(৭৫:৩১) কিন্তু সে সত্যকে অনুসরণও করেনি৷ নামাযও পড়েনি৷
(৭৫:৩২) বরং সে অস্বীকার করেছে ও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে৷
(৭৫:৩৩) তারপর গর্বিত ভঙ্গিতে নিজের পরিবার পরিজনের কাছে ফিরে গিয়েছে৷ ২১
(৭৫:৩৪) এ আচরণ তোমার পক্ষেই শোভনীয় এবং তোমার পক্ষেই মানানসই ৷
(৭৫:৩৫) হাঁ, এ আচরণ তোমার পক্ষেই শোভনীয় এবং তোমার পক্ষেই মানানসই৷ ২২
(৭৫:৩৬) মানুষ ২৩ কি মনে করে যে, তাকে এমনি ছেড়ে দেয়া হবে? ২৪
(৭৫:৩৭) সে কি বীর্যরূপ এক বিন্দু নগণ্য পানি ছিল না যা (মায়ের জরায়ুতে) নিক্ষিপ্ত হয়৷
(৭৫:৩৮) অতপর তা মাংসপিণ্ডে পরিণত হয়৷ তারপর আল্লাহ তার সুন্দর দেহ বানালেন এবং তার অংগ-প্রতংগগুলো সুসামঞ্জস্য করলেন৷
(৭৫:৩৯) তারপর তা থেকে নারী ও পুরুষ দু"রকম মানুষ বানালেন৷
(৭৫:৪০) সেই স্রষ্টা কি মৃতদের পুনরায় জীবিত করতে সক্ষম নন? ২৫
২১. অর্থ হলো, যে ব্যক্তি আখেরাতকে মানতে প্রস্তুত ছিল না সে পূর্ব বর্ণিত আয়াতগুলোতের উল্লেখিত সবকিছু শোনার পরেও তা অস্বীকার করে যেতে থাকলো এবং এসব আয়াত শোনার পর দর্প ভরে নিজের বাড়ীর দিকে চলে গেল৷ মুজাহিদ,কাতাদ, ও ইবনে যায়েদের মতে এ লোকটি ছিল আবু জেহেল৷ আয়াতের শব্দসমূহ থেকেও এটাই প্রকাশ পায় যে, সে এমন কোন ব্যক্তি ছিল যে সূরা কিয়ামার ওপরে বর্ণিত আয়াতগুলো শোনার পর এ আচরণ ও কর্মপন্থা গ্রহণ করেছিল৷ আয়াতের "সে সত্যকে অনুরসণ করেনি,নামাযও পড়েনি"কথাটি বিশেষভাবে মনযোগলাভের যোগ্য৷ এর থেকে স্পষ্ট জানা যায় যে আল্লাহ এবং তাঁর রসূল ও তাঁর কিতাবের সত্যতা স্বীকার করার পর তার প্রাথমিক এবং অনিবার্য দাবী হলো, মানুষ যেন নামায পড়ে৷ আল্লাহর দেয়া শরীয়াতের অন্য সব হুকুম-আহকাম তামীল করার পর্যায় বা অবকাশ তো আসে আরো পরে৷ কিন্তু ঈমান আনার পর কিছু সময় যেতে না যেতেই নামাযের সময় এসে হাজির হয়৷ আর তখনই জানা যায় সে যা মেনে নেয়ার অঙ্গীকার মুখ থেকে উচ্চারণ করেছিল তা সত্যিই তার হৃদয়ের প্রতিধ্বনি, না কি কয়েকটি শব্দের আকারে মুখ থেকে উচ্চারিত ফাঁকা বুলি মাত্র৷
২২. তাফসীরকারগণ -----------আয়াতাংশের কয়েকটি অর্থ বর্ণনা করেছেন৷ যেমন ঠিক তোমাকে! সর্বনাশ হোক তোমার! মন্দ,ধ্বংস এবং দুর্ভাগ্য হোক তোমার! তবে বাক্যটির অবস্থান বিবেচনা করলে আমরা মতে এর দুটি উপযুক্ত অর্থ হতে পারে যা হাযেফ ইবনে কাসীর তাঁর তাফসীরে বর্ণনা করেছেন৷ অর্থাৎ "তুমি যখন তোমার সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করার ধৃষ্টতা করছো৷" এটি একটি শ্লেষ বাক্য৷ কুরআন মজীদের আরো এক জায়গায় এ ধরনের বাক্য প্রয়োগ করা হয়েছে৷ বলা হয়েছে যে, দোযখে আযাব দেয়ার সময় পাপী লোকদের বলা হবেঃ -------------"নাও ,এর মজা চাখো৷ তুমি অতি বড় সম্মানী মানুষ কিনা৷" (আদ দুখান,৪৯)৷
২৩. এখানে বক্তব্যের সমাপ্তি টানতে গিয়ে সেই একই বিষয়বস্তুর পুনরাবৃত্তি করা হচ্ছে যা দিয়ে বক্তব্য শুরু করা হয়েছিল৷ অর্থাৎ মৃত্যুর পরের জীবন অনিবার্যও এবং তা সম্ভবও৷
২৪. আরবী ভাষায় ---------বলা হয় এমন উটকে যা বেঁধে রাখা হয় না, উদ্দেশ্যহীনভাবে যত্রতত্র ঘুরে বেড়ায়,এবং তার খোঁজ -খবর নেয়ার কেউ থাকেনা৷ লাগামহীন উট বলে আমরা এ অর্থটিই প্রকাশ করে থাকি৷ অতএব, আয়াতের অর্থ হলো, মানুষ কি নিজকে লাগামহীন উট মনে করে যে, তার স্রষ্টা তাকে এ পৃথিবীতে দায়িত্বহীন করে ছেড়ে দিয়েছেন? তার কোন দায়িত্ব ও কর্তব্য নেই? কোন জিনিস তার জন্য নিষিদ্ধ নয়? আর এমন কোন সময়ও কি তার আসবে না যখন তাকে তার কাজ-কর্মের জন্য জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে? একথাটিই কুরআন মজীদের অন্য একস্থানে এভাবে বলা হয়েছে যে,কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা"আল্লাহ কাফেরদের বলবেনঃ

-----------------------

"তোমরা কি মনে করেছো যে, আমি তোমাদের অনর্থক সৃষ্টি করেছি? তোমাদেরকে কখনো আমার কাছে ফিরে আসতে হবে না?"(আল মু"মিনূন,১১৫)

এ দু"টি স্থানে মৃত্যুর পরের জীবনের অনিবার্যতার প্রমাণ প্রশ্নের আকারে পেশ করা হয়েছে৷প্রশ্নের সারমর্ম হলো,তোমরা কি প্রকৃতই নিজেদেরকে নিছক পশু বলে মনে করে নিয়েছো? তোমরা কি তোমাদের ও পশুদের মধ্যে এ স্পষ্ট পার্থক্য দেখতে পাও না যে, পশুদের কোন ইখতিয়ার ব স্বাধীনতা নেই, কিন্তু তোমাদের ইখতিয়ার ও স্বাধীনতা আছে? পশুর- কাজ-কর্ম নৈতিক ভাল-মন্দের প্রশ্ন থাকে না৷ কিন্তু তোমাদের কাজ-কর্মের ক্ষেত্রে এ প্রশ্ন যেমন দায়িত্বমুক্ত,তাদের যেমন কোন জবাবদিহি করতে হবে না, তোমাদের ব্যাপারটাও ঠিক তাই? পশুদের পুনরায় জীবত করে না উঠানোর যুক্তিগ্রাহ্য কারণ বুঝা যায়৷তারা তাদের সহজাত ও প্রকৃতিগত ধরা বাঁধা দাবী পুরণ করেছে মাত্র৷ নিজেদের বুদ্ধি -বিবেক খাটিয়ে কোন দর্শন রচন করেনি, কোন বিশেষ মত ও পথের অনুসারী গোষ্ঠির সৃষ্টি করেনি, কাউকে উপাস্য বানায়নি এবং নিজেও কারো উপাস্য হয়নি, এমন কোন কাজ করেনি যাকে নেককাজ ব বদকাজ বলে অভিহিত করা যায়৷ কোন ভাল বা মন্দ রীতি -প্রথার প্রচলন করেনি যার প্রভাব পুরুষাণুক্রমে চলেছে এবং সে জন্য সে পুরস্কার বা শাস্তিলাভের উপযুক্ত ৷ তাই তারা যদি মরার পর নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় তাহলে সেটা বোধগম্য ব্যাপার৷ কারণ তার উপর কোন কাজের দায়-দায়িত্ব বর্তায় না যে,তার জবাবদিহের জন্য পুনরায় তাকে জীবিত করে উঠানোর প্রয়োজন হবে৷ কিন্তু তোমাদেরকে মৃত্যুর পরের জীবন থেকে কিভাবে অব্যহতি দেয়া যেতে পারে? কারণ মৃত্যুর ঠিক পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্তও তোমরা এমন সব নৈতিক কাজ-কর্ম করতে থাকো যার ভাল বা মন্দ হওয়া এবং পুরস্কার বা শাস্তির উপযুক্ত হওয়ার ব্যাপারে তোমাদের বিবেক -বুদ্ধিই সিদ্ধান্ত দেয়৷যে ব্যক্তি কোন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করেছে এবং পরক্ষনেই আকস্মিক কোন দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে তোমাদের মতে কি তার অবাধে(Scotfree)বেঁচে যাওয়া এবং এ জুলুমের প্রতিফল কোন দিনই না পাওয়া উচিত? যে ব্যক্তি দুনিয়ায় এমন কোন বিপর্যয়ের বীজ বপন করে গিয়েছে মানব সন্তানেরা শত শত বছর ধরে যার বিষময় ফল ভোগ করলো বা দুর্ভোগ পোহালো সে-ও নগন্য পোকা মাকড় ও কীট পতঙ্গের মত মৃত্যুর পর বিলীন ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাক,যার কৃতকৃমের ফলে হাজার হাজার ও লাখ লাখ মানুষের জীবন বরবাদ হয়ে গিয়েছে পুনরায় জীবিত হয়ে তাকে সেসব কৃতকর্মের জবাবদিহি করতে না হোক এরূপ ব্যবস্থায় কি তোমাদের বুদ্ধি-বিবেক সত্যিই সন্তুষ্ট হতে পারবে? পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি জীবন ব্যাপী হক ও ইনসাফ এবং কল্যাণ ও সৎকর্মশীলতার জন্য নিজের জীবনপাত করলো এবং জীবনভর শুধু বিপদ-মুসিবতই পোহালো তোমাদের বিবেচনায় কি সে পোকা-মাকড় ও কীট -পতঙ্গের মতই কোন নগণ্য সৃষ্টি, যার নিজের ভাল কাজের পুরস্কার লাভ কোন অধিকারই নেই?
২৫. এটি মৃত্যুর পরের জীবনের সম্ভাব্যতার প্রমাণ৷ যারা একথা বিশ্বাস করে যে, প্রাথমিক পর্যায়ের বীর্য দ্বারা সৃষ্টির সূচনা করে পূর্ণাঙ্গ মানুষ সৃষ্টি করা পর্যন্ত গোটা কাজটাই মহান আল্লাহর শক্তি ও কৌশলের একটা বিস্ময়কর নমুনা,তাদের কাছে প্রকৃতপক্ষে এ প্রমাণের কোন জবাব নেই৷ কেননা, তারা যতই ঔদ্ধতা দেখাক না কেন তাদের বিবেক-বুদ্ধি একথা না মেনে পারে না যে, যে আল্লাহ এভাবে দুনিয়ায় মানুষ সৃষ্টি করেন তিনি পুনরায় এ মানুষকি অস্তিত্ব দান করতেও সক্ষম ৷তবে যারা এ স্পষ্ট জ্ঞানগর্ভ ও যুক্তিসংগত কাজকে কেবল আকস্মিকতার ফল বলে মনে করে তারা যদি হঠকারী আচরণ করতে বদ্ধপরিকর না হয়ে থাকে তাহলে একটি বিষয়ের ব্যাখ্যা তাদের দিতে হবে৷ বিষয়টি হলো,একই ধরনের সৃষ্টি প্রক্রিয়ার ফলশ্রুতিতে পৃথিবীর প্রতিটি অংশে প্রত্যেক জাতির মধ্যে নারী ও পুরুষের জন্মের যে অনুপাতে চলে আসছে তাতে কোথাও কোন যুগে এমন অবস্থা কখনো দেখা দেয়নি যে,কোন জনপদ ক্রমাগত শুধু পুরুষ অথবা শুধু নারীই জন্ম লাভ করেছে এবং ভবিষ্যতে তাদের বংশধারা টিকে থাকার কোন সম্ভবনাই থাকেনি৷ তাদের কাছে এরূপ না হওয়ার কি যুক্তি ও ব্যাখ্যা আছে? কাজটিও কি আকস্মিকভাবেই হয়ে চলেছে? এত বড় দাবী করার জন্য কোন মানুষকে অন্তত এতটা নির্লজ্জ ও বেশরম হওয়া চাই যাতে সে একদিন এ দাবীও করে বসতে পারে যে,লণ্ডন, নিউইয়র্ক,মস্কো,এবং পিকিং এর মত শহর আকস্মিকভাবে আপনা আপনি অস্তিত্ব লাভ করেছে৷ (অধিক ব্যাখ্যার জন্য দেখুন,তাফহীমূল কুরআন,আর রূম,টীকা ২৭ থেকে ৩০; আশ শূরা, টীকা৭৭) বিভিন্ন হাদীস থেকে জানা যায়,রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন এ আয়াতটি পড়তেন তখন আল্লাহর এ প্রশ্নের জবাবে কখনো -----(কেন সক্ষম নন) কখনো --------(তোমার সত্তা অতি পবিত্র ,হে আল্লাহ ,কেন সক্ষম নয়) এবং কখনো-------অথবা-----------বলতেন৷ (ইবনে জারীর, ইবনে আবী হাতেম,ও আবু দাউদ) আবু দাউদে হযরত আবু হুরায়রা থেকে এ মর্মে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ যখন তোমরা সূরা ত্বীনের আয়াত -------------(আল্লাহ কি সব বিচারকের চেয়ে বড় বিচারক নন?)পড়বে তখন বলবে ---------(কেন নয়,আমি নিজেও এর একজন সাক্ষাদাতা,)সূরা কিয়ামাহার এ আয়াতটি যখন পড়বে তখন বলবে এবং যখন সূরা মুরসালাতের আয়াত--------- (এ কুরআন ছাড়া আর কোন জিনিসের প্রতি তারা বিশ্বাস পোষণ করবে?) পড়বে তখন বলবেঃ ---------(আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি৷)ইমাম আহমাদ, তিরমিযী, ইবনুল, মুনযির,ইবনে মারদুইয়া, বায়হাকী এবং হাকেমও অনুরূপ বিষয় সম্বলিত হাদীস বর্ণনা করেছেন৷