(৭৩:১) হে বস্ত্র মুড়ি দিয়ে শয়নকারী
(৭৩:২) রাতের বেলা নামাযে রত থাকো৷ তবে কিছু সময় ছাড়া
(৭৩:৩) অর্ধেক রাত,কিংবা তার চেয়ে কিছু কম করো৷
(৭৩:৪) অথবা তার ওপর কিছু বাড়িয়ে নাও৷ আর কুরআন থেমে থেমে পাঠ করো৷
(৭৩:৫) আমি অতি শীঘ্র তোমার ওপর একটি গুরুভার বাণী নাযিল করবো৷
(৭৩:৬) প্রকৃতপক্ষে রাতের বেলা জেগে ওঠা প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে অনেক বেশী কার্যকর এবং যথাযথভাবে কুরআন পড়ার জন্য উপযুক্ত সময়
(৭৩:৭) দিনের বেলা তো তোমার অনেক ব্যস্ততা রয়েছে৷
(৭৩:৮) নিজ প্রভুর নাম স্মরণ করতে থাকো৷ এবং সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তাঁরই জন্য হয়ে যাও৷
(৭৩:৯) তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের মালিক৷ তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই৷ তাই তাঁকেই নিজের উকীল হিসেবে গ্রহণ করো৷ ১০
(৭৩:১০) আর লোকেরা যা বলে বেড়াচ্ছে সে বিষয়ে ধৈর্যধারণ করো এবং ভদ্রভাবে তাদের থেকে আলাদা হয়ে যাও৷ ১১
(৭৩:১১) এসব মিথ্যা আরোপকারী, সম্পদশালী লোকদের সাথে বুঝাপড়ার ব্যাপারটা তুমি আমার ওপর ছেড়ে দাও৷ ১২ আর কিছু কালের জন্য এদেরকে এ অবস্থায়ই থাকতে দাও৷
(৭৩:১২) আমার কাছে(এদের জন্য)আছে শক্ত বেড়ি, ১৩ জ্বলন্ত আগুণ,
(৭৩:১৩) গলায় আটকে যাওয়া খাবার এবং যন্ত্রণাদায়ক আযাব৷
(৭৩:১৪) এসব হবে সেদিন যেদিন পৃথিবী ও পর্বতমালা কেঁপে উঠবে এবং পাহাড়গুলোর অবস্থা হবে এমন যেন বালুর স্তূপ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে৷ ১৪
(৭৩:১৫) আমি তোমাদের ১৫ নিকট একজন রসূল পাঠিয়েছি তোমাদের জন্য সাক্ষী স্বরূপ ১৬ যেমন ফেরাউনের নিকট একজন রসূল পাঠিয়েছিলাম ৷
(৭৩:১৬) দেখো,ফেরাউন যখন সে রসূলের কথা মানলো না তখন আমি তাকে কঠোরভাবে পাকড়াও করলাম৷
(৭৩:১৭) তোমরা যদি মানতে অস্বীকার করো তাহলে সেদিন কিভাবে রক্ষা পাবে যেদিনটি শিশুকে বৃদ্ধ বানিয়ে দেবে? ১৭
(৭৩:১৮) যেদিনের কঠোরতায় আকাশ মণ্ডল বিদীর্ণ হয়ে যেতে থাকবে? আল্লাহর প্রতিশ্রুতি তো পূর্ন হবেই৷
১. এ শব্দগুলো দ্বারা আল্লাহ তা"আলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে আদেশ দিয়েছেন যে, তিনি যেন রাতের বেলা ওঠেন এবং ইবাদাতের জন্য দাঁড়িয়ে থাকেন৷ এ থেকে বুঝা যায় যে, সে সময় তিনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন অথবা ঘুমানোর জন্য চাদড় মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েছিলেন৷এ সময় তাকে হে নবী (সাঃ) অথবা হে রসূল বলে সম্বোধন না করে হে বস্ত্র মুড়ি দিয়ে শয়নকারী বলে সম্বোধন একটি তাৎপর্যপূর্ণ সম্বোধন৷ এর যে অর্থ দাঁড়ায় তা হলো, এখন আর সে সময় নেই যখন তিনি নিশ্চিন্তে আরামে ঘুমাতেন৷ এখন তাঁর ওপর এক বিরাট কাজের বোঝা চাপানো হয়েছে যার দাবী ও চাহিদা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের৷
২. এর দুটি অর্থ হতে পারে৷ এক, নামাযে দাঁড়িয়ে রাত অতিবাহিত করো এবং রাতের অল্প কিছু সময় মাত্র ঘুমে কাটাও৷ দুই, তোমার কাছে সমস্ত রাতই নামায পড়ে কাটিয়ে দেয়ার দাবী করা হচ্ছে না৷ বরং তুমি বিশ্রামও করো এবং রাতের একটি ক্ষুদ্র অংশ ইবাতদ -বন্দেগীতেও ব্যয় করো৷ কিন্তু পরবর্তী বিষয়বস্তুর সাথে প্রথমোক্ত অর্থটাই অধিকতর সামঞ্জস্যপূর্ণ ৷ সূরা দাহরের ২৬নং আয়াত থেকে একথারই সমর্থন পাওয়া যায়৷ উক্ত আয়াতে বলা হয়েছেঃ

-------------------------

"রাতের বেলা আল্লাহর সমানে সিজদায় পড়ে থাকো এবং রাতের বেশীর ভাগ সময় তাঁর তাসবীহ ও প্রশংসায় অতিবাহিত করো৷"
৩. যে সময়টুকু ইবাদত করে কাটাতে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল সেময়ের পরিমাণ কি হবে এটা তারই ব্যাখ্যা৷ এতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ইখতিয়ার দেয়া হয়েছে, তিনি ইচ্ছা করলে অর্ধেক রাত নামায পড়ে কাটাতে পারেন কিংবা তার চেয়ে কিছু কম বা বেশী করতে পারেন৷ তবে বাচনভঙ্গী থেকে বুঝা যায় যে, অর্ধেক রাত-ই অগ্রাধিকারযোগ্য৷ কারণ অর্ধেক রাতকে মানদণ্ড নির্ধারিত করে তার থেকে কিছু কম বা তার চেয়ে কিছু বেশী করার ইখতিয়ার দেয়া হয়েছে৷
৪. অর্থাৎ তাড়াতাড়ি ও দ্রুতগতিতে পড়ো না৷ বরং ধীরে ধীরে প্রতিটি শব্দ সুন্দরভাবে মুখে উচ্চারণ করে পড়ো৷ এক একটি আয়াত পড়ে থেমে যাও যাতে মন আল্লাহর বাণীর অর্থ ও তার দাবীকে পুরোপুরি উপলদ্ধি করতে পারে এবং তার বিষয়বস্তু দ্বারা প্রভাবিত হয়৷ কোন জায়গায় আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলীর উল্লেখ থাকলে তার মহত্ব শ্রেষ্ঠত্ব ও ভীতি যেন মনকে ঝাঁকুনি দেয়৷কোন জায়গায় তাঁর রহমত ও করুণার বর্ণনা আসলে হৃদয়-মন যেন কৃতজ্ঞতার আবেগে আপ্লুত হয়ে ওঠে৷ কোন জায়গায় তাঁর গযব ও শাস্তির উল্লেখ থাকলে হৃদয় -মন যেন তার ভয়ে কম্পিত হয়৷কোথাও কোন কিছু করার নির্দেশ থাকলে কিংবা কোন কাজ করতে নিষেধ করা হয়ে থাকলে কি কাজ করতে আদেশ করা হয়েছে এবং কোন কাজ করতে নিষেধ করা হয়েছে তা যেন ভালভাবে বুঝে নেয়া যায়৷ মোটকথা কুরআনে শব্দগুলো শুধু মুখ থেকে উচ্চারণ করার সময় নাম কুরআন পাঠ নয়, বরং মুখ থেকে উচ্চারণ করার সাথে সাথে তা উপলব্ধি করার জন্য গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনাও করতে হবে৷ হযরত আনাসকে (রা) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোরআন পাঠের নিয়ম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শব্দগুলোকে টেনে পড়তেন৷উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি -----------"বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম"পড়ে বললেন যে, তিনি আল্লাহ, রহমান এবং রাহীম শব্দকে মদ্দ করে বা টেনে পড়তেন৷ (বুখারী) হযরত উম্মে সালমাকে একই প্রশ্ন করা হলে তিনি বললেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক একটি আয়াত আলাদা আলাদা করে পড়তেন এবং প্রতিটি আয়াত পড়ে থামতেন৷যেমন --------পড়ে থামতেন ,তারপর ---------পড়ে থামতেন এবং কিছু সময় থেমে থেকে----------পড়তেন৷(মুসনাদে আহমাদ,আবু দাউদ ,তিরমিযী )আরেকটি রেওয়ায়েতে হযরত উম্মে সালমা (রা) বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এককেটি শব্দ ষ্পষ্ট উচ্চারণ করে পড়তেন৷ (তিরমিযী, নাসায়ী)হযরত হুযায়ফা ইবনে ইয়ামান বর্ণনা করেছেন যে, একদিন রাতে আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে নামায পড়তে দাঁড়ালাম৷ আমি দেখলাম, তিনি এমভাবে কুরআন তেলাওয়াত করেছেন যে, যেখানে তাসবীহে বিষয় আসছে সেখানে তিনি তাসবীহ পড়ছেন,যেখানে দোয়ার বিষয় আসছে সেখানে দোয়া করেছেন৷এবং যেখানে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনার বিষয় আসছে সেখানে তিনি আশ্রয় পার্থনা করেছেন৷(মুসলিম,নাসায়ী)হযরত আবু যান বর্ণনা করেছেন যে, একবার রাতের নামাযে কুরআন তেলাওয়াত করতে করতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন এ আয়াতটির কাছে পৌছলেন ------------------"তুমি যদি তাদের শাস্তি দাও, তারা তোমরাই বান্দা৷ আর যদি তুমি তাদের ক্ষমা করে দাও তাহলে তুমি পরাক্রমশালী, ও বিজ্ঞ ৷তখন তিনি বার বার এ আয়াতটিই পড়তে থাকলেন এবং এভাবে ভোর হয়ে গেল৷" (মুসনাদে আহমাদ, বুখারী)
৫. এর অর্থ হলো তোমাকে রাতের বেলা নামায পড়ার এ নির্দেশ এ জন্য দেয়া হচ্ছে যে, আমি একটি অতি গুরুভার বানী তোমার ওপরে নাযিল করছি৷এ ভার বহন করার এবং তা বরদাশত করার শক্তি তোমার মধ্যে সৃষ্টি হওয়া আবশ্যক৷ তুমি এ শক্তি অর্জন করতে চাইলে আরাম পরিত্যাগ করে রাতের বেলা নামাযের জন্য ওঠো এবং অর্ধেক রাত কিংবা তার চেয়ে কিছু কম বা বেশী রাত ইবাদত বন্দেগীতে কাটিয়ে দাও৷ কুরআনকে গুরুভার বাণী বলার কারণ হলো, তার নির্দেশ অনুসার কাজ করা, তার শিক্ষার উদাহরণ হিসেবে নিজেকে তুলে ধরা,সারা দুনিয়ার সামনে তার দাওয়াত বা আহবান নিয়ে দাঁড়ানো এবং তদনুযায়ী আকীদা-বিশ্বাস, ধ্যান-ধারণা ,নৈতিক চরিত্র ও আচার -আচরণ এবং তাহযীব-তামাদ্দুনের গোটা ব্যবস্থায় বিপ্লব সংঘটিত করা এমন একটি কাজ যে, এর চেয়ে বেশী কঠিনও গুরুত্বভার কাজের কল্পনাও করা যায় না৷ এ জন্যও একে গুরুত্বভার ও কঠিন বাণী বলা হয়েছে যে, তার অবতরণের ভার বহন করা অত্যন্ত কঠিন কাজ ছিল৷ হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত(রা)বর্ণনা করেছেন যে, একবার রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর অহী নাযিল হওয়ার সময় তিনি আমার উরুর ওপর তাঁর উরু ঠেকিয়ে বসেছিলেন৷ আমার উরুর ওপর তখন এমন চাপ পড়ছিলো যে, মনে হচ্ছিলো তা এখনই ভেঙে যাবে৷হযরত আয়েশা বর্ণনা করেনঃ আমি প্রচণ্ড শীতের দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর অহী নাযিল হতে দেখেছি৷ সে সময়ও তাঁর কপাল থেকে ঘাম ঝরতে থাকতো৷ (বুখারী, মুসলিম, মালিক, তিরমিযী, নাসায়ী)আরেকটি রেওয়ায়েতে হযরত আয়েশা (রা)বলেছেনঃউটনীর ওপর সওয়ার থাকা অবস্থায় যখনই তাঁর ওপর অহী নাযিল হতো উটনী তখণ তার বুক মাটিতে ঠেকিয়ে দিতো৷ অহী নাযিল শেষ না হওয়া পর্যন্ত সে নড়াচড়া পর্যন্ত করতে পারতো না৷(মুসনাদে আহমাদ,হাকেম, ইবনে জারীর)৷
৬. মূল ইবারতে ----------শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে যার ব্যাখ্যায় মুফাস্সির ও ভাষাবিদদের চারটি ভিন্ন ভিন্ন মত আছে৷ একটি মত হলো, --------(নাসিয়াতা)শব্দের মানে রাতের বেলা শয্যা ত্যাগকারী ব্যক্তি৷ দ্বিতীয় মতটি হলো এর অর্থ রাত্রিকালীন সময়৷তৃতীয় মত হলো এর অর্থ রাতের বেলা জেগে থাকা বা ওঠা৷ আর চতুর্থ মতটি হলো, এর অর্থ শুধু রাতের বেলা ওঠা বা জেগে থাকা নয়৷ বরং ঘুমিয়ে পড়ার পর জেগে ওঠা৷ হযরত আয়েশা এবং মুজাহিদ এ চতুর্থ অর্থটিই গ্রহণ করেছেন৷
৭. আয়াতে --------আসাদ্দু ওয়াতয়ানশব্দ ব্যবহৃত হয়েছে৷ এর অর্থ এতো ব্যাপক যে, একটি মাত্র বাক্যে তা বুঝানো সম্ভব নয়৷ এর একটি অর্থ হলো রাতের বেলা ইবাদাত -বন্দেগীর কাজ, শয্যা ত্যাগ করে ওঠা এবং দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা যেহেতু মানুষের স্বভাব-বিরুদ্ধ কাজ,মানুষের মনও প্রবৃত্তি এ সময় আরাম কামনা করে, তাই এটি এমন একটি কাজ ও চেষ্টা -সাধনা যা প্রবৃত্তিকে অবদমিত ও বশীভূত করার জন্য অত্যন্ত কার্যকর পন্থা ৷ যে ব্যক্তি এ পন্থায় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয় এবং দেহ ও মন-মগজের ওপর প্রভাব বিস্তার নিজের এ শক্তিকে আল্লাহর পথে ব্যবহার করতে সক্ষম হয় সে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে সত্য ও শাশ্বত এ দীনের দাওয়াতেকে পৃথিবীতে বিজয়ী করার কাজ করতে পারে৷ দ্বিতীয় অর্থ হলো, এ কাজটি মানুষের হৃদয়-মন ও বক্তব্যের মধ্যে সামঞ্জস্য সৃষ্টি করার একটা কার্যকর উপায়৷ কারণ রাতের এ সময়টিতে বান্দা ও আল্লাহর মধ্যে আর কেউ আড়াল হয়না৷এ অবস্থায় মানুষ মুখে যা বলে তা তার হৃদয়ের কথার প্রতিধ্বনী৷ তৃতীয় অর্থ হলো, এটি মানুষের ভেতর ও বাহিরের মধ্যে সংগতি ও মিল সৃষ্টির অতি কার্যকর একটি উপায়৷ কারণ যে ব্যক্তি রাতের নির্জন নিথর পরিবেশে আরাম পরিত্যাগ করে ইবাদত -বন্দেগীর জন্য উঠবে সে নিসন্দেহে খালেস মনেই এরূপ করবে৷ তাতে প্রদর্শনীর বা লোক দেখানোর আদৌ কোন সুযোগ থাকে না৷চতুর্থ হলো,মানুষের জন্য এ ধরনের ইবাদত-বন্দেগীর যেহেতু দিনের বেলার ইবাদত-বন্দেগীর চেয়ে অনেক বেশী কষ্টকর৷ তাই তা নিয়মিত করার ফলে মানুষের মধ্যে অনেক বেশী দৃঢ়তা সৃষ্টি হয় সে অত্যন্ত শক্ত হয়ে আল্লাহর পথে অগ্রসর হতে পারে এবং এ পথে কঠোরতাসমূহকে সে অটল ও অবিচল থেকে বরদাশত করতে পারে৷
৮. মূল ইবারতে------------বলা হয়েছে৷ এর আভিধানিক অর্থ হলো, কথাকে আরো বেশী যথার্থ ও সঠিক বানায়৷ তবে এর মূল বক্তব্য হলো, সে সময় মানুষ আরো বেশী প্রশান্তি ,তৃপ্তি ও মনোযোগ সহকারে বুঝে কুরআন শরীফ পড়তে পারে৷ ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে ------------অর্থাৎ গভীর চিন্তা -ভাবনা ও মনোনিবেশসহ কুরআন পাঠের জন্য এটা একটা অপেক্ষাকৃত উপযুক্ত সময়৷ (আবু দাউদ)
৯. দিনের বেলার ব্যস্ততার উল্লেখ করার পর "তোমার রবের নাম স্মরণ করতে থাকো" এ নির্দেশ দেয়া থেকে আপনি আপনি একথাটির প্রকাশ পায় যে, দুনিয়াতে হাজারো কাজের মধ্যে ডুবে থেকেও তোমার রবের স্মরণ থেকে গাফেল যেন না হও৷ বরং কোন না কোনভাবে তাকে স্মরণ করতে থাকো৷ (ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কোনাআন সূরা আহযাব ,টীকা ৬৩)
১০. উকীল বলা হয় এমন ব্যক্তিকে যার প্রতি আস্থা রেখে কোন ব্যক্তি নিজের ব্যাপার তার ওপর সোপর্দ করে ৷ উর্দু ভাষাতে প্রায় এ অর্থেই আমরা এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে উকীল শব্দটি ব্যবহার করি আমাদের মামলা-মোকাদ্দমা যার হাতে অর্পণ করে কেউ এতটা নিশ্চিন্ত হয়ে যায় যে,সে তার পক্ষ থেকে ভালভাবেই মামলাটি লড়বে এবং তার নিজের এ মামলা লড়ার কোন দরকার হবে না৷ এ দৃষ্টিকোণ থেকে আয়াতটির অর্থ হলো, দীনের দাওয়াত পেশ করার কারণে তোমার বিরোধিতার যে তুফান সৃষ্টি হয়েছে এবং তোমার ওপর যেসব বিপদ -মুসিবত আসছে সে জন্য তুমি অস্থির বা উৎকণ্ঠিত হয়ো না৷ তোমার প্রভূ তো সেই সত্তা যিনি পূর্ব ও পশ্চিম তথা সমগ্র বিশ্ব জাহানের মালিক ৷ ইলাহী ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব একমাত্র তাঁর ছাড়া আর কারো হাতে নেই৷ তুমি তোমার সমস্ত ব্যাপার তাঁর হাতে সোপর্দ করে দাও এবং নিশ্চিন্ত হয়ে যাও যে,এখন তোমার মোকাদ্দমা তিনি নিজে লড়বেন, তোমার বিরুদ্ধেবাদীদের সাথে তিনিই বুঝাপড়া করবেন এবং তোমার সব কাজ তিনিই সম্পন্ন করবেন৷
১১. "আলাদা হয়ে যাও" কথাটির অর্থ এই নয় যে, তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে ইসলামের তাবলীগের কাজ বন্ধ করে দাও৷ বরং এর অর্থ হলো, তাদের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করো না, তাদের অন্যায় ও অর্থহীন আচরণ উপেক্ষা করে চলো এবং তাদের কোন অভদ্র আচরণের জবাব দিও না৷ তবে তাদের প্রতি এ উপেক্ষা এবং নির্লিপ্ততাও যেন কোন প্রকার ক্ষোভ ,ক্রোধ এবং বিরক্তিসহ না হয়৷ বরং তা যেন এমন উপেক্ষা হয় ,যেমন একজন ভদ্র মানুষ কোন অসভ্য বাউণ্ডেলে বা বখাটে লোকের গালি শুনে যেমন তা উপেক্ষা করে এবং মনকে ভারাক্রান্ত হতে পর্যন্ত দেয় না৷ এ থেকে এরূপ ভুল ধারণা সৃষ্টি হওয়া ঠিক নয় যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কর্মপদ্ধতি বোধ হয় এ থেকেই কিছুটা ভিন্ন ধরনের ছিল ৷তাই আল্লাহ তাঁকে এ আদেশ করেছেন ৷ তিনি মুলত প্রথম থেকেই এ কর্মপদ্ধতি অনুযায়ী কাজ করেছিলেন৷ তবে কুরআনে এ নির্দেশ দেয়ার উদ্দেশ্য হলো কাফেরদের একথা জানিয়ে দেয়া যে, তোমরা যে আচরণ করছো তার জবাব না দেয়ার কারণ দুর্বলতা নয়৷বরং এরূপ আচরণের জবাবে আল্লাহ তাঁর রসূলকে এ ধরনের ভদ্রজনোচিত পন্থা গ্রহণ করার শিক্ষা দিয়েছেন৷
১২. একথা থেকে এ মর্মে স্পষ্ট ইংগিত পাওয়া যায় যে, মক্কায় যেসব লোক রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি মিথ্যা আরোপ করছিল এবং নানাভাবে ধোঁকা দিয়ে এবং নানা রকমের স্বার্থপ্রীতি সংকীর্ণতা ও বিদ্বেষ উস্কে দিয়ে তাঁর বিরোধিতায় নামছিল তারা সবাই ছিল জাতির সচ্ছল ,সম্পদশালী ও বিলাসপ্রিয় মানুষ ৷কারণ ইসলামের এ সংষ্কার আন্দোলনের আঘাত তাদের স্বার্থের ওপর সরাসরি পড়ছিল৷ কুরআন আমাদের বলে যে,এ আচরণ শুধু রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথেই ছিল না বরং যে গোষ্ঠী চিরদিনই সংষ্কার ও সংশোধনের পথ রুদ্ধ করার জন্য জগদ্দল পাথরের মত বাধা সৃষ্টি করে এসেছে৷ উদাহরণ হিসেবে দেখুন, সূরা আল আরাফ, আয়াত ৬০,৬৬,৭৫,৮৮; আল মু"মিনূন, ৩৩; সাবা,৩৪ও ৩৫ এবং আয যুখরুফ,২৩)
১৩. জাহান্নামে পাপী ও অপরাধীদের পায়ে ভারী বেড়ী পরানো হবে৷ তারা যাতে পালাতে না পারে সে জন্য এ বেড়ে পারানো হবে না, বরং তা পারানো হবে এজন্য যে, তারা যেন উঠতে না পারে৷ এ বেড়ি পালিয়ে যাওয়ার রোধ করার জন্য নয় বরং শাস্তি বৃদ্ধি করার জন্য৷
১৪. সে সময় পাহাড়সমূহের বিভিন্ন অংশকে পরষ্পর সংযুক্ত রাখার কেন্দ্রীয় বল নিঃশেষ হয়ে যাবে ৷তাই প্রথমে তা মিহি বালুর স্তুপে পরিণত হবে৷ অতপর ভূমিকম্প গোটা পৃথিবীকে প্রবলভাবে কাঁপিয়ে তুললে বালুর এ স্তুপ বিক্ষিপ্ত হয়ে যাবে এবং গোটা ভুপৃষ্ঠ একটা বিশাল প্রান্তরে রূপান্তরিত হবে৷ এ অবস্থার একটি চিত্র সূরা ত্বা-হার ১০৫ থেকে ১০৭ আয়াত পর্যন্ত এভাবে তুলে ধরা হয়েছেঃ "লোকেরা তোমাকে এসব পাহাড়ের অবস্থা কি হবে সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে৷ তুমি বলো, আমার প্রভু পাহাড়সমূহকে ধুলির মত করে ওড়াবেন এবং ভূপৃষ্ঠকে এমন সমতল বিশাল প্রান্তরে রূপান্তরিত করবেন যে,তুমি সেখানে উঁচু নীচু বা ভাঁজ দেখতে পাবে না৷"
১৫. মক্কার যেসব কাফের রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অস্বীকার করেছিলো এবং তাঁর বিরোধিতায় অতি মাত্রায় তৎপর ছিল এখানে তাদের উদ্দেশ্য কররে বলা হচ্ছে৷
১৬. লোকদের জন্য রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাক্ষী বানিয়ে পাঠানোর একটি অর্থ হলো,তিনি দুনিয়ায় তাদের সামনে নিজের কথা ও কাজের মাধ্যমে সত্যের সাক্ষ পেশ করবেন৷ আরেকটি হলো, আখেরাতে যখন আল্লাহর আদালত কায়েম হবে সে সময় তিনি সাক্ষ দেবেন যে, এসব লোকের কাছে আমি সত্যের আহবান পৌছিয়ে দিয়েছিলাম৷ (আরো ব্যাখ্যার জন্য দেখুন,তাফহীমুল কোরআন সূরা আল বাকারা ,টীকা ১৪৪; আন নিসা,টীকা,৬৪; আন নাহল, আয়াত ৮৪-৮৯; আল আহযাব ,টীকা ৮২; আল ফাত্হ্ টীকা ১৪)
১৭. অর্থাৎ প্রথম তো তোমাদের এ ভয় করা উচিত যে, আমার প্রেরিত রসূলের কথা যদি তোমরা না মানো তাহলে এ একই অপরাধের কারণে ফেরাউন যে দুর্ভাগ্যজনক পরিণাম ভোগ করেছে অনুরূপ পরিণাম দুনিয়াতেই তোমাদের ভোগ করতে হবে৷ আর মনে করো, দুনিয়ায় যদি তোমাদের জন্য কোন আযাবের ব্যবস্থা নাও করা হয় তাহলেও কিয়ামতের আযাব থেকে কিভাবে নিষ্কৃতি পাবে?