(৭০:১) এক প্রার্থনাকারী আযাব প্রার্থনা করেছে
(৭০:২) যে আযাব কাফেরের জন্য অবধারিত৷ তা প্রতিরোধ করার কেউ নেই৷
(৭০:৩) আল্লাহর পক্ষ থেকে, যিনি উর্ধারোহণের সোপনসমূহের অধিকারী
(৭০:৪) ফেরেশতারা এবং রূহ তার দিকে উঠে যায় এমন এক দিনে যা পঞ্চাম হাজার বছরের সমান৷
(৭০:৫) অতএব , হে নবী, তুমি উত্তম ধৈর্য ধারণ করো৷
(৭০:৬) তারা সেটিকে অনেক দূরে মনে করেছে৷
(৭০:৭) কিন্তু আমি দেখছি তা নিকটে৷
(৭০:৮) (যেদিন সেই আযাব আসবে)সেদিন আসমান গলিত রূপার মত বর্ণ ধারণ করবো৷
(৭০:৯) আর পাহাড়সমূহ রংবেরং -এর ধুনিত পশমের মত হয়ে যাবে৷ ১০
(৭০:১০) কোন পরম বন্ধুও বন্ধুকে জিজ্ঞেস করবে না৷
(৭০:১১) অথচ তাদেরকে পরষ্পরে দৃষ্টি সীমার মধ্যে রাখা হবে৷ ১১ অপরাধী সেদিনের আযাব থেকে মুক্তির বিনিময়ে তার সন্তান-সন্ততিকে,
(৭০:১২) স্ত্রীকে, ভাইকে, এবং
(৭০:১৩) তাকে আশ্রয়দানকারী জ্ঞাতি-গোষ্ঠীর আপনজনকে
(৭০:১৪) এমনকি,পৃথিবীর সবকিছুই দিতে চাইবে৷
(৭০:১৫) কখনো নয়, তা তো হবে জলন্ত আগুনের লেলেহিন শিখা
(৭০:১৬) যা শরীরের গোশত ও চামড়া ঝলসিয়ে নিঃশেষ করে দেবে৷
(৭০:১৭) তাদেরকে সে অগ্নিশিখা উচ্চ স্বরে নিজের কাছে ডাকবে, যারা সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, পৃষ্ঠা প্রদর্শন করেছিল
(৭০:১৮) আর সম্পদ জমা করে ডিমে তা দেয়ার মত করে আগলে রেখেছিল ১২
(৭০:১৯) মানুষকে ছোট মনের অধিকারী করে সৃষ্টি করা হয়েছে৷ ১৩
(৭০:২০) বিপদ -মুসিবতে পড়লেই সে ঘাবড়ে যায়,
(৭০:২১) আর যে -ই সচ্ছলতার মুখ দেখে অমনি সে কৃপণতা করতে শুরু করে৷
(৭০:২২) তবে যারা নামায পড়ে ১৪ (তারা এ দোষ থেকে মুক্ত) ৷
(৭০:২৩) যারা নামায আদায়ের ব্যাপারে সবসময় নিষ্ঠাবান৷ ১৫
(৭০:২৪) যাদের সম্পদে নির্দিষ্ট হক আছে
(৭০:২৫) প্রার্থী ও বঞ্চিতদের ৷ ১৬
(৭০:২৬) যারা প্রতিফলের দিনটিকে সত্য বলে মানে৷ ১৭
(৭০:২৭) যারা তাদের প্রভুর আযাবকে ভয় করে৷ ১৮
(৭০:২৮) কারণ তাদের প্রভুর আযাব এমন বস্তু নয় যে সম্পর্কে নির্ভয় থাকা যায়৷
(৭০:২৯) যারা নিজেদের লজ্জাস্থান নিজের স্ত্রী অথবা মালিকানাধীন স্ত্রীলোকদের ছাড়া অন্যদের থেকে হিফাযত করে৷ ১৯
(৭০:৩০) স্ত্রী ও মালিকানাধীন স্ত্রীলোকদের ক্ষেত্রে তারা তিরষ্কৃত হবে না৷
(৭০:৩১) তবে যারা এর বাইরে আর কেউকে চাইবে তারা সীমালংঘনকারী ৷ ২০
(৭০:৩২) যারা আমনত রক্ষা করে ও প্রতিশ্রুতি পালন করে ৷ ২১
(৭০:৩৩) আর যারা সাক্ষ দানের ক্ষেত্রে সততার ওপর অটল থাকে৷ ২২
(৭০:৩৪) যারা নামাযের হিফাযত করে৷ ২৩
(৭০:৩৫) এসব লোক সম্মানের সাথে জান্নাতের বাগানসমূহে অবস্থান করবে৷
১. মূল আয়াতে ব্যবহৃত শব্দ হলো----- (ছায়ালা ছাইলুন)৷ কোন কোন মুফাস্সির এখানে ছায়ালা -------শব্দটিকে জিজ্ঞেস করা অর্থে গ্রহণ করেছেন৷ তাদের মতে আয়াতের অর্থ হলো একজন জিজ্ঞেসকারী জানতে চেয়েছে যে, তাদেরকে যে আযাব সম্পর্কে অবহিত করা হচ্ছে তা কার ওপর আপতিত হবে? আল্লাহ তাআলা এ প্রশ্নের জওয়াব দিয়েছেন এই বলে যে, তা কাফেরদের ওপর পতিত হবেই৷ তবে অধিকাংশ মুফাস্সির এ ক্ষেত্রে চাওয়াকে দাবী করা অর্থ গ্রহণ করেছেন৷ নাসায়ী এবং আরো কিছু সংখ্যক মুহাদ্দিস ইবনে আব্বাস থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন৷ মুহাদ্দিস হাকেম এটিকে সহীহ হাদীস বলে উল্লেখ করেছেন৷ হাদীসটি হলো নাদর ইবনে হারেস ইবনে কালাদা বলেছিলঃ

----------------------

"হে আল্লাহ,এটি যদি সত্যিই তোমার পক্ষ থেকে আসা একটা সত্য বাণী হয়ে থাকে, তাহলে আসমান থেকে আমাদের ওপর পাথর বর্ষণ করো অথবা আমাদেরকে ভীষণ কষ্টদায়ক শাস্তি দাও৷"

এটি ছাড়াও কুরআন মজীদের আরো অনেক স্থানে মক্কার কাফেরদের এ চ্যালেঞ্জেরএ উল্লেখ করা হয়েছে যে, তুমি আমাদের যে আযাবের ভয় দেখাচ্ছো তা নিয়ে আসছো না কেন? উদাহরণ স্বরূপ নীচে উল্লেখিত স্থানসমূহ দেখুন৷ সূরা ইউনুস, আয়াত ৪৬ থকে ৪৮; সূরা আম্বিয়া, আয়াত ৩৬ থেকে ৪১; সূরা আন নামল আয়াত ৬৭ থেকে ৭২; সূরা সাবা আয়াত ২৬ থেকে ৩০; ইয়াসীন, আয়াত, ৪৫থেকে ৫২ এবং সূরা মূলক ২৪ থেকে ২৭৷
২. মূল ইবারতে-------- (জিলমা"আরিজি) শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে৷ মি"রাজ শব্দের বহুবচন হলো------- মা"আরিজ৷ এর অর্থ হলো ধাপ বা সিড়ি, অথবা এমন জিনিস যারা সাহায্যে ওপরে ওঠা যায়৷ আল্লাহ তা"আলাকে --------মা"আরিজ এর অধিকারী বলার মানে হলো তাঁর সত্তা অনেক উচ্চ ও সমুন্নত৷ তার দরবারে পৌছার জন্য ফেরেশতাদের একের পর এক ওপর দিকে উঠতে হয়৷ পরবর্তী আয়াতে এ বিষয়টিই বলা হয়েছে৷
৩. রূহ অর্থ জিবরাঈল আলাইহি সালাম৷ অন্য সব ফেরেশতাদের থেকে আলাদাভাবে জিবরাঈলকে উল্লেখ তাঁর বিশেষ মর্যাদা প্রকাশ করে৷ সূরা শূ"আরায় বলা হয়েছে, ---------(রূহুল আমীন এ কুরআন নিয়ে তোমার দিলের মধ্যে নাযিল হয়েছে)৷ সূরা বাকারায় বলা হয়েছে, -----------------------------
৪. এ পুরো বিবরণটি "মুতাশাবিহাতের" অন্তরভুক্ত৷ এর কোন নির্দিষ্ট অর্থ করা যায় না৷ আমরা ফেরেশতার সঠিক তাৎপর্য কি তা জানিনা৷ আমরা তাদের উর্ধারোহণের সঠিক রূপও জানি না৷ যে ধাপগুলো পেরিয়ে ফেরেশতারা ওপরে ওঠেন তা কেমন তাও আমরা জানি না৷ মহান আল্লাহ সম্পর্কে ও এ ধারণ করা যায় না যে, তিনি কোন বিশেষ স্থানে অবস্থান করেন৷ কারণ তাঁর মহান সত্তা স্থান ও কালের গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়৷
৫. সূরা হজ্জের ৪৭ আয়াতে বলা হয়েছেঃ এসব লোক এ মুহূর্তেই আযাব নিয়ে আসার জন্য তোমার কাছে দাবী করেছে৷ আল্লাহ কখনো তাঁর প্রতিশ্রুতি ভংগ করবেন না৷ তবে তোমরা রবের হিসেবের একদিন তোমাদের হিসেবের হাজার হাজার বছরের সমান হয়ে থাকে৷ সূরা আস সাজদার ৫ আয়াতে বলা হয়েছেঃ "তিনি আসমান থেকে যমীন পর্যন্ত গোটাবিশ্ব -জাহানের সব বিষয় পরিচালন করেন৷ এরপর (তার রিপোর্ট) এমন একটি দিনে তার কাছে পৌছে যা তোমাদের গণনার এ হাজার বছরের সমান৷" আর এখানে আযাব দাবী করার জবাবে বলা হচ্ছে যে, আল্লাহ তা"আলার একদিন পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান৷ এরপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে যারা বিদ্রুপ করে আযাব দাবী করেছে তাদের এসব কথায় ধৈর্য ধারণ করুন৷ তারপর বলা হচ্ছে, এসব লোক আযাবকে দূরে মনে করছে৷ কিন্তু আমি দেখছি তা অত্যাসন্ন ৷ এসব বক্তব্যের প্রতি সামগ্রিকভাবে দৃষ্টিপাত করলে এ বিষয়টি ষ্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, মানুষ তার মন-মানসিকতা, চিন্তা ও দৃষ্টির পরিসর সংকীর্ণ হওয়ার কারণে আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত বিষয়াবলিকে নিজেদের সময়ের মান অনুযায়ী পরিমাপ করে থাকে৷ তাই একশো বছর বা পঞ্চাশ বছর সময়ও তাদের কাছে অত্যন্ত দীর্ঘ সময় বলে মনে হয়৷ কিন্তু আল্লাহর এক একটি পরিকল্পনা হাজার হাজার বছর বা লাখ লাখ বছর মেয়াদের হয়ে থাকে৷এ সময়টিও বলা হয়েছে উদাহরণ হিসেবে৷ প্রকৃতপক্ষে মহা বিশ্ব ভিত্তিক পরিকল্পনা লক্ষ লক্ষ ও শত শত কোটি বছর মেয়াদেও হয়ে থাকে৷ এসব পরিকল্পনার মধ্য থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনার অধীনে এ পৃথীবীতে মানব জাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে৷ এরপর একটা নির্দিষ্ট সময় দেয়া হয়েছে৷ সে অনুযায়ী তাদেরকে এখানে একটি বিশেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কাজ করার অবকাশ দেয়া হবে৷ কোন মানুষই জানে না এ পরিকষ্পনা কখন শুরু হয়েছে, তা কার্যকরী করার জন্য কি পরিমাণ সময় নির্দিষ্ট করা হয়েছে, তার পরিসমাপ্তির জন্য কোন মুহুর্তটি নির্ধারিত করা হয়েছে যে, মুহুর্তটিতে কিয়ামত সংঘটিত হবে এবং সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে কিয়ামত পর্যন্ত জন্মলাভকারী সমস্ত মানুষকে এক সাথে জীবিত করে উঠিয়ে বিচার করার জন্য কোন সময়টি ঠিক করে রাখা হয়েছে৷ আমরা এ মহা পরিকল্পনার ততটুকুই কেবল জানি যতটুকু আমাদের চোখের সামনে সংঘটিত হচ্ছে অথবা অতীত মহাকালে সংঘটিত ঘটনাবলীর যে আংশিক ইতিহাসটুকু আমাদের সামনে বিদ্যমান আছে৷ এর সূচনা ও পরিণতি সম্পর্কে বলতে গেলে বলতে হয় ,সে সম্পর্কে জানা তো দূরের কথা তা বুঝাও তো কোন প্রশ্নেই ওঠে না৷ এখন কথা হলো, যেসব লোক দাবী করছে যে, এ পরিকল্পনা বাদ দিয়ে তার পরিনাম এখনই তাদের সামনে এনে হাজির করা হোক৷ আর যদি তা না করা হয় তাহলে পরিণাম সম্পর্কে যা বলা হচ্ছে সেটিই মিথ্যা, তারা আসলে নিজেদের অজ্ঞতাই প্রমাণ করেছে৷ (আরো ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাহফীমুল কুরআন, সূরা আল হজ্ব, টীকা৯২-৯৩ এবং আস সাজদা, টীকা ৯)
৬. অর্থাৎ এমন ধৈর্য যা একজন মহত উদার ও সাহসী মানুষের মর্যাদার উপযোগী৷
৭. এর দু"টি অর্থ হতে পারে৷এক, তারা এ ব্যাপারটিকে অসম্ভব মনে করে ৷অথচ আমাদের কাছে তা অত্যসন্ন৷ দ্বিতীয় অর্থ এও হতে পারে যে, তারা কিয়ামতের অনেক দূরের ব্যাপার বলে মনে করে৷ কিন্তু আমাদের দৃষ্টিতে তা এত কাছের যেন আগামীকালই সংঘটিত হবে৷
৮. একদল মুফাস্সির এ আয়াতাংশকে ----------------আয়াতাংশের সাথে সম্পৃক্ত বলে ধরে নিয়েছেন৷ তারা বলেনঃ যে দিনটির স্থায়িত্ব পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান বলা হয়েছে সেটি কিয়ামতের দিন ৷ মুসনাদে আহমাদ ও তাফসীরে ইবনে জারীরে হযরত আবু সায়িদ খুদরী থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, এ আয়াতটি সম্পর্কে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলা হলো, তাহলে তো সেদিনটি খুবই দীর্ঘায়িত হবে৷ একথা শুনে তিনি বললেনঃ "যার হাতে আমার প্রাণ সেই মহান সত্তার শপথ একটি ফরয নামায পড়তে দুনিয়াতে যতটুকু সময় লাগে একজন ঈমানদারের জন্য সেদিনটি তার চাইতেও সংক্ষিপ্ত হবে৷" এটি সহীহ সনদে বর্ণিত রেওয়াতের হলে এটি ছাড়া এ আয়াতের অন্য কোন ব্যাখ্যা করার অবকাশই থাকতো না৷ হাদীসটির সনদে উল্লেখিত বর্ণনাকারী দাররাজ এবং তার উস্তাদ আবুল হাইসাম উভয়েই যয়ীফ৷
৯. অর্থাৎ বার বার রং পরিবর্তন হবে৷
১০. পাহাড়সমূহের রং যেহেতু ভিন্ন ভিন্ন তাই তখন তা স্থানচ্যুত ওজনহীন হয়ে উড়তে থাকবে তখন মনে হবে যেন রংবেরংয়ের ধুনিত পশম বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে৷
১১. অর্থাৎ তারা একজন আরেকজনকে দেখতে পাবে না বলে বিজ্ঞেস করবে না তা নয়৷ বরং অন্যের ব্যাপারে যা ঘটেছে তা প্রত্যেকেই নিজ চোখে দেখতে পাবে৷ কিন্তু তা সত্ত্বেও সে তাকে জিজ্ঞেস করবে না৷ কেননা, সে তখন নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকবে৷
১২. এ স্থানে ও আখেরাতের মানুষের মন্দ পরিণামের দু"টি কারণ বলা হয়েছে যা সূরা আল হাক্কার ৩৩ও ৩৪ আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে৷ একটি হলো হক থেকে ফিরে যাওয়া এবং ঈমান আনয়নের অস্বীকৃতি ৷ অপরটি হলো দুনিয়া পূজা ও কৃপণতা৷ এ কারণেই মানুষ সম্পদ জমা করে এবং কোন কল্যাণকর কাজের জন্য তা খরচ করে না৷
১৩. যে বিষয়টিকে আমরা আমাদের ভাষায় এভাবে বলে থাকি,"এটি মানুষের প্রকৃতিগত অথবা এটা তার সহজাত দুর্বলতা" সে বিষয়টিকে আল্লাহ এভাবে বর্ণনা করেন যে,"মানুষকে সৃস্টিই করা হয়েছে এভাবে"৷ এ ক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার যে, কুরআন মজীদের বহু জায়গায় মানব জাতির সাধারণ নৈতিক দুর্বলতা উল্লেখ করার পর ঈমান ও সত্যের পথ অনুসরণকারীদের তা থেকে ব্যতিক্রম বলে উল্লেখ করা হয়েছে৷ পরবর্তী আয়াতে এ বিষয়টিই বর্ণনা করা হয়েছে৷ এভাবে এ সত্যটি আপনা থেকেই ষ্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, মানুষের জন্মগত এসব দুর্বলতা অপরিবর্তনীয় নয়৷ বরং আল্লাহর দেয়া হিদায়াত গ্রহণ করে মানুষ যদি আত্মশুদ্ধির জন্য সত্যিকার প্রচেষ্টা চালায় তাহলে সে এসব দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারে৷ পক্ষান্তরে যদি সে তার প্রবৃত্তিকে লাগামহীনভাবে ছেড়ে দেয় তাহলে দুর্বলতাগুলো তার মধ্যে দৃঢ়মূল হয়ে যায়৷ (আরো ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, সূরা আম্বিয়া ,টীকা ৪১;সূরা আয যুমার, টীকা ২৩ থেকে ২৮ এবং সূরা আশ শূরা, টীকা ৭৫)
১৪. কোন ব্যক্তির নামায পড়ার অপরিহার্য অর্থ হলো সে আল্লাহ, রসূল কিতাব ও আখেরাতের ওপর বিশ্বাস এবং সাথে সাথে নিজের ও বিশ্বাস অনুযায়ী কাজ করার প্রচেষ্টা ও চালিয়ে যায়৷
১৫. অর্থাৎ কোন প্রকার অলসতা, আরামপ্রিয়তা, ব্যস্ততা, কিংবা আকর্ষণ তাদের নামাযের ক্ষেত্রে নিয়মানুবর্তিতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না৷ নামাযের সময় হলে সে সবকিছু ফেলে রেখে তার প্রভুর ইবাদতের জন্য প্রস্তুত হয়৷----------- এর আর একটি অর্থ বর্ণনা করেছেন হযরত উকবা ইবনে আমের৷ তাহলো, সে পূর্ণ প্রশান্তি এবং বিনয় ও নিষ্ঠাসহ নামায পড়ে, কাকের মত ঠোকর মারে না৷ ঠোকর মেরেই কোন রকমে নামায শেষ করার চেষ্টা করে না৷ আবার নামাযের মধ্যে এদিক সেদিক তাকিয়েও দেখেনা৷ প্রচলিত আরবী বাকরীতিতে বদ্ধ বা স্থির পানিকে -----মায়ে দায়েম বলা হয়৷ এরই আলোকে এ ব্যাখ্যা গ্রহণ করা হয়েছে৷
১৬. সূরা যারিয়াতের ১৯ আয়াতে বলা হয়েছে, "তাদের সম্পদে প্রার্থী এবং বঞ্চিতদের নির্দিষ্ট হকে আছে৷" কেউ কেউ এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট হকের অর্থ মনে করেছেন ফরয যাকাত৷ কারণ ফরয যাকাতেই নেসাব ও হার দুটিই নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে৷ কিন্তু এ ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয়৷ কারণ, সূরা মা"আরিজ সর্বসম্মত মতে মক্কায় অবতীর্ণ সূরা৷ কিন্তু নেসাব ও হার নির্দিষ্ট করে যাকাত ফরয হয়েছে মদীনায়৷ অতএব হকের সঠিক অর্থ হলো, প্রার্থী ও বঞ্চিতদের জন্য তারা নিজেরাই নিজেদের সম্পদে একটা অংশ নির্দিষ্ট করে রেখেছে৷ এটাকে তাদের হক মনে করে তারা নিজেরাই তা দিয়ে দেয়৷ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস , হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর, মুজাহিদ, শা"বী এবং ইবরাহীম নাখয়ী এ অর্থই বর্ণনা করেছেন৷ প্রার্থী মানে পেশাদার ভিক্ষুক নয়, বরং যেসব অভাবী মানুষ অন্যের সাহায্যপ্রার্থী তারা৷ আর বঞ্চিত অর্থ এমন লোক যার কোন আয়-উপার্জন নেই৷ অথবা সে উপার্জনের জন্যে চেষ্টা করে ঠিকই কিন্তু তাতে তার প্রয়োজন পূরণ হয় না৷ অথবা কোন দুর্ঘটনা বা দুর্যোগের শিকার হয়ে অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়েছে অথবা আয় -উপর্জনের সামর্থই নেই ৷এ ধরনের লোকদের ব্যাপারে যখনই জানা যাবে যে, তারা প্রকৃতই বঞ্চিত তখন একজন আল্লাহভীরু মানুষ এ জন্য অপেক্ষা করে না যে, সে তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুক৷ বরং তার বঞ্চিত থাকার কথা জানা মাত্র সে নিজেই অগ্রসর হয়ে তাকে সাহায্য করে৷ (আরো জানার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কোরআন, সূরা যারিয়াত,টীকা ১৭)
১৭. অর্থাৎ দুনিয়াতে নিজেকে দায়িত্বহীন এবং জবাবদিহি থেকে মুক্ত মনে করে না৷ বরং এ ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করে যে, একদিন আল্লাহর সামনে হাজির হয়ে তাদেরকে নিজেদের সব কাজের সব হিসেব দিতে হবে৷
১৮. অন্য কথায় তাদের অবস্থা কাফেরদের মত নয়৷ কাফেররা দুনিয়াতে সব রকম গোনাহ, অপরাধ ও জুলুম -অত্যাচারে লিপ্ত থেকেও আল্লাহকে ভয় করে না৷ কিন্তু তারা নিজস্বভাবে যথাসম্ভব নৈতিকতা ও কাজ-কর্মে সদাচরণ করা সত্ত্বেও সবসময় আল্লাহর ভয়ে ভীত থাকে৷ সবসময় তারা এ আশংকা করে যে, আল্লাহর আদালতে আমাদের ক্রুটি-বিচ্যুতি আমাদের নেক কাজের তুলানায় অধিক বলে প্রমাণিত না হয় এবং এভাবে আমরা শাস্তির উপযুক্ত বলে প্রমাণিত না হই৷ (আরো ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহিমূল কোরআন, সূরা আল মু"মিনূন টীকা ৫৪ এবং সূরা আয যারিয়াত,টীকা ১৯)
১৯. লজ্জাস্থানের হিফাজতের অর্থ ব্যভিচার না করা এবং উলঙ্গপনা থেকেও দূরে থাকা৷ (ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহিমূল কোরআন , সূরা আল মু"মিনূন টীকা ৬; আন নূর, টীকা ৩০-৩২ এবং আল আহযাব, টীকা ৬২)৷
২০. ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহিমূল কোরআন, সূরা আল -মু"মিনূন, টীকা-৭৷
২১. আমানতসমূহ বলতে এমন সব আমানত বুঝায়, যা আল্লাহ তা"আলা বান্দার হাতে সোপর্দ করেছেন৷ এবং একজন মানুষ অন্য একজন মানুষের ওপর আস্থা স্থাপন করে "আমানত" হিসেবে অর্পণ করে৷ ঠিক তেমনি চুক্তি বা প্রতিশ্রুতি মানে বান্দা আল্লাহর সাথে যে চুক্তি বা প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হয় এবং মানুষ পরষ্পরের সাথে যেসব চুক্তি ও প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হয় ও উভয় প্রকার চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি৷ এ উভয় প্রকার আমানত এবং উভয় প্রকার চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা একজন মু"মিনের চরিত্রের অপরিহার্য বৈশিষ্ট৷ হাদীসে হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের সামনে যে বক্তব্যই পেশ করতেন তাতে অবশ্যই বলতেনঃ

-------------------------

"সাবধান, যার আমানতদারী নেই তার ঈমান নেই৷ আর যে অংগীকার বা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না তার দীনদারী নেই৷(বায়হাকী -শু"আবুল ঈমান৷)
২২. অর্থাৎ তারা সাক্ষ যেমন গেপন করে না, তেমনি তাতে তেমন কোন কম বেশীও করে না
২৩. এ থেকে নামাযের গুরুত্ব বুঝা যায়৷যে ধরনের উন্নত চরিত্র ও মহৎ কর্মশীল লোক জান্নাতের উপযুক্ত তাদের গুণাবলী উল্লেখ করতে গিয়ে নামায দিয়ে শুরু করা হয়েছে এবং নামায দিয়েই শেষ করা হয়েছে৷ তাদের প্রথম গুণ হলো তারা হবে নামাযী৷ দ্বিতীয় গুণ হলো, তারা হবে নামাযের প্রতি নিষ্ঠাবান এবং সর্বশেষ গুণ হলো, তারা নামযের হিফাযত করবে৷ নামাযের হিফাযতের অর্থ অনেক কিছু৷ যথা সময়ে নামায পড়া, দেহ ও পোশাক-পরিচ্ছদ পাক-পবিত্র আছে কিনা নামাযের পূর্বেই সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া , অযু থাকা এবং অযু করার সময় অংগ -প্রত্যংগগুলো ভালভাবে ধোয়া, নামাযের ফরয ওয়াজিব ও মুস্তাহাব গুলো ঠিকমত আদায় করা, নামাযের নিয়ম-কানুন পুরোপুরি মেনে চলা, আল্লাহর নাফরমানী করে নামাযকে ধ্বংস না করা, এসব বিষয়ও নামাযের হিফাযতের অন্তরভুক্ত৷