(৭:৬৫) আর আদ (জাতি)র ৫১ কাছে আমি পাঠাই তাদের ভাই হূদকে৷ সে বলেঃ “হে আমার সম্প্রদায়ের ভাইয়েরা !তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো৷ তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোন ইলাহ নেই৷ এরপরও কি তোমরা ভুল পথে চলার ব্যাপারে সাবধান হবে না? ”
(৭:৬৬) তার সম্প্রদায়ের প্রধানরা যারা তার কথা মানতে অস্বীকার করছিল, তারা বললোঃ “আমরা তো তোমাকে নির্বুদ্ধিতায় লিপ্ত মনে করি এবং আমাদের ধারণা তুমি মিথ্যুক৷”
(৭:৬৭) সে বললোঃ “হে আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা!আমি নির্বুদ্ধিতায় লিপ্ত নই৷ বরং আমি রব্বুল আলামীনের রসূল,
(৭:৬৮) আমার রবের বাণী তোমাদের কাছে পৌছাই এবং আমি তোমাদের এমন হিতাকাংখী যার ওপর ভরসা করা যেতে পারে৷”
(৭:৬৯) তোমরা কি এ জন্য অবাক হচ্ছো যে, তোমাদেরকে সতর্ক করার উদ্দেশ্যে তোমাদেরই স্বগোত্রীয় এক ব্যক্তির মাধ্যমে তোমাদের রবের স্মারক তোমাদের কাছে এসেছে? ভুলে যেয়ো না, তোমাদের রব নূহের সম্প্রদায়ের পর তোমাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেন এবং অত্যন্ত স্বাস্থ্যবান, ও সুঠাম দেহের অধিকারী করেন৷ কাজেই আল্লাহর অপরিসীম শক্তির কথা স্মরণ রাখো, ৫২ আশা করা যায় তোমরা সফলকাম হবে৷
(৭:৭০) তারা জবাব দিলোঃ “তুমি কি আমাদের কাছে এ জন্য এসেছো যে, আমরা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবো৷ এবং আমাদের বাপ-দাদারা যাদের ইবাদত করে এসেছে তাদেরকে পরিহার করবো? ৫৩ বেশ, যদি তুমি সত্যবাদী হও, তাহলে আমাদের যে আযাবের হুমকি দিচ্ছো, তা নিয়ে এসো৷”
(৭:৭১) সে বললোঃ “তোমাদের রবের অভিসম্পাত পড়েছে তোমাদের ওপর এবং তাঁর গযবও৷ তোমরা কি আমার সাথে এমন কিছু নাম নিয়ে বিতর্ক করছো, যেগুলো তৈরী করেছো তোমরা ও তোমাদের বাপ-দাদারা ৫৪ এবং যেগুলোর স্বপক্ষে আল্লাহ কোন সনদ নাযিল করেননি? ৫৫ ঠিক আছে, তোমরা অপেক্ষা করো এবং আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষা করছি৷”
(৭:৭২) অবশেষে নিজ অনুগ্রহে আমি হূদ ও তার সাথীদেরকে উদ্ধার করি এবং আমার আয়াতকে যারা মিথ্যা বলেছিল এবং যারা ঈমান আনেনি তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দেই৷ ৫৬
৫১. 'আদ'ছিল আরবের প্রাচীনতম জাতি৷ আরবের সাধারণ মানুষের মখে মুখে এদের কাহিনী প্রচলিত ছিল৷ ছোট ছোট শিশুরাও তাদের নাম জানতো৷ তাদের অতীত কালের প্রতাপ-প্রতিপত্তিও গৌরব গাঁথা প্রবাদ বাক্যে পরিণত হয়েছিল৷ তারপর দুনিয়ার বুক থেকে তাদের নাম -নিশানা মুছে যাওয়াটাও প্রবাদের রূপ নিয়েছিল৷ আদ জাতির এ বিপুল পরিচিতির কারণেই আরবী ভাষায় প্রত্যেকটি প্রাচীন ও পুরাতন জিনিসের জন্যে 'আদি' শব্দ ব্যবহার করা হয়৷ প্রাচীন ধ্বংসাবশেষকে আদিয়াত , বলা হয়৷ যে জমির মালিক বেঁচে নেই এবং চাষাবাদকারী না থাকার কারণে যে জমি অনাবাদ পড়ে থাকে তাকে 'আদি-উল-আরদ' বলা হয়৷ প্রাচীন আরবী কবিতায় আমরা এ জাতির নামের ব্যবহার দেখি প্রচুর পরিমাণে৷ আরবের বংশধারা বিশেষজ্ঞগণও নিজেদের দেশের বিলুপ্ত জাতিদের মধ্যে সর্বপ্রথম এ জাতিটির নামোচ্চারণ করে থাকেন৷ হাদীসে বলা হয়েছে, একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে বনু যহল ইবনে শাইবান গোত্রের এক ব্যক্তি আসেন৷ তিনি আদ জাতির এলাকার অধিবাসী ছিলেন৷ তিনি প্রাচীনকাল থেকে তাদের এলাকার লোকদের মধ্যে আদ জাতি সম্পর্কে যেসব কিংবদন্তী চলে আসছে তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শুনান৷কুরআনের বর্ণনা মতে এ জাতিটির আবাসস্থল ছিল 'আহকাফ' এলাকা৷ এ এলাকাটি হিজায, ইয়ামন ও ইয়ামামার মধ্যবর্তী 'রাবয়ুল খালী'র দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত৷ এখন থেকে অগ্রসর হয়ে তারা ইয়ামনের পশ্চিম সমুদ্রোপকূল এবং ওমান ও হাজরা মাউত থেকে ইরাক পর্যন্ত নিজেদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বিস্তৃত করেছিল৷ ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে এ জাতিটির নিদর্শনাবলী দুনিয়ার বুক থেকে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে৷ কিন্তু দক্ষিণ আরবের কোথাও কোথাও এখনো কিছু পুরাতন ধ্বংস স্তুপ দেখা যায়৷ সেগুলোকে আদ জাতির নিদর্শন মনে করা হয়ে থাকে৷ হাজরা মাউতে এক জায়গায় হযরত হূদ আলাহিস সালামের নামে একটি কবরও পরিচিত লাভ করেছে৷ ১৮৩৭খৃস্টাব্দে James R.wellested নামক একজন ইংরেজ নৌ-সেনাপতি 'হিসনে গুরাবে' একটি পুরাতন ফলকের সন্ধান লাভ করেন এতে হযরত হূদ আলাইহিস সালামের উল্লেখ রয়েছে৷এ ফলকে উৎকীর্ণ লিপি থেকে পরিষ্কার জানা যায়, এটি হযরত হূদের শরীয়াতের অনুসারীদের লেখা ফলক৷(আল আহকাফ দেখুন৷)
৫২. মূল শব্দটি হচ্ছে 'আলা'-৷ এর আভিধানিক অর্থ নিয়ামতসমূহ, ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির প্রতীকসমূহ, এবং প্রশংসনীয় চারিত্রিক গুণাবলী ৷ আয়াতের সার্বিক মর্ম এই যে, আল্লাহর অপার অনুগ্রহের কথাও মনে রেখো, আবার এটাও ভুলে যেও না যে, তিনি তোমাদের কাছ থেকে অনুগ্রহ ছিনিয়ে নেয়ারও ক্ষমতা রাখেন৷
৫৩. এখানে আবার একথাটি উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এ জাতিটিও আল্লাহকে অস্বীকার করতো না, আল্লাহ সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল না৷ অথবা তাঁর ইবাদত করতে অস্বীকার করছিল না৷ আসলে তারা হযরত হূদের একমাত্র আল্লাহ বন্দেগী করতে হবে এবং তাঁর বন্দেগীর সাথে আর কারোর বন্দেগী যুক্ত করা যাবে না- এ বক্তব্যটিই মেনে নিতে অস্বীকার করছিল৷
৫৪. অর্থাৎ তোমারা কাউকে বৃষ্টির দেবতা, কাউকে বায়ুর দেবতা, কাউকে ধন-সম্পদের দেবতা, আবার কাউকে রোগের দেবতা, বলে থাকো৷ অথচ তাদের কেউ মূলত কোন জিনিসের স্রষ্টা ও প্রতিপালক নয়৷ বর্তমান যুগেও আমরা এর দৃষ্টান্ত দেখি৷ এ যুগেও লোকেরা দেখি কাউকে বিপদ মোচনকারী বলে থাকে৷ অথচ বিপদ থেকে উদ্ধার করার কোন ক্ষমতাই তার নেই৷ লোকেরা কাউকে 'গনজ বখশ', (গুপ্ত ধন ভাণ্ডার দানকারী) বলে অভিহিত করে থাকে৷ অথচ তার কাছে কাউকে দান করার মত কোন ধনভাণ্ডার নেই৷ কাউকে দাতা বলা হয়ে থাকে৷অথচ সে কোন জিনিসের মালিকই নয়, যে কাউকে দান করতে পারবে৷ কাউকে 'গরীব নওয়াজ' আখ্যা দেয়া হয়ে থাকে৷ অথচ তিনি নিজেই গরীব৷ যে ধরনের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের ফলে কোন গরীবকে প্রতিপালন ও তার প্রতি অনুগ্রহ করা যেতে পারে সেই ধরনের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বে তার কোন অংশ নেই৷ কাউকে 'গউস' (ফরিয়াদ শ্রবণকারী )বলা হয় অথচ কারোর ফরিয়াদ শুনার এবং তার প্রতিকার করার কোন ক্ষমাতাই তার নেই৷ কাজেই এ ধরনের যাবতীয় নাম বা উপাধি নিছক নাম বা উপাধি ছাড়া আর কিছুই নয়৷ এ নামগুলোর পিছনে কোন সত্তা বা ব্যক্তিত্ব নেই৷ যারা এগুলো নিয়ে ঝগড়া ও বিতর্ক করে তারা আসলে কোন বাস্তব জিনিসের জন্যে নয়, বরং কেবল কতিপয় নামের জন্যেই ঝগড়া ও বিতর্ক করে৷
৫৫. অর্থাৎ তোমরা নিজেরাই যে, আল্লাহকে সর্বশ্রেষ্ঠ রব বলে থাকো তিনি তোমাদের এ বানোয়াট ইলাহদের সার্বভৌম ক্ষমতা -কর্তৃত্ব ও প্রভুত্বের স্বপক্ষে কোন সনদ দান করেননি৷ তিনি কোথাও বলেননি যে, আমি অমুকের ও অমুকের কাছে আমার ইলাহী কর্তৃত্বের এ পরিমাণ অংশ স্থানান্তরিত করে দিয়েছি৷ কাউকে বিপদ ত্রাতা, অথবা 'গনজ বখশ' হবার কোন পরোয়ানা তিনি দেননি৷ তোমরা নিজেরাই ধারণা ও কল্পনা অনুযায়ী তাঁর ইলাহী ক্ষমতার যতটুকু অংশ যাকে ইচ্ছা তাকে দান করে দিয়েছো৷
৫৬. 'নিশ্চিহ্ন করে দেই' অর্থাৎ তাদেরকে বিধ্বস্ত ও ধ্বংস করে দিয়েছি৷ দুনিয়ার বুক থেকে তাদের নাম -নিশানা মুছে দিয়েছি৷ প্রাথমিক পর্বের আদ জাতি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে এবং তাদের যাবতীয় নিদর্শনও বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, একথা আরববাসীদের ঐতিহাসিক কথামালা ও কিংবদন্তী সমীহ থেকেও প্রমাণিত হয় এবং আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারসমূহও এর সত্যতা প্রমাণ করে৷তাই আরব ঐতিহাসিকগণ তাদেরকে বিলুপ্ত জাতি হিসেবেই গণ্য করে থাকেন৷ তারপর আদ জাতির কেবলমাত্র সেই অংশটুকুই দুনিয়ার বুকে রয়ে গেছে যারা ছিল হযরত হূদ আলাইহিস সালামের অনুসারী , এটাও আরব ইতিহাসের একটি স্বীকৃত সত্য৷ ইতিহাসে আদ জাতির এ অবশিষ্টাংশ দ্বিতীয় আদ নামে খ্যাত৷ উপরে আমরা হিসনে গুরাবের যে পুরাত ফলকটির কথা উল্লেখ করেছি সেটি আসলে তাদেরই স্মৃতিফলক৷ প্রত্নতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞগণ এ স্মৃতি ফলকে (এটিকে হযরত ঈসার জন্মের প্রায় ১৮শত বছর পূর্বের লিখন বলে মনে করা হচ্ছে) যে উৎকীর্ণ লিখন পাঠ করেছেন, তার কতিপয় বাক্য নীচে উদ্ধৃত করা হলোঃ

"আমরা সুদীর্ঘকাল এই দুর্গে এমন অবস্থর অতিবাহিত করেছিলাম যখন অভাব অনটন থেকে আমাদের জীবন ছিল অনেক দূরে৷ আমাদের খালগুলো নদীর পানিতে ভরে থাকতো……… এবং আমাদের শাসকগণ এমন ধরনের বাদশাহ ছিলেন যারা ছিলেন অসৎ চিন্তা মুক্ত এবং দুস্কৃতকারী ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের প্রতি কঠোর মনোভাবাপন্ন৷ তারা হূদের শরীয়াত অনুযায়ী আমাদের ওপর শাসন কার্য পরিচালনা করতেন এবং উত্তম ফায়সালাসমূহ একটি কিতাবে লিপিবদ্ধ করে নিতেন৷ আমরা মুজিযা ও মৃত্যুর পর পুররুত্থানের প্রতি ঈমান রাখতাম৷"

কুরআনে যে কথা বিধৃত হয়েছে যে, আদ জাতির প্রাচীন মহিমা, গৌরব, ও সমৃদ্ধির উত্তরাধিকারী তারাই হয়েছিল যারা হূদ আলাইহিস সালামের প্রতি ঈমান এনেছিল, এ লিপিটি আজো এরই সত্যতা প্রমাণ করে যাচ্ছে৷