(৭:১৮৯) আল্লাহই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন একটি মাত্র প্রাণ থেকে এবং তারই প্রজাতি থেকে তার জুড়ি বানিয়েছেন, যাতে করে তার কাছে প্রশান্তি লাভ করতে পারে ৷তারপর যখন পুরুষ নারীকে ঢেকে ফেলে তখন সে হালকা গর্ভধারণ করে৷ তাকে বহন করে সে চলাফেরা করে৷ গর্ভ যখন ভারি হয়ে যায় তখন তারা দুজনে মিলে এক সাথে তাদের রব আল্লাহর কাছো দোয়া করেঃ যদি তুমি আমাদের একটি ভাল সন্তান দাও তাহলে আমরা তোমার শোকরগুজারী করবো ৷
(৭:১৯০) কিন্তু যখন আল্লাহ তাদেরকে একটি সুস্থ -নিখুঁত সন্তান দান করেন,তখন তারা তাঁর এ দান ও অনুগ্রহে অন্যদেরকে তাঁর সাথে শরীক করতে থাকে৷ তারা যেসব মুশরিকী কথাবার্তা বলে আল্লাহ তার অনেক উর্ধে৷ ১৪৬
(৭:১৯১) কি ধরনের নির্বোধ লোক এরা! আল্লাহর শরীক গণ্য করে তাদেরকে , যা কোন জিনিস সৃষ্টি করেনি বরং নিজেরাই সৃষ্ট৷
(৭:১৯২) যারা তাদেরকে সাহায্য করতে পারে না এবং নিজেরাও নিজেদেরকে সাহায্য করার ক্ষমতা রাখে না৷
(৭:১৯৩) যদি তোমরা তাদেরকে সত্য -সরল পথে আসার দাওয়াত দাও তাহলে তারা তোমাদের পেছনে আসবে না, তোমরা তাদেরকে ডাকো বা চুপ করে থাকো উভয় অবস্থায়ই ফল তোমাদের জন্য সমানই থাকবে৷ ১৪৭
(৭:১৯৪) তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদেরকে ডাকো তারা তো তোমাদের মতই বান্দা৷ তাদের কাছে দোয়া চেয়ে দেখো, তাদের সম্পর্কে তোমাদের ধারণা যদি সত্য হয়ে থাকে, তবে তারা তোমাদের দোয়ায় সাড়া দিক৷ তাদের কি পা আছে, যা দিয়ে তারা চলতে পারে?
(৭:১৯৫) তাদের কি হাত আছে যা দিয়ে তারা ধরতে পারে? তাদের কি চোখ আছে যা সাহায্যে তারা দেখতে পারে?তাদের কি কান আছে যা দিয়ে তারা শুনতে পারে? ১৪৮ হে মুহাম্মাদ ! এদেরকে বলো, তোমাদের বানানো শরীকদেরকে ডেকে নাও তারপর তোমরা সবাই মিলে আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করো এবং আমাকে একদম অবকাশ দিয়ো না৷
(৭:১৯৬) আমার সহায় ও সাহায্যকারী সেই আল্লাহ যিনি কিতাব নাযিল করেছেন এবং তিনি সৎ লোকদের সহায়তা করে থাকেন৷ ১৪৯
(৭:১৯৭) অন্যদিকে তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদেরকে ডেকে থাকো তারা তোমাদের ও সাহায্য করতে পারে না এবং নিজেরাও নিজেদের সাহায্য করার ক্ষমতা রাখে না৷
(৭:১৯৮) বরং তোমরা যদি তাদেরকে সত্য-সঠিক পথে আসতে বলো তাহলে তারা তোমাদের কথা শুনতেও পাবে না৷ বাহ্যত তোমরা দেখছো, তারা তোমাদের দিকে তাকিয়ে আছে কিন্তু আসলে তারা কিছুই দেখছে না৷
(৭:১৯৯) হে নবী! কোমলতা ও ক্ষমার পথ অবলম্বন করো৷ সৎকাজের উপদেশ দিতে থাকো এবং মূর্খদের সাথে বিতর্কে জড়িও না৷
(৭:২০০) যদি কখনো শয়তান তোমাকে উত্তেজিত করে তাহলে আল্লাহর আশ্রয় চাও৷ তিনি সবকিছু শোনেন এবং জানেন৷
(৭:২০১) প্রকৃতপক্ষে যারা মুক্তাকী, তাদেরকে যদি কখনো শয়তানের প্রভাবে অসৎ চিন্তা স্পর্শও করে যায় তাহলে তারা তখনই সতর্ক হয়ে উঠে তারপর তারা নিজেদের সঠিক কর্মপদ্ধতি পরিষ্কার দেখতে পায়৷
(৭:২০২) আর তাদের অর্থাৎ (শয়তানের ) ভাই-বন্ধুরা তো তাদেরকে তাদের বাঁকা পথেই টেনে নিয়ে যেতে থাকে এবং তাদেরকে বিভ্রান্ত করার ব্যাপারে তারা কোন ত্রুটি করে না৷ ১৫০
(৭:২০৩) হে নবী !যখন তুমি তাদের সামনে কোন নিদর্শন (অর্থাৎ মুজিযা )পেশ করো না তখন তারা বলে, তুমি নিজের জন্য কোন নিদর্শন বেছে নাওনি কেন? ১৫১ তাদেরকে বলে দাও, আমি তো কেবল সেই অহীরই আনুগত্য করি যা আমার রব আমার কাছে পাঠান৷ এটি তো অন্তরদৃষ্টির আলো তোমাদের রবের পক্ষ থেকে এবং হেদায়াত ও রহমত তাদের জন্য যারা একে গ্রহণ করে৷ ১৫২
(৭:২০৪) যখন কুরআন, তোমাদের সামনে পড়া হয়, তা শোনো মনোযোগ সহকারে এবং নীরব থাকো, হয়তো তোমাদের প্রতিও রহমত বর্ষিত হবে৷ ১৫৩
(৭:২০৫) হে নবী!তোমার রবকে স্মারণ করো সকাল-সাঁঝে মনে মনে কান্নাজড়িত স্বরে ও ভীতি বিহ্বল চিত্তে এবং অনুচ্চ কণ্ঠে৷ তুমি তাদের অন্তরভুক্ত হয়ো না যারা গাফলতির মধ্যে ডুবে আছে৷ ১৫৪
(৭:২০৬) তোমার রবের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে অবস্থানকারী ফেরেশতাগণ কখনো নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের অহংকারে তাঁর ইবাদতে বিরত হয় না, ১৫৫ বরঞ্চ তারা তাঁরই মহিমা ঘোষণা করে ১৫৬ এবং তাঁর সামনে বিনত থাকে ৷ ১৫৭
১৪৬. এখানে মুশরিকদের জাহেলিয়াত প্রসূত গোমরাহীর সমালোচনা করা হয়েছে৷ এ ভাষণটির মূল বক্তব্য হচ্ছে, মহান সর্বশক্তিমান আল্লাহই সর্বপ্রথম মানব জাতিকে সৃষ্টি করেন৷ মুশরিকরা ও একথা অস্বীকার করে না৷ তারপর পরবর্তি কালের প্রত্যেকটি মানুষকেও তিনিই অস্তিত্ব দান করেন৷ আর একথাটিও মুশরিকরা জানে৷ নারী গর্ভে শুক্রকে সংরক্ষণ ,তারপর এ সামান্য হালকা গর্ভটি লালন করে তাকে একটি জীবন্ত মানব শিশুতে পরিণত করা, এরপর সেই শিশুটির মধ্যে বিভিন্ন ধরনে শক্তি ও যোগ্যতা সৃষ্টি করে তাকে একটি সুস্থ ও পরিপূর্ণ অবয়বের অধিকারী মানুষ হিসেবে দুনিয়ার বুকে ভুমিষ্ঠ করা -এসব কিছু আল্লাহর ইচ্ছাধীন৷ মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ যদি নারীর গর্ভে সাপ, বাদর বা অন্য কোন অদ্ভুত দেহাবয়ব বিশিষ্ট জীব সৃষ্টি করে দেন অথবা মায়ের গর্ভেই শিশুকে অন্ধ , বধির বোবা , খঞ্জ করে দেন বা তার শারীরিক ,মানসিক ও আত্মিক শক্তির মধ্যে কোন ত্রুটি জন্মিয়ে দেন ,তাহলে আল্লাহর গড়া এ আকৃতিকে পরিবর্তন করার ক্ষমতা কারোর নেই৷ একক আল্লাহর অস্তিত্ব বিশ্বাসীদের ন্যায় মুশরিকরাও এ সত্যটি সম্পর্কে সমানভাবে অবগত৷ তাই দেখা যায়, গর্ভবস্থায়, সুস্থ,সবল ও নিখুঁত অবয়বধারী শিশু ভুমিষ্ঠ হবার ব্যাপারে আল্লাহর ওপরই পূর্ণ ভারসা করা হয়৷ কিন্তু সেই আশা পূর্ণ হয়ে যদি চাঁদের মত ফুটফূটে সুন্দর শিশু ভূমিষ্ঠ হয়, তাহলেও জাহেলী কর্মকাণ্ড নবতর রূপ নিয়ে আত্মাপ্রকাশ করে৷ কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে কোন দেবী অবতার অলী ও পীরের নামে নাজরানা ও শিন্নী নিবেদেন করা হয় এবং শিশুকে এমন সব নামে অভিহিত করা হয় যেন মনে হয় সে আল্লাহর নয়, বরং অন্য কারোর অনুগ্রহের ফল৷ যেমন তার নামকরণ করা হয় হোসাইন বখশ(হোসাইনের দান),পীর বখশ (পীরের দান), আবদুর রসূল (রসূলের গোলাম) আবদুল উয্যা(উয্যা দেবতার দাস) ,আবদে শামস (সূর্য দাস) ইত্যাদি ইত্যাদি৷

সূরার এ অংশটি অনুধাবন করার ব্যাপারে আরো একটি বড় ধরেনের ভুল হয়ে থাকে৷ বিভিন্ন দুর্বল হাদীসের বর্ণান এ ভুলের ভিতকে আরো শক্তিশালী করে দিয়েছে৷ শুরুতে একটি মাত্র প্রাণ থেকে মানব জাতির জন্মের সূচনা হবার কথা বলা হয়েছে৷ এ প্রথম মানব প্রাণটি হচ্ছে হযরত আদম আলাইহিস সালাম৷ তারপর তার সাথে সাথেই একটি পুরুষ ও একটি নারীর কথা বলা হয়েছে৷ তারা প্রথমে সুস্থ ও পূর্ণাবয়ব সম্পন্ন শিশুর জন্মের জন্যে আল্লাহর কাছে দোয়া করে৷ তারপর যখন শিশু ভূমিষ্ঠ হয় তখন তারা আল্লাহর দানের সাথে অন্যদেরকে ও শরীক করে নেয়৷ এ বর্ণনাভংগীর কারণে একদল লোক মনে করে নিয়েছে যে, আল্লাহর সাথে শরীককারী এ স্বামী-স্ত্রী , নিশ্চয়ই হযরত আদম হাওয়া আলাইহিস সালামই হবেন৷ মজার ব্যাপার এই যে, এ ভুল ধারণার সাথে আবার কিছু দুর্বল হাদীসের মিশ্রণ ঘটিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ গল্প রচনা করা হয়েছে৷গল্পটি এ রকম যে, হযরত হাওয়ার ছেলে মেয়ে পয়দা হবার পর মরে যেতো৷ অবশেষে এক সন্তান জন্মের পর শয়তানের প্ররোচনায় তিনি তার নাম আবদুল হারেস (শয়তানের বান্দা) রাখতে উদ্ধুদ্ধ হন৷সবচেয়ে মারাত্মক ও সর্বনাশ ব্যাপার হচ্ছে এই যে, এ হাদীসগুলোর মধ্যে থেকে কোন কোনটির সনদ খোদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত ও পৌছেয়ে দেয়া হয়েছে৷ কিন্তু মূলত এ জাতীয় সমস্ত হাদীসই ভুল৷ কুরআনের বক্তব্য ও এর সমর্থন করে না৷ কুরআন কেবল এতটুকুই বলছেঃ মানব জাতির যে প্রথম দম্পত্তির মাধ্যমে পৃথিবীতে মানব বংশের সূচনা হয়েছিল তার স্রষ্টাও ছিলেন আল্লাহ অন্য কেই নয়৷ তাই সৃষ্টিকর্মে কেউ তার সাহায্যকারী ছিল না৷তারপর প্রত্যেকটি পুরুষ ও নারীর মিলনে যে শিশু জন্ম নেই তার স্রষ্টাও সেই একই আল্লাহ যার সাথে কৃত অঙ্গীকারের ছাপ তোমাদের সবার হৃদয়ে সংরক্ষিত আছে৷ তাই এ অংগীকারের কারণে তোমরা আশা -নিরাশার দোলায় আন্দোলিত হয়ে যখন দোয়া করো তখন সেই আল্লাহর কাছেই দোয়া করে থাকো৷ কিন্তু পরে আশা পূর্ণ হয়ে গেলে তোমাদের মাথায় আবার শিরকের উদ্ভব হয় ৷এ আয়াতে মুশরিকদের প্রত্যেকটি পুরুষ ও নারীর অবস্থা এখানে তুলে ধরা হয়েছে৷

এ প্রসঙ্গে আর একটি কথাও প্রনিধানযোগ্য৷ এসব আয়াতে আল্লাহ যাদের নিন্দাবাদ করেছেন তারা ছিল আরবের মুশরিক সম্প্রদায়৷তাদের অপরাধ ছিল তারা সুস্থ , সবল ও পূর্ণবয়ব সম্পন্ন সন্তান জন্মের জন্যে আল্লাহর কাছে দোয়া করতো কিন্তু সন্তানের জন্মের পর আল্লাহর এ দানে অন্যদের কে অংশীদার করতো৷ নিসন্দেহে তাদের এ অবস্থা ছিল অত্যন্ত খারাপ৷ কিন্তু বর্তমানে তাওহীদের দাবীদারদের মধ্যে আমরা যে শিরকের চেহারা দেখছিল তা তার চাইতেও খারাপ৷ এ তাওহীদের তথাকথিত দাবীদাররা সন্তানও চায় আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যদের কাছে৷ গর্ভ সঞ্চারের পর আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যদের নামে মানত মানে এবং সন্তান জন্মের পর তাদেরই আস্তানায় যেয়ে নজরানা নিবেদন করে৷এরপরও জাহেলী যুগের আরবরাই ছিল কেবল মুশরিক আর এরা নাকি পাক্কা তাওহীদবাদী!তাদের জন্যে জাহান্নাম অবধারিত ছিল আর এদের জন্যে রয়েছে,নাজাতের গ্যারান্টি ,তাদের গোমরাহীর কঠোর সমালোচনা ও নিন্দা করা হয় কিন্তু এদের গোমরাহীর সমালোচনা করলে ধর্মীয় নেতাদের দরবারে বিরাট অস্তিরতা দেখা দেয়৷ কবি আলতাফ হোসাইন হালী তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ 'মুসাদ্দাস' -এ এ অবস্থারই চিত্র এঁকেছেনঃ

-------------------------------------

অন্যে করে মুর্তি পূজা

সে হয় কাফের সন্দেহ নাই

অন্য বানায় খোদার পুত্র

সে হয় কাফের সন্দেহ নেই

অগ্নিতে যে নোয়ায় মাথা

সে হয় কাফের সন্দেহ নেই

তারার শক্তি মানলে তুমি

কাফের হবে সন্দেহ নেই,

কিন্তু মুমিন তারা তাই প্রশস্ত এসব পথই তাদের জন্যে

করুক পূজা ইচ্ছা যাকে অনেক খোদার ভিন্ন ভিন্ন!

নবীকে বসাও যদি আল্লাহর আসনে

ইমামকে বসাও যদি নবীজির সামনে

পীরের মাজারে চাও সিন্নী চড়াও

শহীদের কবরে গিয়ে দোয়া যদি চাও

তবুও তাওহীদের গায়ে লাগে না আঁচড়

ঈমান অটুট থাকে ইসলাম অনঢ়৷
১৪৭. অর্থাৎ মুশরিকদের বাতিল মাবুদের অবস্থা হচ্ছে এই যে, তাদের পক্ষে কাউকে সঠিক পথ দেখানো এবং নিজেদের অনুগামী ও পূজারীদেরকে পথের সন্ধান দেয়া তো দূরের কথা, তারা তো কোন পথপ্রদর্থকের অনুসরণ করারও যোগ্যতা রাখে না৷ এমন কি কোন আহবানকারীর আহবানের জবাব দেবার ক্ষমতাও তাদের নেই৷
১৪৮. এখানে একটি কথা পরিষ্কারভাবে বুঝে নিতে হবে৷ শিরক আশ্রিত ধর্মগুলোয় তিনটি জিনিস আলাদা আলাদা পাওয়া যায়, এক, যেসব মূর্তি ছবি বা নিদর্শনকে পূজা করা হয় এবং সেগুলোকে কেন্দ্র করে সমগ্র পূজা কর্মটি অনুষ্ঠিত হয়৷ দুই, যেসব ব্যক্তি, আত্মা বা ভাবদেবীকে আসল মাবুদ গণ্য করা হয়৷ এবং মুর্তি ছবি ইত্যাদির মাধ্যমে যেগুলোর প্রতিনিধিত্ব করা হয়৷ তিন, এসব মুশরিকী পূজা অনুষ্ঠিনাদির গভীরে যেসব আকীদা বিশ্বাস কার্যকর থাকে৷ কুরআনর বিভিন্ন পদ্ধতিতে এ তিনটি জীনিসের ওপর আঘাত হেনেছে৷ তবে এখানে তার সমালোচনার লক্ষ হচ্ছে প্রথম জিনিসটি৷ অর্থাৎ মুশরিকরা যেসব মুর্তির সামনে পূজার অনুষ্ঠানাদি সম্পন্ন করে এবং যাদের সামনে নিজেদের আবেদন নিবেদন ও নজরানা পেশ করে তাদেরকেই এখানে সমালোচনার বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে৷
১৪৯. মুশরিকরা নবী (সা)কে যে হুমকি দিয়ে আসছিল এটা হচ্ছে তার জবাব ৷ তারা বলতো , যদি তুমি আমাদের এসব মাবুদের বিরোধিতা করা থেকে বিরত না হও এবং তাদের বিরুদ্ধে লোকদের বিশ্বাস এভাবে নষ্ট করে যেতে থাকো, তাহলে তুমি তাদের গযবের শিকার হবে এবং তারা তোমাকে একেবারে নেস্তানুবাদ করে দেবে৷
১৫০. এ আয়াতগুলোতে নবী (সা) কে প্রচার ,পথনিদির্শনা দান সংস্কার ও সংশোধন কৌশলের কতিপয় গুরুত্ব বিষয় জানিয়ে দেয়া হয়েছে৷কেবল নবী (সা) কে নয়, বরং নবী (সা) এর স্থালাভিসিক্ত হয়ে যেসব লোক দুনিয়াবসীকে সঠিক পথ দেখাবার দায়িত্ব পালন করার জন্যে এগিয়ে আসবে তাদেরকে ও তারই মাধ্যমে এ একই কৌশল শিখানোও এর উদ্দেশ্য৷ এ বিষয়গুলোকে ধারাবাহিকভাবে বিশ্লেষণ করা যায়ঃ

(১)ইসলামের আহবায়কের জন্যে যে গুণগুলো সবচেয়ে বেশী প্রয়োজনীয় সেগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে, তাকে কোমল স্বভাবের সহিষ্ণু ও উদার হৃদয় হতে হবে৷ তাকে হতে হবে নিজের সংগী -সহযোগীদের জন্যে স্নেহশীল,সাধারণ মানুষের জন্যে দয়াদ্র হৃদয় এবং নিজের বিরোধীদের জন্যে সহিষ্ণু ৷ নিজের সাথীদের দুবর্লতাগুলোও তাকে সহ্য করে নিতে হবে এবং নিজের বিরোধীদের কঠোর ব্যবহারকেও৷ চরম উত্তেজনাকর অবস্থার মধ্যেও তার নিজের আচরণ ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে৷ অত্যন্ত বিরক্তিকর ও অপছন্দনীয় কথাগুলোও উদার মনে এড়িয়ে যেতে হবে৷বিরোধীদের পক্ষ থেকে যতই কড়া ভাষায় কথা বলা হোক, যতই দোষারূপ করা ও মনে ব্যাথা দেয়া হোক এবং যতই বর্বরোচিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা হোক না কেন,তাকে অবশ্যি এসব কিছুকে উপেক্ষার দৃষ্টিতে দেখতে হবে৷ কঠোর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা, কর্কশ আচরণ করা, তিক্ত ও কড়া কথা বলা এবং প্রতিশোধমূলক মানসিক উত্তেজনায় ভোগা এ কাজের জন্যে বিষতুল্য৷ এতে গোটা কাজ পণ্ড হয়ে যায়৷ এ জিনিসটিকে নবী (সা) এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ আমার রব আমাকে হুকুম দিয়েছেন, আমি যেন ক্রোধ ও সন্তুষটি উভয় অবস্থায়ই ইনসাফের কথা বলী, যে আমার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে তার সাথে সম্পর্ক জুড়ি ,যে আমাকে আমার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে তাকে তার অধিকার দান করি, যে আমার প্রতি জুলুম করে আমি তাকে মাফ করে দেই৷ইসলামের কাজে তিনি নিজের পক্ষ থেকে যাদেরকে পাঠাতেন তাদেরকেও এ একই বিষয়গুলো মেনে চলার নির্দেশ দিতেন৷ তিনি বলেনঃ

-----------------------------

যেখানে তোমরা যাবে সেখানে তোমাদের পদার্পণ যেন লোকদের জন্যে সুসংবাদ হিসেবে দেখা দেয়, তা যেন লোকদের মধ্যে ঘৃণার সঞ্চার না করে৷ লোকদের জীবন যেন তোমাদের কারণে সহজ হয়ে যায়, কঠিন ও সংকীর্ণ হয়ে না পড়ে৷

আল্লাহ নিজে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ গুণেরই প্রশংসা করেছেনঃ

------------------------------------

আল্লাহর রহমতে তুমি তাদের জন্যে কোমল প্রমাণিত হয়েছো, নয়তো যদি তোমার ব্যবহার কর্কশ হতো এবং তোমার মন হতো সংকীর্ণ ও অনুদার, তাহলে এসব লোক তোমার চারদিক থেকে সরে যেতো৷ -(আল ইমরানঃ ১৫৯)

(২)সত্যের দাওয়াতের সাফল্যের মূলমন্ত্র হচ্ছে, দাওয়াতদানকারীরা দার্শনিক তত্ব ও সূক্ষাতিসুক্ষ্ম তত্বালোচনার পরিবর্তে লোকদেরকে এমনসব সহজ সরল সৎকাজের নির্দেশ দেবেন যা সবার কাছে সৎকাজ হিসেবে পরিচিত অথবা যাদের সৎকাজ হবার ব্যাপারি বুঝার জন্যে প্রত্যেক মানুষের সাধারণ জ্ঞানই (Common sence )যথেষ্ট হয়৷ এভাবে সত্যের আহবায়কের আবেদন সাধারণ -অসাধারণ নির্বিশেষে সবাইকে প্রভাবিত করে এবং প্রত্যেকটি শ্রোতার কান থেকে হৃদয় অভ্যন্তরে প্রবেশের পথ সে নিজেই তৈরী করে নেয়৷ এ ধরনের পরিচিত সৎকর্মের দাওয়াতের বিরুদ্ধে যারা প্রতিবাদের ঝড় তোলে তারা নিজেরাই নিজেদের ব্যর্থতা ও এ দাওয়াতের সাফল্যের পথ প্রসস্ত করে৷ কারণ সাধারণ মানুষ যতই বিদ্বেষ ভাবাপন্ন হোক না কেন যখন তারা দেখে যে, একদিকে সৎ,ভ্দ্র ও উন্নত নৈতিক চরিত্রের অধিকারী এক ব্যক্তি সরল সহজভাবে সোজাসুজি সৎকাজের দাওয়াত দিচ্ছে এবং অন্যদিকে এক দল লোক তার বিরোধিতায় নেমে এমন পদ্ধতি অবলম্বন করছে যা নৈতিকতা ও মানবতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী ,তখন স্বাভাবিকভাবেই ধীরে ধীরে সত্য বিরোধীদের প্রতি তাদের মন বিরূপ হয়ে উঠতে থাকে এবং সত্যের আহবায়কের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যেতে থাকে৷ এমনকি শেষ পর্যন্ত মোকাবিলার ময়দানে কেবলমাত্র এমন সব লোক থেকে যায়, বাতিল ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠার মধ্যে যাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ নিহিত অথবা পূর্ববর্তীদের অন্ধ অনুসরণের প্রেরণা ও জাহেলী বিদ্বেষ যাদের মনে যে কোন ধরনের আলো গ্রহণ করা ক্ষমতা বিণষ্ট করে দিয়েছে৷ এ কর্মকৌশলের বদৌলতেই নবী (সা) আরবে সাফল্য অর্জন করেন এবং তারপর মাত্র কিছু দিনের মধ্যে নিকটবর্তি দেশগুলোয় ইসলাম এমনভাবে বিস্তার লাভ করে যে, সেখানে কোথাও মুসলমানদের সংখা দাঁড়ায় শতকরা একশ ভাগ, কোথাও নব্বই ভাগ এবং কোথাও আশি ভাগ৷

(৩) সত্যের এ দাওয়াতের ক্ষেত্রে যেখানে একদিকে ন্যায় ও কল্যাণ অনুসন্ধানীদেরকে সৎকাজের দিকে উদ্ধুদ্ধ করা জরুরী , সেখানে মূর্খদের সাথে কোন প্রকার সংঘর্ষ ও বিরোধে জড়িয়ে না পড়াও অপরিহার্য , যতই তারা সংঘর্ষ ও বিরোধ সৃষ্টি করার জন্যে যত চেষ্টাই করুক৷ যারা ন্যায়সংগতভাবে বুদ্ধি বিবেচনার সাথে বক্তব্য অনুধাবন করতে চায় আহবায়কের উচিত একমাত্র তাদেরই সম্বোধন করা৷এ ব্যাপারে তাকে অতি সাবধানী হতে হবে৷ অন্যদিকে যখন কোন ব্যক্তি নিরেট মূর্খের মত ব্যবহার শুরু করে দেয় তর্ক বিতর্ক গোয়ার্তুমি ,ঝগড়-ঝাটি ও গালিগালাজের পর্যায়ে মেনে আসে তখন আহবায়কের তার প্রতিদ্বন্দ্বীর ভুমিকায় অবতীর্ণ হতে অস্বীকার করা উচিত৷কারণ এতে ক্ষতির সম্ভবনা রয়েছে ৷ কারণ আহবায়কের যে শক্তি ইসলামী দাওয়াত সম্প্রসারণ ও ব্যক্তি চরিত্র সংশোধনের কাজে ব্যয়িত হওয়া উচিত তা অযথা এ বাজে কাজে ব্যয় হয়ে যায়৷

(৪)তিন নম্বরে নির্দেশ দেয়া হয়েছে সেই প্রসংগে আরো নির্দেশ হচ্ছে এই যে,সত্যের আহবায়ক যখনই বিরোধিদের জুলুম ,নির্যাতন ও অনিষ্টকর কার্যকলাপ এবং তাদের মূর্খতা প্রসূত অভিযোগ -আপত্তির কারণে মানসিক উত্তেজনা অনুভব করতে তখনই তার বুঝে নেয়া উচিত যে, এটি শয়তানের উস্কানি ছাড়া আর কিছুই নয়৷ তখনই তার আল্লাহর কাছে এ মর্মে আশ্রয় চাওয়া উচিত যে, আল্লাহ যেন তার বান্দাকে এ উত্তেজনার স্রোতে ভাসিয়ে না দেনএবং তাকে এমন অসংযমী ও নিয়ন্ত্রনবিহীন না করেন যার ফলে সে সত্যের দাওয়াতকে ক্ষতিগ্রস্ত করার মত কোন কাজ করে বসে৷সত্যের দাওয়াতের কাজ ঠাণ্ডা মাথাই করা যেতে পারে৷ আবেগ -উত্তেজনার বশবর্তি না হয়ে পরিবেশ পরিস্থিতি এবং সময় -সুযোগ দেখে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করে যে পদক্ষেপটি নেয়া হয় একমাত্র সেটিই সঠিক হতে পারে৷ কিন্তু শয়তান যেহেতু এ কাজটির উন্নতি কখনো দুচোখে দেখতে পারে না তাই সে হামেশা নিজের সংগী -সাথীদের সাহায্যে সত্যের আহবায়কের ওপর নানান ধরনের আক্রমণ পরিচালনার চেষ্টা চালায়৷আবার প্রত্যেকটি আক্রমণের পর সে আহবায়ককে এই বলে ক্ষেপাতে থাকে যে, এ আক্রমণের জবাব তো অবশ্যই দেয়া দরকার৷ আহবায়কের মনের দুয়ারে শয়তানের এ আবেদন অধিকাংশ সময় অতিশয় প্রতারণাপূর্ণ ব্যাখ্যা ও ধর্মীয় সংস্কারের মোড়কে আবৃত হয়ে আসে ৷ কিন্তু এর গভীরে সংকীর্ণ স্বার্থপ্রীতি ছাড়া আর কিছুই থাকে না ৷ তাই শেষ দু আয়াতে বলা হয়েছেঃ যারা মুক্তাকী (অর্থাৎ আল্লাহকে ভয় করে কাজ করে এবং অসৎকাজ থেকে দূরে থাকতে চায়) তারা নিজেদের মনে কোন শয়তানী প্ররোচানার প্রভাব এবং কোন অসৎ চিন্তার ছোয়া অনুভব করতেই সাথে সাথেই সজাগ হয়ে ওঠে৷ তারপর এ পর্যায়ে কোন ধরনের কর্মপদ্ধতি অবলম্বনে দীনের স্বার্থ রক্ষিত হবে এবং সত্য প্রীতির অংগাংগীভাবে জড়িত এবং এ জন্যে শয়তানের সাথে যাদের ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে তারা অবশ্যি শয়তানী প্ররোচনার মোকাবিলায় টিকে থাকতে পারে না৷ এবং তার কাছে পরাজিত হয়ে ভুল পথে পা বাড়ায়৷তারপর শয়তান তাদেরকে নাকে রশি লাগিয়ে যেখানে ইচ্ছা ঘোরাতে থাকে এবং কোথাও গিয়ে স্থির হতে দেয় না৷বিরোধীদের প্রত্যেকটি গালির জবাবে তাদের কাছে গালির স্তুপ এবং তাদের প্রত্যেকটি অপকৌশলের জবাবে তার চাইতেও বড় অপকৌশল তাদের কাছে তৈরী থাকে৷

এ বক্তব্যের একটি সাধারণ প্রয়োগ ক্ষেত্রেও রয়েছে৷ মুক্তাকী লোকেরা নিজেদের জীবনে সাধারণত অমুত্তাকী লোকদের থেকে ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকে৷ যারা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ কে ভয় করে এবং সর্বান্তকরণে অসৎকাজ থেকে দূরে থাকতে চায় তাদের মনে কখনো অসৎ চিন্তার সামান্যতম স্পর্শও লাগে তাহলে তাদের মনকে তা ঠিক তেমনিভাবে আহত করে যেমন আঙুলে কাঁটা বিঁধে গেলে বা চোখে বালির কণা পড়লে মানুষ যন্ত্রনা বোধ করে৷ যেহেতু তারা অসৎ চিন্তা ,অসৎ কামনা-বাসনা ও অসৎ সংকল্প করতে অভ্যস্ত নয় তাই জিনিসগুলো তাদের জন্যেআঙুলে কাঁটা ফুটে যাওয়া, চোখে বালি পড়া অথবা স্পর্শকাতর ও পরিচ্ছন্নতা প্রিয় ব্যক্তির কাপড় কালির দাগ লেগে যাওয়া বা ময়লার ছিঁটে পড়ার মত অস্বস্তিকর বোধ হয়৷ তারপর তাদের মনে এভাবে অস্বস্তির কাঁটা যাবার পর তাদের চোখ খুলে যায় এবং তাদের বিবেক জেগে উঠে , অসৎ প্রবণতা এ ধূলোমোটি ফেলার কাজে ব্যাপৃত হয়৷ অন্যদিকে যারা আল্লাহকে ভয় করে না, অসৎকাজ থেকে বাঁচতেও চায় না এবং শয়তানের সাথে নিবিড় সম্পর্কও কায়েম করে রেখেছে তাদের মনে অসৎ চিন্তা ,অসৎ সংকল্প ও অসৎ উদ্দেশ্য পরিপক্কতা লাভ করতে থাকে এবং তারা এসব পচা দুর্গন্থময় আবর্জনায় কোন প্রকার অস্বস্তি অনুভব করে না৷তাদের অবস্থা হয় ঠিক তেমনি যেমন কোন ডেকচিতে শুয়োরের মাংস রান্না করা হচ্ছে কিন্তু ডেকচি এর কোন খবরই রাখে না যে, তার মধ্যে কি রান্না হচ্ছে৷ অথবা কোন ধাঙড়ের সারা দেহ ও কাপড় চোপড় ময়লায় ভরে গেছে এবং তা থেকে ভীষণ দুর্গন্ধও বেরুচ্ছে কিন্তু তার মধ্যে কোন অনুভুতিই নেই যে, সে কিসের মধ্যে আছে৷
১৫১. কাফেদের এ প্রশ্নের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট বিদ্রুপের ভাব ফুটে উঠেছিল৷ অর্থাৎ তাদের কথাটার অর্থ ছিলঃ আরে মিয়া! তুমি যেভাবে নবী হয়ে বসেছো ঠিক তেমনিভাবে নিজের জন্যে একটি মুজিযাও বেছে খুটে সাথে নিয়ে এলে পারতে৷ কিন্তু এ বিদ্রুপের জবাব কিভাবে দেয়া হয়েছে তা দেখুন৷
১৫২. অর্থাৎ যে জিনিসটির চাহিদা দেখা দেয় বা আমি নিজে যার প্রয়োজন অনুভব করি সেটি আমি নিজে উদ্ভাবন বা তৈরী করে পেশ করে দেবো, এটা আমার কাজ নয়৷ আমি তো একজন রসূল -আল্লাহর প্রেরিত৷ আমার দায়িত্ব কেবল এতটুকু যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করে যাবো৷ মুজিযার পরিবর্তে আমরা প্রেরণকারী আমার কাছে এ কুরআন পাঠিয়েছেন৷ এর মধ্যে আছে অন্তদৃষ্টির আলো৷ এর প্রধানতম বৈশিষ্ট হচ্ছে এই যে,যারা একে মেনে নেয় তারা জীবনের সঠিক সরল পথ পেয়ে যায় এবং তাদের নৈতিক বৃত্তির আল্লাহর অনুগ্রহের নিদর্শন সুষ্পষ্ট ভাবে প্রকাশিত হতে থাকে৷
১৫৩. অর্থাৎ বিদ্বেষ, স্বার্থপরতা ও হঠকারিতার কারনে তোমরা কুরআনের বানী শুনতেই যে কানে আঙুল দাও এবং নিজেরা না শুনার ও অন্যদের না শুনতে দেয়ার উদ্দেশ্যে যে হৈ চৈ ও শোরগোল শুরু করে থাকো, এ নীতি পরিহার করো৷ বরং কুরআনের বাণী গভীর মনোযোগ সহকারে শোনো এবং তার শিক্ষা অনুধাবন করো৷ এর শিক্ষার সাথে পরিচিত হবার পর ঈমানদারদের মত তোমাদের নিজেদেরও এর রহমতের অংশীদার হয়ে যাওয়া কোন বিচিত্র ব্যাপার নয়৷ বিরোধীদের বিদ্রুপাত্মাক বক্রোক্তির জবাবে এটি এমন একটি মার্জিত মধুর ও হৃদয়গ্রাহী প্রচার নীতি, যার চমৎকারিত্ব বর্ণনা করে শেষ করা যায় না৷ যে ব্যক্তি প্রচার কৌশল শিখতে চায় গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে এ জবাব থেকে সে তা শিখতে পারে৷ এআয়াতের মূল উদ্দেশ্য তো আমি ওপরে বর্ণনা করেছি৷ কিন্তু পরোক্ষভাবে এ থেকে এ বিধানও পাওয়া যায় যে, যখন আল্লাহর কালাম পাঠ করা হয় তখন লোকদের আদব সহকারে নীরব থাকা এবং মনোযোগ সহকারে তা শোনা উচিত৷ এ থেকে এ কথাটিও প্রমাণিত হয় যে, নামাযের মধ্যে ইমাম যখন কুরআন তেলাওয়াত করতে থাকেন তখন মুকতাদীদের নীরবে শোনা উচিত৷ কিন্তু এ বিষয়ে ইমামদের মধ্যে বিভিন্ন মতের সৃষ্টি হয়েছে৷ ইমাম আবু হানিফা (রা) এবং তার সাথীদের মতে ইমামদের কেরাআত উচ্চস্বরে হোক বা অনুচ্ছ স্বরে হোক সব অবস্থায় মুকতাদীদের নীরব থাকতে হবে৷ইমাম মালিক (র) ও ইমাম আহমদের (র) মতে কেবলমাত্র ইমাম যখন উচ্চ স্বারে কেরআত পড়বেন তখনই মুকতাদীদের নীরবে থাকতে হবে৷ কিন্তু ইমাম শাফীঈ (র) বলেন, ইমামের উচ্চ ও অনুচ্চ স্বরে কেরাআত পড়ার উভয় অবস্থায়ই মুকতাদীদের কেরাআত পড়তে হবে৷ কারণ কোন কোন হাদীসের ভিত্তিতে তিনি মনে করেন,যে ব্যক্তি নামাযে সূরা ফাতেহা পড়ে না তার নামায হয় না৷
১৫৪. স্মরণ করা অর্থ নামাযও এবং অন্যান্য ধরনের স্মরণ করাও৷ চাই মুখে মুখে বা মনে মনে যে কোনভাবেই তা হোক না কেন৷ সকাল -সাঝ বলতে নির্দিষ্টভাবে এ দুটি সময়ও বুঝানো হয়ে থাকতে পারে৷ আর এ দু সময়ে আল্লাহর স্মরণ বলতে বুঝানো হয়েছে নামাযকে৷ পক্ষান্তরে সকাল সাঁঝ কথাটা সর্বক্ষণ অর্থেও ব্যবহৃত হয়এবং তখন এর অর্থ হয় সবসময় আল্লাহর স্মরণে মশগুল থাকা৷ এ ভাষণটির উপসংহারে সর্বশেষ উপদেশ হিসেবে এটা বলা হয়েছে ৷ এর উদ্দেশ্য বর্ণনা প্রসংগে বলা হয়েছে তোমাদের অবস্থা যেন গাফেলদের মত না হয়ে যায়৷ দুনিয়ায় যা কিছু গোমরাহী ছড়িয়েছে এবং মানুষের নৈতিক চরিত্রে ও কর্মকাণ্ডে যে বিপর্যয়ই সৃষ্টি হয়েছে তার একমাত্র কারণ হচ্ছে,মানুষ ভুলে যায় , আল্লাহ তার রব সে আল্লাহর বান্দা , দুনিয়ায় তাকে পরীক্ষা করার জন্যে পাঠানো হয়েছে এবং দুনিয়ার জীবন শেষ হবার পর তাকে তার রবের কাছে হিসেব দিতে হবে৷কাজেই যে ব্যক্তি নিজেও সঠিক পথে চলতে চায় এবং দুনিয়ার অন্যান্য মানুষকেও তদনুসারে চালাতে চায় সে নিজে যেন কখনো এ ধরনের ভুল না করে, এ ব্যাপারে তাকে কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে৷ এ জন্যেই নামায ও আল্লাহর যিকিরের মাধ্যমে সব সময় স্থায়ীভাবে আল্লাহর প্রতি আকৃষ্ট থাকার ও তাঁর সাথে সম্পর্ক রাখার জন্যে বার বার তাকীদ করা হয়েছে৷
১৫৫. এর অর্থ হচ্ছে,শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার করা ও রবের বন্দেগী থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া শয়তানের কাজ৷ এর ফলে হয় অধপতন ও অবনতি৷ পক্ষান্তরে তার আল্লাহর সমানে ঝুঁকে পড়া এবং তাঁর বন্দেগীতে অবিচল থাকা একটি ফেরেশতাসূলভ কাজ৷ এর ফল হয় উন্নতি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভ৷ যদি তোমরা এ উন্নতি চাও তাহলে নিজেদের কর্মনীতিকে শয়তানের পরিবর্তে ফেরেশতাদের কর্মনীতির অনুরূপ করে গড়ে তোল৷
১৫৬. মহিমা ঘোষণা করে অর্থাৎ আল্লাহ যে ক্রটিমুক্ত, দোষমুক্ত, ভুলমুক্ত সব ধরনের দুর্বলতা থেকে তিনি যে একেবারেই পাক-পবিত্র এবং তিনি যে লা -শরীক , তুলনাহীন ও অপ্রতিদ্বন্দ্বি এ বিষয়টি সর্বান্তকরণে মেনে নেয়৷মুখে তার স্বীকৃতি দেয় ও অংগীকার করে এবং স্থায়ী ভাবে সবসময় এর প্রচার ও ঘোষনায় সোচ্চার থাকে৷
১৫৭. এ ক্ষেত্রে শরীয়তের বিধান এই যে, যে ব্যক্তি এ আয়াতটি পড়বে বা শুনবে তাকে সিজদা করতে হবে৷ এভাবে তার অবস্থা হয়ে যাবে আল্লাহর নিকটতম ফেরেশতাদের মত৷ এভাবে সারা বিশ্ব জাহানের ব্যবস্থাপনা পরিচালনাকারী কর্মীরা যে মহান আল্লাহর সামনে নত হয়ে আছে তারাও তাদের সাথে তাঁর সামনে নত হয়ে যাবে এবং নিজেদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সংগে সংগেই একথা প্রমাণ করে দেবে যে, তারা কোন অহমিকায় ভোগে না এবং আল্লাহর বান্দেগী থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়াও তাদের স্বভাব নয়৷

কুরআন মজীদে চৌদ্দটি স্থানে সিজদার আয়াত এসেছে৷ এ আয়াতগুলো পড়লে বা শুনলে সিজদা করতে হবে, এটি ইসলামী শরীয়াতের একটি বিধিবদ্ধ বিষয়,এ ব্যাপারে সবাই একমত৷তবে এ সিজদা ওয়াজিব হবার ব্যাপারে বিভিন্ন মত রয়েছে৷ ইমাম আবু হানীফা, (র) তেলাওয়াতে সিজদাকে ওয়াজিব বলেন৷ অন্যান্য উলামা বলেন এটি সুন্নত৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনেক সময় একটি বড় সমাবেশ কুরআনে পড়তেন এবং সেখানে সিজদার আয়াত এলে তিনি নিজে তৎক্ষণাৎ সিজদা করতেন এবং সাহাবীগণএর যিনি যেখানে থাকতেন তিনি সেখানেই সিজদানত হতেন৷এমনকি কেউ কেউ সিজদা করার জায়গা না পেয়ে নিজের সামনের ব্যক্তির পিঠের ওপর সিজদা করতেন৷ হাদীসে একথাও এসেছে, মক্কা বিজয়ের সময় তিনি কুরআন পড়েন৷ সেখানে সিজদার আয়াত এলে যারা মাটির ওপর দাঁড়িয়েছিলেন তারা মাটিতে সিজদা করেন এবং যারা ঘোড়ারও উটের পিঠে সওয়ার ছিলেন তারা নিজেদের বাহনের পিঠেই ঝুঁকে পড়েন৷ কখনো নবী (সা) খুতবার মধ্যে সিজদার আয়াত পড়তেন, তখন মিম্বার থেকে নেমে সিজদা করতেন তারপর আবার মিম্বরের ওপর উঠে খুতবা দিতেন৷

অধিকাংশ আলেমের মতে নামাযের জন্যে যেসব শর্ত নির্ধারিত এ তেলাওয়াতের সিজাদার জন্যও তাই নির্ধারিত ৷ অর্থাৎ অযুসহকারে কিবলার দিকে মুখ করে নামাযের সিজদার মত করে মাটিতে মাথা ঠেকাতে হবে৷কিন্তু তেলাওয়াতের সিজদার অধ্যায়ে আমরা যতগুলো হাদীস পেয়েছি সেখানে কোথাও এ শর্তগুলোর স্বপক্ষে কোন প্রমাণ নেই৷ সেখান থেকে তো একথাই জানা যায় যে, সিজদার আয়াত শুনে যে ব্যক্তি যেখানে যে অবস্থায় থাকে সে অবস্থায়ই যেন সিজদা করে - তার অযু থাক বা না থাক,কিবলামুখী হওয়া তার পক্ষে সম্ভব হোক বা না হোক, মাটিতে মাথা রাখার সুযোগ পাক বা না পাক তাতে কিছু আসে যায় না৷ প্রথম যুগের আলেমদের মধ্যেও আমরা এমন অনেক লোক দেখি যারা এভাবেই তেলাওয়াতের সিজদা করেছেন৷ ইমাম বুখারী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) সম্পর্কে লিখেছেন, তিনি অযু ছাড়াই তেলাওয়াতের সিজদা করতেন৷কাতহূল বারীতে আবু আবদুর রহমান সুলামী সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিনি পথ চলতে কুরআন মজীদ পড়তেন এবং কোথাও সিজদার আয়াত এলেই মাথা ঝুঁকিয়ে নিতেন৷ অযু সহকারে থাকুন বা থাকুন এবং কিবলার দিকে মুখ ফিরানো থাক বা না থাক, তার পরোয়া করতেন না৷ এসব কারণে আমি মনে করি, যদিও অধিকাংশ আলেমদের মতটিই অধিকতর সতর্কমূলক তবুও কোন ব্যক্তি যদি অধিকাংশ আলেমের মতের বিপরিত আমল করে তাহলে তাকে তিরস্কার করা যেতে পারে না৷ কারণ অধিকাংশ আলেমদের মধ্যে এমনসব লোকও পাওয়া গেছে যাদের রীতি ছিল পরবর্তীকালের অধিকাংশ আলেমদের থেকে ভিন্নতর৷