(৭৮:১) এরা কি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ?
(৭৮:২) Is it about the awesome tiding সেই বড় খবরটা সম্পর্কে কি ,
(৭৮:৩) যে ব্যাপারে এরা নানান ধরনের কথা বলে ও ঠাট্টা - বিদ্রুপ করে ফিরছে ?
(৭৮:৪) কখনো না শীঘ্রই এরা জানতে পারবে৷
(৭৮:৫) হাঁ কখখনো না , শীঘ্রই এরা জানতে পারবে৷
(৭৮:৬) একথা কি সত্য নয় , আমি যমীনকে বিছানা বানিয়েছি ?
(৭৮:৭) পাহাড়গুলোকে গেঁড়ে দিয়েছি পেরেকের মতো ?
(৭৮:৮) তোমাদের (নারী ও পুরুষ ) জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি ?
(৭৮:৯) তোমাদের ঘুমকে করেছি শান্তির বাহন ,
(৭৮:১০) রাতকে করেছি আবরণ
(৭৮:১১) এবং দিনকে জীবিকা আহরণের সময় ?
(৭৮:১২) তোমাদের ওপর সাতটি মজবুত আকাশ স্থাপন করেছি
(৭৮:১৩) এবং একটি অতি উজ্জ্বল ও উত্তপ্ত বাতি সৃষ্টি করেছি ? ১০
(৭৮:১৪) আর মেঘমালা থেকে বর্ষণ করেছি অবিরাম বৃষ্টিধারা ,
(৭৮:১৫) যাতে তার সাহায্যে উৎপন্ন করতে পারি
(৭৮:১৬) শস্য , শাক সবজি ও নিবিড় বাগান ? ১১
(৭৮:১৭) নিসন্দেহে বিচারের দিনটি নির্ধারিত হয়েই আছে৷
(৭৮:১৮) যেদিন শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে , তোমরা দলে দলে বের হয়ে আসবে৷১২
(৭৮:১৯) আকাশ খুলে দেয়া হবে , ফলে তা কেবল দরজার পর দরজায় পরিণত হবে৷
(৭৮:২০) আর পর্বতমালাকে চলমান করা হবে , ফলে তা মরীচিকায় পরিণত হবে৷১৩
(৭৮:২১) আসলে জাহান্নাম একটি ফাঁদ ৷১৪
(৭৮:২২) বিদ্রোহীদের আবাস৷
(৭৮:২৩) সেখানে তারা যুগের পর যুগ পড়ে থাকবে৷১৫
(৭৮:২৪) সেখানে তারা কোন রকম ঠাণ্ডা পানযোগ্য কোন জিনিসের স্বাদই পাবে না৷১৬
(৭৮:২৫) গরম পানি ও ক্ষতঝরা ছাড়া
(৭৮:২৬) (তাদের কার্যকলাপের) পূর্ণ প্রতিফল৷
(৭৮:২৭) তারা কোন হিসেব নিকেশের আশা করতো না৷
(৭৮:২৮) আমার আয়াতগুলোকে তারা একেবারেই মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করেছিল৷ ১৭
(৭৮:২৯) অথচ প্রত্যেকটি জিনিস আমি গুণে গুণে লিখে রেখেছিলাম ৷ ১৮
(৭৮:৩০) এখন মজা বুঝ , আমি তোমাদের জন্য আযাব ছাড়া কোন জিনিসে আর কিছুই বাড়াবো না ৷
১. বড় খবর বলতে কিয়ামত ও আখেরাতের কথা বুঝানো হয়েছে মক্কাবাসীরা অবাক হয়ে কিয়ামত ও আখেরাতের কথা শুনতো ৷ তারপর তাদের প্রত্যেকটি আলাপ আলোচনায় , বৈঠকে , মজলিসে এ সম্পর্কে নানান ধরনের কথা বলতো ও ঠাট্টা বিদ্রুপ করতো৷ জিজ্ঞাসাবাদ বলতেও এ নানা ধরনের কথাবার্তা ও ঠাট্টা বিদ্রুপের কথাই বোঝানো হয়েছে৷ লোকেরা পরস্পরের সাথে দেখা হলে বলতো , আরে ভাই , শুনেছো নাকি ? মানুষ নাকি মরে যাবার পরে আবার জীবিত হবে ? এমন কথা আগে কখনো শুনেছিলে ? যে মানুষটি মরে পচে গেছে , যার শরীরের হাড়গুলো পর্যন্ত মাটিতে মিশে গেছে , তার মধ্যে নাকি আবার নতুন করে প্রাণ সঞ্চার হবে , একথা কি মেনে নেয়া যায় ? আগের পরের সব বংশধররা জেগে উঠে এক জায়গায় জমা হবে , একথা কি যুক্তিসম্মত ? আকাশের বুকে মাথা উঁচু করে পৃথিবী পৃষ্ঠে দাঁড়িয়ে থাকা এসব বড় বড় পাহাড় নাকি পেঁজা তুলোর মতো বাতাসে উড়তে থাকবে ? চাঁদ , সুরুজ আর তারাদের আলো কি নিভে যেতে পারে? দুনিয়ার এই জমজমাট ব্যবস্থাটা কি ওলটপালট হয়ে যেতে পারে? এই মানুষটি তো গতকাল পর্যন্ত ও বেশ জ্ঞানী ও বিচক্ষণ ছিল , আজ তার কি হয়ে গেলো , আমাদের এমন সব অদ্ভুত অদ্ভুত খবর শুনিয়ে যাচ্ছে ? এ জান্নাত ও জাহান্নাম এতদিন কোথায় ছিল ? এর আগে কখনো আমরা তার মুখে একথা শুনিনি কেন ? এখন এরা হঠাৎ টপকে পড়লো কোথা থেকে ? কোথা থেকে এদের অদ্ভুত ধরনের ছবি এঁকে এনে আমাদের সামনে পেশ করা হচেছ ? আরবী ------------ আয়াতাংশটির একটি অর্থ তো হচ্ছে : এ ব্যাপারে তারা নানান ধরনের কথা বলছে ও ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে ফিরছে ৷ এর দ্বিতীয় অর্থ এও হতে পারে ,দুনিয়ার পরিণাম সম্পর্কে তারা নিজেরাও কোন একটি অভিন্ন আকীদা পোষণ করে না বরং "তাদের মধ্যে এ ব্যাপারে বিভিন্ন মত পাওয়া যায় ৷ " তাদের কেউ কেউ খৃষ্টানদের চিন্তাধারায় প্রভাবিত ছিল৷ কাজেই তারা মৃত্যুর পরের জীবন স্বীকার করতো ৷ তবে এই সংগে তারা একথাও মনে করতো যে ,এই জীবনটি শারীরিক নয় , আত্মিক পর্যায়ের হবে৷ কেউ কেউ আবার আখেরাত পুরোপুরি অস্বীকার করতো না , তবে তা ঘটতে পারে কিনা , এ ব্যাপারে তাদের সন্দেহ ছিল৷ কুরআন মজীদে এ ধরনের লোকদের এ উক্তি উদ্ধৃত করা হয়েছে : (আরবী -------------------)"আমরা তোম মাত্র একটি ধারণাই পোষণ করি , আমাদের কোন নিশ্চত বিশ্বাস নেই৷ " [আল জাসিয়াহ , ৩১] আবার কেউ কেউ একদম পরিস্কার বলতো : (আরবী -----------------------------)
২. অর্থাৎ আখেরাত সম্পর্কে যেসব কথা এরা বলে যাচ্ছে এগুলো সবই ভুল৷ এরা যা কিছু মনে করেছে ও বুঝেছে তা কোনক্রমেই সঠিক নয়৷
৩. অর্থাৎ যে বিষয়ে এরা নিজেরা নানা আজেবাজে কথা বলছে ও ঠাট্টা বিদ্রূপ করে ফিরছে৷ সেটি যথার্থ সত্য হয়ে এদের সামনে ফুটে ওঠার সময় মোটেই দূরে নয়৷ সে সময় এরা জানতে পারবে , রসূল এদেরকে যে খবর দিয়েছিলেন তা ছিল সঠিক এবং আন্দাজ অনুমানের ভিত্তিতে এরা যেসব কথা তৈরী করছিল তা ছিল ভিত্তিহীন অসার৷
৪. যমীনকে মানুষের জন্য বিচানা অর্থাৎ একটি শান্তিময় আবাস ভূমিতে পরিণত করার মধ্যে আল্লাহর যে নিভুল ও পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান , ক্ষমতা ও কর্মকুশলতা সক্রিয় রয়েছে সে সম্পর্কে ইতিপূর্বে তাফহীমুল কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে৷ দৃষ্টান্ত স্বরূপ নীচের স্থানগুলো দেখুন : তাফহীমুল কুরআন , আন নামল ৭৩ , ৭৪ ও ৮১ টীকা , ইয়াসীন ২৯ টীকা , আল মু'মিন ৯০ ও ৯১ টীকা , আয যুখরুফ ৭ টীকা , আল জাসিয়াহ ৭ টীকা এবং কাফ ১৮ টীকা ৷
৫. পৃথিবীতে পাহাড় সৃষ্টির কারণ এবং এর পেছনে আল্লহর যে কল্যাণ স্পর্শ রয়েছে তা জানার জন্য তাফহীমূল কুরআনের সূরা আন নাহল ১২ টীকা , আন নমল ৭৪ টীকা এবং আল মুরসালাত ১৫ টীকা দেখুন৷
৬. মানব জাতিকে নারী ও পুরুষের জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করার মধ্যে সৃষ্টিকর্তার যে মহান কল্যাণ ও উদ্দেশ্যে রয়েছে তা বিস্তারিতভাবে জানার জন্য তাফহীমূল কুরআনের সূরা আল ফুরকান ৬৯ টীকা , আর রুম ২৮ থেকে ৩০ টীকা , ইয়াসীন ৩১ টীকা , আশ শূরা ৭৭ টীকা, আয যুখরুফ ১২ টীকা এবং আল কিয়ামাহ ২৫ টীকা দেখুন৷
৭. মানুষকে দুনিয়ায় কাজ করার যোগ্য করার জন্য মহান আল্লাহ অত্যন্ত কর্মকুশলতা সহকারে তার প্রকৃতিতে ঘুমের এক অভিলাষ বা চাহিদা সৃষ্টি করে দিয়েছেন৷ প্রতি কয়েক ঘন্টা পরিশ্রম করার পর এই চাহিদা আবার তাকে কয়েক ঘন্টা ঘুমাতে বাধ্য করে৷ এ সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা জানার জন্য পড়ুন তাফহীমুল কুরআনের সূরা আর রুম ৩৩ টীকা৷
৮. অর্থাৎ রাতকে অন্ধকার করে দিয়েছি৷ ফলে আলো থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে তার মধ্যে তোমরা সহজেই ঘুমের প্রশান্তি লাভ করতে সক্ষম করতে হবে৷ অন্যদিকে দিনকে আলোকোজ্জ্বল করে দিয়েছি৷ ফলে তার মধ্যে তোমরা অতি সহজেই নিজেদের রুজি রোজগারের জন্য কাজ করতে পারবে৷ পৃথিবীতে রাত দিনের নিয়মিত ও নিরবিছিন্ন আবর্তনের মধ্যে অসংখ্য কল্যাণ রয়েছে৷ কিন্তু তার মধ্যে থেকে মাত্র এই একটি কল্যাণের দিকে ইংগিত করার মাধ্যমে মহান আল্লাহ একথা বুঝতে চান যে , এখানে যা কিছু ঘটছে এগুলো উদ্দেশ্য কাজ করছে৷ তোমাদের নিজেদের স্বার্থের সাথে এ উদ্দেশ্যের গভীর সম্পর্ক রয়েছে৷ তোমাদের অস্তিত্বের গঠন প্রকৃতি নিজের আরাম ও প্রশান্তির জন্য যে অন্ধকারের অভিলাষী ছিল তার জন্যে রাতকে এবং তার জীবিকার জন্য যে আলোর অভিলাষী ছিল তার জন্য দিনকে সরবরাহ করা হয়েছে ৷ তোমাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পাদিত এই ব্যবস্থাপনা নিজেই সাক্ষ্য দিয়ে চলছে যে , কোন জ্ঞানময় সত্তার কর্মকৌশল ছাড়া এটা সম্ভবপর হয়নি৷ (অধিক ব্যাখ্যার জন্য তাফহীমুল কুরআন সূরা ইউনুস ৬৫ টীকা, ইয়াসীন ৩২ টীকা , আল মু'মিন ৮৫ টীকা এবং আয্‌ যুখরুফ ৪ টীকা )৷
৯. মজবুত বলা হয়েছে এ অর্থে যে,আকাশের সীমান্ত অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে সংবদ্ধমতার মধ্যে সমান্যতম পরিবর্তনও কখনো হয় না৷এ সীমানা পেরিয়ে উর্ধজগতের অসংখ্য গ্রহ -নক্ষত্রের মধ্য থেকে কোন একটিও কখনো অন্যের সাথে সংঘর্ষ বাধায় না এবং কোনটি কক্ষচ্যুত হয়ে পৃথিবীর বুকে আছড়েও পড়ে না৷ (অধিক ব্যাখ্যার জন্য পড়ুন তাফহীমল কুরআন আল বাকারাহ ৩৪ টীকা ,আর রা'দ ২ টীকা ,আল হিজর ৮ ও ১২ টীকা,আল মু'মিনুন ১৫ টীকা, লুকমান ১৩ টীকা ,ইয়াসীন ৩৭ টীকা,আস সাফফাত ৫ ও ৬ টীকা,আল মু'মিন ৯০ টীকা এবং কাফ ৭ও ৮ টীকা )৷
১০. এখানে সূর্যের কথা বলা হয়েছে৷ মূলে (আরবী ) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ এর মানে হচ্ছে অতি উত্তপ্ত আবার অতি উজ্জ্বলও৷ তাই আয়াতের অনুবাদে আমি দুটো অর্থই ব্যবহার করেছি৷এ ছোট বাক্যটির মধ্যে মহান আল্লাহর শক্তি ও কর্মকুশলতার যে বিরাট নিদর্শনটির দিকে ইংগিত করা হয়েছে সে নিদর্শনটির অর্থাৎ সূর্যের ব্যাস পৃথিবী থেকে ১০৯ গুণ বেশী এবং তার আয়তন পৃথিবী তুলনায় ৩ লক্ষ ৩৩ হাজার গুণ বড়৷ তার তাপমাত্রা ১ কোটি ৪০ লক্ষ সেন্টিগ্রেড৷ পৃথিবী থেকে ৯ কোটি ৩০ লক্ষ মাইল দূরে অবস্থান করা সত্ত্বেও তার আলোর শক্তি এত বেশী যে ,মানুষ খালি চোখে তার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রাখার চেষ্টা করলে দৃষ্টি শক্তি হারিয়ে ফেলবে৷ তার উত্তাপ এত বেশী যে পৃথিবীর কোথাও তার উত্তাপের ফলে তাপমাত্রা ১৪০ ডিগ্রী ফারেনহাইট পর্যন্ত পৌঁছে যায়৷ মহান আল্লাহ তাঁর অসীম জ্ঞান ও সৃষ্টিকুশল তার মাধ্যমে পৃথিবীকে সূর্য থেকে এক ভারসাম্যপূর্ণ দূরত্বে স্থাপন করেছেন৷ পৃথিবী তার অবস্থানের চাইতে সূর্যের বেশী কাছাকাছি নয় বলে অস্বাভাবিক গরম নয়৷ আবার বেশী দূরে নয় বলে অস্বাভাবিক ঠাণ্ডাও নয়৷ এ কারণে মানুষ,পশু -পাখি ও উদ্ভিদের জীবন ধারণ সম্ভবপর হয়েছে৷ সূর্য থেকে শক্তির অপরিমেয় ভাণ্ডার উৎসারিত হয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে এবং এ শক্তিই পৃথিবীর বুকে আমাদের জীবন ধারণের উৎস৷ তারি সাহায্য আমাদের ক্ষেতে ফসল পাকছে৷ এবং পৃথিবীর প্রতিটি তার আহার লাভ করছে৷তারি উত্তাপে সাগরের পানি বাষ্প হয়ে আকাশে উঠে যায়,তারপর বাতাসের সাহায্য দুনিয়ার বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে বারি বর্ষণ করে৷ এ সূর্যের বুকে মহাণ সর্বশক্তিমান আল্লাহ এমন বিশাল অগ্নিকুণ্ড জ্বালিয়ে রেখেছেন যা কোটি কোটি বছর থেকে সমগ্র সৌরজগতে আলো ,উত্তাপ ও বিভিন্ন প্রকার রশ্মি অব্যাহতভাবে ছড়িয়ে চলছে৷
১১. পৃথিবীতে বৃষ্টিপাতের ব্যবস্থাপনা এবং উদ্ভিদের তরতাজা হয়ে ওঠার মধ্যে প্রতিনিয়ত আল্লাহর অসীম ক্ষমতা ও সৃষ্টিকুশলতার যে বিস্ময়কর আত্মপ্রকাশ ঘটে চলছে সে সম্পর্কে তাফহীমল কুরআনের নিম্নোক্ত স্থান সমূহে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে : সূরা আন নাহল ৫৩ টীকা ,আল মু'মিনুন ১৭ টীকা ,আশ শূ'আরা ৫ টীকা ,আর রুম ৩৫ টীকা ,ফাতের ১৯ টীকা ,ইয়াসীন ২৯ টীকা ,আল মু'মিন ২০ টীকা ,আয যুখরফ ১০ -১১ টীকা এবং আল ওয়াকিয়াহ ২৮ থেকে ৩০ টীকা৷এ আয়াতগুলোতে একের পর এক বহু প্রাকৃতিক নিদর্শন ও যুক্তি প্রমাণ পেশ করে কিয়ামত ও আখেরাত অস্বীকারকারীদেরকে একথা জানানো হয়েছে যে , যদি তোমরা চোখ মেলে একবার পৃথিবীর চারদিকে তাকাও পাহাড় পর্বত , তোমাদের নিজেদের জন্ম , নিদ্রা , জাগরণ এবং দিন রাত্রির আবর্তনের এই ব্যবস্থাপনাটি গভীর দৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করো তাহলে এসবের মধ্যে তোমরা দু'টি জিনিস সুস্পষ্টভাবে দেখতে পাবে৷ এক , একটি জবরদস্ত শক্তির সহায়তা ছাড়া এসব কিছু অস্তিত্বশীল হতে পারে না এবং এ ধরনের নিয়ম শৃংখলার আওতাধীনে জারীও থাকতে পারে না৷ দুই , এসব জিনিসের প্রত্যেকটির মধ্যে একটি বিরাট হিকমত তথা প্রজ্ঞা ও তীক্ষ্ণ কর্মকুশলতা সক্রিয় রয়েছে এবং উদ্দেশ্যবিহীনভাবে কোন একটি কাজও হচ্ছে না৷ যে মহাশক্তি এসব জিনিসকে অস্তিত্ব দান করতে পারে , এদেরকে ধ্বংস করে দেবার এবং ধ্বংস করার পর আবার নতুন করে অন্য আকৃতিতে সৃষ্টি করার তার ক্ষমতা নেই , এ ধরনের কথা এখন কেবলমাত্র একজন মূর্খই বলতে পারে৷ আর একথাও কেবলমাত্র একজন নির্বোধই বলতে পারে যে , যে জ্ঞানময় সত্তা এই বিশ্ব - জাহানের কোন একটি কাজও বিনা উদ্দেশ্যে করেননি , তিনি নিজের এ জগতে মানুষকে জেনে বুঝে ভালো ও মন্দের পার্থক্য , আনুগত্য ও অবাধ্যতার স্বাধীনতা এবং নিজের অসংখ্য সৃষ্টিকে কাজে লাগাবার ও ইচ্ছা মতো ব্যবহার করার ক্ষমতা বিনা উদ্দেশ্যেই দান করেছেন৷ একথাও কেবলমাত্র একজন নির্বোধই বলতে পারে৷ মানুষ তার সৃষ্ট এ জিনিসগুলোকে ভালোভাবে ব্যবহার করুক বা খারাপভাবে উভয় অবস্থায় পরিণাম সমান হবে , একজন ভালো কাজ করতে করতে মারা যাবে , সে মাটিতে মিশে খতম হয়ে যাবে আর একজন খারাপ কাজ করতে করতে মারা যাবে সেও মাটিতে মিশে খতম হয়ে যাবে , যে ভালো কাজ করবে সে তার ভালো কাজের কোন প্রতিদান পাবে না এবং যে খারাপ কাজ করবে সে ও তার খারপ কাজের জন্য জিজ্ঞাসিত হবে না এবং কোন প্রতিফল পাবে না , এ ধরনের কথা একজন জ্ঞানহীন মানুষই বিশ্বাস করতে পারে৷ মৃত্যুর পরের জীবন , কিয়ামত ও আখেরাত সম্পর্কিত এসব যুক্তিই কুরআনের বিভিন্ন স্থানে উল্লিখিত হয়েছে৷ উদাহরণ স্বরূপ , তাফহীমূল কুরআনের নিম্নোক্ত স্থানসগুলো দেখুন : আর রা' আদ ৭ টীকা , আল হজ্জ ৯ টীকা , আর রুম ৬ টীকা , সাবা ১০ ও ১২ টীকা এবং আস সাফফাত ৮ ও ৯ টীকা৷
১২. এখানে শিংগার শেষ ফুঁকের কতা বলা হয়েছে৷ এর আওয়াজ বুলন্দ হবার সাথে সাথেই সমস্ত মানুষ অকস্মাৎ জেগে উঠবে৷ " তোমরা বলতে শুধুমাত্র যাদেরকে তখন সম্বোধন করা হয়েছিল তাদের কথা বলা হয়নি বরং সৃষ্টির প্রথম দিন থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যতগুলো লোক দুনিয়ায় জন্মগ্রহণ করেছে ও কবরে তাদের সবার কথা বলা হয়েছে৷ ( ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন , সূরা ইবরাহীম ৫৭ টীকা, আল হাজ্জ ১ টীকা , ইয়সীন ৪৬ ও ৪৭ টীকা এবং আয যুমার ৭৯ টীকা )৷
১৩. এখানে মনে রাখতে হবে , কুরআনের অন্যান্য স্থানের মতো এখানেও একই সাথে কিয়ামতের বিভিন্ন পর্যায়ের কথা বলা হয়েছে , প্রথম আয়াতটিতে শেষ দফায় শিংগায় ফুঁক দেবার পর যে অবস্থায় সৃষ্টি হবে তার বর্ণনা দেয়া হয়েছে৷ আর পরবর্তী দু'টি আয়াতে দ্বিতীয় দফায় শিংগায় ফুঁক দোবার পর যে অবস্থায় সৃষ্টি হবে তার বর্ণনা দেয়া হয়েছে ৷ এ সম্পর্কে তাফহীমুল কুরআনের সূরা আল হাক্কার ১০ টীকায় বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে৷ " আকাশ খুলে দেয়া হবে " এর মানে হচ্ছে উর্ধজগতে কোন বাধা ও বন্ধন থাকবে না৷ সব দিক থেকে সব রকমের আসমানী বালা মুসিবতের এমন বন্যা নেমে আসতে থাকবে যেন মনে হবে তাদের আসার জন্য সমস্ত দরজা ও বন্ধ নেই৷ আর পাহাড়ের চলার ও মরীচিকায় পরিণত হবার মানে হচ্ছে , দেখতে দেখতে মুহূর্তের মধ্যে পর্বতমালা স্থানচ্যুত হয়ে শুন্যে উড়তে থাকবে৷ তারপর ভেঙ্গে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়বে যে , যেখানে একটু আগে বিশাল পর্বত ছিল সেখানে দেখা যাবে বিশাল বালুর সমুদ্র৷ এ অবস্থাকে সূরা ত্বাহায় নিম্নোক্তভাবে বর্ণনা করা হয়েছে : "এরা তোমাকে জিজ্ঞেস করছে , সেদিন এ পাহাড় কোথায় চলে যাবে ? এদের বলে দাও , আমার রব তাদেরকে ধূলোয় পরিণত করে বাতাসে উড়িয়ে দেবেন এবং যমীনকে এমন একটি সমতল প্রান্তরে পরিণত করে দেবেন যে , তার মধ্যে কোথাও একটু ও অসমতল ও উঁচুনীচু জায়গা এবং সামান্যতম ভাঁজ ও দেখতে পাবে না ৷" ( ১০৫ - ১০৭ আয়াত এবং ৮৩ টীকা)
১৪. শিকার ধরার উপযোগী করে যে জায়গাটিকে গোপনে তৈরী করা হয় এবং নিজের অজ্ঞাতসারে শিকার যেখানে চলে এসে তার মধ্যে আটকে যায় , তাকেই বলে ফাঁদ৷ জাহান্নামের ক্ষেত্রে এ শব্দটি ব্যবহার করার কারণ হচ্ছে এই যে , আল্লাহর বিরুদ্ধে যারা বিদ্রোহাত্মক ভূমিকা অবলম্বন করে তারা জাহান্নামের ভয়ে ভীত না হয়ে দুনিয়ায় এ মনে করে লাফালাফি দাপাদাপি করে ফিরছে যে , আল্লাহর সার্বভৌমত কর্তৃত্ব তাদের জন্য একটি ঢালাও বিচরণ ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে৷ এখানে তাদের পাকড়াও হবার কোন আশংকা নেই৷ কিন্তু জাহান্নাম তাদের জন্য একটি গোপন ফাঁদ যেখানে তারা আকস্মিকভাবে আটকা পড়ে যায় এবং সেখানে থেকে বের হবার আর কোন উপায় থাকে না৷
১৫. মূলে আহকাব ( আরবী ----------------) শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে৷ এর মানে হচ্ছে , একের পর এক আগমনকারী দীর্ঘ সময়৷ এমন একটি ধারাবাহিক যুগ যে , একটি যুগ শেষ হবার পর আর একটি যুগ শুরু হয়ে যায়৷ এ থেকে লোকেরা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে যে, জান্নাতের জীবন হবে চিরন্তন কিন্তু জাহান্নাম চিরন্তন হবে না৷ কারণ এ যুগ যতই দীর্ঘ হোক না কেন , এখানে যখন যুগ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তখন এ থেকে একথাই বুঝা যাচ্ছে যে , এ সময় অশেষ ও অফুরন্ত হবে না৷ বরং একদিন তা শেষ হয়ে যাবে ৷ কিন্তু দু'টি কারণে এই যুক্তি ভুল৷ এক , আরবীতে 'হাকব' শব্দের আভিধানিক অর্থের মধ্যেই এ ভাবধারা রয়েছে যে , একটি হাকবের পিছনে আর একটি হাকব রয়েছে ৷ কাজেই আহকাব অপরিহার্যভাবে এমন যুগের জন্য বলা হবে যা একের পর এক আসতেই থাকবে এবং এমন কোন যুগ হবে না যার পর আর কোন যুগ আসবে না৷ দুই , কোন বিষয় সম্পর্কে কুরআন মজীদের কোন আয়াত থেকে এমন কোন অর্থ গ্রহণ করা নীতিগতভাবে ঠিক নয়, যা সেই একই বিষয় সম্পর্কিত কুরআনের অন্যান্য বর্ণনার সাথে সংঘর্ষশীল হয়৷ কুরআনের ৩৪ জায়গায় জাহান্নামবাসীদের জন্য 'খুলুদ' ( চিরন্তন ) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ তিন জায়গায় কেবল "খুলুদ" বলেই শেষ করা হয়নি বরং তার সাথে "আবাদান" "আবাদান" (চিরকাল) শব্দও বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে৷ এক জায়গায় পরিস্কার বলা হয়েছে , "তারা চাইবে জাহান্নাম থেকে বের হয়ে যেতে৷ কিন্তু তারা কখনো সেখান থেকে বের হতে পারবে না এবং তাদের জন্য রয়েছে স্থায়ী আযাব ৷ " ( আল মায়েদাহ ৩৭ আয়াত ) আর এক জায়গায় বলা হয়েছে : "যতদিন পৃথিবী ও আকাশ প্রতিষ্ঠিত আছে ততদিন তারা এ অবস্থায় চিরকাল থাকবে , তবে তোমার রব যদি অন্য কিছু চান৷ " জান্নাতবাসীদের সম্পর্কেও এ একই কথা বলা হয়েছে ৷ বলা হয়েছে : "যতদিন পৃথিবী ও আকাশ প্রতিষ্ঠিত আছে ততদিন জান্নাতে তারা চিরকাল থাকবে , তবে তোমরা রব যদি অন্য কিছু চান৷" (হুদ ১০৭ - ১০৮ আয়াত) এই সুস্পষ্ট বক্তব্যের পর 'আহকাব' শব্দের ভিত্তিতে একথা বলার অবকাশ আর কতটুকু থাকে যে , আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহাত্মক আচরণকারীরা জাহান্নামে চিরকাল অবস্থান করবে না বরং কখনো না কখনো তাদের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে ?
১৬. মূলে গাসসাক ( আরবী ---) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ এর অর্থ হয় : পুঁজ , রক্ত , পুঁজ মেশানো রক্ত এবং চোখ ও গায়ের চামড়া থেকে বিভিন্ন ধরনের কঠোর দৈহিক নির্যাতনের ফলে যেসব রস বের হয়৷ এছাড়াও এ শব্দটি ভীষণ দুর্গন্ধ ও পঁচে গিয়ে উৎকট দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এমন জিনিসের জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে৷
১৭. এ হচ্ছে তাদের জাহান্নামের ভয়াবহ আযাব ভোগ করার কারণ ৷ প্রথমত , দুনিয়ার তারা এ মনে রে জীবন যাপন করতে থাকে যে , আল্লাহর সামনে হাজির হয়ে নিজেদের আসনের হিসেব পেশ করার সময় কখনো আসবে না৷ দ্বিতীয় , আল্লাহ নিজের নবীদের মাধ্যমে তাদের হিদায়াতের জন্য যেসব আয়াত পাঠিয়েছিলেন সেগুলো মেনে নিতে তারা সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে এবং সেগুলোকে মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করে৷
১৮. অর্থাৎ তাদের সমস্ত কথা ও কাজ , তাদের সব রকমের উঠাবসা - চলাফেরা এমনকি তাদের চিন্তা , মনোভাব , সংকল্প ও উদ্দেশ্যাবলীর পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড আমি তৈরি করে রাখছিলাম ৷ সেই রেকর্ড থেকে কোন কিছুই বাদ যেতে পারেনি৷ অথচ সেই নির্বোধদের এসবের কোন খবর ছিল না৷ তারা নিজেদের জায়গায় বসে মনে করছিল , তারা কোন মগের মূল্লুকে বাস করছে , নিজেদের ইচ্ছে মতো তার এখানে যাচ্ছে তাই করে যাবে এবং তাদের এসব স্বেচ্ছাচারের জন্যে করোর কাছে জবাবদিহি করতে হবে না৷