(৯:১১) কাজেই যদি তারা তাওবা করে নেয় এবং নামায কয়েম করে এবং যাকাত দেয় তাহলে তারা তোমাদের দীনী ভাই৷ যারা জানে, তাদের জন্য আমার বিধান ষ্পষ্ট করে বর্ণনা করি ৷ ১৪
(৯:১২) আর যদি অঙ্গীকার করার পর তারা নিজেদের কসম ভংগ করে এবং তোমাদের দীনের ওর হামলা চালাতে থাকে তাহলে কুফরীর পতাকাবাহীদের সাথে যুদ্ধ করো৷ কারণ তাদের কসম বিশ্বাসযোগ্য নয়৷ হয়তো (এরপর তরবারীর ভয়েই )তারা নিরস্ত হবে৷ ১৫
(৯:১৩) তোমরা কি লড়াই করবে না ১৬ এমন লোকদের সাথে যারা নিজেদের অঙ্গীকার ভংগ করে এসেছে এবং যারা রসূলকে দেশ থেকে বের করে দেবার দুরভিসন্ধি করেছিল আর বাড়াবাড়ি সুচনা তারাই করেছিল? তোমরা কি তাদেরকে ভয় করো? যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো,তাহলে আল্লাহকে ভয় করাই তোমাদের জন্য অধিক সমীচীন৷
(৯:১৪) তাদের সাথে লড়াই করো,আল্লাহ তোমাদের হাতে তাদের শাস্তি দেবেন, তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপদস্ত করবেন, তাদের মোকাবিলায় তোমাদের সাহায্য করবেন এবং অনেক মুমিনের অন্তর শীতল করে দেবেন৷
(৯:১৫) আর তাদের অন্তরের জ্বালা জুড়িয়ে দেবেন৷ এবং যাকে ইচ্ছা তাওবা করার তাওফীক ও দান করবেন৷ ১৭ আল্লাহ সবকিছু জানেন এবং তিনি মহাজ্ঞানী ৷
(৯:১৬) তোমরা কি একথা মনে করে রেখেছো যে তোমাদের এমনিই ছেড়ে দেয়া হবে? অথচ আল্লাহ এখনো দেখেননি তোমাদের মধ্য থেকে কারা (তার পথে )সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালালো এবং আল্লাহ ,রসূল ও মুমিনদের ছাড়া কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধু রূপে গ্রহণ করলো না? ১৮ তোমরা যা কিছু করো, আল্লাহ তা জানেন৷
১৪. এখানে আবার একথা স্পষ্ট করে বলে দেয়া হয়েছে যে নামায পড়া ও যাকাত দেয়া ছাড়া নিছক তাওবা করে নিলেই তারা তোমাদের দীনী ভাই হয়ে যাবে না৷আর এগুলো আদায় করলে তারা তোমাদের দীনী ভাই হবে, একথা বলার মানে হচ্ছে, এইযে, এ শর্তগুলো পূরণকরার ফল কেবল এতটুকুই হবে না যে, তোমাদের জন্য তাদের ওপর হাত ওঠানো এবং তাদের ধন-প্রাণ নষ্ট করা হারাম হয়ে যাবে রবং এ সংগে আরো একটি সুবিধা লাভ করা যাবে৷ অর্থাৎ এর ফলে ইসলামী সমাজে তারা সমান অধিকার লাভ করবে৷ সামাজিক, তামাদ্দুনিক ও আইনগত দিক দিয়ে তারা অন্যান্য সকল মুসলমানের মতই হবে৷ কোন পার্থক্য ও বিশেষ গুণাবলী তাদের উন্নতির পথে অন্তরায় সৃষ্টি করতে পারবে না৷
১৫. পূর্বাপর আলোচনা থেকে স্বতস্ফূর্তভাবে একথা বুঝা যাচ্ছে যে, কসম, অঙ্গীকার ও শপথ বলতে কুফরী ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করার অংগীকারের কথাই এখানে বুঝানো হয়েছে৷ কারণ এদের সাথে এখন আর কোন চুক্তি করার প্রশ্নই ওঠে না৷ আগের সমস্ত চুক্তিই তরা ভংগ করেছে৷ তাদের অংগীকার ভংগের কারণেই আল্লাহ ও তার রসূলের পক্ষ তেকে তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার পরিষ্কার ঘোষণা শুনিয়ে দেয়া হয়েছে৷ একথাও বলা হয়েছে যে, এ ধরনের লোকদের সাথে কেমন করে চুক্তি করা যেতে পারে? এ সাথে এ নির্দেশও দেয়া হয়েছিল যে, এখন তারা কুফরী ও শিরক ত্যাগ করে নামায কায়েম করবে ও যাকাত আদায় করবে, একমাত্র এ নিশ্চয়তা বিধান করলেই তাদের ছেড়ে দেয়া যেতে পারে৷ এ কারণে এ আয়াতটি মুরতাদদের সাথে যুদ্ধ করার ব্যাপারে একেবারেই দ্ব্যর্থহীন আদেশ স্বরূপ৷ আসলে দেড় বছর পরে হযরত আবু বকর সিদ্দীকের (রা) খিলাফত আমলে ইসলাম বর্জনের যে প্রবণতা দেখা দিয়েছিল এখানে সেদিকেই ইংগিত দেয়া হয়েছে৷ এ আয়াতে ইতিপূর্বে প্রদত্ত নির্দেশ অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল৷অতিরিক্ত ও বিস্তারিত জানার জন্য পড়ুন আমার বই ইসলামী আইনে মুরতাদের শাস্তি৷
১৬. এখান থেকে ভাষণটি মুসলমানদের দিকে মোড় নিচ্ছে৷ তাদেরকে যুদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে এবং দীনের ব্যাপারে কোন প্রকার সম্পর্ক, নিকট আত্মীয়তা ও বৈষয়িক সুবিধার কথা একটুও বি্বেচনায় না আনার কঠোর নির্দেশ দেয়া হচ্ছে৷ ভাষণের এ অংশটির সমগ্র প্রাণসত্তা ও মর্ম অনুধাবন করার জন্য সে সময় যে অবস্থা ও পরিস্থিতি বিরাজমান ছিল তা আর একবার ভেবে দেখা দরকার৷ সন্দেহ , নেই, ইসলাম এ সময় দেশের একটি বড় অংশে ছড়িয়ে পড়েছিল৷ আরবে এমন কোন বড় শক্তি তখন ছিল না , যে তাকে শক্তি পরিক্ষার আহবান জানাতে পারতো৷ তবুও এ সময় যে সিদ্ধান্তকর ও চরম বৈপ্লবিক পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছিল স্থুল দৃষ্টি সম্পন্ন লোকেরা তাতে অনেক বিপদের ঝুঁকি দেখতে পাচ্ছিল৷

একঃ সমস্ত মুশরিক গোত্রগুলোকে একই সঙ্গে সকল চুক্তি বাতিল করার চ্যালেঞ্জ দিয়ে দেয়া, মুশরিকদের হজ্জ বন্ধ করে দেয়া, কাবার অভিভাবকের পরিবর্তন এবং জাহেলী রসম রেওয়াজের একেবারেই মুলোৎপাটন -এসবের অর্থ ছিল একই সংগে সারাদেশে আগুণ জ্বলে ওঠবে এবং মুশরিক ও মুনাফিকরা নিজেদের স্বার্থ ও গোত্রীয় বৈশিষ্ট্যের হেফাজতের জন্য শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত প্রবাহিত করতে উদ্ধূদ্ধ হবে৷

দুই.হজ্জকে শুধুমাত্র তাওহীদবাদীদের জন্য নির্দিষ্ট করা এবং মুশরিকদের জন্য কাবা ঘরের পথ রুদ্ধ করে দেয়ার অর্থ ছিল , দেশের জনসংখ্যার যে একটি বিরাট অংশ তখনো মুশরিক ছিল,ধর্মীয় কাজ কর্মে জন্য তাদের কাবাঘরে আসার পথ বন্ধ হয়ে যাবে৷ শুধু এ নয়, সমকালীন আরবের অর্থনৈতিক জীবনে কাবার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম এবং কাবার ওপর আরবদের অর্থনৈতিক জীবন বিপুলভাবে নির্ভরশীল ছিল৷ কাজেই এভাবে কাবার দরজা বন্ধ করার কারণে তারা কাবাঘর থেকে কোন প্রকার অর্থনৈতিক সুবিধাদি লাভ করতে পারবে না৷

তিনঃ যারা হোদায়বিয়ার চুক্তি ও মক্কা বিজয়ের পর ঈমান এনেছিলেন তাদের জন্য এটি ছিল কঠিন পরীক্ষার বিষয়৷ কারণ তাদের অনেক জ্ঞাতি-ভাই, আত্মীয় -স্বজন তখনো মুশরিক ছিল৷তাদের মধ্যে এমন অনেক লোকও ছিল পুরাতন ব্যবস্থার বিভিন্ন পদমর্যাদার সাথে যাদের স্বার্থ বিজরিত ছিল৷এখন বাহ্যত আরবের মুশরিকদের গোটা সমাজ ব্যবস্থা ছিন্নভিন্ন করে দেবার যে আয়োজন চলছিল তার মানে ছিল মুসলমানরা নিজেদের হাতেই নিজেদের বংশ, পরিবার ও কলিজার টুকরাদেরকে ধুলায় মিশিয়ে দেবে এবং তাদের মান, মর্যাদা, ও শতশত বছরের প্রতিষ্ঠিত বৈশিষ্ট্যসমূহ চিরতরে খতম করে দেবে৷

যদিও বাস্তবে এর মধ্যে থেকে কোন একটা বিপদও কার্যত সংঘটিত হয়নি৷ দায় মুক্তির ঘোষণার পর সারা দেশে যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠার পরিবর্তে বরং দেশের বিভিন্ন এলাকায় যেসব মুশরিক গোত্র এতদিন নির্লিপ্ত ছিল তাদের এবং বিভিন্ন আমীর ,রইস ও রাজন্যবর্গের প্রতিনিধি দল মদীনায় আসতে শুরু করলো৷ তারা নবী (সা) এর সামনে ইসলাম গ্রহণ করে আনুগত্যের শপথ নিতে লাগলো৷ ইসলাম গ্রহণ করার পর নবী(সা) তাদের প্রত্যেককে নিজের পদমর্যাদায় বহাল রাখলেন৷ কিন্তু এ নতুন নীতি ঘোষণা করার সময় তার এ ফলাফলকে কেউ আগাম অনুমান করতে পারেনি৷ তাছাড়া এ ঘোষণার সাথে সাথেই যদি মুসলমানরা শক্তি প্রয়োগ করে তা বস্তাবায়িত করার জন্য পুরোপুরি তৈরী না হয়ে যেতো , তাহলে সম্ভবত এ ধরনের ফলাফল দেখাই যেতো না৷ কাজেই এ সময় মুসলমানদের মধ্যে আল্লাহর পথে জিহাদ করার উদ্দীপনা ও আবেগ সৃষ্টি করা এবং এ নীতি কার্যকর করতে গিয়ে তাদের মনে যেসব আশংকা দেখা দিয়েছিল সেগুলো দূর করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল৷এ সংগে তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, আল্লাহর ইচ্ছা পূর্ণ করার জন্য তাদের কোন জিনিসের পরোয়া না করা উচিত৷ এ বক্তব্যই আলোচ্য ভাষণের মূল প্রতিপদ্য বিষয়৷
১৭. এখানে একটি সম্ভবনার দিকে হালকা ইঙ্গিত করা হয়েছে৷ তবে পরবর্তীতে এটি বাস্তব ঘটনার রূপে আত্মপ্রকাশ করে৷ মুসলমানরা মনে করেছিল, এ ঘোষণার সাথে সাথেই দেশে রক্তের নদী বয়ে যাবে৷ এ ভুল ধারণা দূর করার জন্য ইশারা- ইঙ্গিতে তাদের জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, এ কঠোর নীতি অবলম্বন করার কারণে যেখানে একদিকে যুদ্ধ বেধে যাওয়ার সম্ভবনা রয়েছে সেখানে লোকদের তাওবার সৌভাগ্য লাভের সম্ভবনাও রয়েছে ৷ কিন্তু এ ইঙ্গিতকে খুব বেশী শানিত ও স্পষ্ট করা হয়নি৷ কারণ এর ফলে একদিকে মুসলমানদের যুদ্ধ প্রস্তুতি স্তিমিত হয়ে পড়তো এবং অন্যদিকে যে হুমকিটি মুশরিকদেরকে তাদের অব্স্থানের নাজুকতার কথা ভাবার এবং পরিশেষে তাদের ইসলামী ব্যাব্স্থার মধ্যে বিলিন হবার জন্য উদ্ধুদ্ধ করে ছিল৷ তা হালকা, ও নিষ্প্রভ হয়ে যেতো৷
১৮. স্বল্পকাল আগে যারা ইসলাম গ্রহন করেছিল এখানে তাদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে, তাদেরকে বলা হচ্ছে, যতক্ষণ তোমরা এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে একথা প্রমাণ করে না দেবে যে, যথার্থই তোমরা আল্লাহ ও তাঁর দীনকে নিজেদের ধন-প্রাণ ও ভাই -বন্ধুদের তুলনায় বেশী ভালবাসো, ততক্ষণ তোমাদের সাচ্চা মুমিন বলে গণ্য করা যেতে পারে না৷ এ পর্যন্ত বাহ্যত তোমাদের অবস্থা হচ্ছে এই যে, যেহেতু সাচ্চা মুমিন ও প্রথম যুগের দৃঢ়চিত্ত মুসলিমদের প্রাণপণ প্রচেষ্টা ও সংগ্রামের মাধ্যমে ইসলাম বিজয় লাভ করছে এবং সারাদেশে ছেয়ে গেছে তাই তোমরাও মুসলমান হয়ে গেছো৷