(৮৮:১) তোমার কাছে আচ্ছন্নকারী বিপদের খবর এসে পৌঁছেছে কি ?
(৮৮:২) কিছু চেহারা সেদিন হবে ভীত কাতর ,
(৮৮:৩) কঠোর পরিশ্রম রত , ক্লান্ত - পরিশ্রন্ত ৷  
(৮৮:৪) জ্বলন্ত আগুনে ঝলসে যেতে থাকবে৷ 
(৮৮:৫) ফুটন্ত ঝরণার পানি তাদেরকে দেয়া হবে পান করার জন্য৷ 
(৮৮:৬) তাদের জন্য কাঁটাওয়ালা শুকনো ঘাস ছাড়া আর কোন খাদ্য থাকবে না৷
(৮৮:৭) তা তাদেরকে পুষ্ট করবে না এবং ক্ষুধাও মেটাবে না৷ 
(৮৮:৮) কিছু চেহারা সেদিন আলোকোজ্জ্বল হবে৷ 
(৮৮:৯) নিজেদের কর্ম সাফল্যে আনন্দিত হবে৷
(৮৮:১০) উচ্চ মর্যাদার জান্নাতে অবস্থান করবে৷ 
(৮৮:১১) সেখানে কোন বাজে কথা শুনবে না৷
(৮৮:১২) যেখানে থাকবে বহমান ঝরণাধারা ৷ 
(৮৮:১৩) সেখানে উঁচু আসন থাকবে , 
(৮৮:১৪) পানপাত্রসমূহ থাকবে ৷
(৮৮:১৫) সারি সারি বালিশ সাজানো থাকবে 
(৮৮:১৬) এবং উৎকৃষ্ট বিছানা পাতা থাকবে৷ 
(৮৮:১৭) (এরা মানছে না ) তাহলে কি এরা উটগুলো দেখছে না , কিভাবে তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে ? 
(৮৮:১৮) আকাশ দেখছে না , কিভাবে তাকে উঠানো হয়েছে ? 
(৮৮:১৯) পাহাড়গুলো দেখছে না , কিভাবে তাদেরকে শক্তভাবে বসানো হয়েছে ? 
(৮৮:২০) আর যমীনকে দেখছে না ,কিভাবে তাকে বিছানো হয়েছে ?
(৮৮:২১) বেশ (হে নবী ) তাহলে তুমি উপদেশ দিয়ে যেতে থাকো ৷ তুমি তো শুধু মাত্র একজন উপদেশক, 
(৮৮:২২) এদের উপর বল প্রয়োগকারী নও ৷
(৮৮:২৩) তবে যে ব্যক্তি মুখ ফিরিয়ে নেবে এবং অস্বীকার করবে, 
(৮৮:২৪) আল্লাহ তাকে মহাশাস্তি দান করবেন ৷ 
(৮৮:২৫) অবশ্যি এদের আমার কাছেই ফিরে আসতে হবে ৷ 
(৮৮:২৬) তারপর এদের হিসেব নেয়া হবে আমারই দায়িত্ব ৷  
১. এর অর্থ হচ্ছে কিয়ামত৷ অর্থাৎ যে বিপদটা সারা পৃথিবীকে আচ্ছন্ন করে ফেলবে৷ এ প্রসংগে একটি কথা অবশ্যি সামনে রাখতে হবে৷ এখানে সামগ্রিকভাবে আখেরাতের কথা বলা হচ্ছে ৷ বিশ্ব ব্যবস্থাপনা ভেঙ্গে পড়ার সূচনা থেকে শুরু করে সমস্ত মানুষের আবার জীবিত হয়ে ওঠা এবং আল্লাহর দরবারে শাস্তি ও পুরস্কার লাভ করা পর্যন্ত সমগ্র পর্যায়টি এর অন্তরভুক্ত ৷
২. চেহারা শব্দটি এখানে ব্যক্তি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে৷ মানুষের শরীরের সবচেয়ে উল্লেখ যোগ্য ও সবচেয়ে সুস্পষ্ট অংশ হচ্ছে তার চেহারা ৷ এর মাধ্যমে তার ব্যক্তিত্বের পরিচিতি ফুটে ওঠে৷মানুষ ভালো-মন্দ যে অবস্থারই সম্মুখীন হয়, তার প্রকাশ ঘটে তার চেহারায় ৷ তাই "কিছু লোক"না বলে "কিছু চেহারা" বলা হয়েছে ৷
৩. কুরআন মজীদে কোথাও বলা হয়েছে , জাহান্নামের অধিবাসীদের খাবার জন্য ' যাককুম ' দেয়া হবে৷ কোথাও বলা হয়েছে , " গিসলীন " ( ক্ষতস্থান থেকে ঝরে পড়া তরল পদার্থ ) ছাড়া তাদের আর কোন খাবার থাকবে না৷ আর এখানে বলা হচ্ছে , তারা খাবার জন্য কাঁটাওয়ালা শুকনো ঘাস ছাড়া আর কিছুই পাবে না৷ এ বর্ণনাগুলোর মধ্যে মূলত কোন বৈপরীত্য নেই৷ এর অর্থ এও হতে পারে যে , জাহান্নামের অনেকগুলো পর্যায় থাকবে ৷ বিভিন্ন ধরনের আযাব দেয়া হবে৷ আবার এর অর্থ এও হতে পারে যে , তারা " যাককুম " খেতে না চাইলে " গিসলীন " পাবে এবং তা খেতে অস্বীকার করলে কাঁটাওয়ালা ঘাস ছাড়া আর কিছুই পাবে না৷ মোটকথা , তারা কোন মনের মতো খাবার পাবে না৷
৪. অর্থাৎ দুনিয়ায় তারা যেসব প্রচেষ্টা চালিয়ে ও কাজ করে এসেছে আখেরাতে তার চমৎকার ফল দেখে তারা আনন্দিত হবে৷ তারা এ ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়ে যাবে যে , দুনিয়ায় ঈমান , সততা ও তাকওয়ার জীবন অবলম্বন করে তারা নিজেদের প্রবৃত্তি ও কামনা - বাসনার যে কুরবানী দিয়েছে , দায়িত্ব পালন করার ব্যাপারে যে কস্ট স্বীকার করেছে , আল্লাহর বিধানের আনুগত্য করতে গিয়ে যেসব জুলুম নিপীড়নের শিকার হয়েছে , গোনাহ থেকে বাঁচতে দিয়ে যেসব ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এবং যেসব স্বার্থ ও স্বাদ আস্বাদন থেকে নিজেকে বঞ্চিত করেছে তা সবই আসলে বড়ই লাভজনক কারবার ছিল৷
৫. এটিকেই কুরআনের বিভিন্ন স্থানে জান্নাতের নিয়ামতের মধ্যে একটি বড় নিয়মত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে৷ ( ব্যাখ্যার জন্য দেখন তাফহীমুল কুরআন , সূরা মারয়াম ৩৮ টীকা , আততুর ১৮ টীকা , আল ওয়াক্বিয়াহ ১৩ টীকা , এবং আন নিসা ২১ টীকা ৷
৬. তাদের সামনে সবসময় পানপাত্র ভরা থাকবে৷ চেয়ে বা ডাক দিয়ে আনিয়ে নেবার প্রয়োজন হবে না৷
৭. অর্থাৎ আখেরাতের কথা শুনে এরা যদি বলে , এসব কিছু কেমন করে হতে পারে , তাহলে নিজেদের চারপাশের জগতের প্রতি একবার দৃষ্টি বুলিয়ে এরা কি কখনো চিন্তা করেনি , এই উট কেমন করে সৃষ্টি হলো ? আকাশ কেমন করে বুলন্দ হলো ? পাহাড় কেমন করে প্রতিষ্ঠিত হলো ? এই পৃথিবী কেমন করে বিস্তৃত হলো ? এসব জিনিস যদি তৈরি হতে পারে এবং তৈরি হয়ে এদের সামনে বর্তমান থাকতে পারে , তাহলে কিয়ামত কেন আসতে পারবে না ? আখেরাতে আর একটা নতুন জগত তৈরি হতে পারবে না কেন ? জান্নাত ও জাহান্নাম হতে পারবে না কেন ? দুনিয়ায় চোখ মেলেই যেসব জিনিস দেখা যায় সেগুলো সম্পর্কে যে ব্যক্তি মনে করে যে , সেগুলোর অস্তিত্ব লাভ তো সম্ভবপর৷ কারণ সেগুলো অস্তিত্ব লাভ করেছে কিন্তু যেসব জিনিস এখনো তার দৃষ্টিতে পড়েনি এবং সেগুলো সম্পর্কে এখনো সে কোন অভিজ্ঞতা অর্জন করেনি , সেগুলো সম্পর্কে যদি সে এক কথায় বলে দেয় যে , সেগুলোর অস্তিত্ব লাভ সম্ভব নয় , তাহলে তাকে বুদ্ধি- বিবেকহীন ও চিন্তাশক্তি বিবর্জিত ব্যক্তিই মনে করা হবে ৷ তার মস্তিস্কে যদি একটুও বুদ্বি থাকে তাহলে তার অবিশ্য চিন্তা করা উচিত যে, যা কিছু বর্তমান আছে এবং অস্তিত্ব লাভ করেছে সেগুলোইবা কেমন করে অস্তিত্ব লাভ করলো ? আরবের মরু এলাকার অধিবাসীদের জন্য যে ধরনের বৈশিষ্ট ও গুণাবলীসম্পন্ন প্রাণীর প্রয়োজন এই উটগুলো কেমন করে সেসব বৈশিষ্ট ও গুণাবলী সম্পন্ন হলো ? এই আকাশ কেমন করে তৈরি হলো , যার শূন্য পেট শ্বাস নেবার জন্য জন্য বাতাসে ভরা ? যার মেঘমালা বৃষ্টিবহন করে আনে ? যার সূর্য দিনে আলো ও তাপ দেয় ? যার চাঁদ ও তারা রাতের আকাশে আলো ছড়ায় ? পৃথিবীর এই বিস্তীর্ণ ক্ষেত্র , যেখানে মানুষ বসবাস করে , যেখানে উৎপাদিত শস্য ও ফলমূল তার খাদ্য প্রয়োজন পূর্ণ করে , যার নদী ও কূপের পানির ওপর তার জীবন নির্ভরশীল তাকে কিভাবে বিছানায় মতো ছড়িয়ে দেয়া হলো ? রং বে রঙের মাটি ও পাথর এবং বিভিন্ন খনিজ পদার্থ নিয়ে এ পাহাড়গুলো পৃথিবীর বুকে কিভাবে গজিয়ে উঠেছে? এসব কিছুই কি একজন মহাশক্তিশালী ও বিজ্ঞ স্রষ্টার সৃষ্টি কৌশল চাড়া এমনিই তৈরি হয়ে গেছে ? কোন চিন্তাশীল বিবেকবান ব্যক্তি এই প্রশ্নের নেতিবাচক জবাব দিতে পারেন না ৷ তিনি যদি জেদী ও হঠধর্মী না হয়ে থাকেন , তাহলে তাকে অবশ্যি মানতে হবে , কোন মহাশক্তিধর ও মহাবিজ্ঞ সত্তা এগুলোকে সম্ভবপর না করলে এগুলোর প্রত্যেকটি অসম্ভব ছিল৷ আর একজন সর্বশক্তিমানের শক্তির জোরে যদি দুনিয়ার এসব জিনিস তৈরি হওয়া সম্ভবপর হয়ে থাকে তাহলে ভবিষ্যতে যে জিনিসগুলোর অস্তিত্ব লাভের খবর দেয়া হচ্ছে সেগুলোকে অসম্ভব মনে করার কোন যুক্তিসংগত কারণ নেই৷
৮. অর্থাৎ ন্যায়সংগত যুক্তি মানতে যদি কোন ব্যক্তি প্রস্তুত না হয় , তাহলে মানা না মানা তার ইচ্ছা তবে তোমাকে এই দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়নি যে , যে ব্যক্তি মানতে প্রস্তুত নয় তাকে জবরদস্তি মানাতে হবে৷ তোমার কাজও কেবল এতটুকু : লোকদেরকে ভুল ও সঠিক এবং সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য জানিয়ে দাও৷ তাদেরকে ভুল পথে চলার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করো৷ কাজেই এ দায়িত্ব তুমি পালন করে যেতে থাকো৷