(৭:৫৪) প্রকৃতপক্ষে আল্লাহই তোমাদের রব, যিনি আকাশ ও পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন৷ ৪০ তারপর তিনি নিজের কর্তৃত্বের আসনে সমাসীন হন৷৪১ তিনি রাত দিয়ে দিনকে ঢেকে দেন তারপর রাতের পেছনে দিন দৌড়িয়ে চলে আসে৷ তিনি সূর্য , চন্দ্র ও তারকারাজী সৃষ্টি করেন৷ সবাই তাঁর নির্দেশের আনুগত ৷জেনে রাখো, সৃষ্টি তারই এবং নির্দেশও তাঁরই৷ ৪২ আল্লাহ বড়ই বরকতের অধিকারী ৪৩ তিনি সমগ্র বিশ্ব জাহানের মালিক ও প্রতিপালক ৷
(৭:৫৫) তোমাদের রবকে ডাকো কান্নাজড়িত কণ্ঠে ও চুপে চুপে ৷ অবশ্যি তিনি সীমালংঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না৷
(৭:৫৬) দুনিয়ায় সুস্থ পরিবেশ বহাল করার পর আর সেখানে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না৷৪৪ আল্লাহকেই ডাকো ভীতি ও আশা সহকারে৷ ৪৫ নিশ্চিতভাবেই আল্লাহর রহমত সৎকর্মশীল লোকদের নিকবর্তী৷
(৭:৫৭) আর আল্লাহই বায়ুকে নিজের অনুগ্রহের পূর্বাহ্নে সুসংবদবাহীরূপে পাঠান ৷ তারপর যখন সে পানি ভরা মেঘ বহন করে তখন কোন মৃত ভুখণ্ডের দিকে তাকে চালিয়ে দেন এবং সেখানে বারি বর্ষণ করে(সেই মৃত ভুখণ্ড থেকে ) নানা প্রকার ফল উৎপাদন করেন৷ দেখো, এভাবে আমি মৃতদেরকে মৃত্যুর অবস্থা থেকে বের করে আনি৷ হয়তো এ চাক্ষুষ পর্যবেক্ষণ থেকে তোমরা শিক্ষা লাভ করবে৷
(৭:৫৮) উৎকৃষ্ট ভুমি নিজের রবের নির্দেশ প্রচুর ফসল উৎপন্ন করে এবং নিকৃষ্ট ভুমি থেকে নিকৃষ্ট ধরনের ফসল ছাড়া আর কিছুই ফলে না৷ ৪৬ এভাবেই আমি কৃতজ্ঞ জনগোষ্ঠির জন্য বারবার নিদর্শনসমূহ পেশ করে থাকি৷
৪০. এখানে দিন শব্দটি প্রচলিত ২৪ ঘন্টার দিন অর্থে অথবা যুগ বা কাল (PERIOD)অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে৷ শেষোক্ত অর্থে কুরআনে একাধিক ব্যবহার লক্ষনীয় ৷ যেমন সুরা হজ্জের ৬ রুকূতে (আয়াত ৪৭ )বলা হয়েছেঃ

------------------------------------

(আর প্রকৃতপক্ষে তোমরা যে হিসাব কষে থাকো সেই দৃষ্টিতে তোমার রবের এখানে একটি দিন এক হাজার বছরের সমান)৷

আবার সূরা মা'আরিজ-এর ৪নং আয়াতে বলা হয়েছেঃ

------------------------------------------------

(ফেরেশতারা এ জিব্রীল তাঁর দিকে আরোহণ করে একদিনে, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর) ৷ তবে এখানে 'দিন' শব্দের প্রকৃত তাৎপর্য কি, তা আল্লাহই ভাল জানেন৷ (আরো ব্যাখ্যার জন্যে দেখুন , সূরা হামীম সাজদা-টীকা ১১-১৫)
৪১. আল্লাহর "ইস্তিওয়া আলাল আরশ"(কর্তৃত্বের আসনে সমাসীন হওয়া) এর বিস্তারিত স্বরূপ অনুধাবন করা আমাদের পক্ষে কঠিন৷ খুব সম্ভবত সমগ্র বিশ্ব -জাহান সৃষ্টির পর মহান আল্লাহ কোন একটি স্থানকে তাঁর এ অসীম সাম্রাজ্যের কেন্দ্র নির্ধারণ করেন এবং সেখানে নিজের আলোকে রশ্মির বিচরণকে কেন্দ্রীভূত করে দেন আর তারই নাম দেন "আরশ" (কর্তৃত্বের আসন)৷ সেখান থেকে সমগ্র বিশ্ব জাহানের নব নব সৃষ্টির প্রক্রিয়া চলছে ও ক্রমাগত শক্তির বিচরণ ঘটেছে , সেই সাথে সৃষ্টি জগতের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনাও অব্যাহত রয়েছে৷আবার এও সম্ভব হতে পারে যে, আরশ অর্থ শাসন কর্তৃত্ব এবং আরশের ওপর সমাসীন হয়ে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ এ বিশ্ব -জাহান সৃষ্টি করার পর এর শাসন দণ্ড নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন৷ মোটকথা আরশের ওপর সমাসীন হওয়ার বিস্তারিত অর্থ যাই হোক না কেন, মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ যে, এ বিশ্ব-জগতের নিছক স্রষ্টাই নন বরং এর পরিচালক ও ব্যবস্থাপকও একথা ভালভাবে হৃদয়ংগম করানোই কুরআনে এর উল্লেখের আসল উদ্দেশ্য৷ তিনি এ দুনিয়াকে অস্তিত্বশীল করার পর এর সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে কোথাও বসে যাননি৷ বরং কার্যত তিনিই সারা বিশ্ব-জাহানের ছোট বড় প্রত্যেকটি বস্তুর ওপর কর্তৃত্ব করেছেন৷ পরিচালনা ও শাসন কৃর্তৃত্বের যাবতীয় ক্ষমতা কার্যত তাঁরই হাতে নিবদ্ধ৷ প্রতিটি বস্তু তাঁর নির্দেশের অনুগত৷ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালুকণাও তাঁর নির্দেশ মেনে চলে৷ প্রতিটি বন্তু ও প্রানীর ভাগ্যই চিরন্তরভাবে তাঁর নির্দেশের সাথে যুক্ত৷ যে মৌলিক বিভ্রান্তিটির কারণে মানুষ কখনো শিরকের গোমরাহীতে লিপ্ত হয়েছে, আবার কখনো নিজেকে স্বাধীন ক্ষমতা সম্পন্ন ঘোষণা করার মতো ভ্রান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে কুরআন এভাবে তার মূলোৎপাটন করতে চায়৷বিশ্ব-জাহানের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা থেকে আল্লাহকে কার্যত সম্পর্কহীন মনে করার অনিবার্য ফল দাঁড়ায় দুটি৷ মানুষ নিজের ভাগ্য কে অন্যের হাতে বন্দি মনে করবে এবং তার সামনে মাথা নত করে দেবে অথবা নিজেকেই নিজের ভাগ্যের নিয়ন্তা মনে করবে এবং নিজেকে সর্বময় কর্তৃত্বশীল স্বাধীন সত্তা মনে করে কাজ করে যেতে থাকবে৷ এখানে আরো একটি কথা প্রণিধানযোগ্য৷ স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যকার সম্পর্ক সুষ্পষ্ট করার জন্যে কুরআন মজীদে মানুষের ভাষা থেকে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে এমন সব শব্দ পরিভাষা , উপমা ও বর্ণনাভংগী গ্রহণ করা হয়েছে, যা রাজত্ব ও বাদশাহীর সাথে সম্পর্ক রাখে৷এ বর্ণনাভংগী কুরআনে এত বেশী স্পষ্ট যে, অর্থ বুঝে কুরআন পাঠকারী যে কোন ব্যক্তিই এ বিষয়টি অনুভব না করে থাকতে পারবেন না৷ কোন কোন অর্বাচীন সমালোচক স্বীয় বিকৃত চিন্তা ও মানসিকতার কারণে এ বাচনভংগী থেকে বুঝেছেন যে, এ কিতাবটি যে যুগের রচনা সে যুগে মানুষের মন-মস্তিষ্কে রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রভাব ব্যাপকভাবে বিস্তৃত ছিল৷ তাই এ কিতাবের রচয়িতা (এ বিবেকহীন নিন্দুকদের মত এর রচয়িতা নাকি হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহকে একজন রাজা ও বাদশাহ হিসেবেই পেশ করেছেন৷ অথচ কুরআন যে শাশ্বত ও অনাদি -অনন্ত সত্য উপস্থাপন করছে তা এর সম্পূর্ণ বিপরীত৷ সে সত্যটি হচ্ছে, ভুমণ্ডলে ও নভোমণ্ডলে একমাত্র আল্লাহর রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত ৷ সার্বভৌমত্ব( Sovereignty)বলতে যা বুঝায় তা একমাত্র তারই সত্তার একচেটিয়া অধিকার ও বৈশিষ্ট্য৷ আর বিশ্ব -জাহানের এ ব্যবস্থাপনা একটি পূর্নাঙ্গ কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা বিশেষ, যেখানে ঐ একক সত্তা, সমস্ত ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের পূর্ণ অধিকারী৷ কাজেই এ ব্যবস্থার মধ্যে যে ব্যক্তি বা দল নিজের বা অন্য কারুর আংশিক বা পূর্ণ কর্তৃত্বের দাবীদার হয়, সে নিজেকে নিছক প্রতারণার জালে আবদ্ধ করে রেখেছে৷ তাছাড়া এ ব্যবস্থার মধ্যে অবস্থান করে মানুষ পক্ষে ঐ একক সত্তাকে একই সাথে ধর্মীয় অর্থেও একমাত্র মাবুদ এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক -সাংস্কৃতিক অর্থেও একমাত্র শাসক (Sovereign)হিসেবে মেনে নেয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোন সঠিক দৃষ্টিভংগী ও কর্মনীতি হতে পারে না৷
৪২. "আরশের উপর সমাসীন হলেন" ব্যাকটির মাধ্যমে সংক্ষেপে যে বিষয়টি বর্ণিত হয়েছিল এখানে তারই অতিরিক্ত ব্যাখ্যা করা হয়েছে৷ অর্থাৎ নিছক স্রষ্টাই নন, তিনি হুকুমকর্তা এবং শাসকও ৷ তিনি সৃষ্টি করার পর নিজের সৃষ্ট বস্তুসমূহকে অন্যের কর্তৃত্বে সোপর্দ করে দেননি অথবা সমগ্র সৃষ্টিকে বা তার অংশ বিশেষকে ইচ্ছামত চলার জন্যে স্বাধীবভাবে ছেড়ে দেননি৷ বরং কার্যত সমগ্র বিশ্ব জগতের পরিচালনা ব্যবস্থা আল্লাহর নিজের হাতেই কেন্দ্রীভূত রয়েছে৷ দিন রাত্রির আবর্তন আপনা আপনিই হচ্ছে না৷ বরং আল্লাহর হুকুমে হচ্ছে ৷ তিনি যখনই চাইবেন দিন ও রাতকে থামিয়ে দেবেন আর যখনই চাইবেন এ ব্যবস্থা বদলে দেবেন৷ সূর্য, চন্দ্র , তারকা এরা কেউ নিজস্ব কোন শক্তির অধিকারী নয়৷ বরং এরা সবাই সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর কর্তৃত্বাধীন৷ এরা একান্ত অনুগত দাসের মত সেই কাজই করে যাচ্ছে যে কাজে আল্লাহ এদেরকে নিযুক্ত করেছেন৷
৪৩. বরকতের আসল অর্থ হচ্ছে বৃদ্ধি, উন্নতি, বিকাশ ৷ এই সংগে এ শব্দটির মধ্যে একদিকে উচ্চতা ও মহত্বের ভাবধারা নিহিত রয়েছে এবং অন্যদিকে রয়েছে স্থীতিশীলতা ও অবিচলতার ভাবধারাও৷ আবার মংগল ও কল্যাণের ভাবধারাও নিশ্চিতভাবে এসব অর্থের অন্তরভুক্ত রয়েছে৷ কাজেই আল্লাহ বড়ই বরকতের অধিকারী হবার অর্থ এ দাঁড়ায় যে, তাঁর মংগল ও কল্যাণের কোন সীমা নেই৷ তাঁর সত্তা থেকে সীমাহীন কল্যাণ চতুর্দিকে বিস্তৃত হচ্ছে এবং তিনি অতি উন্নত ও শ্রেষ্ঠ এক সত্তা৷ তাঁর মহত্বের কোন শেষ নেই৷ আর তাঁর এ কল্যাণ ,মহত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব চিরস্থায়ী , ও অনন্তকালীন -সাময়িক নয় ৷ এর ক্ষয়ও নেই৷ পতনও নেই৷ (আল -ফুরকান, টীকা ১-১৯দ্রষ্টব্য)৷
৪৪. "পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না৷" -অর্থাৎ পৃথিবীর পরিচালনা ব্যবস্থাকে বিঘ্নিত ও বিনষ্ট করো না৷ মানুষ যখন আল্লাহর বন্দেগী না করে নিজের বা অন্য কারোর তাবেদারী করে এবং আল্লাহর পথনির্দেশনা গ্রহণ না করে নিজের সমাজ, সংস্কৃতি ও নেতিকতাকে এমনসব মূলনীতি ও আইনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করে যা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কারোর পথনির্দেশনা থেকে গৃহীত , তখন এমন একটি মৌলিক ও সার্বিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়, যা পৃথিবীর পরিচালন ব্যবস্থাকে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে৷ এই বিপর্যয়ের পথরোধ করাই কুরআনের উদ্দেশ্য ৷ এইসংগে কুরআন এ সত্যটি সম্পর্কেও সজাগ করতে চায় যে, বিপর্যয়, পৃথিবীর ব্যবস্থাপনায় মৌল বিষয় নয় এবং সুস্থতা, তার সাথে সাময়িকভাবে সংযুক্ত হয়নি৷ বরং সুস্থতা, হচ্ছে এ ব্যব্স্থাপনার মৌল বিষয় এবং নিছক মানুষের মূর্খতা অজ্ঞতা , ও বিদ্রোহাত্মক কার্যকলাপের ফলে বিপর্যয় তার ওপর সামায়িকভাবে আপতিত হয়৷ অন্য কথায় বলা যায়, এখানে মূর্খতা , অজ্ঞাতা, অসভ্যতা, শিরক বিদ্রোহ ও নৈতিক বিশৃংখলার মধ্য দিয়ে মানুষের জীবনের সুচনা হয়নি, এবং এগুলো দুর করার জন্যে পরবর্তীকালে ক্রমাগত সংশোধন সংস্কার ও সুস্থতা, বিধানের কাজ চলেনি৷ বরং প্রকৃতপক্ষে মানব জীবনের সুচনা হয়েছে সুস্থ ও সুসভ্য ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে এবং পরবর্তীকালে দুস্কর্মশীল লোকেরা নিজেদের নির্বুদ্ধিতা ও দুষ্ট মনোবৃত্তির সাহায্যে এ সুস্থ ব্যবস্থাপনাটিকে ক্রমান্বয়ে বিনষ্ট ও বিপর্যস্ত করেছে৷বিপর্যয় নির্মূল করে জীবন ব্যবস্থাকে আবার নতুন করে সংশোধিত ও সুস্থ করে তোলার জন্যেই মহান আল্লাহ যুগে যুগে ধারাবাহিকভাবে নবী পাঠিয়েছেন৷তাঁরা প্রত্যেক যুগে মানুষকে এ একই দাওয়াত দিয়ে এসেছেন যে, যে সুস্থ ও সভ্য বিধানের ভিত্তিতে দুনিয়ার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল তার মধ্যে বিপর্যয় সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকো৷ সভ্যতার বিবর্তন সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করে একটি মহল যে উদ্ভট মতাদর্শ পেশ করেছেন, কুরআনের দৃষ্টিভংগী তাদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা৷ তাঁরা বলছেন, মানুষ অন্ধকার থেকে বের হয়ে ধীরে ধীরে ও পর্যায়ক্রমে আলোর মধ্যে এসেছে৷ বিকৃতি, অসভ্যতার ও বর্বরতা থেকে তার জীবনের সুচনা হয়েছে৷ তারপর পর্যায়ক্রমে তা সুস্থতা ও সভ্যতার দিকে এসেছে৷ বিপরীতপক্ষে কুরআন বলছে আল্লাহ মানুষকে পূর্ন আলোকের মধ্যে এ পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন৷ পূর্ণ আলোকোজ্জ্বল পরিবেশে একটি সুস্থ জীবন ব্যবস্থার আওতাধীনে তার জীবন পথে চলা শুরু হয়েছিল৷ তারপর মানুষ নিজেই শয়তানের নেতৃত্ব গ্রহণ করে বারবার অন্ধকারের মধ্যে প্রবেশ করেছে৷ এবং এ সুস্থ জীবন ব্যবস্থায় বিপর্যয় ডেকে এনেছে৷ অন্যদিকে আল্লাহ বারবার নিজের নবী ও রাসূলগণকে পাঠিয়েছেন ৷ তাঁরা মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে আসার এবং বিপর্যয় সৃষ্টি থেকে বিরত থাকার জন্যে আহবান জানিয়েছেন৷ (দেখুন সূরা বাকারা২৩০ টীকা)৷
৪৫. এ বাক্যটি থেকে একথা সুষ্পষ্ট হয়ে গেছে যে, ওপরের বাক্যে যাকে বিপর্যয় বলা হয়েছিল তা হচ্ছে আসলে মানুষের আল্লাহর পরিবর্তে অন্য কাউকে নিজের অভিভাবক বন্ধু ও কার্য সম্পাদনকারী গণ্য করে সাহায্যের জন্যে তাকে ডাকা৷ অন্যদিকে মানুষের এ ডাক একমাত্র আল্লাহর সত্তাকে কেন্দ্র করে উচ্চারিত হওয়ার নামই সুস্থতা , ও বিশুদ্ধতা৷ ভীতি ও আশা সহকারে ডাকার অর্থ হচ্ছে, তোমাদের ভয় করতে হলে একমাত্র আল্লাহকেই করতে হবে৷ এবং কোন আশা পোষন করতে হলে তাও করতে হবে একমাত্র আল্লাহরই কাছ থেকে৷ এ অনুভূতি সহাকারে আল্লাহকে ডাকতে হবে যে, তোমাদের ভাগ্য পুরোপুরি তাঁরই করুনা নির্ভর৷ সৌভাগ্য ,সাফল্য ও মুক্তিলাভ একমাত্র তাঁরই সাহায্য ও পথনির্দেশনায় সম্ভব৷অন্যথায় তাঁর সাহায্য থেকে বঞ্চিত হলে তোমাদের জন্য ব্যর্থতা ও ধ্বংস অনিবার্য৷
৪৬. এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে৷ মূল বক্তব্য বিষয়টি অনুধাবন করার জন্যে এ সম্পর্কে অবহিত হওয়া অপরিহার্য৷ এখানে বৃষ্টি ও তার বরকতের উল্লেখ করার উদ্দেশ্য শুধু আল্লাহর অসীম ক্ষমতা বর্ণনা ও মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের প্রমাণ তুলে ধরাই নয়, বরং সেই সাথে একটি উপমার সাহায্যে রিসালাত ও তার বরকতসমূহ এবং তার মাধ্যমে ভাল ও মন্দের মধ্যে এবং উৎকৃষ্ট ও নিকৃষ্টের মধ্য পার্থক্যের চিত্র অংকন করাও এর লক্ষ্য৷ রসূলের আগমন এবং আল্লাহর শিক্ষা ও পথনির্দেশনা নাযিল হওয়াকে জলকনা বহনকারী বায়ূ প্রবাহ ও রহমতের মেঘকমালায় আছন্ন হয়ে যাওয়া এবংঅমৃতধারাপূর্ণ বারিবিন্দু বর্ষনের সাথে তুলনা করা হয়েছে৷ আবার বৃষ্টিপাতের মাধ্যমে মৃত পতিত ভূমির অকস্মাত সঞ্জীবিত হওয়া এবং তার উদর থেকে জীবনের অঢেল সম্পদরাজি উৎসারিত হবার ঘটনাকে নবীর শিক্ষা, অনুশীলন ও নেতৃত্বের মৃত ভূপতিত মানবতার অকস্মাত জেগে ওঠার এবং তার বক্ষদেশে থেকে কল্যাণের স্রোতস্বিনী উৎসারিত হবার পরিস্থিতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হিসেবে পেশ করা হয়েছে৷ তারপর বলা হয়েছে, বৃষ্টি বর্ষনের ফলে এসব বরকত কেবলমাত্র এমনসব ভূমি লাভ করে, যা মূলত উর্বর কিন্তু নিছক পানির অভাবে যার শষ্য ও উৎপাদনের যোগ্যতা চাপা পড়েছিল৷ ঠিক তেমনি রিসালাতের এ কল্যাণধারা থেকেও কেবলমাত্র সেই সব লোক লাভবান হতে পারে যারা মূলত মৃৎবৃত্তির অধিকারী এবং কেবলমাত্র নেতৃত্ব ও পথনির্দেশনা না পাওয়ার কারণে যাদের যোগ্যতা ও সুস্থ মনোবৃত্তির সুস্পষ্ট রূপলাভ করার ও কর্মতৎপরতা হবার সুযোগ পায় না৷অন্যদিকে দুষ্ট মনোবৃত্তির অধিকারী ও দুষ্কর্মশীল মানুষেরা হচ্ছে এমন ধরনের অনুর্বর জমির মত, যা রহমতের বারি বর্ষণে কোনক্রমেই লাভবান হয় না বরং বৃষ্টির পানি পড়ার সাথে সাথেই যার পেটের সমস্ত বিষ কাঁটা গাছ ও ঝোপ ঝাড়ের আকারে বের হয়ে আসে ৷ অনুরূভাবে রিসালাতের আবির্ভাবে তাদের কোন ফায়দা হয় না ৷বরং উলটো তাদের অভ্যন্তরের সমস্ত দুষ্কৃতি ও শয়তানী মনোবৃত্তি পূর্ণোদ্যমে সক্রিয় হয়ে ওঠে ৷ পরবর্তী কয়েকটি রুকূতে ধারাবাহিকভাবে ঐতিহাসিক প্রমাণ সহকারে এ উপমাটিকে সুষ্পষ্ট করে তুলে ধরা হয়েছে৷ সেখানে বলা হয়েছে প্রত্যেক যুগে নবীর আগমনের পর মানব জাতি দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়৷ একটি ভাগ হচ্ছে সুস্থ ও সৎ চেতনা সম্পন্ন লোকদের৷ রিসালাতের অমিয় ধারায় অবগাহন করে তারা পুরিপুষ্ট হয় এবং উন্নতি ও উত্তম ফলে ফুলে শুশোভিত হয়৷ আর দ্বিতীয় ভাগটি হচ্ছে দুষ্ট চেতনা সম্পন্ন জনগোষ্ঠির ৷ কষ্টিপাথরের সামনে আসার সাথে সাথেই তারা নিজের সমস্ত অসৎ প্রবণতা ডালি উন্মুক্ত করে দেয়৷ তাদের সমস্ত দৃষ্কৃতি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে৷ অবশেষে তাদেরকে ঠিক তেমনিভাবে ছেটে দূরে নিক্ষেপ করা হয় যেভাবে স্বর্ণকার রূপা ও সোনা ভেজাল অংশটুকু ছেটে দুরে নিক্ষেপ করে৷