(৭৯:১) সেই ফেরেশতাদের কসম যারা ডুব দিয়ে টানে
(৭৯:২) এবং খুব আস্তে আস্তে বের করে নিয়ে যায়৷
(৭৯:৩) আর (সেই ফেরেশতাদেরও যারা বিশ্বলোকে ) দ্রুত গতিতে সাঁতরে চলে,
(৭৯:৪) বারবার (হুকুম পালনের ব্যাপারে )সবেগে এগিয়ে যায়,
(৭৯:৫) এরপর (আল্লাহর হুকুম অনুয়াযী )সকল বিষয়ের কাজ পরিচালনা করে৷
(৭৯:৬) যেদিন ভূমিকম্পের ধাক্কা ঝাঁকুনি দেবে
(৭৯:৭) এবং তারপর আসবে আর একটি ধাক্কা৷
(৭৯:৮) কতক হৃদয় সেদিন ভয়ে কাঁপতে থাকবে৷
(৭৯:৯) দৃষ্টি হবে তাদের ভীতি বিহবল৷
(৭৯:১০) এরা বলে, “সত্যিই কি আমাদের আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হবে ?
(৭৯:১১) পচা -গলা হাড্ডিতে পরিণত হয়ে যাওয়ার পরও ? ”
(৭৯:১২) বলতে থাকে “তাহলে তো এ ফিরে আসা হবে বড়ই লোকসানের !”
(৭৯:১৩) অথচ এটা শুধুমাত্র একটা বড় রকমের ধমক
(৭৯:১৪) এবং হঠাৎ তারা হাযির হবে একটি খোলা ময়দানে৷
(৭৯:১৫) তোমার কাছে কি মূসার ঘটনার খবর পৌঁছেছে ?
(৭৯:১৬) যখন তার রব তাকে পবিত্র ‘তুওয়া’ উপত্যকায় ডেকে বলেছিলেন ,
(৭৯:১৭) “ফেরাউনের কাছে যাও , সে বিদ্রোহী হয়ে গেছে৷
(৭৯:১৮) তাকে বলো , তোমার কি পবিত্রতা অবলম্বন করার আগ্রহ আছে
(৭৯:১৯) এবং তোমার রবের দিকে আমি তোমাকে পথ দেখাবো , তাহলে তোমার মধ্যে (তাঁর) ভয় জাগবে ?
(৭৯:২০) তারপর মূসা ফেরাউনের কাছে গিয়ে তাকে বড় নিদর্শন দেখালো ৷
(৭৯:২১) কিন্তু সে মিথ্যা মনে করে প্রত্যাখ্যান করলো ও অমান্য করলো ,
(৭৯:২২) তারপর চালবাজী করার মতলবে পিছনে ফিরলো ৷১০
(৭৯:২৩) এবং লোকদের জমায়েত করে তাদেরকে সম্বোধন করে বললো :
(৭৯:২৪) আমি তোমাদের সবচেয়ে বড় রব ” ১১
(৭৯:২৫) অবশেষে আল্লাহ তাকে আখেরাত ও দুনিয়ার আযাবে পাকড়াও করলেন৷
(৭৯:২৬) আসলে এর মধ্যে রয়েছে মস্তবড় শিক্ষা , যে ভয় করে তার জন্যে৷১২
১. এখানে যে বিষয়টির জন্য পাঁচটি গুণাবলীসম্পন্ন সত্তাসমূহের কসম খাওয়া হয়েছে তার কোন বিস্তারিত আলোচনা করা হয়নি৷কিন্তু পরবর্তী আলোচনায় যেসব বিষয় উত্থাপিত হয়েছে তা থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে একথাই প্রমাণিত হয় যে,কিয়ামত অবশ্যি হবে এবং সমস্ত মৃত মানুষদের নিশ্চিতভাবেই আবার নতুন করে জীবিত করে উঠানো হবে,একথার ওপরই এখানে কসম খাওয়া হয়েছে৷ এ পাঁচটি গুণাবলী কোন কোন সত্তার সাথে জড়িত,একথাও এখানে পরিস্কার করে বলা হয়নি৷ কিন্তু বিপুল সংখ্যক সাহাবী ও তাবেঈন এবং অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে এখানে ফেরেশতাদের কথা বলা হয়েছে৷ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা ) ,হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা ),মাসরূক,সাঈদ ইবনে যুবাইর,আবু সালেহ ,আবুদ দূহা ও সুদ্দী বলেন : ডুব দিয়ে টানা এবং আস্তে আস্তে বের করে আনা এমন সব ফেরেশতার কাজ যারা মৃত্যুকালে মানুষের শরীরের গভীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তার প্রতিটি শিরা উপশিরা থেকে তার প্রাণ বায়ু টেনে বের করে আনে৷ দ্রুতগতিতে সাঁতরে চলার সাথে হযরত আলী (রা ),হযরত ইবনে মাসউদ (রা ),মুজাহিদ,সাঈদ ইবেন জুবাইর ও আবু সালেহ ফেরেশতাদেরকেই সংশ্লিষ্ট করেছেন৷ এ ফেরেশতারা আল্লাহর হুকুম তামিল করার জন্য এমন দ্রুত গতিশীল রয়েছে যেন মনে হচ্ছে তারা মহাশূন্যে সাঁতার কাঠছে৷ "সবেগে এগিয়ে যাওয়ার" ব্যাপারেও এই একই অর্থ গ্রহণ করেছেন হযরত আলী (রা)মুজাহিদ,আতা ,আবু সালেহ, মাসরূক ও হাসান বসরী প্রমুখগণ৷আর সবেগে এগিয়ে অর্থ হচ্ছে,আল্লাহের হুকুমের ইশারা পাওয়ার সাথে সাথেই তাদের প্রত্যেকই তা তামিল করার জন্যে দৌড়ে যায়৷ "সকল বিষয়ের সাথে পরিচালনাকারী বলতেও ফেরেশতাদের কথাই বুঝানো হয়েছে৷ হযরত আলী (রা ),মুজাহিদ,আতা ,আবু সালেহ,হাসান বসরী,কাতাদাহ থেকে একথাই উদ্ধৃত হয়েছে৷অন্য কথায় বলা যায়, এরা বিশ্ব ব্যবস্থাপনার এমন সব কর্মচারী যাদের হাতে আল্লাহর হুকুমে দুনিয়ার সমগ্র ব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে৷ কোন সহীহ হাদীসে এ আয়াতগুলোর এ অর্থ বর্ণিত না হলেও প্রথম সারির কয়েকজন সাহাবা এবং তাঁদেরই ছাত্রমণ্ডলীর অন্তরভুক্ত কতিপয় তাবেঈ যখন এগুলোর এ অর্থ বর্ণনা করেছেন তখন তাঁদের এই জ্ঞান নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে অর্জিত হয়ে থাকবে মনে করাটাই স্বাভাবিক৷এখন প্রশ্ন দেখা দেয়, কিয়ামত অনুষ্ঠিত হওয়া ও মৃত্যুর পরের জীবন সম্পর্কে ফেরেশতাদের কসম খাওয়ার কারণ কি ? তারা নিজেরাই তো সে জিনিসের মতো অদৃশ্য ও অননুভূত , যা অনুষ্ঠিত হবার ব্যাপারে তাদেরকে সাক্ষী ও প্রমাণ হিসেবে পেশ করা হয়েছে ? এর কারণ অবশ্য আল্লাহ ভালো জানেন৷ তবে আমার মতে এর কারণ হচ্ছে , আরববাসীরা ফেরেশতাদের অস্তিত্ব অস্বীকার করতো না৷ তারা স্বীকার করতো মৃত্যুকালে ফেরেশতারাই মানুষের প্রাণ বের করে নিয়ে যায়৷ তারা একথাও বিশ্বাস করতো যে , ফেরেশতারা অতি দ্রুতগতিশীল হয় , এক মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবী থেকে আকাশ পর্যন্ত এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় চলে যায় এবং হুকুম করার সাথে সাথেই যে কোন কাজ মুহূর্তকাল দেরী না করেই করে ফেলে৷ তারা একথা ও মানতো , ফেরেশতারা আল্লাহর হুকুমের অনুগত এবং আল্লাহর হুকুমেই বিশ্ব জাহানের সমগ্র ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করে ৷ ফেরেশতারা স্বাধীন এবং স্বতন্ত্র ইচ্ছা ও কর্মপ্রেরণার অধিকারী নয়৷ মূর্খতা ও অজ্ঞতার কারণে তারা অবশ্যি ফেরেশতাদেরকে আল্লাহর কন্যা বলতো ৷ তারা তাদেরকে নিজেদের মাবুদে পরিণত করেছিল৷ কিন্তু আসল ক্ষমতা ইখতিয়ার যে ফেরেশতাদের হাতে একথা তারা মনে করতো না৷ তাই এখানে কিয়ামত হওয়া এবং মৃত্যুর পরের জীবন প্রমাণ করার উদ্দেশ্যেই ফেরেশতাদের উপরোল্লিখিত গুণাবলীর কথা বলা হয়েছে৷ বলা হয়েছে যে আল্লাহর হুকুমে ফেরেশতারা তোমাদের প্রাণ বের করে নিয়ে যায় , তাঁরই হুকুমে তারা আবার তোমাদের প্রাণ দানও করতে পারে৷ যে আল্লাহর হুকুমে তারা বিশ্ব জাহানের ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করছে তাঁরই হুকুমে , যখনই তিনি এ হুকুম করবেন তখনই তারা এ বিশ্ব জাহানকে ধ্বংস করে দিতে এবং আর একটি নতুন দুনিয়া সৃষ্টি করতে ও পারে৷ তার হুকুম তামিল করার ব্যাপারে তাদের পক্ষ থেকে সামান্যতম শৈতিল্য বা মুহূর্তকাল দেরীও হতে পারে না৷
২. প্রথম ধাক্কা বলতে এমন ধাক্কা বুঝানো হয়েছে , যা পৃথিবী ও তার মধ্যকার সমস্ত জিনিস ধ্বংস করে দেবে৷ আর দ্বিতীয় ধাক্কা বলতে যে ধাক্কায় সমস্ত মৃতরা জীবিত হয়ে যমীনের মধ্য থেকে বের হয়ে আসবে তাকে বুঝানো হয়েছে ৷ সূরা যুমারে এ অবস্থাটি নিম্নোক্তভাবে বর্ণিত হয়েছে : "আর শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে৷ তখন পৃথিবী ও আকাশসমূহে যা কিছু আছে সব মরে পড়ে যাবে , তবে কেবলমাত্র তারাই জীবিত থাকবে যাদের আল্লাহ ( জীবিত রাখতে ) চাইবেন৷ তারপর দ্বিতীয়বার ফুঁক দেয়া হবে৷ তখন তারা সবাই আবার হঠাৎ উঠে দেখতে থাকবে৷ " ( ৬৮ আয়াত )
৩. "কতক হৃদয় " বলা হয়েছে কারণ কুরআন মজীদের দৃষ্টিতে শুধুমাত্র কাফের , নাফরমান ও মুনাফিকরাই কিয়ামতের দিন ভীত ও আতংকিত হবে৷ সৎ মু'মিন বান্দাদের ওপর এ ভীতি প্রভাব বিস্তার করবে না৷ সূরা আম্বিয়ায় তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে : " সেই চরম ভীতি ও আতংকের দিনে তারা একটু ও পেরেশান হবে না এবং ফেরেশতারা এগিয়ে এসে তাদেরকে অভ্যর্থনা জানাবে৷ তারা বলতে থাকবে , তোমাদের সাথে এ দিনটিরই ওয়াদা করা হয়েছিল৷ " ( ১০৩ আয়াত )
৪. অর্থাৎ যখন তাদেরকে বলা হল , হাঁ সেখানে এমনটিই হবে , তারা বিদ্রূপ করে পরস্পর বলাবলি করতে লাগলো : সত্যিই যদি আমাদের আবার জীবিত হয়ে ফিরে আসতে হয় তাহলে তো আমরা মারা পড়বো৷ এরপর আমাদের আর রক্ষা নেই ৷
৫. অর্থাৎ তারা এটাকে একটি অসম্ভব কাজ মনে করে একে বিদ্রূপ করছে৷ অথচ আল্লাহর জন্য এটা কোন কঠিন কাজ নয়৷ এ কাজটি করতে তাঁকে কোন বড় রকনের প্রস্তুতি নিতে হবে না৷ এর জন্য শুধুমাত্র একটি ধমক বা ঝাঁকুনিই যথেষ্ট৷ সঙ্গে সঙ্গেই তোমাদের শরীরের ধবংসাবশেষ মাটি বা ছাই যে কোন আকারেই থাক না কেন সব দিক থেকে উঠে এসে এক জায়গায় জমা হবে এবং অকস্মাৎ তোমরা নিজেদেরকে পৃথিবীর বুকে জীবিত আকারে দেখতে পাবে৷ এ ফিরে আসাকে যতই ক্ষতিকর মনে করে তোমরা তা থেকে পালিয়ে থাকার চেষ্টা করো না কেন , এ ঘটনা অব্যশই ঘটবে৷ তোমাদের অস্বীকার , পালায়ন প্রচেষ্টা বা ঠাট্টা - বিদ্রূপে এটা থেমে যাবে না৷
৬. মক্কার কাফেরদের কিয়ামত ও আখেরাতকে না মানা এবং তা নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রূপ করা আসলে কোন দার্শনিক তত্ত্বের অস্বীকৃতি ছিল না৷ বরং এভাবে তারা আল্লাহর রসূলের প্রতি মিথ্যা আরোপ করতো৷ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে তারা যে কৌশল অবলম্বন করতো তা কোন সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে ছিল না৷ বরং তার উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর রসূলকে আঘাত হানা ও ক্ষতিগ্রস্ত করা৷ তাই আখেরাতের জীবনের ব্যাপারে আরো বেশী যুক্তিপ্রমাণ পেশ করার আগে তাদেরকে হযরত মূসা (আ) ও ফেরাউনের ঘটনা শুনানো হচ্ছে৷ এভাবে তারা রসূলের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হওয়া এবং রসূল প্রেরণকারী আল্লাহর মোকাবিলায় মাথা উঁচু করার পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক হয়ে যেতে পারবে৷
৭. পবিত্র তুওয়া উপত্যকার অর্থ বর্ণনা করে সাধারণভাবে মুফাসসিরগণ বলেছেন : " সেই পবিত্র উপত্যকাটি যার নাম ছিল তুওয়া " কিন্তু এ ছাড়া এর আরো দু'টি অর্থও হয় ৷ এক , " যে উপত্যকাটিকে দু'বার পবিত্র করা হয়েছে ৷ " কারণ মহান আল্লাহ হযরত মূসা (আ) কে সেখানে সম্বোধন করে প্রথম বার তাকে পবিত্র করেন৷ আর হযরত মুসা বনী ইসরাঈলকে মিসর থেকে বের করে এনে এ উপত্যকায় অবস্থান কররে আল্লাহ তাকে দ্বিতীয়বার পবিত্রতার মর্যাদায় ভূষিত করেন৷ দুই " রাতে পবিত্র উপত্যকায় সম্বোধন করেন৷ " আরবী প্রবাদে বলা হয় : আরবী ------------------------------ অর্থাৎ উমুক ব্যক্তি রাতের কিছু অংশ অতিক্রম করার পর এসেছিল৷
৮. এখানে কয়েকটি কথা ভালোভাবে বুঝে নিতে হবে :

এক : হযরত মূসাকে নবুওয়াতের দায়িত্বে নিযুক্ত করার সময় তাঁর ও আল্লাহর মধ্যে যেসব কথা হয়েছিল কুরআন মজীদের যথার্থ স্থানে তা কোথাও সংক্ষেপে আবার কোথাও বিস্তারিত বিবৃত হয়েছে৷ এখানে সংক্ষেপে বলার সুযোগ ছিল৷ তাই এখানে কেবল সেগুলোর সারাংশই বর্ণনা করা হয়েছে৷ সূরা ত্বা - হার ৯ থেকে ৪৮, শূ' আরার ১০ থেকে ১৭ , নামলের ৭ থেকে ১২ এবং কাসাসের ২৯ থেকে ৩৫ আয়াতে এর বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে৷

দুই : এখানে ফেরাউনের যে বিদ্রোহের কথা বলা হয়েছে তার অর্থ হচ্ছে , বন্দেগীর সীমানা অতিক্রম করে স্রষ্টা ও সৃষ্টি উভয়ের মোকাবিলায় বিদ্রোহ করা৷ সৃষ্টার মোকাবিলায় বিদ্রোহ করার বিষয়টি আলোচনা সামনের দিকে এসে যাচ্ছে ৷ সেখানে বলা হয়েছে : ফেরাউন তার প্রজাদের সমবেত করে ঘোষণা করে , " আমি তোমাদের সবচেয়ে বড় রব৷" আর সৃষ্টির মোকাবিলায় তার বিদ্রোহ ও সীমালংঘন ছিল এই যে , সে নিজের শাসনাধীন এলাকার অধিবাসীদের বিভিন্ন দলে ও শ্রেণীতে বিভক্ত করে রেখেছিল৷ দুর্বল শ্রেণীগুলোর ওপর সে চালাতো কঠোর জুলুম - নির্যাতন এবং নিজের সমগ্র জাতিকে বোকা বানিয়ে তাদেরকে নিজের দাসে পরিণত করে রেখেছিল একথা সূরা কাসাসের ১৪ আয়াতে এবং সূরা যুখরুফের ৫৪ আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে৷

তিন : হযরত মূসাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল :

আরবী ----------------------------------------------------)

"তুমি ও তোমার ভাই হারুন , তোমরা দু'জন তার সাথে মোলায়েম সুরে কথা বলবে , হয়তো সে নসীহত গ্রহণ করতে ও আল্লাহকে ভয় করতে পারে৷ " ( সূরা ত্বা - হা ৪৪ আয়াত ) এ মোলায়েম সুরে কথা বলার একটা নমুনা এ আয়াতগুলোতে পেশ করা হয়েছে ৷ এ থেকে একজন পথভ্রষ্ট ব্যক্তিকে পথ দেখাবার জন্য তার কাছে কিভাবে বিচক্ষণতার সাথে সত্যের দাওয়াত পেশ করতে হবে তার কলাকৌশল জানা যায় ৷ এর দ্বিতীয় নমুনাটি পেশ করা হয়েছে সূরা ত্বা - হা'র ৪৯ থেকে ৫২ , আশ শূ'আরার ২৩ থেকে ২৮ এবং আল কাসাসের ৩৭ আয়াতে ৷ কুরআন মজীদে মহান আল্লাহ যেসব আয়াতে ইসলামের দাওয়াত প্রচারের কৌশল শিখিয়েছেন এ আয়াতগুলো তারই অন্তরভুক্ত ৷

চার : হযরত মূসাকে শুধুমাত্র বনী ইসরাঈলদের মুক্ত করার জন্য ফেরাউনের কাছে পাঠনো হয়নি , যেমন কোন কোন লোক মনে করে থাকেন ৷ বরং তাঁকে নবুওয়াত দান করে ফেরাউনের কাছে পাঠাবার প্রথম উদ্দেশ্যে এই ছিল ফেরাউন ও তার কওমকে সত্য সঠিক পথ দেখানো৷ এর দ্বিতীয় উদ্দেশ্যই ছিল , যদি সে সত্য সঠিক পথ গ্রহণ না করে তাহলে তিনি বনী ইসরাঈলকে ( যারা আসলে ছিল একটি মুসলিম কওম ) তার দাসত্বমুক্ত করে মিসর থেকে বের করে আনবেন৷ ' এ আয়াত গুলো থেকেও একথা সুস্পষ্ট হয়ে যায়৷ কারণ এগুলোতে বনী ইসরাঈলের রেহাইয়ের কোন উল্লেখই নেই৷ বরং হযরত মূসাকে ফেরাউনের সামনে কেবলমাত্র সত্যের দাওয়াত প্রচার করার হুকুম দেয়া হয়েছে৷ যেসব আয়াতে হযরত মূসা ইসলামের বাণী প্রচার করেছেন এবং বনী ইসরাঈলদের রেহাই এর দাবী ও করেছেন যেসব আয়াত থেকেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়৷ যেমন আল ' আরাফের ১০৪ থেকে ১০৫ , ত্বা-হা'র ৪৭ থেকে ৫২ , আশ শূ'আরার ১৬ থেকে ১৭ এবং ২৩ থেকে ২৮ আয়াত৷ ( আর ও বেশী ব্যাখ্যা জানার জন্য তাফহীমূল কুরআন সূরা ইউনুসের ৭৪ টীকা দেখুন)

পাঁচ : এখানে পবিত্রতা ( আত্মিক শুদ্ধতা ) অবলম্বন করার অর্থ হচ্ছে আকীদা বিশ্বাস , চরিত্র কর্ম সবক্ষেত্রে পবিত্রতা অবলম্বন করা৷ অন্য কথায় ইসলাম গ্রহণ করা ৷ ইবনে যায়েদ বলেন , কুরআনে যেখানেই [ তাযাক্কী ( আত্মিক) শুদ্ধতা ] শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে সেখানেই এর অর্থ হয় ইসলাম গ্রহণ করা ৷ এর প্রমাণ হিসেবে তিনি কুরআন মজীদের নিম্নোক্ত আয়াত তিনটি পেশ করেন : আরবী ---------------------------------------"আর এটি হচ্ছে , তাদের প্রতিদান যারা পবিত্রতা অবলম্বন করে ৷ " অর্থাৎ ইসলাম গ্রহণ করে ৷ আরবী --------------------------------------------------------------------------------------"আর তোমরা জান হয়তো তারা পবিত্রতা অবলম্বন করতে পারে৷ " অর্থাৎ মুসলমান হয়ে যেতে পারে৷ (আরবী ----------------------) "আর কী যদি তারা পবিত্রতা অবলম্বন করতে না পারে তাহলে তোমার কি দায়িত্ব আছে ? অর্থাৎ যদি তারা মুসলমান না হয় ৷ (ইবনে জারীর ৷)

ছয় : আর " তোমরা রবের দিকে আমি তোমাকে পথ দেখাবো , তাহলে তোমার মধ্যে (তাঁর ) ভয় জাগবে " একথার অর্থ হচ্ছে , যখন তুমি নিজের রবকে চিনে নেবে এবং তুমি জানতে পারবে যে , তুমি তার বান্দাহ , স্বাধীন ও স্বয়ংসম্পর্ণ ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তি নও তখন অনিবার্যভাবে তোমার দিলে তাঁর ভয় সৃষ্টি হবে৷ আর আল্লাহর ভয় এমন একটি জিনিস যার ওপর দুনিয়ার মানুষের সঠিক ও নির্ভুল দৃষ্টিভংগী গ্রহণ নির্ভর করে৷ আল্লাহর জ্ঞান এবং তাঁর ভয় ছাড়া কোন প্রকার পবিত্রতা ও শুদ্ধ আত্মার কল্পনাই করা যেতে পারে না৷
৯. বড় নিদর্শন বলতে এখানে লাঠির অজগর হয়ে যাওয়ার কথাই বুঝানো হয়েছে৷ কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে এর উল্লেখ করা হয়েছে৷ অবশ্যি একটি নিষ্প্রাণ লাঠির মানুষের চোখের সামনে একটি জলজ্যান্ত অজগর সাপে পরিণত হওয়া , যাদুকরেরা এর মোকাবিলায় লাঠি ও দড়ি দিয়ে যেসব কৃত্রিম অজগর বানিয়ে দেখিয়েছিল সেগুলোকে টপাটপ গিলে ফেলা এবং হযরত মূসা ( আ) যখন একে ধরে উঠিয়ে নিলেন তখন আবার এর লাঠি হয়ে যাওয়া , এর চাইতে বড় নিদর্শন আর কী হতে পারে ? এসব একথারই সুস্পষ্ট আলামত যে , আল্লাহ রাব্বুল আলামীনেরই পক্ষ থেকে হযরত মূসা ( আ) প্রেরিত হয়েছিলেন ৷
১০. কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এর বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হয়েছে ৷ সেখানে বলা হয়েছে : ফেরাউন সারা মিসর থেকে শ্রেষ্ঠ পারদর্শী যাদুকরদের ডেকে আনে এবং একটি বিশাল সাধারণ সমাবেশে তাদেরকে লাঠি ও দড়ি দিয়ে অজগর সাপ বানাতে বলে , যাতে করে লোক বিশ্বাস করে যে মূসা আলাইহিস সালাম কোন নবী নন এবং একজন যাদুকর এবং লাঠিকে অজগরে পরিণত করার যে তেলেসমাতি তিনি দেখিয়েছেন অন্যান্য যাদুকররাও তা দেখাতে পারে ৷ কিন্তু তার এ প্রতারণাপূর্ণ কৌশল ব্যর্থ হলো এবং যাদুকররা পরাজিত হয়ে নিজেরাই স্বীকার করে নিল যে , হযরত মূসা আলাইহিস সালাম যা কিছু দেখিয়েছেন তা যাদু নয় বরং মু'জিযা৷
১১. ফেরাউনের এ দাবীটি কুরআনের কয়েকটি স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে৷ একবার সে হযরত মূসা ( আ) কে বলে, " যদি তুমি আমাকে ছাড়া আর কাউকে আল্লাহ বলে মেনে নিয়ে থাকো তাহলে আমি তোমাকে বন্দী করবো৷ " ( আশ শূ'আরার ২৯ আয়াত ) আর একবার সে তার দরবারের লোকদের সম্বোধন করে বলে , " হে জাতির প্রধানরা আমি জানি না আমি ছাড়া তোমাদের আর কোন খোদাও আছে ৷ " ( আল কাসাস ৩৮ আয়াত) ফেরাউনের এসব বক্তব্যের এ অর্থ ছিল না এবং এ অর্থ হতেও পারে না যে , সে-ই এই বিশ্ব জাহানের স্রষ্টা এবং এ পৃথিবীটাও সে সৃষ্টি করেছে৷ এসবের এ অর্থও ছিল না যে , সে আল্লাহর অস্তিত্ব অস্বীকার করে এবং নিজেকেই বিশ্ব -জাহানের রব বলে দাবী করে ৷ আবার এ অর্থও ছিল না যে , সে ধর্মীয় অর্থে একমাত্র নিজেকেই লোকদের মাবুদ ও উপাস্য গণ্য করে ৷ তার ধর্মের ব্যাপারে কুরআন মজীদই এর সাক্ষ্য দিচ্ছে যে , সে নিজেই অন্য উপাসাদের পূজা করতো৷ তাই দেখা যায় তার সভাসদরা একবার তাকে সম্বোধন করে বলে , " আপনি কি মূসাকে ও তার কওমকে দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করার এবং আপনাকে ও আপনার উপাস্যদেরকে ত্যাগ করার স্বাধীনতা দিতে থাকবেন ? (আল আ'রাফ ১২৭ আয়াত) কুরআনে ফেরাউনের এ বক্তব্যও উদ্ধৃতি হয়েছে যে, মূসা যদি আল্লাহর প্রেরিত হতো তাহলে তার কাছে সোনার কাঁকন অবতীর্ণ করা হয়নি কেন? অথবা তার সাথে ফেরেশতাদেরকে চাপরাশি -আরদালি হিসেবে পাঠানো হয়নি কেন ? ( আয যুখরুফ ৫৩ আয়াত ) কাজেই এ থেকে বুঝা যায় যে , আসলে সে ধর্মীয় অর্থে নয় বরং রাজনৈতিক অর্থে নিজেকে ইলাহ , উপাস্য ও প্রধান বর হিসেবে পেশ করতো৷ অর্থাৎ এর অর্থ ছিল , আমি হচ্ছি প্রধান কর্তৃত্বের মালিক৷ আমি ছাড়া আর কেউ আমার রাজ্যে হুকুম চালাবার অধিকার রাখে না৷ আর আমার ওপর আর কোন উচ্চতর ক্ষমতাধর ও নেই , যার ফরমান এখানে জারী হতে পারে৷ ( আরো বেশী ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমূল কোরআন , আর আ'রাফ ৮৫ টীকা, ত্বা-হা ২১ টীকা,আশ শূ'আরা ২৪ ও ২৬ টীকা, আল কাসাস ৫২ ও ৫৩ টীকা এবং আয যুখরুফ ৪৯ টীকা )
১২. অর্থাৎ আল্লাহর রসূলকে মিথ্যা বলার ও তাঁর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করার পরিণামকে ভয় করো৷ ফেরাউন এই পরিণামের মুখোমুখি হয়েছিল৷