(৮২:১) যখন আকাশ ফেটে যাবে ,
(৮২:২) যখন তারকারা চারদিকে বিক্ষিপ্ত হয়ে যাবে ,
(৮২:৩) যখন সমুদ্র ফাটিয়ে ফেলা হবে
(৮২:৪) এবং যখন কবরগুলো খুলে ফেলা হবে,
(৮২:৫) তখন প্রত্যেক ব্যক্তি তার সামনের ও পেছনের সবকিছু জেনে যাবে ৷
(৮২:৬) হে মানুষ ! কোন জিনিষ তোমাকে তোমার মহান রবের ব্যাপারে ধোঁকায় ফেলে রেখেছে ,
(৮২:৭) যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন , তোমাকে সুঠাম ও সুসামঞ্জস্য করে গড়েছেন
(৮২:৮) এবং যে আকৃতিতে চেয়েছেন তোমাকে গঠন করেছেন ৷
(৮২:৯) কখনো না, বরং ( আসল কথা হচ্ছে এই যে ) , তোমরা শাস্তি ও পুরস্কারকে মিথ্যা মনে করছো৷
(৮২:১০) অথচ তোমাদের ওপর পরিদর্শক নিযুক্ত রয়েছে ,
(৮২:১১) এমন সম্মানিত লেখকবৃন্দ ,
(৮২:১২) যারা তোমাদের প্রত্যেকটি কাজ জানে৷
(৮২:১৩) নিসন্দেহে নেক লোকেরা পরমানন্দে থাকবে
(৮২:১৪) আর পাপীরা অবশ্যি যাবে জাহান্নামে ৷
(৮২:১৫) কর্মফলের দিন তারা তার মধ্যে প্রবশ করবে
(৮২:১৬) এবং সেখান থেকে কোনক্রমেই সরে পড়তে পারবে না৷
(৮২:১৭) আর তোমরা কি জানো , ঐ কর্মফল দিনটি কি ?
(৮২:১৮) হাঁ , তোমরা কি জানো , ঐ কর্মফল দিনটি কি ?
(৮২:১৯) এটি সেই দিন যখন কারোর জন্য কোন কিছু করার সাধ্য কারোর থাকবে না ৷ ফায়সালা সেদিন একমাত্র আল্লাহর ইখতিয়ারে থাকবে৷
১. সূরা তাকভীরে বলা হয়েছে , সমুদ্রগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হবে এবং এখানে বলা হয়েছে , সমুদ্রগুলোকে ফাটিয়ে ফেলা হবে ৷ এই উভয় আয়াতকে মিলিয়ে দেখলে একটি বিশেষ এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং একই সময় সারা দুনিয়াকে প্রচণ্ডভাবে আলোড়িত করে দেবে , এ বিষয়টিকেও সামনে রাখলে সমুদ্রগুলোর ফেটে চৌচির হয়ে যাওয়ার ও তার মধ্যে আগুন লেগে যাবার প্রকৃত অবস্থাটি আমরা অনুধাবন করতে পারি৷ আমরা বুঝতে পারি , প্রথমে ঐ মহাভূমিকম্পনের ফলে সমুদ্রের তলদেশ ফেটে যাবে এবং সমুদ্রের পানি ভূগর্ভের অভ্যন্তরভাগে নেমে যেতে থাকবে যেখানে সর্বক্ষণ প্রচণ্ড গরম লাভা টগবগ করে ফুটছে ৷ এই গরম লাভার সাথে সংযুক্ত হবার পানি তার প্রাথমিক অবস্থায় অর্থাৎ প্রাথমিক দু'টি মৌলিক উপাদান অক্সিজেন ও হাইড্রোজেনে পরিণত হবে৷ এর মধ্যে অক্সিজেন আগুন জ্বালানোয় সাহায্য করে এবং হাইড্রোজেন নিজে জ্বলে উঠে৷ এভাবে প্রাথমিক মৌলিক উপাদানে পরিণত হওয়া ও আগুন লেগে যাওয়ার একটি ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া ( chine reaction) চলতে থাকবে৷ এভাবে দুনিয়ার সবগুলো সাগরে আগুন লেগে যাবে ৷ এটা আমাদের তাত্ত্বিক পর্যালোচনা ভিত্তিক অনুমান৷ তবে এর সঠিক জ্ঞান আল্লাহ ছাড়া আর করোর নেই৷
২. প্রথম তিনটি আয়াতে কিয়ামতের প্রথম পর্বের উল্লেখ করা হয়েছে এবং এই আয়াতে দ্বিতীয় পর্বের কথা বলা হয়েছে৷ কবর খুলে ফেলার মানে হচ্ছে, মানুষকে আবার নতুন করে জীবিত করে উঠানো৷
৩. আসল শব্দ হচ্ছে ( আরবী ) এ শব্দগুলোর কয়েকটি অর্থ হতে পারে এবং সবগুলো অর্থই এখানে প্রযোজ্য৷ যেমন (১) যে ভালো ও মন্দ কাজ করে মানুষ আগে পাঠিয়ে দিয়েছে তাকে ( আরবী ----) এবং যেগুলো করতে সে বিরত থেকেছে তাকে ( আরবী ----) বলা যায়৷ এ দিক দিয়ে এ শব্দগুলো ইংরেজী Commission বা omission এর মতো একই অর্থবোধক৷ (২) যা কিছু প্রথমে করেছে তা ( আরবী ------) এবং যা কিছু পরে করেছে তা ( আরবী ) এর অন্তরভুক্ত ৷ অর্থাৎ সম্পাদনের ধারাবাহিকতা ও তারিখ অনুসারে মানুষের প্রত্যেকটি কাজের হিসেব সম্বলিত আমলনামা তার সামনে এসে যাবে ( ৩ ) যেসব ভালো বা মন্দ কাজ মানুষ তার জীবনে করেছে সেগুলো ( আরবী --------) এর অন্তরভুক্ত৷ এ মানুষের সামাজে এসব কাজের যে প্রভাব ও ফলাফল সে নিজের পেছনে রেখে এসেছে সেগুলো ( আরবী -------------------) এর অন্তরভুক্ত৷
৪. অর্থাৎ প্রথমে তো তোমার উচিত ছিল সেই পরম করুণাময় ও অনুগ্রহকারীর অনুগ্রহ লাভ করে তাঁর শোকরগুজারী করা এবং তাঁর সমস্ত হুকুম মেনে চল৷ তাঁর নাফরমানী করতে গিয়ে তোমার লজ্জিত হওয়া উচিত ছিল৷ কিন্তু নিজের যাবতীয় যোগ্যতা ও কর্মক্ষমতাকে তুমি নিজের কৃতিত্ব মনে করার ধোঁকায় পড়ে গেছো৷ তোমাকে যিনি অস্তিত্বদান করেছেন তাঁর অনুগ্রহের স্বীকৃতি দেবার চিন্তা তোমার মনে একবারও উদয় হয় না৷ দ্বিতীয়ত, দুনিয়ার তুমি যা ইচ্ছে করে ফেলতে পারো , এটা তোমার রবের অনুগ্রহ৷ তবে কখনো এমন হয়নি যে , যখনই তুমি কোন ভুল করেছো অমনি তিনি তোমাকে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত করে বিকল করে দিয়েছেন৷ অথবা তোমার চোখ অন্ধ করে দিয়েছেন বা তোমাকে বজ্রপাতে হত্যা করেছেন৷ কিন্তু তাঁর এ অনুগ্রহ ও কোমলতাকে তুমি দুর্বলতা ভেবে বসেছো৷ এবং তোমার আল্লাহর উলুহিয়াতে ইনসাফের নামগন্ধও নেই মনে করে নিজেকে প্রতারিত করেছো৷
৫. অর্থাৎ এই ধরনের ধোঁকা খেয়ে যাওয়ার কোন যুক্তিসংগত কারণ নেই৷‌ তোমার অস্তিত্ব নিজেই ঘোষণা করছে যে, তুমি নিজে নিজেই সৃষ্টি হয়ে যাওনি৷ তোমার বাপ মাও তোমাকে সৃষ্টি করেনি৷ তোমার মধ্যে যেসব উপাদান আছে সেগুলো নিজে নিজে একত্র হয়ে যাওয়ার ফলেও ঘটনাক্রমে তুমি মানুষ হিসেবে তৈরী হয়ে যাওনি৷ বরং এক মহাজ্ঞানী ও মহাশক্তিধর আল্লাহ তোমাকে এই পূর্ণাঙ্গ মানবিক আকৃতি দান করেছেন৷ তোমার সামনে সব রকমের প্রাণী রয়েছে , তাদের মোকাবিলায় তোমার সবচেয়ে সুন্দর শারীরিক কাঠামো এবং শ্রেষ্ঠ ও উন্নত শক্তি একেবারেই সুস্পষ্ট৷ বুদ্ধির দাবী তো এই ছিল , এসব কিছু দেখে কৃতজ্ঞতায় তোমার মাথা নত হয়ে যাবে এবং সেই মহান রবের মোকাবিলায় তুমি কখনো নাফরমানী করার দুঃসাহস করবে না৷ তুমি এও জানো যে , তোমার রব কেবলমাত্র রহীম ও করীম করুণাময় ও অনুগ্রহশীলই নন , তিনি জব্বার ও কাহ্‌হার - মহাপরাক্রমশালী এবং কঠোর শাস্তি দানকারীও ৷ তাঁর পক্ষ থেকে যখন কোন ভূমিকম্প , তুফান বা বন্যা আসে তখন তার প্রতিরোধের জন্য তোমরা যতই ব্যবস্থা অবলম্বন করো না কেন সবকিছুই নিস্ফল হয়ে যায়৷ তুমি একথা ও জানো , তোমার রব মূর্খ অজ্ঞ নন বরং তিনি মহাজ্ঞানী ও মহাবিজ্ঞ৷ জ্ঞান ও বিজ্ঞতার অপরিহার্য দাবী হচ্ছে এই যে , যাকে বুদ্ধি জ্ঞান দান করা হবে তাকে তার কাজের জন্য দায়ীও করতে হবে৷ যাকে ক্ষমতা ইখতিয়ার দেয়া হবে সেই ক্ষমতা ইখতিয়ার সে কিভাবে ব্যবহার করেছে তার হিসেবও তার কাজ থেকে নিতে হবে৷ যাকে নিজ দায়িত্বে সৎ ও অসৎকাজ করার ক্ষমতা দেয়া হবে তাকে তার সৎকাজের জন্য পুরস্কার ও অসৎকাজের জন্য শাস্তি ও দিতে হবে৷ এসব সত্য তোমার কাছে দিনের আলোর মতো সুস্পষ্ট৷ তাই তোমার মহান রবের পক্ষ থেকে তুমি যে ধোঁকায় পড়ে গেছো তার পেছনে কোন যুক্তিসংগত কারণ রয়েছে , একথা তুমি বলতে পারবে না৷ তুমি নিজে যখন কারোর কর্মকর্তা হবার দায়িত্ব পালন করে থাকো তখন তোমার নিজের অধীন ব্যক্তি যদি তোমার ভদ্রতা ও কোমল ব্যবহারকে দুর্বলতা মনে করে তোমার মাথায় চড়ে বসে , তাহলে তখন তুমি তাকে নীচ প্রকৃতির বলে মনে করে থাকো৷ কাজেই তোমার প্রকৃতি একথা সাক্ষ দেবার জন্য যথেষ্ট যে , প্রভুর দয়া , করুণা ও মহানুভবতার কারণে তার চাকর ও কর্মচারীর কখনো তার মোকাবিলায় দুঃসাহসী হয়ে যাওয়া উচিত নয়৷ তার এ ভুল ধারণা পোষণ করা উচিত নয় যে , সে যা ইচ্ছা তাই করে যাবে এবং এ জন্য কেউ তাকে পাকড়াও করতে ও শাস্তি দিতে পারবে না৷
৬. অর্থাৎ যে জিনিসটি তোমাকে ধোঁকায় ফেলে দিয়েছে তার পেছনে আসলে কোন শক্তিশালী যুক্তি নেই৷ বরং দুনিয়ার এই কর্মজগতের পরে আর কোন কর্মফল জগত নেই , নিছক তোমার এ নির্বোধ ধারণাই এর পেছনে কাজ করেছে৷ এ বিভ্রান্ত ও ভিত্তিহীন ধারণাই তোমাকে আল্লাহ থেকে গাফেল করে দিয়েছে৷ এরি ফলে তুমি আল্লাহর ন্যায় বিচারের ভয়ে ভীত হও না এবং এটিই তোমার নৈতিক আচরণকে দায়িত্বহীন বানিয়ে দিয়েছে ৷
৭. অর্থাৎ তোমরা চাইলে কর্মফল দিবসকে অস্বীকার করতে পারো , তাকে মিথ্যা বলতে পারো , তার প্রতি বিদ্রূপবাণ নিক্ষেপ করতে পারো কিন্তু এতে প্রকৃত সত্য বদলে যাবে না৷ প্রকৃত সত্য হচ্ছে এই যে , তোমাদের রব এই দুনিয়ায় তোমাদেরকে লাগামহীনভাবে ছেড়ে দেননি৷ বরং তিনি তোমাদের প্রত্যেকের ওপর অত্যন্ত সত্যনিষ্ঠ তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করে রেখেছেন৷ তারা নিরপেক্ষভাবে তোমাদের সমস্ত ভালো ও মন্দ কাজ রেকর্ড করে যাচ্ছে৷ তোমাদের কোন কাজ তাদের দৃষ্টির অগোচরে থাকছে না৷ তোমরা অন্ধকারে , একান্ত নির্জনে , জনমানবহীন গভীর জংগলে অথবা এমন যে কোন অবস্থায় কোন কাজ করে থাকলে যে সম্পর্কে তোমরা পূর্ণ নিশ্চিন্ত থাকছো যে , তা সকল সৃষ্টি অগোচরে রয়ে গেছে , তারপরও তা তাদের কাছ থেকে গোপন থাকছে না৷ এই তত্ত্ববধায়ক ফেরেশতাদের জন্য আল্লাহ " কিরামান কাতেবীন " শব্দ ব্যবহার করেছেন ৷ অর্থাৎ লেখকবৃন্দ যারা করীম ( অত্যন্ত সম্মানিত ও মর্যাদাবান)৷ তাদের কারোর সাথে ব্যক্তিগত ভালোবাসা বা শত্রুতা নেই৷ ফলে একজনের প্রতি অন্যায় পক্ষপাতিত্ব এবং অন্যজনের অযথা বিরোধিতা করে সত্য বিরোধী ঘটনা রের্কড করার কোন অবকাশই সেখানে নেই৷ তারা খেয়ানতকারীও নয়৷ ডিউটি ফাঁকি দিয়ে নিজেদের তরফ থেকে খাতায় উল্টো সিধে লিখে দেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়৷ তারা ঘুষখোরও নয়৷ নগদ কিছু নিয়ে কারো পক্ষে বা কারো বিপক্ষে মিথ্যা রিপোর্ট দেবার কোন প্রশ্নই তাদের ব্যাপারে দেখা দেয় না৷ এসব যাবতীয় নৈতিক দুর্বলতা থেকে তারা মুক্ত ৷ তারা এসবের অনেক উর্ধে ৷ কাজেই সৎ ও অসৎ উভয় ধরনের মানুষের নিশ্চিত থাকা উচিত যে , তাদের প্রত্যেকের সৎকাজ হুবুহু রেকর্ড হবে এবং কারোর ঘাড়ে এমন কোন অসৎকাজ চাপিয়ে দেয়া হবে না , যা সে করেনি৷ তারপর এই ফেরেশতাদের দ্বিতীয় যে গুণটি বর্ণনা করা হয়েছে তা হচ্ছে : " তোমরা যা কিছু করো তা তারা জানে ৷" অর্থাৎ তাদের অবস্থা দুনিয়ার সি, আই , ডি ও তথ্য সরবরাহ এজেন্সিগুলোর মতো নয় ৷ সব রকমের প্রচেষ্টা ও সাধ্য - সাধনার পরও অনেক কথা তাদের কাছ থেকে গোপন থেকে যায়৷ কিন্তু এ ফেরেশতারা প্রত্যেক ব্যক্তির প্রত্যেকটি কাজ সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত৷ সব জায়গায় সব অবস্থায় সকল ব্যক্তির সাথে তারা এমন ভাবে লেগে আছে যে , তারা জানতেই পারছে না যে, কেউ তাদের কাজ পরিদর্শন করছে৷ কোন ব্যক্তি কোন নিয়তে কি কাজ করেছে তাও তারা জানতে পারে৷ তাই তাদের তৈরি করা রেকর্ড একটি পূর্ণাংগ রেকর্ড৷ এই রেকর্ডের বাইরে কোন কথা নেই৷ এ সম্পর্কেই সূরা কাহাফের ৪৯ আয়াতে বলা হয়েছে : কিয়ামতের দিন অপরাধীরা অবাক হয়ে দেখবে তাদের সামনে যে আমলনামা পেশ করা হচ্ছে তার মধ্যে তাদের ছোট বড় কোন একটি কাজও অলিখিত থেকে যায়নি৷ যা কিছু তারা করেছিল সব হুবহু ঠিক তেমনিভাবেই তাদের সামনে আনা হয়েছে৷
৮. অর্থাৎ কাউকে সেখানে তার কর্মফল ভোগ করার হাত থেকে নিস্কৃতি দান করার ক্ষমতা কারোর থাকবে না৷ কেউ সেখানে এমন প্রভাবশালী বা আল্লাহর প্রিয়ভাজন হবে না যে , আল্লাহর আদালতে তাঁর রায়ের বিরুদ্ধে বেঁকে বসে একথা বলতে পারে , উমুক ব্যক্তি আমার আত্মীয় , প্রিয় বা আমার সাথে সম্পর্কিত , কাজেই দুনিয়ায় সে যত খারাপ কাজ করে থাকুক না কেন তাকে তো মাফ করতেই হবে৷