(৯:১১১) প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আল্লাহ মুমিনদের থেকে তাদের প্রাণ ও ধন-সম্পদ জান্নাতের বিনিময়ে কিনে নিয়েছেন৷ ১০৬ তারা আল্লাহর পথে লড়াই করে এবং মারে ও মরে৷ তাদের প্রতি তাওরাত ,ইনজীল ও কুরআনে(জান্নাতের ওয়াদা) আল্লাহর জিম্মায় একটি পাকাপোক্ত ওয়াদা বিশেষ৷ ১০৭ আর আল্লাহর চাইতে বেশী নিজের ওয়াদা পূরণকারী আর কে আছে? কাজেই তোমরা আল্লাহর সাথে যে কেনা-বেচা করছো সে জন্য আনন্দ করো৷ এটিই সবচেয়ে বড় সাফল্য৷
(৯:১১২) আল্লাহর দিকে বারবার প্রত্যাগমনকারী ১০৮ তার ইবাদতকারী, তার প্রশংসা বানী উচ্চারণকারী, তার জন্য যমীনে বিচরণকারী ১০৯ তার সামনে রুকূ ও সিজদাকারী, সৎকাজের আদেশকারী , অসৎকাজ থেকে বিরতকারী, এবং আল্লাহর সীমারেখা সংরক্ষণকারী ১১০ (সেই সব মুমিন হয়ে থাকে যারা আল্লাহর সাথে কেনাবেচার সওদা করে) আর হে নবী! এ মুমিনদেরকে সুখবর দাও!
(৯:১১৩) নবী ও যারা ঈমান এনেছে তাদের পক্ষে মুশরিকদের জন্য মাগফিরাতের দোয়া করা, সংগত নয়, তারা তাদের আত্মীয়-স্বজন হলেই বা কি এসে যায়, যখন একথা সুষ্পষ্ট হয়ে গেছে যে, তারা জাহান্নামেরই উপযুক্ত৷১১১
(৯:১১৪) ইবরাহীম তার বাপের জন্য যে মাগফিরাতের দোয়া করেছিল তা তো সেই ওয়াদার কারণে ছিল যা সে তার বাপের সাথে করেছিল্ ১১২ কিন্তু যখন তার কাছে একথা পরিস্কার হয়ে গেছে যে, তার বাপ আল্লাহর দুশমন তখন সে তার প্রতি বিমুখ হয়ে গেছে৷ যথার্থই ইবরাহীম কোমল হৃদয়, আল্লাহভীরু ও ধৈর্যশীল ছিল৷ ১১৩
(৯:১১৫) লোকদেরকে হেদায়াত দান করার পর আবার গোমরাহীতে লিপ্ত করা আল্লাহর রীতি নয়, যতক্ষন না তিনি তাদেরকে কোন জিনিস থেকে সংযত হয়ে চলতে হবে তা পরিস্কার করে জানিয়ে দেন৷ ১১৪ আসলে আল্লাহ প্রত্যেকটি জিনিসের জ্ঞান রাখেন৷
(৯:১১৬) আর এও সত্য, আসমান ও যমীনের রাজত্ব আল্লাহর নিয়ন্ত্রনাধীন, জীবন ও মৃত্যু তাঁরই ইখতিয়ারভুক্ত এবং তোমাদের এমন কোন সহায় ও সাহায্যকারী নেই যে তোমাদেরকে তাঁর হাত থেকে বাঁচাতে পারে৷
(৯:১১৭) আল্লাহ নবীকে মাফ করে দিয়েছেন এবং অত্যন্ত কঠিন সময়ে যে মুহাজির ও আনসারগণ নবীর সাথে সহযোগীতা করেন তাদেরকেও মাফ করে দিয়েছেন৷ ১১৫ যদিও তাদের মধ্যে থেকে কিছু লোকের দিল বক্রতার দিকে আকৃষ্ট হতে যাচ্ছিল ১১৬ (কিন্তু তারা এ বক্রতার অনুগামী না হয়ে নবীর সহযোগী হয়েছেন৷ফলে) আল্লাহ তাদেরকে মাফ করে দিয়েছেন৷ ১১৭ নিসন্দেহে এ লোকদের প্রতি তিনি স্নেহশীল ও মেহেরবান ৷
(৯:১১৮) আর কে তিনজনের ব্যাপার মূলতবী করে দেয়া হয়েছিল তাদেরকেও তিনি মাফ করে দিয়ছেন ১১৮ পৃথিবী তার সমগ্র ব্যাপকতা সত্ত্বেও যখন তাদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে গেলো, তাদের নিজেদের প্রাণও তাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ালো এবং তারা জেনে নিল যে, আল্লাহর হাত থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর নিজের রহমতের আশ্রয় ছাড়া আর কোন আশ্রয়স্থল নেই তখন আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের দিকে ফিরলেন যাতে তারা তার দিকে ফিরে আসে৷ অবশ্যি আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল ও করুণাময়৷ ১১৯
১০৬. আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে ঈমানের যে ব্যাপারটা স্থিরকৃত হয় তাকে কেনাবেচা বলে এখানে উল্লেখ করা হয়েছে৷ এর মানে হচ্ছে, ঈমান শুধুমাত্র একটা অতি প্রাকৃতিক আকীদা -বিশ্বাস নয়৷ বরং এটা একটি চুক্তি ৷ এ চুক্তির প্রেক্ষিতে বান্দা তার নিজের প্রাণ ও নিজের ধন-সম্পদ আল্লাহর হাতে বিক্রি করে দেয়৷ আর এর বিনিময়ে সে আল্লাহর পক্ষ থেকে এ ওয়াদা কবুল করে নেয় যে, মরার পর পরবর্তী জীবনে তিনি তাকে জান্নাত দান করবেন৷ এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অন্তর্নিহিত বিষয়বস্তু অনুধাবন করার জন্য সর্বপ্রথম কেনা -বেচার তাৎপর্য ও স্বরূপ কি তা ভালোভাবে বুঝে নিতে হবে৷

নিরেট সত্যের আলোকে বিচার করলে বলা যায় মানুষের ধন -প্রাণের মালিক হচ্ছেন আল্লাহ ৷ কারণ তিনিই তার কাছে যা কিছু আছে সব জিনিসের স্রষ্টা ৷ সে যা কিছু ভোগ ও ব্যবহার করেছে তাও তিনিই তাকে দিয়েছেন৷ কাজেই এদিক দিয়ে তো কেনাবেচার কোন প্রশ্নেই ওঠে না৷ মানুষের এমন কিছু নেই, যা সে বিক্রি করবে৷ আবার কোন জিনিস আল্লাহর মালিকানার বাইরেও নেই, যা তিনি কিনবেন৷কিন্তু মানুষের মধ্যে এমন একটি জিনিস আছে ,যা আল্লাহ পুরোপুরি মানুষের হাতে সোপর্দ করে দিয়েছেন৷ সেটি হচ্ছে তার ইখতিয়ার অর্থাৎ নিজের স্বাধীন নির্বাচন ক্ষমতা ও স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি (Free will and freedom of choice)৷এ ইখতিয়ারের কারণে অবশ্যি প্রকৃত সত্যের কোন পরিবর্তন হয় না৷ কিন্তু মানুষ এ মর্মে স্বাধীনতা লাভ করে যে, সে চাইলে প্রকৃত সত্যকে মেনে নিতে পারে এবং চাইলে তা অস্বীকার করতে পারে৷ অন্য কথায় এ ইখতিয়ারের মানে এ নয় যে মানুষ প্রকৃত পক্ষে তার নিজের প্রাণের নিজের বুদ্ধিবৃত্তি ও শারীরিক শক্তির এবং দুনিয়ায় সে যে কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা লাভ করেছে, তার মালিক হয়ে গেছে৷ এ সংগে এ জিনিসগুলো সে যেভাবে চাইবে সেভাবে ব্যবহার করার অধিকার লাভ করেছে, একথাও ঠিক নয়৷ বরং এর অর্থ কেবল এতটুকুই যে, তাকে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে , আল্লাহর পক্ষে থেকে কোন প্রকার জোর -জবরদস্তি ছাড়াই সে নিজেরই নিজের সত্তার ও নিজের প্রত্যেকটি জিনিসের ওপর আল্লাহর মালিকানা ইচ্ছা করলে স্বীকার করতে পারে আবার ইচ্ছা করলে নিজেই নিজের মালিক হয়ে যেতে পারে এবং নিজেই একথা মনে করতে পারে যে, সে আল্লাহ থেকে বেপরোয়া হয়ে নিজের ইখতিয়ার তথা স্বাধীন কর্মক্ষমতার সীমানার মধ্যে নিজের ইচ্ছামত কাজ করার অধিকার রাখে ৷ এখানেই কেনা -বেচার প্রশ্নটা দেখা দেয়৷ আসলে এ কেনা -বেচা এ অর্থে নয় যে, মানুষের একটি জিনিস আল্লাহ কিনতে চান, বরং প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে , যে জিনিসটি আল্লাহর মালিকানাধীন যাকে তিনি আমানত হিসেবে মানুষের হাতে সোপর্দ করেছেন এবং যে ব্যাপারে বিশ্বস্ত থাকার বা অবিশ্বস্ত হবার স্বাধীনতা তিনি মানুষেকে দিয়ে রেখেছেন সে ব্যাপারে তিনি মানুষের দাবী করেন, আমার জিনিসকে তুমি স্বেচ্ছায় ও সাগ্রহে (বাধ্য হয়ে নাও) ৷ এ সংগে খেয়ানত করার যে স্বাধীনতা তোমাকে দিয়েছি তা তুমি নিজেই প্রত্যাহার করো৷ এভাবে যদি তুমি দুনিয়ার বর্তমান অস্থায়ী জীবনে নিজের স্বাধীনতাকে (যা তোমার অর্জিত নয় বরং আমার দেয়া) আমার হাতে বিক্রি করে দাও তাহলে আমি পরবর্তী চিরন্তন জীবনে এর মূল্য জান্নাতের আকারে তোমাকে দান করবো৷ যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কেনা -বেচার এ চুক্তি সম্পাদন করে সে মুমিন৷ ঈমান আসলে এ কেনা-বেচার আর এক নাম ৷ আর যে ব্যক্তি এটা অস্বীকার করবে অথবা অঙ্গীকার করার পরও এমন আচরণ করবে যা কেবলমাত্র কেনা- বেচা না করার অবস্থায় করা যেতে পারে সে কাফের৷ আসলে এ কেনা -বেচাকে পাস কাটিয়ে চলার পরিভাষিক নাম কুফরী ৷কেনা -বেচার এ তাৎপর্য ও স্বরূপটি অনুধাবন করার পর এবার তার অন্তর্নিহিত বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করা যাকঃ

এক এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ মানুষকে দুটি বড় বড় পরীক্ষার সম্মুখীন করেছেন৷ প্রথম পরীক্ষাটি হচ্ছে, তাকে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেবার পর সে মালিকাকে মালিক মনে করার এবং বিশ্বাসঘাতকতা ও বিদ্রোহের পর্যায়ের নেমে না আসার মতো সৎ আচরণ করে কিনা৷ দ্বিতীয়টি হচ্ছে, নিজের প্রভু ও মালিক আল্লাহর কাছ থেকে আজ নগদ যে মূল্য পাওয়া যাচ্ছে, না বরং মরার পর পরকালীন জীবনে যে মূল্য আদায় করার ওয়াদা তার পক্ষ থেকে করা হয়েছে তার বিনিময়ে নিজের আজকের স্বাধীনতা ও তার যাবতীয় স্বাদ বিক্রি করতে স্বেচ্ছায় ও সাগ্রহে রাজী হয়ে যাবার মত আস্থা তার প্রতি আছে কিনা৷

দুইঃ যে ফিকাহর আইনের ভিত্তিতে দুনিয়ার ইসলামী সমাজ গঠিত হয় তার দৃষ্টিতে ঈমান শুধুমাত্র কতিপয় বিশ্বাসের স্বীকৃতির নাম৷ এ স্বীকৃতির পর নিজের স্বীকৃতি ও অংগীকারের ক্ষেত্রে মিথ্যুক হবার সুষ্পষ্ট প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত শরীয়াতের কোন বিচারক কাউকে অমুমিন বা ইসলামী মিল্লাত বহির্ভুত ঘোষণা করতে পারে না৷ কিন্তু আল্লাহর কাছে গ্রহনযোগ্য ঈমানের তাৎপর্য় ও স্বরূপ হচ্ছে, বান্দা তার চিন্তা ও কর্ম উভয়ের স্বাধীনতা ও স্বাধীন ক্ষমতা আল্লাহর হাতে বিক্রি করে দিবে এবং নিজের মালিকানার দাবী পুরোপুরি তার সপক্ষে প্রত্যাহার করবে৷ কাজেই যদি কোন ব্যক্তি ইসলামের কালেমার স্বীকৃতি দেয় এবং নামায -রোযা ইত্যাদির বিধানও মেনে চলে, কিন্তু নিজেকে নিজের দেহ ও প্রাণের নিজের মন, মস্তিস্ক ও শারীরিক শক্তির নিজের ধন-সম্পদ ,উপায়, উপকরণ ইত্যাদির এবং নিজের অধিকার ও নিয়ন্ত্রণাধীন সমস্ত জিনিসের মালিক মনে করে এবং সেগুলোকে নিজের ইচ্ছামত ব্যবহার করার স্বাধীনতা নিজের জন্য সংরক্ষিত রাখে, তাহলে হয়তো দুনিয়ায় তাকে মুমিন মনে করা হবে কিন্তু আল্লাহর কাছে সে অবশ্যী অমুমিন হিসেবে গণ্য হবে৷ কারণ কুরআনের দৃষ্টিতে কেনা-বেচার ব্যাপারে ইমানের আসল তাৎপর্য ও স্বরূপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে৷ কিন্তু সে আল্লাহর সাথে আদতে কোন কেনা-বেচার কাজই করেননি৷ যেখানে আল্লাহ চান সেখানে ধন প্রাণ নিয়োগ না করা এবং যেখানে তিনি চান না সেখানে ধন প্রাণ নিয়োগ ও ব্যবহার করা- এ দুটি কার্যধারাই চূড়ান্তভাবে ফায়সালা করে দেয় যে, ইমানের দাবীদার ব্যক্তি তার ধন প্রাণ আল্লাহর হাতে বিক্রি করেইনি অথবা বিক্রির চুক্তি করার পরও সে বিক্রি করা জিনিসকে যথারীতি নিজের মনে করেছে৷

তিনঃ ঈমানের এ তাৎপর্য ও স্বরূপ ইসলামী জীবনাচরণকে কাফেরী জীবনাচরণ থেকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ আলাদা করে দেয়৷ যে মুসলিম ব্যক্তি সঠিক অর্থে আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছে সে জীবনের সকল বিভাগে আল্লাহর ইচ্ছার অনুগত হয়ে কাজ করে৷ তার আচরণে কোথাও স্বাধীন ও স্বেচ্ছাচারী দৃষ্টিভংগীর প্রকাশ ঘটতে পারে না৷ তবে কোন সময় সাময়িকভাবে সে গাফলতির শিকার হতে পারে এবং আল্লাহর সাথে নিজের কেনা -বেচার চুক্তির কথা ভূলে গিয়ে স্বাধীন ও স্বেচ্ছাচারী ভূমিকা অবলম্বন করাও তার পক্ষে সম্ভব ৷ এটা অবশ্যি ভিন্ন ব্যাপার৷ অনুরূপভাবে ঈমানদারদের সমন্বায়ে গঠিত কোন দল বা সমাজ সমষ্টিগতভাবেও আল্লাহর ইচ্ছা ও তার শরয়ী আইনের বিধিনিষেধমুক্ত হয়ে কোন নীতি পদ্ধতি রাষ্ট্রীয় নীতি, তামাদ্দুনিক ও সাংস্কৃতিক পদ্ধতিএবং কোন অর্থনৈতিক, সামাজিক ও আন্তর্জাতিক আচরণ অবলম্বন করতে পারে না৷ কোন সাময়িক গাফলতির কারণে যদি সেটা অবলম্বন করেও থাকে তাহলে যখনই সে এ ব্যাপারে জানতে পারবে তখনই স্বাধীন ও স্বৈরাচারী আচরণ ত্যাগ করে পুনরায় বন্দেগীর আচরণ করতে থাকবে৷ আল্লাহর আনুগত্য মুক্ত হয়ে কাজ করা এবং নিজের ও নিজের সাথে সংশ্লিষ্টদের ব্যাপারে নিজে নিজেই কি করবো না করবো, সিদ্ধান্ত নেয়া অবশ্যি একটি কুফরী জীবনাচরণ ছাড়া আর কিছুই নয়৷ যাদের জীবন যাপন পদ্ধতি এ রকম তারা মুসলমান নামে আখ্যায়িত হোক বা অমুসলিম নামে তাতে কিছু যায় আসে না৷

চারঃ এ কেনা-বেচার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহর যে ইচ্ছার আনুগত্য মানুষের জণ্য অপরিহার্য হয় তা মানুষের নিজের প্রস্তাবিত বা উদ্ভাবিত নয় বরং আল্লাহ নিজে যেমন ব্যক্ত করেন তেমন৷ নিজে নিজেই কোন জিনিসকে আল্লাহর ইচ্ছা বলে ধরে নেয়া এবং তার আনুগত্য করতে থাকা মূলত আল্লাহর ইচ্ছা নয় বরং নিজেরই ইচ্ছার আনুগত্য করার শামিল৷ এটি এ কেনাবেচার চুক্তির সম্পূর্ণ বিরোধী৷ যে ব্যক্তি ও দল আল্লাহর কিতাব ও তার নবীর হেদায়াত থেকে নিজের সমগ্র জীবনের কর্মসুচী গ্রহণ করেছে একমাত্র তাকেই আল্লাহর সাথে কৃত নিজের কেনা-বেচার চুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত বলে মনে করা হবে৷

এ হচ্ছে এ কেনা -বেচার অন্তনিহিত বিষয়৷ এ বিষয়টি অনুধাবন করার পর এ কেনা-বেচার ক্ষেত্রে বর্তমান পার্থিব জীবনের অবসানের পর মূল্য (অর্থাৎ জান্নাত৷) দেবার কথা বলা হয়েছে কেন তাও আপনা আপনিই বুঝে আসে৷ বিক্রেতা নিজের প্রাণ ও ধন -সম্পদ আল্লাহর হাতে বিক্রি করে দেবে কেবলমাত্র এ অংগীকারের বিনিময়েই যে জান্নাত পাওয়া যাবে তা নয়৷ বরং বিক্রেতা নিজের পার্থিব জীবনে এ বিক্রি করা জিনিসের ওপর নিজের স্বাধীন ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার প্রত্যাহার করবে এবং আল্লাহ প্রদত্ত আমানতের রক্ষক হয়ে তার ইচ্ছা অনুযায়ী হস্তক্ষেপ করবে৷ এরূপ বাস্তব ও সক্রিয় তৎপরতার বিনিময়েই জান্নাত প্রাপ্তি নিশ্চিত হতে পারে৷ সুতরাং বিক্রেতার পার্থিব জীবনকাল ও শেষ হবার পর যখন প্রমাণিত হবে যে, কেনা-বেচার চুক্তি করার পর সে নিজের পার্থিব জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চুক্তির শর্তসমূহ পুরোপুরি মেনে চলেছে একমাত্র তখনই এ বিক্রি সম্পূর্ণ হবে৷ এর আগে পর্যন্ত ইনসাফের দৃষ্টিতে সে মূল্য পাওয়ার অধিকারী হতে পারে না৷

এ বিষয়গুলো পরিষ্কার ভাবে বুঝে নেবার সাথে সাথে এ বর্ণনার ধারাবাহিকতায় কোন প্রেক্ষাপটে এ বিষয়বস্তুটির অবতারণা হয়েছে তাও জেনে নেয়া উচিত৷ ওপর থেকে যে ধারাবাহিক ভাষণ চলে আসছিল তাতে এমন সব লোকের কথা ছিল যারা ঈমান আনার অংগীকার করেছিল ঠিকই কিন্তু পরীক্ষার কঠিন সময় সমুপস্থিত হলে তাদের অনেকে গাফলতির কারণে, অনেকে আন্তরিকতার অভাবে এবং অনেকে চূড়ান্ত মুনাফিকীর পথ অবলম্বন করার ফলে আল্লাহর ও তার দীনের জন্য নিজের সময় ধন সম্পদ স্বার্থ ও প্রাণ দিতে ইতস্তত করেছিল ৷ কাজেই এ বিভিন্ন ব্যক্তি ও শ্রেনীর আচরণের সমালোচনা করার পর এখন তাদেরকে পরিষ্কার বলে দেয়া হচ্ছে, তোমরা যে ঈমান গ্রহণ করার অংগীকার করেছো তা নিছক আল্লাহর অস্তিত্ব ও একত্ব মেনে নেবার নাম নয়৷ বরং একমাত্র আল্লাহই যে তোমাদের জান ও তোমাদের ধন-সম্পদের মালিক ও অকাট্য ও নিগূঢ় তত্ত্ব মেনে নেয়া ও এর স্বীকৃতি দেয়ার নামই ঈমান৷ কাজেই এ অংগীকার করার পর যদি তোমরা এ প্রাণ ও ধন -সম্পদ আল্লাহর হুকুমে কুরবানী করতে ইতস্তত করো এবং অন্যদিকে নিজের দৈহিক ও আত্মিক শক্তিসমূহ এবং নিজের উপায় -উপকরণ সমূহ আল্লাহর ইচ্ছার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে থাকো তাহলে এ থেকে একথাই প্রমাণিত হবে যে, তোমাদের অংগীকার মিথ্যা৷ সাচ্চা ঈমানদার একামাত্র তারাই যারা যথার্থই নিজেদের জান-মাল আল্লাহর হাতে বিকিয়ে দিয়েছে এবং তাকেই এ সবের মালিক মনে করেছে৷ তিনি এগুলো যেখানে ব্যয় করার নির্দেশ দেন সেখানে নির্দ্বিধায় এগুলো ব্যয় করে এবং যেখানে তিনি নিষেধ করেন সেখানে দেহ ও আত্মার সামান্যতম শক্তিও এবং আর্থিক উপকরণের নগন্যতম অংশও ব্যয় করতে রাজী হয় না৷
১০৭. এ ব্যাপারে অনেকগুলো আপত্তি তোলা হয়েছে৷ বলা হয়েছে , এখানে যে ওয়াদার কথা বলা হয়েছে তা তাওরাত ও ইনজীলে নেই৷ কিন্তু ইনজীলের ব্যাপারে এ ধরনের কথা বলার কোন ভিত্তি নেই৷ বর্তমানে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে যে ইনজীলসমূহ পাওয়া যায় সেগুলোর হযরত ঈসা (আ) এর এমন অনেকগুলো উক্তি পাওয়া যায় যেগুলো এ আয়াতের সমর্থক৷ যেমনঃ

ধন্য যাহারা ধার্মিকতার জন্য তাড়িত হইয়াছে, কারণ স্বার্গরাজ্য তাহাদেরই৷ (মথি ৫:১০)

যে কেহ আপন প্রাণ রক্ষা করে, সে তাহা হারাইবে, এবং যে কেহ আমার নিমিত্ত আপন প্রাণ হারায় ,সে তাহা রক্ষা করিবে৷ (মথি ১০:৩৯ )

আর যে কোন ব্যক্তি আমার নামের জন্য বাটী কি ভ্রাতা, কি ভাগীনি কি পিতা ও মাতা , কি সন্তান ,কি ক্ষেত্র পরিত্যাগ করিয়াছে , সে তাহার শতগুণ পাইবে এবং অনন্ত জীবনের অধিকারী হইবে৷ (মথি ১৯:২৯)

তবে তাওরাত বর্তমানে যে অবস্থায় পাওয়া যায় তাতে অবশ্যি এ বিষয়বস্তুটি পাওয়া যায় না৷ শুধু এটি কেন, সেখানে তো মৃত্যুর পরবর্তী জীবন, শেষ বিচারের দিন ও পরকালীন পুরস্কার ও শাস্তির ধারণাই অনুপস্থিত৷ অথচ এ আকীদা সবসময় আল্লাহর সত্য দীনের অবিচ্ছেদ্য অংগ হিসেবেই বিদ্যমান রয়েছে৷ কিন্তু বর্তমান তাওরাতে এ বিষয়টির অস্তিত্ব না থাকার ফলে এ সিদ্ধান্ত গ্রহন করাও ঠিক নয় যে, যথার্থই তাওরাতের এ অস্তিত্ব ছিল না৷আসলে ইহুদীরা তাদের অবনতির যুগে এতই বস্তুবাদী ও দুনিয়াবী সমৃদ্ধির মোহে এমন পাগল হয়ে গিয়েছিলো যে, তাদের কাছে নিয়ামত ও পুরস্কার এ দুনিয়ায় লাভ করা ছাড়া তার আর কোন অর্থই ছিলো না৷ এ কারণে আল্লাহর কিতাবে বন্দেগী ও আনুগত্যের বিনিময়ে তাদেরকে যেসব পুরস্কার দেবার ওয়াদা করা হয়েছিল সে সবকে তারা দুনিয়ার এ মাটিতেই নামিয়ে এনেছিল এবং জান্নাতের প্রতিটি সংজ্ঞা ও বৈশিষ্টকে তারা তাদের আকাংখিত ফিলিস্তিনের ওপর প্রয়োগ করেছিল ৷ তাওরাতের বিভিন্ন স্থানে আমরা এ ধরনের বিষয়বস্তু দেখতে পাই৷ যেমনঃ

হে ইস্রায়েল শুন, আমাদের ঈশ্বর সদাপ্রভূ একই সদাপ্রভু, তুমি তোমার সমস্ত হৃদয়, তোমার সমস্ত প্রাণ ও তোমার সমস্ত শক্তি দিয়া আপন ঈশ্বর সদাপ্রভূকে প্রেম করিবে৷ (দ্বীতীয় বিবরণ ৬: ৪,৫)

আরো দেখিঃ

তিনি কি তোমার পিতা নহেন, যিনি তোমাকে লাভ করিলেন৷ তিনিই তোমার নির্মাতা ও স্থিতিকর্তা৷(দ্বিতীয় বিবরণ ৩২:৬)

কিন্তু আল্লাহর সাথে এ সম্পর্কের যে পুরস্কার বর্ণনা করা হয়েছে তা হচ্ছে এই যে, তোমরা এমন একটি দেশের মালিক হয়ে যাবে যেখানে দুধ ও মধুর নহর প্রবাহিত হচ্ছে অর্থাৎ ফিলিস্তিন৷ এর আসল কারণ হচ্ছে, তাওরাত বর্তমানে যে অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে তা প্রথমত সম্পূর্ণ নয়, তাছাড়া নির্ভেজাল আল্লাহর বাণী সম্বলিত ও নয়৷ বরং তার মধ্যে আল্লাহর বানীর সাথে অনেক ব্যাখ্যামূলক বক্তব্য ও সংযোজিত করে দেয়া হয়েছে৷ তার মধ্যে ইহুদীদের জাতীয় ঐতিহ্য, বংশপ্রীতি , কুসংষ্কার আশা -আকাংখা ভূল ধারণাও ফিকাহভিত্তিক ইজতিহাদের একটি বিরাট অংশ একই ভাষণ ও বানী পরষ্পরার মধ্যে এমন ভাবে মিশ্রিত হয়ে গেছে যে, অধিকাংশ স্থানে আল্লাহর আসল কালামকে তার মধ্যে থেকে পৃথক করে বের করে নিয়ে আসা একেবারেই অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়৷ (এ প্রসঙ্গে আরো দেখুন সূরা আলে ইমরানের ২ টীকা৷)
১০৮. মূলআয়াতে ------(আত্ তা-য়েবুন) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ এর শাব্দিক অনুবাদ করলে দাঁড়ায় তাওবাকারী৷ কিন্তু যে বর্ণনা রীতিতে ও শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে তা থেকে সুষ্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, তাওবা করা ঈমানদারদের স্থায়ী ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্টের অন্তরভুক্ত৷ তাই এর সঠিক অর্থ হচ্ছে তারা কেবলমাত্র একবার তাওবা করে না বরং সবসময় তাওবা করতে থাকে৷ আর তাওবার আসল অর্থ হচ্ছে ফিরে আসা৷ কাজেই এ শব্দটির মূল প্রাণ সত্তা প্রকাশ কারার জন্য আমি এর ব্যাখ্যামূলক অনুবাদ এভাবে করেছি তারা আল্লাহর দিকে বারবার ফিরে আসে ৷ মুমিন যদিও তার পূর্ণ চেতনা ও সংকল্প সহকারে আল্লাহ সাথে নিজের প্রাণ ও ধন -সম্পদ কেনা-বেচার কারবার করে কিন্তু যেহেতু বাইরের অবস্থার প্রেক্ষিতে এটাই অনুভূত হয় যে, প্রাণ তার নিজের এবং ধন ও তার নিজের আর তাছাড়া এ প্রাণ ও ধনের আসল মালিক মহান আল্লাহ৷ কোন অনুভূত সত্তা নন বরং একটি যুক্তিগ্রাহ্য সত্তা৷ তাই মুমিনের জীবনের বারবার এমন সময় আসতে থাকে যখন সে সাময়িকভাবে আল্লাহর সাথে করা তার কেনা-বেচার চুক্তি ভুলে যায়৷ এ অবস্থায় এ চুক্তি থেকে গাফেল হয়ে সে কোন লাগামহীন কার্যকলাপ করে বসে৷ কিন্তু একজন প্রকৃত ও যথার্থ মুমিনের বৈশিষ্ট এই যে, এ সমায়িক ভুলে যাওয়ার হাত থেকে যখনই সে রেহাই পায়, তখনই নিজের গাফলতির পর্দা ছিড়ে সে বেরিয়ে আসে এবং অনুভব করতে থাকে যে, অবচেতনভাবে সে নিজের অংগীকারের বিরুদ্ধাচারণ করে ফেলেছে তখনই সে লজ্জা অনুভব করে, তীব্র অনুশোচন সহকারে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করে ক্ষমা চায় এবং নিজের অংগীকারকে পুনরায় তরতাজা করে নেয়৷ এ বারবার তাওবা করা, বারবার আল্লাহর দিকে ফিরে আসা এবং প্রত্যেকটি পদস্খলনের পর বিশ্বস্ততার পথে ফিরে আসাই ঈমানের স্থিতি ও স্থায়িত্বের প্রতীক৷ নয়তো যেসব মানবিক দুবর্লতা সহকারে মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে সেগুলোর উপস্থিতিতে তার পক্ষে এটা কোনক্রমেই সম্ভব নয় যে, সে আল্লাহর হাতে একবার ধন-প্রাণ বিক্রি করার পর চিরকাল পূর্ণ সচেতন অবস্থায় এ কেনা-বেচার দাবী পূরণ করতে থাকবে এবং কখনো গাফলতি ও বিস্মৃতির শিকার হবে না৷ তাই মহান আল্লাহ মুমিনের এ সংজ্ঞা বর্ণনা করেন না যে, বন্দেগীর পথে এসে কখনো যার পা পিছলে যায় না সে মুমিন৷ বরং বার বার পা পিছলে যাবার পরও প্রতিবারই সে একই পথে ফিরে আসে , এটিকেই আল্লাহ মুমিনের প্রশংসনীয় গুণ হিসেবে গণ্য করেছেন৷ আর এটিই হচ্ছে মানুষের আয়ত্বের ভেতরের শ্রেষ্ঠতম গুণ৷ আবার এ প্রসংগে মুমিনের গুণাবলীর মধ্যে সবার আগে তাওবার কথা বলার আর একটি উপযোগিতাও রয়েছে৷ আগে থেকে যে ধারাবাহিক বক্তব্য চলে আসছে তাতে এমনসব লোকের উদ্দেশ্যে কথা বলা হয়েছে যাদের থেকে ঈমান বিরোধী কার্যকলাপের প্রকাশ ঘটেছিল৷ কাজেই তাদেরকে ঈমানের তাৎপর্য ও তার মৌলিক দাবী জানিয়ে দেবার পর এবার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে, মুমিনের যে অপরিহার্য গুণাবলীর অধিকারী হতে হবে তার মধ্যে প্রথম ও প্রধান গুণ হচ্ছেঃ যখনই বন্দেগীর পথ থেকে তাদের পা পিছলে যায় তারা যেন সংগে সংগেই আবার সেদিকে ফিরে আসে৷ নিজেদের সত্য বিচ্যুতির ওপর যেন অবিচল হয়ে দাড়িয়ে না থাকে এবং পিছনের দিকে বেশী দূরে চলে না যায়৷
১০৯. মূল ইবারতে ---------(আস সায়েহুন) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ কোন কোন মুফাসসির এর অর্থ করেছেন -------(আস সা-য়েমুন) অর্থাৎ যারা রোযা রাখে৷ কিন্তু ----------আস সায়েহুনা বা বিচরণকারীকে রোযাদার অর্থে ব্যবহার করলে সেটা হবে তার রূপক ও পরোক্ষ অর্থ৷ এর প্রকৃত ও প্রত্যক্ষ অর্থ এটা নয়৷ আর যে হাদীসে বলা হয়েছে , নবী (সা) নিজেই এ শব্দটির এ অর্থ বিশ্লেষণ করেছেন সেটিকে নবীর (সা) ওপর প্রয়োগ করা ঠিক নয়৷ তাই আমরা একে এর প্রকৃত অর্থে গ্রহণ করাকেই বেশী সঠিক মনে করি৷ কুরআনে বিভিন্ন জায়গায় ইসফাক শব্দটি সরল ও সাধারণ অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে , এর মানে হয় ব্যয় করা ..............................
১১০. অর্থাৎ মহান আল্লাহ আকীদা -বিশ্বাস ,ইবাদত-বন্দেগী, নৈতিক চরিত্র, সামাজিকতা , তামাদ্দুন অর্থনীতি-রাজনীতি আইন -আদালত , এবং যুদ্ধ ও শান্তির ব্যাপারে যে সীমারেখা নির্ধারণ করেছেন তারা তা পুরোপুরি মেনে চলে৷ নিজেদের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক কর্মকাণ্ড এ সীমারেখার মধ্যে আবদ্ধ রাখে৷ কখনো এ সীমা অতিক্রম করে ইচ্ছামতো কাজ করতে থাকে না৷ আবার কখনো আল্লাহর আইনের পরিবর্তে মনগড়া আইনের বা মানুষের তৈরী ভিন্নতর আইনকে জীবন বিধান হিসেবে গ্রহণ করে না৷এ ছাড়াও আল্লাহর সীমারেখাগুলো প্রতিষ্ঠিত করতে হবে এবং এগুলো লংঘন করতে দেয়া যাবে না৷ কাজেই সাচ্চা ঈমানদারকের সংজ্ঞা কেবল এতটুকুই নয় যে, তারা নিজেরা আল্লাহর সীমা মেনে চলে বরং তাদের অতিরিক্ত গুণাবলী হচ্ছে এই যে, তারা দুনিয়ায় আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে, সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করে এবং সেগুলো অটুট রাখার জন্য নিজেরদের সর্বশক্তি নিয়োগ করে৷
১১১. কোন ব্যক্তির জন্য ক্ষমার আবেদন জানানোর অনিবার্য অর্থ হচ্ছে এই যে, আমরা তার প্রতি সহানুভূমিশীল এবং তাকে ভালবাসি ৷ আমরা তার দোষকে ক্ষমাযোগ্য মনে করি৷ যারা বিশ্বস্তদের অন্তরভুক্ত এবং শুধুমাত্র গোনাহগার তাদের ক্ষেত্রে এ দুটো কথাই ঠিক ৷ কিন্তু যে ব্যক্তি প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে তার প্রতি সহানুভুতিশীল হওয়া তাকে ভালবাসা ও তার অপরাধকে ক্ষমাযোগ্য মনে করা শুধু যে নীতিগতভাবে ভুল তাই নয় বরং এর ফলে আমাদের নিজেদের বিশ্বস্ততা ও সন্দেহযুক্ত হয়ে পড়ে৷ আর যদি শুধুমাত্র আমাদের আত্মীয় বলে আমরা তাকে মাফ করে দিতে চাই তাহলে এর মানে হবে, আমাদের কাছে আত্মীয়তার সম্পর্ক আল্লাহর প্রতি বিশ্বস্ততার দাবীর তুলনায় অনেক বেশী মূল্যবান৷ আল্লাহ ও তার দীনের প্রতি আমাদের ভালবাসা নির্ভেজাল ও শর্তহীন নয়৷ আল্লাহদ্রোহীদের সাথে আমরা যে সম্পর্কে জুড়ে রেখেছি তার ফলে আমরা চাচ্ছি, আল্লাহ নিজেও যেন এ সম্পর্ক গ্রহণ করেন এবং আমাদের আত্মীয়কে যেন অবশ্যই ক্ষমা করে দেন, যদিও এ একই অপরাধ করার কারণে অন্যান্য অপরাধীদেরকে তিনি জাহান্নামের শাস্তি দিয়ে থাকেন৷ বন্তুত এ সমস্ত কথাই ভুল আন্তরিকতা ও বিশ্বস্ততার বিরোধী এবং সেই একনিষ্ঠ ঈমানের পরিপন্থী যার দাবী হচ্ছে, আল্লাহ ও তার দীনের প্রতি আমাদের ভালবাসা নির্ভেজাল হতে হবে ,আল্লাহর বন্ধু হবে আমাদের বন্ধু এবং তার শত্রু হবে আমাদের শত্রু ৷ এ কারণে মহান আল্লাহ এ কথা বলেননি যে, তোমারা মুশরিকদের জন্য মগফিরাতের দোয়া করো না৷ বরং তিনি বলেছেন তাদের জন্য মাগফিরাতের দোয়া করা তোমাদের পক্ষে শোভা পায় না৷ অর্থাৎ আমার মানা করায় যদি তোমরা বিরত থাকো তাহলে তো এর তেমন কোন গুরুত্ব থাকে না৷ মূলত তোমাদের মধ্যে আনুগত্য ও বিশ্বস্ততার অনুভূতি এত বেশী তীব্র হওয়া উচিত যার ফলে আমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণাকারীদের সাথে সহানুভূতির সম্পর্ক রাখা এবং তাদের অপরাধকে ক্ষমাযোগ্য মনে করা তোমাদের নিজেদের কাছেই অশোভন ঠেকে৷ এখানে আরো এতটুকু বুঝে নিতে হবে যে, আল্লাহদ্রোহীদের প্রতি যে সহানুভূতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে তা কেবলমাত্র এমন পর্যায়ের সহানুভূতি যা দীনের ব্যাপরে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়৷ অন্যদিকে মানবিক মহানুভূতি এবং পার্থিব সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আত্মীয়তা ও রক্ত সম্পর্ক এবং স্নেহ -সম্প্রীতিপূর্ণ ব্যবহার এসব নিষিদ্ধ নয় বরং প্রশংসনীয়৷ আত্মীয় কাফের হোক বা মুমিন , তার সামাজিক অধিকার অবশ্যি প্রদান করতে হবে৷ বিপদগ্রস্ত মানুষকে সকল অবস্থায় সাহায্য দিতে হবে৷ অভাবীকে যে কোন সময় সহায়তা দন করতে হবে৷ রুগ্ন ও আহতের সেবা ও তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনের ব্যাপারে কোন ত্রুটি দেখানো যাবে না৷ ইয়াতীমের মাথায় অবশ্যি স্নেহের হত বুলাতে হবে৷ এসব ব্যাপারে কখনো মুসলিম ও অমুসলিমের বাচবিচার করা চলবে না৷
১১২. হযরত ইবরাহীম তার মুশরিক পিতার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার সময় যে কথা বলেছিলেন সেদিকে ইংগিত করা হয়েছে ৷ তিনি বলেছিলেনঃ

-------------------------

আপনার প্রতি সালাম, আপনার জন্য আমি আমার রবের কাছে দোয়া করবো যেন তিনি আপনাকে মাফ করে দেন৷ তিনি আমার প্রতি বড়ই মেহেরবান৷ (মারয়ামঃ ৪৭ )

তিনি আরো বলেছিলেনঃ

-------------------------

আমি আপনার জন্য অবশি ক্ষমা চাইবো৷ তবে আপনাকে আল্লাহর পাকড়াও থেকে বাঁচানোর ক্ষমতা আমার নেই৷ (আল মুমতাহিনাঃ ৪)

উপরক্ত ওয়াদার ভিত্তিতে তিনি নিজের পিতার জন্য এ দোয়া করেছিলেনঃ

---------------------------------

আর আমার পিতাকে মাফ করে দাও, তিনি পথভ্রষ্টদের অন্তরভুক্ত ছিলেন৷ আর যেদিন সকল মানুষকে উঠানো হবে সেদিন আমাকে লাঞ্ছিত করো না৷ যেদিন ধনসম্পদ এবং সন্তান সন্তুতি কারোর কোন কাজে লাগবে না৷ একমাত্র সেই নাজাত পাবে , যে আল্লাহর সামনে হাযির হবে বিদ্রোহমুক্ত হৃদয় নিয়ে৷ (আশ শুআরাঃ ৮৬-৮৯)

এ দোয়া তো প্রথমত অত্যন্ত সতর্ক ও সংযত ভাষায় করা হয়েছিল৷ কিন্তু পরক্ষনেরই হযরত ইবরাহীম চিন্তা করলেন যে, তিনি যে ব্যক্তির জন্য দোয়া করেছেন সে তো ছিল প্রকাশ্য আল্লাহদ্রোহী এবং আল্লাহর দীনের ঘোরতর শত্রু তখন তিনি এ থেকে বিরত হলেন এবং একজন যথার্থ বিশ্বস্ত মুমিনের মত বিদ্রোহীর প্রতি সহানুভূতি দেখানো থেকে পরিষ্কারভাবে সরে দাঁড়লেন৷ অথচ এ বিদ্রোহী ছিল তার পিতা ,যে এক সময় স্নেহ ও ভালোবাসা দিয়ে তাকে লালন পালন করেছিল৷
১১৩. মূলে -----(আওওয়াহুন) ও --------(হালীমুন) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ আওওয়াহুন মানে হচ্ছে, যে অনেক বেশী হা -হুতাশ করে, কান্নাকাটি করে, ভয় পায় ও আক্ষেপ করে ৷ আর হালীম এমন ব্যক্তিকে বলা হয় , যে নিজের মেজায সংযত রাখে, রাগে, শত্রুতায় ও বিরোধিতায় বেসামাল আচরণ করে না এবং অন্যদিকে ভালবাসায়, বন্ধুত্বের ও হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রম করে যায় না৷এখানে এ শব্দ দুটি দ্বিবিধ অর্থ প্রকাশ করছে৷ হযরত ইবরাহীম (আ) তার পিতার জন্য মাগফিরাতের দোয়া করেছেন ৷ কারণ তিনি ছিলেন অত্যন্ত সংবেদনশীল হৃদয় বৃত্তির অধিকারী৷ তার পিতা জাহান্নামের ইন্ধনে পরিণত হবে, একথা ভেবে তিনি কেঁপে উঠেছিলেন৷ আবার তিনি ছিলেন "হালিম" -সংযমী ও ধৈর্যশীল৷ তার পিতা ইসলামের পথে এগিয়ে যাবার ক্ষেত্রে বাধা দেবার জন্য তার ওপর যে জুলুম নির্যাতন চালিয়েছিল তা সত্ত্বেও তার মুখ থেকে পিতার জন্য দোয়া বের হয়ে গিয়েছিল৷ তারপর তিনি দেখলেন , তাঁর পিতা আল্লাহর দুশমন ,তাই তিনি তার থেকে নিজেকে দায়মুক্ত করে নিলেন ৷ কারণ তিনি আল্লাহকে ভয় করতেন এবং কারোর প্রতি ভালোবাসায় সীমা অতিক্রম করতেন না৷
১১৪. অর্থাৎ লোকদের কোন চিন্তা কার্যধারা ও পদ্ধতি থেকে বাঁচতে হবে তা আল্লাহ আগেই বলে দেন৷ তারপর যখন তারা তা থেকে বিরত হয় না এবং ভুল চিন্তা ও কাজে লিপ্ত হয়ে তার ওপর অবিচল থাকে তখন আল্লাহও তাদের হেদায়াত করার ও সঠিক পথনির্দেশনা দেয়া থেকে বিরত হন এবং যে ভুল পথে তারা যেতে চায় তার ওপর তাদেরকে ঠেলে দেন৷

এ বক্তব্যটি থেকে একটি মূলনীতি অনুধাবন করা যায়৷ আল্লাহ কুরআন মজীদের যেসব জায়গায় হেদায়াত দেয়া ও গোমরাহ করাকে তার নিজের কাজ বলে উল্লেখ করেছেন সেগুলো এ মূলনীতিটির মাধ্যমে ভালভাবে বুঝে যেতে পারে৷ আল্লাহর হেদায়াত দেয়ার মানে হচ্ছে, তিনি নিজের নবী ও কিতাসমূ

১১৫. অর্থাৎ তাবুক যুদ্ধে নবী (সা) ও সাহাবায়ে কেরামের যেসব ছোটখাটো ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়েছিল তাদের উৎকৃষ্ট মানের কার্যকলাপের বদৌলতে আল্লাহ সেগুলো মাফ করে দিয়েছেন৷ নবী (সা) এর কাজে যে ত্রুটি হয়েছিল আগেই ৪৩ আয়াতে তা উল্লেখ করা হয়েছে ৷ অর্থাৎ যারা সামর্থ থাকা সত্ত্বেও পিছনে থেকে যাওয়ার অনুমতি চেয়েছিল তাদেরকে তিনি অনুমতি দিয়েছিলেন৷
১১৬. অর্থাৎ কোন কোন আন্তরিকতা সম্পন্ন সাহাবাও এ কঠিন সময়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে কোন না কোন ভাবে ইতস্তত করেছিলেন৷ কিন্তু যেহেতু তাদের দিলে ঈমান ছিল এবং তারা আন্তরিকভাবে আল্লাহর সত্য দীনকে ভালবাসতেন তাই শেষ পর্যন্ত তারা নিজেদের দুর্বলতার ওপর বিজয়ী হতে পেরেছিলেন৷
১১৭. অর্থাৎ তাদের মনে ভ্রান্তি নীতির প্রতি ও ঝোঁক কেন সৃষ্টি হয়েছিল সে জন্য আল্লাহ এখন আর তাদেরকে পাকড়াও করবেন না৷ কারণ মানুষ নিজেই যে দুর্বলতার সংশোধন করে নেয় আল্লাহ সে জন্য কোন কৈফিয়ত তলব করেন না৷
১১৮. নবী (সা) যখন তাবুক থেকে মদীনায় ফিরে এলেন তখন যারা পিছনে অর্থাৎ মদীনায় থেকে গিয়েছিল৷ তারা ওযর পেশ করার জন্য হাজির হলো৷ তাদের মধ্যে ৮০ জনেরও বেশী ছিল মুনাফিক৷ মুনাফিরা মিথ্যা ওযর পেশ করেছিল এবং রসূলুল্লাহ (সা) তা মেনে নিচ্ছিলেন্৷ তারপর এলো এ তিন জন মুমিনের পালা৷ তারা পরিষ্কারভাবে নিজেদের দোষ স্বীকার করলেন৷ নবী (সা) তাদের তিনজনের ব্যাপারে ফায়সালা মুলতবী রাখলেন৷ তিনি সাধারণ মুসলমানদের হুকুম দিলেন, আল্লাহর নির্দেশ না আসা পর্যন্ত তাদের সাথে কোন প্রকার সামাজিক সম্পর্ক রাখা যাবে না৷ এ বিষয়টির ফায়সালা করার জন্য এ আয়াত নাযিল হয়৷ (এখানে একথাটি অবশ্যি) সামনে রাখতে হবে যে, ৯৯ টীকায় যে সাতজন সাহাবীর আলোচনা এসেছে তাদের ব্যাপারটি কিন্তু এদের থেকে স্বতন্ত্র ৷ তারা তো জবাবদিহির আগেই নিজেরাই নিজেদের শাস্তি দিয়েছিলেন৷
১১৯. এ তিন জন সাহাবী ছিলেন কাব ইবনে মালেক ,হিলাল ইবনে উমাইয়াহ এবং মুরারাহ ইবনে রুবাই৷ আগেই বলেছি, এরা তিনজন ছিলেন সাচ্চা মুমিন৷ এর আগে তারা বহুবার নিজেদের আন্তরিকতার প্রমাণ দিয়েছিলেন৷ অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন৷ শেষের দুজন তো বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিলেন৷ কাজেই তাদের ঈমানী সত্যতা সব রকমের সংশয় -সন্দেহের উর্ধে ছিল৷ আর প্রথম জন যদিও বদরী সাহাবী ছিলেন না কিন্তু বদর ছাড়া প্রতিটি যুদ্ধে নবী (সা) এর সাথে অংশগ্রহণ করেছিলেন৷ ইসলামের জন্য তার এমন ত্যাগ প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম -সাধনা সত্ত্বেও এমন এক নাজুক সময়ে যখন যুদ্ধ করার শক্তি ও সমর্থের অধিকারী প্রত্যেক মুমিনকে যুদ্ধ করার জন্য এগিয়ে আসার হুকুম দেয়া হয়েছিল তখন তারা যে অলসতা ও গাফলতির পরিচয় দিয়েছিলেন সে জন্য তাদেরকে কঠোরভাবে পাকড়াও করা হয়েছিল৷ নবী (সা) তাবুক থেকে ফিরে এসে মুসলমানদের প্রতি কড়া নির্দেশ জারি করেন কেউ এদের সাথে সালাম কালাম করতে পারবে না৷ ৪০ দিন পরে তাদের স্ত্রীদেরকে ও তাদের থেকে আলাদা বসবাস করার কঠোর আদেশ দেয়া হলো৷ আসলে এ আয়াতে তাদের অবস্থার যে ছবি আঁকা হয়েছে মদীনার জনবসতিতে তাদের অবস্থা ঠিক তাই হয়ে গিয়েছিল ৷ শেষে তাদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের ব্যাপারটি যখন ৫০ দিনে এসে ঠেকালো তখন ক্ষমার এ ঘোষণা নাযিল হলো৷

এ তিন জনের মধ্য থেকে হযরত কাব ইবনে মালেক অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে নিজের ঘটনা বর্ণনা করেছেন৷ এ ঘটনা বড়ই শিক্ষাপ্রদ৷ বৃদ্ধ বয়সে তিনি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন৷ এ সময় তার ছেলে আবদুল্লাহ তাকে হাত ধরে নিয়ে চলাফেরা করতেন৷ আবদুল্লাহকে তিনি নিজেই এ ঘটনা এভাবে শুনানঃ

তাবুক যুদ্ধের প্রস্তুতি পর্বে নবী (সা) যখনই মুসলমানদেরকে যুদ্ধে অংশ গ্রহন করার আবেদন জানাতেন তখনই আমি মনে মনে সংকল্প করে নিতাম যে, যুদ্ধে যাবার প্রস্তুতি নেবো৷ কিন্তু ফিরে এসে আমাকে অলসতায় পেয়ে বসতো এবং আমি বলতাম , এখনই এতো তাড়াহুড়া কিসের, রওয়ানা দেবার সময় যখন আসবে তখন তৈরী হতে কতটুকু সময়ই বা লাগবে৷এভাবে আমার প্রস্তুতি পিছিয়ে যেতে থাকলো৷ তারপর একদিন সেনাবাহিনীর রওয়ানা দেবার সময় এসে গেল৷ অথচ তখনো আমি তৈরী ছিলাম না৷ আমি মনে মনে বললাম, সেনাবাহিনী চলে যাক, আমি এক দুদিন পরে পথে তাদের সাথে যোগ দেবো৷ কিন্তু তখনো একই অলসতা আমার পথের বাধা হয়ে দাঁড়ালো ৷ এভাবে সময় পার হয়ে গেলো৷

এ সময় যখন আমি মদীনায় থেকে গিয়েছিলাম আমার মন ক্রমেই বিষিয়ে উঠিছিল৷ কারণ আমি দেখছিলাম যাদের সাথে এ শহরে আমি রয়েছি তার হয়, মুনাফিক , নয়তো দুর্বল, বৃদ্ধ ও অক্ষম লোক, যাদেরকে আল্লাহ অব্যহতি দিয়েছেন৷

নবী (সা) তাবুক থেকে ফিরে এসে যথারীতি মসজিদে প্রবেশ করে দু'রাকাত নফল নামায পড়লেন৷ তারপর তিনি লোকদের সাথে সাক্ষাত করার জন্য বসলেন৷মুনাফিকরা এ মজলিসে এসে লম্বা লম্বা কসম খেয়ে তাদের ওযর পেশ করতে লাগলো৷ এদের সংখা ছিল ৮০ এর চাইতেও বেশী৷ রসূলূল্লাহ (সা) তাদের প্রত্যেকের বনোয়াট ও সাজানো কথা শুনলেন৷ তাদের লোক দেখানো ওযর মেনে নিলেন এবং তাদের অন্তরের ব্যাপার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়ে বললেন, আল্লাহ তোমাদের মাফ করুন৷ তারপর আমার পালা এলো৷ আমি সামনে গিয়ে সালাম দিলাম৷ তিনি আমার দিকে চেয়ে মুচকি হেসে বললেন, আসুন! আপনাকে কিসে আটকে রেখেছিল? আমি বললাম, আল্লাহর কসম! যদি আমি কোন দুনিয়াদারের সামনে হাযির হতাম তাহলে অবশ্যি কোন না কোন কথা বানিয়ে তাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করতাম৷ কথা বানিয়ে বলার কৌশল আমিও জানি ৷ কিন্তু আপনার ব্যাপারে আমার দৃঢ় বিশ্বাস ,যদি এখন কোন মিথ্যা ওযর পেশ করে আমি আপনাকে সন্তুষ্ট করেও নেই তাহলে আল্লাহ নিশ্চয়ই আপনাকে আমার প্রতি আবার নারাজ করে দেবেন৷ তবে যদি আমি সত্য বলি তাহলে আপনি নারাজ হয়ে গেলেও আমি আশা রাখি আল্লাহ আমার জন্য ক্ষমার কোন পথ তৈরী করে দেবেন৷ আসলে পেশ করার মতো, কোন ওযরই আমার নেই৷ যুদ্ধে যাওয়ার ব্যাপারে আমি পুরোপুরি সক্ষম ছিলাম৷ একথা শুনে রসূলুল্লাহ (সা)বললেন , এ ব্যক্তি সত্য কথা বলেছে৷ ঠিক আছে, চলে যাও এবং আল্লাহ তোমার ব্যাপারে কোন ফায়সালা না দেয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে থাকো৷ আমি উঠে নিজের গোত্রের লোকদের মধ্যে গিয়ে বসলাম৷ এখানে সবাই আমার পিছনে লাগলো৷ তারা আমাকে এ বলে তিরস্কার করতে লাগলো যে, তুমি ও কোন মিথ্যা ওযর পেশ করলে না কেন এসব কথা শুনে আবার রসূলের কাছে গিয়ে কিছু বানোয়াট ওযর পেশ করার জন্য আমার মনে আগ্রহ সৃষ্টি হলো৷ কিন্তু যখন শুনলাম আরো দুজন সৎলোক (মুরারাহ ইবনে রুবাই ও হেলাল ইবনে উমাইয়াহ ) আমার মতো একই সত্য কথা বলেছেন তখন আমি মানসিক প্রশান্তি অনুভব করলাম এবং আমার সত্য কথার ওপর অটল থাকলাম৷

এরপর নবী(সা) সাধারণ হুকুম জারি করলেন, আমাদের তিন জনের সাথে কেউ কথা বলতে পারবে না৷ অন্য দুজন তো ঘরের মধ্যে বসে রইলো কিন্তু আমি বাইরে বের হতাম, জামায়াতে নামায পড়তাম এবং বাজারে ঘোরাফেরা করতাম৷ কিন্তু কেউ আমার সাথে কথা বলতো না৷ মনে হয়তো, এ দেশটি একদম বদলে গেছে৷ আমি যেন এখানে একজন অপরিচিত আগুন্তুক৷ এ জনপদের কেউ আমাকে জানে না, চেনা না৷ মসজিদে নামায পড়তে গিয়ে যথারীতি নবী (সা) কে সালাম করতাম৷ আমার সালামের জবাবে তার ঠোঁট নড়ে উঠছে কিনা তা দেখার জন্য আমি অপেক্ষা করতাম৷ কিন্তু শুধু অপেক্ষা করাই সার হতো৷ তার নজর আমার ওপর কিভাবে পড়ছে তা দেখার জন্য আমি আড়চোখে তার প্রতি তাকাতাম৷ কিন্তু অবস্থা ছিল এই যে, যতক্ষণ আমি নামায পড়তাম ততক্ষণ তিনি আমাকে দেখতে থাকতেন এবং যেই আমি নামায শেষ করতাম অমনি আমার ওপর থেকে তিনি চোখ ফিরিয়ে নিতেন৷একদিন ঘাবড়ে গিয়ে আমার চাচাত ভাই ও ছেলে বেলার বন্ধু আবু কাতাদার কাছে গেলাম৷ তার বাগানের পাঁচিলের ওপর উঠে তাকে সালাম দিলাম৷ কিন্তু আল্লাহর সেই বান্দাটি আমার সালামের জবাবও দিলো না৷ আমি বললামঃ হে আবু কাতাদাহ! আমি তোমাকে আল্লাহর কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি আমি কি আল্লাহ ও তার রসূলকে ভালবাসি না? সে নীরব রইলো৷ আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম , সে নীরব রইলো৷ তৃতীয়বার যখন আমি কসম দিয়ে তাকে এ প্রশ্ন করলাম তখন সে শুদুমাত্র এতটুকু বললোঃ আল্লাহ ও তার রসূলই ভাল জানেন৷ একথায় আমার চোখে পানি এসে গেলো৷ আমি পাঁচিল থেকে নেমে এলাম৷ এ সময় আমি একদিন বাজার দিয়ে যাচ্ছিলাম৷ এমন সময় সিরিয়ার নাবতী বংশীয় এক লোকের সাথে দেয়া হলো ৷ সে রেশমে মোড়া গাসসান রাজার একটি পত্র আমার হাতে দিল৷ আমি পত্রটি খুলে পড়লাম৷ তাতে লেখা ছিল, আমরা শুনেছি, তোমার নেতা তোমার ওপর উৎপীড়ন করছে ৷ তুমি কোন নগ্যন্য ব্যক্তি নও৷ তোমাকে ধ্বংস হতে দেয়া যায় না৷ আমাদের কাছে চলে এসো ৷ আমরা তোমাকে মর্যাদা দান করবো৷ আমি বললাম , এ দেখি আর এক আপদ! তখনই চিঠিটাকে চুলোর আগুনে ফেলে দিলাম৷

চল্লিশটা দিন এভাবে কেটে যাবার পর রসূলুল্লাহ (সা) কাছে থেকে তার দুত এই হুকুম নিয়ে এলেন , যে নিজের স্ত্রী থেকে ও আলাদা হয়ে যাও৷ আমি জিজ্ঞেস করলাম তাকে কি তালাক দিয়ে দিবো? জবাব এলো , না , তালাক নয়৷ শুধু আলাদা থাকো৷ কাজেই আমি স্ত্রীকে বলে দিলাম, তুমি বাপের বাড়ি চলে যাও এবং আল্লাহ এ ব্যাপারে কোন সিন্ধান্ত দেয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে থাকো৷

এভাবে উনপঞ্চাশ দিন পার হয়ে পঞ্চাশ দিন পড়লো৷ সেদিন সকালে নামাযের পরে আমি নিজের ঘরের ছাদের ওপর বসে ছিলাম৷ নিজের জীবনের প্রতি আমার ধিক্কার জাগছিল হঠাৎ এক ব্যক্তি চেঁচিয়ে বললোঃ কাব ইবনে মালিককে অভিনন্দন৷ একথা শুনেই আমি সিজদায় নত হয়ে গেলাম৷ আমি নিশ্চিত হলাম যে, আমার ক্ষমার ঘোষনা জারি হয়েছে৷ এরপর লোকেরা দলে দলে ছুটে আসতে লাগলো৷ তারা প্রত্যেকে পাল্লা দিয়ে আমাকে মুবারকবাদ দিচ্ছিল৷ তারা বলছিল তোমার তওবা কবুল হয়েছে৷ আমি উঠে সোজা মসজিদে নববীর দিকে গেলাম৷ দেখলাম, নবী (সা) এর চেহারা আনন্দে উজ্জল হয়ে উঠেছে৷ আমি সালাম দিলাম৷ তিনি বললেন, তোমাকে মোবারকবাদ ! আজকের দিনটি তোমার জীবনের সর্বোত্তম দিন৷ আমি জিজ্ঞেস করলাম, এ ক্ষমা কি আপনার পক্ষ থেকে না আল্লাহর পক্ষ থেকে? বললেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং এ সংগে তিনি সংশ্লিষ্ট আয়াত শুনিয়ে দিলেন৷ আমি বললামঃ হে আল্লাহর রসূল! আমার সমস্ত ধন -সম্পদ আল্লাহর পথে সদকা করে দিতে চাই৷এটাও আমার তাওবার অংশ বিশেষ৷ বললেনঃ কিছু রেখে দাও, এটাই তোমার জন্য ভাল৷ এ বক্তব্য অনুযায়ী আমি নিজের খয়বরের সম্পত্তির অংশটুকু রেখে দিলাম৷ বাদবাকি সব সাদকা করে দিলাম৷ তারপর আল্লাহর কাছে অংগীকার করলাম, যে সত্যকথা বলার কারণে আল্লাহ আমাকে মাফ করে দিয়েছেন তার ওপর আমি সারা জীবন প্রতিষ্ঠিত থাকবো৷ কাজেই আজ পর্যন্ত আমি জেনে বুঝে যথার্থ সত্য ও প্রকৃত ঘটনা বিরোধী কোন কথা বলিনি এবং আশা করি আল্লাহ আগামীতেও তা থেকে আমাকে বাঁচাবেন৷

এ ঘটনার মধ্যে শিক্ষণীয় অনেক কিছু আছে৷ প্রত্যেক মুমিনের মনে তা বদ্ধমূল হয়ে যাওয়া উচিত৷

এ থেকে প্রথম যে শিক্ষাটি পাওয়া যায়, তা হচ্ছে, কুফর ও ইসলামের সংঘাতের ব্যাপারটি বড়ই গুরুত্বপূর্ণ ও নাজুক৷ এ সংঘাতে কুফরের সাথে সহযোগিতা করা তো দূরের কথা , যে ব্যক্তি ইসলামের সাথে সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে অসৎ উদদেশ্যে নয়, সৎ উদ্দেশ্যে এবং সারা জীবনও নয় বরং কোন এক সময় ভূল করে বসে, তারও সারা জীবনের ইবাদত -বন্দেগী ও দীনদারী ঝুঁকির সম্মুখীন হয়৷ এমনকি এমন উন্নত মর্যাদাসম্পন্ন লোকও পাকড়াও হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে না যে, বদর ওহোদ আহযাব ও হুনাইনের ভয়াবহ যুদ্ধ ক্ষেত্রে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লড়াই করেছিল এবং যার ঈমান ও আন্তরিকতার মধ্যে বিন্দুমাত্র খাদ ছিলো না৷

দ্বিতীয় শিক্ষাটিও এর চাইতে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়৷ সেটি হচ্ছে দ্বায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে গড়িমসি করা কোন মামুলি ব্যাপার নয়৷ বরং অনেক সময় শুধুমাত্র গড়িমসি করতে করতে মানুষ এমন কোন ভুল করে বসে যা বড় বড় গোনাহের অন্তরভূক্ত৷ তখন একথা বলে সে নিষ্কৃতি পেতে পারে না৷ সে অসৎ উদ্দেশ্যে এ কাজটি করেনি৷

নবী (সা) এর নেতৃত্বে যে সমাজ গড়ে উঠেছিল৷ এ ঘটনা খুবই চমৎকারভাবে তার প্রাণসত্তা উন্মোচন করে দেয়৷ একদিকে রয়েছে মুনাফিদের দল ৷ তাদের বিশ্বাসঘাতকতা সবার কাছে সুষ্পষ্ট ছিল৷ এরপরও তাদের বাহ্যিক ওযরসমূহ শোনা হয় এবং সেগুলোর সত্যাসত্য এড়িয়ে যাওয়া হয়৷ কারণ তাদের কাছ থেকে তো আন্তরিকতার আশাই করা হয়নি কোন দিন৷ কাজেই এখন আন্তরিকতার অভাব নিয়ে অভিযোগ তোলার কোন প্রশ্নই ওঠে না৷ অন্যদিকে রয়েছেন একজন পরীক্ষিত মুমিন৷ তার উৎসর্গীত প্রাণ কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে কারো মনে কোন প্রকার সন্দেহের অবকাশই নেই৷ তিনি মিথ্যা ও বলেন না৷ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় নিজের ভুল স্বীকার করে নেন৷ কিন্তু তার ওপর ক্রোধ বর্ষিত হয়৷ এ ক্রোধের কারণ এ নয় যে, তার মুমিন হবার ব্যাপারে সন্দেহ দেখা দিয়েছে বরং এর কারণ হচ্ছে , মুমিন হওয়া সত্ত্বেও সে মুনাফিক সুলভ কাজ করলো কেন? আসলে এভাবে তাকে একথাই বলা হচ্ছে, যে, তোমরাই পৃথিবীর সার বস্তু৷ তোমাদের থেকে যদি মৃত্তিকা উর্বরতা লাভ করতে না পারে তাহলে উর্বরতা কোথা থেকে আসবে?তারপর মজার ব্যাপার হচ্ছে, এ পুরো ঘটনায় নেতা যেভাবে শাস্তি দিচ্ছেন এবং ভক্ত যেভাবে তা মাথা পেতে নিচ্ছেন আর এ সাথে সমগ্র দলটি যেভাবে এ শাস্তি কার্যকর করছে তার প্রত্যেকটি দিকই তুলনা বিহীন৷ এ ক্ষেত্রে কে বেশী প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য তা স্থির করাই কঠিন৷ নেতা অত্যন্ত কঠোর শাস্তি দিচ্ছেন৷ কিন্তু সেখানে ক্রোধ বা ঘৃণার লেশমাত্র নেই৷ বরং গভীর স্নেহ ও প্রীতি সহকারে তিনি শাস্তি দিচ্ছেন৷ ক্রুদ্ধ পিতার ন্যায় তার দৃষ্টি একদিকে অনল বর্ষণ করে চলেছে ঠিকই কিন্তু অন্য দিকে আবার তাকে প্রতি মুহূর্তে একথা জনিয়ে দিচ্ছে যে, তোমার সাথে কোন শত্রুতা নেই বরং তোমার ভুলের কারণে আমার অন্তরটা ব্যাথায় টনটন করছে৷ তুমি নিজের ভুল শুধরে নিলে তোমাকে এ বুকে জড়িয়ে ধরার জন্য আমি ব্যগভাবে অপেক্ষা করছি৷ ভক্ত শাস্তির তীব্রতায় অস্থির হয়ে পড়ছে৷কিন্তু তার পদযুগল আনুগত্যের রাজপথ থেকে এক চুল পরিমানও টলছে না৷ সে আত্মম্ভরিতা ও জাহেলী দাম্ভিকতারও শিকার হচ্ছে না এবং প্রকাশ্যে অহংকার করে বেড়ানোর তো দূরের কথা, এমনকি নিজের প্রিয় নেতার বিরুদ্ধে মনের গভীরে সামান্যতম অভিযোগও সৃষ্টি হতে দিচ্ছে না৷ বরং নেতার প্রতি ভালবাসায় তার মন আরো ভরে উঠেছে৷ শাস্তির পুরো পঞ্চাশ দিন তার দৃষ্টি সবচেয়ে বেশী অধীর হয়ে যে জিনিসটি খুজে বেড়িয়েছে, সেটি হচ্ছে, নেতার চোখে তার প্রতি আগের সেই মমত্বপূর্ণ দৃষ্টি বহাল আছে কিনা, যা তার সমস্ত আশা আকাংখার শেষ আশ্রয় স্থল৷ সে যেন একজন দুর্ভিক্ষপীড়িত কৃষক৷ আকাশের এক কিনারে যে ছোট্র এক টুকরো মেঘ দেখা যাচ্ছে৷ সেটিই তার সমস্ত আশার একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু ৷ তারপর দলের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে যে, তার অভুতপূর্ব শৃংখলা বিরাজিত যে, নেতার মুখ থেকে বয়কটের নির্দেশ উচ্চারিত হবার সাথে সাথেই অপরাধীর ওপর থেকে দলের সমস্ত লোক দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়েছে৷ প্রকাশ্যে তো দূরের কথা গোপনেও কোন নিকটতম আত্মীয় এবং সবচেয়ে অন্তরঙ্গ বন্ধুও তার সাথে কথা বলছে না৷ স্ত্রীও তার থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে৷ আল্লাহর দোহাই দিয়ে সে জিজ্ঞেস করছে, আমার আন্তরিকতায় কি তোমাদের কোন সন্দেহ জেগেছে? কিন্তু যারা দীর্ঘকাল তাকে আন্তরিক দেখে আসছিল তারা পরিস্কার বলে দিচ্ছেঃ আমাদের কাছ থেকে নয়, আল্লাহ ও তার রসূলের কাছ থেকে নিজের আন্তরিকতার সনদ নাও৷ অন্যদিকে দলের নৈতিক প্রাণসত্তা এত বেশী উন্নত ও পবিত্র যে, এক ব্যক্তির উচু মাথা নীচু হবার সাথে সাথেই নিন্দুকদের কোন দল তার নিন্দায় সোচ্চার হয়ে উঠে না৷ বরং শাস্তির এ পুরো সময়টায় দলের প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের এ সাজাপ্রাপ্ত ভাইয়ের বিপদে মর্মবেদনা অনুভব করে এবং পুনরায় তাকে উঠিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরার জন্য ব্যকুল থাকে৷ ক্ষমার কথা ঘোষণা হওয়ার সাথে সাথেই লোকেরা অতি দ্রুত তার কাছে পৌছে তার সাথে সাক্ষাত করার এবং তাকে সুসংবাদ দেবার জন্য দৌড়াতে থাকে৷ কুরআন যে ধরনের সত্যনিষ্ঠা দল দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠিত করতে চায় এটি হচ্ছে তারই দৃষ্টান্ত৷

এ প্রেক্ষাপটে উল্লেখিত আয়াত বিশ্লেষণ করলে আমাদের কাছে একথাটি সুষ্পষ্ট হয়ে যায় যে, এ সাহাবীগণ আল্লাহর দরবার থেকে যে ক্ষমা লাভ করেছিলেন এবং সেই ক্ষমার কথা বর্ণনা করার ভাষায় মধ্যে যে স্নেহ ও করুণা ধারা প্রবাহিত হচ্ছে তার মূলে রয়েছে তাদের আন্তরিকতা৷ পঞ্চাশ দিনের কঠোর শাস্তি ভোগকালে তারা এ আন্তরিকতার প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন৷ ভূল করার পর যদি তারা অংহকার করতেন, নিজেদের নেতার অসন্তোষের জাবাবে ক্রোধ ও ক্ষোভের প্রকাশ ঘটাতেন, শাস্তিলাভের ফলে এমনই বিক্ষুদ্ধ হতেন যেমন স্বার্থবাদী লোকদের আত্মভিমানে আঘাত লাগলে বিক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে৷ সামাজিক বয়কটকালে দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে রাজি৷ কিন্তু নিজের আত্মভিমানকে আহত করতে রাজি নই- এ নীতি অবলম্বন করতেন এবং যদি এ সমগ্র শাস্তিকালে দলের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে বেড়াতেন এবং অসন্তুষ্ট ও বিক্ষুদ্ধ লোকদের খুঁজে বের করে এক সাথে মিলিয়ে জোটবদ্ধ করতেন, তাহলে তাদের ক্ষমা করা তো দূরের কথা বরং নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, দল থেকে তাদেরকে আলাদা করে দেয়া হতো এবং এ শাস্তির মেয়াদ শেষ হবার পর তাদের যোগ্য শাস্তিই তাদেরকে দেয়া হতো৷ তাদেরকে বলা হতো, যাও তোমরা নিজেদের অহম পূজায় লিপ্ত থাকো৷ সত্যের কালেমা বুলন্দ করার সংগ্রামে অংশ নেবার সৌভাগ্য তোমাদের আর কখনো হবে না৷

কিন্তু এ কঠিন পরীক্ষায় ঐ তিনজন সাহাবী এ পথ অবলম্বন করেননি, যদিও এ পথটি তাদের জন্য খোলা ছিল৷ তারা বরঞ্চ আমাদের আলোচিত পূর্বোক্ত পথ অবলম্বন করেছিলেন৷ এ পথ অবলম্বন করে তারা প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে, আল্লাহর আনুগত্যের নীতি তাদের হৃদয় থেকে পূজা ও বন্দনা করার মতো সকল মূর্তি অপসারিত করেছে৷ নিজেদের সমগ্র ব্যক্তি সত্তাকে তারা আল্লাহর পথে সাধনা করার জন্য নিয়োজিত করে দিয়েছে৷নিজেদের ফিরে যাবার নৌকাগুলোকে এমনভাবে জ্বালিয়ে দিয়ে ইসলামী জামায়াতে প্রবেশ করেছিলেন যে, পেছনে ফিরে যেতে চাইলেও আর ফেরার কোন জায়গা ছিল না৷ এখানেই মার খাবেন এবং এখানেই মরবেন৷ অন্য কোথাও কোন বৃহত্তম সম্মান ও মর্যাদা লাভের নিশ্চয়তা পেলেও এখানকার লাঞ্ছনা ত্যাগ করে তা গ্রহণ করতে এগিয়ে যাবেন না৷ এরপর তাদেরকে উঠিয়ে বূকে জড়িয়ে না ধরে আর কী করা যেতো? এ কারণেই আল্লাহ তাদের ক্ষমার কথা বলেছেন অত্যন্ত স্নেহমাখা ভাষায়৷ তিনি বলেছেনঃ আমি তাদের দিকে ফিরলাম যাতে তারা আমার দিকে ফিরে আসে৷ এ কয়েকটি শব্দের মাধ্যমে এমন একটি অবস্থার ছবি আঁকা হয়েছে যা থেকে বুঝা যায় যে, প্রভু আগে এ বান্দাদের দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়েছিলেন৷ কিন্তু যখন তারা পালিয়ে না গিয়ে ভগ্ন হৃদয়ে তারই দোরগাড়ায় বসে পড়লো তখন তাদের বিশ্বস্ততার চিত্র দেখে প্রভু নিজে আর স্থির থাকতে পারলেন না৷ প্রেমের আবেগে অধীর হয়ে তাকে দরজা থেকে উঠিয়ে নিয়ে যাবার জন্য তিনি নিজেই বের হয়ে এলেন৷