(৯:১০০) মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে থেকে যারা সবার আগে ঈমানের দাওয়াত গ্রহণ করার ব্যাপারে উদ্যোগী হয়েছে এবং যারা পরে নিষ্ঠা সহকারে তাদের অনুসরণ করছে আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে৷ আল্লাহ তাদের জন্য এমন বাগান তৈরী করে রেখেছেন যার নিম্নদেশে ঝরণাধারা প্রবাহিত হবে এবং তারা তার মধ্যে থাকবে চিরকাল৷ এটাই মহা সাফল্য৷
(৯:১০১) তোমাদের আশেপাশে যেসব বেদুইন থাকে তাদের মধ্যে রয়েছে অনেক মুনাফিক৷ অনুরূপভাবে মদীনাবাসীদের মধ্যেও রয়েছে এমন কিছু মুনাফিক, যারা মুনাফিকীতে পাকাপোক্ত হয়ে গেছে৷ তোমরা তাদেরকে চিন না, আমি চিনি তাদেরকে৷ ৯৭ শীঘ্রই আমি তাদেরকে দ্বিগুণ শাস্তি দেবো৷ ৯৮ তারপর আরো বেশী বড় শাস্তির জন্য তাদেরকে ফিরিয়া আনা হবে৷
(৯:১০২) আরো কিছু লোক আছে, যারা নিজেদের ভুল স্বীকার করে নিয়েছে৷ তাদের কাজকর্ম মিশ্র ধরনের কিছু ভাল, কিছু মন্দ৷ অসম্ভব নয়, আল্লাহ তাদের প্রতি আবার মেহেরবান হয়ে যাবেন৷ কারণ , তিনি ক্ষমাশীল ও করুণাময়৷
(৯:১০৩) হে নবী! তাদের ধন -সম্পদ থেকে সদকা নিয়ে তাদেরকে পাক পবিত্র করো, (নেকীর পথে) তাদেরকে এগিয়ে দাও এবং তাদের জন্য রহমতের দোয়া করো৷ তোমার দোয়া তাদের সান্তনার কারণ হবে৷ আল্লাহ সবকিছু শুনেন ও জানেন৷
(৯:১০৪) তারা কি জানে না, আল্লাহই তার বান্দাদের তাওবা কবুল করেন, তাদের দান -খয়রাত গ্রহণ করেন এবং আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, ও করুণাময়?
(৯:১০৫) আর হে নবী! তাদেরকে বলে দও, তোমরা কাজ করতে থাকো৷ আল্লাহ তার রসূল ও মুমিনরা তোমাদের কাজের ধারা এখন কেমন থাকে তা দেখবেন৷ ৯৯ তারপর তোমাদের তার দিকে ফিরিয়ে নেয়া হবে যিনি প্রকাশ্যে ও গোপনে সবকিছু জানেন এবং তোমরা কি করতে তা তিনি তোমাদের বলে দেবেন৷ ১০০
(৯:১০৬) অপর কিছু লোকের ব্যাপার এখনো আল্লাহর হুকুমের অপেক্ষায় আছে , তিনি চাইলে তাদেরকে শাস্তি দেবেন, আবার চাইলে তাদের প্রতি নতুন করে অনুগ্রহ করবেন৷ আল্লাহ সবকিছু জানেন তিনি জ্ঞানী ও সর্বজ্ঞ৷ ১০১
(৯:১০৭) আরো কিছু লোক আছে , যারা একটি মসজিদ নির্মাণ করেছে (সত্যের দাওয়াতকে) ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে , (আল্লাহর বন্দেগী করার পরিবর্তে) কুফরী কারার জন্য মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে এবং (এ বাহ্যিক ইবাদতগাহকে ) এমন এক ব্যক্তির জন্য গোপন ঘাটি বানাবার উদ্দেশ্যে যে ইতিপূর্বে আল্লাহ ও তার রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল৷ তারা অবশ্যি কসম খেয়ে বলবে , ভালো ছাড়া আর কোন ইচ্ছাই আমাদের ছিল না৷ কিন্তু আল্লাহ সাক্ষী , তারা একেবারেই মিথ্যেবাদী৷
(৯:১০৮) তুমি কখনো সেই ঘরে দাঁড়াবে না৷ যে মসজিদে প্রথম দিন থেকে তাকওয়ার ভিত্তেতে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল সেই মসজিদটি দাঁড়ানোরই (ইবাদতের জন্য) তোমার পক্ষে অধিকতর সমীচীন৷ সেখানে এমন লোক আছে যারা পাক -পবিত্র থাকা পছন্দ করে এবং আল্লাহ পবিত্রতা অর্জনকারীদেরকে ভালবাসেন৷ ১০২
(৯:১০৯) তাহলে তুমি কি মনে করো , যে ব্যক্তি আল্লাহ ভীতি ও তার সন্তুষ্টি অর্জনের উপর নিজের ইমারতের ভীত্তি স্থাপন করলো সে ভাল, না যে ব্যক্তি তার ইমারতের ভিত উঠালো একটি পতাকার স্থিতিহীন ফাঁপা প্রাণ্তের ওপর ১০৩ এবং তা তাকে নিয়ে সোজা জাহান্নামের আগুনে গিয়ে পড়লো? এ ধরনের জালেমদের কে আল্লাহ কখনো সোজা পথ দেখান না৷ ১০৪
(৯:১১০) তারা এই যে ইমারত নির্মাণ করেছে এটা সবসময় তাদের মনে সন্দেহের কারণ হয়ে থাকবে (যার বের হয়ে যাওয়ার আর কোন উপায়ই এখন নেই) যে পর্যন্ত না তাদের অন্তর ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়৷ ১০৫ আল্লাহ অত্যন্ত সচেতন ,জ্ঞানী ও সর্বজ্ঞ৷
৯৭. অর্থাৎ নিজেদের মুনাফিকী গোপন করার ব্যাপারে তারা এতই দক্ষতা অর্জন করেছে যে, নবী (সা)নিজেও তার অসাধারণ অন্তরদৃষ্টি, বুদ্ধিমত্তা, ও বিচক্ষণতা, সত্ত্বেও তাদেরকে চিনতে পারতেন না৷
৯৮. দ্বিগুণ শাস্তি মানে, হচ্ছে, একদিকে যে দুনিয়ার প্রেমে মত্ত হয়ে তারা ঈমান ও আন্তরিকতার পরিবর্তে মুনাফিকী, ভণ্ডামী, ও বিশ্বাসঘাতকতার নীতি অবলম্বন করছে তা তাদের হাতছাড়া হয়ে যাবে এবং তারা ধন -সম্পদ ,মর্যাদাও প্রতিপত্তি লাভের পরিবর্তে বরং শোচনীয় অমর্যাদা, লাঞ্ছনা, ও ব্যর্থতার শিকার হবে৷ অন্যদিকে তারা যে সত্যের দাওয়াতকে ব্যর্থ ও অসফল দেখতে এবং নিজেদের চালবাজীর মাধ্যমে নস্যাৎ করে দিতে চায় তা তাদের ইচ্ছা, ও প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাদের চোখের সামনে উন্নতি ও বিকাশ লাভ করতে থাকবে৷
৯৯. এখানে মিথ্যা ঈমানের দাবীদার ও গোনাহগার মুমিনের পার্থক্য, পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হয়েছে৷ যে ব্যক্তি ঈমানের দাবী করে,কিন্তু আসলে আল্লাহ, তাঁর রসূলও মুমিনের জামায়াতের ব্যাপারে আন্তরিক নয়, তার এ আন্তরিকতাহীনতার প্রমাণ যদি তার কার্যকলাপের মাধ্যমে পাওয়া যায়, তাহলে তার সাথে কঠোর ব্যবহার করা হবে৷ আল্লাহর পথে ব্যয় করার জন্য সে কোন সম্পদ পেশ করলে তা প্রত্যাখান করা হবে৷ সে মারা গেলে কোন মুসলমান তার জানাযার নামায পড়বে না৷ এবং তার গোনাহ মাফের জন্য দোয়াও করবে না, সে তার বাপ বা ভাই হলেও৷ অন্যদিকে যে ব্যক্তি সত্যিকার মুমিন কিন্তু এ সত্ত্বেও সে এমন কিছু কাজ করে বসেছে যা তার আন্তরিকাতাহীনতার প্রমাণ করে, এ ক্ষেত্রে সে যদি নিজের ভূল স্বীকার করে নেয় তাহলে তাকে মাফ করে দেয়া হবে৷ তার সদকা, দান -খয়রাত গ্রহণ করা হবে এবং তার ওপর রহমত নাযিলের জন্য দোয়াও করা হবে৷ এখন কোন ব্যক্তির আন্তরিকতাবিহীন কার্যকলাপের পরও তাকে নিছক একজন গোনাহগার মুমিন গণ্য করতে হলে তাকে তিনটি মানদণ্ডে যাচাই করতে হবে৷ আলোচ্য আয়াতে বর্ণিত এ মানদণ্ডগুলোর নিম্নরূপঃ

(১) নিজের ভুলের জন্য সে খোঁড়া অজুহাত ও মনগড়া ব্যাখ্যা পেশ করবে না৷ বরং যে ভুল হয়ে গেছে সহজ সরলভাবে তা মেনে নেবে৷

(২) তার আগের কার্যকলাপ দেখা হবে৷ সে আন্তরিকতাহীনতার দাগী ও অপরাধী কিনা তা যাচাই করা হবে ৷ যদি আহে সে ইসলামের জামায়াতের এক সৎ ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে থাকে এবং তার জীবনের সমস্ত কার্যকলাপে আন্তরিক সেবা, ত্যাগ, কুরবানী ও ভালো কাজে অগ্রবর্তী থাকার বেকর্ড থেকে থাকে, তাহলে ধরে নেয়া হবে, যে বর্তমানে যে ভুল সে করেছে তা ঈমান ও আন্তরিকতাহীনতার ফল নয় বরং তা নিছক সাময়িক সৃষ্ট একটি দুর্বলতা বা পদস্খলন ছাড়া আর কিছুই নয়৷

(৩) তার ভবিষ্যত কার্যকলাপের ওপর নজর রাখা হবে৷ দেখতে হবে, তার ভুলের স্বীকৃতি কি নিছক মৌখিক না তার মধ্যে লজ্জার গভীর অনুভূতি রয়েছে৷ যদি নিজের ভুল সংশোধনের জন্য তাকে অস্থির ও উৎকণ্ঠিত দেখা যায় এবং তার প্রতিটি কথা থেকে এ কথা প্রকাশ হয় যে, তার জীবনে যে ঈমানী ক্রটির চিত্র ভেসে উঠেছিল তাকে মুছে ফেলার ও তা সংশোধন করার জন্য সে প্রাণন্তকর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তাহলে সে যথাথই লজ্জিত হয়েছে বলে মনে করা হবে, এ লজ্জা ও অনুশোচনাই হবে তার ঈমান ও আন্তরিকতার প্রমাণ৷

মুহাদ্দিসগণ এ আয়াতগুলো নাযিলের পটভুমী হিসেবে যে ঘটনা বর্ণনা করেছেন তা থেকে এ বিষয়বস্তুটি আয়নার মতো স্বচ্ছ হয়ে ওঠে৷ তারা বলেন, এ আয়াতগুলো আবু লুবাবাহ ইবনে আবদুল মুনযির ও তার ছজন সাথীর প্রসংগে নাযিল হয়েছিল৷হিজরতের আগে আকাবার বাইআতের সময় যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন আবু লুবাবাহ ছিলেন তাদের একজন৷ বদর, ওহোদ ও অন্যান্য যুদ্ধে তিনি বারবার অংশ গ্রহন করেন৷ কিন্তু তাবুক যুদ্ধের সময মানসিক দুর্বলতার তার ওপর প্রধান্য বিস্তার করে এবং কোন প্রকার শরয়ী ওযর ছাড়াই তিনি ঘরে বসে থাকেন৷ তার অন্য সাথীরাও ছিলেন তারই মতো আন্তরিকতা সম্পন্ন৷ তারাও এ একই প্রকার দুর্বলতার শিকার হন৷ নবী (সা) যখন তাবুক যুদ্ধ থেকে ফিরে এলেন এবং যারা পিছনে থেকে গিয়েছিল তাদের সম্পর্কে আল্লাহ ও তার রসূলের মতামত কি তা তারা জানতে পারলেন তখন তারা ভীষণভাবে অনুতপ্ত হলেন৷ কোন প্রকার জিজ্ঞাসাবাদের আগেই তারা নিজেদেরকে একটি খুটির সাথে বেধে নেন এবং বলেন, আমাদের মাফ না করে দেয়া পর্যন্ত আমাদের জন্য আহার নিদ্রা হারাম৷ এ অবস্থায় আমাদের প্রাণ বায়ূ বের হয়ে গেলেও আমরা তার পরোয়া করবো না৷ কয়েক দিন পর্যন্ত এভাবেই তারা বাধা অবস্থায় অনাহার অনিদ্রায় কাটান৷ এমনকি একদিন তারা বেহুশ হয়ে পড়ে যান৷ শেষে তাদের জানানো হলো, আল্লাহ ও তার রসূল তোমাদের মাফ করে দিয়েছেন৷ তারা নবী (সা)কে বলেন, ঘরের যে আরাম আয়েশ আমাদের ফরয থেকে গাফেল করে দিয়েছিল তা এবং নিজেদের সমস্ত ধন সম্পদ আমরা আল্লাহর পথে দান করে দেবো, এটাও আমাদের তাওবার অন্তরভুক্ত৷ কিন্তু নবী (সা) বলেন, সমস্ত ধন -সম্পদ দান করে দেবার দরকার নেই, শুদুমাত্র এক তৃতীয়াংশই যথেষ্ট৷ তদনুসারে তখনই তারা সেগুলো আল্লাহর পথে ওয়াকফ করে দেন৷ এ ঘটনাটি বিশ্লেষণ করলে পরিষ্কার জানা যায় , কোন ধরনের দুর্বলতা আল্লাহ মাফ করেন৷ উল্লেখিত মহান সাহাবীগণ এ ধরনের আন্তরিকতাহীন আচরণে অভ্যস্ত ছিলেন না৷ বরং তাদের বিগত জীবনের কার্যকলাট তাদের ঈমানী নিষ্ঠা, আন্তরিকাতা ও দৃঢ়তার দৃষ্টিতে পরিপূর্ণ ছিল৷ এবারেও রসূল (সা) এর নিকট তাদের কেউ মিথ্যা অজুহাত পেশ করেননি৷ বরং নিজেদের ভুলকে নিজেরাই অকপটে ভুল হিসেবে স্বীকৃতি দেন৷ তারা ভুলের স্বীকারোক্তি সহকারে নিজেদের কার্য ধারার মাধ্যমে একথা প্রমাণ করে দিয়েছের যে, তারা যথাথই লজ্জিত হয়েছেন এবং নিজেদের গোনাহ মাফ করাবার জন্য অত্যন্ত অস্থির ও উদ্ধিগ্ন ৷

এখানে আলোচ্য আয়াতটিতে আর একটি মুল্যবান কথা বলা হয়েছে৷ সে কথাটি হচ্ছে, গোনাহ মাফের জন্য মুখ ও অন্তর দিয়ে তাওবা করার সাথে সাথে বাস্তাব কাজের মাধ্যমেও তাওবা করতে হবে৷ আর আল্লাহর পথে ধন -সম্পদ দান করা হচ্ছে বাস্তব তাওবার একটি পদ্ধতি৷ এভাবে নফসের মধ্যে যে দুষিত ময়লা আবর্জনা লালিত হচ্ছিল এবং যার কারণে মানুষ গোনাহে লিপ্ত হয়েছিল তা দূর হয়ে যায় এবং ভালো ও কল্যাণের দিকে ফিরে যাবার যোগ্যতা বেড়ে যায়৷ গোনাহ করার পর তা স্বীকার করার ব্যাপাটি এমন যেমন এক ব্যক্তি গর্তের মধ্যে পড়ে যায় এবং নিজের পড়ে যাওয়াটা সে অনুভব করতে পারে৷ তারপর নিজের গোনাহের ওপর তার লজ্জিত হওয়াটা এ অর্থ বহন করে যে, এ গর্তকে সে নিজের অবস্থানের জন্য বড়ই খারাপ জায়গা মনে করে-----------------
১০০. এর অর্থ হচ্ছে, চুড়ান্ত পর্যায়ে প্রতিটি বিষয় সম্পূর্ণরূপে স্বয়ং আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত৷ আর আল্লাহ এমন এক সত্তা যার কাছে কোন কিছু গোপন থাকতে পারে না৷ এ জন্য কোন ব্যক্তি দুনিয়ায় তার ভন্ডামী ও মুনাফিকী গোপন করতে সক্ষমও হয় এবং মানুষ যেসব মানদণ্ডে কারোর ঈমান ও আন্তরিকতা পরখ করতে পারে সেসবগুলোতে পুরোপুরি উত্তির্ণ হলেও একথা মনে করা উচিত নয়, যে সে মুনাফিকীর শাস্তি থেকে রেহাই পেয়ে গেছে৷
১০১. এদের ব্যাপরটি ছিল সন্দেহপূর্ণ৷ এদেরকে না মুনাফিক বলে চিহ্নিত করা যেতো আর না বলা যেতো গোনাহগার মুমিন৷ এ দুটি জিনিসের কোনটিরই আলামত তখনো তাদের মধ্যে পুরোপিরি ফুটে উঠেনি৷ তাই আল্লাহ তাদের ব্যাপারটি মুলতবী রাখেন৷ মুলতবী রাখার অর্থ এই নয় যে, আসলে আল্লাহর কাছেও তাদের ব্যাপারটি সন্দেহপূর্ণ ছিল৷ রবং এর অর্থ এই যে, কোন ব্যক্তি বা দলের ব্যাপারে মুসলমানদের নিজেদের কর্মপদ্ধতি নির্ধারনে অতিমাত্রায় তাড়াহুড়া করা চাই না৷ যতক্ষণ পর্যন্ত না এমন ধরনের আলামতের মাধ্যমে তার অবস্থান সুষ্পষ্ট হয়ে যায়, যা অদৃশ্য জ্ঞান দিয়ে নয় বরং যুক্তি ও অনুভুতি দিয়ে পরখ করা যেতে পারে, ততক্ষণ অপেক্ষা করা উচিত৷
১০২. নবী (সা) মদীনায় আগমনের আগে খাযরাজ গোত্রে আবু আমের নামে এক ব্যক্তি ছিল৷ জাহেলী যুগে সে খৃষ্টান রাহেবের (সাধু) মর্যাদা লাভ করেছিল৷ তাকে আহলে কিতাবদের আলেমদের মধ্যে বিশিষ্ট ব্যক্তি গণ্য করা হতো৷অন্যদিকে সাধুগিরির কারণে পণ্ডতি সুলভ মর্যাদার পাশাপাশি তার দরবেশীর প্রভাবও মদীনা ও আশেপাশের এলাকার অশিক্ষিত আরব সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল৷ নবী (সা) যখন মদীনায় পৌছলেন তখন সেখানে বিরাজ করছিল আবু আমেরের ধর্মীয় ও আধ্যত্মিক কতৃত্বের রমরমা অবস্থা৷ কিন্তু এ জ্ঞান ,বিদ্যাবত্তা ও দরবেশী তার মধ্যে সত্যানুসন্ধিৎসা ও সত্যকে চেনার মতো ক্ষমতা সৃষ্টি করার পরিবর্তে উল্টো তার জন্য একটি বিরাট অন্তরাল সৃষ্টি করলো৷ আর এ অন্তরাল সৃষ্টির ফলে রসূলের আগমণের পর সে নিজে ঈমানের নিয়ামত থেকে শুধু বঞ্চিতই রইল না ৷ বরং রসূলকে নিজের ধর্মীয় পৌরহিত্যের প্রতিদ্বন্দ্বি এবং নিজের দরবেশী ও সাধু বৃত্তিক কর্মকাণ্ডের শত্রু মনে করে তার ও তার সমুদয় কার্যক্রমের বিরোধিতায নেমে পড়লো৷ প্রথম দুবছর তার আশা ছিল কুরাইশী কাফেরদের শক্তি ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য যথেষ্ট প্রমাণিত হবে৷ কিন্তু বদরের যুদ্ধে কুরাইশরা চরমভাবে পরাজিত হলো৷ এ অবস্থায় সে আর নীরব থাকতে পারলো না৷ সেই বছরই সে মদীনা থেকে বের হয়ে পড়লো৷ সে কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্রের মধ্যে ইসলামের বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করলো৷ যেসব কুচক্রীর চক্রান্ত ও যোগসাজশে ওহোদ যুদ্ধ বাধে, তাদের মধ্যে এ আবু আমেরও অন্যমত৷ বলা হয়ে থাকে, ওহোদের যুদ্ধের ময়দানে সে অনেকগুলো গর্ত খুঁড়েছিল৷ এরই একটির মধ্যে পড়ে গিয়ে নবী (সা) আহত হয়েছিলেন৷ তারপর আহযাব যুদ্ধের সময় চারদিকে থেকে যে সেনাবাহী মদীনার ওপর আক্রমণ চালিয়েছিল তাকে আক্রমণে উস্কে দেয়ার ব্যাপারেও তার অগ্রনী ভুমিকা ছিল৷ এরপর হুনাইন যুদ্ধ পর্যন্ত আরব মুশরিকও মুসলমানদের মধ্যে যতগুলো যুদ্ধ হয়েছে সবগুলোতেই এ ঈসায়ী দরবেশ ইসলামের বিরুদ্ধে মুশরিক শক্তির সক্রিয় সহয়ক ছিল৷ শেষ পর্যন্ত আরবের কোন শক্তি ইসলামের অগ্রযাত্রা রুখে দিতে পারবে বলে তার আর আশা রইল না৷ কাজেই সে আরব দেশ ত্যাগ করে রোমে চলে যায় এবং আরব থেকে যে "বিপদ" মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল সে সম্পর্কে সে কাইসাকে (সীজার )অবহিত করে৷ এ সময়ই মদীনায় খবর পৌছে যে, কাইসার আরব আক্রমণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং এরই প্রতিবিধান করার জন্য নবী (সা) কে তাবুক অভিযান করতে হয়৷

ঈসায়ী রাহেব আবু আমেরের এ ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতায় তার সাথে শরীক ছিল মদীনার মুনাফিক গোষ্ঠির একটি দল৷ আবু আমেরকে তার ধর্মীয় প্রভাব ব্যবহার করে ইসলামের বিরুদ্ধে রোমের কাইসার ও উত্তরাঞ্চলের খৃষ্টান আরব রাজ্যগুলোর সামরিক সাহায্য লাভ করতেও এ মুনাঠিকরা তাকে পরামর্শ দেয় ও মদদ যোগায়৷ যখন সে রুমের পথে রওয়ানা হচ্ছিল তখন তার ও এ মুনাফিকদের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদিত হলো৷ এ চুক্তি অনুযায়ী স্থির হলো, যে মদীনায় তারা নিজেদের একটি পৃথক মসজিদ তৈরী করে নেবে৷ এভাবে সাধারণ মুসলমানদের থেকে আলাদা হয়ে মুনাফিক মুসলমানদের এমন একটি স্বতন্ত্র জোট গড়ে উঠবে যা ধর্মীয় আলখেল্লায় আবৃত থাকবে৷ তার প্রতি সহজে কোন প্রকার সন্দেহ করা যাবে না৷ সেখানে শুধু যে, মুনাফিকরাই সংঘটিত হবে এবং ভবিষ্যত কর্মপন্থা নির্ধারনের জন্য পরামর্শ করবে তা নয়৷বরং আবু আমেরের কাছ থেকে যেসব এজেন্ট খবর ও নির্দেশ নিয়ে আসবে তারাও সন্দেহের উর্ধে থেকে নিরীহ ফকীর ও মুসাফিরের বেশে এ মসজিদে অবস্থান করতে থাকবে৷ এ ন্যাক্করজনক ষড়যন্ত্রটির ভিত্তিতেই এ মসজিদ নির্মিত হয়েছিল এবং এরি কথা এ আয়াতে বলা হয়েছে৷

মদীনায় এ সময় দুটি মসজিদ ছিল৷ একটি মসজিদে কুবা৷ এটি ছিল নগর উপকণ্ঠে৷ অন্যটি ছিল মসজিদে নববী৷ শহরের অভ্যন্তরে ছিল এর অবস্থান৷ এ দুটি মসজিদ বর্তমান থাকা সত্ত্বেও তৃতীয় একটি মসজিদ নির্মাণ করার কোন প্রয়োজনই ছিল না৷ আর এটা কোন যুক্তিহীন ধর্মীয় আবেগের যুগ ছিল না যে, প্রয়োজন থাকুক ব না থাকুক মসজিদ নামে নিছক একটি ইমারত তৈরী করে দিলেই তখন নেকীর কাজ বলে মনে করা হবে৷বরং একটি নতুন মসজিদ তৈরী করার অর্থই ছিল মুসলমানদের জামায়াতের মধ্যে অনর্থক বিভেদ সৃষ্টি করা৷ একটি সত্যনিষ্ঠা ইসলামী ব্যবস্থা কোনক্রমেই এটা বরদাশত করতে পারে না৷ তাই তারা নিজেদের পৃথক মসজিত তৈরী কারার আগে তার প্রয়োজনের বৈধতা, প্রমাণ করতে বাধ্য ছিল৷ এ উদ্দেশ্যে তারা নবী (সা) এর সামনে এ নতুন নির্মাণ কাজের প্রয়োজন পেশ করে৷ এ প্রসঙ্গে তারা বলে, বৃষ্টি বাদলের জন্য এবং শীতের রাতে সাধারণ লোকদের বিশেষ করে উল্লেখিত দুটি মসজিদ থেকে দুরে অবস্থানকারী বৃদ্ধ, দুর্বল ও অক্ষম লোকদের প্রতিদিন পাঁচবার মসজিদে হাজিরা দেয়া কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় ৷ কাজেই আমরা শুধুমাত্র নামাযীদের সুবিধার্থে এ নতুন মসজিদটি নির্মাণ করতে চাই৷

মুখেএ পবিত্র ও কল্যাণমূসক বাসনার কথা উচ্চারণ করে যখন এ "দ্বিরার", (ক্ষতিকর) মসজিদটির নির্মাণ কাজ শেষ হলো তখন এ দুর্বৃত্তরা নবী (সা) এর দরবারে হাযির হলো এবং সেখানে একবার নামায পরিয়ে মসজিদটির উদ্বোধন করার জন্য তার কাছে আবেদন জানালো৷ কিন্তু আমি এখন যুদ্ধের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত আছি এবং শীঘ্রই আমাকে একটি বড় অভিযানে বের হতে হবে, সেখান থেকে ফিরে এসে দেখা যাবে, একথা বলে তিনি তাদের আবেদন এড়িয়ে গেলেন৷ এরপর তিনি তাবুক রওয়ানা হয়ে গেলেন এবং তার রওয়ানা হওয়ার পর এ মুনাফিকরা এ মসজিদে নিজেদের জোট গড়ে তূলতে এবং ষড়যন্ত্র পাকাতে লাগলো৷

এমন কি তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল, ওদিকে রোমানদের হাতে মুসলমানদের মুলোৎপাটনের সাথে সাথেই এদিকে এরা আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের মাথায় রাজ মূকূট পরিয়ে দেবে৷ কিন্তু তবুকের যা ঘটলো তাতে তাদের সে আশার গুড়ে বালি পড়লো৷ ফেরার পথে নবী (সা) যখন মদীনার নিকটবর্তী "যী আওয়ান" নামক স্থানে পৌছলেন তখন এ আয়াত নাযিল হলো৷ তিনি তখনই কয়েকজন লোককে মদীনায় পাঠিয়ে দিলেন৷ তাদেরকে দায়িত্ব দিলেন ,তার মদীনায় পৌছার আগেই যেন তারা দ্বিরার মসজিদটি ভেংগে ধুলিস্মাত করে দেয়৷
১০৩. এখানে কুরআনের মূল শব্দ হচ্ছে,----- (জুরুফ)৷ আরবী ভাষায় সাগর বা নদীর এমন কিনারাকে জুরুফ বলা হয় স্রোতের টানে যার তলা থেকে মাটি সরে গেছে এবং ওপরের অংশ কোন বুনিয়াদ ও নির্ভর ছাড়াই দাঁড়িয়ে আছে৷ যারা আল্লাহকে ভয় না করা এবং তার সন্তুষ্টির পরোয়া না করার ওপর নিজেদের কার্যক্রমের ভিত গড়ে তোলে, তাদের জীবন গঠনকে এখানে এমন একটি ইমারতের সাথে তুলনা করা হয়েছে৷ যা এমনি ধরনের একটি অন্তসরাশূন্য অস্থিতিশীল সাগর কিনারে নির্মাণ করা হয়েছে৷ এটি একটি নজীরবিহীন উপমা৷ এর চাইতে সুন্দরভাবে এ অবস্থার আর কোন চিত্র , আকা সম্ভব নয়৷ এর সমগ্র অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অনুধাবন করতে হলে বুঝে নিতে হবে যে, দুনিয়ার জীবনের যে উপরিভাগের ওপর মুমিন, মুনাফিক কাফের, সৎকর্মশীল, দূষ্কৃতকারী তথা সমস্ত মানুষ কাজ করে, তা মাটির উপরিভাগের স্তরের মতো যার ওপর দুনিয়ার সমস্ত ইমারত নির্মাণ করা হয়ে থাকে৷ এ স্তরের মধ্যে কোন স্থায়িত্ব ও স্থিতিশীলতা নেই৷ বরং এর নীচে নিরেট জমি বিদ্যমান থাকার ওপরই এর স্থিতিশীলতা নির্ভর করে৷ যে স্তরের নীচের মাটির কোন জিনিসের যেমন নদীর পানির তোড়ে ভেসে গেছে তার ওপর যদি কোন মানুষ (যে মাটির প্রকৃত অবস্থা জানে না ) বাহ্যিক অবস্থায় প্রতারিত হয়ে নিজের গৃহ নির্মাণ করে তাহলে তা তার গৃহসহ ধ্বসে পড়বে এবং সে কেবল নিজেই ধ্বংস হবে না৷ বরং এ অস্থিতিশীল ভিতের ওপর নির্ভর করে নিজের জীবনের যা কিছু পূঁজিপাট্রা সে সংশ্লিষ্ট গৃহের মধ্যে জমা করেছিল সবই এ সাথে ধ্বংস হয়ে যাবে৷ দুনিয়ার জীবনের এ বাহ্যিক স্তরটরও এ উপমাটির সাথে হুবহু মিল রয়েছে৷ এ স্তরটির ওপরই আমরা সবাই আমাদের জীবনের যাবতীয় কার্যক্রমের ইমারত নির্মাণ করি৷ অথচ এর নিজের কোন স্থিতি ও স্থায়িত্ব নেই৷ বরং আল্লাহর ভয় তার সামনে জবাবদিহির অনুভুতি এবং তার ইচ্ছা ও মর্জি মতো চলার শক্ত ও নিরেট পাথর খণ্ড তার নীচে বসানো থাকে , এরি ওপর তার মজবুতী ও স্থিতিশীলতা নির্ভর করে ৷ যে অজ্ঞ ও অপরিণামদর্শী মানুষ নিছক দুনিয়ার জীবনের বাহ্যিক দিকের ওপর ভরসা করে আল্লাহর ভয়ে ভীত না হয়ে এবং তার সন্তোষ লাভের পরোয়া না করে দুনিয়ায় কাজ করে যায় সে আসলে নিজের জীবন গঠনের বুনিয়াদ নীচে থেকেই অন্তসার শুণ্য করে দেয়৷ তার শেষ পরিণতি এ ছাড়া আর কিছুই নয়, যে ভিত্তিহীন যে উপরি স্তরের ওপর সে তার সারা জীবনের সঞ্চয় জমা করেছে৷ একদিকে অকস্মাৎ তা ধ্বসে পড়বে এবং তাকে তার জীবনের সমস্ত সম্পদসহ ধ্বংস ও বরবাদ করে দেবে৷
১০৪. সোজা পথ অর্থাৎ যে পথে মানুষ সফলকাম হয় এবং যে পথে অগ্রসর হয়ে সে যথার্থ সাফল্যের মনযিলে পৌছে যায়৷
১০৫. অর্থাৎ তারা মুনাফিক সূলভ ধোঁকা ও প্রতারণার বিরাট অপরাধ করে নিজেদের অন্তরকে চিরকালের জন্য ইমানী যোগ্যতা থেকে বঞ্চিত করেছে৷ বেঈমানী ও নাফরমানীর রোগ তাদের অন্তরের অন্তস্থলে অনুপ্রবেশ করেছে৷ যতদিন তাদের এ অন্তর থাকবে ততদিন এ রোগ ও সেখানে অবস্থান করবে৷ আল্লাহর হুকুম অমান্য করার জন্য যে ব্যক্তি প্রকাশ্যে মন্দির নির্মাণ করে অথবা তার দীনের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য ব্যরিকড ও ঘাটি তৈরী করে তার হেদায়াত ও কোন না কোন সময় সম্ভব ৷ কারণ তার মধ্যে ষ্পষ্টবাদিতা, আন্তরিকতা ও নৈতিক সাহসের সুক্ষতার উপাদন মৌলীকভাবে সংরক্ষিত রয়েছে৷ আর এ উপাদান সত্য ও ন্যায়ের পক্ষাবলম্বন করার জন্য ঠিক তেমনিভাবে কাজে লেগে যেমন মিথ্যা ও অন্যায়ের পক্ষাবলম্বন করার জন্য কাজে লাগে৷কিন্তু যে কাপুরুষ, মিথ্যুক ও প্রতারক আল্লাহর নাফরমাণী ও হুকুম অমান্য করার জন্য মসজিদে নির্মাণ করে এবং আল্লাহর দীনের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আল্লাহর পরস্তির প্রতারণামূলক পোশাক পরিধান করে, মুনাফিকীর ঘুণে তার চরিত্র কুরে কুরে খেয়ে ফেলেছে৷ আন্তরিকতার সাথে ঈমানের বোঝা বহন করার ক্ষমতা সে কোথা থেকে পাবে?