(৮:৬৫) হে নবী! মুমিনদেরকে যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করো৷ তোমাদের মধ্যে বিশজন সবরকারী থাকলে তার দুশ জনের ওপর বিজয়ী হবে৷ আর যদি এমনি ধরনের একশ জন থাকে তাহলে তারা সত্য অস্বীকারকারীদের মধ্যে থেকে এক হাজার জনের ওপর বিজয়ী হবে৷ কারণ তারা এমন এক ধরনের লোক যাদের বোধশক্তি নেই৷ ৪৭
(৮:৬৬) বেশ, এখন আল্লাহ তোমাদের বোঝা হালকা করে দিয়েছেন৷ এবং তিনি জেনেছেন যে এখনো তোমাদের মধ্যে দুর্বলতা রয়েছে৷ কাজেই যদি তোমাদের মধ্যে একশ জন সবরকারী হয় তাহলে তারা দুশ জনের ওপর এবং এক হাজার লোক এমনি পর্যায়ের হলে তারা দুহাজারের ওপর আল্লাহর হুকুমে বিজয়ী হবে৷ ৪৮ আর আল্লাহ সবরকারীদের সাথে আছেন৷
(৮:৬৭) সারা দেশে শত্রুদেরকে ভালভাবে পর্যুদস্ত না করা পর্যন্ত কোন নবীর পক্ষে নিজের কাছে বন্দীদের রাখা শোভনীয় নয়৷ তোমরা চাও দুনিয়ার স্বার্থ৷ অথচ আল্লাহর সামনে রয়েছে আখেরাত৷ আর আল্লাহ পরাক্রমশালী ও বিজ্ঞ৷
(৮:৬৮) আল্লাহর লিখন যদি আগেই না লেখা হয়ে যেতো, তাহলে তোমরা যা কিছু করেছো সে জন্য তোমাদের কঠোর শাস্তি দেয়া হতো৷
(৮:৬৯) কাজেই তোমরা যা কিছু সম্পদ লাভ করেছো তা খাও, কেননা, তা হালাল ও পাক -পবিত্র এবং আল্লাহকে ভয় করতে থাকো৷ ৪৯ নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল ও করুণাময়৷
৪৭. আধুনিক পরিভাষায় যাকে আভ্যন্তরীণ সুক্ষ্মতর , শক্তি, নৈতিক শক্তি বা মনোবল (Morale) বলা হয় আল্লাহ তাকেই ফিকাহ , বোধ ,উপলব্ধি, বুদ্ধি, ও ধী-শক্তি (Understanding)বলেছেন৷ এ অর্থ ও ভাবধারা প্রকাশের জন্যে এ শব্দটি আধুনিক পরিভাষার তুলনায় বেশী বিজ্ঞানসম্মত৷ যে ব্যক্তি নিজের উদ্দেশ্যের ব্যাপারে সঠিকভাবে সচেতন এবং ঠাণ্ডা মাথায় ভালভাবে চিন্তে এ জন্যে সংগ্রাম করতে থাকে যে, যে জিনিসের জন্যে সে নিজের প্রাণ উৎসর্গ করতে এসেছে তা তার ব্যক্তিগত জীবনের চেয়ে অনেক বেশী মূল্যবান এবং তা নষ্ট হয়ে গেলে তার জন্যে বেঁচে থাকা অর্থহীন হয়ে পড়বে, সে এ ধরনের চেতনা ও উপলব্দি থেকে বঞ্চিত একজন যোদ্ধার চেয়ে কয়েকগুণ বেশী শক্তিশালী৷ যদিও শরীরিক শক্তির প্রশ্নেউভয়ের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই তারপর যে ব্যক্তি সত্যের জ্ঞান রাখে , যে ব্যক্তি নিজের অস্তিত্ব ,আল্লাহর অস্তিত্ব, আল্লাহর সা, নিজের সম্পর্ক এবং পার্থিব জীবনের তাৎপর্য ,মৃত্যুর তাৎপর্য ও মৃত্যুর পরের জীবনের তাৎপর্য ভালভাবে উপলব্দি করে এবং যে ব্যক্তি হক ও বাতিলের পার্থক্য আর এই সাথে বাতিলের বিজয়ের ফলাফল সম্পর্কেও সঠিকভাবে জ্ঞাত, তার শক্তির ধারে কাছেও এমন সব লোক পৌছতে পারবে না যারা জাতীয়তাবাদ ,স্বাদেশিকতাবাদ বা শ্রেনী সংগ্রামের চেতনা নিয়ে কর্মক্ষেত্রে নেমে আসে৷ এ জন্যেই বলা হয়েছে, একজন বোধশক্তি সম্পন্ন সজাগ মুমিন ও একজন কাফেরের মধ্যে সত্যের জ্ঞান ও সত্য সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণেই প্রকৃতগতভাবে এক ও দশের অনুপাত সৃষ্টি হয়৷ কিন্তু শুধুমাত্র উপলব্দি ও জ্ঞানের সাহায্যে এই অনুপাত প্রতিষ্ঠিত হয় না বরং সেই সাথে সবরের গুণও এর একটি অপরিহার্য শর্ত৷
৪৮. এর অর্থ এ নয় যে, প্রথমে এক ও দশের অনুপাত ছিল এবং এখন যেহেতু তোমাদের মধ্যে দুর্বলতা এসে গেছে তাই এক ও দুইয়ের অনুপাত কায়েম করা হয়েছে৷ বরং এর সঠিক অর্থ হচ্ছে, নীতিগত ও মানগতভাবে মুমিন ও কাফেরের মধ্যেতো এক ও দশেরই অনুপাত বিদ্যমান কিন্তু যেহেতু এখন তোমাদের নৈতিক প্রশিক্ষণ পূর্ণতা লাভ করেনি এবং এখানো তোমাদের চেতনা ,উপলব্ধি ও অনুধাবন ক্ষমতা পরিপক্কতা অর্জন করেনি,তাই আপাতত সর্বনিম্ন মান ধরেই তোমাদের কাছে দাবী করা হচ্ছে যে , নিজেদের চাইতে দ্বিগুণ শক্তিধরদের বিরুদ্ধে লড়তে তো তোমাদের ইতস্তত করা উচিত নয়৷ মনে রাখতে হবে,২য় হিজরীতে এ বক্তব্য উপস্থাপিত হয়৷ তখন মুসলমানদের মধ্যে বহু লোক সবেমাত্র নতুন নতুন ইসলাম গ্রহণ করেছিল এবং তাদের প্রশিক্ষণ ছিল প্রাথমিক অবস্থায়৷পরে নবী (সা) এর নেতৃত্বে যখন তারা পরিপক্কতা অর্জন করলেন তখন প্রকৃতপক্ষে তাদের ও কাফেরদের মধ্যে ,ক ও দশের অনুপাতই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়৷বস্তুত নবী (সা) এর আমলের শেষের দিকে এবং খোফায়ে রাশেদীনের যুগের বিভিন্ন যুদ্ধে বারবার এর সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে৷
৪৯. এ আয়াতের ব্যাখ্যায় টীকাকারগণ যেসব হাদিস বর্ণনা করেছেন তার মোদ্দকথা হচ্ছেঃ বদরের যুদ্দে কুরাইশদের যেসব লোক বন্দী হয় তাদের সাথে কেমন ব্যবহার করা হবে এ নিয়ে পরে পরামর্শ হয়৷ হযরত আবু বরক (রা) পরামর্শ দেন, ফিদিয়া (মুক্তিপণ) নিয়ে তাদের ছেড়ে দেয়া হোক৷ হযরত উমর(রা) বলেন, তাদের হত্যা করা হোক৷ নবী (সা)হযরত আবু বরকরের (রা)মত গ্রহণ করেন এবং ফিদিয়া তথা বিনিময় মূল্য স্থিরিকৃত হয়ে যায়৷ এর ফলে মহান আল্লাহ তিরস্কার করে ও অসন্তোষ প্রকাশ করে এ আয়াত নাযিল করেন৷ কিন্তু তাফসীরকারগণ "আল্লাহর লিখন যদি আগেই লেখা না হয়ে যেতো আয়াতের" এ অংশের কোন যুক্তি সংগত ব্যাখ্যা দিতে পারেননি৷ তারা বলেন, এখানে আল্লাহর তাকদীরের কথা বলা হয়েছে অথবা আল্লাহ আগেভাগেই মুসলমানদের জন্যে গনীমতের মাল হালাল করে দেবার সংকল্প করেছিলেন৷ কিন্তু একথা সুষ্পষ্ট যতক্ষন পর্যন্ত শরীয়াতের বিধান প্রদানকারী অহীর মাধ্যমে কোন জিনিসের অনুমতি না দেয়া হয়েছে ততক্ষণ পর্যন্ত তা গ্রহণ করা জায়েয হতে পারে না৷ কাজেই নবী (সা)সহ সমগ্র ইসলাম জামায়াত এ ব্যাখ্যার কারণে গুনাহাগার গণ্য হবে৷ খবরে ওয়াহিদ (অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী হাদীস) এর ওপর নির্ভর করে এ ধরনের ব্যাখ্যা গ্রহণ করে নেয়া বড়ই কঠিন ব্যাপার৷

আমার মতে এ আয়াতের সঠিক ব্যাখ্যা নিম্নরূপঃ বদরের যুদ্ধের আগে সূরা মুহাম্মাদে যুদ্ধ সম্পর্কে যে প্রাথমিক নির্দেশ দেয়া হয়েছিল তাতে বলা হয়েছিলঃ

----------------------------------

"কাজেই যখন তোমরা কাফেরদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত থাকো তখন তাদের গর্দানে আঘাত করো৷শেষে যখন তোমরা তাদের সম্পূর্ণরূপে পরাজিত করবে তখন তাদের কষে বাঁধবে৷ তারপর হয় করুণা, নয় মুক্তিপণ৷ তোমরা জিহাদ চালিয়ে যাবে যতক্ষণ না যুদ্ধের অবসান ঘটে" ৷ সূরা মুহাম্মাদঃ ৪

এ বক্তব্যে যুদ্ধাবন্দীদের থেকে ফিদিয়া আদায় করার অনুমতি দেয়া হয়েছিল ঠিকই কিন্তু এই সংগে এ মর্মে শর্ত লাগানো হয়েছিল যে, প্রথমে শত্রুদের শক্তি ভালভাবে চূর্ণ করে দিতে হবে তারপর বন্দী করার কথা চিন্তা করতে হবে৷ এ ফরমান অনুযায়ী মুসলমানরা বদরে যেসব যুদ্ধ অপরাধীকে বন্দী করেছিল, তারপর তাদের কাছ থেকে যেসব ফিদিয়া আদায় করেছিল তা অনুমতি মোতাবিক ছিল ঠিকই কিন্তু সেখানে ভুলটি ছিল এইঃ পূর্বাহ্নে "শত্রুর শক্তি ভালভাবে চূর্ণ করে দেবার" যে শর্তটি রাখা হয়েছিল তা পূর্ণ করার ব্যাপারে ত্রুটি দেখা দিয়েছিল্ যুদ্ধে কুরাইশ সেনারা যখন পালাতে শুরু করলো তখন মুসলমানদের অনেকেই গনীমতের মাল লুটপাট করতে এবং কাফেরদের ধরে ধরে বাধঁতে লাগলো৷ এ সময় খুব কম লোকই শত্রুদের পিছনে কিছু দূর পর্যন্ত ধাওয়া করেছিল৷ অথচ মুসলমানরা যদি পূর্ণ শক্তিতে তাদেরকে ধাওয়া করতো তাহলে সেদিনই কুরাইশদের শক্তি নির্মুল হয়ে যেতো৷এ জন্যে আল্লাহ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন৷ আর এ ক্ষোভ নবীর ওপর নয় বরং মুসলমানদের ওপর আল্লাহার এ মহান ফরমানের মর্ম হচ্ছেঃ তোমরা এখনো নবীর মিশন ভালভাবে উপলব্ধি করতে পারোনি৷ ফিদিয়া ও গনিমাতের মাল আদায় করে অর্থভাণ্ডার ভরে তোলা নবীর আসল কাজ নয়৷ একমাত্র কুফরের শক্তির দম্ভ ভেঙে গুড়িয়ে দেয়ার কাজটিই তার উদ্দেশ্যও লক্ষের সাথে সরাসরি সম্পর্ক রাখে৷কিন্তু দুনিয়ার লোভ লালসা তোমাদের ওপর বারবার প্রাধান্য বিস্তার করে৷ প্রথমে তোমরা চাইলে শত্রুর মূল শক্তিকে এড়িয়ে বাণিজ্য কাফেলার ওপর আক্রমণ চালাতে৷ তারপর চাইলে শত্রুর মাথা গুড়িয়ে দেবার গনীমতের মাল লুট করতে ও যুদ্ধ অপরাধীদের বন্দী করতে৷ আবার এখন গনিমাতের মাল নিয়ে ঝগড়া করতে শুরু করেছো৷যদি আমি আগেই ফিদিয়া আদায় করার অনুমতি না দিয়ে দিতাম তাহলে তোমাদের এ কার্যক্রমের জন্যে তোমাদের কঠোর শাস্তি দিতাম৷ যা হোক এখন তোমরা যা কিছু নিয়েছো তা খেয়ে ফেলো কিন্তু আগামীতে এমন ধরনের আচরণ অবলম্বন করা থেকে দূরে থাকো৷যা আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয়৷ এ ব্যাখ্যার ব্যাপারে আমি মত স্থির করে ফেলেছিলাম এমন সময় ইমাম আবু বরক জাসসাস তার আহকামূল কুরাআন গ্রন্থে এ ব্যাখ্যাটিকে কমপক্ষে গ্রহণযোগ্য বলে গণ্য করেছেন দেখে আমি আরো একটু বেশী মানসিক নিশ্চিন্ততা অনুভব করতে পেরেছি৷ তারপর সীরাতে ইবনে হিশামও একটি রেওয়াতে দেখেছি৷ তাতে বলা হয়েছে, মুসলিম মুজাহিদরা যখন গনীমাতের মাল আহরণ করতে ও কাফেরদের কে ধরে ধরে বেঁধে ফেলতে ব্যস্ত ছিলেন তখন নবী (সা) হযরত সাদ ইবনে মুআযের (রা) চেহারায় কিছু বিরক্তির ভাব লক্ষ্য করলেন৷ তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হে সাদ! মনে হচ্ছে, লোকদের এ কাজ তোমার পছন্দ হচ্ছে না৷ তিনি জবাব দিলেন "ঠিকই, হে আল্লাহর রসূল! মুশরিকদের সাথে এ প্রথম যুদ্ধ এবং এ যুদ্ধে আল্লাহ তাদেরকে পরাজিত করেছেন৷ কাজেই এ সময় বন্দী করে তাদের প্রাণ বাঁচাবার চাইতে বরং তাদেরকে চরমভাবে গুড়িয়ে দিলেই বেশী ভাল হতো"৷ (২য় খণ্ড ,২৮০-২৮১ পৃঃ)৷