(৭৬:১) মানুষের ওপরে কি অন্তহীন মহাকালের এমন একটি সময়ও অতিবাহিত হয়েছে যখন সে উল্লেখযোগ্য কোন জিনিসই ছিল না?
(৭৬:২) আমি মানুষকে এক সংমিশ্রণ বীর্য থেকে সৃষ্টি করেছি যাতে তার পরীক্ষা নিতে পারি৷ এর উদ্দেশ্যে আমি তাকে শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তির অধিকারী করেছি৷
(৭৬:৩) আমি তাকে রাস্তা দেখিয়ে দিয়েছি৷ এরপর হয় সে শোকরগোজার হবে নয়তো হবে কুফরের পথ অনুসরণকারী৷
(৭৬:৪) আমি কাফেরদের জন্য শিকল,বেড়ি এবং জ্বলন্ত আগুন প্রস্তুত করে রেখেছি৷
(৭৬:৫) (বেহেশতে) নেককার লোকেরা পানপাত্র থেকে এমন শরাব পান করবে যাতে কর্পূর পানি সংমিশ্রিত থাকবে৷
(৭৬:৬) এটি হবে একটি বহমান ঝর্ণা৷ আল্লাহর বান্দারা যার পানির সাথে শরাব মিশিয়ে পান করবে এবং যেখানেই ইচ্ছা সহজেই তার শাখা-প্রশাখা বের করে নেবে৷
(৭৬:৭) এরা হবে সেসব লোক যারা (দুনিয়াতে )মানত পূরণ করে ১০ সে দিনকে ভয় করে যার বিপদ সবখানে ছড়িয়ে থাকবে৷
(৭৬:৮) আর আল্লাহর মহব্বতে ১১ মিসকীন,ইয়াতীম, এবং বন্দীকে ১২ খাবার দান করে ১৩
(৭৬:৯) এবং (তাদেরকে বলে) আমরা একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যেই তোমাদের খেতে দিচ্ছি৷ আমরা তোমাদের কাছে এর কোন প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতা ১৪ পেতে চাই না৷
(৭৬:১০) আমরা তো আমাদের রবের পক্ষ থেকে সেদিনের আযাবের ভয়ে ভীত, যা হবে কঠিন বিপদ ভরা অতিশয় দীর্ঘ দিন৷
(৭৬:১১) আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সেদিনের অকল্যাণ থেকে রক্ষা করবেন এবং তাদেরকে সজীবতা ও আনন্দ দান করবেন৷ ১৫
(৭৬:১২) আর তাদের সবরের বিনিময়ে ১৬ তাদেরকে জান্নাত ও রেশমী পোশাক দান করবেন৷
(৭৬:১৩) তারা সেখানে উঁচু আসনের ওপরে হেলান দিয়ে বসবে৷ সেখানে রোদের উত্তাপ কিংবা শীতের তীব্রতা তাদের কষ্ট দেবে না ৷
(৭৬:১৪) জান্নাতের বৃক্ষরাজির ছায়া তাদের ওপর ঝুঁকে পড়ে ছায়া দিতে থাকবে ৷আর তার ফলরাজি সবসময় তাদের নাগালের মধ্যে থাকবে (তারা যেভাবে ইচ্ছা চয়ন করতে পারবে)
(৭৬:১৫) তার সামনে রৌপ্য পাত্র ১৭ ও সচ্ছ কাঁচের পাত্রসমূহ পরিবেশিত হতে থাকবে ৷কাঁচ পাত্রও হবে রৌপ্য জাতীয় ধাতুর ১৮
(৭৬:১৬) যা (জান্নাতের ব্যবস্থাপকরা) যথাযথ পরিমাণে পূর্ণ করে রাখবে৷ ১৯
(৭৬:১৭) সেখানে তাদের এমন সূরা পাত্র পান করানো হবে যাতে শুকনো আদার সংমিশ্রণ থাকবে ৷
(৭৬:১৮) এটি জান্নাতের একটি ঝর্ণা যা সালসাবীল নামে অভিহিত৷ ২০
(৭৬:১৯) তাদের সেবার জন্য এমন সব কিশোর বালক সদা তৎপর থাকবে যারা চিরদিনই কিশোর থাকবে৷ তুমি তাদের দেখলে মনে করবে যেন ছড়ানো ছিটানো মুক্তা৷ ২১
(৭৬:২০) তুমি সেখানে যে দিকেই তাকাবে সেদিকেই শুধু নিয়ামত আর ভোগের উপকরণের সমাহার দেখতে পাবে এবং বিশাল সাম্রাজ্যের সাজ-সরঞ্জাম তোমাদের দৃষ্টিগোচর হবে৷ ২২
(৭৬:২১) তাদের পরিধানে থাকবে মিহি রেশমের সবুজ পোশাক এবং মখমল ও সোনালী কিংখাবের বস্ত্ররাজি৷ ২৩ আর তাদেরকে রৌপ্যের কঙ্কন পরানো হবে ৷ ২৪ আর তাদের রব তাদেরকে অতি পবিত্র শরাব পান করাবেন৷ ২৫
(৭৬:২২) এ হচ্ছে তোমাদের জন্য প্রতিদান৷ কারণ, তোমাদের কাজ কর্ম মূল্যবান প্রমাণিত হয়েছে৷ ২৬
১. আয়াতের প্রথমাংশ হলো ----------৷ এখানে অধিকাংশ মুফাস্সির ও অনুবাদক -----(হাল) শব্দটিকে -----(ক্বাদ) শব্দের অর্থে গ্রহণ করেছেন এবং এর অর্থ করেছেন নিঃসন্দেহে মানুষের ওপরে এরূপ একটি সময় এসেছিল৷ তবে ------(হাল) আরবী ভাষায় মূলতঃ কির অর্থেই ব্যবহৃত হয়৷ সর্বাবস্থায় এর দ্বারা প্রশ্ন করা বুঝায় না৷ বরং বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাহ্যিক ভাবে প্রশ্নবোধক এ শব্দটি বিভিন্ন অর্থে বলা হয়ে থাকে৷ যেমন,কখনো আমরা জানতে চাই যে,অমুক ঘটনা ঘটেছিল না ঘটেনি আর সে জন্য কাউকে জিজ্ঞেস করি, এ ধরনের ঘটনা কি ঘটেছিল? কোন কোন সময় আবার প্রশ্ন করা আমাদের উদ্দেশ্য হয় না, বরং উদ্দেশ্য হয় কোন বিষয় অস্বীকার করা৷ তখন যে বাচনভংগী ব্যবহার করে আমরা তা অস্বীকার করি তাহলো অন্য কেউও কি এ কাজ করতে পারে? কোন সময় আমরা কারো থেকে কোন বিষয়ে স্বীকৃতি পেতে চাই এবং এ উদ্দেশ্যে তাকে জিজ্ঞেস করি , আমি কি তোমার টাকা পরিশোধ করেছি? কোন সময় আবার শুধু স্বীকৃতি আদায় করাই আমাদের মুল উদ্দেশ্য হয় না৷ বরং তখন আমরা প্রশ্ন করি শ্রোতার মন মগজকে আরো একটি বিষয় ভাবতে বাধ্য করার জন্য যা তার স্বীকৃতির অনিবার্য ফল স্বরূপ দেখা যায়৷ যেমন আমরা কাউকে জিজ্ঞেস করিঃ আমি কি তোমার সাথে কোন খারাপ আচরণ করেছি? এ প্রশ্নের উদ্দেশ্য শুধু এতটুকুই নয় যে, সে স্বীকার করুক, আপনি তার সাথে সত্যই কোন খারাপ আচরণ করেননি৷ বরং এর উদ্দেশ্য তাকে একথাও চিন্তা করতে বাধ্য করা যে, যে ব্যক্তি আমার সাথে কোন খারাপ আচরণ করেনি তার সাথে আমার খারাপ আচরণ করা কতটুকু ন্যায় সংগত? আলোচ্য আয়াতের প্রশ্নবোধক অংশটুকু প্রকৃতপক্ষে এ শেষ অর্থেই বলা হয়েছে৷ এর উদ্দেশ্য মানুষকে শুধু এতটুকু স্বীকার করানো নয় যে,তার ওপরে এমন একটি সময় সত্যিই অতিবাহিত হয়েছে৷ বরং এর দ্বারা তাকে এ বিষয়ও চিন্তা করতে বাধ্য করা উদ্দেশ্য যে, যে আল্লাহ এমন নগণ্য অবস্থা থেকে সৃষ্টির সূচনা করে তাকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন তিনি তাকে পুনরায় সৃষ্টি করতে অক্ষম হবেন কেন?

আয়াতের দ্বিতীয় অংশ হলো------------৷(দাহরি )অর্থ -অন্তহীন মহাকাল যার আদি-অন্ত কিছুই মানুষের জানা নেই৷ আর----- (হিনা) অর্থ অন্তহীন এ মহাকালের বিশেষ একটি সময়, মহাকাল প্রবাহের কোন এক পর্যায়ে যার আগমন ঘটেছিল৷ বক্তব্যের সারমর্ম হলো, এ অন্তহীন মহাকালের মধ্যে একটি দীর্ঘ সময় তো এমন অতিবাহিত হয়েছে যখন মানব প্রজাতির আদৌ কোন অস্তিত্ব ছিল না৷ তারপর এ মহাকাল প্রবাহে এমন একটি সময় আসলো যখন মানুষ নামের একটি প্রজাতির সূচনা করা হলো৷ এ সময়-কাল প্রত্যেক মানুষের জন্য এমন একটি সময় এসেছে যখন তাকে শূন্য মাত্রা বা অস্তিত্বহীনতা থেকে অস্তিত্বদানের সূচনা করা হয়েছে৷

আয়াতের তৃতীয় অংশ হলো ----------অর্থাৎ তখন সে কোন উল্লেখযোগ্য বস্তু ছিল না৷ তার একটি অংশ বাপের শুক্রের মধ্যে অণুবীক্ষণিক জীবাণু আকারে এবং আরেকটি অংশ মায়ের বীর্যে একটি অণুবীক্ষণিক ডিম্বের আকারে বর্তমান ছিল৷ দীর্ঘকাল পর্যন্ত মানুষ এ বিষয়ও জানতো না যে, একটি শুক্রকীট এবং একটি ডিম্বকোষের মিলনের ফলেই সে অস্তিত্ব লাভ করে৷ বর্তমানে অত্যন্ত শক্তিশালী অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে সে এ দুটিকে দেখতে সক্ষম হয়েছে বটে, কিন্তু এখনো কেউ বলতে পারে যে, পিতার এ শুক্রকীটে এবং মায়ের ডিম্বকোষে কত সংখ্যক মানুষের অস্তিত্ব থাকে৷ গর্ভসঞ্চারকালে এ দুটি জিনিসের মিলনে যে প্রাথমিক কোষ(Cell) সৃষ্টি হয় তা পরিমাণহীন এমন একটি পরমাণূ যা কেবল অত্যন্ত শক্তিশালী অনুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যেই দেখা যেতে পারে৷ আর তা দেখার পরেও আপাত দৃষ্টিতে কেউ একথা বলতে পারে না যে, এভাবে কোন মানুষ জন্মলাভ করছে কিংবা এ নগণ্য সূচনা বিন্দু থেকে বৃদ্ধি ও বিকাশ লাভ করে কোন মানুষ যদি সৃষ্টি হয়েও তাহলে সে কেমন দৈহিক উচ্চতা ও কাঠামো ,কেমন আকার -আকৃতি এবং কেমন যোগ্যতা ও ব্যক্তিত্বধারী মানুষ হবে তাও বলতে পারে না৷ সে সময় কোন উল্লেখযোগ্য বস্তুই ছিল না, এ বাণীর তাৎপর্য এটাই ৷ যদিও মানুষ হিসেবে সে সময় তার অস্তিত্বের সূচনা হয়ে গিয়েছিল৷
২. এক সংমিশ্রিত বীর্য দ্বারা অর্থ হলো, মানুষের সৃষ্টি পুরুষ ও নারীর দুটি আলাদা বীর্য দ্বারা হয়নি৷ বরং দুটি বীর্য সংমিশ্রিত হয়ে যখন একটি হয়ে গিয়েছে তখন সে সংমিশ্রিত বীর্য থেকে মানুষ সৃষ্টি হয়েছে৷
৩. এটাই হলো দুনিয়ায় মানুষের এবং মানুষের জন্য দুনিয়ার প্রকৃত অবস্থান ও মর্যাদা৷ মানুষ নিছক গাছপালা বা জীব-জন্তু মত নয় যে, তার সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য এখানেই পূরণ হয়ে যাবে এবং প্রকৃতির নিয়মানুসারে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তার নিজের অংশের করণীয় কাজ সম্পাদন করার পর এখানেই মৃত্যুবরণ করবে এবং নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে৷ তাছাড়া এ দুনিয়া তার জন্য আযাব বা শাস্তির স্থান নয় যেমনটা খৃষ্টান পাদ্রীরা মনে করে, প্রতিদানের ক্ষেত্রেও নয় যেমনটা জন্মন্তরবাদীরা মনে করে ,চারণ ক্ষেত্রে বা বিনোদন কেন্দ্র নয় যেমনটা বস্তুবাদীরা মনে করে আবার দ্বন্দ্ব ও সংগ্রাম ক্ষেত্রেও নয় যেমনটা ডারউইন ও মার্কসের অনুসারীরা মনে করে থাকে৷ বরং দুনিয়া মূলত তার জন্য একটা পরীক্ষাগার৷ যে জিনিসেকে সে বয়স বা আয়ুস্কাল বলে মনে করে আসলে তা পরীক্ষার সময় যা তাকে এ দুনিয়ায় দেয়া হয়েছে৷ দুনিয়ায় যে ক্ষমতা ও যোগ্যতা তাকে দেয়া হয়েছে,যেসব বস্তুকে কাজে লাগানো সুযোগ তাকে দেয়া হয়েছে,যে মর্যাদা নিয়ে বা অবস্থানে থেকে সে এখানে কাজ করছে এবং তার ও অন্যান্য মানুষের মধ্যে যে সম্পর্ক বিদ্যমান তার সবাই মূল অসংখ্য পরীক্ষা পত্র৷ জীবনের সর্বশেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিরবিচ্ছিন্নভাবে পরীক্ষা চলবে৷ এ পরীক্ষার ফলাফল দুনিয়ায় প্রকাশ পাবে না৷ বরং আখেরাতের তার সমস্ত পরীক্ষা পত্র পরীক্ষা ও যাঁচাই বাছাই করে ফায়সালা দেয়া হবে৷ সে সফল না বিফল৷তার সফলতা ও বিফলতা সবটাই নির্ভর করবে এ বিষয়ের ওপর যে, সে তার নিজের সম্পর্কে কি ধারণা নিয়ে এখানে কাজ করছে এবং তাকে দেয়া পরীক্ষঅর পত্রসমূহে সে কিভাবে জবাব লিখেছে৷ নিজের সম্পর্কে সে যদি মনে করে থাকে যে,তার কোন আল্লাহ নেই অথবা নিজেকে সে বহু সংখ্যক ইলাহর বান্দা মনে করে থাকে , এবং পরীক্ষার সবগুলো পত্রে এ বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে জবাব লিখে থাকে যে, আখেরাতে তাকে তার স্রষ্টার সামনে কোন জবাবদিহি করতে হবে না তাহলে তার জীবনের সমস্ত কর্মকাণ্ড ভুল হয়ে গিয়েছে ৷আর যদি সে নিজেকে একমাত্র আল্লাহর বান্দা মনে করে আল্লাহর মনোনীত পথ ও পন্থা অনুসারে কাজ করে থাকে এবং আখেরাতে জবাবদিহির চেতনা বিবেচনায় রেখে তা করে থাকে তাহলে সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে গেলো৷ (এ বিষয়টি কুরআন মজীদে এত অধিক জায়গায় ও এত বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, এখানে স্থানগুলোর নাম উল্লেখ করা বেশ কঠিন৷ যারা এ বিষয়টি আরো ভালভাবে বুঝতে চান তারা তাফহীমুল কুরআনের প্রত্যেক খণ্ডের শেষে সংযুক্ত বিষয়সূচীর মধ্যে পরীক্ষা শব্দটি বের করে সেসব স্থান দেখুন যেখানে কুরআন মজীদে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টির ব্যাখ্যা করা হয়েছে৷ কুরআন ছাড়া পৃথিবীতে এমন আর কোন গ্রন্থ নেই যার মধ্যে এ সত্যটি এত বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে৷
৪. আসলে বলা হয়েছে আমি তাকে -----ও --------- বানিয়েছি৷ বিবেকবুদ্ধির অধিকারী করেছি বললে এর সঠিক অর্থ প্রকাশ পায়৷ কিন্তু অনুবাদে আমি ----শব্দের অর্থ"শ্রবণশক্তির অধিকারী" এবং-------শব্দের অর্থ "দৃষ্টিশক্তিতর অধিকারী"করেছি৷ যদিও এটিই আরবী ভাষায় এ দুটি শব্দের শাব্দিক অনুবাদ কিন্তু আরবী ভাষায় অভিজ্ঞ প্রত্যেক ব্যক্তিই জানেন যে,জন্তু-জানোয়ারের জন্য কখনো-------ও -----শব্দ ব্যবহৃত হয় না৷ অথচ জন্তু-জানোয়ারও দেখতে এবং শুনতে পায়৷অতএব এখানে শোনা এবং দেখার অর্থ শোনার ও দেখার সে শক্তি নয় যা জন্তু-জানোয়ারকেও দেয়া হয়েছে৷এখানে এর অর্থ হলো, শোনা ও দেখার সেসব উপায়-উপকরণ যার সাহায্যে মানুষ জ্ঞান অর্জন করে এবং সিদ্ধান্তে উপনীত হয়৷ তাছাড়া শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি যেহেতু মানুষের জ্ঞানার্জনের উপায়-উপকরণের মধ্যে সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ তাই সংক্ষেপে এগুলোরই উল্লেখ করা হয়েছে৷ মানুষ যেসব ইন্দ্রিয়ের সাহায্য জ্ঞান অর্জন করে থাকে আসলে এসব ইন্দ্রিয়ের সবগুলোকেই এখানে বুঝানো হয়েছে৷ তাছাড়া মানুষকে যেসব ইন্দ্রিয় ও অনুভূতি শক্তি দেয়া হয়েছে তা ধরন ও প্রকৃতিগত দিক দিয়ে পশুদের ইন্দ্রিয় ও অনুভূতি শক্তি থেকে সমপূর্ণ ভিন্ন৷ কারণ মানুষের প্রতিটি ইন্দ্রিয়ের পেছনে একটি চিন্তাশীল মন-মগজ বর্তমান যা ইন্দ্রিয়সমূহের মাধ্যমে লব্ধ জ্ঞান ও তথ্যসমূহকে একত্রিত ও বিন্যস্ত করে তা থেকে ফলাফল বের করে ,মতামত স্থির করে এবং এমন কিছু সিদ্ধান্ত করে যার ওপরে তার কার্যকলাপ ও আচরণের ভিত্তি স্থাপিত হয়৷ তাই মানুষকে সৃষ্টি করে আমি তাকে পরীক্ষা করেত চাচ্ছিলাম একথাটি বলার পর আমি এ উদ্দেশ্যেই তাকে ---ও --------- অর্থাৎ "শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তির অধিকারী করেছি" কথাটি বলার অর্থ দাঁড়ায় এই যে, আল্লাহ তা"আলা তাকে জ্ঞান ও বিবেক -বুদ্ধির শক্তি দিয়েছেন যাতে সে পরীক্ষা দেয়ার উপুযুক্ত হতে পারে৷ বাক্যটির অর্থ যদি এটা নয় হয় এবং ---------ও --------বানানোর অর্থ যদি শুধু শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তির অধিকারী বানানো হয় তাহলে অন্ধ ও বধির ব্যক্তিরা এ পরীক্ষা থেকে বাদ পড়ে যায় অথচ জ্ঞান ও বিবেক-বুদ্ধি থেকে যদি কেউ পুরোপুরি বঞ্চিত না হয় তাহলে তার এ পরীক্ষা থেকে বাদ পড়ার কোন প্রশ্নই ওঠে না৷
৫. অর্থাৎ আমি তাকে শুধু জ্ঞান ও বিবেক -বুদ্ধি দিয়েই ছেড়ে দেইনি৷ বরং এগুলো দেয়ার সাথে সাথে তাকে পথও দেখিয়েছে যাতে সে জানতে পারে শোকরিয়ার পথ কোনটি এবং কুফরীর পথ কোনটি৷ এরপর যে পথই সে অবলম্বন করুক না কেন তার জন্য সে নিজেরই দায়ী৷ এ বিষয়টিই সূরা বালাদে এভাবে বর্ননা করা হয়েছে --------"আমি তাকে দু"টি পথ (অর্থাৎ ভাল ও মন্দ পথ) স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিয়েছি৷ " সূরা শামসে বিষয়টি বর্ণনা করা হয়েছে এভাবেঃ -------------"শপথ (মানুষের) প্রবৃত্তির আর সে সত্তার যিনি তাকে (সব রকম বাহ্যিক) ও আভ্যান্তরীণ শক্তি দিয়ে শক্তিশালী করেছেন৷ আর পাপাচার ও তাকওয়া-পরহেজগারীর অনুভূতি দু"টোই তার ওপর ইলহাম করেছেন৷" এসব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ সামনে রেখে বিচার করলে এবং পৃথিবীতে মানুষের হিদায়াতের জন্য আল্লাহ তা"আলা যেসব ব্যবস্থার কথা কুরআন মজিদে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন তাও সামনে রাখলে বুঝা যায় যে, এ আয়াতে পথ দেখানোর যে কথা বলা হয়েছে তার দ্বারা পথপ্রদর্শনের কোন একটি মাত্র পন্থা ও উপায় বুঝানো হয়নি৷ বরং এর দ্বারা অনেক পন্থা ও উপায়ের কথা বলা হয়েছে যার কোন সীমা পরিসীমা নেই৷ যেমনঃ

একঃ প্রত্যেক মানুষকে জ্ঞান ও বিবেক-বুদ্ধির যোগ্যতা দেয়ার সাথে সাথে তাকে একটি নৈতিক বোধ ও অনুভূতি দেয়া হয়েছে যার সাহায্যে সে প্রকৃতিগতভাবেই ভাল ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য করে, কিছু কাজ-কর্ম ও বৈশিষ্টকে খারাপ বলে জানে যদিও সে নিজেই তাতে লিপ্ত৷ আবার কিছু কাজ-কর্ম ও গুণাবলীকে ভাল বলে মনে করে যদিও সে নিজে তা থেকে দূরে অবস্থান করে৷ এমন কি যেসব লোক তাদের স্বার্থ ও লোভ -লালসার কারণে এমন সব দর্শন রচনা করেছে যার ভিত্তিতে তারা অনেক খারাপ ও পাপকার্যকেও নিজেদের জন্য বৈধ করে নিয়েছে তাদের অবস্থাও এমন যে, সে একই মন্দ কাজ করার অভিযোগ যদি কেউ তাদের ওপর আরোপ করে, তাহলে তারা প্রতিবাদে চিৎকার করে উঠবে এবং তখনই জানা যায় যে, নিজেদের মিথ্যা ও অলীক দর্শন সত্ত্বেও বাস্তবে তারা নিজেরাও সেসব কাজকে খারাপই মনে করে থাকে৷ অনুরূপ ভাল কাজ ও গুণাবলীকে কেউ মূর্খতা, নির্বুদ্ধিতা এবং সেকেলে ঠাওরিয়ে রাখলেও কোন মানুষের কাছ থেকে তারা যখন নিজেরাই নিজেদের সদাচরণের সূফল ও উপকার লাভ করে তখন তারা সেটিকে মূল্যবান মনে করতে বাধ্য হয়ে যায়৷

দুইঃ প্রত্যেক মানুসের মধ্যেই আল্লাহ তা"আলা বিবেক (তিরষ্কারকারী নফস) বলে একটি জিনিস রেখে দিয়েছেন৷ যখন সে কোন মন্দ কাজ করতে উদ্যত হয় অথবা করতে থাকে অথবা করে ফেলে তখন এ বিবেকই তাকে দংশন করে৷যতই হাত বুলিয়ে বা আদর -সোহাগ করে দিয়ে মানুষ এ বিবেককে ঘুম পাড়িয়ে দিক, তাকে অনুভূতিহীন বানানোর যত চেষ্টাই সে করুক সে তাকে একদম নিশ্চিহ্ন করতে সক্ষম নয়৷ হঠকারী হয়ে দুনিয়ায় সে নিজেকে চরম বিবেকহীন প্রমাণ করতে পারে ,সে সুন্দর সুন্দর অজুহাত খাড়া করতে দুনিয়াকে ধোঁকা দেয়ার সব রকম প্রচেষ্টা চালাতে পারে, সে নিজের বিবেককে প্রতারিত করার জন্য নিজের কর্মকাণ্ডের সপক্ষে অসংখ্য ওজর পেশ করতে পারে; কিন্তু এসব সত্ত্বেও আল্লাহ তার স্বভাব-প্রকৃতিতে যে হিসাব পরীক্ষককে নিয়োজিত রেখেছেন সে এত জীবন্ত ও সজাগ যে,সে নিজে প্রকৃতপক্ষে কি তা কোন অসৎ মানুষের কাছেও গোপন থাকে না৷ সূরা আল কিয়ামাহতে একথাটিই বলা হয়েছে যে,"মানুষ যত ওজরই পেশ করুক না কেন সে নিজেকে নিজে খুব ভাল করেই জানে"৷(আয়াত ১৫)৷

তিনঃ মানুষের নিজের সত্তায় এবং তার চারপাশে যমীন থেকে আসমান পর্যন্ত গোটা বিশ্ব-জাহানের সর্বত্র এমন অসংখ্য নিদর্শনাদি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে যা আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে যে, এমনসব জিনিস কোন আল্লাহ ছাড়া হতে পারে না কিংবা বহু সংখ্যক খোদাএ বিশ্ব-জাহানের সৃষ্টিকর্তা বা পরিচালক হতে পারে না৷ বিশ্ব চরাচরের সর্বত্র এবং মানুষের আপন সত্তার অভ্যন্তরে বিদ্যমান এ নিদর্শনাবলীই কিয়ামত ও আখেরাতের সুষ্পষ্ট প্রমাণ পেশ করেছে৷ মানুষ যদি এসব থেকে চোখ বন্ধ করে থাকে অথবা বুদ্ধি -বিবেক কাজে লাগিয়ে সব বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা না করে অথবা তা যেসব সত্যের প্রতি ইংগিত করছে তা মেনে নিতে টালবাহানা ও গড়িমসি করে তাহলে তা তার নিজেরই অপরাধ৷ আল্লাহ তা"আলা নিজের পক্ষ থেকে তার সামনে সত্যের সন্ধান দাতা নিদর্শনাদি পেশ করতে আদৌ কোন অস্পূর্ণতা রাখেনি৷

চারঃ মানুষের নিজের জীবনে ,তার সমসাময়িক পৃথিবীতে এবং তার পূর্বের অতীত ইতিহাসের অভিজ্ঞতায়, এমন অসংখ্য ঘটনা সংঘটিত হয়েছে এবং হয়ে থাকে যা প্রমাণ করে যে, একটি সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর শাসন-কর্তৃত্ব তার ওপর এবং সমগ্র বিশ্ব-জাহানের ওপর কর্তৃত্ব চালিয়ে যাচ্ছেন যাঁর সামনে সে নিতান্তই অসহায়৷ যাঁর ইচ্ছা সবকিছুর ওপর বিজয়ী এবং যাঁর সাহায্যের সে মুখাপেক্ষী৷ এসব অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ বাহ্যিক ক্ষেত্রসমূহেই শুধু এ সত্যের প্রমাণ পেশ করে না৷ বরং মানুষের নিজের প্রকৃতির মধ্যেও সে সর্বোচ্চ শাসন-কর্তৃত্বের প্রমাণ বিদ্যমান যার কারণে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার ক্ষেত্রে খারাপ সময়ে নাস্তিকরাও আল্লাহর সামনে প্রার্থনার হাত প্রসারিত করে এবং কট্টর মুশরিকরাও সব মিথ্যা খোদাকে পরিত্যাগ করে একমাত্র আল্লাহকে ডাকতে শুরু করে৷

পাঁচঃ মানুষের বিবেক-বুদ্ধি ও প্রকৃতিগত জ্ঞানের অকাট্য ও চূড়ান্ত রায় হলো অপরাধের শাস্তি এবং উত্তম কার্যাবলীর প্রতিদান অবশ্যই পাওয়া উচিত৷ এ উদ্দেশ্যে দুনিয়ার প্রত্যেক সমাজে কোন না কোন রূপে বিচার -ব্যবস্থা কায়েম করা হয় এবং যেসব কাজ-কর্ম প্রশংসনীয় বলে মনে করা হয় তার জন্য পুরষ্কার ও প্রতিদান দেয়ারও কোন না কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়৷ এটা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, নৈতিকতা এবং প্রতিদান বা ক্ষতিপূরণ আইনের মধ্যে এমন একটি অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বিদ্যমান যা অস্বীকার করা কোন মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়৷ একথা যদি স্বীকার করা হয় যে, এ পৃথিবীতে এমন অসংখ্য অপরাধ আছে যার যথাযোগ্য শাস্তি তো দূরের কথা যার আদৌ কোন শাস্তি দেয়া যায় না৷ এবং এমন অসংখ্য সেবামূলক ও কল্যাণমূলক কাজ আছে যার যথাযোগ্য প্রতিদান তো দূরের কথা কাজ সম্পাদনকারী আদৌ কোন প্রতিদান লাভ করতে পারে না৷ তাহলে আখেরাতকে মেনে নেয়া ছাড়া কোন উপায় থাকে না৷ তবে কোন নির্বোধ যদি মনে করে অথবা কোন হঠকারী ব্যক্তি যদি সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে থাকে যে, ন্যায় ও ইনসাফের ধারণা পোষণকারী মানুষ এমন এক পৃথিবীতে জন্মলাভ করে ফেলেছে যেখানে ন্যায় ও ইনসাফের ধারণা একেবারেই অনুপস্থিত তবে সেটা আলাদা কথা, এরপর অবশ্য একটি প্রশ্নের জওয়াব দেয়া তার দায়িত্ব ও কর্তব্য হয়ে পড়ে৷ তাহলো,এমন এক বিশ্বে জন্মলাভকারী মানুষের মধ্যে ইনসাফের এ ধারণা এলো কোথা থেকে?

ছয়ঃ এসব উপায়-উপকরণের সাহায্যে মানুষকে হিদায়াত ও পথপ্রদর্শনের জন্য আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে নবী পাঠিয়েছেন এবং কিতাব নাযিল করেছেন৷ এসব কিতাব পরিস্কার ভাষায় বলে দেয়া হয়েছে ,শোকরের পথ কোনটি এবং কুফরের পথ কোনটি এবং এ দুটি পথে চলার পরিণামই বা কি? নবী -রসূল এবং তাদের আনীত কিতাবসমূহের শিক্ষা জানা-অজানা, দৃশ্য-অদৃশ্য অসংখ্য উপায় ও পন্থায় এত ব্যাপকভাবে সমগ্র বিশ্ব ছড়িয়ে পড়েছে যে, কোন জনপদই আল্লাহ ও আখেরাতের ধারণা, সৎ ও অসৎ কাজের পার্থক্য বোধ এবং তাঁদের পেশকৃত নৈতিক নীতিমালা ও আইন-বিধান সম্পর্কে অজ্ঞ নয়, নবী -রসূলের আনীত কিতাবসমূহের শিক্ষা থেকেই তারা এ জ্ঞান লাভ করেছে তা তাদের জানা থাক বা না থাক ৷বর্তমানে যেসব লোক নবী -রসূলগণ এবং আসমানী কিতাবসমূহকে অস্বীকার করে অথবা তাদের সম্পর্কে কোন খবরই রাখে না তারাও এমন অনেক জিনিস অনুসরণ করে থাকে যা মূলত ঐ সব শিক্ষা থেকে উৎসারিত ও উৎপন্ন হয়ে তাদের কাছে পৌছেছে৷ অথচ মূল উৎস কি সে সম্পর্কে তারা কিছুই জানে না৷
৬. মূল আয়াতে---------- শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে৷ এর অর্থ এমন সব মানুষ যারা পুরোপুরি তাদের রবের আনুগত্য করেছে, তাঁর পক্ষ থেকে অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহ পালন করেছে এবং তাঁর পক্ষ থেকে নিষিদ্ধ কাজসমূহ থেকে বিরত রয়েছে৷
৭. অর্থাৎ তা কর্পূর মিশ্রিত পানি হবে না বরং তা হবে এমন একটি প্রাকৃতিক ঝর্ণাধারা যার পানি হবে স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন এবং শীতল আর তার খোশবু হবে অনেকটা কার্পূরের মত৷
৮. --------(আল্লাহ বান্দারা) কিংবা ----------(রহমানের বান্দারা ) শব্দগুলো আভিধানিক অর্থে সমস্ত মানুষের জন্যই ব্যবহৃত হতে পারে৷ কারণ সবাই আল্লাহর বান্দা কিন্তু তা সত্ত্বেও কুরআন মজীদে যেখানেই এ ধরনের শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তার দ্বারা আল্লাহর নেক্কার বান্দাগণকেই বুঝানো হযেছে৷ অসৎলোক,যারা নিজেরাই নিজেদেরকে আল্লাহর বন্দেগী তথা দাসত্বের বাইরে রেখেছে ,তারা যেন এর যোগ্য-ই নয় যে, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে নিজের মহান নামের সাথে যুক্ত করে -------অথবা ----এর মত সম্মানিত উপাধিতে ভূষিত করবেন৷
৯. এর দ্বারা বুঝায় না যে, তারা সেখানে কোদাল ও খন্তা নিয়ে নালা খনন করবে এবং এভাবে উক্ত ঝর্ণার পানি যেখানেই ইচ্ছা নিয়ে যাবে৷বরং এর অর্থ হলো, জান্নাতের মধ্যে যেখানেই তারা চাইবে সেখানেই এ ঝর্ণা বইতে থাকবে৷ এ জন্য তাদের নির্দেশ বা ইংগিতই যথেষ্ট হবে৷ সহজেই বের করে নেবে কথাটি এ বিষয়টির প্রতিই ইংগিত করে৷
১০. "নযর" বা মানত পূরণ করার একটা অর্থ হলো, মানুষের ওপর যা কিছু ওয়াজিব করা হয়েছে তা তারা পূরণ করবে৷ দ্বিতীয় অর্থ হলো, মানুষ তার নিজের ওপর যা ওয়াজিব করে নিয়েছে কিংবা অন্য কথায় সে যে কাজ করার সংকল্প ব ওয়াদা করেছে তা পূরণ করবে৷ তৃতীয় অর্থ হলো, ব্যক্তির ওপরে যা ওয়াজিব তা সে পূরণ করবে৷ তা তার ওপর ওয়াজিব করা হয়ে থাকুক অথবা সে নিজেই তার ওপর ওয়াজিব করে নিয়ে থাকুক৷ এ তিনটি অর্থের মধ্যে দ্বিতীয় অর্থটি বেশী পরিচিত এবং "নযর" শব্দ দ্বারা সাধারণত এ অর্থটিই বুঝানো হয়ে থাকে৷ যাই হোক, এখানে ঐ সমস্ত লোকের প্রশংসা হয়তো এ জন্য করা হয়েছে যে, তারা আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত ওয়াজিবসমূহ পালন করে৷ অথবা এ জন্য তাদের প্রশংসা করা হয়েছে যে, তারা অত্যন্ত সৎ মানুষ৷ যেসব ওয়াজিব বা করনীয় আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য নির্ধারিত করে দিয়েছেন সেগুলো পালনের ব্যাপারে কোন রকম ত্রুটি করা তো দূরের কথা যেসব ভাল ও কল্যাণকর কাজ আল্লাহ তাদের জন্য ওয়াজিব বা করণীয় করে দেননি তারা যখন আল্লাহর কাছে সে কাজ করার ওয়াদা করে তখন সে ওয়াদাও পালন করে৷

মানতের বিধি-বিধান ও হুকুম-আহকাম তাফহীমুল কুরআনে সূরা বাকারার ৩১০ নং টীকায় আমি সংক্ষেপে বর্ণনা করেছি৷ তবে এখানে তা আরো একটু বিস্তারিত আলোচনা করা যথার্থ বলে মনে করছি৷ যাতে এ ব্যাপারে মানুষ যেসব ভুল করে অথবা যেসব ভুল ধারণা মানুষের মধ্যে দেখা যায় তা থেকে আত্মরক্ষা করতে এবং এর সঠিক নিয়ম-কানুন অবহিত হতে পারে৷

একঃ ফিকাহ শাস্ত্রবিদগণের মতে "নযর" বা মানত চার প্রকারের৷ এক,এক ব্যক্তি আল্লাহর সাথে ওয়াদা করলো যে, সে তাঁর সন্তুষ্টি বিধানের জন্য অমুক নেক কাজ সম্পাদন করবে৷দুই,সে মানত করলো যে, আল্লাহ যদি আমার অমুক প্রয়োজন পূরণ করেন তাহলে আমি শোকরিয়া হিসেবে অমুক নেক কাজ করবো৷ এ দুই প্রকারের মানতকে ফিকাহবিদদের পরিভাষায় "নযরে তাবাররুর" বা নেক কাজের মানত বলা হয় এবং এব্যাপারে তারা একমত যে, এ নযর পূরণ করা ওয়াজিব৷ তিন,কোন ব্যক্তির কোন নাজায়েজ কাজ করার কিংবা কোন ওয়াজিব কাজ না করার সংকল্প করা৷ চার,কোন ব্যক্তির কোন মুবাহ কাজ করা নিজের জন্য ওয়াজিব করে নেয়া অথবা কোন অবাঞ্ছিত কাজ করার সংকল্প করা৷ এ দুপ্রকারের মানতকে ফিকাহবিদদের পরিভাষায় "নযরে লাজাজ"(মুর্খতা ,ঝগড়াটেপনা ও হঠকারীতামূলক মানত)বলে৷ এর মধ্যে তৃতীয় প্রকারের মানত সম্পর্কে সব ফিকাহবিদদের ঐক্যমত হলো, তা মানত হিসেবে পরিগণিত হয় না৷ চতুর্থ প্রকারের মানত সম্পর্কে ফিকাহবিদগণ ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করেছেন৷ কোন কোন ফিকাহবিদ বলেছেনঃ এ মানত পূরণ করা কর্তব্য৷ কেউ কেউ বলেনঃ শপথ ভংগের কাফ্ফারা দিতে হবে৷ আবার কেউ কেউ বলেন,ব্যক্তি ইচ্ছা করলে মানত পুরণ করতে পারে কিংবা কাফ্ফারা দিতে পারে৷ এ ব্যাপারে তার স্বাধীনতা রয়েছে৷ শাফেয়ী এবং মালেকীদের মতে এ প্রকারের মানতও আদৌ মানত হিসিবে গণ্য হয় না৷ আর হানাফীদের মতে এ প্রকারের মানতের জন্য কাফ্ফারা দেয়া আবশ্যিক হয়ে যায় ৷(উমদাতুল কারী)৷

দুইঃ কিছু সংখ্যক হাদীস থেকে জানা যায় যে, কেউ যদি মনে করে মানত দ্বারা "তাকদীর" পরিবর্তিত হয়ে যাবে অথবা যে মানতে কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য শোকরিয়া হিসেবে নেক কাজ করার পরিবর্তে আল্লাহকে বিনিময় হিসেবে কিছু দেয়ার জন্য এভাবে চিন্তা করে যে, তিনি যদি আমার কাজটি করে দেন তাহলে আমি তাঁর জন্য অমুক নেক কাজটি করে দেব৷ তবে এ ধরনের মানত নিষিদ্ধ৷ হাদীসে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর থেকে বর্ণিত হয়েছে যে,

--------------------

"একবার রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানত মানতে নিষেধ করতে লাগলেন ৷ তিনি বলেছিলেন, মানত কোন কিছু প্রতিরোধ করতে পারে না৷তবে এভাবে কৃপণ ব্যক্তির দ্বারা তার কিছু অর্থ ব্যায় করানো হয় ৷(মুসলিম -আবু দাউদ)

হাদীসের শেষ অংশের অর্থ হলো, কৃপণ ব্যক্তি নিজের ইচ্ছায় আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় করার মত বান্দা নয়৷ মানতের মাধ্যমে সে এ লোভে কিছু খরচ করে যে, এ বিনিময়ে গ্রহণ করে আল্লাহ তাআলা হয়তো তার তাকদীর পরিবর্তন করে দেবেন৷ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) বর্ণিত আরেকটি হাদীস হলো, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ

------------

"মানত কোন কাজকে এগিয়ে আনতে কিংবা আশু সংঘটিতব্য কোন কাজকে পিছিয়ে দিতে পারে না৷ তবে এভাবে কৃপণ ব্যক্তির কিছু অর্থ -সম্পদ খরচ করানো হয়৷"(বুখারী ও মুসলিম)

আরো একটি হাদিসে তিনি বলেছেনঃ নবী (সা) মানত করতে নিষেধ করেছেন৷তিনি বলেছেনঃ

-----------------------

এভাবে কোন উপকার বা কল্যাণ হয় না৷ তবে বখীল কর্তৃক তার অর্থ-সম্পদ থেকে কিছু খরচ করানো হয়"(বুখারী ও মুসলিম)

ইমাম মুসলিম (রা) হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে প্রায় এরূপ বিষয়বস্তু সম্বলিত কিছু সংখ্যক হাদীস উদ্ধৃত করেছেন৷ বুখারী ও মুসলিম উভয়ে আরো একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন যাতে তারা বলেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ

---------------------------

"আল্লাহ তাআলা কোন মানুষের তাকদীরে যা নির্ধারিত করেননি,মানত ঐ মানুষকে তার ব্যবস্থা করে দিতে পারে না৷ তবে মানত তাকদীর অনুসারে হয়ে থাকে৷আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীর এভাবে বখীলের কাছ থেকে সেই বস্তু বের করে নেয় যা সে অন্য কোন কারণে বের করতো না৷"

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আসের (রা) বর্ণিত একটি হাদীস এ বিষয়টিকে আরো স্পষ্ট করে তোলে৷ হাদীসটিতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ

-------------------------------

"যা দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করাই মুখ্য উদ্দেশ্য হয় প্রকৃত মানত সেটিই৷"(তাহাবী)৷

তিনঃ মানতের ব্যাপারে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো একটি নিয়ম বা ফর্মূলা বলেছেন৷ তাহলো, যেসব মানত আল্লাহর আনুগত্যের উদ্দেশ্যে হবে কেবল সে সব মানত পূরণ করতে হবে৷ আল্লাহর নাফরমানীমূলক কোন মানত কখনো পূরণ করা যাবে না৷ অনুরূপ কোন ব্যক্তি যে বস্তুর মালিক নয় সে বস্তু দিয়ে কোন মানত করা যায় না৷ অথবা মানুষের সাধ্যাতীত কোন কাজ দিয়েও মানত করা যায় না৷ হযরত আয়েশা (রা)বর্ণনা করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ

--------------------------

"কেউ যদি মানত করে, সে আল্লাহর আনুগত্য করবে তাহলে যেন সে তাঁর আনুগত্য করে৷ আর কেউ যদি মানত করে, সে আল্লাহর নাফরমানী করবে তাহলে যেন সে তা না করে৷"(বুখারী ,আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ, তাহাবী)৷

সাবেত ইবনে দ্বাহহাক বলেন,নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ

-------------------------------

"আল্লাহর অবাধ্যতামূলক কোন বিষয়ে কিংবা যে বস্তু ব্যক্তির মালিকানাধীন নয় এমন বস্তুর ক্ষেত্রে মানত পূরণ করার কোন প্রশ্নই ওঠে না৷ (আবু দাউদ)৷

মুসলিম এ একই বিষয় সম্বলিত হাদীস হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন থেকে বর্ণনা করেছেন তাছাড়া আবু দাউদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে "আমর ইবনে আসের (রা)বর্ণিত হাদীসটি এর চেয়েও ব্যাপক ও বিস্তৃত৷ এ হাদীসে তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন এভাবেঃ

------------------------

"মানুষের আয়ত্বাধীন বা নাগালের মধ্যে নয় এমন কোন কাজে কোন মানত বা শপথ অচল৷ অনুরূপ আল্লাহর অবাধ্যতামূলক কিংবা অত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করার মত কোন কাজেও মানত বা শপথ কার্যকর হবে না৷"

চারঃ যে কাজে মূলত কোন নেকী নেই এবং ব্যক্তি অযথা কোন অর্থহীন কাজ কিংবা অসহনীয় কঠোর পরিশ্রম অথবা আত্মপীড়নকে নেক কাজ মনে করে তা নিজের জন্য আবশ্যিক করে নিয়েছে তার এরূপ মানত পূরণ না করা উচিত৷ এ ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ অত্যন্ত স্পষ্ট৷ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বলেনঃ একবার নবী (সা)খুতবা পেশ করার সময় দেখলেন, এক ব্যক্তি রোদে দাঁড়িয়ে আছে৷ তিনি জিজ্ঞেস করলেন,লোকটি কে এবং কেনই বা সে রোদে দাঁড়িয়ে আছে? তাঁকে বলা হলো, লোকটির নাম আবু ইসরাঈল৷ সে মানত করেছে যে ,সে দাঁড়িয়ে থাকবে ,বসবে না, ছায়া গ্রহণ করবে না, কারো সাথে কথা বলবে না এবং রোযা রাখবে৷ একথা শুনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ

--------------------------

"তাকে বলো,সে কথা বলুক, ছায়াতে আশ্রয় গ্রহণ করুক, এবং বসুক৷ তবে রোযা যেন পালন করে৷" (বুখারী,আবু দাউদ,ইবনে মাজাহ,মুয়াত্তা)

হযরত উকবা ইবনে আমের জুহানী বলেন আমার বোন খালি পায়ে হেঁটে হজ্জ করার মানত করলো৷সে আরো মানত করলো যে, হজ্জের এ সফরে সে মাথায়ও কাপড় দেবে না৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ তাকে বলো , সে যেন বাহনে সওয়ার হয়ে হজ্জে যায় এবং মাথায় কাপড় দেয়৷ (আবু দাউদ ও মুসলিম এ বিষয়ে বেশ করেকটি হাদীস বর্ণনা করেছেন তবে তাতে কিছু শাব্দিক তারতম্য আছে) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) উকবা ইবনে আমেরের বোনের এ ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যে বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন তার ভাষা হলো,

----------------

"তার এ মানতের প্রয়োজন আল্লাহর নেই৷ তাকে বলো, সে যেন বাহনে সওয়ার হয়ে হজ্জ করতে যায়৷" (আবু দাউদ)

আরো একটি হাদীস বর্ণনা প্রসংগে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বলেনঃ এক ব্যক্তি বললো, আমার বোন পায়ে হেঁটে হজ্জ করার মানত করেছে৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ

----------------

"তোমার বোনের কঠোর পরিশ্রমে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই৷তার উচিত সওয়ারীর পিঠে উঠে হজ্জ করা৷" (আবু দাউদ)

হযরত আনাস ইবনে মালেক থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (সম্ভবত হজ্জের সফরে) দেখলেন এক বয়োবৃদ্ধ দুর্বল ব্যক্তিকে তার দুই পুত্র ধরাধরি করে নিয়ে যাচ্ছে৷ তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ব্যাপার কি ? বলা হলো,সে পায়ে হেঁটে হজ্জ করার মানত করেছে৷ একথা শুনে তিনি বললেনঃ

------------------------

"এ ব্যক্তি নিজে নিজেকে কষ্ট দেবে,তাতে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই৷ এরপর তিনি তাকে বাহনে সওয়ার হতে নির্দেশ দিলেন৷ (বুখারী ,মুসলিম, আবু দাউদ, মুসলিমে হযরত আবু হুরায়রা থেকেও এ একই বিষয়ে হাদীস বর্ণিত হয়েছে)

পাঁচঃ কোন মানত পূরণ করা যদি কার্যত অসম্ভব হয় তাহলে তা অন্য কোনভাবে পূরণ করা যেতে পারে৷ হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ বলেনঃ মক্কা বিজয়ের দিন এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললো, হে আল্লাহর রসূল, আমি এ মর্মে মানত করেছিলাম যে, আল্লাহ যদি আপনার হাতে মক্কা বিজয় দান করেন তাহলে আমি বায়তুল মুকাদ্দাসে দুই রাকআত নামায পড়বো৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ এখানেই পড়ে নাও৷ সে আবার জিজ্ঞেস করলো৷ তিনিও পুনরায় একই জবাব দিলেন৷ সে আবার জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেনঃ---------- তাহলে এখন তোমার মর্জি৷ অন্য একটি হাদীসে আছে৷ নবী (সা) বলেছেনঃ

-----------------

"সে মহান সত্তার শপথ, যিনি মুহাম্মাদকে ন্যায় ও সত্য দিয়ে পাঠিয়েছেন; তুমি যদি এখানে নামায পড়ে নাও, তাহলে তা বায়তুল মাকদাসে নামায পড়ার বিকল্প হিসেবে যথেষ্ট হবে৷"(আবু দাউদ)

ছয়ঃ কেউ যদি তার সমস্ত অর্থ-সম্পদ আল্লাহর পথে খরচ করার জন্য মানত করে তাহলে সে ক্ষেত্রে ফিকাহবিদগণ ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করেছেন৷ ইমাম মালেক (র) বলেনঃ এ ক্ষেত্রে তাকে এক -তৃতীয়াংশ সম্পদ দিয়ে দিতে হবে৷ মালেকীদের মধ্য থেকে "সাহনূনের "বক্তব্য তাকে এতটা সম্পদ দিয়ে দিতে হবে যতটা দিলে সে কষ্টের মধ্যে পড়বে না৷ইমাম শাফেয়ী (র) বলেনঃ এটা যদি তার "নযরে তাবাররুর"(নেকীর উদ্দেশ্যে মানত )হয় তাহলে সমস্ত সম্পদ দিয়ে দিতে হবে৷আর যদি "নযরে লাজাজ"(মুর্খতা ও হঠকারীতামূলক মানত)হয় তাহলে সে উক্ত মানত পূরণ করতে পারে কিংবা "কসম"বা শপথের "কাফ্ফারা"ও দিতে পারে৷ এ ব্যাপারে তার স্বাধীনতা রয়েছে৷ ইমাম আবু হানীফা বলেনঃ তাকে যেসব অর্থ-সম্পদ যাকাত দিতে হয় যেসব সম্পদ আল্লাহর পথে দিয়ে দেয়া কর্তব্য৷ কিন্তু যেসব সম্পদের যাকাত দিতে হয় না, যেমন, বসত বাড়ী এবং অনুরূপ অন্যান্য সম্পদ তার ওপর এ মানত প্রযোজ্য হবে না৷ হানাফীদের মধ্যে ইমাম যুফারের (র) বক্তব্য হলো, নিজের পরিবার-পরিজনের জন্য দুই মাসের প্রয়োজনীয় খরচ রেখে অবশিষ্ট সমস্ত সম্পদ সদকা করে দিতে হবে৷ (উমদাতুল কারী,শহ ওয়ালী উল্লাহ কৃত মুয়াত্তার শরাহ৷) এ বিষয়টি সম্পর্কে হাদীসে যা বর্ণিত হয়েছে তাহলো হযরত কা"ব ইবনে মালেক বলেন,তাবুক যুদ্ধে অংশ গ্রহণ না করার কারণে যে তিরষ্কার ও অসন্তোষের শিকার আমি হয়েছিলাম তা মাফ হয়ে গেলে আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে আরয করলাম যে, আমার তাওবার মধ্যে এ বিষয়টিও অন্তরভুক্ত ছিল যে, আমি আমার সমস্ত সম্পদের মালিকানা স্বত্ব ত্যাগ করে তা আল্লাহ ও আল্লাহর রসূলের পথে দান করে দেব৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ না, এরূপ করো না৷ আমি বললাম, তাহলে অর্ধেক সম্পদ? তিনি বললেনঃ না,তাও না৷ আমি আবার বললাম, তাহলে এক -তৃতীয়াংশ? তিনি বললেনঃ হাঁ৷(আবু দাউদ) অন্য একটি হাদীসে আছে৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ তুমি তোমার কিছু সম্পদ যদি নিজের জন্য রেখে দাও তাহলে তা তোমার জন্য সর্বোত্তম হবে৷ (বুখারী )ইমাম যুহরী বলেনঃ আমি জানতে পেরেছি যে,হযরত আবু লুবাবা (রা) (তাবুক যুদ্ধের ব্যাপারে তিনিও তিরস্কার ও অসন্তোষের শিকার হয়েছিলেন) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেনঃ আমি আমার সমস্ত সম্পদের মালিকানা ত্যাগ করে তা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পথে সদকা হিসেবে দিয়ে দিতে চাই৷ জবাবে নবী (সা) বললেনঃ সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ দিয়ে দেয়াই তোমার জন্য যথেষ্ট ৷(মুয়াত্তা)

সাতঃ ইসলাম গ্রহণের পূর্বে কেউ যদি কোন নেক মানত করে তাহলে ইসলাম গ্রহণের পরে কি তা পূরণ করতে হবে? এ ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ফতোয়া হলো, তা পূরণ করতে হবে৷ বুখারী, আবু দাউদ ও তাহাবীতে হযরত "উমর সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে তিনি জাহেলী যুগে মানত করেছিলেন যে, মসজিদে হারামে এক রাত (কারো কারো বর্ণনায় একদিন) ই"তিকাফ করবেন৷ ইসলাম গ্রহণের পর তিনি এ ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ফতোয়া জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেনঃ ------------"নিজের মানত পূরণ করো৷" কোন কোন ফিকাহবিদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ নির্দেশের অর্থ করেছেন যে, এরূপ করা ওয়াজিব৷ আবার কেউ কেউ অর্থ করেছেন যে, এরূপ করা মুস্তাহাব৷

আটঃ মৃত ব্যক্তির কোন মানত থাকলে তা পূরণ করা কি ওয়ারিশদের জন্য ওয়াজিব? এ প্রশ্নে ফিকাহবিদগণ ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করেছেন৷ ইমাম আহমাদ, ইসহাক ইবনে রাহাওয়াইয়া,আবু সাওর এবং জাহেরিয়াদের মতে মৃতের দায়িত্বে যদি রোযা বা নামাযের মানত থেকে থাকে তাহলে ওয়ারিশদের জন্য তা পূরণ করা ওয়াজিব৷ হানাফীদের মতে মৃত ব্যক্তি যদি শারীরিক ইবাদতের (নামায ও রোযা) মানত করে থাকে তাহলে তা পূরণ করা ওয়ারিশদের জন্য ওয়াজিব নয়৷ আর যদি আর্থিক ইবাদেতের মানত করে থাকে এবং মৃত ব্যক্তির আগে তার ওয়ারিশদের তা পূরণ করার অছিয়ত না করে থাকে তাহলে সে মানতও পূরণ করা ওয়াজিব নয়৷ কিন্তু সে যদি অছিয়ত করে যায়, তাহলে তা পূরণ করা ওয়াজিব৷ তবে তার পরিত্যক্ত সম্পদ এক-তৃতীয়াংশের অধিক সম্পদ দিয়ে নয়৷ এর সাথে মালেকী মাযহাবের মতামতের অনেকটা মিল আছে৷ শাফেয়ী মাযহাবের মতে, মানত যদি আর্থিক ইবাদতের না হয়ে অন্য কিছুর হয় কিংবা আর্থিক ইবাদতেরই হয় আর মৃত ব্যক্তি যদি কোন সম্পদ রেখে না গিয়ে থাকে,তাহলে তার ওয়ারিশদের জন্য আর্থিক ইবাদেতের মানত পূরণ করা ওয়াজিব নয়৷ তবে মৃত ব্যক্তি যদি সম্পদ রেখে গিয়ে থাকে তাহলে সে অছিয়ত করে থাকুক বা না থাকুক এ ক্ষেত্রে তার ওয়ারিশদের জন্য আর্থিক ইবাদতের মানত পূরণ করা ওয়াজিব৷(শরহে মুসলিম লিন নববী,বাযলূল মাজহুদ-শরহে আবী দাউদ)৷ এ সম্পর্কে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস কর্তৃক এ মর্মে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে,হযরত সা"দ ইবনে উবাদা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে একটি ফতোয়া জিজ্ঞেস করলেন৷ তিনি বললেনঃ আমার মা ইন্তেকাল করেছেন৷ তিনি একটি মানত করেছিলেন৷ কিন্তু তা পূরণ করতে পারেননি৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ তুমি তার সে মানত পূরণ করে দাও৷(আবু দাউদ,মুসলিম )ইবনে আব্বাস অন্য একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, এক মহিলা সমুদ্র যাত্রা করার সময় মানত করলো,আমি যদি সহী সালামতে জীবিত ঘরে ফিরে আসতে পারি তাহলে একমাস রোযা রাখবো৷ ফিরে আসার পরই সে মারা গেল৷ তার বোন ও মেয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলো৷ তিনি বললেনঃ তার পক্ষ থেকে তুমি রোযা রাখো৷ (আবু দাউদ)আবু দাউদ বুরাইদা থেকে অনুরূপ আরো একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, এক মহিলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এ ধরনের মাসয়ালা জিজ্ঞেস করলে তিনি তাকে সে একই জবাব দিলেন যা ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে৷ এসব হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যে নির্দেশ রয়েছে তা ওয়াজিব অর্থে না মুস্তাহাব অর্থে তা যেহেতু পরিষ্কার নয় এবং হযরত সা"দ ইবনে উবাদার মায়ের মানত আর্থিক ইবাদতের মানত ছিল না শারীরিক ইবাদতের মানত ছিল তাও স্পষ্ট নয় তাই এ মাসায়ালার ব্যাপারে ফকীহদের মধ্যে মত পার্থক্যের সৃষ্টি হয়েছে৷

নয়ঃ ভ্রান্ত ও নাজায়েজ প্রকৃতির মানত সম্পর্কে একথা পরিষ্কার যে, তা পূরণ করা ঠিক নয়৷তবে এ ধরনের মানতের ক্ষেত্রে কাফ্ফারা দিতে হবে কিনা সে বিষয়ে মতভেদ আছে৷ এ বিষয়ে হাদীসমূহের বর্ণনাই যেহেতু ভিন্ন ভিন্ন তাই তাই ফিকহাবিদগণও ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করেছেন৷ এক শ্রেণীর বর্ণনায় আছে যে,এ অবস্থায় নবী (সা) কাফ্ফারা আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন৷যেমন হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ-------------- "গোনাহের কাজে কোন মানত করা যায় না৷ এ ধরনের মানতের কাফ্ফারা হলো শপথ ভঙ্গের কাফ্ফারার মত ৷" (আবু দাউদ) উকবা ইবনে আমের জুহানীর বোনের ব্যাপারে (ওপরে ৪নং এ যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে)নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, "সে যেন তার মানত ভঙ্গ করে এবং তিন দিন রোযা রাখে৷" (মুসলিম ,আবু দাউদ )আরেকজন মহিলা যে পায়ে হেঁটে হজ্জ করার মানত করেছিল তার ব্যাপারে নবী (সা) নির্দেশ দিয়েছিলেন যে " যেন বাহনে সওয়ার হয়ে হজ্জে যায় এবং শপথ ভঙ্গের কাফ্ফারা আদায় করে৷" (আবু দাউদ) ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ

-------------------------

"কেউ যদি মানত করে এবং কি মানত করলো তা নির্দিষ্ট না করে তাকে শপথ ভঙ্গের কাফ্ফারা দিতে হবে৷ কেউ যদি কোন গোনাহের কাজের মানত করে, তবে তাকে শপথ ভঙ্গের কাফ্ফারা দিতে হবে৷কেউ যদি এমন বিষয়ের মানত করে যা পূরণ করার সাধ্য তার নেই তাকে শপথ ভঙ্গের কাফফরা দিতে হবে৷আর কেউ যদি এমন জিনিসের মানত করে যা পূরণ করার সমার্থ তার আছে,তাহলে তাকে সে মানত পূরণ করতে হবে৷"(আবু দাউদ)

অন্য দিকে আছে যেসব হাদীস যা থেকে জানা যায় যে, এসব অবস্থায় কাফ্ফারা দিতে হবে না৷ ওপরে ৪নং এ যে ব্যক্তির উল্লেখ করা হয়েছে যে, সে রোদে দাঁড়িয়ে থাকার এবং কারো সাথে কথা না বলার মানত করেছিল তার কাহিনী উল্লেখ করার পর ইমাম মালেক (র)তাঁর গ্রন্থ মুয়াত্তায় লিখেছেন যে, নবী (সা) তাকে মানত ভঙ্গ করার নির্দেশ দানের সাথে সাথে কাফ্ফারা আদায় করার নির্দেশও দিয়েছিলেন বলে কোন সুত্র থেকেই আমি জানতে পারিনি৷ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস বর্ণনা করেছেন যে,রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ

----------------------

"কেউ কোন বিষয়ে মানত করার পর যদি দেখে যে, অন্য একটি জিনিস তার চেয়ে উত্তম তাহলে সে যেন তা পরিত্যাগ করে এবং যেটি উত্তম সেটি গ্রহণ করে৷ আর ঐটি ছেড়ে দেয়াই হবে তার কাফ্ফারা"(আবু দাউদ)

বায়হাকীর মতে হাদীসটি এবং হযরত আবু হুরাইরার রেওয়ায়াতের "যে কাজটি উত্তম সেটি করবে আর এরূপ করাই এর কাফ্ফারা "এ অংশটুকু প্রমাণিত নয়৷এসব হাদীস সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে ইমাম নববী (র) শরহে মুসলিমে লিখেছেন,"ইমাম মালেক (র) শাফেয়ী (র),আবু হানীফা (র),দাউদ যাহেরী এবং সংখ্যাগুরু আলেমদের মতে গোনাহর কাজের মানত বাতিল এবং তা পূরণ না করলে কাফ্ফারা দিতে হবে না ৷ কিন্তু ইমাম আহমাদের (র) মতে কাফ্ফারা দিতে হবে৷"
১১. মুল শব্দ হলো -------৷অধিকাংশ মুফাস্সির ----- এর ---(হা) শব্দটিকে ---------খাদ্যের সর্বনাম হিসেবে নির্ধারিত করেছেন৷ তাঁরা এর অর্থ বর্ণনা করেছেন যে,খাদ্য অত্যন্ত প্রিয় ও আকর্ষণীয় হওয়া সত্ত্বেও এবং নিজেরাই খাদ্যের মুখাপেক্ষী হওয়া সত্ত্বেও নেককার লোকেরা তা অন্যদেরকে খাওয়ান৷ ইবনে আব্বাস ও মুজাহিদ বলেন, এর অর্থ হলো ---------অর্থাৎ গরীব ও দুস্থদের খাওয়ানোর আকাংখা ও উৎসাহের কারণে তারা এ কাজ করে থাকে৷ হযরত ফুদাইল ইবনে আয়দ্ব ও আবু সুলায়মান আদ-দারানী বলেন, তারা আল্লাহ তাআলার মহব্বতে এরূপ করে৷ আমাদের মতে পরবর্তী আয়াতাংশ ----------------(আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টিলাভের উদ্দেশ্যেই তোমাদের খাওয়াচ্ছি) এ অর্থকেই সমর্থন করে৷
১২. প্রাচীনকালে রীতি ছিল বন্দীদের হাতকড়া ও বেড়ী পরিয়ে প্রতিদিন বাইরে বের করে আনা হতো৷ তারপর তারা রাস্তায় রাস্তায় ও মহল্লায় মহল্লায় ভিক্ষা করে ক্ষুধা নিবারণ করতো৷পরবর্তীকালে ইসলামী সরকার এ কুপ্রথাকে উচ্ছেদ করে৷ (কিতাবুল খারাজ, ইমাম আবু ইউসূফ, পৃষ্ঠা ১৫০,মুদ্রণ ১৩৮২ হিঃ)এ আয়াতে বান্দী বলতে কাফের হোক বা মুসলমান,যুদ্ধবন্দী হোক বা অপরাধের কারণে বন্দী হোক সব রকম বন্দীকে বুঝানো হয়েছে৷ বন্দী অবস্থায় তাদেরকে খাদ্য দেয়া হোক বা ভিক্ষা করানো হোক,সর্বাবস্তায় একজন অসহায় মানুষকে -যে তার খাবার সংগ্রহের জন্য নিজে কোন চেষ্টা করতে পারে না- খাবার দেয়া অতি বড় নেকী ও সওয়াবের কাজ৷
১৩. কোন গরীবকে খেতে দেয়া যদিও বড় নেকীর কাজ, কিন্তু কোন অভাবী মানুষের অন্যান্য অভাব পূরণ করাও একজন ক্ষুধার্ত মানুষকে খেতে দেয়ার মতই নেক কাজ৷ যেমন কেউ কাপড়ের মুখাপেক্ষী, কেউ অসুস্থ তাই চিকিৎসার মুখাপেক্ষী অথবা কেউ ঋণগ্রস্থ, পাওনাদার তাকে অস্থির ও অতিষ্ঠ করে তুলেছে৷ এসব লোককে সাহায্য করা খাবার খাওয়ানের চেয়ে কম নেকীর কাজ নয় ৷ তাই এ আয়াতটিতে নেকীর একটি বিশেষ অবস্থা ও ক্ষেত্রকে তার গুরুত্বের কারণে উদাহরণ হিসেবে পেশ করা হয়েছে মাত্র৷ অন্যথায় এর মূল উদ্দেশ্য অভাবীদের সাহায্য করা৷
১৪. গরীবদের খাবার দেয়ার সময় মুখে একথা বলতে হবে এমনটা জরুনী নয়৷ মনে মনেও একথা বলা যেতে পারে৷ আল্লাহর কাছে মুখে বলার যে মর্যাদা এভাবে বলারও সে একই মর্যাদা ৷ তবে একথা মুখে বলার উল্লেখ করা হয়েছে এ জন্য যে,যাকে সাহায্য করা হবে তাকে যেন নিশ্চিত করা যায় যে, আমরা তার কাছে কোন প্রকার কৃতজ্ঞতা অথবা বিনিময় চাই না,যাতে সে চিন্তামুক্ত হয়ে খাবার গ্রহণ করতে পারে৷
১৫. অর্থাৎ চেহারার সজীবতা ও মনের আনন্দ৷ অন্য কথায় কিয়ামতের দিনের সমস্ত কঠোরতা ও ভয়াবহতা শুধু কাফেরদের জন্যই নির্দিষ্ট হবে৷ নেককার লোকেরা সেদিন কিয়ামতের সব রকম দুঃখ-কষ্ট থেকে নিরাপদে থাকবে এবং আনন্দিত ও উৎফুল্ল হবে৷ একথাটিই সূরা আম্বিয়াতে এভাবে বলা হয়েছে; "চরম হতবুদ্ধিকর সে অবস্থা তাদেরকে অস্থির ও বিহ্বল করবে না৷ ফেরেশতারা অগ্রসর হয়ে অত্যন্ত সম্মানের সাথে তাদের গ্রহণ করবে এবং বলবে এটা তোমাদের সেদিন যার প্রতিশ্রুতি তোমাদের দেয়া হতো৷"(আয়াত ১০৩) এ বিষয়টিই সূরা নামলে আরো স্পষ্ট করে বলা হয়েছে এভাবেঃ "যে ব্যক্তি সৎকাজ নিয়ে আসবে সে তার তুলনায় অধিক উত্তম প্রতিদান লাভ করবে৷ এসব লোক সেদিনের ভয়াবহতা থেকেও নিরাপদ থাকবে৷"(আয়াত ,৮৯)
১৬. এখানে "সবর" শব্দটি অত্যন্ত ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে৷ বরং প্রকৃতপক্ষে সৎকর্মশীল ঈমানদারদের গোটা পার্থিব জীবনকেই "সবর" বা ধৈর্যের জীবন বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে৷ জ্ঞান হওয়ার বা ঈমান আনার পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কোন ব্যক্তির নিজের অবৈধ আশা আকাংখাকে অবদমিত করা, আল্লাহর নির্দিষ্ট সীমাসমূহ মেনে চলা, আল্লাহর নির্ধারিত ফরয সমূহ পালন করা, আল্লাহ সন্তুষ্টি লাভের জন্য নিজের সময়, নিজের অর্থ-সম্পদ,নিজের শ্রম,নিজের শক্তিও যোগ্যতা এমনকি প্রয়োজনের মুহূর্তে প্রাণ পর্যন্ত কুরবানী করা, আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এরূপ সমস্ত লোভ-লালসা ও আকর্ষণেকে পদাঘাত করা, সত্য ও সঠিক পথে চলতে যেসব বিপদ ও দুঃখ-কষ্ট আসে তা সহ্য করা, হারাম পন্থায় লাভ করা যায় এরূপ প্রতিটি স্বার্থ ও ভোগের উপকরণ পরিত্যাগ করা,ন্যায় ও সত্যপ্রীতির কারণে যে ক্ষতি,মর্মবেদনা ও দুঃখ-কষ্ট এসে ঘিরে ধরে তা বরদাশত করা-এসবই আল্লাহর এ ওয়াদার ও পর আস্থা রেখে করা যে,এ সদাচরণের সুফল এ পৃথিবীতে নয় বরং মৃত্যুর পরে আরেকটি জীবনে পাওয়া যাবে৷ এটা এমন একটা কর্মপন্থা যা মু"মিনের গোটা জীবনকেই সবরের জীবনে রূপান্তরিত করে৷ এটা সার্বক্ষণিক,সবর,স্থায়ী সবর, সর্বাত্মক সবর,এবং জীবনব্যাপী সবর৷ (আরো ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমূল কোরআন, আল বাকারা, টীকা৬০; আলে ইমরান ,টীকা ১৩, ১০৭ ,১৩১; আল আন"আম, টীকা ২৩; আল আনফাল, টীকা ৩৭,৪৭; ইউনুস,টীকা ৯; হূদ ,টীকা ১১; আর রা"দ, টীকা ৩৯;আন নাহল, টীকা ৯৮; মারয়াম, টীকা ৪০; আল ফুরকান, টীকা ৯৪; আল কাসাস, টীকা ৭৫,১০০; আল আনকাবুত ,টীকা ৯৭; লোকমান , টীকা ২৯,৫৬; আস সাজদা, টীকা ৩৭;আল আহযাব,টীকা ৫৮; আয যুমার, টীকা ৩২; হা-মীম আস সাজদা, টীকা ৩৮; আশ শুরা, টীকা ৫৩)৷
১৭. সূরা যুখরুফের ৭১ আয়াতে বলা হয়েছে যে, তাদের সামনে সবসময় স্বর্ণপাত্র সমূহ পরিবেশিত হতে থাকবে৷ এ থেকে জানা গেল যে,সেখানে কোন সময় স্বর্ণপাত্র এবং কোন সময় রৌপ্য পাত্র ব্যবহার করা হবে৷
১৮. অর্থাৎ তা হবে রৌপ্যের তৈরী কিন্তু কাঁচের মত স্বচ্ছ৷ এ ধরনের রৌপ্য এ পৃথিবীতে নেই৷ এটা জান্নাতের একটা বৈশিষ্ট যে, সেখানে কাঁচের মত স্বচ্ছ রৌপ্যপাত্র জান্নাতবাসীদের দস্তরখানে পরিবেশন করা হবে৷
১৯. অর্থাৎ প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার চাহিদা অনুপাতে পানপাত্র ভরে ভরে দেয়া হবে৷ তা তাদের চাহিদার চেয়ে কমও হবে না আবার বেশীও হবে না৷ অন্য কথায়, জান্নাতের খাদেমরা এত সতর্ক এবং সুবিবেচক হবে যে, যাকে তারা পানপাত্র পরিবেশন করবে সে কি পরিমাণ শরাব পান করতে চায় সে সম্পর্কে তারা পুরোপুরি আন্দাজ করতে পারবে৷(জান্নাতের শরাবের বৈশিষ্ট সম্পর্কে জানতে হলে দেখুন, তাফহীমুল কোরআন, আস সাফ্ফাত ,৪৫ থেকে ৪৭ আয়াত টীকা ২৪ থেকে ২৭ ; সূরা মুহাম্মাদ ,আয়াত ১৫,টীকা ২২ ; আত তূর ,আয়াত, ২৩ টীকা ১৮; আল ওয়াকিয়া, আয়াত ১৯ , টীকা ১০৷)
২০. আরবরা শরাবের সাথে শুকনো আদা মেশানো পানির সংমিশ্রণ খুব পছন্দ করতো৷ তাই বলা হয়ছে ,সেখানেও তাদের এমন শরাব পরিবেশন করা হবে যাতে শুকনো আদার সংমিশ্রণ থাকবে৷ কিন্তু তা এমন সংমিশ্রন হবে না যে, তার মধ্যে শুকনো আদা মিশিয়ে তারপর পানি দেয়া হবে৷ বরং তা হবে একটা প্রাকৃতিক ঝর্ণাধারা যার মধ্যে, আদার খোশবু থাকবে কিন্তু তিক্ততা থাকবে না৷ সে জন্য তার নাম হবে "সালসাবীল"৷"সালসাবীল"অর্থ এমন পানি যা মিঠা, মৃদু ও সুস্বাদু হওয়ার কারণে সহজেই গলার নীচে নেমে যায়৷ অধিকাংশ মুফাস্সিরের মতে "সালসাবিল" শব্দটি এখানে উক্ত ঝর্ণাধারার বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে ,বিশেষ্য হিসেবে নয়৷
২১. ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল করআন, আস সাফ্ফাত , টীকা ২৬; আত তূর, টীকা ১৯; আল ওয়াকিয়া,টীকা ৯৷
২২. অর্থাৎ দুনিয়াতের কোন ব্যক্তি যত দরিদ্র ও নিসম্বলই হোক না কেন সে যখন তার নেক কাজের কারণে জান্নাতে যাবে তখন সেখানে এমন শানশওকত ও মর্যাদার সাথে থাকবে যেন সে এক বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি৷
২৩. এই একই বিষয় সূরা আল কাহফের ৩১ আয়াতে এভাবে বর্ণিত হয়েছেঃ

-------------------

"তারা (অর্থাৎ জান্নাতবাসীরা )মিহি রেশম এবং মখমল ও কিংখাবের সবুজ পোশাক পরিধান করবে৷ সুউচ্চ আসনে হেলান দিয়ে বসবে৷"

একারণে সেসব মুফাস্সিরদের মতামত সঠিক বলে মনে হয় না যারা বলেন, এর অর্থ এমন কাপড় যা তাদের আসন ও পালংকের ওপর ঝুলন্ত অবস্থায় থাকবে অথবা সেসব কিশোর বালকদের পোশাক-পরিচ্ছদ যারা তাদের সেবা ও খেদমতের জন্য সদা তৎপর থাকবে৷
২৪. সূরা আল কাহফের ৩১ আয়াতে বলা হয়েছে,------------"তাদের সেখানে স্বর্ণের কংকন বা চুড়ি দ্বারা সজ্জিত ও শোভিত করা হবে৷" এ একই বিষয় সূরা হজ্জের ২৩ আয়াত এবং সূরা ফাতেরের ৩৩ আয়াতেও বলা হয়েছে৷ এসব আয়াত একত্রে মিলিয়ে দেখলে তিনটি অবস্থা হওয়া সম্ভব বলে মনে হয়৷ এক, তারা ইচ্ছা করলে কোন সময় সোনার কংকন পরবে আবার ইচ্ছা করলে কোন সময় রূপার কংকন পরবে৷ তাদের ইচ্ছা অনুসারে দু"টি জিনিসই প্রস্তুত থাকবে৷ দুই, তারা সোনা ও রূপার কংকন এক সাথে পরবে৷ কারণ দুটি একত্র করলে সৌন্দর্য অনেক বৃদ্ধি পায়৷ তিন,যার ইচ্ছা সোনার কংকন পরিধান করবে এবং যার ইচ্ছা রূপার কংকন ব্যবহার করবে৷ এখানে প্রশ্ন হলো, অলংকার পরিধান করে মেয়েরা, কিন্তু পুরুষের অলংকার পরানোর অর্থ ও তাৎপর্য কি হতে পারে? এর জবাব হলো, প্রাচীনকালে রাজা-বাদশাহ এবং নেতা ও সমাজপতিদের রীতি ছিল তারা হাত,গলা ও মাথার মুকুটে নানা রকমের অলংকার ব্যবহার করতো৷ আমাদের এ যুগেও বৃটিশ ভারতের রাজ ও নবাবদের মধ্যে পর্যন্ত এ রীতি প্রচলিত ছিল৷ সুরা যুখরুফে বলা হয়েছে, হযরত মূসা (আ) যখন সাদাসিধে পোশাকে শুধু একখানা লাঠি হাতে নিয়ে ফেরাউনের রাজ দরবারে উপস্থিত হয়ে তাকে বললেন যে, তিনি বিশ্ব-জাহানের রব আল্লাহর প্রেরিত রসূল তখন ফেরাউন তার সভসদদের বললোঃ সে এ অবস্থায় আমার সামনে এসেছে ৷দূত বটে৷

-------------

"সে যদি যমীন ও আসমানের বাদশাহর পক্ষ থেকেই প্রেরিত হয়ে থাকতো তাহলে তার সোনার কংকন নাই কেন? কিংবা ফেরেশতাদের একটি বাহিনী অন্তত তার আরদালী হয়ে আসতো৷"(আয যুখরুফ,৫৩)৷
২৫. ইতিপূর্বে দু" প্রকার শরাবের কথা বলা হয়েছে৷ এর এক প্রকার শরাবের মধ্যে কর্পূরের সুগন্ধি যুক্ত ঝর্ণার পানি সংমিশ্রণ থাকবে৷ অন্য প্রকারের শরাবের মধ্যে "যানজাবীল, ঝর্ণার পানির সংমিশ্রন থাকবে ৷এ দুপ্রকার শরাবের কথা বলার পর এখানে আবার আর একটি শরাবের উল্লেখ করা এবং সাথে সাথে একথা বলা যে, তাদের বর তাদেরকে অত্যন্ত পবিত্র শরাব পান করাবেন এর অর্থ এই যে, এটা অন্য কোন প্রকার উৎকৃষ্টতর শরাব হবে যা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ হিসেবে তাদের পান করানো হবে৷
২৬. মূল বাক্য হলো,--------------- অর্থাৎ তোমাদের কাজ-কর্ম মূল্যবান প্রমাণিত হয়েছে৷---অর্থ বান্দা সারা জীবন দুনিয়াতে যেসব কাজ-কর্ম আঞ্জাম দিয়েছে বা দেয় তা সবই৷ যেসব কাজে সে তার শ্রম দিয়েছে এবং যেসব লক্ষে সে চেষ্টা -সাধনা করেছে তার সমষ্টি হলো তার ----আর তা মূল্যবান প্রমাণিত হওয়ার অর্থ হলো আল্লাহ তা"আলার কাছে তা মূল্যবান বলে স্বীকৃত হয়েছে৷ শোকরিয়া কথাটি যখন বান্দার পক্ষ থেকে আল্লাহর জন্য হয় তখন অর্থ হয় তাঁর নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা৷ আর যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য হয় তখন তর অর্থ হয় আল্লাহ তা"আলা তার কাজ-কর্মের মূল্য দিয়েছেন৷ এটি মনিব বা প্রভুর একটি বড় মেহেরবানী যে, বান্দা যখন তাঁর মর্জি অনুসারে নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য আঞ্জাম দেয় মনিব তখন তার মূল্য দেন বা স্বীকৃতি দেন৷