৃথিবীও তোমাদের জন্য সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল এবং তোমরা পেছনে ফিরে পালিয়ে গিয়েছিলে ৷
(৯:২৬) তারপর আল্লাহ তার প্রশান্তি নাযিল করেন তাঁর রসূলের ওপর ও মুমিনদের ওপর এবং সেনাদল নামান যাদেরকে তোমরা চোখে দেখতে পাচ্ছিলে না৷ এবং সত্য অস্বীকারকারীদের শাস্তি দেন৷ কারণ যারা সত্য অস্বীকার করে এটাই তাদের প্রতিফল৷
(৯:২৭) তারপর (তোমরা এও দেখছো) এভাবে শাস্তি দেবার পর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাওবার তাওফীকও দান করেন৷ ২৪ আল্লাহ ক্ষমাশীল ও করুণাময়৷
(৯:২৮) হে ঈমানদারগণ! মুশরিকরা তো অপবিত্র, কাজেই এ বছরের পর তারা যেন আর মসজিদে হারামের কাছে না আসে৷ ২৫ আর যদি তোমাদের দারিদ্রের ভয় থাকে, তাহলে আল্লাহ চাইলে তার নিজ অনুগ্রহে শীঘ্রই তোমাদের অভাবমুক্ত করে দেবেন ৷ আল্লাহ সবকিছু জানেন ও তিনি প্রজ্ঞাময় ৷
(৯:২৯) আহলি কিতাবদের মধ্য থেকে যারা আল্লাহ ও পরকালের ঈমান আনে না ২৬ যা কিছু আল্লাহ ও তার রসূল গণ্য করেছেন তাকে হারাম করো না ২৭ এবং সত্য দীনকে নিজেদের দীনে পরিণত করে না, তাদের সাথে যুদ্ধ করো যে পর্যন্ত না তারা নিজের হাতে জিযিয়া দেয় ও পদানত হয়ে থাকে৷ ২৮
২৩. দায়িত্ব মুক্তি ও সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা সম্বলিত ভয়ংকর নীতি কার্যকর করার ফলে সারা আরবে সর্বত্র যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠবে এবং তার মোকিবালা করা অসম্ভব হবে বলে যারা আশংকা করছিল তাদেরকে বলা হচ্চে, এসব অমুলক ভয়ে ভীত হচ্ছো কেন? এর চাইতেও বেশী কঠিন বিপদের সময় যে আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেছেন তিনি এখনো তোমাদের সাহায্য করার জন্য রয়েছেন৷ এ কাজ যদি তোমাদের শক্তির ওপর নির্ভর করতো তাহলে এর আর মক্কা সীমানা পার হতে হতো না৷ আর না হোক, বদরের ময়দানে তো খতমই হয়ে যেতো৷ কিন্তু এর পেছনে তো রয়েছে স্বয়ং আল্লাহর শক্তি৷ আর অতীতের অভিজ্ঞতাসমূহ তোমার কাছে একথা প্রমাণ করে দিয়েছে যে, এখনো পর্যন্ত আল্লাহর শক্তিই এর উন্নতি ও বিকাশ সাধন করে এসেছে৷ কাজেই নিশ্চিত বিশ্বাস রাখো, আজো তিনিই একে উন্নতি ও অগ্রগতি দান করবেন৷ এখানে হুনায়েন যুদ্ধের কথা বলা হয়েছে ৷ এ যুদ্ধটি ৮ হিজরীর শওয়াল মাসে এ আয়াতগুলো নাযিলের মাত্র বার তের মাস আগে মক্কা ও তায়েফের মাঝখানে হুনায়েন উপত্যকায় সংঘটিত হয়েছিল৷ এ যুদ্ধে মুসলমানদের পক্ষে ছিল ১২ হাজার সৈন্য ৷ এর আগে কোন যুদ্ধে মুসলমানদের এত বিপুল সংখ্যক সৈন্য জামায়েত হয়নি৷ অন্যদিকে কাফেরদের সৈন্য সংখ্যা ছিল এর তুলানায় অনেক কম৷ কিন্তু এ সত্ত্বেও হাওয়াযিন গোত্রের তীরন্দাজরা যুদ্ধের মোড় ফিরিয়ে দিল৷ মুসলিম সেনাদলে মরাত্মক বিশৃংখলা দেখা দিল৷ তারা বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত হযে পিছু হটতে লাগলো৷ এ সময় শুধুমাত্র নবী (সা) এবং মুষ্টিমেয় কতিপয় মরণপণ সাহাবী যুদ্ধের ময়দানে দৃঢ়পদ ছিলেন৷তাদের অবিচলতার ফলেই সেনাবাহিনী পুনর্বার সংগঠিত হলো এবং মুসলমানরা বিজয় লাভ করলো৷ অন্যথায় মক্কা বিজয়ের ফলে মুসলমানরা যে পরিমাণে লাভবান হয়েছিল হুনায়েনে তাদেরকে তার চাইতে অনেক বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হতে হতো ৷
২৪. হুনায়েন যুদ্ধে জয়লাভ করার পর নবী(সা) বিজিত শত্রুদের সাথে যে সদয় ও সহানুভূতিপূর্ণ ব্যবহার করেন তার ফলে তাদের বেশীরভাগ লোক মুসলমান হয়ে যায়৷ এখানে মুসলমানদের যে কথা বলা উদ্দেশ্যে এ দৃষ্টান্ত পেশ করা হয়েছে তা এই যে, এখন সারা আরবের সমস্ত মুশরিককে ধ্বংস করা হবে, এ কথা তোমরা ভাবলে কেন? না তা নয় বরং আগের অভিজ্ঞতা থেকে তোমাদের আশা করা উচিত যে, যখন এ লোকদের মনে জাহেলী ব্যবস্থার বিকাশ ও স্থায়িত্বের আর কোন আশা থাকবে না এবং যেসব সহায়তা ও আনুকূল্যের কারণে এতদিন তারা জাহেলিয়াতকে বুকের সাথে জড়িয়ে রেখেছে তা সব খতম হয়ে যাবে, তখন তারা নিজেরাই ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নেবার জন্য এগিয়ে আসবে৷
২৫. অর্থাৎ আগামীতে শুধু তাদের হজ্জ ও যিয়ারতই বন্ধ নয় বরং মসজিদে হারামের সীমানায় তাদের প্রবেশই নিষিদ্ধ ৷ এভাবে শিরক ও জাহেলিয়াতের পুনরাবর্তনের কোন সম্ভাবনাই থাকবে না৷ অপবিত্র, কথাটির মানে এই নয় যে, তারা নিজেরাই অপবিত্র বা নাপাক৷ বরং এর মানে হচ্ছে , তাদের আকীদা,-বিশ্বাস , নৈতিক , চরিত্র, কাজকর্ম এবং তাদের জাহেলী চালচলন ও সমাজ ব্যবস্থা অপবিত্র ৷ আর এ অপবিত্রতার কারণে হারাম শরীফের চতুসীমায় তাদের প্রবেশ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে৷ ইমাম আবু হানিফার মতে এর অর্থ শুধু এতটুকুই যে, হজ্জ ও উমরাহ এবং জাহেলী অনুষ্ঠানাদি পালন করার জন্য তারা হারাম শরীফের সীমানায় প্রবেশ করতে পারবে না৷ ইমাম শাফেয়ীর মতে এ হুকুমের অর্থ হচ্ছে,তারা (যে কোন অব্স্থায়ই )মসজিদে হারামে প্রবেশ করতে পারবে না৷ ইমাম মালেক বলেন, শুধু মসজিদে হারামেই নয়, দুনিয়ার অন্য কোন মসজিদেও তাদের প্রবেশ জায়েজ নয়৷ তবে এ শেষোক্ত মতটি সঠিক নয়৷ কারণ নবী (সা) নিজেই তাদের মসজিদে নববীতে আসার অনুমতি দিয়েছিলেন৷
২৬. যদিও আহলি কিতাবরা আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি ঈমান রাখার দাবীদার কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা না আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে,না আখেরাতের প্রতি৷ আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার অর্থ শুধুমাত্র আল্লাহ আছে একথা মেনে নেয়া নয়৷ বরং এর অর্থ হচ্ছে, মানুষ আল্লাহকে একমাত্র ইলাহ ও একমাত্র রব বলে মেনে নেবে এবং তাঁর সত্তা, গুণাবলী, অধিকার, ও ক্ষমতায় নিজেকে বা অন্য কাউকে শরীক করবেনা৷ কিন্তু খৃস্টান ও ইহুদীরা এ অপরাধে লিপ্ত৷ পরবর্তী পর্যায়ের আয়াতগুলোতে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে ৷ তাই তাদের আল্লাহকে মেনে নেয়ার কথাটা অর্থহীন৷ একে কোনক্রমেই ঈমান বিল্লাহ বলা যেতে পারে না৷ অনুরূপভাবে আখেরাতকে মানার অর্থ মরে যাওয়ার পর আমাদের আবার উঠানো হবে, শুধু এতটুকু কথার স্বীকৃতি দেয়া নয় বরং এ সংগে এ কথা মেনে নেয়াও অপরিহার্য হয়ে পড়ে যে, সেখানে কোন চেষ্টা তদবীর ও সুপারিশ করা, জরিমানা দেয়া এবং কোন বুজর্গ ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক ও বন্ধন কোন কাজে লাগবে না৷ কেউ কারোর পাপের কাফ্ফারা হবে না৷ আল্লাহর আদালতে ইনসাফ হবে সম্পূর্ণ পক্ষপাতহীন এবং মানুষের ঈমান ও আমল ছাড়া আর কোন জিনিসকে মোটেই মূল্য দেয়া হবে না৷ এরূপ বিশ্বাস ছাড়া আখেরাতকে মেনে নেয়া অর্থহীন৷ কিন্তু ইহুদী ও খৃষ্টানরা এ দিক দিয়েই নিজেদের ঈমান আকিদা নষ্ট করে ফেলেছে৷ কাজেই তাদের আখেরাতের প্রতি ঈমান গ্রহণযোগ্য নয়৷
২৭. অর্থাৎ আল্লাহ তার রসূলের মাধ্যমে যে শরীয়াত নাযিল করেছেন তাকে নিজেদের জীবন বিধান হিসেবে গ্রহণ করে না৷
২৮. অর্থাৎ তারা ঈমান আনবে ও আল্লাহর সত্য দীনের অনুসারী হয়ে যাবে, যুদ্ধের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য তা নয়৷ বরং যুদ্ধের উদ্দেশ্য ও লক্ষ হচ্ছেঃ তাদের কর্তৃত্ব ও প্রাধান্য খতম হয়ে যাবে৷ তারা পৃথীবীতে শাসন ও কর্তৃত্বের আসনে প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারবে না৷ বরং পৃথিবীতে মানুষের জীবন ব্যব্স্থা লাগাম এবং মানুষের ওপর কর্তৃত্ব করা ও তাদের নেতৃত্ব দান করার ক্ষমতা ও ইখতিয়ার সত্যের অনুসারীদের হাতে থাকবে এবং তারা এ সত্যের অনুসারীদের অধীনে অনুগত জীবন যাপন করবে৷

যিম্মীদেরকে ইসলামী শাসনের আওতায় যে নিরাপত্তা ও সংরক্ষণ দান করা হবে তার বিনিময়কে জিযিয়া বলা হয়৷ তাছাড়া তারা যে হুকুম মেনে চলতে এবং ইসলামী শাসনের আওতাধীনে বসবাস করতে রাজী হয়েছে , এটা তার একটি আলামত হিসেবেও চিহ্নিত হবে৷ নিজের হাতে জিযিয়া দেয় এর অর্থ হচ্ছে, সহজ ,সরল আনুগত্যের ভংগিতে জিযিয়া আদায় করা ৷ আর পদানত হয়ে থাকে এর অর্থ, পৃথিবীতে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব তাদের নয় বরং যে মুমিন ও মুসলিমরা আল্লাহর খিলাফত ও প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব পালন করছে তাদের হাতে থাকবে৷

প্রথমদিকে ইহুদীও খ্রীষ্টানের কাছ থেকে জিযিয়া আদায়ের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল৷ কিন্তু পরবর্তীকালে নবী (সা) নিজে মাজুসীদের (অগ্নিউপাসক) থেকে জিযিয়া আদায় করে তাদেরকে যিম্মী করেন৷ এরপর সাহাবায়ে কেরাম সর্বসম্মতিক্রমে আরবের বাইরের সব জাতির ওপর সাধারণভাবে এ আদেশ প্রয়োগ করেন৷

ঊনিশ শতকে মুসলিম মিল্লাতের পতন ও অবনতির যুগে এ জিযিয়া সম্পর্কে মুসলমানদের পক্ষ থেকে বড় বড় সাফাই পেশ করা হতো৷ সেই পদাংক অনুসারী কিছু লোক এখনো রয়েছে এবং তারা এখনো এ ব্যাপারে সাফাই গেয়ে চলেছে৷ কিন্তু আল্লাহর দীন এসবের অনেক ঊর্ধে৷ আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে যারা বিদ্রোহের ভুমিকায় অবতীর্ণ , তাদোর কাছে কৈফিয়ত দান ও ওযর পেশ করার তার কোন প্রয়োজন নেই৷ পরিষ্কার, ও সোজা কথায়, যারা আল্লাহর দীনকে গ্রহণ করে না এবং নিজেদের বা অন্যের উদ্ভাবিত ভূল পথে চলে, তারা বড় জোর এতটুকু স্বাধীনতা ভোগ করার অধিকার রাখে যে, নিজেরা ভূল পথে চলতে চাইলে চলতে পারে, কিন্তু আল্লাহর যমীনে কোন একটি জায়গায়ও মানুষের ওপর শাসন চালাবার এবং নিজেদের ভ্রান্তি নীতি অনুযায়ী মানুষের সামগ্রীক জীবন ব্যবস্থা পরিচালনা করার আদৌ কোন অধিকার তাদের নেই৷ দুনিয়ার যেখানেই তারা এ জিনিসটি লাভ করবে সেখানেই বিপর্যয় সৃষ্টি হবে৷তাদেরকে এ অবস্থান থেকে সরিয়ে দিয়ে সৎ ও সত্যনিষ্ঠা জীবন বিধানের অনুগত করার জন্য প্রচেষ্টা চালানোই হবে মুমিনদের কর্তব্য৷

এখন প্রশ্ন থেকে যায়, এ জিযিয়া কিসের বিনিময়ে দেয়? এর জবার হচ্ছে, ইসলামী শাসন কর্তৃত্বের আওতাধিনে নিজেদের গোমরাহীর ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকার জন্য অমুসলিমদের যে স্বাধীনতা দান করা হয় এটা তারই মূল্য৷ আর যে সৎ ও সত্যানিষ্ঠা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা তাদের এ স্বাধীনতাকে কাজে লাগাবার অনুমতি দেয় এবং তাদের অধিকার সংরক্ষন করে তার শাসণ ও আইন-শৃংখলা ব্যবস্থা পরিচালনায় এ অর্থ ব্যয়ীত হওয়া উচিত৷ এর সবচেয়ে বড় ফায়দা হচ্ছে এই যে, জিযিয়া আদায় করার সময় প্রতি বছর যিম্মীদের মধ্যে একটা অনুভুতি জাগতে থাকবে৷ প্রতি বছর তারা মনে করতে থাকবে,তারা আল্লাহর পথে যাকাত দেবার সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত আর এর পরিবর্তে গোমরাহীও ভ্রষ্টতার ওপর প্রতিষ্টিত থাকার জন্য তাদের মূল্য দিতে হচ্ছে৷ এটা তাদের কত বড় দুর্ভাগ্য৷ এ দুর্ভাগ্যের কারাগারে তারা বন্দী৷