(৭:১৭২) আর হে নবী! ১৩৩ লোকদের স্মরণ করিয়ে দাও সেই সময়ের কথা যখন তোমাদের রব বনী আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদের বের করিয়েছিলেন এবং তাদেরকে তাদের নিজেদের ওপর সাক্ষী বানিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ আমি কি তোমাদের রব নই? তারা বলেছিলঃ নিশ্চয়ই তুমি আমাদের রব , আমরা এর সাক্ষ দিচ্ছি৷ ১৩৪ এটা আমি এ জন্য করেছিলাম যাতে কিয়ামতের দিন তোমরা না বলে বসো, আমরা তো একথা জানতাম না ৷
(৭:১৭৩) অথবা না বলে ওঠো, শিরকের সূচনা তো আমাদের বাপ -দাদারা আমাদের পূর্বেই করেছিলেন এবং পরবর্তীকালে তাদের বংশে আমাদের জন্ম হয়েছে৷ তবে কি ভ্রষ্টাচারী লোকেরা যে অপরাধ করেছিল সে জন্য তুমি আমাদের পাকড়াও করছো? ১৩৫
(৭:১৭৪) দেখো, এভাবে আমি নিদর্শনসমূহ সুষ্পষ্টভাবে পেশ করে থাকি৷ ১৩৬ আর এ জন্য করে থাকি যাতে তারা ফিরে আসে৷ ১৩৭
(৭:১৭৫) আর হে মুহাম্মাদ! এদের সামনে সেই ব্যক্তির অবস্থা বর্ণনা করো যাকে আমি দান করেছিলাম আমার আয়াতের জ্ঞান৷ ১৩৮ কিন্তু সে তা যথাযথভাবে মেনে চলা থেকে দূরে সরে যায়৷ অবশেষে শয়তান তার পিছনে লাগে৷ শেষ পর্যন্ত সে বিপথগামীদের অন্তরভুক্ত হয়েই যায়৷
(৭:১৭৬) আমি চাইলে ঐ আয়াতগুলোর সাহায্যে তাকে উচ্চ মর্যাদ দান করতাম কিন্তু সে তো দুনিয়ার প্রতিই ঝুঁকে রইল এবং নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করলো৷ কাজেই তা অবস্থা হয়ে গেল কুকুরের মত , তার ওপর আক্রমণ করলেও সে জিভ ঝুলিয়ে রাখে আর আক্রমণ না করলেও জিভ ঝুলিয়ে রাখে৷ ১৩৯ যারা আমার আয়াতকে মিথ্যা সাব্যস্ত করে তাদের দৃষ্টান্ত এটাই৷ তুমি এ কাহিনী তাদেরকে শুনাতে থাকো, হয়তো তারা কিছু চিন্তা -ভাবনা করবে৷
(৭:১৭৭) যারা আমার আয়াতকে মিথ্যা বলেছে তাদের দৃষ্টান্ত বড়ই খারাপ এবং তার নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম চালিয়ে গেছে৷
(৭:১৭৮) আল্লাহ যাকে সুপথ দেখান সে-ই সঠীক পথ পেয়ে যায় এবং যাকে আল্লাহ নিজের পথনির্দশনা থেকে বঞ্চিত করেন সে-ই ব্যর্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে৷
(৭:১৭৯) আর এটি একটি অকাট্য সত্য যে, বহু জিন ও মানুষ এমন আছে যাদেরকে আমি জাহান্নামের জন্যই সৃষ্টি করেছি৷ ১৪০ তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা উপলব্ধি করে না৷ তাদের চোখ আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা দেখে না৷ তাদের কান আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা শোনে না৷তারা পশুর মত বরং তাদের চাইতেও অধম৷ তারা চরম গাফলতির মধ্যে হারিয়ে গেছে৷
(৭:১৮০) ভাল নামগুলো ১৪১ আল্লাহর জন্য নির্ধারিত৷ সুতরাং ভাল নামেই তাঁকে ডাকো এবং তাঁর নাম রাখার ব্যাপারে যারা সত্য থেকে বিচ্যুত হয়ে যায় তাদেরকে বর্জন কর৷ তারা যা কিছু করে এসেছে ৷ তার ফল অবশ্যি পাবে৷ ১৪২
(৭:১৮১) আমার সৃষ্টির মধ্যে একটি দল এমনও আছে যে, যথার্থ সত্য অনুযায়ী পথনির্দেশ দেয় এবং সত্য অনুযায়ী বিচার করে৷
১৩৩. পূর্ববর্তী আলোচনা যেখানে শেষ হয়েছিল সেখানে বলা হয়েছিল, মহান আল্লাহ বনী ইসরাঈললের কাছ থেক বন্দেগী ও আনুগত্যের অংগীকার নিয়েছিলেন এখন সাধারণ মানুষকে সম্বোধন করে তাদেরকে জানানো হচ্ছে যে এ ব্যাপারে বনী ইসরাঈলের কোন বিশেষত্ব নেই বরং প্রকৃতপক্ষে তোমরা সবাই নিজেদের স্রষ্টার সাথে একটি অংগীকারে আবদ্ধ এবং এ অংগীকার তোমরা কতটুকু পালন করেছো সে ব্যাপারে তোমাদের একদিন জবাবদিহি করতে হবে৷
১৩৪. বিভিন্ন হাদীস থেকে জানা যায় এটি আদম সৃষ্টির সময়কার একটি ঘটনা৷সে সময় একদিকে যেমন ফেরেশতাদের একত্র করে প্রথম মানুষটিকে সিজদা করানো হয়েছিল এবং পৃথিবীতে মানুষের খিলাফতের কথা ঘোষণা করা হয়েছিল, অন্যদিকে ঠিক তেমনি কিয়াতম পর্যন্ত আদমের যে অগণিত সংখ্যক বংশধর জন্মলাভ করবে মহান আল্লাহ তাদের সবাইকে একই সংগে সজীব ও সচেতন সত্তায় আবির্ভূত করে নিজের সামনে উপস্থিত করেছিলেন এবং তাদের কাছ থেকে তার রব হবার ব্যাপারে সাক্ষ্য গ্রহণ করেছিলেন৷ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত উবাই ইবনে কা'ব রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্ভবত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে জ্ঞান লাভ করে যা কিছু বর্ণনা করেন তা এ বিয়ষের সবচেয়ে ভাল ব্যাখ্যা বলে আমার কাছে মনে হয়ছে৷তিনি বলেনঃ

"মহান আল্লাহ সবাইকে একত্র করেন৷ (এক এক ধরনের বা এক এক যুগের ) লোকদেরকে আলাদা আলাদা দলে সংগঠিত করেন৷ তাদেরকে মানবিক আকৃতি ও বাকশক্তি দান করেন৷ তারপর থেকে অংগীকার গ্রহণ করেন৷ তাদেরকে নিজেদের ওপর সাক্ষী বানিয়ে জিজ্ঞেস করেনঃ আমি কি তোমাদের রব নই? তারা বলেঃ অবশ্যই তুমি আমাদের রব৷ তখন আল্লাহ বলেনঃ কিয়ামতের দিন যাতে তোমরা না বলতে পারো আমরা তো একথা জানতাম না , তাই আমি তোমাদের ওপর পৃথিবী ও আকাশ এবং তোমাদের পিতা আদমকে সাক্ষী করছি৷ভালভাবে জেনে রাখো, আমি ছাড়া ইবাদত লাভের যোগ্য আর কেউ নেই এবং আমি ছাড়া আর কোন রব নেই৷ তোমরা আমার সাথে আর কাউকে শরীক করো না৷ আমি তোমাদের কাছে আমার নবী পাঠাবো ৷ আমার সাথে তোমরা যেসব অংগীকার করছো তারা সেসব তোমাদের স্মরণ করিয়ে দেবে৷ আর তোমাদের প্রতি আমার কিতাব নাযিল করবো৷ এ কথায় সমস্ত মানুষ বলে ওঠেঃআমরা সাক্ষ দিচ্ছি,তুমিই আমাদের রব, তুমিই আমাদের মাবুদ তুমি ছাড়া আমাদের আর কোন রব ও মাবুদ নেই৷"

কেউ কেউ এ ব্যাপারটিকে নিছক রূপক বা উপমা হিসেবে বর্ণিত একটি ব্যাপার মনে করে থাকেন৷তাদের মতে এখানে কুরআন মজীদ কেবল একথাই বুঝাতে চায় যে, আল্লাহর রব হবার বিষয়টি স্বীকৃতি মানবিক প্রকৃতির মধ্যে নিহিত রয়েছে এবং এ কথাটি এখানে এমনভাবে বর্ণিত হয়েছে যেমন এটি বাস্তব জগতে অনুষ্ঠিত একটি ঘটনা ছিল ৷ কিন্তু এ ব্যাখ্যাকে আমি সঠিক মনে করি না৷ কুরআনও হাদীসে এটিকে একটি বাস্তব ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে৷ আর শুধু ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেই শেষ করে দেয়া হয়নি বরং এ সংগে একথাও বলা হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন অনাদিকালের এ অংগীকারটিকে মানুষের বিরুদ্ধে একটি দলীল ও প্রমাণ হিসেবে পেশ করা হবে৷ কাজেই একে নিছক একটি রূপক বর্ণনা গণ্য করার কোন কারণ আমি দেখি না৷ আমার মতে, বাস্তবে যেমন বিভিন্ন ঘটনা ঘটে থাকে ঠিক তেমনিভাবে এ ঘটনাটিও ঘটেছিল৷ মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ কিয়ামত পর্যন্ত যেসব মানুষকে সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন৷ তাদের সবাইকে বাস্তবে একই সংগে জীবন,চেতনা ও বাকশক্তি দান করে নিজের সামনে হাযির করেছিলেন এবং বাস্তবে তাদেরকে এ সত্যটি সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত করেছিলেন যে, তাঁর মহান, পবিত্র ও উন্নত সত্তা ছাড়া তাদের আর কোন রব ও ইলাহ নেই এবং তাঁর বন্দেগী ও হুকুমের আনুগত্য (ইসলাম) ছাড়া তাদের জন্যে আর কোন সঠিক জীবন বিধান নেই৷ এ সম্মেলন অনুষ্ঠানকে কোন ব্যক্তি যদি অসম্ভব মনে করে থাকে তাহলে এটি নিছক তার চিন্তার পরিসরের সংকীর্ণতার ফল ছাড়া আর কিছুই নয়৷ অন্যথায় বাস্তবে মানব সন্তানের বর্তমান পর্যায়ক্রমিক জন্ম ও বিকাশ যতটা সম্ভব সৃষ্টির আদিতে তার সামষ্টিক আবির্ভাব ও অন্তে তার সামষ্টিক পুনরুত্থান ও সমাবেশ ঠিক ততটাই সম্ভবপর৷ তাছাড়া মানুষের মত একটি সচেতন, বুদ্ধিমান, ও স্বাধীন ক্ষমতা সম্পন্ন সৃষ্টিকে পৃথিবীতে নিজের প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্তির প্রাক্কালে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে প্রকৃত সত্য জানিয়ে দেয়া এবং তার কাছ থেকে নিজের পক্ষে বিশ্বস্ততার অংগীকার নিয়ে নেয়াটা অত্যন্ত যুক্তিসংগত বলেই মনে হচ্ছে৷ এ ধরনের একটা ঘটনা ঘটা মোটেই বিস্ময়কর নয়৷ বরং এ ধরনের একটা ঘটনা না ঘটলেই অবাক হতে হতো৷
১৩৫. আদিকালে তথা সৃষ্টির সূচনা লগ্নে সমগ্র মানব জাতির কাছ থেকে যে অংগীকার নেয়া হয়েছিল এখানে তার উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হয়েছে৷ সেই উদ্দেশ্য হচ্ছে মানব জাতির মধ্যে থেকে যারা আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহাত্মক আচরণ করবে তারা যেন নিজেরাই নিজেদের এ অপরাধের জন্যে সম্পূর্ণরূপে দায়ী হয়৷ নিজেদের সাফাই গাইবার জন্যে না জানার ওজুহাত পেশ করার কোন সুযোগ যেন তাদের না থাকে এবং পূর্ববর্তী বংশধরদের ওপর নিজেদের গোমরাহীর সমস্ত দায়-দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে নিজেরা দায়মুক্ত হতেও না পারে৷ অন্য কথায় বলাযায়, প্রত্যেকটি মানুষ ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিজের মধ্যে আল্লাহর একমাত্র ইলাহ ও একমাত্র রব হবার সাক্ষ ও স্বীকৃতি বহন করে চলেছে, আদিতম অংগীকারকে আল্লাহ প্রত্যেকটি মানুষের জন্যে এরি প্রমাণ হিসেবে গণ্য করেছেন৷ এ জন্যে কোন ব্যক্তি নিজের অজ্ঞতা অথবা ভ্রান্ত পরিবেশে লালিত হবার কারণে তার গোমরাহীর জন্যে মোটেই দায়ী নয়, একথা কোনক্রমেই বলা যেতে পারে না৷

এখন প্রশ্ন দেখা দেয়, সৃষ্টির প্রথম দিনের এ অংগীকার যদি বাস্তবে সংঘটিত হয়েও থাকে তাহলে তা কি আমাদের চেতনা ও স্মৃতিপটে সংরক্ষিত আছে? আমাদের মধ্য থেকে কোন একজনও কি একথা জানে , সৃষ্টির সুচনা লগ্নে তাকে আল্লাহর সামনে পেশ করা হয়েছিল, সেখানে তার সামনে ----(আমি কি তোমাদের রব নই? ) প্রশ্ন করা হয়েছিল এবং তার জবাবে সে বলছিল ------(হ্যাঁ?)জবাব যদি নেতিবাচক হয়ে থাকে, তাহলে যে অংগীকারের কথা আমাদের চেতনা ও স্মৃতিপটে থেকে উধাও হয়ে গেছে তাকে কেমন করে আমাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে?

এর জবাবে বলা যায়, সেই অংগীকারের কথা যদি মানুষের চেতনা ও স্মৃতিপটে জাগরুক রাখা হতো তাহলে, মানুষকে দুনিয়ার বর্তমান পরীক্ষাগারে পাঠানো ব্যাপারটা একেবারে অর্থহীন হয়ে যেতো৷ কারণ এরপর পরীক্ষার আর কোন অর্থই থাকতো না৷ তাই এ অংগীকারের কথা চেতনা ও স্মৃতিপটে জাগরুক রাখা হয়নি ঠিকই কিন্তু অবচেতন মনে ও সুপ্ত অনুভূতিতে তাকে অবশ্যি সংরক্ষিত রাখা হয়েছে৷ তার অবস্থা আমাদের অবচেতন ও অনুভূতি সঞ্জাত অন্যান্য জ্ঞানের মতই৷ সভ্যতা, সংস্কৃতি, নৈতিক ও ব্যবহারিক জীবনের সকল বিভাগে মানুষ আজ পর্যন্ত যা কিছুর উদ্ভব ঘটিয়েছিল তা সবই আসলে মানুষের মধ্যে প্রচ্ছন্নভাবে বিরাজিত ছিল৷ বাইরের কার্যকারণ ও ভিতরের উদ্যোগ আয়োজন ও চেষ্টা সাধনা মিলেমিশে কেবলমাত্র অব্যক্তকে ব্যক্ত করার কাজটুকুই সম্পাদন করেছে৷ এমন কোন জিনিস যা মানুষের মধ্যে অব্যক্তভাবে বিরাজিত ছিল না, তাকে কোন শিক্ষা , অনুশীলন ,পরিবেশের প্রভাব ও আভ্যন্তরীন চেষ্টা-সাধনার বলে কোনক্রমেই তার মধ্যে সৃষ্টি করা সম্ভব নয় এটি একটি জাজ্বল্যমান সত্য৷ আর এ প্রভাব -প্রচেষ্টাসমূহ নিজের সর্বশক্তি নিয়োগ করলেও মানুষের মধ্যে যেসব জিনিস অব্যক্তভাবে বিরাজিত রয়েছে তাদের কোনটিকেও পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দেবার ক্ষমতা রাখে না৷ বড় জোর তারা তাকে তার মূল স্বাভাব প্রকৃতি থেকে বিকৃত করতে পারে মাত্র৷ তবুও সব রকমের বিকৃতি ও বিপথগামীতা সত্ত্বেও সেই জিনিসটি তার মধ্যে বিদ্যমান থাকবে, আত্মপ্রকাশের প্রচেষ্টা চালাতে থাকবে এবং বাইরের আবেদন সাড়া দেয়ার জন্যে সর্বক্ষণ উন্মুখ থাকবে৷ এ ব্যাপারটি যেমন আমি ইতিপূর্বে বলেছি , আমাদের সকল প্রকার অবচেতন ও প্রচ্ছন্ন অনুভূতি লব্দ জ্ঞানের ক্ষেত্রে সর্বতোভাবে সত্যঃ

:এগুলো সবই আমাদের মধ্য অব্যক্তভাবে রয়েছে৷ আমরা বাস্তবে যা কিছু ব্যক্ত করি এবং যেসব কাজ করি তার মাধ্যমেই এগুলোর অস্তিত্বের নিশ্চিত প্রমাণ আমরা পেয়ে থাকি৷

: এগুলোর কার্যকর অভিব্যক্তির জন্যে বাইরের আলোচনা (স্মরণ করিয়ে দেয়া)শিক্ষা, অনুশীলন ও কাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন হয়৷ আর আমাদের দ্বারা বাস্তবে যা কিছু সংঘটিত হয়, তা আসলে বাইরের সেই আবেদনেরই সাড়া বলে প্রতীয়মান হয় যা আমাদের মধ্যে সুপ্তভাবে বিরাজমান জিনিসসমূহের পক্ষ থেকে এসে থাকে৷

: ভিতরের ভ্রান্ত কামনা বাসনা ও বাইরের প্রতিকূল প্রভাব, প্রতিপত্তি ও কার্যক্রম এগুলোকে দাবিয়ে দিয়ে বিকৃত ও বিপথগামী করে এবং এগুলোর ওপর আবরণ ফেলে দিয়ে এগুলোকে নিস্তেজ ও নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে কিন্তু সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে না৷ আর এজন্যেই ভিতরের চেতনা ও বাইরের প্রচেষ্টা -উভয়ের সহায়তায়, সংস্কার, সংশোধন ও পরিবর্তন (conversion) সম্ভবপর৷

বিশ্ব জাহানে আমাদের যথার্থ মর্যাদা এবং বিশ্ব জাহানের স্রষ্টার সাথে আমাদের সম্পর্কের ব্যাপারে আমরা যে সুপ্ত চেতনা লব্দ জ্ঞানের অধিকারী তার অবস্থাও এ একই পর্যায়ভুক্তঃ এ জ্ঞান যে আবহামানকাল ধরেই বিরাজমান তার প্রমাণ হচ্ছে এই যে,তা মানব জীবনের প্রতি যুগে পৃথিবীর সব এলাকায়, প্রতিটি জনপদে প্রত্যেকটি বংশে প্রজন্মে ও পরিবারে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং কখনো দুনিয়ার কোন শক্তিই তাকে নিশ্চিহ্ন করতে সক্ষম হয়নি৷

: ঐ জ্ঞান যে প্রকৃত সত্যের অনুরূপ তার প্রমাণ হচ্ছে এই যে, যখনই তা আত্মপ্রকাশ করে আমাদের জীবনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে তখনই তা সুষ্থ ও কল্যাণকর ফল প্রদান করতে সক্ষম হয়েছে৷

: তার আত্মপ্রকাশ করার ও কার্যকর রূপলাভ করার জন্যে সবসময় একটি বহিরাগত আবেদনের প্রয়োজন হয়েছে৷ তাই নবীগণ, আসমানী কিতাবসমূহ ও তাদের আনুগত্যকারী সত্যের আহবায়কদের সবাই এ দায়িত্বই পালন করে এসেছেন৷ এ জন্যেই কুরআনে তাদেরকে মুযক্কির (স্মারক) এবং তাদের কাজকে তাযকীর (স্মরণ করিয়ে দেয়া), যিকর (স্মরণ )ও তাযকিরাহ(স্মৃতি) ইত্যাদি শব্দাবলীর মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে ৷ এর অর্থ দাঁড়ায় নবীগণ ,কিতাবসমূহ ও সত্যের আহবায়কগণ মানুষের মধ্যে কোন নতুন জিনিস সৃষ্টি করেন না, বরং তার মধ্যে আগে থেকেই যে জিনিসটির অস্তিত্ব বিরাজ করছিল তাকে জাগিয়ে তোলেন এবং নতুন জীবনীশক্তি দান করেন মাত্র৷

: মানবাত্মার পক্ষ থেকে প্রতি যুগে এ স্মরণ করিয়ে দেবার প্রয়াসে ইতিবাচক সাড়া দেয়া হয়েছে ৷ তার মধ্যে যে প্রকৃতপক্ষে এমন এক জ্ঞান সুপ্ত ছিল , যা নিজের আহবায়কারীরা আওয়াজ চিনতে পেরে তার জবাব দেবার জন্যে জেগে উঠেছে, এটি তার আর একটি প্রমাণ৷

: তারপর মূর্খতা, অজ্ঞতা, ইন্দ্রিয় লিপ্সা, স্বার্থপ্রীতি এবং মানুষ ও জিনের বংশদ্ভুত শয়তানদের বিভ্রান্তিকর শিক্ষা ও প্ররোচনা তাকে সবসময় দাবিয়ে রাখার, বিপথগামী ও বিকৃত করার প্রচেষ্টা চালিয়েছে৷ এর ফলে শিরক, আল্লাহ বিমুখতা , আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রাহ এবং নৈতিক ও কর্ম ক্ষেত্রে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে৷ কিন্তু বিভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতার এ সমুদয় শক্তির সম্মিলিত প্রচেষ্টা সত্তেও সেই জ্ঞানের জন্মগত ছাপ মানুষের হৃদয়পটে কোন না কোন পর্যায়ে অক্ষুণ্ন থেকেছে৷ এ জন্যেই স্মরণ করিয়ে দেয়াও নবায়নের প্রচেষ্টা তাকে জাগিয়ে তোলার ব্যাপারে সফল ভুমিকা পালন করে এসেছে৷

অবশ্যি দুনিয়ার বর্তমান জীবনে যারা পরম সত্য ও বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে বদ্ধপরিকর তারা নিজেদের তথাকথিত যুক্তিবাদের ভিত্তিতে জন্মগতভাবে হৃদয়ফলকে খোদিত এ লিপিটির অস্তিত্ব অস্বীকার করতে পারে অথবা কমপক্ষে একে সন্দেহযুক্ত সাব্যস্ত করতে পারে৷ কিন্তু যেদিন হিসেব নিকেশ ও বিচারের আদালত প্রতিষ্ঠিত হবে সেদিন মহাশক্তিশালী স্রষ্টা তাদের চেতনা ও স্মৃতিপটে সৃষ্টির প্রথম দিনের সেই সম্মেলনটির স্মৃতি জাগিয়ে তূলবেন৷ সৃষ্টির প্রথম দিনে তারা একযোগে যে মহান সৃষ্টাকে তাদের একমাত্র রব ও মাবুদ বলে স্বীকার করে নিয়েছিল সেই স্মৃতি আবার পুরোদমে তরতাজা করে দেবেন৷ তারপর তিনি তাদের নিজেদের অভ্যন্তর থেকে প্রমাণ সংগ্রহ করে এ অংগীকরলিপি যে তাদের হৃদয়ে সবসময় খোদিত ছিল তা দেখিয়ে দেবেন৷তাদের জীবনের সংরক্ষিত কার্যবিবরণী থেকে সর্বসমক্ষে এও দেখিয়ে দেবেন যে, তারা কিভাবে হৃদয়ফলকে খোদিত সে লিপিটি উপেক্ষা করেছে, কখন কোন সময় তাদের হৃদয়ের অভ্যন্তর থেকে এ লিপির সত্যতার স্বীকৃতি স্বগতভাবে উচ্চারিত হয়েছে, নিজের ও নিজের চারপাশের ভ্রষ্টতার ওপর তাদের বিবেক কোথায় কখন অসম্মতি ও বিদ্রোহের আওয়াজ বুলন্দ করেছে, সত্যের আহবায়কদের আহবানের জবাব দেয়ার জন্যে তাদের অভ্যন্তরের লুকানো জ্ঞান কতবার কত জায়গায় আত্মপ্রকাশে উন্মুখ হয়েছে এবং তারা নিজেদের স্বার্থপ্রীতি ও প্রবৃত্তির লালসার বশবর্তী হয়ে কোন ধরনের তাট বাহানার মাধ্যমে তাকে ক্রমাগত প্রতারিত ও স্তব্ধ করে দিয়েছে৷ সেদিন যখন এসব গোপন কথা প্রকাশ হয়ে পড়বে তখন যুক্তি-তর্ক করার অবকাশ থাকবে না বরং পরিষ্কারভাবে অপরাধ স্বীকার করে নিতে হবে ৷ তাই কুরআন মজিদ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষনা করেছেঃ সেদিন অপরাধীরা একথা বলবে না, আমরা মুর্খ ছিলাম অজ্ঞ ছিলাম , আমরা গাফেল ছিলাম বরং তারা একথা বলতে বাধ্য হবে, আমরা কাফের ছিলাম, অর্থাৎ আমরা জেনে বুঝে সত্যকে অস্বীকার করেছিলাম৷

------------------------------------

"আর তারা নিজেদের ব্যাপারেই সাক্ষ দেবে, তারা কাফের তথা অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যানকারী ছিল৷" (আনআমঃ ১৩০)
১৩৬. অর্থাৎ সত্যকে উপলদ্ধি করার ও চিনে নেবার যেসব উপরকরণ ও নিদর্শন মনুষের নিজের মধ্যে রয়েছে সেগুলো পরিস্কারভাবে তুলে ধরি৷
১৩৭. অর্থাৎ বিদ্রোহ ও বিকৃতি -বিভ্রান্তির নীতি পরিত্যাগ করে বন্দেগী ও আল্লাহর আনুগত্যের আচরণের দিকে যেন ফিরে আসে৷
১৩৮. এ বাক্যটিতে কোন এক নির্দিষ্ট ব্যক্তির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে বলে মনে হয়৷কিন্তু আল্লাহ ও তাঁর রসূলের উৎকৃষ্টতম নৈতিক মানও এ ক্ষেত্রে প্রনিধানযোগ্য ৷ তাঁর যখনই কারোর কোন দুস্কৃতির উদাহরণ দেন তখন দোষটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন না৷বরং তার ব্যক্তিত্বের উহ্য রেখে শুধুমাত্র তার দোষটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন৷এভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবমাননা ও লাঞ্চনা ছাড়াই আসল উদ্দেশ্য সফল হয়ে যায় ৷ তাই যে ব্যক্তির দৃষ্টান্ত এখানে পেশ করা হয়েছে কুরআন ও হাদীসের কোথাও তার পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি৷ মুফাসসিরগণ রসূলের যুগের এবং তাঁর পূর্ববর্তী যুগের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে এ দৃষ্টান্তের লক্ষ্য বলে চিহ্নিত করেছেন৷ কেউ বাল'আম ইবনে বাউরার নাম নিয়েছেন৷ কেউ নিয়েছেন উমাইয়া ইবনে আবীস সালতের নাম৷আবার কেউ বলেছেন , এ ব্যক্তি ছিল সাইফী ইবনুর রাহেব৷ কিন্তু প্রকৃতপক্ষে উদাহারণ হিসেবে যে বিশেষ ব্যক্তির ভুমিকা এখানে পেশ করা হয়েছে সে তো পর্দান্তরালেই রয়ে গেছে৷তবে যে ব্যক্তিই এ ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে তার ব্যাপারে এ উদাহরণটি প্রযোজ্য হবেই৷
১৩৯. এ দুটি সংক্ষিপ্ত বাক্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বর্ণনা করা হয়েছে৷ এ বিষয়টি একটু বিস্তারিতভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন৷ এখানে যে ব্যক্তির উদাহরণ পেশ করা হয়েছে সে আল্লাহর কিতাবের জ্ঞানের অধিকারী ছিল৷ অর্থাৎ প্রকৃত সত্য সম্পর্কে অবহিত ছিল৷ এ ধরনের জ্ঞানের অধিকারী হবার কারণে যে কর্মনীতিকে সে ভূল বলে জানতো তা থেকে দূরে থাকা এবং যে কর্মনীতিকে সঠিক মনে করতো তাকে অবলম্বন করাই তার উচিত ছিল৷ এ যথার্থ জ্ঞান অনুযায়ী কাজ করলে আল্লাহ তাকে মানবতার উচ্চতর পর্যায়ে উন্নীত করতেন৷ কিন্তু সে দুনিয়ার স্বার্থ , স্বাদ ও আরাম আয়েশের দিকে ঝুঁকে পড়ে৷প্রবৃত্তির লালসার মোকাবিলা করার পরিবর্তে সে তার সামনে নতজানু হয়৷ উচ্চতর বিষয় সমূহ লাভের জন্যে সে পার্থিব লোভ-লালসার উর্ধে ওঠার পরিবর্তে তার মধ্যে এমনভাবে ডুবে যায় যার ফলে নিজের সমস্ত উচ্চতর আশা -আকাংখা, বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক উন্নতির সমস্ত সম্ভবনা পরিত্যাগ করে বসে৷ তার নিজের জ্ঞান যেসব সীমানা রক্ষণাবেক্ষণের দাবী জানিয়ে আসছিল সেগুলো লংঘন করে এগিয়ে চলতে থাকে৷ তারপর যখন সে নিছক নৈতিক দুর্বলতার কারণে জেনে বুঝে সত্যকে উপেক্ষা করে এগিয়ে চললো৷ তখন তার নিকটেই ওঁৎ পেতে থাকা শয়তান তার পেছনে লেগে যায় এবংঅনবরত তাকে এক অধপতন থেকে আর এক অধপতনের দিকে টেনে নিয়ে যেতে থাকে৷অবশেষে এ জালেম শয়তান তাকে এমন সব লোকের দলে ভিড়িয়ে দেয় যারা তার ফাঁদে পা দিয়ে বুদ্ধি বিবেক সব কিছু হারিয়ে বসেছিল৷ এরপর আল্লাহ এ ব্যক্তির অবস্থাকে এমন একটি কুকুরের সাথে তুলনা করেছেন যার জিভ সবসময় ঝুলে থাকে এবং এ ঝুলন্ত জিভ থেকে অনবরত লালা টপকে পড়তে থাকে৷ এহেন অবস্থা তার উগ্র লালসার আগুন ও অতৃপ্ত কামনার কথা প্রকাশ করে৷ যে কারণে আমাদের ভাষায় আমরা এহেন পার্থিব লালসায় অন্ধ ব্যক্তিকে দুনিয়ার কুকুর বলে থাকি৷ ঠিক সেই একই কারণে এ বিষয়টিকে এখানে উপমার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে৷কুকুরের স্বভাব কি? লোভ ও লালসা ৷ চলাফেরার পথে তার নাক সব সময় মাটি শুকতে থাকে,হয়তো কোথাও কোন খাবারের গন্ধ পাওয়া যাবে এ আশায়৷ তার গায়ে কেউ কোন পাথর ছুড়েঁ মারলেও তার ভুল ভাংবে না৷রবং তার মনে সন্দেহ জাগবে, যে জিনিসটি দিয়ে তাকে মারা হয়েছে সেটি হয়তো কোন হাড় বা রুটির টুকরা হবে৷ পেট পূজারী লোভী কুকুর একবার লাফিয়ে দৌড়ে গিয়ে সেই নিক্ষিপ্ত পাথরটিও কামড়ে ধরে৷ পথিক তার দিকে কোন দৃষ্টি না দিলেও দেখা যাবে সে লোভ-লালসার প্রতিমূর্তি হয়ে বিরাট আশায় বুক বেঁধে জিভ ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে হাপাচ্ছে৷ সে তার পেটের দৃষ্টি দিয়ে সারা দুনিয়াকে দেখে৷ কোথাও যদি কোন বড় লাশ পড়ে থাকে, কয়েকটি কুকুরের পেট ভরার জন্যে সেটি যথেষ্ট হলেও একটি কুকুর তার মধ্যে থেকে কেবলমাত্র তার নিজের অংশটি নিয়েই ক্ষান্ত হবে না বরং সেই সম্পূর্ণ লাশটিকে নিজের একার জন্যে আগলে রাখার চেষ্টা করবে এবং অন্য কাউকে তার ধারে কাছেও ঘেঁসতে দেবে না৷ এ পেটের লালসার পর যদি দ্বিতীয় কোন বস্তু তার ওপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে তাহলে সেটি হচ্ছে যৌন লালসা৷ সারা শরীরের মধ্যে কেবলমাত্র লজ্জাস্থানটিই তার কাছে আকর্ষনীয় এবং সেটিরই সে ঘ্রাণ নিতে ও তাকেই চাটতে থাকে৷কাজেই এখানে এ উপমা দেবার উদ্দেশ্য হচ্ছে একথাটি সুষ্পষ্টভাবে তুলে ধরা যে, দুনিয়া পূজারী ব্যক্তি যখন জ্ঞান ও ঈমানের বাঁধন ছিড়ে ফেলে প্রবৃত্তির অন্ধ লালসার কাছে আত্মসমর্পন করে এগিয়ে চলতে থাকে তার অব্স্থা পেট ও যৌনাংগ সর্বস্ব কুকুরের মত হওয়া ছাড় আর কোন উপায় থাকে না৷
১৪০. এর অর্থ এটা নয় যে, আমি তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার জন্যই সৃষ্টি করেছিলাম এবং তাদেরকে সৃষ্টি করার সময় এ সংকল্প করেছিলাম যে, তাদেরকে জাহান্নামের ইন্ধনে পরিণত করবো৷ এবং এর সঠিক অর্থ হচ্ছে, আমি তো তাদেরকে হৃদয়, মস্তিষ্ক, কান, চোখ সবকিছুসহ সৃষ্টি করেছিলাম৷ কিন্তু এ বেকুফরা এগুলোকে যথাযথভাবে ব্যবাহার করেনি এবং নিজেদের অসৎ কাজের বদৌলতে শেষ পর্যন্ত তারা জাহান্নামের ইন্ধনে পরিণত হয়েছে৷ চরম দুঃখ প্রকাশ ও আক্ষেপ করার জন্য মানুষের ভাষায় যে ধরনের বাকরীতির প্রচলন রয়েছে এখানেও একই ধরনের বাক্য রীতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে৷ উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, কোন মায়ের কয়েক জন জোয়ান ছেলে যুদ্ধে মারা গেলে সে লোকদের বলতে থাকে, আমি তাদেরকে যুদ্ধের ময়দানে জীবন দান করার জন্যই বুঝি খাইয়ে পরিয়ে বড় করেছিলাম৷ এ বাক্যে মায়ের বক্তব্যের উদ্দেশ্য এ নয় যে, সত্যই সে তার সন্তানদেরকে এ উদ্দেশ্যে লালন পালন করেছিল বরং এ ধরণের আক্ষেপের সুরে সে আসলে বলতে চায়, আমি নিজের সন্তানদেরকে বড়ই পরিশ্রম করে নিজের শরীরের রক্ত পানি করে বড় করে তুলেছিলাম৷কিন্তু আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারী যুদ্ধবাজদেরকে শাস্তি দিন৷ কারণ তাদের জন্যই আমার পরিশ্রম ও ত্যাগের ফসল এভাবে মাটি হয়ে গেলো৷
১৪১. এখন ভাষণ শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে৷তাই উপসংহারে উপদেশ ও তিরষ্কার মিশ্রিত পদ্ধতিতে লোকদেরকে তাদের কয়েকটি প্রধান প্রধান গোমরাহীর ব্যপারে সতর্ক করে দেয়া হচ্ছে৷ এই সংগে নবীর দাওয়াতের মোকাবিলায় তারা যে অস্বীকার, প্রত্যাখ্যান ও বিদ্রুপাত্নক দৃষ্টিভঙ্গী অবলম্বন করেছিল তার ভুল বুঝিয়ে দিয়ে তার অশুভ পরিণাম সম্পর্কেও তাদেরকে সাবধান করে দেয়া হচ্ছে
১৪২. মানুষের মনে বিভিন্ন জিনিসের যে ধারণা থাকে এবং বিভিন্ন জিনিস সম্পর্কে মানুষ যেসব কল্পনা করে থাকে তারই ভিত্তিতে নিজের ভাষায় সে তাদের নাম রাখে৷ধারণা ও কল্পনায় গলদ থাকলে তা নামের মধ্যেই ফুটে উঠে৷আবার নামের ভ্রান্তি ধারণা ও কল্পনার ভ্রান্তির কথাই প্রকাশ করে৷তারপর বিভিন্ন জিনিস সম্পর্কে মানুষের মনে যে ধারণা থাকে তারই ভিত্তিতে তার সাথে তার সম্পর্কও গড়ে উঠে এবং সেই হিসেবে তার সাথে সে ব্যবহারও করে৷ ধরণা ও কল্পনার ত্রুটি সম্পর্ক ও ব্যবহারের ত্রুটির আকারে আত্মপ্রকাশ করে৷ আবার ধারনা ও কল্পনা নির্ভুল হলে পারষ্পরিক সম্পর্কও নির্ভুল ও সঠিক রূপ নেয় ৷ এ কথা দুনিয়ার অন্যান্য সমস্ত জিনিসের ব্যাপারে যেমন সত্য তেমনি আল্লাহর ব্যাপারেও সত্য৷ মানুষ আল্লাহর নাম (তাঁর সত্তা সম্পর্কিত হোক বা গুণবাচক নাম হোক)স্থির করার ব্যাপারে যে ভুল করে থাকে তা হয় আসলে আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলী সম্পর্কিত তার আকীদা বিশ্বাসের ফলশ্রুতি৷ তারপর আল্লাহ সম্পর্কে নিজের ধারণা ও আকীদার মধ্যে মানুষ যতটুকু ও যে ধরণের ভুল করে ঠিক ততটুকু ও সেই ধরণের ভুল তার নিজের জীবনের সমগ্র নৈতিক দৃষ্টিভংগী ও কর্মনীতি গড়ে তোলার ব্যপারেও সংঘটিত হয়ে যায়৷কারণ মানুষ আল্লাহর ব্যপারে এবং আল্লাহর সাথে নিজের ও বিশ্ব জাহানের সম্পর্কের ব্যপারে যে ধারণা গড়ে তোলে পুরোপুরি তারই ভিত্তিতে তার নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে উঠে৷ তাই বলা হয়েছে, আল্লাহর নাম রাখার ব্যাপারে ভুল করা থেকে দূরে থাকো৷ ভাল নামই আল্লাহর উপযোগী এবং তার সাহায্যেই তাঁকে স্মরণ করা উচিত৷ তার নাম ঠিক করার ব্যাপারে 'ইলহাদ' তথা বিদ্রোপাত্নক দৃষ্টিভংগী মারাত্নক পরিণতি ডেকে আনবে৷ "ভাল ভাল নাম" বলতে এমন সব নাম বুঝায় যার মাধ্যেমে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ব, তাঁর পাক-পবত্রতা ও তাঁর পূর্ণাঙ্গ গুণাবলীর প্রকাশ ঘটে৷ কুরআনে উল্লেখিত 'ইলহাদ' শব্দের অর্থ হচ্ছে, মধ্যবর্তী স্থান থেকে সরে যাওয়া এবং সোজা সরল দিক থেকে বিপথগামী হয়ে যাওয়া৷তীর যখন সোজা নিশানায় না লাগে অন্য কোন দিকে লাগে তখন আরবীতে বলা হয় (الحد السهم الهدف)