(৮:২০) হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করো এবং হুকুম শোনার পর তা অমান্য করো না৷
(৮:২১) তাদের মতো হয়ে যেয়ো না, যারা বললো, আমরা শুনেছি অথচ তারা শোনে না৷ ১৬
(৮:২২) অবশ্যি আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ধরনের জানোয়ার হচ্ছে সেই সব বধির ও বোবা লোক ১৭ যারা -বিবেক বুদ্ধি কাজে লাগায় না৷
(৮:২৩) যদি আল্লাহ জানতেন এদের মধ্যে সামান্য পরিমানও কল্যাণ আছে তাহলে নিশ্চয়ই তিনি তাদেরকে শুনতে উদ্ধুদ্ধ করতেন৷ (কিন্তু কল্যাণ ছাড়া) যদি তিনি তাদের শুনাতেন তাহলে তারা নির্লিপ্ততার সাথে মুখ ফিরিয়ে নিতো৷ ১৮
(৮:২৪) হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ ও তাঁর রসূলের ডাকে সাড়া দাও, যখন রসূল তোমাদের এমন জিনিসের দিকে ডাকেন যা জীবন দান করবে৷ আর জেনে রাখো আল্লাহ মানুষ ও তার দিলের মাঝখানে আড়াল হয়ে আছেন এবং তোমাদের তাঁর দিকেই সমবেত করা হবে৷ ১৯
(৮:২৫) আর সেই ফিতনা থেকে দূরে থাকো, যার অনিষ্টকারিতা শুধুমাত্র তোমাদের গোনাহগারদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না৷ ২০ জেনে রাখো, আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা৷
(৮:২৬) স্মরণ করো সেই সময়ের কথা যখন তোমরা ছিলে সামান্য কয়েকজন৷ পৃথিবীর বুকে তোমাদের দুর্বল মনে করা হতো৷ লোকেরা তোমাদের খতম করেই দেয় নাকি, এ ভয়ে তোমরা কাঁপতে৷ তারপর আল্লাহ তোমাদের আশ্রয়স্থল যোগার করে দিলেন, নিজের সাহায্য দিয়ে তোমাদের শক্তিশালী করলেন এবং তোমাদের ভাল ও পবিত্র জীবিকা দান করলেন, হয়তো তোমরা শোকরগুজার হবে৷ ২১
(৮:২৭) হে ঈমানদরগণ! জেনে বুঝে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করো না, নিজেদের আমানতসমূহের ২২ খেয়ানত করো না৷
(৮:২৮) এবং জেনে রেখো, তোমাদের অর্থ-সম্পদ ও তোমাদের সন্তান-সন্তুতি আসলে পরীক্ষার সামগ্রী ৷ ২৩ আর আল্লাহর কাছে প্রতিদান দেবার জন্য অনেক কিছুই আছে৷
১৬. এখানে শোনা বলতে এমন শোনা বুঝায় যা মেনে নেয়া ও গ্রহণ করা অর্থ প্রকাশ করে৷ যেসব মুনাফীক ঈমানের কথা মুখে বলতো কিন্তু আল্লাহর হুকুম মেনে চলতো না এবং তার আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতো তাদের দিকেই এখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে৷
১৭. অর্থাৎ যারা সত্য কথা শোনেও না৷ সত্য কথা বলেও না ৷যাদের কান ও মুখ সত্যের ব্যাপারে বধির ও বোবা৷
১৮. অর্থাৎ যখন তাদের মধ্যে সত্যপ্রিয়তা ও সত্যের জন্য কাজ করার আবেগ ও প্রেরণা নেই তখন তাদের যদি আদেশ পালন করার জন্যে যুদ্ধে যেতে উদ্বুদ্ধ করাও হতো তাহলেও তারা এ আসন্ন বিপদ দেখেই অবলীলাক্রমে পালিয়ে যেতো৷ এ অবস্থায় তাদের সংগ তোমাদের জন্যে কল্যাণকর হবার পরিবর্তে ক্ষতিকর প্রমানিত হতো৷
১৯. মানুষের মুনাফেকী আচরণ থেকে বাঁচবার জন্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী পদ্ধতি যেটি হতে পারে, তা হলো তার মনে দুটো বিশ্বাস বদ্ধমূল করে দেয়া৷ এক, যাবতীয় কর্মকাণ্ড সেই আল্লাহর সাথে জড়িত যিনি মনের অবস্থাও জানেন৷ মানুষ তার মনে মনে যে সংকল্প পোষণ করে এবং মনের মধ্যে যেসব ইচ্ছা, আশা, আকাংখা, উদ্দেশ্য, লক্ষ ও চিন্তা-ভাবনা লুকিয়ে রাখে তার যাবতীয় গোপন তথ্য তার কাছে দিনের আলোর মতো সুষ্পস্ট৷ দুই, একদিন আল্লাহর সামনে যেতেই হবে৷ তাঁর হাত থেকে বের হয়ে কেউ কোথাও পালিয়ে বাঁচতে পারবে না৷ এ দুটি বিশ্বাস যত বেশী শক্তিশালী ও পাকাপোক্ত হবে ততই মানুষ মুনাফিকি আচরণ থেকে দূরে থাকবে৷ এ জন্য মুনাফিকী আচরণের বিরুদ্ধে উপদেশ দান প্রসংগে কুরআন এ বিশ্বাস দুটির উল্লেখ করেছে বারবার৷
২০. এখানে ফিতনা দ্বারা একটি সর্বব্যাপী সামাজিক অনাচার বুঝানো হয়েছে৷ এ অনাচার মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ে মানুষের জীবন দুর্ভাগ্য ও ধ্বংস ডেকে আনে৷ শুধুমাত্র যারা গোনাহ করে তারই এ দুর্ভাগ্য ও ধ্বংসের শিকার হয় না বরং এর শিকার তারাও হয় যারা এ পাপাচারে জর্জরিত সমাজে বসবাস করা বরদাশত করে নেয়৷ উদাহরণস্বরূপ ধরে নেয়া যেতে পারে, যখন কোন শহরে ময়লা আবর্জনা এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিচ্ছিন্ন ভাবে জমে থাকে তখন তার প্রভাব ও থাকে সীমাবদ্ধ৷ এ অবস্থায় শুধুমাত্র যেসব লোক নিজেদের শরীরে ও ঘরোয়া পরিবেশে ময়লা আবর্জনা ভরে রেখেছে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়৷ কিন্তু যখন সেখানে ময়লা আবর্জনার স্তুপ ব্যাপকভাবে জমে উঠতে থাকে এবং সারা শহরে ময়লা প্রতিরোধ ও নিষ্কাশণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্যে প্রচেষ্টা চালাবার মতো একটি দলও থাকে না তখন মাটি, পানি ও বাতাসের সর্বত্রই বিষক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে৷ এর ফলে যে মহামারী দেখা দেয় তাতে যারা ময়লা আবর্জনা ছড়ায় যারা নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন থাকে এবং যারা ময়ল ও আবর্জনার বসবাস করে তারা সবাই আক্রান্ত হয়৷ নৈতিক ময়লা ও আবর্জনার বেলায়ও ঠিক একই ব্যাপার ঘটে৷ যদি তা ব্যক্তিগত পর্যায়ে কিছু ব্যক্তির মধ্যে থাকে এবং সৎ ও সত্যনিষ্ঠ সমাজের প্রতিপত্তির চাপে কোণঠাসা ও নিস্তেজ অবস্থায় থাকে তাহলে তার ক্ষতিকর প্রভাব সীমাবদ্ধ থাকে৷ কিন্তু যখন সমাজের সামষ্টিক বিবেক দুর্বল হয়ে পড়ে , নৈতিক অনিষ্টগুলোকে দমিয়ে রাখার ক্ষমতা তার থাকে না, সামাজ অংগনে অসৎ, নির্লজ্জ ও দুশ্চরিত্র লোকেরা নিজেদের ভেতরের ময়লাগুলো প্রকাশ্যে উৎক্ষিপ্ত করতে ও ছড়াতে থাকে, সৎলোকেরা নিষ্কর্মা হয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত সততা ও সদগুণাবলী নিয়েই সন্তুষ্ট থাকেএবং সামাজিক ও সামাষ্টিক দুষ্কৃতির ব্যাপারে নীরব ভূমিকা পালন করে তখন সামগ্রিকভাবে গোটা সামাজের ওপর দুর্ভোগ নেমে আসে৷ এ সময় এমন ব্যাপক দুর্যোগের সৃষ্টি হয় যার ফলে বড় -ছোট, সবল -দুর্বল, সবাই সমানভাবে বিপর্যয় ও বিধ্বস্ত হয়৷ কাজেই আল্লাহর বক্তব্যের মর্ম হচ্ছে, রসূর যে সংস্কার ও হেদায়াতের কর্মসূচী নিয়ে মাঠে নেমেছেন এবং যে কাজে অংশগ্রহন করার জন্যে তোমাদের প্রতি আহবান জানাচ্ছেন তার মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত ও সামাজিক উভয় দিক দিয়ে তোমাদের জন্যে যথার্থ জীবনের গ্যারান্টি৷ যদি সাচ্চা দিলে আন্তরিকতা সহকারে তাতে অংশ না নাও এবং সমাজের বুজে যেসব দুস্কৃতি ছড়িয়ে রয়েছে সেগুলোকে বরদাশত করতে থাকো তাহলে ব্যাপক বিপর্যয় দেখা দেবে৷ যদিও তোমাদের মধ্যে এমন অনেক লোক থেকে থাকে যারা কার্যত দুস্কৃতির লিপ্ত হয় না এবং দুস্কৃতি ছাড়াবার জন্যে তাদেরকে দায়ীও করা যায় না বরং নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনে তারা সুকৃতির অধিকারী হয়ে থাকে তবুও এ ব্যাপক বিপদ তোমাদের আচ্ছন্ন করে ফেলবে৷ সূরা আরাফের ১৬৩-১৬৬ আয়াতে শনিবারওয়ালাদের ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত পেশ করতে গিয়ে এ এক কথাই বলা হয়েছে ৷ এ দৃষ্টিভংগীকেই ইসলামের ব্যক্তি চরিত্র ও সমাজ সংস্কারমূলক কার্য়ক্রমের মৌলিক দৃষ্টিকোণ বলা যেতে পারে৷
২১. এখানে শোকগুজার শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ৷ ওপরের ধারাবাহিক বক্তব্যগুলো সামনে রাখলে একটা কথা পরিস্কার হয়ে যায়৷ আল্লাহ মুসলমানদের দুর্বলতার অব্স্থা থেকে বের করে এনেছেন এবং মক্কার বিপদসংকুল জীবন থেকে উদ্ধার করে তাদেরকে এমন শান্তি ও নিরাপত্তার ভূমিতে আশ্রয় দিয়েছিলেন যেখানে তারা উত্তম রিযিক লাভ করছে, শুধুমাত্র এতটুকু কথা মেনে নেয়াই শুকরগুজারী অর্থ প্রকাশের জন্যে যথেষ্ট নয়৷ বরং সেই সাথে একথাও অনুধাবন করা শোকরগুজারীর অন্তরভুক্ত যে, যে মহান আল্লাহ মুসলমানদের প্রতি এত সব অনুগ্রহ করেছেন সেই আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করা তাদের কর্তব্য৷ আর রসূল যে আন্দোলনের সূচনা করেছেন, তাকে সফল করার সধানায় তাদেরকে আন্তরিকতা ও উৎসর্গিত মনোভাব নিয়ে আত্মনিয়োগ করতে হবে৷ এ কাজে যেসব বাধা-বিপত্তি,বিপদ-আপদ , ও ক্ষয়-ক্ষতির সম্ভবনা দেখা দেবে আল্লাহর ওপর নির্ভর করে তারা সাহসের সাথে তার মোকাবিলা করে যাবে৷ কারণ এ আল্লাহই ইতিপূর্বে বিপদ আপদ থেকে তাদেরকে উদ্ধার করে এনেছিলেন৷ তারা নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস রাখবে যখন তারা আন্তরিকতার সহকারে আল্লাহর কাজ করবে তখন আল্লাহ নিশ্চয়ই তাদের পক্ষ সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা করবেন- এসবই শোকরগুজারীর অর্থে অন্তরভুক্ত৷ কাজেই শুধুমাত্র মুখে স্বীকৃতি দান পর্যায়ের শোকরগুজারী এখানে উদ্দেশ্য নয়৷ বরং এ শোকরগুজারী বাস্তবে কাজের মাধ্যমে প্রকাশিত হবে৷ অনুগ্রহের কথা স্বীকার করা সত্ত্বেও অনুগ্রহকারীর সন্তুষ্টি লাভের জন্যে প্রচেষ্টা না চালানো, তার খিদমত করার ব্যাপারে আন্তরিক না হওয়া এবং না জানি আগামীতেও তিনি অনুগ্রহ করবেন কিনা এ ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করা - এসব কোন ক্রমেই শোকরগুজারী নয় বরং উলটো অকৃতজ্ঞতারই আলামত৷
২২. নিজেদের 'আমানতসমূহ' মানে কারোর ওপর বিশ্বাস ও আস্থা স্থাপন করে যেসব দায়িত্ব তার ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়৷ তার আনুগত্য করা ও অংগীকর পালনের দায়িত্বও হতে পারে৷ অথচ কোন সামাজিক চুক্তি পালন, দলের গোপনীয়তা রক্ষা করা বা ব্যক্তিগত ও দলীয় সম্পত্তি রক্ষা করার কিংবা এমন কোন পদের অংগীকারও হতে পারে যা কোন ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে দল তার হাতে সোপর্দ করে দেয়৷(আরো বেশী ব্যাখ্যার জন্যে দেখুন সূরা আন নিসার ৮৮ টীকা)৷
২৩. যে জিনিসটি সাধারণত মানুষের ঈমানী চেতনায় এবং নিষ্ঠা ও আন্তরিকাতায় বিশৃংখলা সৃষ্টি করে এবং যে জন্যে মানুষ প্রায়ই মুনাফেকী, বিশ্বাসঘাতকতা ও খেয়ানত লিপ্ত হয় সেটি হচ্ছে, তার অর্থনৈতিক স্বার্থ ও সন্তান -সন্ততির স্বার্থের প্রতি সীমাতিরিক্ত আগ্রহ৷ এ কারণে বলা হয়েছে এ অর্থ -সম্পদ ও সন্তান -সন্ততির মোহে অন্ধ হয়ে তোমরা সাধারণত সত্য-সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাও৷অথচ এগুলো তো আসলে দুনিয়ার পরীক্ষাগৃহে তোমাদের জন্যে পরীক্ষার সমগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়৷ যাকে তোমরা পুত্র বা কন্যা বলে জানো প্রকৃতপক্ষে সে তো পরীক্ষার একটি বিষয় ৷ আর যাকে তোমরা সম্পত্তি বা ব্যবসায় বলে থাকে সেও প্রকৃতপক্ষে পরীক্ষার আর একটি বিষয় মাত্র৷ এ জিনিসগুলো তোমাদের হাতে সোপর্দ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে, তোমরা অধিকার ও দায়-দায়িত্বের প্রতি কতদূর লক্ষ রেখে কাজ করো, দায়িত্বের বোঝা মাথায় নিয়ে আবেগ তাড়িত হয়েও কতদূর সত্য ও সঠিক পথে চলা অব্যাহত রাখো, এবং পার্থিব বস্তুর প্রেমাসক্ত নফসকে কতদূর নিয়ন্ত্রণে রেখে পুরোপুরি আল্লাহর বান্দায় পরিণত হও এবং আল্লাহ তাদের যতটুকু অধিকার নির্ধারণ করেছেন ততটুকু আদায় ও করতে থাকো, এগুলোর মাধ্যমে তা যাচাই করে দেখা হবে৷