(৭২:১) হে নবী ,বল, আমার কাছে অহী পাঠানো হয়েছে যে, জিনদের একটি দল মনোযোগ দিয়ে শুনেছে৷ তারপর (ফিরে গিয়ে নিজ জাতির লোকদেরকে ) বলেছেঃ"আমরা এক বিস্ময়কর "কুরআন"শুনেছি
(৭২:২) যা সত্য ও সঠিক পথের নির্দেশনা দেয় তাই আমরা তার ওপর ঈমান এনেছি এবং আমরা আর কখনো আমাদের রবের সাথে কাউকে শরীক করবো না৷"
(৭২:৩) আর "আমাদের রবের মর্যাদা অতীব সমুচ্চ ৷ তিনি কাউকে স্ত্রী কিংবা সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেননি৷"
(৭২:৪) আর "আমাদের নির্বোধ লোকেরা আল্লাহ সম্পর্কে সত্য ও ন্যায়ের পরিপন্থী অনেক কথাবার্তা বলে আসছে৷"
(৭২:৫) আর "আমরা মনে করেছিলাম যে, মানুষ এবং জিন আল্লাহর সম্বন্ধে কখনো মিথ্যা বলতে পারে না৷"
(৭২:৬) আর "মানুষের মধ্য থেকে কিছু লোক জিনদের কিছু লোকের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতো৷ এভাবে তারা জিনদের অহংকার আরো বাড়িয়ে দিয়েছে৷"
(৭২:৭) আর "তোমরা যেমন ধারণা পোষণ করতে মানুষেরাও ঠিক তেমনি ধারণা পোষণ করেছিল যে, আল্লাহ কাউকে রসূল বানিয়ে পাঠাবেন না৷"
(৭২:৮) আর “আমরা আসমানে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখেছি, তা কঠোর প্রহরী ও উল্কাপিন্ড দ্বারা পরিপুর্ণ ৷”
(৭২:৯) আর "ইতিপূর্বে আমরা ছিঁটেফোটা কিছু আড়ি পেতে শোনার জন্য আসমানে বসার জায়গা পেয়ে যেতাম৷ কিন্তু এখন কেউ গোপনে শোনার চেষ্টা করলে সে তার নিজের বিরুদ্ধে নিক্ষেপের জন্য একটি উল্কা নিয়োজিত দেখতে পায়৷"
(৭২:১০) আর আমাদের বোধগম্য হচ্ছিল না যে, পৃথিবীবাসীদের সাথে কোন খারাপ আচরণ করার সংকল্প করা হয়েছে, নাকি তাদের প্রভু, তাদেরকে সঠিক পথ দেখাতে চান? ১০
(৭২:১১) আর আমাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক লোক আছে নেককার আর কিছু লোক আছে তার চেয়ে নীচু পর্যায়ের৷ এভাবে আমরা বিভিন্ন মতে বিভক্ত ১১ ছিলাম৷
(৭২:১২) আর আমরা মনে করতাম যে, আমরা পৃথিবীতে আল্লাহকে অক্ষম করে দিতে সক্ষম নই এবং পালিয়েও তাঁকে পরাভূত করতে পারবো না৷ ১২
(৭২:১৩) আর আমরা যখন হিদায়াতের বানী শুনলাম তখন তার প্রতি ঈমান আনলাম ৷ যে ব্যক্তিই তার রবের ওপর ঈমান আনবে তার অধিকার বিনষ্ট হওয়ার কিংবা অত্যাচারিত হওয়ার ভয় থাকবে না৷ ১৩
(৭২:১৪) আর আমাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক লোক আছে মুসলমান (আল্লাহর আনুগত্যকারী) আর কিছু সংখ্যক লোক আছে ন্যায় ও সত্য থেকে বিমুখ৷ তবে যারা ইসলাম (আনুগত্যের পথ) গ্রহণ করেছে তারা মুক্তির পথ খুঁজে পেতে সক্ষম হয়েছে৷
(৭২:১৫) আর যারা ন্যায় ও সত্য থেকে বিমুখ তারা হবে জাহান্নামের ইন্ধন৷ ১৪
(৭২:১৬) আর ১৫ (হে বনী, বলে দাও, আমাকে অহীর মাধ্যমে এও জানানো হয়েছে যে,)লোকেরা যদি সঠিক পথের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকতো তাহলে আমি তাদের প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণের মধ্যে সমৃদ্ধ করতাম৷ ১৬
(৭২:১৭) যাতে এ নিয়ামতের মাধ্যমে তাদের পরীক্ষা করতে পারি৷ ১৭ আর যারা তাদের প্রভূর স্মরণ থেকে বিমুখ হবে ১৮ তিনি তাদের কঠিন আযাবে নিক্ষেপ করবেন৷
(৭২:১৮) আর মসজিদসমূহ আল্লাহর জন্য৷ তাই তোমরা আল্লাহর সাথে আর কাউকে ডেকো না ৷ ১৯
(৭২:১৯) আর আল্লাহর বান্দা ২০ যখন তাঁকে ডাকার জন্য দাঁড়ালো তখন তারা সবাই তার ওপর হামলা করতে উদ্যত হলো৷
১. এ থেকে জানা যায় যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে সময় জিনদের দেখতে পাচ্ছিলেন না এবং তারা যে কুরাআন শুনছে একথাও তাঁর জানা ছিল না৷ পরবর্তী সময়ে আল্লাহ তাআলা তাঁকে অহীর মাধ্যমে এ ঘটনা জানিয়ে দিয়েছেন৷ এ ঘটনাটি বর্ণনা প্রসংগে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস স্পস্টভাবে বলেছেন যে, সে সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিনদের উদ্দেশ্যে কুরআন পাঠ করনেনি এবং তিনি তাদের দেখেনওনি৷" (মুসলিম ,তিরমিযী, মুসনাদে আহমাদ, ইবনে জারীর)
২. মূল আয়াতে -------(কুরআনান আজাবান)শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে৷"কুরআন" মানে পড়ার মত জিনিস৷ জিনেরা সম্ভবত শব্দটি এ অর্থেই ব্যবহার করেছিল৷ কারণ তখন তারা প্রথম বারের মত এ বাণীর সাথে পরিচিত হয়েছিল৷ সে সময় হয়তো তাদের জানা ছিল না যে, যে জিনিস তারা শুনছে তার নামই কোরআন৷ ------(আজাবা)আধিক্য অর্থ নির্দেশক একটি শব্দ৷ আরবী ভাষায় শব্দটি ব্যবহৃত হয় অত্যাধিক বিস্ময়কর ব্যাপার বুঝাতে ৷ সুতরাং জিনদের উক্তির অর্থ হলো, আমরা এমন একটি বাণী শুনে এসেছি যা ভাষাগত উৎকর্ষতা ও বিষয়বস্তু অতুলনীয়৷ এ থেকে জানা যায় যে, জিনরা শুধু মানুষের কথা শুনতে পারে তাই নয়, তারা মানুষের ভাষাও ভালভাবে বুঝতে পারে৷ তবে এটা জরুরী নয় যে, সব জিন মানুষের সব ভাষাই জানবে বা বুঝবে৷ সম্ভবত তাদের যে গোষ্ঠি পৃথিবীর যে এলাকায় বসবাস করে তারা সে এলাকার মানুষের ভাষা জানে৷তবে কুরআনের এ বক্তব্য থেকে একথা স্পষ্ট বুঝা যায় যে, ঐ সময় যেসব জিন কুরাআন শুনেছিল তারা আরবী ভাষায় এত দক্ষ ছিল যে, তারা এ বাণীর অতুলনীয় ভাষাগত উৎকর্ষ পর্যন্ত উপলদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছিল এবং এর উচ্চমানের বিষয়বস্তু ও ভালভাবে বুঝতে পেরেছিল৷
৩. এ থেকে কয়েকটা বিষয় জানা গেল৷এক, জিনরা আল্লাহর অস্তিত্ব এবং তাঁর "রব" হওয়াকে অস্বীকার করে না৷ দুই, তাদের মধ্যেও মুশরিক আছে যারা মুশরিক মানুষের মত অন্য জিনিসকে আল্লাহর উলুহিয়াতের মধ্যে শরীক করে৷ তাই জিনদের যে কওমের সদস্যরা কুরাআন মজীদ শোনার পর কওমের কাছে ফিরে গিয়েছিল তারাও ছিল মুশরিক৷ তিন, নবুওয়াত এবংআসমানী কিতাবসমূহ নাযিল হওয়ার ধারা জিনদের মধ্যে প্রচলিত ছিল না৷ বরং তাদের মধ্যে যেসব জিন ঈমান আনে তারা মানুষের মধ্যে প্রেরিত নবী এবং তাদের আনীত কিতাবসমূহের ওপর-ই ঈমান আনে৷ একথাটি সূরা আহকাফের ২৯ -৩১ আয়াত থেকেও জানা যায়৷ ঐ আয়াতগুলোতে বলা হয়েছে , সে সময় যেসব জিন কুরআন শুনেছিল তারা হযরত মূসার অনুসারী ছিল৷ তারা কুরআন শোনার পর নিজের কওমকে এ মর্মে দাওয়াত দিয়েছিল যে, এখন আল্লাহর পক্ষ থেকে যে বানী এসেছে এবং পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহের সত্যতা প্রতিপন্ন করছে তার ওপর ঈমান আনো৷ সূরা আর রহমানও এ বিষয়টিই প্রমাণ করে৷ কারণ তার পুরা বক্তব্যই স্পষ্ট করে দেয় যে, মানুষ ও জিন শুধু এ দুটি সৃষ্টিই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াতের ক্ষেত্রে ছিল৷
৪. এখান থেকে দুটি বিষয় জানা গেল৷ এ জিনগুলো হয় ঈসায়ী বা খৃষ্ট ধর্মের অনুসারী ছিল অথবা অন্য এমন কোন ধর্মের অনুসারী ছিল যে ধর্মে মহান আল্লাহর স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে বলে বিশ্বাস করা হতো ৷ দুটি, সে সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাযের মধ্যে পবিত্র কুরআনের এমন কোন অংশ তিলাওয়াত করছিলেন যা শুনে তাদের কাছে নিজেদের আকীদার ভ্রান্তি ধরা পড়েছিল৷ এবং তারা বুঝতে পেরেছিল যে, মহান আল্লাহর সমুন্নত ও অতি মর্যাদাবান সত্তার সাথে স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে সম্পর্কিতও করা চরম অজ্ঞতা ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ৷
৫. মূল আয়াতে --------(ছাফিহুনা)শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে৷ এ শব্দটি এক ব্যক্তির জন্যও ব্যবহৃত হতে পারে আবার অনেক লোক বা দলের জন্যও ব্যবহৃত হতে পারে৷ যদি শব্দটি একজন অজ্ঞ বা মূর্খ লোক অর্থে গ্রহণ করা হয় তাহলে তার মানে হবে ইবলীস৷ আর যদি অনেক লোক বা দলের অর্থে গ্রহণ করা হয় তাহলে অর্থ হবে জিনদের মধ্য থেকে অনেক নির্বোধ ও বুদ্ধি -বিবেকহীন লোক এ রকম কথা বলতো৷
৬. অর্থাৎ তাদের ভ্রান্ত কথাবার্তা দ্বারা আমাদের বিভ্রান্ত হওয়ার কারণ হলো, আমরা কোন সময় চিন্তাও করতে পারিনি যে, মানুষ কিংবা জিন আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা বলার দুঃসাহসও করতে পারে কিন্তু এখন এ কুরআন শুনে আমরা জানতে পেরেছি যে, প্রকৃত পক্ষে তারা ছিল মিথ্যাবাদী৷
৭. ইবনে আব্বাস বলেনঃ জাহেলী যুগে আরবরা যখন কোন জনহীন প্রান্তরে রাত্রি যাপন করতো তখন উচ্চস্বরে বলতো, "আমরা এ প্রান্তরের অধিপতি জিনের আশ্রয় প্রার্থনা করছি৷"জাহেলী যুগের অন্যান্য বর্ণনাতেও এ বিষয়টির বহুল উল্লেখ দেখা যায়৷ উদাহরণ স্বরূপ , কোন জায়গায় পানি এবং ঘাস ফুরিয়ে গেলে মুরুচারী যাযাবর বেদুঈনরা তাদের একজন লোককে এমন আরেকটি জায়গা খুঁজে বের করতে পাঠাতো যেখানে পানি এবং ঘাস পাওয়া যেতে পারে৷ অতপর উক্ত ব্যক্তির নির্দেশনা মুতাবিক এসব লোক নতুন জায়গায় পৌছলে সেখানে অবস্থান নেয়ার আগে চিৎকার করে বলতোঃ আমরা এ প্রান্তরের মালিকের আশ্রয় প্রার্থনা করছি, যাতে আমরা এখনে সব রকম বিপদ থেকে নিরাপদে থাকতে পারি৷ " তাদের বিশ্বাস ছিল , প্রত্যেক জনমনবহীন জায়গা কোন না কোন জিনের দখলে আছে৷ তার আশ্রয় প্রার্থনা ছাড়াই কেউ যদি সেখানে অবস্থান করে তাহলে সে জিন হয় নিজেই তাদের উত্যক্ত করে কিংবা অন্য জিনদের উত্যক্ত করার জন্য লেলিয়ে দেয়৷ ঈমান আনয়নকারী এ জিনরা এ বিষয়টির প্রতিই ইংগিত করেছে৷ তাদের কথার অর্থ হলো এ পৃথিবীর খলিফা বা প্রতিনিধি মানুষ৷ তারাই যখন উল্টা আমাদের ভয় করতে শুরু করেছে এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে আমাদের আশ্রয় প্রার্থনা করতে শুরু করেছে তখন আমাদের জাতির লোকদের মস্তিষ্ক বিকৃতি আরো বৃদ্ধি পেয়েছে৷ তাদের গর্ব, অহংকার এবং কুফরী ও জুলুম অত্যাচারের মাত্রা অত্যাধিক বেড়ে গিয়েছে এবং গোমরাহীর ক্ষেত্রে তারা আরো বেপরোয়া হয়ে গিয়েছে৷
৮. মূল ভাষ্য হচ্ছে ----------- এ আয়াতাংশের দুটি অর্থ হতে পারে৷ একটি আমরা যা অনুবাদ করেছি৷ অপরটি হলো,"মৃত্যুর পর আল্লাহ তা"আলা কাউকে আর জীবিত করে উঠাবেন না৷" যেহেতু কথাটি ব্যাপক অর্থবোধক তাই তার এ অর্থও গ্রহণ করা যেতে পারে যে মানুষের মত জিনদের মধ্যে একদল আখেরাতকে অস্বীকার করতো৷ কিন্তু পরবর্তী বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্যের দিক থেকে প্রথম অর্থটিই অধিক অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য৷ কারণ, পরবর্তী আয়াতসমূহে এ বিষয়টির ঊল্লেখ আছে যে,ঈমান আনয়নকারী এসব জিন তাদের কওমকে বলছে, আল্লাহ আর কোন রসূল পাঠাবেন না ৷ তোমাদের এ ধারণা ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে৷ আমাদের জন্য আসমানের দারজা বন্ধ করার কারণ হলো আল্লাহ একজন রসল পাঠিয়েছেন৷
৯. এটাই সে কারণ যার ভিত্তিতে জিনরা এ বিষয়টি অনুসন্ধান করতে বেরিয়েছিল যে, পৃথিবীতে এমন কি ঘটনা ঘটেছে বা ঘটতে যাচ্ছে যার খবরাখবর সুরক্ষিত করার জন্য এমন কঠোর ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে এখন আমরা উর্ধ জগতের কোন খবর জানার সুযোগ পাই না এবং যেখানেই যাই আমাদের মেরে তাড়িয়ে দেয়া হয়৷
১০. এ থেকে জানা গেল যে, দুটি পরিস্থিতিতে উর্ধ জগতে এ ধরনের অসাধারণ ব্যবস্থাদি গৃহীত হয়ে থাকে৷এক, আল্লাহ যদি পৃথিবীবাসীদের ওপর কোন আযাব নাযিল করার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন এবং চান যে তা নাযিল হওয়ার আগে জিনরা তার পূর্বাভাবস পেয়ে তাদের মানুষ বন্ধুদের সাবধান করে না দিক৷ দুই, আল্লাহ যদি পৃথিবীতে কোন রসূল পাঠিয়ে থাকেন এবং তাঁর কাছে যেসব হিদায়াত ও বাণী পাঠানো হচ্ছে তাতে শয়তানরা যাতে কোন প্রকার হস্তক্ষেপ করতে না পারে এবং রসূলের কাছে কি কি হিদায়াত বা বানী পাঠানো হচ্ছে তা আগেভাবেই জেনে নিতে না পারে তার নিরাপত্তা ও সংরক্ষণ কাম্য হয় তখন এ ধরনের অসাধারণ ব্যবস্থাটি গ্রহীত হয়৷ সুতরাং জিনদের একথাটির অর্থ হলো, আমরা যখন আসমানে এরূপ কঠোর প্রহরা দেখলাম এবং অজস্র উল্কা বর্ষণ লক্ষ করলাম তখন এ দুটি অবস্থার কোনটি সংঘটিত হচ্ছে আমাদের মধ্যে তা জানার উদ্বেগ সৃষ্টি হলো৷ আল্লাহ তা"আলা কি হঠাৎ করে পৃথিবীর কোন জাতির ওপর আযাব নাযিল করেছেন না কোন এলাকায় কোন রসূল পাঠিয়েছেন? এ বিষয়টি অনুসন্ধানেই আমরা বেরিয়ে পড়েছিলাম৷ এরি এক পর্যায়ে আমরা এ বিস্ময়কর বাণী শুনতে পেলাম যা সত্য ও সঠিক পথের সন্ধান দান করে৷ এভাবে আমরা জানতে পেরেছি, আল্লাহ কোন আযাব নাযিল করেননি৷ বরং তারঁ সৃষ্টি সত্য ও সঠিক পথ দেখানোর জন্য একজন রসূল পাঠিয়েছেন৷ (অধিক ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কোরআন, সূরা আল হিজর, টীকা ৮ থেকে ১২; সূরা সাফ্ফাত , টীকা ৭ এবং সূরা আল মুলক টীকা ১১)
১১. অর্থাৎ আমাদের মধ্যে নৈতিক চরিত্রের দিক থেকেও ভাল ও মন্দ দু"প্রকারের জিন আছে এবং আকীদা -বিশ্বাসের দিক থেকেও মত ও পথ একটি নয়৷ এ ক্ষেত্রেও আমরা বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত৷ একথা বলে ঈমান আনয়নকারী এসব জিন নিজ জাতির জিনদের বুঝাতে চাচ্ছিল যে, নিসন্দেহে আমরা সত্যও সঠিক পথ খুঁজে বের করার মুখাপেক্ষী৷এর প্রয়োজনীয়তা আমরা অস্বীকার করতে পারি না৷
১২. অর্থাৎ আমাদের এ ধারণাই আমাদের মুক্তির পথ দেখিয়েছে৷ আমরা যেহেতু আল্লাহ সম্পর্কে নির্ভয় বা বেপরোয়া ছিলাম না এবং এ ব্যাপারে আমাদের নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল যে, যদি আমরা তাঁর অবাধ্য হই তাহলে তাঁর পাকড়াও থেকে কোন অবস্থায়ই বাঁচতে পারবো না৷ তাই মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত সত্য ও সঠিক পথ প্রদর্শনকারী বাণী শুনে ন্যায় ও সত্যকে জানার পরও অজ্ঞ ও নির্বোধ লোকদের প্রচারিত ও প্রতিষ্ঠিত আকীদা-বিশ্বাসকেই আঁকড়ে থাকার দুঃসাহস আমরা দেখাইনি৷
১৩. অধিকার বিনষ্ট হওয়ার অর্থ হলো, নেক কাজের জন্য যতটা পারিশ্রমিক বা পুরস্কার পাওয়ার কথা তার চাইতে কম দেয়া৷ আর জুলুম বা অত্যাচার হলো নেক কাজের জন্য আদৌ কোন পারিশ্রমিক বা পুরষ্কার না দেয়া এবং তার দ্বারা এ ত্রুটি বা অপরাধ হয়েছে তার তুলনায় অধিক শাস্তি দেয়া, কিংবা অপরাধ ছাড়াই কাউকে শাস্তি দেয়া৷ আল্লাহ তা"আলার দরবারে কোন ঈমানদারের প্রতি এ ধরনের কোন বেইনসাফী হওয়ার আশংকা থাকবে না৷
১৪. কুরআনের ভাষ্য অনুসারে জিনেরা আগুন থেকে সৃষ্ট৷ তাই প্রশ্ন হতে হতে পারে যে, জাহান্নামের আগুন দ্বারা তাদের আবার কি কষ্ট হবে? এর জবাব হলো, কুরআনের ভাষ্য অনুসারে মানুষ ও মাটি থেকে সৃষ্ট৷ তা সত্ত্বেও তাদের মাটির ঢিল ছুঁড়ে মারলে ব্যাথা পায় কেন? প্রকৃত সত্য হলো মানুষের গোটা দেহ মাটির উপাদান দ্বারা তৈরী হলেও এসব উপাদান থেকে যখন একজন রক্ত-মাংসের জীবন্ত মানুষ অস্তিত্ব লাভ করে তখন সে এসব উপাদান থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিসে রূপান্তরিত হয়এবং একই উপাদান থেকে তৈরী অন্যান্য জিনিস তার কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়৷ ঠিক তেমনিভাবে গঠনাকৃতির দিক থেকে জিন যদিও আগুণের তৈরী৷ কিন্তু আগুণ থেকে তৈরী একটি জীবন্ত ও চেতনা সম্পন্ন সৃষ্টি যখন অস্তিত্ব লাভ করে তখন সে আগুনই তার জন্যের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়৷ (অধিক ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমূল কোরআন, সূরা আর রহমান, টীকা ১৫)
১৫. এর পূর্বে জিনদের কথা শেষ হয়ে গিয়েছে৷ এখন এখান থেকে আল্লাহ তা"আলা নিজের কথা শুরু হচ্ছে৷
১৬. একথাটিই সুরা নূহে এভাবে বলা হয়েছে ,"তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলে তিনি তোমাদের ওপর আসমান থেকে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন৷"(ব্যাখ্যার জন্য দেখুন,তাফহীমুল কুরআন, সূরা নূহ ,টীকা ২)প্রচুর পরিমাণ পানিকে নিয়ামতের প্রাচুর্য অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে৷ কেননা, পানির ওপর নির্ভর করেই জনবসতি গড়ে উঠে৷ পানি না থাকলে মৌলিক প্রয়োজন যেমন পূর্ণ হয় না তেমনি মানুষের বিভিন্ন রকম শিল্পও গড়ে উঠতে পারে না৷
১৭. অর্থাৎ তিনি দেখতে চান তারা নিয়ামত লাভ করার পর কৃতজ্ঞ থাকে কিনা এবং আমার দেয়া নিয়ামসমূহ সঠিক ভাবে কাজে লাগায় , না ভ্রান্ত পথে কাজে লাগায়৷
১৮. স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার একটা অর্থ হলো, মানুষ আল্লাহর প্রেরিত উপদেশ গ্রহণ করবে না৷ আরেকটি অর্থ হলো, মানুষ আল্লাহর যিকরের কথা শোনা পছন্দ করবে না৷ এর আরেকটি অর্থ হলো, সে আল্লাহর ইবাদত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে৷
১৯. মুফাস্সিরগণ -----(মাছাজিদ)শব্দটি সাধারণভাবে ইবাদতখানা বা উপসানলায় অর্থে গ্রহণ করেছেনঃ "মাসাজিদ" শব্দটি এ অর্থ গ্রহণ করলে আয়াতটির অর্থ হয় "উপাসনালয় সমূহে আল্লাহর ইবাদতের সাথে সাথে আর কারো ইবাদত যেন করা না হয়৷ হযরত হাসান বাসরী বলেনঃ সমস্ত পৃথিবীটাই ইবাদতখানা বা উপাসনালয়৷ তাই আয়াতটির মূল বক্তব্য হলো আল্লাহর এ পৃথিবীতে কোথাও যেন শিরক করা না হয়৷ তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ বাণী থেকে প্রমাণ পেশ করেছেন -----------------(আমার জন্য সমগ্র পৃথিবীকে ইবাদতের স্থান এবং পবিত্রতা অর্জনের উপায় বানিয়ে দেয়া হয়েছে)৷হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর মসজিদ বলতে যেসব অংগ -প্রত্যংগের সাহায্যে মানুষ সিজদা কর সেগুলো অর্থাৎ হাত,হাঁটু, পা ও কপাল বুঝিয়েছেন৷ এ ব্যাখ্যা অনুসারে আয়াতটির অর্থ হলো, সমস্ত অংগ-প্রত্যংক আল্লাহর তৈরী ৷ এগুলোর সাহায্যে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে সিজদা করা যাবে না৷
২০. এখানে আল্লাহর বান্দা অর্থ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম৷