(৭:১৬৩) আর সমুদ্রের তীরে যে জনপদটি অবস্থিত ছিল তার অবস্থা সম্পর্কেও তাদেরকে একটু জিজ্ঞেস করো৷ ১২২ তাদের সেই ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দাও যে, সেখানকার লোকেরা শনিবারে আল্লাহর হুকুম অমান্য করতো এবং শনিবারেই মাছেরা পানিতে ভেসে ভেসে তাদের সামনে আসতো৷১২৩ অথচ শনিবার ছাড়া অন্য দিন আসতো না৷ তাদের নাফরমানীর কারণে তাদেরকে আমি ক্রমাগত পরীক্ষার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছিলাম বলেই এমনটি হতো৷ ১২৪
(৭:১৬৪) আর তাদের একথাও স্মরণ করিয়ে দাও, যখন তাদের একটি দল অন্য দলকে বলেছিল, তোমরা এমন লোকদের উপদেশ দিচ্ছো কেন যাদেরকে আল্লাহ ধ্বংস করবেন বা কঠোর শাস্তি দেবেন? জবাবে তারা বলেছিল, এসব কিছু এ জন্যেই করছি যেন আমরা তোমাদের রবের সামনে নিজেদের ওপর পেশ করতে পারি এবং এ আশায় করছি যে, হয়তো এ লোকেরা তাঁর নাফরমানী করা ছেড়ে দেবে৷
(৭:১৬৫) শেষ পর্যন্ত তাদেরকে যে সমস্ত হেদায়াত স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছিল তারা যখন সেগুলো সম্পূর্ণ ভুলে গেলো তখন যারা খারাপ কাজে বাধা দিতো তাদেরকে আমি বাঁচিয়ে নিলাম এবং বাকি লোক যারা দোষী ছিল তাদের নাফরমানীর জন্য তাদেরকে কঠিন শাস্তি দিলাম৷ ১২৫
(৭:১৬৬) তারপর যে কাজ থেকে তাদেরকে বাধা দেয়া হয়েছিল তাই যখন তারা পূর্ণ ঔদ্ধত্যসহকারে করে যেতে লাগলো তখন আমি বললাম, তোমরা লাঞ্ছিত ও ঘৃণিত বানর হয়ে যাও৷ ১২৬
(৭:১৬৭) আর স্মরণ করো যখন তোমাদের রব ঘোষণা করেন ১২৭ কিয়ামত পর্যন্ত তিনি সবসময় বনী ইসরাঈলীদের ওপর এমন সব লোককে চাপিয়ে দিয়ে যেতে থাকবেন যারা তাদেরকে দেবে কঠিনতম শাস্তি৷ ১২৮ নিসন্দেহে তোমাদে রব দ্রুত শাস্তিদানকারী এবং নিশ্চিতভাবেই তিনি ক্ষমাশীল ও করুনাময়ও৷
(৭:১৬৮) আমি তাদেরকে পৃথিবীতে খন্ড বিখন্ড করে বহু সংখ্যক জাতিতে বিভক্ত করে দিয়েছি৷ তাদের মধ্যে কিছু লোক ছিল সৎ এবং কিছু লোক অন্য রকম৷ আর আমি ভাল ও খারাপ অবস্থায় নিক্ষেপ করার মাধ্যমে তাদেরকে পরীক্ষা করতে থাকি, হয়তো তারা ফিরে আসবে৷
(৭:১৬৯) তারপর পরবর্তী বংশদরদের পর এমন কিছু অযোগ্য লোক তাদের স্থলাভিষিক্ত হয় যারা আল্লাহর কিতাবের উত্তরাধিকারী হয়ে এ তুচ্ছ দুনিয়ার স্বার্থ আহরণে লিপ্ত হয় এবং বলতে থাকে আশা করা যায়, আমাদের ক্ষমা করা হবে৷ পরক্ষনেই সেই ধরনের পার্থিব সামগ্রী যদি আবার তাদের সামনে এসে যায় তাহলে তৎক্ষনাৎ দৌড়ে গিয়ে তা লুফে নেয়৷ ১২৯ তাদের কাছ থেকে কি কিতাবের অংগীকার নেয়া হয়নি যে, তারা আল্লাহর নামে কেবলমাত্র সত্য ছাড়া আর কিছুই বলবে না? আর কিতাবে যা লেখা আছে তাতো তারা নিজেরাই পড়ে নিয়েছে৷ ১৩০ আখারাতের আবাস তো আল্লাহর ভয়ে ভীত লোকদেরই জন্য ভাল ১৩১ -এতটুকু কথাও কি তোমরা বুঝো না?
(৭:১৭০) যারা কিতাবের বিধান যথাযথভাবে মেনে চলে এবং নামায কায়েম করে, নিসন্দেহে এহেন সৎকর্মশীল লোকেদের কর্মফল আমি নষ্ট করবো না৷
(৭:১৭১) তাদের কি সেই সময়টার কথা কিছু মনে আছে যখন আমি পাহাড়কে হেলিয়ে তাদের ওপর ছাতার মত এমনভাবে বিস্তৃত করে দিয়েছিলাম, যে তারা ধারণা করেছিল, তা বুঝি তাদের ওপর পতিত হবে? সে সময় আমি তাদেরকে বলেছিলাম , তোমাদেরকে আমি যে কিতাব দিচ্ছি তাকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরো এবং তাতে যা কিছু লেখা আছে তা স্মরণ রাখো, আশা করা যায়, তোমরা ভূল পথ অবলম্বন করা থেকে বাঁচতে পারবে৷ ১৩২
১২২. বিশেষজ্ঞদের অধিকাংশের মতে এ স্থানটি ছিল 'আয়লা', 'আয়লাত' বা 'আয়লূত'৷ ইসরাঈলের ইহুদী রাষ্ট্র বর্তমানে এখানে এ নামে একটি বন্দর নির্মাণ করেছে৷ এর কাছেই রয়েছে জর্দানের বিখ্যাত বন্দর আকাবা৷ লোহিত সাগরের যে শাখাটি সিনাই উপদ্বীপের পূর্ব উপকূল ও আরবের পশ্চিম উপকূলের মাঝখানে একই লম্বা উপসাগরের মত দেখায় তার ঠিক শেষ মাথায় এ স্থানটি অবস্থিত৷ বনী ইসরাঈলের উত্থান যুগে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিকেন্দ্র ছিল৷ হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালাম এ শহরেই তাঁর লোহিত সাগরের সামরিক ও বাণিজ্যিক নৌবহরের কেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন৷ এখানে যে ঘটনাটির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে ইহুদীদের পবিত্র গ্রন্থসমূহে আমরা তার কোন উল্লেখ পাই না৷ তাদের ইতিহাসেও এ প্রসংগে নীরব৷ কিন্তু কুরআন মজীদে যেভাবে এ ঘটনাটিকে এখানে ও সূরা বাকারায় বর্ণনা করা হয়েছে, তা থেকে পরিষ্কার প্রতীয়মান হয় যে, কুরআন নাযিলের সময় বনী ইসরাঈলীরা সাধারণভাবে এ ঘটনাটি সম্পর্কে ভালভাবেই অবগত ছিল৷ এটি একটি প্রমানিত সত্য যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরোধিতার প্রশ্ন যেখানে মদীনার ইহুদীরা কোন একটি সুযোগও হাতছাড়া হতে দিতো না সেখানে কুরআনের এ বর্ণনার বিরুদ্ধে তারা আদৌ কোন আপত্তিই তোলেনি৷
১২৩. কুরআনে 'সাব্ত' শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে ৷ 'সাব্ত' মানে শনিবার৷ বনী ইসরাঈলীদের জন্যে এ দিনটিকে পবিত্র দিন গণ্য করা হয়েছিল৷ মহান আল্লাহ এ দিনটিকে নিজের ও বনী ইসরাঈলীদের সন্তান-সন্তুতিদের মধ্যে সম্পাদিত পুরুষানুক্রমিক স্থায়ী অংগীকার গণ্য করে তাকীদ করেছিলেন যে এ দিন কোন পার্থিব কাজ করা যাবে না, ঘরে আগুণ পর্যন্ত জ্বালানো যাবে না, গৃহপালিত পশু এমন কি চাকর-বাকর -দাসদাসিদের থেকেও কোন সেবা করা চলবে না এবং যে ব্যক্তি এ নিয়ম লংঘন করবে তাকে হত্যা করা হবে৷ কিন্তু উত্তরকালে বনী ইসরাঈল প্রকাশ্যে এ আইনের বিরোধীতা করতে থাকে৷ ইয়ারমিয়াহ (যিরমিয়) নবীর আমলে (যিনি খৃষ্টপূর্ব ৬২৮ও ৫৮৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে বেঁচে ছিলেন৷)লোকেরা খাস জেরুজালেরমের সিংহ দরজাগুলো দিয়ে মালপত্র নিয়ে চলাফেরা করতো৷ এতে ঐ নবী ইহুদীদেকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, তোমরা যদি এভাবে প্রকাশ্যে শরীয়াতের বিরুদ্ধাচারণ করা থেকে বিরত না হও তাহলে জেরুসালেমে আগুন লাগিয়ে দেয়া হবে৷ (যিরমিয় ১৭:২১-২৭) হযরত হিযকিঈল (যিহিস্কেল)নবীও এ একই অভিযোগ করেন৷ তাঁর আমল ছিল খৃষ্টপূর্ব ৫৯৫ ও ৫৩৬ এর মধ্যবর্তী সময়ে৷ তাঁর গ্রন্থে শনিবারের অবমাননাকে ইহুদীদের একটি মস্তবড় জাতীয় অপরাধ গণ্য করা হযেছে৷(যিহিস্কেল ২০:১২-২৪)এসব উদ্ধৃতি থেকে অনুমান করা যেতে পারে, কুরআন মজিদে এখানে যে ঘটনাটির কথা বলছে সেটও সম্ভবত এ একই যুগের ঘটনা৷
১২৪. মানুষকে পরীক্ষা করার জন্যে মহান আল্লাহ যেসব পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকেন তার মধ্যে এও একটি পদ্ধতি যে, যখন কোন ব্যক্তি বা দলের মধ্যে আনুগত্য বিচ্যুতি ও নাফরমানীর প্রবণতা বাড়তে থাকে তখন তাকে আরো বেশী করে নাফরমানী করার সুযোগ দেয়া হয়৷ যেন তার যেসব প্রবণতা ভেতরে লুকিয়ে থাকে সেগুলো পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়ে যায় এবং যেসব অপরাধ সে নিজেকে কুলষিত করতে চায় কেবলমাত্র সুযোগের অভাবে সে সেগুলো থেকে বিরত থেকে না যায়৷
১২৫. এ বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, এ জনপদে তিন ধরনের লোক ছিল৷ এক,যারা প্রকাশ্যে ও পূর্ণ ঔদ্ধত্য সহকারে আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধাচরণ করছিল৷ দুই,যারা নিজেরা বিরুদ্ধাচরণ করছিল না কিন্তু অন্যের বিরুদ্ধাচরণকে নীরবে হাত পা গুটিয়ে বসে বসে দেখছিল এবং উপদেশ দানকারীদের বলছিল,এ হতভাগাদের উপদেশ দিয়ে কী লাভ? তিন,যারা ঈমানী সম্ভমবোধ ও মর্যাদাবোধের কারণে আল্লাহর আইনের এহেন প্রকাশ্য অমর্যাদা বরদাশত করতে পারিনি এবং তারা এ মনে সৎ কাজের আদেশ দিতে ও অসৎকাজ থেকে অপরাধীদের বিরত রাখতে তৎপর ছিল যে, হয়তো ঐ অপরাধীরা তাদের উপদেশের প্রভাবে সৎপথে এসে যাবে, আর যদি তারা সৎপথে নাও আসে তাহলে অন্তত নিজেদের সামর্থ মোতাবিক কর্তব্য পালন করে তারা আল্লাহর সামনে নিজেদের দায় মুক্তির প্রমাণ পেশ করতে পারবে৷এ অবস্থায় এ জনপদের ওপর যখন আল্লাহর আযাব নেমে এলো তখনকার অবস্থা বিশ্লেষণ করে কুরাআন মজীদ বলছে , এ তিনটি দলের মধ্যে থেকে একমাত্র তৃতীয় দলটিকেই বাচিয়ে নেয়া হয়েছিল৷কারণ একমাত্র তারাই আল্লাহর সামনে নিজেদের ওযর পেশ করার চিন্তা করছিল এবং একমাত্র তারাই নিজেদের দায়িত্ব মুক্তির প্রমাণ সংগ্রহ করে রেখেছিল৷ বাকি দল দুটিকে অপরাধীদের মধ্যে গণ্য করা হলো এবং নিজেদের অপরাধ অনুপাতে তারা শাস্তি ভোগ করলো৷কোন কোন তাফসীরকার এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে আল্লাহ প্রথম দলটির শাস্তি ভোগ করার এবং দ্বিতীয় দলটির উদ্ধার প্রাপ্তির ব্যাপারে স্পষ্ট উক্তি করেছেন৷ কিন্তু তৃতীয় দলটির ব্যাপারে নীরবতা অবলম্বন করেছেন৷ কাজেই তারা শাস্তি ভোগ করেছিল না উদ্ধার পেয়েছিল , এ ব্যাপারে কিছুই বলা যায় না৷ আবার আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর একটি বর্ণনা পাওয়া যায়৷ তাতে বলা হয়েছে তিনি প্রথমে দ্বিতীয় দলটি শাস্তি লাভ করেছিল বলে মত পোষণ করতেন৷ পরে তাঁর ছাত্র ইকরামা তাকে এ ব্যাপারে নিশ্চিন্ত করে দেন যে, দ্বিতীয় দলটি উদ্ধার পেয়েছিল৷ কিন্তু কুরআনের বর্ণনা সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করলে মনে হয়, হযরত ইবনে আব্বাসের প্রথম চিন্তাটিই সঠিক ছিল৷একথা সুষ্পষ্ট যে, কোন জনপদের ওপর আল্লাহর আযাব অবতীর্ণ হলে সমগ্র জনপদবাসীরা দুভাগেই বিভক্ত হয়ে যেতে পারে৷ এক ভাগে এমন সব লোকেরা থাকে যারা আযাব ভোগ করে এবং অন্য ভাগে থাকে তারা যারা আযাব থেকে বেঁচে যায়৷ এখন কুরআনের বক্তব্য অনুযায় উদ্ধারপ্রাপ্ত যদি কেবল তৃতীয় দলটিই হয়ে থাকে তাহলে নিশ্চিতখাবে বলা যায় যারা উদ্ধার পায়নি তাদের মধ্যে থাকবে প্রথম ও দ্বিতীয় উভয় দলই৷ এরি সমর্থন পাওয়া যায় (অর্থাৎ এসব কিছুই করছি আমরা তোমাদের রবের সমানে নিজের ওযর পেশ করা উদ্দেশ্যে) বাক্যাংশটির মধ্যে৷এ বাক্যাংশটিতে আল্লাহ নিজেই একথা সুষ্পষ্ট যে করে দিয়েছেন যে, আল্লাহর কাছে ওযর করার জন্যে অবশ্যি নিজেদের দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করে যেতে হবে৷ এভাবে দায়িত্ব মূক্তির প্রমাণ যারা সংগ্রহ করতে পারবে একমাত্র তারাই আল্লাহর কাছে ওযর পেশ করতে পারবে৷ এ থেকে পরিষ্কার প্রমাণিত হচ্ছে, এ জনপদের প্রকাশ্যে আল্লাহর বিধান লংঘন করা চলতে থাকে সেখানকার সবাই জবাবদিহির সম্মুখীন হয়৷ সেখানকার কোন অধিবাসী শুধু নিজেই আল্লাহর বিধান লংঘন করেনি বলেই আল্লাহর সামনে জবাবদিহি থেকে বাঁচতে পারে না৷রবং আল্লাহর সামনে নিজের সাফাই পেশ করার জন্যে তাকে অবশ্যই এ মর্মে প্রমাণ পেশ করতে হবে যে, নিজের সামর্থ মোতাবিক মানুষের সংশোধন ও আল্লাহর সত্য দীনের প্রতিষ্ঠার জন্যে সে প্রচেষ্টা চালিয়ে এসেছে৷ এ ছাড়া কুরআন এ হাদীসের অন্যান্য বক্তব্য থেকেও আমরা সামষ্টিক অপরাধের ক্ষেত্রে আল্লাহর এ একই ধরনের আইনের কথা জানতে পারি৷ তাই আমরা দেখি কুরআনে বলা হয়েছেঃ

----------------------------------

(সেই বিপর্যয় থেকে সাবধান হও, যার কবলে বিশেষভাবে কেবলমাত্র তোমাদের মধ্য থেকে যারা জুলূম করেছে তারাই পড়বে না) আর এর ব্যাখ্যায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ

----------------------------------------

"মহান আল্লাহ বিশেষ লোকদের অপরাধের দরুন সর্বসাধারণকে শাস্তি দেন না, যতক্ষন সাধারণ লোকদের অবস্থা এমন পর্যায়ে না পৌছে যায় যে, তারা নিজেদের চোখের সামনে খারাপ কাজ হতে দেখে এবং তার বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশের ক্ষমতাও রাখে এরপরও কোন অসন্তোষ প্রকাশ করে না৷কাজেই লোকেরা যখন এমন অবস্থায় পৌছে যায় তখন আল্লাহ সাধারণ ও অসাধারণ নির্বেশেষে সবাইকে আযাবের মধ্যে নিক্ষেপ করেন"৷

এছাড়াও আলোচ্য আয়াত থেকে একথাও জানা যায় যে, এ জনপদের ওপর দুই পর্যায়ে আল্লাহর আযাব নাযিল হয়৷ প্রথম পর্যায়ে নাযিল হয় ---------(কঠিন শাস্তি )এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে নাফরমানী যারা অব্যাহত রেখেছিল তাদেরকে বানরে পরিণত করা হয়৷ আমার মতে প্রথম পর্যায়ের আযাবে উভয় দলই শামিল ছিল এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের আযাব দেয়া হয়েছিল কেবলমাত্র প্রথম দলকে৷

এ ক্ষেত্রে অবশ্যি সঠিক ব্যাপার একমাত্র আল্লাহই ভাল জানেন৷ যদি আমার অভিমত সঠিক হয়ে থাকে তাহলে তা আল্লাহর পক্ষ থেকেই এসেছে৷ আর যদি আমি ভুল করে থাকি তাহলে সে জন্যে আমিই দায়ী ৷ আল্লাহ অবশ্যি ক্ষমাশীল ও করুণাময়৷
১২৬. ব্যাখ্যার জন্যে দেখুন সূরা আল বাকারা ৮৩ টীকা৷
১২৭. এখানে মূল শব্দ হচ্ছে----- (তায়াজ্জানা)এর অর্থ হয় অনেকটা নোটিশ দিয়ে জানিয়ে দেবার মত৷
১২৮. প্রায় খৃষ্টপূর্ব অষ্টম শতক থেকে বনী ইসরাঈলকে এভাবে ক্রমাগত সতর্ক করে দিয়ে আসা হচ্ছিল৷ তাই দেখা যায়, ইহুদীদের পবিত্র গ্রন্থ সমষ্টিতে ইয়াসইয়াহ (যিশাইয়)ও ইয়ারমিয়াহ(যিরমিয়) এবং তাদের পর আগমনকারী নবীদের সকল গ্রন্থে কেবল এ সতর্কবাণী লিপিবব্ধ রয়েছে৷তারপর ঈসা আলাইহিস সালামও তাদেরকে এ একই সতর্কবাণী শুনান৷ বিভিন্ন ইনজীল গ্রন্থে তাঁর একাধিক ভাষণ থেকেই এ বিষয়টি সুষ্পষ্ট হয়ে ওঠে৷ সবশেষে কুরআন মজীদও একথটিকে দৃঢ়ভাবে পুনর্ব্যক্ত করেছে৷ সে সময় থেকে নিয়ে আজো পর্যন্ত ইতিহাসের এমন একটি যুগও অতিক্রন্ত হয়নি যখন ইহুদী জাতির ওপর দুনিয়ার কোথাও না কোথাও নিপীড়ন ও লাঞ্চনা অব্যাহত থাকেনি৷ ইহূদী জাতির এ অবস্থা কুরআন ও তর পূর্বেকার আসমানী গ্রন্থাবলীর সত্য তারই সুষ্পষ্ট সাক্ষবহ৷
১২৯. অর্থাৎ গুনাহ করে৷ তারা জানে এ কাজটি করা গুনাহ তবুও এ আশায় তারা এ কাজটি করে যে, কোন না কোনভাবে তাদের গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে৷কারণ তারা মনে করে, তারা আল্লাহর প্রিয়পাত্র এবং তারা যত কঠিন অপারাধই করুন না কেন তাদের ক্ষমতালাভ অপরিহার্য৷ এ ভূল ধারণার ফলে কোন গুনাহ করার পর তারা লজ্জিত হয় না এবং তাওবাও করে না৷ বরং ঐ একই ধরনের গুনাহ করার সুযোগ এলে তারা আবার তাতে জড়িয়ে পড়ে৷ এ হতভাগ্য লোকেরা এমন একটি কিতাবের উত্তরাধীকারী ছিল, যা তাদেরকে দুনিয়ার নেতৃত্বের পদে আসীন করতে চেয়েছিল৷ কিন্তু তাদের হীনমন্যতা ও নীচাশয়তার ফলে তারা এ সৌভাগ্যের পরশমণিটির সাহায্যে তুছ্ছ পার্থিব সম্পদ আহরণ করার চাইতে বড় কোন জিনিস উপার্জনের হিম্মাতই করলো না৷ তারা দুনিয়ার ন্যায়-ইনসাফ,সত্য-সততার পতাকাবহী এবং কল্যাণ ও সুকৃতির অগ্রপথিক ও পদপ্রদর্শক হবার পরিবর্তে নিছক দুনিয়ার কুকুর হয়েই রইল৷
১৩০. অর্থাৎ তারা নিজেরাই জানে, তাওরাতের কোথাও বনী ইসরাঈলের জন্যে শর্তহীন মুক্তি সনদ দেয়ার উল্লেখ নেই৷ আল্লাহ কখনো তাদেরকে একথা বলেননি এবং তাদের নবীগণ্ও কখনো তাদেরকে ও ধরনের নিশ্চয়তা দেননি যে, তোমরা যা ইচ্ছা করতে পারো, তোমাদের সকল গুনাহ মাফ হয়ে যাবে৷ তাছাড়া আল্লাহ নিজে যে কথা কখনো বলেননি তাকে আল্লাহর কথা বলে প্রচার করার কি অধিকারই বা তাদের থাকতে পারে? অথচ তাদের কাছ থেকে অংগীকার নেয়া হয়েছিল যে, আল্লাহর নামে কোন অসত্য কথা তারা বলবে না৷
১৩১. এ আয়াতটির দুটি অনুবাদ হতে পারে৷ একটি অনুবাদ আমি এখানে করেছি৷ আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, আল্লাহর ভয়ে ভীত লোকদের জন্যে তো আখেরাতের আবাসই ভাল প্রথম অনুবাদের আলোকে আয়াতের তাৎপর্য হবে এই যে, মাগফেরাত কারোর একচেটিয়া ব্যাক্তিগত বা পারিবারিক অধিকার নয়৷তুমি এমন কাজ করবে যা শাস্তি লাভের যোগ্য কিন্তু আখেরাতে তুমি নিছক ইহূদী বা ইসরাঈলী হবার কারণে ভাল জায়গা পেয়ে যাবে , এটা কখনো হতে পারে না৷ তোমাদের মধ্যে সামান্যতম বিবেক -বুদ্ধি থাকলেও তোমরা নিজেরাই বুঝতে পারবে যে, আখেরাতের ভাল জয়গাএকমাত্র তারাই পেতে পারে যারা দুনিয়ায় আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে কাজ করে৷ আর দ্বিতীয় অনুবাদটির গ্রহণ করলে মর্ম এ দাঁড়ায় যে, যেসব লোক আল্লাহর ভয়ে ভীত নয় একমাত্র তারাই দুনিয়াবী লাভ ও স্বার্থকে আখেরাতের ওপর অগ্রাধিকার দেয়৷ আল্লাহর ভয়ে ভীত লোকেরা নিশ্চিতভাবে আখেরাতের স্বার্থকে দুনিয়ার স্বার্থের ওপর এবং আখেরাতের কল্যাণ ও লাভকে দুনিয়ার আয়েশ -আরামের ওপর অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে৷
১৩২. মূসা আলাইহিস সালামকে অংগীকারনামা খোদিত শিলালিপি গুলো দেবার সময় সিনাই পাহাড়ের পাদদেশে যে ঘটনাটি ঘটেছিল সেদিকে এখানে ইংগিত করা হয়েছে৷ বাইবেলে নিম্নোক্ত ভাষায় এ ঘটনাটি বর্ণনা দেয়া হয়েছে৷

'পরে মূসা আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করিয়ে দেয়ার জন্যে লোকদেরকে শিবির থেকে বাইরে আনলেন৷ আর তারা পর্বতের তলায় দাঁড়ালো৷ তখন সমস্ত সিনাই পর্বত ওপর থেকে নীচে পর্যন্ত ধোয়ার পরিপূর্ণ হয়ে গেল৷ কারণ মহান আল্লাহর অগ্নিশিখার মধ্যে দিয়ে তার ওপর নেমে এলেন৷আর ভাঁটির ধোঁয়ার মত ধোঁয়া ওপরে উঠছিল এবং গোটা পর্বত ভীষণভাবে কাঁপছিল"৷ (যাত্র পুস্তক ১৯: ১৭-১৮)

এভাবে আল্লাহ কিতাবের বিধান মেনে চলার জন্যে বনী ইসরাঈলীদের কাছ থেকে অংগীকার নিতে গিয়ে বাইরে তাদের জন্যে একটি বিশেষ পরিবেশ সৃষ্টি করেন যাতে আল্লাহর প্রতাপ-প্রতিপত্তি, তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ব এবং এ অংগীকারের গুরুত্ব তাদের মনে পুরোপুরি অনুভূত হয় এবং বিশ্ব জাহানের সার্বভৌম ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিকারী শাহেনশাহের সাথে অংগীকার ও চুক্তি সম্পাদন করাকে তারা যেন মামুলি ব্যাপার মনে করতে না পারে৷ এ থেকে এ ধারণা করা ঠিক হবে না যে, তারা আল্লাহর সাথে অংগীকার করতে প্রস্তুত ছিল না, ভয় দেখিয়ে জোর জররদস্তি করে তাদেরকে অংগীকারাব্ধ হতে উদ্ধুদ্ধ করা হয়েছে ৷ আসল ব্যাপার হচ্ছে তারা সবাই ছিল মুমিন৷ সিনাই পাহাড়ের পাদদেশে তারা গিয়েছিল অংগীকারাবদ্ধ হতে৷ কিন্তু আল্লাহ তাদের সাথে মামুলীভাবে অংগীকার ও প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হবার পরিবর্তে এ অংগীকারের অনুভূতি তাদের মনে ভালভাবে বদ্ধমূল করার চেষ্টা করেন৷ অংগীকার করার সময় কোন মহাশক্তিধর সত্তার সাথে তারা অংগীকর করছে এবং তাঁর সাথে অংগীকার ভংগ করার পরিণাম কি হতে পারে, তা যেন তারা অনুভব করতে পারবে এটাই ছিল আল্লাহর অভিপ্রায়৷

এখানে এসে বনী ইসরাঈল জাতিকে সাম্বোধনের পালা শেষ হয়ে যায়৷ পরবর্তী রুকূগুলোতে সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে বক্তব্য পেশ করা হয়েছে৷ বিশেষ করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাদেরকে সরাসরি ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছিলেন, তাদরেকে লক্ষ্য করে বক্তব্য রাখা হয়েছে৷