(৭৪:১) হে বস্ত্র মুড়ি দিয়ে শয়নকারী,
(৭৪:২) ওঠো এবং সাবধান করে দাও,
(৭৪:৩) তোমার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো,
(৭৪:৪) তোমার পোশাক পবিত্র রাখো,
(৭৪:৫) অপবিত্রতা থেকে দূরে থাকো,
(৭৪:৬) বেশী লাভ করার জন্য ইহসান করো না
(৭৪:৭) এবং তোমার রবের জন্য ধৈর্য অবলম্বন করো৷
(৭৪:৮) তবে যখন শিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে,
(৭৪:৯) সেদিনটি অত্যন্ত কঠিন দিন হবে৷
(৭৪:১০) কাফেরদের জন্য মোটেই সহজ হবে না৷
(৭৪:১১) আমাকে এবং সে ব্যক্তিকে ১০ ছেড়ে দাও যাকে আমি একা সৃষ্টি করেছি৷ ১১
(৭৪:১২) তাকে অঢেল সম্পদ দিয়েছি
(৭৪:১৩) এবং আরো দিয়েছি সবসময় কাছে থাকার মত অনেক পুত্র সন্তান৷ ১২
(৭৪:১৪) তার নেতৃত্বের পথ সহজ করে দিয়েছি৷
(৭৪:১৫) এরপরও সে লালায়িত, আমি যেন তাকে আরো বেশী দান করি৷ ১৩
(৭৪:১৬) তা কখনো নয়, সে আমার আয়াতসমূহের সাথে শত্রুতা পোষণ করে৷
(৭৪:১৭) অচিরেই আমি তাকে এক কঠিন স্থানে চড়িয়ে দেব
(৭৪:১৮) সে চিন্তা -ভাবনা করলো এবং একটা ফন্দি উদ্ভাবনের চেষ্টা করলো৷
(৭৪:১৯) অভিশপ্ত হোক সে ,সে কি ধরনের ফন্দি উদ্ভাবনের চেষ্টা করলো?
(৭৪:২০) আবার অভিশপ্ত হোক সে ,সে কি ধরনের ফন্দি উদ্ভাবনের চেষ্টা করলো?
(৭৪:২১) অতপর সে মানুষের দিকে চেয়ে দেখলো৷
(৭৪:২২) তারপর ভ্রুকুঞ্চিত করলো এবং চেহারা বিকৃত করলো৷
(৭৪:২৩) অতপর পেছন ফিরলো এবং দম্ভ প্রকাশ করলো৷
(৭৪:২৪) অবশেষে বললোঃ এ তো এক চিরাচরিত যাদু ছাড়া আর কিছুই নয়৷
(৭৪:২৫) এ তো মানুষের কথা মাত্র৷ ১৪
(৭৪:২৬) শিগগিরই আমি তাকে দোযখে নিক্ষেপ করবো৷
(৭৪:২৭) তুমি কি জানো ,সে দোযখ কি?
(৭৪:২৮) যা জীবিত ও রাখবে না আবার একেবারে মৃত করেও ছাড়বে না ৷ ১৫
(৭৪:২৯) গায়ের চামড়া ঝলসিয়ে দেবে৷ ১৬
(৭৪:৩০) সেখানে নিয়োজিত আছে উনিশ জন কর্মচারী৷
(৭৪:৩১) আমি ১৭ ফেরেশতাদের দোযখের কর্মচারী বানিয়েছি ১৮ এবং তাদের সংখ্যাকে কাফেরদের জন্য ফিতনা বানিয়ে দিয়েছি৷ ১৯ যাতে আহলে কিতাবদের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে৷ ২০ ঈমানদারদের ঈমান বৃদ্ধি পায়, ২১ আহলে কিতাব ও ঈমানদাররা সন্দেহ পোষণ না করে ২২ আর যাদের মনে রোগ আছে তারা এবং কাফেররা যেন বলে, এ অভিনব কথা দ্বারা আল্লাহ কি বুঝাতে চেয়েছে? ২৩ এভাবে আল্লাহ যাকে চান প্রথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে চান হিদয়াত দান করেন৷ ২৪ তোমার রবের বাহিনী সম্পর্কে তিনি ছাড়া আর কেউ অবহিত নয়৷ ২৫ আর দোযখের এ বর্ণনা এ ছাড়া আর কোন উদ্দেশ্যই নয় যে, মানুষ তা থেকে উপদেশ গ্রহণ করবে৷ ২৬
১. ওপরে ভূমিকা আমরা এসব আয়াত নাযিলের যে পটভূমি বর্ণনা করেছি সে সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করলে একথাটি ভালভাবেই উপলব্ধি করা যায় যে, এখানে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে -----ইয়া আয়্যুহাল রাসূল বা-------ইয়া আয়্যুহান ন্নাবীয়ু বলে সম্বোধন করার পরিবর্তে ইয়া আয়্যুহাল মুদ্দাস্সির -----------বলে সম্বোধন কেন করা হয়েছে৷ নবী (সা) যেহেতু হঠাৎ জিবরাঈলকে আসমান ও পৃথিবীর মাঝখানে একটি আসনে উপবিষ্ট দেখে ভীত হয়ে পড়েছিলেন এবং সে অবস্থায় বাড়ীতে পৌছে বাড়ীর লোকদের বলেছিলেনঃ আমাকে চাদর দিয়ে আচ্ছাদিত করো, আমাকে চাদর দিয়ে আচ্ছাদিতো করো৷ তাই আল্লাহ তাঁকে ---------ইয়া আয়্যুহাল মুদ্দাস্সির বলে সম্বোধন করেছেন৷ সম্বোধনের এ সূক্ষ্ম ভংগী থেকে আপনা আপনি এ অর্থ পরিস্ফূটিত হয়ে ওঠে যে, হে আমার প্রিয় বান্দা,তুমি চাদর জড়িয়ে শুয়ে আছো কেন? তোমার ওপরে তো একটি মহত কাজের গুরুদায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে৷ এ দায়িত্ব পালন করার জন্য তোমাকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে উঠে দাঁড়াতে হবে৷
২. হযরত নূহ আলাইহিস সালামকে নবুওয়াতের পদমর্যাদায় অভিষিক্ত করার সময় যে আদেশ দেয়া হয়েছিল এটাও সে ধরনের আদেশ৷ হযরত নূহ আলাইহিস সালামকে বলা হয়েছিলঃ

----------------------

"তোমার নিজের কওমের লোকদের ওপর এক ভীষণ কষ্টদায়ক আযাব আসার পূর্বেই তাদের সাবধান করে দাও৷" (নূহ,১)

আয়াতটির অর্থ হলো ,হে বস্ত্র আচ্ছাদিত হয়ে শয়নকারী তুমি ওঠো৷ তোমার চারপাশে আল্লাহর যেসব বান্দারা অবচেতন পড়ে আছে তাদের জাগিয়ে তোল৷ যদি এ অবস্থায়ই তারা থাকে তাহলে যে অবশ্যম্ভাবী পরিণতির সম্মুখীন তারা হতে যাচ্ছে সে সম্পর্কে তাদের সাবধান করে দাও৷ তাদের জানিয়ে দাও, তারা "মগের মুল্লুকে" বাস করছে না যে, যা ইচ্ছা তাই করে যাবে, অথচ কোন কাজের জন্য জবাবদিহি করতে হবে না৷
৩. এ পৃথিবীতে এটা একজন নবীর সর্বপ্রথম কাজ৷এখানে এ কাজটিই তাঁকে আঞ্জাম দিতে হয়৷ তাঁর প্রথম কাজই হলো, অজ্ঞ ও মূর্খ লোকেরা এ পৃথিবীতে যাদের শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রতাপ মেনে চলেছে তাদের সবাইকে অস্বীকার করবে এবং গোটা পৃথিবীর সামনে উচ্চ কণ্ঠ একথা ঘোষণা করবে যে, এ বিশ্ব জাহানে এক আল্লাহ ছাড়া আর কারো কোন শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রতাপ নেই৷ আর এ কারণেই ইসলামে আল্লাহ আকবার (আল্লাহ শ্রেষ্ঠ) কথাটিকে সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দেয়া হয়েছে৷ "আল্লাহু আকাবার " ঘোষণার মাধ্যমেই আযান শুরু হয়৷ আল্লাহু আকবার একথাটি বলে মানুষ নামায শুরু করে এবং বার বার আল্লাহু আকবার বলে ওঠে ও বসে৷ কোন পশুকে জবাই করার সময়ও "বিসমিল্লাহে আল্লাহু আকবার "বলে জবাই করে৷ তাকবীর ধ্বনি বর্তমান বিশ্বে মুসলমানদের সর্বাধিক স্পষ্ট ও পার্থক্যসূচক প্রতীক৷ কারণ, ইসলামের মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর বড়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণার মাধ্যমেই কাজ শুরু করেছিলেন৷ এখানে আরো একটি সুক্ষ্ম বিষয় আছে যা ভালভাবে বুঝে নেয়া দরকার৷ এসময়ই প্রথমবারের মত রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যে নবূওয়াতের বিরাট গুরুদায়িত্ব পালনের জন্য তৎপর হতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে এ আয়াতগুলোর "শানে নুযুল" থেকেই সে বিষয়ই জানা গিয়েছে৷ একথা তো স্পষ্ট যে, যে শহর ,সমাজ ও পরিবেশে তাঁকে এ উদ্দেশ্য ও লক্ষ নিয়ে কাজ করার জন্য তৎপর হওয়ার নির্দেশ দেয়া হচ্ছিল তা ছিল শিরকের কেন্দ্রভূমি বা লীলাক্ষেত্র ৷ সাধারণ আরবদের মত সেখানকার অধিবাসীরা যে কেবল মুশরিক ছিল, তা নয়৷ বরং মক্কা সে সময় গোটা আরবের মুশরিকদের সবচেয়ে বড় তীর্থক্ষেত্রের মর্যাদা লাভ করেছিল৷ আর কুরাইশরা ছিল তার ঘনিষ্ঠতম প্রতিবেশী, সেবায়ত ও পুরোহিত৷ এমন একটি জায়গায় কোন ব্যক্তির পক্ষে শিরকের বিরুদ্ধে এককভাবে তাওহীদের পতাকা উত্তোলন করা জীবনের ঝুঁকি গ্রহণ করার শামিল৷ তাই "ওঠো এবং সাবধান করে দাও"বলার পরপরই "তোমর রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো" বলার অর্থই হলো যেসব যেসব বড় বড় সন্ত্রাসী শক্তি তোমার এ কাজের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে হয় তাদের মোটেই পরোয়া করো না৷ বরং স্পষ্ট ভাষায় বলে দাও, যারা আমার এ আহবান ও আন্দোলনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে আমার "রব" তাদের সবার চেয়ে অনেক বড়৷ আল্লাহর দীনের কাজ করতে উদ্যত কোন ব্যক্তির হিম্মত বৃদ্ধি ও সাহস যোগানের জন্য এর চাইতে বড় পন্থা বা উপায় আর কি হতে পারে? আল্লাহর বড়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের নকশা যে ব্যক্তির হৃদয়-মনে খোদিত সে আল্লাহর জন্য একাই গোটা দুনিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করতে সামন্যতম দ্বিধা -দ্বন্দ্ব ও অনুভব করবে না৷
৪. এটি একটি ব্যাপক অর্থ ব্যঞ্জক কথা৷ এর অর্থ অত্যন্ত বিস্তৃত৷এর একটি অর্থ হলো,তুমি তোমার পোশাক-পরিচ্ছদ নাপাক বস্তু থেকে পবিত্র রাখো৷ কারণ শরীর ও পোশাক -পরিচ্ছদের পবিত্রতা এবং "রূহ" বা আত্মার পবিত্রতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত৷ কোন পবিত্র আত্মা ময়লা -নোংরা ও পূতিগন্ধময় দেহ এবং অপবিত্র পোশাকের মধ্যে মোটেই অবস্থান করতে পারে না৷ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে সমাজে ইসলামের দাওয়াতের কাজ শুরু করেছিলেন তা শুধু আকীদা-বিশ্বাস ও নৈতিক আবিলতার মধ্যেই নিমজ্জিত ছিল না বরং পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার প্রাথমিক ধারণা সম্পর্কে পর্যন্ত সে সমাজের লোক অজ্ঞ ছিল৷ এসব লোককে সব রকমের পবিত্রতা শিক্ষা দেয়া ছিল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাজ৷ তাই তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, তিনি যেন তাঁর বাহ্যিক জীবনেও পবিত্রতার সর্বোচ্চ মান বজায় রাখেন৷ এ নির্দেশের ফল স্বরূপ নবী (সা) মানব জাতিকে শরীর ও পোশাক-পরিচ্ছদের পবিত্রতা সম্পর্কে এমন বিস্তারিত শিক্ষা দিয়েছেন যে, জাহেলী যুগের আরবরা তো দূরের কথা আধুনিক যুগের চরম সভ্য জাতিসমূহও সে সৌভাগ্যের অধিকারী নয়৷ এমনকি দুনিয়ার অধিকাংশ ভাষাতে এমন কোন শব্দ পর্যন্ত পাওয়া যায় না যা "তাহারাত" বা পবিত্রতার সমার্থক হতে পারে৷ পক্ষান্তরে ইসলামের অবস্থা হলো, হাদীস এবং ফিকাহর গ্রন্থসমূহে ইসলামী হুকুম-আহকাম তথা বিধি -বিধান সম্পর্কে সব আলোচনা শুরু হয়েছে "কিতাবুল তাহারাত" বা পবিত্রতা নামে অধ্যায় দিয়ে৷ এতে পবিত্রতা ও অপবিত্রতার পার্থক্য এবং পবিত্রতা অর্জনের উপায় ও পন্থাসমূহ একান্ত খুঁটিনাটি বিষয়সহ সবিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে৷

একথাটির দ্বিতীয় অর্থ হলো,নিজের পোশাক-পরিচ্ছদ পরিষ্কার-পরিছন্ন রাখো ৷ বৈরাগ্যবাদী ধ্যান-ধারণা পৃথিবীতে ধর্মাচরণের যে মানদণ্ড বানিয়ে রেখেছিল তাহলো ,যে মানুষে যাতো বেশী নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন হবে সে ততো বেশী পূত-পবিত্র ৷ কেউ কিছুটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কাপড় পরলেই মনে করা হতো, সে একজন দুনিয়াদার মানুষ৷ অথচ মানুষের প্রবৃত্তি নোংরা ও ময়লা জিনিসকে অপছন্দ করে৷ তাই ঘোষণা করা হয়েছে যে, আল্লাহর পথে আহবানকারীর বাহ্যিক অবস্থাও এতোটা পবিত্র ও পরিষ্কার -পরিচ্ছন্ন হওয়া প্রয়োজন যেন মানুষ তাকে সম্মান ও মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখে এবং তার ব্যক্তিত্ব এমন কোন দোষ-ত্রুটি যেন না থাকে যার কারণে রুচি ও প্রবৃত্তিতে তার প্রতি ঘৃণার সৃষ্টি হয়৷

একথাটির তৃতীয় অর্থ হলো,নিজের পোশাক পরিচ্ছদ নৈতিক দোষ-ত্রুটি থেকে পবিত্র রাখো৷ তোমার পোশাক -পরিচ্ছদ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন তো অবশ্যই থাকবে তবে তাতেও কোন প্রকার গর্ব -অহংকার ,প্রদর্শনী বা লোক দেখানোর মনোবৃত্তি ,ঠাটবাট এবং জৌলুসের নামগন্ধ পর্যন্ত থাকা উচিত নয়৷ পোশাক এমন একটি প্রাথমিক জিনিস যা অন্যদের কাছে একজন মানুষের পরিচয় তুলে ধরে ৷ কোন ব্যক্তি যে ধরনের পোশাক পরিধান করে তা দেখে প্রথম দৃষ্টিতেই মানুষ বুঝতে পারে যে, সে কেমন স্বভাব চরিত্রের লোক৷ নওয়াব,বাদশাহ , ও নেতৃ পর্যায়ের লোকদের পোশাক ,ধর্মীয় পেশার লোকদের পোশাক,দাম্ভিক ও আত্মম্ভরী লোকদের পোশাক, বাজে ও নীচ স্বভাব লোকদের পোশাক,এবং গুণ্ডা-পাণ্ডা ও বখাটে লোকদের পোশাকের ধরন সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে থাকে৷ এসব পোশাকই পোশাক পরিধানকারীর মেজাজ ও মানসিকতার প্রতিনিধিত্ব করে৷ আল্লাহর দিকে আহবানকারীর মেজাজ ও মানসিকতা স্বাভাবিকভাবেই এসব লোকদের থেকে আলাদা হয়ে থাকে ৷তাই তার পোশাক-পরিচ্ছদ তাদের পোশাক -পরিচ্ছদ থেকে স্বতন্ত্র ধরনের হওয়া উচিত৷ তাঁর উচিত এমন পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধান করা যা দেখে প্রত্যেকেই অনুভব করবে যে, তিনি একজন শরীফ ও ভদ্র মানুষ, যাঁর মন-মানস কোন প্রকার দোষে দুষ্ট নয়৷

এর চতুর্থ অর্থ হলো, নিজেকে পবিত্র রাখো৷ অন্য কথায় এর অর্থ হলো, নৈতিক দোষ-ত্রুটি থেকে পবিত্র থাকা এবং উত্তম নৈতিক চরিত্রের অধিকারী হওয়া৷ ইবনে আব্বাস, ইবরাহীম নাখয়ী, শা"বী, আতা,মুজাহিদ, কাতাদা, সা"ঈদ ইবনে জুবায়ের ,হাসান বাসরী এবং আরো অনেক বড় বড় মুফাস্সিরের মতে এটিই এ আয়াতের অর্থ ৷ অর্থাৎ নিজের নৈতিক চরিত্রকে পবিত্র রাখো এবং সব রকমের দোষ-ত্রুটি থেকে দূরে থাকো৷ প্রচলিত আরবী প্রবাদ অনুসারে যদি বলা হয় যে,------------(অমুক ব্যক্তির কাপড় বা পোশাক পবিত্র অথবা অমুক ব্যক্তি পবিত্র৷" তাহলে এর দ্বারা বুঝানো হয় যে, সে ব্যক্তির নৈতিক চরিত্র খুবই ভাল৷পক্ষান্তরে যদি বলা হয় ----------------(অমুক বক্তির পোশাক নোংরা তাহলে এ দ্বারা বুঝানো হয় যে, লোকটি লেনদেন ও আচার -আচরণের দিক দিয়ে ভাল নয়৷ তার কথা ও প্রতিশ্রুতির উপর আস্থা রাখা যায় না)৷
৫. এটি একটি ব্যাপক অর্থ ব্যঞ্জক কথা৷ এর অর্থ অত্যন্ত বিস্তৃত৷এর একটি অর্থ হলো,তুমি তোমার পোশাক-পরিচ্ছদ নাপাক বস্তু থেকে পবিত্র রাখো৷ কারণ শরীর ও পোশাক -পরিচ্ছদের পবিত্রতা এবং "রূহ" বা আত্মার পবিত্রতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত৷ কোন পবিত্র আত্মা ময়লা -নোংরা ও পূতিগন্ধময় দেহ এবং অপবিত্র পোশাকের মধ্যে মোটেই অবস্থান করতে পারে না৷ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে সমাজে ইসলামের দাওয়াতের কাজ শুরু করেছিলেন তা শুধু আকীদা-বিশ্বাস ও নৈতিক আবিলতার মধ্যেই নিমজ্জিত ছিল না বরং পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার প্রাথমিক ধারণা সম্পর্কে পর্যন্ত সে সমাজের লোক অজ্ঞ ছিল৷ এসব লোককে সব রকমের পবিত্রতা শিক্ষা দেয়া ছিল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাজ৷ তাই তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, তিনি যেন তাঁর বাহ্যিক জীবনেও পবিত্রতার সর্বোচ্চ মান বজায় রাখেন৷ এ নির্দেশের ফল স্বরূপ নবী (সা) মানব জাতিকে শরীর ও পোশাক-পরিচ্ছদের পবিত্রতা সম্পর্কে এমন বিস্তারিত শিক্ষা দিয়েছেন যে, জাহেলী যুগের আরবরা তো দূরের কথা আধুনিক যুগের চরম সভ্য জাতিসমূহও সে সৌভাগ্যের অধিকারী নয়৷ এমনকি দুনিয়ার অধিকাংশ ভাষাতে এমন কোন শব্দ পর্যন্ত পাওয়া যায় না যা "তাহারাত" বা পবিত্রতার সমার্থক হতে পারে৷ পক্ষান্তরে ইসলামের অবস্থা হলো, হাদীস এবং ফিকাহর গ্রন্থসমূহে ইসলামী হুকুম-আহকাম তথা বিধি -বিধান সম্পর্কে সব আলোচনা শুরু হয়েছে "কিতাবুল তাহারাত" বা পবিত্রতা নামে অধ্যায় দিয়ে৷ এতে পবিত্রতা ও অপবিত্রতার পার্থক্য এবং পবিত্রতা অর্জনের উপায় ও পন্থাসমূহ একান্ত খুঁটিনাটি বিষয়সহ সবিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে৷

একথাটির দ্বিতীয় অর্থ হলো,নিজের পোশাক-পরিচ্ছদ পরিষ্কার-পরিছন্ন রাখো ৷ বৈরাগ্যবাদী ধ্যান-ধারণা পৃথিবীতে ধর্মাচরণের যে মানদণ্ড বানিয়ে রেখেছিল তাহলো ,যে মানুষে যাতো বেশী নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন হবে সে ততো বেশী পূত-পবিত্র ৷ কেউ কিছুটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কাপড় পরলেই মনে করা হতো, সে একজন দুনিয়াদার মানুষ৷ অথচ মানুষের প্রবৃত্তি নোংরা ও ময়লা জিনিসকে অপছন্দ করে৷ তাই ঘোষণা করা হয়েছে যে, আল্লাহর পথে আহবানকারীর বাহ্যিক অবস্থাও এতোটা পবিত্র ও পরিষ্কার -পরিচ্ছন্ন হওয়া প্রয়োজন যেন মানুষ তাকে সম্মান ও মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখে এবং তার ব্যক্তিত্ব এমন কোন দোষ-ত্রুটি যেন না থাকে যার কারণে রুচি ও প্রবৃত্তিতে তার প্রতি ঘৃণার সৃষ্টি হয়৷

একথাটির তৃতীয় অর্থ হলো,নিজের পোশাক পরিচ্ছদ নৈতিক দোষ-ত্রুটি থেকে পবিত্র রাখো৷ তোমার পোশাক -পরিচ্ছদ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন তো অবশ্যই থাকবে তবে তাতেও কোন প্রকার গর্ব -অহংকার ,প্রদর্শনী বা লোক দেখানোর মনোবৃত্তি ,ঠাটবাট এবং জৌলুসের নামগন্ধ পর্যন্ত থাকা উচিত নয়৷ পোশাক এমন একটি প্রাথমিক জিনিস যা অন্যদের কাছে একজন মানুষের পরিচয় তুলে ধরে ৷ কোন ব্যক্তি যে ধরনের পোশাক পরিধান করে তা দেখে প্রথম দৃষ্টিতেই মানুষ বুঝতে পারে যে, সে কেমন স্বভাব চরিত্রের লোক৷ নওয়াব,বাদশাহ , ও নেতৃ পর্যায়ের লোকদের পোশাক ,ধর্মীয় পেশার লোকদের পোশাক,দাম্ভিক ও আত্মম্ভরী লোকদের পোশাক, বাজে ও নীচ স্বভাব লোকদের পোশাক,এবং গুণ্ডা-পাণ্ডা ও বখাটে লোকদের পোশাকের ধরন সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে থাকে৷ এসব পোশাকই পোশাক পরিধানকারীর মেজাজ ও মানসিকতার প্রতিনিধিত্ব করে৷ আল্লাহর দিকে আহবানকারীর মেজাজ ও মানসিকতা স্বাভাবিকভাবেই এসব লোকদের থেকে আলাদা হয়ে থাকে ৷তাই তার পোশাক-পরিচ্ছদ তাদের পোশাক -পরিচ্ছদ থেকে স্বতন্ত্র ধরনের হওয়া উচিত৷ তাঁর উচিত এমন পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধান করা যা দেখে প্রত্যেকেই অনুভব করবে যে, তিনি একজন শরীফ ও ভদ্র মানুষ, যাঁর মন-মানস কোন প্রকার দোষে দুষ্ট নয়৷

এর চতুর্থ অর্থ হলো, নিজেকে পবিত্র রাখো৷ অন্য কথায় এর অর্থ হলো, নৈতিক দোষ-ত্রুটি থেকে পবিত্র থাকা এবং উত্তম নৈতিক চরিত্রের অধিকারী হওয়া৷ ইবনে আব্বাস, ইবরাহীম নাখয়ী, শা"বী, আতা,মুজাহিদ, কাতাদা, সা"ঈদ ইবনে জুবায়ের ,হাসান বাসরী এবং আরো অনেক বড় বড় মুফাস্সিরের মতে এটিই এ আয়াতের অর্থ ৷ অর্থাৎ নিজের নৈতিক চরিত্রকে পবিত্র রাখো এবং সব রকমের দোষ-ত্রুটি থেকে দূরে থাকো৷ প্রচলিত আরবী প্রবাদ অনুসারে যদি বলা হয় যে,------------(অমুক ব্যক্তির কাপড় বা পোশাক পবিত্র অথবা অমুক ব্যক্তি পবিত্র৷" তাহলে এর দ্বারা বুঝানো হয় যে, সে ব্যক্তির নৈতিক চরিত্র খুবই ভাল৷পক্ষান্তরে যদি বলা হয় ----------------(অমুক বক্তির পোশাক নোংরা তাহলে এ দ্বারা বুঝানো হয় যে, লোকটি লেনদেন ও আচার -আচরণের দিক দিয়ে ভাল নয়৷ তার কথা ও প্রতিশ্রুতির উপর আস্থা রাখা যায় না)৷
৬. মূল বাক্যাংশ হলো------- (ওয়ালা তামনূন তাছতাকসির)একথাটির অর্থ এতো ব্যাপক যে, একটি মাত্র কথায় অনুবাদ করে এর বক্তব্য তুলে ধরা সম্ভব নয়৷

এর একটি অর্থ হলো, তুমি যার প্রতিই এহসান বা অনুগ্রহ করবে,নিস্বার্থভাবে করবে৷ তোমার অনুগ্রহ ও বদান্যতা এবং দানশীলতা ও উত্তম আচরণ হবে একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্য৷ ইহসান বা মহানুভবতার বিনিময়ে কোন প্রকার প্রার্থিব স্বার্থ লাভের বিন্দুমাত্র আকাংখাও তোমার থাকবে না৷ অন্য কথায় একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্য ইহসান করো, কোন প্রকার স্বার্থ উদ্ধারের জন্য ইহসান করো না৷

দ্বিতীয় অর্থ হলো, নবুওয়াতের যে দায়িত্ব তুমি পালন করছো৷ যদিও তা একটি বড় রকমের ইহসান ,কারণ তোমার মাধ্যমেই আল্লাহর গোটা সৃষ্টি হিদায়াত লাভ করছে৷ তবুও এ কাজ করে তুমি মানুষের বিরাট উপকার করছো এমন কথা বলবে না এবং এর বিনিময়ে কোন প্রকার ব্যক্তি স্বার্থ উদ্ধার করবে না৷

তৃতীয় অর্থ হলো, তুমি যদিও অনেক বড় ও মহান একটি কাজ করে চলেছো কিন্তু নিজের দৃষ্টিতে নিজের কাজকে বড় বলে কখনো মনে করবে না এবং কোন সময় চিন্তাও যেন তোমার মনে উদিত না হয় যে, নবুওয়াতের এ দায়িত্ব পালন করে আর এ কাজে প্রাণপণ চেষ্টা -সাধনা করে তুমি তোমার রবের প্রতি কোন অনুগ্রহ করছো৷
৭. অর্থাৎ যে কাজ আঞ্জাম দেয়ার দায়িত্ব তোমাকে দেয়া হচ্ছে তা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ও জীবনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ৷ এ কাজ করতে গিয়ে তোমাকে কঠিন বিপদাপদ ও দুঃখ-কষ্টের মুখোমুখি হতে হবে৷ তোমার নিজের কওম তোমার শত্রু হয়ে দাঁড়াবে৷ সমগ্র আরব তোমার বিরুদ্ধে কোমর বেঁধে লাগবে৷ তবে এ পথে চলতে গিয়ে যে কোন বিপদ-মুসিবতই আসুক না কেন তোমার প্রভুর উদ্দেশ্যে সেসব বিপদের মুখে ধৈর্য অবলম্বন করো এবং অত্যন্ত অটল ও দৃঢ়চিত্ত হয়ে নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে থাকো৷ এ কাজ থেকে বিরত রাখার জন্য ভয়-ভীতি,লোভ -লালসা , বন্ধুত্ব শত্রুতা এবং ভালবাসা সব কিছুই তোমার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে৷ এসবের মোকাবেলা করতে গিয়ে নিজের অবস্থানে স্থির ও অটল থাকবে৷ এগুলো ছিল একেবারে প্রাথমিক দিকনির্দেশনা ৷ আল্লাহ তাআলা তাঁর রসূলকে যে সময় নবুওয়াতের কাজ শুরু করতে আদেশ দিয়েছিলেন সে সময় এ দিকনির্দেশনাগুলো তাঁকে দিয়েছিলেন৷ কেউ যদি এসব ছোট ছোট বাক্য এবং তার অর্থ সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করে তাহলে স্বতস্ফূর্তভাবে তার মন বলে উঠবে যে একজন নবীর নবুওয়াতের কাজ শুরু করার প্রাক্কালে তাঁকে এর চাইতে উত্তম আর কোন দিকনির্দেশনা দেয়া যেতে পারে না৷এ নির্দেশনায়া তাকে কি কাজ করতে হবে একদিকে যেমন তা বলে দেয়া হয়েছে তেমনি এ কাজ করতে গেলে তাঁর জীবন ,নৈতিক চরিত্র এবং আচার-আচরণ কেমন হবে তাও তাঁকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে৷ এর সাথে সাথে তাঁকে এ শিক্ষাও দেয়া হয়েছে যে, তাকে কি নিয়ত ,কি ধরনের মানসিকতা এবং কিরূপ চিন্তাধারা নিয়ে একাজ আঞ্জাম দিতে হবে আর এতে এ বিষয়েও তাঁকে সাবধান করে দেয়া হয়েছে যে, একাজ করার ক্ষেত্রে কিরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে এবং তা মোকাবিলা কিভাবে করতে হবে৷ বর্তমানেও যারা বিদ্বেষের কারণে স্বার্থের মোহে অন্ধ হয়ে বলে যে, (নাউযুবিল্লাহ) মৃগী রোগে আক্রান্ত হওয়ার মুহূর্তে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখ থেকে এমন কথা উচ্চারিত হতো, তারা একটু চোখ খুলে এ বাক্যগুলো দেখুক এবং নিজেরাই চিন্তা করুক যে, এগুলো কোন মৃগী রোগে আক্রান্ত মানুষের মুখ থেকে উচ্চারিত কথা না কি মহান আল্লাহর বানী যা রিসালাতের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের জন্য তিনি তার বান্দাকে দিচ্ছেন?
৮. আমরা ভুমিকাতেই উল্লেখ করেছি যে, এ সূরার এ অংশটা প্রথম দিকে নাযিলকৃত আয়াতসমূহের কয়েক মাস পরে এমন সময় নাযিল হয়েছিল যখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে ইসলামের তাবলীগ ও প্রচারের কাজ শুরু হওয়ার পর প্রথম বারের মত হজ্জের মওসুম সমাগত হলো এবং কুরাইশ নেতৃবৃন্দ একটি সম্মেলন ডেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো, বহিরাগত হাজীদের মনে কুরআন ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে খারাপ ধারণা সৃষ্টির জন্য অপপ্রচার ও কুৎসা রটনার এক সর্বাত্মক অভিযান চালাতে হবে৷ এ আয়াতগুলোতে কাফেরদের এ কর্মকাণ্ডের পর্যালোচনা করা হয়েছে৷ আর একথাটি দ্বারাই পর্যালোচনা শুরু করা হয়েছে এর অর্থ হলো ,ঠিক আছে যে ধরনের আচরণ তোমরা করতে চাচ্ছ তা করে নাও৷ এভাবে পৃথিবীতে তোমরা কোন উদ্দেশ্য সাধনে সফল হলেও যেদিন শিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে এবং কিয়ামত কায়েম হবে সেইদিন তোমরা নিজেদের কৃতকর্মের মন্দ পরিণাম থেকে কিভাবে রক্ষা পাবে? (শিংগা সম্পর্কে ব্যাখ্যা জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন , সূরা আনআম টীকা ৪৭;ইবরাহীম,টীকা৫৭;ত্বা-হা টীকা ৭৮; আল হাজ্জ, টীকা ১,ইয়াসীন, টীকা ৪৬ও ৪৭ , আয যুমার ,টীকা ৭৯ এবং ক্বাফ, টীকা ৫২)৷
৯. এ বাক্যটি থেকে স্বতঃই প্রতিভাত হয় যে, সেদিনটি ঈমানদারদের জন্য হবে খুবই সহজ এবং এর সবটুকু কঠোরতা সত্যকে অমান্যকারীদের জন্য নির্দিষ্ট হবে৷ এ ছাড়া বাক্যটি থেকে এ অর্থও প্রতিফলিহত হয় যে,সেদিনটির কঠোরতা কাফেরদের জন্য স্থায়ী হয়ে যাবে৷ তা এমন ধরনের কঠোরতা হবে না যা পরে কোন সময়ে হালকা বা লঘূ হয়ে যাওয়ার আশা করা যাবে৷
১০. এখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে বলা হচ্ছেঃ হে নবী, কাফেরদের সে সম্মেলনে যে ব্যক্তি (ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা) তোমাকে বদনাম করার উদ্দেশ্যে পরামর্শ দিয়েছিল যে, সমগ্র আরব থেকে আগত হাজীদের কাছে তোমাকে যাদুকর বলে প্রচার করতে হবে তার ব্যাপারটা তুমি আমার ওপর ছেড়ে দেও৷ এখন আমার কাজ হলো, তার সাথে বুঝাপড়া করা৷ তোমার নিজের এ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করার কোন প্রয়োজন নেই৷
১১. একথাটির দুটি অর্থ হতে পারে এবং দুটি অর্থই সঠিক৷ এক,আমি যখন তাকে সৃষ্টি করেছিলাম সে সময় কোন প্রকার ধন-সম্পদ,সন্তান-সন্তুতি এবং মর্যাদা ও নেতৃত্বের অধিকারী ছিল না ৷ দুই, একমাত্র আমিই তার সৃষ্টিকর্তা৷ অন্য যেসব উপাস্যের খোদায়ী ও প্রভুত্ব কায়েম রাখার জন্য সে তোমার দেয়া তাওহীদের দাওয়াতের বিরোধিতায় এত তৎপর, তাদের কেউই তাকে সৃষ্টি করার ব্যাপররে আমার সাথে শরীক ছিল না৷
১২. ওয়ালীদ ইবনে মুগীরার দশ বারটি পুত্র সন্তান ছিল৷ তাদের মধ্যে হযরত খালেদ ইবনে ওয়ালীদ ইতিহাসে অনেক বেশী প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন৷ এসব পুত্র সন্তানদের জন্য ----------শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ এর কয়েকটি অর্থ হতে পরে৷ এক, রুযী রোজগারের জন্য তাদের দৌড় ঝাপ করতে বা সর্বক্ষণ ব্যস্ত থাকতে কিংবা বিদেশ যাত্রা করতে হয় না৷ তাদের বাড়ীতে এত খাদ্য মজুদ আছে যে, তারা সর্বক্ষণ বাপের কাছে উপস্থিত থাকে এবং তাকে সাহায্য করার জন্য প্রস্তুত থাকে৷ দুই, তার সবগুলো সন্তানই নামকরা এবং প্রভাবশালী,তারা বাপের সাথে দরবার ও সভা সমিতিতে উপস্থিত থাকে৷ তিন, তারা সবাই এমন সামাজিক পদমর্যাদার অধিকারী ব্যক্তি যে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের সাক্ষ বা মতামত গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়ে থাকে৷
১৩. একথার একটি অর্থ হলো, এসব সত্ত্বেও তার লালসা ও আকাংখার শেষ নেই৷ এত কিছু লাভ করার পরও সে সর্বক্ষণ এ চিন্তায় বিভোর যে, দুনিয়ার সব নিয়ামত ও ভোগের উপকরণ সে কিভাবে লাভ করতে পারবে৷ দুই,হযরত হাসান বাসরী ও আরো কয়েকজন মনীষী বর্ণনা করেছেন যে, সে বলতোঃ মুহাম্মাদের (সা) একথা যদি সত্য হয়ে থাকে যে, মৃত্যুর পর আরো একটি জীবন আছে এবং সেখানে জান্নাত বলেও কিছু একটা থাকবে তাহলে সে জান্নাত আমার জন্যই তৈরী করা হয়েছে৷
১৪. মক্কায় কাফেরদের যে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, এখানে সে সম্মেলনে সংঘটিত ঘটনার কথা বলা হচ্ছে৷ সূরার ভূমিকায় ঘটনাটির যে বিস্তারিত বিবরণ আমরা উল্লেখ করেছি তা থেকে এ বিষয়টি স্পষ্ট প্রতিভাত হয় যে, এ ব্যক্তি মনে প্রানে যে বিশ্বাস করে নিয়েছিল যে, কুরআন আল্লাহর বাণী৷ কিন্তু নিজের গোত্রের মধ্যে তার মর্যাদা, প্রভাব প্রতিপত্তি ও নেতৃত্ব বজায় রাখার জন্য ঈমান আনতে প্রস্তুত ছিল না৷ কাফেরদের সে সম্মেলনে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে কুরাইশ নেতাদের প্রস্তাবিত অভিযোগসমূহ সে নিজেই যখন খণ্ডন করলো তখন আরবের লোকদের মধ্যে রটিয়ে দিয়ে নবীকে(সা) বদনাম করা যায় এমন কোন তার বিবেকের বিরুদ্ধে লড়াই করছে এবং বেশ কিছু সময় কঠিন মানসিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকার পর পরিশেষে, সে যেভাবে একটি অভিযোগ তৈরী করলো, তার একটা পূর্নাংগ চিত্র এখানে পেশ করা হয়েছে৷
১৫. এর দুটি অর্থ হতে পারে৷ একটি অর্থ হলো, যাকেই এর মধ্যে নিক্ষেপ করা হবে তাকেই সে জ্বালিয়ে ছাই করে দেবে৷ কিন্তু জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়েও সে রক্ষা পাবে না৷ বরং আবার তাকে জীবিত করা হবে এবং আবার জ্বালানো হবে৷ আরেক জায়গায় কথাটা এভাবে বলা হয়েছেঃ ------------সেখানে সে মরে নিঃশেষ হয়েও যাবে না আবার বেঁচেও থাকবে না (আল আলা,১৩)৷এর দ্বিতীয় অর্থ হতে পারে এই যে, আযাবের উপযুক্ত কেউ-ই তার কবল থেকে রক্ষা পাবে না৷ আর যে তার কবলে পড়বে তাকেই আযাব থেকে রেহাই দেবে না৷
১৬. "তা দেহের কোন অংশই না জ্বালিয়ে ছাড়বে না"একথা বলে আবার "চামড়া ঝলসিয়ে দেবে" কথাটি আলাদা করে উল্লেখ করাটা বাহ্যত অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হয়৷ কিন্তু এ বিশেষ ধরনের আযাবের কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করার উদ্দেশ্যে হলো, মূলত মুখমণ্ডল ও দেহের চামড়াই মানুষের ব্যক্তিত্বকে সুষ্পষ্টরূপে তুলে ধরে বা প্রকাশ করে৷ তাই চেহারা ও গোত্রচর্মের কুৎসিত দর্শন ও কুশ্রী হওয়া তার জন্য সর্বাধিক মানসিক যন্ত্রনার কারণ হবে৷ শরীরের আভ্যন্তরীণ অংগ-প্রত্যংগে তার যত কষ্ট ও যন্ত্রণাই হোক না কেন সে তাতে ততটা মানসিক যাতনাক্লিষ্ট হয় না৷ যতটা হয় তার চেহারা কুৎসিত হলে কিংবা শরীরের খোলা মেলা অংশের চামড়া বা ত্বকের ওপর বিশ্রী দাগ পড়লে৷ কারণ কোন মানুষের চেহারা ও গাত্র চর্মে বিশ্রী দাগ থাকলে সবাই তাকে ঘৃনা করে৷ তাই বলা হয়েছেঃ এ সুদর্শন চেহারা এবং অত্যন্ত নিটোল ও কান্তিময় দেহধারী যেসব মানুষ নিজেদের ব্যক্তিত্ব গৌরবে আত্মহারা তারা যদি আল্লাহর আয়াতের সাথে ওয়ালীদ ইবনে মুগীরার মত শত্রুতার আচরণ করতেই থাকে তাহলে তাদের মুখমণ্ডল ঝলসিয়ে বিকৃত করে দেয়া হবে আর তাদের গাত্রচর্ম পুড়িয়ে কয়লার মত কাল করে দেয়া হবে৷
১৭. এখান থেকে "তোমরা রবের বাহিনী সম্পর্কে তিনি ছাড়া আর কেউ অবহিত নয়" পর্যন্ত বাক্যগুলোতে একটি ভিন্ন প্রসংগ আলোচিত হয়েছে৷"দোযখের কর্মচারীর সংখ্যা শুধু উনিশ জন হবে" একথা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখে শুনে যারা সমালোচনামুখর হয়ে উঠেছিল এবং কথাটা নিয়ে হাসি ঠাট্রা করতে শুরু করেছিল প্রাসংগিক বক্তব্যের মাঝখানে বক্তব্যের ধারাবাহিকতায় ছেদ টেনে তাদের কথা জবাব দেয়া হয়েছে৷ তাদের কাছে একথাটি বিস্ময়কর মনে হয়েছে যে, এক দিকে আমাদের বলা হচ্ছে আদম আলাইহিস সালামের সময় থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ কুফরী করেছে এবং কবীরা গুনাহে লিপ্ত হয়েছে তাদের সবাইকে দোযখে নিক্ষেপ করা হবে৷ অপর দিকে আমাদের জানানো হচ্ছে যে, এত বড় বিশাল দোযখে অসংখ্য মানুষকে আযাব দেয়ার জন্য মাত্র উনিশ জন কর্মচারী নিয়োজিত থাকবে৷ একথা শুনে কুরাইশ নেতারা অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো৷ আবু জেহেল বললোঃ আরে ভাই, তোমরা কি এতই অকর্মা ও অথর্ব হয়ে পড়ছো যে, তোমাদের মধ্য থেকে দশ দশ জনে মিলেও দোযখের একজন সিপাইকে কাবু করতে পারবে না? বনী জুমাহ, গোত্রের এক পলোয়ান সাহেব তো বলতে শুরু করলোঃ সতের জনকে আমি একাই দেখে নেব৷ আর তোমরা সবাই মিলে অবশিষ্ট দুই জনকে কাবু করবে৷ এসব কথার জবাব হিসেবে সাময়িকভাবে প্রসংগে পাল্টে একথাগুলো বলা হয়েছে৷
১৮. অর্থাৎ মানুষের দৈহিক শক্তির সাথে তুলনা করে তাদের শক্তি সম্পর্কে অনুমান করা তোমাদের বোকামী ও নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছুই নয়৷ তারা মানুষ নয়, বরং ফেরেশতা৷ তোমাদের পক্ষে অনুমান করাও সম্ভব নয় যে, কি সাংঘাতিক শক্তিধর ফেরেশতা আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি করেছেন৷
১৯. অর্থাৎ দোযখের কর্মচারীদের সংখ্যা বর্ণনা করার বাহ্যত কোন প্রয়োজনই ছিল না৷ কিন্তু তাদের সংখ্যা আমি এ জন্য উল্লেখ করলাম যাতে তা সেসব লোকের জন্য ফিতনা হয়ে যায় যারা নিজেদের মনের মধ্যে এখনও কুফরী লুকিয়ে রেখেছে৷ এ ধরনের লোক বাহ্যিকভাবে ঈমানের প্রদর্শনী যতই করুন না কেন তার অন্তরের কোন গভীরতম প্রদেশও যদি সে আল্লাহর উলুহিয়াত ও তাঁর অসাধারণ ক্ষমতা কিংবা অহী ও রিসালাত সম্পর্কে সামান্যতম সন্দেহ বা দ্বিধা-দ্বন্দ্বেও পোষণ করে থাকে তাহলে আল্লাহর এত বড় জেলখানায় অসংখ্য অপরাধী মানুষ ও জিনকে শুধু উনিশ জন সিপাই সামলে রাখবে এবং আলাদাভাবে প্রত্যেককে শাস্তিও দেবে একথা শোনামাত্র তার লুকিয়ে রাখা কুফরী স্পষ্ট বেরিয়ে পড়বে৷
২০. কোন কোন মুফাস্সির এর এ অর্থ বর্ণনা করেছেন যে, আহলে কিতাবের (ইয়াহুদ ও খৃষ্টান) ধর্মগ্রন্থেও যেহেতু দোযখের ফেরেশতাদের এ সংখ্যাটিই উল্লেখ করা হয়েছে৷ তাই একথা শোনামাত্র তাদের দৃঢ় বিশ্বাস সৃষ্টি হবে যে, প্রকৃতপক্ষে এটা আল্লাহর কথাই হবে৷ কিন্তু আমাদের মতে দুটি কারণে এ ব্যাখ্যা সঠিক নয়৷ প্রথম কারণটি হলো, ইয়াহুদ ও খৃষ্টানদের যে ধর্মগ্রন্থ বর্তমানে দুনিয়ায় পাওয়া যায় তাতে অনেক খোঁজাখুঁজির পরও দোযখের কর্মচারী ফেরেশতারা সংখ্যা উনিশ জন একথা কোথাও পাওয়া যায়নি৷ দ্বিতীয় কারণটি হলো, কুরআনের বহুসংখ্যক বক্তব্য আহলে কিতাবের ধর্মীয় গ্রন্থে বর্ণিত বক্তব্যের অনুরূপ৷ কিন্তু ইয়াহুদ ও খৃষ্টানরা এসব বক্তব্যের ব্যাখ্যা করে বলে যে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসব কথা তাদের ধর্মগ্রন্থ থেকে গ্রহণ করেছেন৷ এসব কারণে আমাদের মতে একথাটির সঠিক অর্থ হলোঃ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভাল করেই জানতেন যে তার মুখে দোযখের কর্মচারী ফেরেশতার সংখ্যা উনিশ, একথা উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথে তাঁর প্রতি হাসি-তামাসা ও ঠাট্রা -বিদ্রুপের অসংখ্য বাণ নিক্ষিপ্ত হবে৷ তা সত্ত্বেও আল্লাহর প্রেরিত অহীতে যে কথা বলা হয়েছে, তা তিনি কোন প্রকার ভয়-ভীতি বা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছাড়াই প্রকাশ্য ঘোষণার মাধ্যমে সবার সামনে পেশ করলেন এবং কোন প্রকার ঠাট্রা -বিদ্রুপের আদৌ পরোয়া করলেন না৷ জাহেল আরবরা নবীদের মাহাত্ম্য ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে অবহিত ছিল না ঠিকই , কিন্তু আহলে কিতাব গোষ্ঠী ভাল করেই জানতো যে প্রত্যেক যুগে নবীদের নীতি ও পদ্ধতি এটাই যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের কাছে যা কিছু আসতো মানুষ পছন্দ করুন বা না করুক তারা তা হুবহু মানুষের কাছে পৌছিয়ে দিতেন৷ তাই আশা করা গিয়েছিল যে এ চরম প্রতিকূল পরিবেশে রসূকে (সা) বাহ্যত অদ্ভুত একথাটি কোন প্রকার দ্বিধা-সংকোচ না করে সারাসরি পেশ করতে দেখে অন্তত আহলে কিতাব গোষ্ঠীর দৃঢ় প্রত্যয় জন্মাবে যে, এটি একজন নবীর কাজ ছাড়া আর কিছুই নয়৷ এ ক্ষেত্রে অন্যদের তুলনায় আহলে কিতাব গোষ্ঠীর কাছ থেকে এ আচরণ লাভের প্রত্যাশা ছিল বেশী৷ উল্লেখ্য যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে এ কর্মনীতি বেশ কয়েকবার প্রতিফলিত হয়েছে৷ এর মধ্যে সব চাইতে উল্লেখযোগ্য হলো মিরাজের ঘটনা তিনি কাফেরদের সমাবেশে নিসংকোচে ও দ্বিধাহীন চিত্তে মিরাজের ঘটনা বর্ণনা করেছিলেন৷ এ বিস্ময়কর ঘটনা শুনে তাঁর বিরোধিরা কত রকমের কাহিনী ফাঁদের তার এক বিন্দু পরোয়াও তিনি করেননি৷
২১. একথাটি ইতিপূর্বে কুরআন মজীদের কয়েকটি স্থানে বলা হয়েছে৷ অর্থাৎ প্রত্যেকটি পরীক্ষার সময় একজন ঈমানদার যদি তার ঈমানে অটল ও অচল থাকে এবং সন্দেহ -সংশয় কিংবা আনুগত্য পরিহার কিংবা দীনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার পথ বর্জন করে দৃঢ় প্রত্যয়, আস্থা ,আনুগত্য ও অনুসরণ এবং দীনের প্রতি আস্থা পোষণের পথ অনুসরণ করে তাহলে তার ঈমান দৃঢ়তা ও সমৃদ্ধি লাভ করে৷ (ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, সূরা আলে ইমরান,আয়াত ১৭৩; আল আনফাল, আয়াত ২;টীকা ২; আত তাওবা, আয়াত ১৪৪ ও ১৪৫;টীকা ১২৫;আল আহযাব, আয়াত ২২; টীকা ৩৮; আল ফাতাহ, আয়াত ৪;টীকা ৭)৷
২২. কুরআন মজীদে সাধারণত "মনের রোগ" কথাটি মুনাফেকী অর্থে ব্যবহার করা হয়৷ তাই এ ক্ষেত্রে এ শব্দটির ব্যবহার দেখে কোন কোন মুফাস্সির মনে করেছেন ,এ আয়াতটি মদীনাতে নাযিল হয়েছে৷ কারণ, মদীনাতেই মুনাফিকদের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল৷কিন্তু এ ধারণা কয়েকটি কারণে ঠিক নয়৷ প্রথমত এ দাবী ঠিক নয় যে মক্কায় মুনাফিক ছিল না৷ আমরা তাফহীমুল কোরআন সূরা আনকাবুতের ভূমিকায় এবং ১,১৩,১৪,১৫.ও ১৬নং টীকায় এ ভ্রান্তি স্পষ্ট করে তুলে ধরেছি৷দ্বিতীয়ত বিশেষ পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে ধারাবাহিকভাবে অবতীর্ণ আয়াতসমূহের কোন একটি আয়াত সম্পর্ক একথা বলা যে, তা অন্য কোন পরিস্থিতিতে নাযিল হয়েছে এবং কোন পূর্বাপর সম্পর্ক ছাড়াই এখানে জুড়ে দেয়া হয়েছে ,এভাবে কুরআনের কোন আয়াতের তাফসীর করা আমরা সঠিক মনে করি না৷ নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়াতসমূহ থেকেই আমরা সূরা মুদ্দাস্সিরের এ অংশের ঐতিহাসিক পটভূমি জানতে পরি৷ মক্কী যুগের প্রাথমিক পর্যায়ের একটি বিশেষ ঘটনা সম্পর্কে এ অংশটি নাযিল হয়েছিল৷ ঘটনার সাথে বক্তব্যের ধারাবাহিকতার পুরোপুরি সামঞ্জস্য রয়েছে৷ যদি এ একটি বাক্য কয়েক বছর পর মদীনাতেই নাযিল হয়ে থাকে তাহলে তাকে এ বিশেষ বিষয়ের মধ্যে এনে জুড়ে দেয়ার কি এমন অবকাশ বা যুক্তি আছে? এখন একটি প্রশ্ন থেকে যায় যে,"মনের রোগ" বলতে তাহলে কি বুঝানো হয়েছে? এর জবাব হলো,এর অর্থ সন্দেহের রোগ৷ অকাট্যভাবে এবং নিসংশয়ে আল্লাহ,আখেরাত,অহী, রিসালাত, জান্নাত ও দোযখ অস্বীকার করে এমন লোক শুধু মক্কায় নয় গোটা পৃথিবীতে আগেও যেমন কম ছিল এখনও তেমনি কম আছে৷ আল্লাহ আছেন কিনা, আখেরাত হবে কি হবে না, ফেরেশতা ,জান্নাত ও দোযখ বাস্তাবিকই আছে না কাল্পকাহিনী মাত্র? রসূল কি প্রকৃতই রসূল ছিলেন? তাঁর কাছে কি সত্যই অহী আসতো? প্রত্যেক যুগে এ ধরনের সন্দেহ পোষণকারী লোকের সংখ্যাই অধিক ছিল৷ এ সন্দেহই অধিকাংশ মানুষকে শেষ পর্যন্ত কুফরীতে নিমজ্জিত করেছে৷ তা না হলে যারা এসব সত্য অকাট্যভাবে অস্বীকার করে পৃথিবীতে এরূপ নির্বোধের সংখ্যা কোন সময়ই বেশী ছিল না৷ কেননা যার মধ্যে বিন্দু পরিমান বিবেক-বুদ্ধিও আছে সেও জানে যে, এসব বিষয়ের সত্য ও সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে বাতিল করে দেয়া এবং অকাট্যভাবে অসম্ভব ও অবাস্তব বলে সিদ্ধান্ত দেয়ার আদৌ কোন ভিত্তি নেই৷
২৩. এর অর্থ এ নয় যে, তারা একে আল্লাহর বাণী বলে মেনে নিচ্ছিলো ঠিকই কিন্তু বিস্ময় প্রকাশ করছিলো এ জন্য যে, আল্লাহ তা"আলা একথা বললেন কেন? বরং প্রকৃতপক্ষে তারা বলতে চাচ্ছিলো যে, যে বাণীতে এরূপ বিবেক -বুদ্ধি বিরোধি ও দুর্বোধ্য কথা বলা হয়েছে তা আল্লাহর বাণী কি করে হতে পারে?
২৪. অর্থাৎ এভাবে আল্লাহ তা"আলা মাঝে মধ্যে তাঁর বাণী ও আদেশ-নির্দেশে এমন কিছু কথা বলেন যা মানুষের জন্য পরীক্ষার কারণ হয়ে দাঁড়ায়৷ যে কথা শুনে একজন সত্যপন্থী, সৎপ্রকৃতির এবং সঠিক চিন্তার লোক সহজ সরল অর্থ গ্রহণ করে সঠিক পথ অনুসরণ করে একজন হঠকারী বক্রচিন্তাধারী এবং সত্যকে এড়িয়ে চলার মানসিকতা সম্পন্ন ব্যক্তি সে একই কথার বাঁকা অর্থ করে তাকে ন্যায় ও সত্য থেকে দূরে সরে যাওয়ার একটা নতুন বাহানা হিসেবে ব্যবহার করে৷ প্রথমোক্ত ব্যক্তি নিজে যেহেতু সত্যপন্থী তাই আল্লাহ তা"আলা তাকে হিদায়তা দান করেন৷ কারণ, হিদায়াত প্রার্থী ব্যক্তিকে জোর করে গোমরাহ বা পথভ্রষ্ট করা আল্লাহর নীতি নয়৷ শেষোক্ত ব্যক্তি যেহেতু নিজেই হিদায়াত চায় না, বরং গোমরাহীকেই পছন্দ করে তাই আল্লাহ তাকে গোমরাহীর পথেই ঠেলে দেন৷ কারণ যে ন্যায় ও সত্যকে ঘৃণা করে তাকে জোর করে হকের পথে টেনে আনা আল্লাহর নীতি নয়৷ (আল্লাহ তা"আলার হিদায়াত দান করা এবং গোমরাহীর মধ্যে নিক্ষেপ করার বিষয়টি সম্পর্কে এ তাফসীর গ্রন্থের বিভিন্ন জায়গায় বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে৷ উদাহরণ স্বরূপ নীচে উল্লেখিত জায়গাসমূহে দেখুন, সূরা আল বাকারাহ ,টীকা ১০,১৬,১৯,ও ২০;আন নিসা, ১৭৩;আল আন"য়াম,টীকা ১৭,২৮ও ৯০;ইউনুস,টীকা ১৩;আল কাহ্ফ,টীকা ৫৪ এবং আল কাসাস,টীকা ৭১)
২৫. অর্থাৎ আল্লাহ তা"আলা এ বিশ্ব -জাহানে ভিন্ন ভিন্ন কত শত রকমের জীব-জন্তু যে সৃষ্টি করে রেখেছেন, তাদের কত রকম শক্তি সমার্থ যে দান করেছেন এবং তাদের দ্বারা কত রকম কাজ যে আঞ্জাম দিচ্ছেন একমাত্র তিনি ছাড়া আর কেউ তা জানে না৷ পৃথিবীর মত ক্ষুদ্র একটি গ্রহে বসবাসকারী মানুষ তার সীমাবদ্ধ দৃষ্টি দিয়ে চার পাশের ক্ষুদ্র পৃথিবীকে দেখে যদি ও ভূল ধারণা করে বসে যে সে, তার ইন্দ্রিয়সমূহের সাহায্যে যা কিছু দেখছে ও অনুভব করেছে কেবল মাত্র সেগুলোই আল্লাহর ক্ষমতা ও কর্তৃত্বধীন তাহলে এটা তার মূর্খতা ও নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছুই না৷ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তা"আলার সর্বময় ক্ষমতা ও কর্তৃত্বধীন এ বিশ্ব-জাহান এত ব্যাপক ও বিশাল যে, মানুষের ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে এর ব্যাপকতা ও বিশালতার সবটুকু জ্ঞানের স্থান সংকুলান তো দূরের কথা এর কোন একটি জিনিস সম্পর্কেও পুর্ণ জ্ঞান লাভ করা তার সাধ্যাতীত৷
২৬. অর্থাৎ দোযখের উপযুক্ত হয়ে যাওয়া এবং তার শাস্তিলাভের পূর্বেই লোকেরা যেন তা থেকে নিজেদের রক্ষার চিন্তা করে৷