(৮:২৯) হে ঈমানদারগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করার পথ অবলম্বন করো তাহলে আল্লাহ তোমাদের কষ্টিপাথর দান করবেন ২৪ এবং তোমাদের পাপগুলো তোমাদের থেকে দূর করে দেবেন এবং তোমাদের ত্রুটি -বিচ্যুতি ক্ষমা করবেন৷ আল্লাহ অতিশয় অনুগ্রহশীল৷
(৮:৩০) সেই সময়ের কথাও স্মরণ করার মত যখন সত্য অস্বীকারকারীরা তোমার বিরুদ্ধে নানান রকমের চক্রান্ত আঁটছিল৷ তারা চাচ্ছিল তোমাকে বন্দী করতে৷ হত্যা করতে বা দেশ ছাড়া করতে৷ ২৫ তারা নিজেদের কূট -কৌশল প্রয়োগ করে চলছিল, অন্যদিকে আল্লাহ ও তাঁর কৌশল প্রয়োগ করেছিলেন আর আল্লাহ সবচেয়ে ভাল কৌশল, অবলম্বনকারী৷
(৮:৩১) যখন তাদেরকে আমার আয়াত শুনানো হতো, তারা বলতো ,হ্যাঁ আমরা শুনেছি, আমরা চাইলে এমন কথা আমরাও শুনাতে পারি৷ এতো সেই সব পুরানো কাহিনী, যা আগে থেকে লোকেরা বলে আসছে৷
(৮:৩২) আর সেই কথাও স্মরণ যোগ্য যা তারা বলেছিলঃ হে আল্লাহ! যদি এটা যথার্থই সত্য হয়ে থাকে এবং তোমার পক্ষ থেকে হয়ে থাকে তাহলে আমাদের ওপর আকাশ থেকে পাথর বর্ষণ করো অথবা কোন যন্ত্রণাদায়ক আযাব আমাদের ওপর আনো৷ ২৬
(৮:৩৩) তুমিই যখন তাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলে তখন আল্লাহ তাদের ওপর আযাব নাযিল করতে চাচ্ছিলেন না৷ আর এটা আল্লাহর রীতিও নয় যে, লোকেরা ক্ষমা চাইতে থাকেবে এবং তিনি তাদেরকে আযাব দেবেন৷ ২৭
(৮:৩৪) কিন্তু এখন কেন তিনি তাদের ওপর আযাব নাযিল করবেন না যখন তারা মসজিদে হারামের পথ রোধ করেছে? অথচ তারা এ মসজিদের বৈধ মুতাওয়াল্লীও নয়৷ এর বৈধ মুতাওয়াল্লী হতে পারে একমাত্র তাকওয়াধারীরাই৷ কিন্তু অধিকাংশ লোক একথা জানে না৷
(৮:৩৫) বায়তুল্লাহর কাছে তারা কি নামায পড়ে! তারা তো শুধু সিটি দেয় ও তালি বজায়৷ ২৮ কাজেই তোমরা যে সত্য অস্বীকার করে আসছিলে তার প্রতিদানে এখন আযাবের স্বাদ গ্রহণ করো৷ ২৯
(৮:৩৬) যারা সত্যকে মেনে নিতে অস্বীকার করেছে তারা নিজেদের ধন-সম্পদ আল্লাহর পথ রোধ করার জন্য ব্যয় করেছে এবং এখনো আরো ব্যয় করতে থাকবে৷ কিন্তু শেষ পর্যন্ত এ প্রচেষ্টা তাদের অনুশোচনার কারণ হয়ে দাঁড়াবে ৷ তারপর তারা বিজিত হবে৷ আর এ কাফেরদের ঘেরাও করে জাহান্নামের দিকে আনা হবে৷
(৮:৩৭) মূলত আল্লাহ কলুষতাকে পবিত্রতা থেকে ছেঁটে আলাদা করবেন এবং সকল প্রকার কলুষতা মিলিয়ে একত্র করবেন তারপর এ পুঁটলিটা জাহান্নামে ফেলে দেবেন৷ মূলত এরাই হবে দেউলিয়া৷ ৩০
২৪. কষ্টিপাথর এমন একটি জিনিসকে বলা হয় যা খাঁটি ও ভেজালের মধ্যকার পার্থক্যকে সুষ্পষ্ট করে তুলে ধরে৷ এটিই ফুরকান-এর অর্থ৷এ জন্যেই আমি ফুরকানের অনুবাদ করেছি কষ্টিপাথর শব্দ দিয়ে৷ এখানে আল্লাহর বানীর অর্থ হচ্ছে যদি তোমরা দুনিয়ায় আল্লাহকে ভয় করে কাজ করতে থাকো এবং আন্তরিকতাভাবে আল্লাহর ইচ্ছা বিরোধী কোন কাজের করতে প্রস্তুত না হয়ে থাকো, তাহলে মহান আল্লাহ তোমাদের মধ্যে এমন পার্থ্ক্যকারী শক্তি সৃষ্টি করে দেবেন যার ফলে প্রতি পদে পদে তোমরা জানতে পারবে কোন কর্মনীতিটা ভুল ও কোনটা নির্ভুল এবং কোন কর্মনীতি অবলম্বন করলে আল্লাহর সন্তোষ লাভ করা যায়৷ এবং কিসে তিনি অসন্তুষ্ট হন৷ জীবন পথের প্রতি বাঁকে প্রতিটি চৌরাস্তায় এবং প্রতিটি চড়াই উতরাইয়ে তোমাদের অন্তরদৃষ্টি বলে দেবে কোন দিকে চলা উচিত এবং কোন দিকে চলা উচিত নয়৷ কোনটি সেই নিরেট সত্যের পথ যা আল্লাহর দিকে নিয়ে যায় এবং কোনটি মিথ্যা ও অসত্যের পথ, যা শয়তানের সাথে সম্পর্ক জুড়ে দেয়৷
২৫. এটা এমন সময়ের কথা যখন কুরাইশদের এ যাবতকার আশংকা নিশ্চিত বিশ্বাসের পরিণত হয়ে গিয়েছিল, তখন তরা পরস্পর বলাবলি করতে লাগলো,এ ব্যক্তি মক্কা থেকে বের হয়ে গেলে বিপদ আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে৷ কাজেই তারা তাঁর ব্যাপারে একা চুড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌছার জন্যে দারুন নদওয়ায় জাতীয় নেতৃবৃন্দের একটি সভা দলের মত ছিল, এ ব্যক্তির হাতে পায়ে লোহার বেড়ি পরিয়ে এক জায়গায় বন্দী করে রাখা হোক৷ মৃত্যুর পূর্বে আর তাকে মুক্তি দেবার প্রয়োজন নেই৷ কিন্তু এ মত গ্রহীত হলো না ৷ কারণ তারা বললো, আমরা তাকে বন্দী করে রাখলেও তার যেসব সাথী কারাগারের বাইরে থাকবে তারা বরাবর নিজেদের কাজ করে যেতে থাকবে এবং সামান্য একটু শক্তি অর্জন করতে পারলেই তাকে মুক্ত করার জন্যে প্রাণ উৎসর্গ করে দিতে কুন্ঠাবোধ করবে না৷ দ্বিতীয় দলের মত ছিল একে আমাদের এখান থেকে বের করে দাও৷ তারপর যখন সে আমাদের মধ্যে থাকবে না তখন সে কোথায় থাকে ও কি করে তা নিয়ে আমাদের মাথা ঘামাবার কি আছে? মোটকথা এভাবে তার অস্তিত্ব আমাদের জীবন ব্যবস্থায় যে বিশৃংখলা সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল তা বন্ধ হয়ে যাবে৷ কিন্তু এ মতটিকেও এই বলে রদ করে দেয়া হলো যে, এ ব্যক্তি হচ্ছে কথার যাদুকর৷ কথার মাধ্যেমে মানুষের মন গলিয়ে ফেলার ব্যাপারে এর জুড়ি নেই৷ সে এখান থেকে বের হয়ে গেলে না জানি আরবের কোন কোন উপজাতি ও গোত্রকে নিজের অনুসারী বানিয়ে নেবে! তারপর না জানি কী পরিমাণ ক্ষমতা অর্জন করে আরবের কেন্দ্রস্থল নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে তোমাদের ওপর আক্রমণ করে বসবে! সব শেষ আবু জেহেল মত প্রকাশ করলো যে, আমাদের প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন করে উচ্চ বংশীয় অসি চালনায় পারদর্শী যুবক বাছাই করে নিতে হবে ৷ তারা সবাই মিলে একই সংগে মুহাম্মাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে এবং তাকে হত্যা করবে৷ এভাবে মুহাম্মাদকে হত্যা করার দায়টি সমস্ত গোত্রের ওপর ভাগাভাগি হয়ে যাবে৷ আর সবার সংগে লড়াই করা বনু আবদে মান্নাফের জন্যে অসম্ভব হয়ে পড়বে৷কাজেই বাধ্য হয়ে তারা রক্তমূল্য গ্রহণ করতে রাজী হয়ে যাবে৷ এ মতই সবাই পছন্দ করলো৷ হত্যা করার জন্যে লোকদের নাম স্থিরিকৃত হলো৷ হত্যা করার সময়ও নির্ধারিত হলো৷ এমনকি যে রাতটি হত্যার জন্যে নির্ধারিত করা হয়েছিল সে রাত ঠিক সময়ে হত্যাকারীরাও যথা স্থানে নিজেদের মতলব হাসিল করার উদ্দেশ্যে পৌছে গিয়েছিল৷কিন্তু তাদের হাত উঠাবার আগেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের চোখে ধুলো দিয়ে বের হয়ে গিয়েছিলেন৷ ফলে একেবারে শেষ সময়ে তাদের পরিকল্পিত কৌশল বানচাল হয়ে গেলো৷
২৬. একথা তারা দোয়া হিসেবে নয়, চ্যালেঞ্জের সুরে বলতো৷ অর্থাৎ তাদের একথা বলার উদ্দেশ্য ছিল, যদি যথার্থই এটি সত্য হতো এবং আল্লাহর পক্ষে থেকে হতো, তাহলে একে মিথ্যা বলার ফলে তাদের ওপর আকাশ তেকে পাথর বর্ষিত হতো এবং ভয়াবহ আযাব তাদের ওপর আপতিত হতো৷ কিন্তু তা হয়নি৷ আর যখন তা হয়নি তখন এর অর্থ হচ্ছে , এটি সত্যও নয় এবং আল্লাহর পক্ষ থেকেও আসেনি৷
২৭. ওপরে তাদের যে বাহ্যিক দোয়ার উল্লেখ করা হয়েছে তার মধ্যে যে প্রশ্ন নিহিত ছিল এটি তার জওয়াব৷ এ জওয়াবে বলা হয়েছে , আল্লাহ মক্কী যুগে আযাব পাঠাননি কে?এর প্রথম কারণ ছিল, যতদিন কোন নবী কোন জনবসতিতে উপস্থিত থাকেন এবং সত্যের দাওয়াত দিতে থাকেন ততদিন পর্যন্ত জনবসতিতর অধিবাসীদের অবকাশ দেয়া হয় এবং পূর্বাহ্নে আযাব পাঠিয়ে তাদের সংশোধিত হবার সুযোগ কেড়ে নেয়া হয় না৷ এর দ্বিতীয় কারণ,যতদিন পর্যন্ত কোন জনবসতি থেকে এমন ধরনের লোকেরা একের পর এক বের হয়ে আসতে থাকে যারা নিজেদের পূর্ববর্তী গাফলতি ও ভুল কর্মনীতি ও সজাগ হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে থাকে এবং নিজেদের ভবিষ্যত কর্মনীতি ও আচার-আচরণ সংশোধন করে নেয়, ততদিন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট জনবসতিকে মহান আল্লাহ অনর্থন ধ্বংস করে দেবেন, এটা মোটেই যুক্তিসংগত নয়৷ তবে নবী যখন সংশ্লিষ্ট জনবসতির ব্যাপারে তার দায়িত্ব সর্বতোভাবে পালন করার পর নিরাশ হয়ে সেখান থেকে বের হয়ে যান অথবা তাকে বের করে দেয়া হয় কিংবা তাকে হত্যা করা হয় এবং সৎ ও সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিকে দেখতে প্রস্তুত নয়, তখনই আযাবের আসল সময় এসে যায়৷
২৮. আরববসীদের মনে ভুল ধারণা প্রচ্ছন্ন ছিল এবং সাধারণ আরববাসীরা যার ফলে প্রতারিত হচ্ছিল এখানে সেদিকে ইশারা করা হয়েছে৷ তারা মনে করতো , কুরাইশরা যেহেতু বাইতুল্লাহর খাদেম ও মুতাওয়াল্লী এবং সেখানে ইবাদত করে তাই তাদের ওপর রয়েছে আল্লাহর অনুগ্রহ৷ এ ধারণাটি প্রতিবাদ করে বলা হয়েছে, শুধুমাত্র উত্তরাধিকার সুত্রে খাদেম ও মুতাওয়াল্লির দায়িত্ব লাভ করলে কোন ব্যক্তি বা দল কোন ইবাদত গৃহের বৈধ খাদেম ও মুতাওয়াল্লী হতে পারে না৷ একমাত্র যারা মুক্তাকী আল্লাহকে ভয় করে তারাই ইবাদত গৃহের বৈধ মুতাওয়াল্লী হতে পারে৷আর এদের অবস্থা হচ্ছে, যে গৃহটিকে শুধুমাত্র এবং নির্ভেজাল আল্লাহর ইবাদত করার জন্যে নির্ধারিত করা হয়েছিল সেখানে এরা এমন এক দল লোককে প্রবেশ করতে বাধা দিচ্ছে যারা নির্ভেজাল আল্লাহর ইবাদতকারী৷ এভাবে এরা মুতাওয়াল্লী ও খাদেমের দায়িত্ব পালন করার পরিবর্তেএ ইবাদত গৃহের মালিক হয়ে বসেছে৷এখন এরা যার ওপর নারায হবে তাকে এ ইবাদত গৃহে আসতে দেবে না৷ এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করার ব্যাপারে এরা নিজেদেরকে পূর্ণ ক্ষমতার অধিকারী বলে মনে করছে৷ এ ধরনের পদক্ষেপ ও কার্যকলাপ এদের মুত্তাকী না হবার এবং আল্লাহকে ভয় না করার সুষ্পষ্ট প্রমাণ৷আর এরা বাইতুল্লাহে এসে যে ইবাদত করে তাতে না আছে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা , না আছে আল্লাহর প্রতি ভক্তি ও নিষ্ঠা এবং আল্লাহকে স্মরণ করার প্রবণতা৷ তারা একটা অর্থহীন হৈচৈ ,শোরগোল ও ক্রীড়া-কৌতুক চালিয়ে যাচ্ছে৷ একে এরা নাম দিয়েছে ইবাদত৷ আল্লাহর গৃহের এ ধরনের নাম সর্বস্ব খিদতম এবং এ ধরনের মিথ্যা ইবাদতের ভিত্তিতে এরা কেমন করে আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের অধিকারী হয়ে গেলো৷ এ ধরনের কার্যকলাপ এদেরকে কেমন করে আল্লাহর আযাব থেকে নিরাপদ রাখতে পারে?
২৯. তারা মনে করতো, শুধুমাত্র আকাশ থেকে পাথর বৃষ্টি অথবা অন্য কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগের আকারেই আল্লাহর আযাব আসে৷ কিন্তু এখানে তাদের জানানো হয়েছে , বদর যুদ্ধে তাদের চূড়ান্ত পরাজয়ই আসলে তাদের জন্যে আল্লাহর আযাব ছাড়া আর কিছুই নয়৷ তাদের এ পরাজয় ইসলামকে জীবনী শক্তি লাভের সুসংবাদ এবং জাহেলী ব্যবস্থাকে মৃত্যুর সিদ্ধান্ত শুনিয়ে দিয়েছে৷
৩০. মানুষ যে পথে নিজের সমস্ত সময়, শ্রম, যোগ্যতা, ও জীবন পূঁজি ব্যয় করে , তার একেবারে শেষ প্রান্তে পৌছে গিয়ে যদি সে জানতে পারে যে, এসব তাকে সোজা ধ্বংসের দিকে টেনে এনেছে এবং এ পথে সে যা কিছু খাটিয়েছে তাতে সূদ বা মুনাফা পাওয়ার পরিবর্তে উল্টো তাকে দণ্ড ভোগ করতে হবে, তাহলে এর চাইতে বড় দেউলিয়াপনা তার জন্যে আর কী হতে পারে!