(৭:৪০) নিশ্চিতভাবে জেনে রাখো, যারা আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা সাব্যস্ত করেছে এবং এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে, তাদের জন্য কখনো আকাশের দরজা খুলবে না৷ তাদের জান্নাতে প্রবেশ এমনই অসম্ভব ব্যাপার যেমন সূঁচের ছিদ্রে উট প্রবেশ করানো৷ অপরাধীরা আমার কাছে এভাবেই বদলা পেয়ে থাকে৷
(৭:৪১) তাদের জন্য বিছানাও হবে জাহান্নামের এবং ওপরের আচ্ছাদনও হবে জাহান্নামের ৷ এ প্রতিফল আমি জালেমদেরকে দিয়ে থাকি ৷
(৭:৪২) অন্যদিকে যারা আমার আয়াত মেনে নিয়েছে এবং সৎকাজ করেছে - আর এ পর্যায়ে আমি কাউকে তার সামর্থের অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করি না- তারা হচ্ছে জান্নাতবাসী৷ সেখানে তারা থাকবে চিরকাল৷
(৭:৪৩) তাদের মনে পরষ্পরের বিরুদ্ধে যা কিছু গ্লানি থাকবে তা আমি বের করে দেবো৷ ৩২ তাদের নিম্নদেশে ঝরণাধারা প্রবাহিত হবে এবং তারা বলবেঃ “প্রশংসা সব আল্লাহরই জন্য, যিনি আমাদের এ পথ দেখিয়েছেন৷ আমরা নিজেরা পথের সন্ধান পেতাম না যদি না আল্লাহ আমাদের পথ দেখাতেন্ আমাদের রবের পাঠানো রসূলগণ যথার্থ সত্য নিয়েই এসেছিলেন৷” সে সময় আওয়াজ ধ্বনিত হবেঃ “তোমাদেরকে এই যে জান্নাতের উত্তরাধিকারী বানানো হয়েছে, এটা তোমরা লাভ করেছো সেই সমস্ত কাজের প্রতিদানে যেগুলো তোমরা অব্যাহতভাবে করতে৷” ৩৩
(৭:৪৪) তারপর জান্নাতের অধিবাসীরা জাহান্নামের অধিবাসীদেরকে ডেকে বলবেঃ “আমাদের রব আমাদের সাথে যে সমস্ত ওয়াদা করেছিলেন তার সবগুলোকেই আমরা সঠিক পেয়েছি, তোমাদের রব যেসব ওয়াদা করেছিলেন , তোমরাও কি সেগুলোকে সঠিক পেয়েছো? ৩৪
(৭:৪৫) ” তারা জবাবে বলবেঃ “হাঁ”, তখন একজন ঘোষণাকারী তাদের মধ্য ঘোষণা করবেঃ “আল্লাহর লানত সেই জালেমদের ওপর , যারা মানুষকে আল্লাহর পথে চলতে বাধা দিতো এবং তাকে বাঁকা করে দিতে চাইতো আর তারা ছিল আখেরাত অস্বীকারকারী৷”
(৭:৪৬) এ উভয় দলের মাঝখানে থাকবে একটি অন্তরাল৷ এর উচু স্থানে (আ’রাফ) অপর কিছু লোক থাকবে৷ তারা জান্নাতে প্রবেশ করেনি ঠিকই কিন্তু তারা হবে তার প্রার্থী৷
(৭:৪৭) তারা প্রত্যেককে তার লক্ষণের সাহায্যে চিনে নেবে ৷ জান্নাতবাসীদেরকে ডেকে তারা বলবেঃ “তোমাদের প্রতি শান্তি হোক! ”আর যখন তাদের দৃষ্টি জাহান্নামবাসীদের দিকে ফিরবে , তারা বলবেঃ “হে আমাদের রব! এ জালেমের সাথে আমাদের শামিল করো না৷”
৩২. অর্থাৎ দুনিয়ার জীবনে এ সৎলোকেদের মধ্যে কিছু পারষ্পরিক তিক্ততা, মনোমালিন্য ও ভুল বুঝাবুঝি থেকে থাকলেও আখেরাতের জীবনে তা সব দূর করে দেয়া হবে৷ তাদের মন পরস্পরের ব্যাপারে পরিষ্কার হয়ে যাবে৷ তারা পরস্পর আন্তরিকতা সম্পন্ন অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে৷ দুনিয়ায় যে ব্যক্তি তাদের বিরোধী ছিল, যে তাদের সাথে লড়াই করেছিল এবং তাদের বিরূপ সমালোচনা করেছিল, তাকে তাদের সাথে জান্নাতের আপ্যায়নে শামিল থাকতে দেখে তাদের কারোর মনে কোন প্রকার কষ্টের উদ্রেক হবে না৷ এ আয়াতটি পড়ে হযরত আলী (রা) বলেছিলেনঃ আমি আশা করি, আল্লাহ আমার, উসমানের , তালহার ও যোবাইরের মধ্যে সাফাই করে দেবেন৷ এ আয়াতটিকে ব্যাপকভাবে দৃষ্টিতে দেখলে আমরা এ সিন্ধান্তে উপনীত হতে পারি, যে, এ দুনিয়ায় সৎলোকদের গায়ে ঘটনাক্রমে যেসব দাগ বা কলংক লেগে যায়, সেই দাগগুলো সহকারে আল্লাহর তাদের কে জান্নাতে নিয়ে যাবেন না৷ বরং সেখানে প্রবেশ করার আগে নিজের বিশেষ অনুগ্রহে তাদেরকে একেবারে পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র করে নেবেন এবং একটি নিরেট নিষ্কলংক জীবন নিয়ে তারা সেখানে উপস্থিত হবেন৷
৩৩. বেহেশত এ ধরনের একটি মজার ব্যাপার ঘটবে৷ জান্নাতবাসীরা নিজেদের কাজের জন্যে অহংকারে মেতে উঠবে না৷ তারা একথা মনে করবে না যে, তারা এমন কাজ করেছিল যার বিনিময়ে তাদের জন্যে জান্নাত অবধারিত হয়ে গিয়েছিল৷ বরং তারা আল্লাহর প্রশংসা ও তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে পঞ্চমুখ হয়ে উঠবে৷ তারা বলবে, এসব আমাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহন নয়তো আমরা এর যোগ্য ছিলাম না৷ অন্যদিকে আল্লাহ তাদের ওপর নিজের অনুগ্রহের বড়াই করবেন না৷ বরং জবাবে বলবেন , তোমরা নিজেদের কাজের বিনিময়ের এ মর্যাদার অধিকারী হয়েছো৷ তোমাদেরকে যা কিছু দেয়া হচ্ছে সবই তোমাদের মেহনতের ফসল৷এগুলো ভিক্ষে করে পাওয়া নয় বরং তোমাদের প্রচেষ্টার ফল এবং তোমাদের কাজের মজুরী৷ নিজেদের মেহনতের বিনিময়ে তোমরা এসব সম্মানজনক জীবিকা অর্জনের অধিকার লাভ করছো৷ অপর দিকে আল্লাহ তাঁর জবাবের কথা এ ভাবে উল্লেখ করেছেন না যে, আমি একথা বলবো, রবং তিনি বলছেন , আওয়াজ ধ্বনিত হবে, -এভাবে বর্ণনা করার কারণে বিষয়টি আরো বেশী আকর্ষনীয় হয়ে উঠেছে৷

আসলে এই একই ধরনের সম্পর্ক দুনিয়ায় আল্লাহ ও তাঁর নেক বান্দাদের মধ্যেও রয়েছে৷ দুরাচারী লোকেরা দুনিয়ায় যে অনুগ্রহে লাভ করে থাকে তারা সে জন্যে গর্ব করে বেড়ায়৷ তারা বলে থাবে ,এসব আমাদের যোগ্যতা , প্রচেষ্টা , -সাধনা ও কর্মের ফল৷ আর এ জন্যেই তারা প্রত্যেকটি অনুগ্রহলাভের কারণে আরো বেশী অহংকারী ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারীতে পরিণত হতে থাকে৷ বিপরীত পক্ষে সৎলোকেরা যে কোন অনুগ্রহ লাভ করুক না কেন তাকে অবশ্যি আল্লাহ দান মনে করে৷ সে জন্যে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে৷ আল্লাহর দান যতই বাড়তে থাকে ততই তারা বিনয় প্রকাশ করতে থাকে৷এবং ততই তাদের দয়া, স্নেহ ও বদান্যতা বেড়ে যেতে থাকে৷ তারপর আখেরাতের ব্যাপারেও তারা নিজেদের সৎকর্মের জন্যে অহংকারে মত্ত হয় না৷তারা একথা বলে না যে, তাদের গুনাহখাতা নিশ্চিতভাবেই মাফ করে দেয়া হবে৷ বরং নিজেদের ভুল-ত্রুটির জন্যে তারা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে থাকে৷ নিজেদের কর্মফলের পরিবর্তে আল্লাহর করুনা ও মেহেরবানীর ওপর পূর্ণ আস্থাশীল হয়৷ তারা সবসময় ভয় করতে থাকে ৷তাদের আমলনামায় প্রাপ্যের পরিবর্তে কোন দেনার খাত বের হয়ে না আসে৷ বুখারী ও মুসলিম উভয় হাদীস গ্রন্থে উল্লিখত হয়েছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ

------------------------------

"খুব ভালভাবেই জেনে রাখো, তোমরা নিছক নিজেদের কর্মকাণ্ডের জোরে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না"৷ লোকেরা জিজ্ঞাস করলো , হে আল্লাহর রসূল ! আপনিও ? জবাব দিলেন, হাঁ আমিও-

---------------------------------------------------------

"হাঁ, তবে যদি আল্লাহ আমাকে তাঁর রহমত ও অনুগ্রহের আবরণে ঢেকে নেন"৷
৩৪. অর্থাৎ এ আরাফাবাসীরা হবে এমন একদল লোক, যাদের জীবনের ও কর্মকাণ্ডের ইতিবাচক বা ভাল দিক এত বেশী শক্তিশালী হবে না, যার ফলে তারা জান্নাতলাভ করতে সক্ষম হয়, আবার এর নেতিবাচক বা খারাপ দিকও এত বেশী খারপ হবে না, যার ফলে তাদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করা যেতে পারে৷ তাই তারা জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝখানে একটি সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করবে৷