(৭১:২১) নূহ বললোঃ হে প্রভু,তারা আমার কথা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ঐ সব নেতার অনুসরণ করেছে যারা সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি পেয়ে আরো বেশী ব্যর্থ হয়ে গিয়েছে৷
(৭১:২২) এসব লোক সাংঘাতিক ষড়যন্ত্র -জাল বিস্তার করে রেখেছে৷ ১৬
(৭১:২৩) তারা বলেছে,তোমরা নিজেদের দেব-দেবীদের কোন অবস্থায় পরিত্যাগ করো না৷ আর ওয়াদ, সুওয়া’আ, ইয়াগুস,ইয়াউক,এবং নাসরকেও ১৭ পরিত্যাগ করো না৷
(৭১:২৪) অথচ এসব দেব-দেবী বহু লোককে গোমরাহীতে নিক্ষেপ করেছে৷ তুমিও এসব জালেমদের জন্য গোমরাহী ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করো না৷ ১৮
(৭১:২৫) নিজেদের অপরাধের কারণেই তাদের নিমজ্জিত করা হয়েছিল তারপর আগুনের মধ্যে নিক্ষেপ করা হয়েছিল৷ ১৯ অতপর তারা আল্লাহর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য কোন সাহায্যকারী পায়নি৷ ২০
(৭১:২৬) আর নূহ বললোঃ হে আমার রব, এ কাফেরদের কাউকে পৃথিবীর বুকে বসবাসের জন্য রেখো না৷
(৭১:২৭) তুমি যদি এদের ছেড়ে দাও তাহলে এরা তোমার বান্দাদের বিভ্রান্ত করবে এবং এদের বংশে যারাই জন্মলাভ করবে তারাই হবে দুষ্কৃতকারী ও কাফের৷
(৭১:২৮) হে আমার রব, আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে,যারা মু"মিন হিসেবে আমার ঘরে প্রবেশ করেছে তাদেরকে এবং সব মু"মিন নারী-পুরুষকে ক্ষমা করে দাও৷ জালেমদের জন্য ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করো না৷
১৬. ষড়যন্ত্রের অর্থ হলো জাতির লোকদের সাথে নেতাদের ধোঁকাবাজি ও প্রতারণা৷ নেতারা জাতির লোকদের হযরত নূহ আলাইহিস সালামের শিক্ষার বিরুদ্ধে বিভ্রান্ত ও প্রতারিত করার চেষ্টা করতো৷ যেমন, তারা বলতোঃ "নুহ তো তোমাদের মতই একজন মানুষ৷ আল্লাহর কাছ থেকে তার কাছে অহী এসেছে তা কি করে মেনে নেয়া যায়?" (সূরা আ"রাফ ৬৩; হূদ-২৭) "আমাদের নিম্ন শ্রেনীর লোকেরা না বুঝে শুনে নূহের আনুগত্য করছে৷ তার কথা যদি সত্যিই মূল্যবান হতো তাহলে জাতির নেতা ও জ্ঞানী -গুনী ব্যক্তিবর্গ তার প্রতি বিশ্বাস পোষণ করতো৷" (হূদ -২৭) "আল্লাহ যদি পাঠাতেই চাইতেন তাহলে কোন ফেরেশতা পাঠাতেন৷" (আল মু"মিনূন, ২৪) এ ব্যক্তি যদি আল্লাহর প্রেরিত রসূল হতেন, তাহলে তাঁর কাছে সবকিছুর ভাণ্ডার থাকতো , তিনি অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে জানতেন এবং ফেরেশতাদের মত সব রকম মানবীয় প্রয়োজন ও অভাব থেকে মুক্ত হতেন৷(সূরা হূদ, ৩১) নূহ এবং তার অনুসারীদের এমন কি অলৌকিকত্ব আছে যার জন্য তাদের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে নিতে হবে? (হূদ,২৭) এ ব্যক্তি আসলে তোমাদের মধ্যে তার নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে চায়৷ (আল মু"মিনূন,২৫) প্রায় এ রকম কথা বলেই কুরাইশ নেতারা লোকদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে বিভ্রান্ত করতো৷
১৭. নূহের কওমের উপাস্যদের দেবীদের মধ্য থেকে এখানে সেসব দেব-দেবীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে পরবর্তীকালে মক্কাবাসীরা যাদের পূজা করতে শুরু করেছিল এবং ইসলামের প্রাথমিক যুগে আরবের বিভিন্ন স্থানে তাদের মন্দির ও বর্তমান ছিল৷ এটা অসম্ভব নয় যে, মহা প্লাবনে যেসব লোক রক্ষা পেয়েছিল পরবর্তী বংশধরগণ তাদের মুখ থেকে নূহের (আ) জাতির প্রাচীন উপাস্য দেব-দেবীদের নাম শুনেছিল এবং পরে তাদের বংশধরদের নতুন করে জাহেলিয়াত ছড়িয়ে পড়লে তারা সেসব -দেব-দেবীর প্রতিমা তৈরী করে তাদের পূজা অর্চন শুরু করেছিল৷

"ওয়াদ্দ" ছিল "কুদা"আ" গোত্রের "বনী কালব ইবনে দবরা" শাখার উপাস্য দেবতা৷ "দামাতুল জানদাল" নামক স্থানে তারা এর বেদী নির্মাণ করে রেখেছিল৷ আরবের প্রাচীন শিলা লিপিতে তার নাম "ওয়াদ্দম আবাম"(ওয়াদ্দ বাপু) উল্লেখিত আছে৷ কালবীর মতে তার মূর্তি ছিল এক বিশালদেহী পুরুষের আকৃতিতে নির্মিত৷ কুরাইশরাও তাকে উপাস্য দেবতা হিসেবে মানতো৷ তাদের কাছে এর নাম ছিল "উদ্দ"৷ তার নামা অনুসারে ইতিহাসে "আবদে উদ্দ" নামে এক ব্যক্তির উল্লেখ দেখা যায়৷

"সুওয়া" ছিল হুযাইল গোত্রের দেবী৷ তার মুর্তি ছিল নারীর আকৃতিতে তৈরী৷ ইয়াম্বুর সন্নিকটেস্থ "রুহাত" নামক স্থানে তার মন্দির ছিল৷

"ইয়াগুস" ছিল "তায়" গোত্রের "আনউম" শাখায় এবং "মাযহিজ" গোত্রের কোন কোন শাখার উপাস্য দেবতা৷ "মাযহিজে"র শাখা গোত্রের লোকেরা ইয়ামান ও হিজাযের মধ্যবর্তী "জুরাশ" নামক স্থানে তার সিংহাকৃতির মূর্তি স্থাপন করে রেখেছিল৷ কুরাইশ গোত্রেরাও কোন কোন লোকের নাম আবদে ইয়াগুস ছিল বলে দেখা যায়৷

"ইয়াউক" ইয়ামানের হামদান অঞ্চলের অধিবাসী হামদান গোত্রের "খাওয়ান" শাখার উপাস্য দেবতা ছিল এর মূর্তি ছিল ঘোড়ার আকৃতির৷

"নাসর" ছিল হিমইয়ার অঞ্চলের হিমইয়র গোত্রের "আলে যুল-কুলা শাখার দেবতা৷ বালখা" নামক স্থানে তার মূর্তি ছিল৷ এ মূর্তির আকৃতি ছিল শকুনের মত৷ সাবার প্রাচীন শিলালিপিতে এর নাম উল্লেখিত হয়েছে "নাসূর"৷ এর মন্দিরকে লোকেরা "বায়তে নাসূর" বা নাসূরের ঘর এবং এর পূজারীদের "আহলে নাসূর " বা নাসূরের পূজারী বলতো৷ প্রাচীন মন্দিরসমূহের যে ধ্বংসাবশেষ আরব এবং তার সন্নিহিত অঞ্চলসমূহে পাওয়া যায় সেসব মন্দিরের অনেকগুলোর দরজায় শকুনের চিত্র খোদিত দেখা যায়৷
১৮. এ সূরার ভূমিকাতেই আমরা এ বিষয়টি উল্লেখ করেছি যে, হযরত নূহ আলাইহিস সালামের এ বদদোয়া কোন প্রকার ধৈর্যহীনতার কারণ ছিল না৷ বরং এ বদদোয়া তাঁর মুখ থেকে তখনই উচ্চারিত হয়েছিল যখন তাবলীগ ও দাওয়াতের ক্ষেত্রে শত শত বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর তিনি তাঁর জাতির ব্যাপারে পুরোপুরি নিরাশ হয়েছিলেন৷ হযরত মূসাও এরূপ পরিস্থিতিতেই ফেরাউন ও ফেরাউনের কওমের জন্য এ বলে বদদোয়া করেছিলেনঃ "হে প্রভূ! তুমি এদের অর্থ -সম্পদ ধ্বংস করে দাও এবং তাদের দিলের ওপর মোহর লাগিয়ে দাও, এরা কঠিন আযাব না দেখা পর্যন্ত ঈমান আনবে না৷" তার জবাবে আল্লাহ তা"আলা বলেছিলেনঃ তোমার দোয়া কবুল করা হয়েছে৷ (ইউনূস, আয়াত ৮৮-৮৯) হযরত মূসা আলাইহিস সালামের বদদোয়ার মত নূহ আলাইহিস সালামের এ বদদোয়াও ছিল আল্লাহর ইচ্ছার প্রতিধ্বনি৷ তাই সূরা হূদে আল্লাহ তা"আলা বলেছেনঃ

--------------------------

"আর অহী পাঠিয়ে নূহকে জানিয়ে দেয়া হলো, এ পর্যন্ত তোমার কওমের যেসব লোক ঈমান এনেছে এখন তারা ছাড়া আর কেউ ঈমান আনবে না৷ তাদের কৃতকর্মের জন্য আর দুঃখ করো না৷" (হূদ ,৩৬)
১৯. অর্থাৎ নিমজ্জিত হওয়াতেই তাদের ব্যাপারটি চূড়ান্ত ভাবে শেষ হয়ে যায়নি৷ বরং ধ্বংস হওয়ার পরপরই তাদের রূহসমূহে আগুণে কঠিন শাস্তির মধ্যে নিক্ষেপ করা হয়েছে৷ এ আচরণের সাথে ফেরাউন ও তার জাতির সাথে কৃত আচরণের হুবহু মিল রয়েছে৷ এ বিষয়টিই সূরা আল মু"মিনের ৪৫ও ৪৬ আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে৷ (ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহিমূল কোরআন, সূরা আল মু"মিন, টীকা-৬৩) যেসব আয়াত দ্বারা মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের আযাব বা কবরের আযাব প্রমাণিত হয় এ আয়াতটি তারই একটি৷
২০. অর্থাৎ তারা যেসব দেব-দেবীকে সাহায্যকারী মনে করতো সেসব দেব-দেবীর কেউ-ই তাদের রক্ষা করতে আসেনি৷ এটা যেন মক্কাবাসীদের জন্য এ মর্মে সতর্কবাণী যে, তোমরাও যদি আল্লাহর আযাবে পাকড়াও হও তা হলে যেসব দেব-দেবীর ওপর তোমরা ভরসা করে আছ তারা তোমাদের কোন কাজেই আসবে না৷