(৮:১) লোকেরা তোমার কাছে গনীমাতের মাল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে? বলে দাও, এ গনীমতের মাল তো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ৷কাজেই তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, নিজেদের পারষ্পরিক সম্পর্কে শুধরে নাও এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করো, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো৷
(৮:২) সাচ্চা ঈমানদার তো তারাই আল্লাহকে স্মরণ করা হলে যাদের হৃদয় কেঁপে ওঠে৷ আর আল্লাহর আয়াত যখন তাদের সামনে পড়া হয়, তাদের ঈমান বেড়ে যায় এবং তারা নিজেদের রবের ওপর ভরসা করে৷
(৮:৩) তারা নামায কায়েম করে এবং যা কিছু আমি তাদেরকে দিয়েছি তা থেকে ( আমার পথে) খরচ করে৷
(৮:৪) এ ধরনের লোকেরাই প্রকৃত মুমিন৷ তাদের জন্য তাদের রবের কাছে রয়েছে বিরাট মর্যাদা , ভূলত্রুটির ক্ষমা ও উত্তম রিযিক৷
(৮:৫) (এই গনীমাতের মালের ব্যাপারে ঠিক তেমনি অবস্থা দেখা দিচ্ছে যেমন অবস্থা সে সময় দেখা দিয়েছিল যখন) তোমার রব তোমাকে সত্য সহকারে ঘর থেকে বের করে এনেছিলেন এবং মুমিনদের একটি দলের কাছে এটা ছিল বড়ই অসহনীয়৷
(৮:৬) তারা এ সত্যের ব্যাপারে তোমার সাথে ঝগড়া করছিল অথচ তা একেবারে পরিস্কার হয়ে ভেসে উঠেছিল৷ তাদের অবস্থা এমন ছিল, যেন তরা দেখছিল তাদেরকে মৃত্যুর দিকে হাকিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে৷
(৮:৭) স্মরণ করো সেই সময়ের কথা যখন আল্লাহ তোমাদের সাথে ওয়াদা করেছিলেন, দুটি দলের মধ্যে থেকে একটি তোমরা পেয়ে যাবে৷ তোমরা চাচ্ছিলে, তোমরা দুর্বল দলটি লাভ করবে৷ কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছিল, নিজের বাণীসমূহের সাহায্যে তিনি সত্যকে সত্যরূপে প্রকাশিত করে দেখিয়ে দেবেন এবং কাফেরদের শিকড় কেটে দেবেন ,
(৮:৮) যাতে সত্য সত্য রূপে এবং বাতিল বাতিল হিসেবে প্রমাণিত হয়ে যায়, অপরাধিদের কাছে তা যতই অসহনীয় হোক না কেন৷
(৮:৯) আর সেই সময়ের কথা স্মরণ করো যখন তোমরা তোমাদের রবের কাছে ফরিয়াদ করছিলে৷ জবাবে তিনি বললেন , তোমাদের সাহায্য করার জন্য আমি একের পর এক, এক হাজার ফেরেশতা পাঠাচ্ছি৷
(৮:১০) একথা আল্লাহ তোমাদের শুধুমাত্র এ জন্য জানিয়ে দিলেন যাতে তোমরা সুখবর পাও এবং তোমাদের হৃদয় নিশ্চিন্ততা অনুভব করে৷ নয়তো সাহায্য যখনই আসে আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে৷ অবশ্যই আল্লাহ মহাপরাক্রমশীল ও মহাজ্ঞানী৷
১. এক অদ্ভুত ধরনের ভূমিকা দিয়ে যুদ্ধের ঘটনাবলীর পর্যালোচনা শুরু করা হয়েছে৷ বদরের ময়দানে কুরাইশ সেনাদলের কাছ থেকে যে, গনীমতের মাল লাভ করা হয়েছিল তা বন্টন করার ব্যাপারে মুসলমানদের মধ্যে বিবাদ দেখা দিয়েছিল৷ যেহেতু ইসলাম গ্রহণ করার পর এই প্রথমবার তারা ইসলামের পতাকা তলে লড়াই করার সুযোগ পেয়েছিলেন৷তাই এ প্রসংগে যুদ্ধ ও যুদ্ধজনিত বিষয়াদিতে ইসলামের বিধান কি তা তাদের জানা ছিল না৷ সূরা বাকারাহ ও সূরা মুহাম্মাদ কিছু প্রাথমিক নির্দেশ দেয়া হয়েছিল৷ কিন্তু তখনো কোন সামরিক কৃষ্টি , সভ্যতা ও রীতিনীতির ভিত্তি পত্তন করা হয়নি৷ আরো বহু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ের ন্যায় মুসলমানরা তখনো পর্যন্ত যুদ্ধের ব্যাপারেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরাতন জাহেলিয়াতের ধারণাই পোষণ করতো৷ এ কারণে বদরের যুদ্ধে কাফেরদের পরাজয়ের পর যে ব্যক্তি যে পরিমাণ গনীমতের মাল হস্তগত করেছিল আরবের পুরাতন রীতি অনুযায়ী সে নিজেকে তার মালিক ভেবে নিয়েছিল৷ কিন্তু দ্বিতীয় একটি দল গনিমতের দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে কাফেরদের পিছনে ধাওয়া করেছিল৷তারা এ সম্পদে নিজেদের সমান সমান অংশ দাবী করলো৷ কারণ তারা বললো , আমরা যদি শত্রুর পেছনে ধাওয়া করে তাদেরকে দুরে ভাগিয়ে দিয়ে না আসতাম এবং তোমাদের মত গনীমতের মাল আহরণ করতে লেগে যেতাম তাহলে শত্রুদের ফিরে এসে পাল্টা হামলা চালিয়ে আমাদের বিজয়কে পরাজয়ে রূপান্তরিত করে দেবারও সম্ভবনা ছিল৷ তৃতীয় একটি দল রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হেফাজতে নিয়োজিত ছিল৷ তারাও নিজেদের দাবী পেশ করলো৷ তারা বললো,এ যুদ্ধে আমরাই তো সবচেয়ে বেশী মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছি৷ আমরা যদি রসূল (সা) এর চারদিকে মজবুত প্রাচীর গড়ে না তুলতাম এবং আল্লাহ না করুণ! তার ওপর যদি কোন আঘাত আসতো তাহলে বিজয় লাভ করারই কোন প্রশ্ন উঠতো না৷ ফলে কোন গনীমতের মাল ও লাভ করা যেতো না এবং বন্টন করারও সমস্যা দেখা দিত না ৷ কিন্তু গনিমতের মাল কার্যত যাদের হাতে ছিল তাদের মালিকানার জন্যে যেন কোন প্রমাণের প্রয়োজন ছিল না৷ একটি জ্বলজ্যান্ত সত্য যুক্তি -প্রমাণের মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়ে যাবে, যুক্তি প্রমাণের এ অধিকার মানতে তারা প্রস্তুত ছিল না৷ এভাবে অবশেষে এ বিবাদ তিক্ততার রূপ ধারণ করলো এবং কথাবার্তা তিক্ততা এক পর্যায়ে মনেও ছড়িয়ে পড়তে লাগলো৷

মহান আল্লাহ সূরা আনফাল নাযিল করার জন্যে এ মনস্তাত্বিক পরিবেশ বেছে নিয়েছেন৷ এ বিষয় দিয়ে যুদ্ধ সংক্রান্ত নিজের পর্যালোচনামূলক বক্তব্যের সূচনা করেছেন৷ প্রথম বাক্যটির মধ্যেই প্রশ্নের জবাব নিহিত ছিল৷ বলছেনঃ তোমর কাছে গনীমতের মাল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে? মূল বক্তব্যে গনিমতের মালকে 'আনফাল' বলা হয়েছে৷ এ 'আনফাল' শব্দের মধ্যে মূল সমস্যার সামাধান নিহিত রয়ে গেছে৷ আনফাল বহুবচন৷ এর একবচন হচ্ছে নাফল৷ আরবী ভাষায় ওয়াজিব অথবা যথার্থ অধিকার ও মূল পাওনার অতিরিক্তকে নফল বলা হয়৷ এ ধরনের নফল যদি কোন অধীনের পক্ষে থেকে হয় তাহলে তার অর্থ হয়, গোলাম নিজের প্রভুর জন্যে স্বেচ্ছাকৃতভাবে অবশ্য পালনীয় কর্তব্যের চাইতে বাড়তি কিছু কাজ করেছে৷ আর যখন তা মালিক বা কর্তার পক্ষ থেকে হয় তখন তার অর্থ হয় এমন ধরনের দান বা পুরস্কার যা প্রভুর পক্ষ থেকে বান্দা বা গোলামকে তার যথার্থ পাওনা ও অধিকারের অতিরিক্ত বা বখশিস হিসেবে দেয়া হয়েছে৷ কাজেই এখানে এ বক্তব্যের অর্থ হচ্ছে, আল্লাহর দেয়া পুরস্কার ও অনুগ্রহ সম্পর্কেই কি এ সমস্ত বাদানুবাদ, জিজ্ঞাসাবাদ ও কলহ -বিতর্ক চলেছে?যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে তোমরা কবেই বা তার মালিক ও সর্বসময় ক্ষমতার অধিকারী হলে যে, তোমরা নিজেরাই তা বন্টন করার সিব্ধান্ত নিয়ে নিলে? যিনি এ সম্পদ দান করেছেন তিনি সিদ্ধান্ত দেবেন, কাকে দেয়া হবে, কাকে দেয়া হবে না এবং যাকে দেয়া হবে কতটুকু দেয়া হবে?

যুদ্ধ প্রসংগে এটা ছিল একটা অনেক বড় ধরনের নৈতিক সংস্কার ৷ মুসলমানদের যুদ্ধ দুনিয়ার বস্তুগত স্বার্থ ও সম্পদ লাভ করার জন্য নয় বরং সত্যের নীতি অনুযায়ী দুনিয়ার নৈতিক ও তামাদ্দুনিক বিকৃতির সংস্কার সাধন করার জন্যেই তা হয়ে থাকে৷ আর এ যুদ্ধ নীতি বাধ্য হয়ে তখনই অবলম্বন করা হয় যখন প্রতিবন্ধক শক্তিগুলো স্বাভাবিক দাওয়াত ও প্রচার পদ্ধিতির মাধ্যমে সংস্কার সাধনের সমস্ত পথ রুদ্ধ করে দেয়৷কাজেই সংস্কারদের দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকতে হবে উদ্দেশ্যের প্রতি ৷ উদ্দেশ্যের জন্যে সংগ্রাম করতে গিয়ে আল্লাহর পক্ষে থেকে পুরস্কার হিসেবে যেসব সম্পদ লাভ করা হয় সেদিকে তাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকা উচিত নয়৷ শুরুতেই যদি এসব স্বার্থ থেকে তাদের দৃষ্টি সরিয়ে না দেয়া হয় তাহলে অতি দ্রুত তাদের মধ্যে নৈতিক অধপতন সূচিত হবে এবং তারা এসব স্বার্থ লাভকে নিজেদের উদ্দেশ্য হিসেবে গন্য করবে৷

তাছাড়া এটা যুদ্ধ প্রসংগে একটা বড় রকমের প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সংস্কারও ছিল৷ প্রাচীন যুগের পদ্ধতি ছিল, যুদ্ধে যে মালমাত্তা যার হস্তগত হতো সেই তার মালিক গণ্য হতো৷অথবা বাদশাহ ও সেনাপতি সমস্ত গনীমতের মালের মালিক হয়ে বসতো৷ প্রথম অবস্থায় দেখা যেতো প্রায়ই বিজয়ী সেনাদলের মধ্যে গনীমতের মাল নিয়ে প্রচন্ড সংঘাত দেখা দিয়েছে৷ এমনকি অনেক সময় তাদের এ অভ্যন্তরীণ সংঘাত তাদের বিজয়কে পরাজয়ে রুপান্তরিত করে দিতো৷ দ্বিতীয় অবস্থায় সৈন্যরা চুরি করতে অভ্যস্থ হয়ে পড়তো৷ তারা গনিমতের মাল লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করতো৷ কুরআন গনীমতের মালকে আল্লাহ ও রসূলের সম্পদ গণ্য করে প্রথমে এ নীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে যে, সমস্ত গনিমতের মাল কোন রকম কমবেশী না করে পুরোপুরি ইমামের সামনে এনে রেখে দিতে হবে৷ তার মধ্য থেকে একটি সুইও লুকিয়ে রাখা যাবে না৷ তারপর সামনের দিকে অগ্রসর হয়ে এ সম্পদ বন্টনের জন্যে নিম্নোক্ত আইন প্রণয়ন করেছেঃএ সম্পদের পাঁচ ভাগের এক ভাগ আল্লাহর কাজ ও তাঁর গরীর বান্দাদের সাহায্যের জন্য বায়তুল মালে জমা দিতে হবে৷ আর বাকি চার ভাগ যুদ্ধে যে সেনাদল শরীক হয়েছিল তাদের মধ্যে সমানভাগে ভাগ করে দিতে হবে৷ এভাবে জাহেলী যুগের পদ্ধতিতে যে দুটি ত্রুটি ছিল তা দূর হয়ে গেছে৷

এখানে আরো একটি সুক্ষ্ম তত্ত্বও জেনে রাখতে হবে৷ গনিমতের মাল সম্পর্কে এখানে শুধুমাত্র এতটুকু কথাই বলাই শেষ করে দেয়া হয়েছে যে, এটা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের৷ এ সম্পদ বন্টনের কোন প্রসংগ এখানে উত্থাপন করা হয়নি৷ এর কারণ প্রথমে স্বীকৃতি ও আনুগত্যের ভাবধারার পূর্ণতা লাভই ছিল উদ্দেশ্য৷ তারপর সামনের দিকে গিয়ে কয়েক রুকূ পরে এ সম্পদ কিভাকে বন্টন করতে হবে তা বলে দেয়া হয়েছে৷তাই এখানে একে 'আনফাল' বলা হয়েছে এবং পঞ্চম রুকুতে এ সম্পদ বন্টন করার বিধান বর্ণনা প্রসংগে একে 'গানায়েম' (গনিমাতের বহুবচন৷) বলা হয়েছে৷
২. অর্থাৎ যখনই মানুসের সামনে আল্লাহর কোন হুকুম আসে এবং সে তার সত্যতা মেনে নিয়ে আনুগত্যের শির নত করে দেয় তখনই তার ঈমান বেড়ে যায়৷ এ ধরেনের প্রত্যেকটি অবস্থায় এমনটিই হয়ে থাকে৷ যখনই আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রসূলের হেদায়াতের মধে মানুষ এমন কোন জিনিস দেখে যা তার ইচ্ছা আশা-আকাংখা , চিন্তা-ভাবনা মতবাদ , পরিচিত আচার-আচরণ , স্বার্থ, আরাম-আয়েশ ,ভালোবাসা, ও বন্ধুত্ব বিরোধী হয় এবং সে তা মেনে নিয়ে আল্লাহ ও রসূলের বিধান পরিবর্তন করার পরিবর্তে নিজেকে পরিবর্তিত করে ফেলে এবং তা গ্রহণ করতে গিয়ে কষ্ট স্বীকার করে নেয় তখন মানুষের ঈমান তরতাজা ও পরিপুষ্ট হয়৷ পক্ষান্তরে এমনটি করতে অস্বীকৃতি জানালে মানুষের ঈমানের প্রাণ শক্তি নিস্তেজ হয়ে যেতে থাকে৷ কাজেই জানা গেলো, ঈমান কোন অনড়, নিশ্চল , এ স্থির জিনিসের নাম নয়৷ এটা শুধুমাত্র একবার মানাও না মানার ব্যাপার নয়৷ একবার না মানলে শুধুমাত্র একবারই না মানা হলো এবং একবার মেনে নিলে কেবলমাত্র একবারই মেনে নেয়া হলো এমন নয়৷ বরং মানা ও না মানা উভয়ের মধ্যে হ্রাস বৃদ্ধি রয়েছে৷ প্রত্যেকটি অস্বীকৃতির মাত্রা কমতেও পারে, বাড়তেও পারে৷ আবার এমনিভাবে প্রত্যেকটি স্বীকৃতি ও মেনে নেয়ার মাত্রাও বাড়তে কমতে পারে৷ তবে ফিকাহর বিধানের দিক দিয়ে তামাদ্দুনিক ব্যবস্থায় অধিকার ও মর্যাদা নির্দিষ্ট করার সময় মানা ও না মানার ব্যাপাটির একবারই গন্য করা হয়৷ ইসলামী সমাজে সকল স্বীকৃতি দানকারী (মুমিন) আইনগত অধিকার ও মর্যাদা সমান৷ তাদের মধ্যে মানার (ঈমান )ব্যাপারে বহুতর পার্থক্য থাকতে পারে৷ তাতে কিছু আসে যায় না৷ আবার সকল অস্বীকৃতিদানকারী একই পর্যায়ের যিম্মী বা হরবী(যুদ্ধমান) অথবা চুক্তিবদ্ধ ও আশ্রিত গণ্য হয়, তাদের মধ্যে কুফরীর ব্যাপারে যতই পার্থ্ক্য থাক না কেন৷
৩. বড় বড় ও উন্নত পর্যায়ের ঈমানদাররাও ভুল করতে পারে এবং তাদের ভুল হয়েছেও৷ যতদিন মানুষ মানুষ হিসেবে দুনিয়ার বুকে বেঁচে আছে ততদিন তার আমলনামা শুধুমাত্র উৎকৃষ্ট মানের কার্যকলাপে ভর্তি থাকবে এবং দোষ-ত্রুটি ও ভুল -ভ্রান্তি থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকবে এমনটি হতে পারে না৷ কিন্তু মহান আল্লাহর একটি বড় রহমত হচ্ছে এই যে, যতদিন মানুষ বন্দেগীর অনিবার্য শর্তসমূহ পূর্ণ করে ততদিন আল্লাহ তার ভুল-ত্রুটি উপেক্ষা করতে থাকেন এবং তার কার্যাবলী যে ধরনের প্রতিদান লাভের যোগ্যতা সম্পন্ন হয় নিজ অনুগ্রহে তার চেয়ে কিছু বেশী প্রতিদান তাকে দান করেন নয়তো যদি প্রত্যেকটি ভুলের শাস্তি ও প্রত্যেকটি ভাল কাজের পুরস্কার আলাদাভাবে দেবার নিয়ম করা হতো তাহলে কোন অতি বড় সৎলোকও শাস্তির হাত থেকে রেহাই পেতো না৷
৪. অর্থাৎ তারা সে সময় বিপদের মোকাবিলা করতে ভয় পাচ্ছিল , অথচ বিপদের মুখে এগিয়ে যাওয়াই তখন ছিল সত্যের দাবী৷ ঠিক তেমনি গনীমতের মাল হাতছাড়া করতে আজ তাদের কষ্ট হচ্ছে, অথচ তা পরিহার করে হুকুমের প্রতীক্ষা করাই আজ সত্যের দাবী৷ এর দ্বিতীয় অর্থ এ হতে পারে, যদি আল্লহার আনুগত্যে করো এবং নিজের নফসের খাহেশের পরিবর্তে রসূলের কথা মেনে নাও তাহলে ঠিক তেমনি ভাল ফল দেখতে পারে যেমন এখনি বদর যুদ্ধের সময় দেখছো৷ কুরাইশদের সেনাদলের বিরুদ্ধে লড়াই করতে যাওয়া তোমাদের কাছে বড়ই দুসহনীয় মনে হয়েছিল এবং তাকে তোমরা ধ্বংসের বার্তাবহ মনে করেছিলে ৷ কিন্তু যখন তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নির্দেশ পালন করলে তখন এ বিপজ্জনক কাজটিই তোমাদের জন্যে জীবনের সাফল্যের বার্তা বহন করে আনলো৷

সাধারণভাবে সীরাত ও যুদ্ধের বর্ণনা সংক্রান্ত ইতিহাস গ্রন্থসমূহে বদর যুদ্ধ প্রসংহে যেসব বর্ণনা এসেছে৷কুরআনের এ বক্তব্য পরোক্ষভাবে তার প্রতিবাদ করেছে৷ অর্থাৎ এসব গ্রন্থে বলা হয়েছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুমিনদের নিয়ে প্রথমে কুরাইশদের বাণিজ্য কাফেলা, লুট করার উদ্দেশ্য মদীনা থেকে রওয়ানা হয়েছিলেন৷ তাপর কয়েক মনযিল পথ অতিক্রম করার পর যখন জানা গেলো মক্কা থেকে কুরাইশদের সেনাবাহিনী কাফেলার হেফাজত করার জন্যে এগিয়ে আসছে তখন পরামর্শ করা হলো, কাফেলার ওপর আক্রমণ করা হবে না সেনাবাহিনীর মোকাবিলা করা হবে ? কিন্তু কুরআন এর সম্পূর্ণ কথা বলছে৷ কুরআন বলছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন ঘর থেকে বের হয়েছিলেন তখনই কুরাইশ সেনাদলের সাথে চুড়ান্ত যুদ্ধ করার বিষয়টি তার সামনে ছিল৷ আর কাফেলা ও সেনাদল কোনটিকে আক্রমণ করা হবে, এ পরামর্শ ও তখনি করা হয়েছিল৷ সেনাদলের মোকাবিলা করা অপরিহার্য এ সত্যটি মুমিনদের কাছে সুষ্পষ্ট হয়ে গেলেও তাদের মধ্য থেকে একদল লোক যুদ্ধের হাত থেকে রেহাই পাবার জন্যে বিতর্ক করে চলছিল৷ তারপর সবশেষে যখন সেনাদলের দিকে অগ্রসর হবার বিষয়টি চুড়ান্তভাবে স্থিরিকৃত হয়ে গলো তখন এ দলটি মদীনা থেকে একথা মনে করেই বের হলো যে, তাদেরকে সোজা মৃত্যুর দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ৷

৫. অর্থাৎ বাণিজ্য কাফেলা বা কুরাইশ সেনাদল৷
৬. অর্থাৎ বাণিজ্য কাফেলা ৷ তাদের সাথে মাত্র তিরিশ চল্লিশ জন রক্ষী ছিল৷
৭. এ থেকে অনুমান করা যায়, সে সময় কোন ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল৷ এ সূরার ভূমিকায় আমি উল্লেখ করেছি, কুরাইশ সেনাদল অগ্রসর হবার পর মূলত প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল, ইসলামী দাওয়াত ও জাহেলী ব্যবস্থা৷ এ দুয়ের মধ্যে আরব ভুখণ্ডে কার বেঁচে থাকার অধিকার আছে?যদি মুসলমানরা সে সময় সাহসের সাথে মোকাবিলা করতে এগিয়ে না আসতো তাহলে এরপর ইসলামের জন্য আর বেঁচে থাকার কোন সুযোগ থাকতো না৷ পক্ষান্তরে মুসলমানদের ঘর থেকে বের হয়ে পড়ার এবং প্রথম পদক্ষেপেই কুরাইশ শক্তির ওপর চুড়ান্ত আঘাত হানার কারণে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল যার ফলে ইসলাম মজবুতভাবে পা রাখার জায়গা পেয়ে গিয়েছিল এবং এর পরের সমস্ত মোকাবিলায় জাহেলিয়াত একের পর এক পরাজয়বরণ করেছিল৷