(৭:১৫২) (জওয়াবে বলা হলো) যারা বাছুরকে মাবুদ বানিয়েছে তারা নিশ্চয়ই নিজেদের রবের ক্রোধের শিকার হবেই এবং দুনিয়ার জীবন লাঞ্ছিত হবে৷ মিথ্যা রচনাকারীদেরকে আমি এমনি ধরনের শাস্তিই দিয়ে থাকি৷
(৭:১৫৩) আর যারা খারাপ কাজ করে তারপর তাওবা করে নেয় এবং ঈমান আনে, এ ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে এ তাওবা ও ঈমানের পর তোমার রব ক্ষমাশীল ও করুণাময়৷
(৭:১৫৪) তারপর মূসার ক্রোধ প্রশমিত হলে সে ফলকগুলি উঠিয়ে নিল৷ যারা নিজেদের রবকে ভয় করে তাদের জন্য ঐ সব ফলকে ছিল পথনির্দেশ ও রহমত৷
(৭:১৫৫) আর মূসা (তার সাথে) আমার নির্ধারিত সময়ে হাযির হবার জন্যে নিজের জাতির সত্তর জন লোককে নির্বাচিত করলো৷ ১০৯ যখন তারা একটি ভয়াবহ ভূমিকম্পে আক্রান্ত হলো তখন মূসা বললোঃ হে প্রভূ! তুমি চাইলে আগেই এদেরকে ও আমাকে ধ্বংস করে দিতে পারতে৷ আমাদের মধ্য থেকে কিছু নির্বোধ লোক যে অপরাধ করেছিল সে জন্যে কি তুমি আমাদের সবাইকে ধ্বংস করে দেবে? এটি তো ছিল তোমার পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা, এর মাধ্যমে তুমি যাকে চাও পথভ্রষ্ট করো আবার যাকে চাও হেদায়াত দান করো৷ ১১০ তুমিই তো আমাদের অভিভাবক৷ কাজেই আমাদের মাফ করে দাও এবং আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করো৷ ক্ষমাশীলদের মধ্যে তুমিই শ্রেষ্ঠ৷
(৭:১৫৬) আর আমাদের জন্য এ দুনিয়ার কল্যাণ লিখে দাও এবং আখেরাতেরও , আমরা তোমার দিকে ফিরেছি৷ জওয়াবে বলা হলোঃ শাস্তি তো আমি যাকে চাই তাকে দিয়ে থাকি কিন্তু আমার অনুগ্রহ সব জিনিসের ওপর পরিব্যপ্ত হয়ে আছে৷ ১১১ কাজেই তা আমি এমন লোকদের নামে লিখবো যারা নাফরমানী থেকে দূরে থাকবে, যাকাত দেবে এবং আমার আয়াতের প্রতি ঈমান আনবে৷
(৭:১৫৭) (আজ তারাই এ রহমতের অংশীদার)যারা এ প্রেরিত উম্মী নবীর আনুগত্য করে, ১১২ যার উল্লেখ নিকট এখানে তাওরাত ও ইনজীলে লিখিত অবস্থায় পাওয়া যায়৷ ১১৩ সে তাদের সৎকাজের আদেশ দেয়, অসৎকাজের থেকে বিরত রাখে, তাদের জন্য পাক পবিত্র জিনিসগুলো হালাল ও নাপাক জিনিসগুলো হারাম করে ১১৪ এবং তাদের ওপর থেকে এমন সব বোঝা নামিয়ে দেয়৷যা তাদের ওপর চাপানো ছিল আর এমন সব বাঁধন থেকে তাদেরকে মুক্ত করে যাতে করে আবদ্ধ ছিল৷ ১১৫ কাজেই যারা তার প্রতি ঈমান আনে, তাকে সাহায্য সহায়তা দান করে এবং তার সাথে অবতীর্ণ আলোকে রশ্মির অনুসরণ করে তারাই সফলতা লাভের অধিকারী৷
১০৯. জাতীয় প্রতিনিধিদের তলব করার একটি বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল৷ জাতির ৭০ জন প্রতিনিধি সিনাই পাহাড়ে আল্লাহর সমীপে হাযির হয়ে সমগ্র জাতির পক্ষ থেকে গো-বৎস পূজার অপরাধের ক্ষমা চাইবে এবং নতুন করে আল্লাহর আনুগত্যের অংগীকার করবে, এই ছিল এর উদ্দেশ্য৷ বাইবেলে ও তালমুদে এ বিষয়টির উল্লেখ নেই৷ তবে হযরত মূসা যে ফলকগুলি ছুঁড়ে দিয়ে ভেঙে ফেলেছিলেন সেগুলোর বদলে অন্য ফলক দেবার জন্যে তাঁকে সিনাই পাহাড়ে ডেকে পাঠানো হয়েছিল একথা অবশ্যি সেখানে উল্লেখিত হয়েছে৷ (যাত্রা পুস্তক ৩৪ অধ্যায়)৷
১১০. এর অর্থ হচ্ছে, প্রত্যেকটি পরীক্ষাকাল মানুষের জন্যে চূড়ান্তই হয়ে থাকে৷ এ পরীক্ষা চালুনীর মত একটি মিশ্রিত দল থেকে কর্মঠ লোকগুলোকে বাছাই করে নিয়ে অকর্মন্য লোকগুলোকে দূরে নিক্ষেপ করে দল থেকে আলাদা করে দেয়৷ এই ধরনের পরীক্ষা মাঝে মাঝে আসতে থাকে, এটা আল্লাহর একটি কর্ম কৌশল৷ এসব পরীক্ষায় যারা সফলকাম হয় তারা মূলত আল্লাহর সাহায্য ও পথনির্দশেই সাফল্য লাভ করে থাকে৷ আর যারা ব্যর্থ হয় তারা আল্লাহর সাহায্য ও পথনির্দেশ থেকে বঞ্চিত হবার কারণেই ব্যর্থতার সম্মুখীন হয়৷ যদিও আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য ও পথনির্দেশনা লাভ করার ও একটি নিয়ম আছে এবং এ নিয়মটি সম্পূর্ণরূপে প্রজ্ঞা ও ইনসাফের ওপর নির্ভরশীল ৷ তবুও এটি একটি প্রমাণিত সত্য যে, পরীক্ষায় কারোর সফলকাম বা অসফল হওয়া আসলে আল্লাহরই সাহায্য , অনুগ্রহ ও পথনির্দেশনার ওপর নির্ভর করে৷
১১১. অর্থাৎ মহান আল্লাহ যে পদ্ধতিতে বিশ্ব ব্যবস্থা পরিচালনা করছেন সেখানে ক্রোধ মুখ্য নয় এবং অনুগ্রহ ও মেহেরবানী সেখানে মাঝে মধ্যে দেখা যায় এমন নয়৷বরং অনুগ্রহই সেখানে মূখ্য এবং সমগ্র বিশ্ব ব্যবস্থা তারই ওপর প্রতিষ্ঠিত ৷ আর সেখানে ক্রোধের প্রকাশ কেবল তখনই ঘটে যখন মানুষের দম্ভ ও অহংকার সীমা ছাড়িয়ে যায়৷
১১২. ওপরের বাক্যটি পর্যন্ত হযরত মূসার দোয়ার জওয়াব শেষ হয়ে গিয়েছিল৷ অতপর সুযোগ বুঝে এবার সাথে সাথেই বনী ইসরাঈলকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য করার দাওয়াত দেয়া হয়েছে৷ এ ভাষণটির মূল বক্তব্য হচ্ছে তোমাদের প্রতি আল্লাহর রহমত অবতীর্ণ হবার জন্যে হযরত মূসা (আ) এর যুগে যেসব শর্ত আরোপ করা হয়েছিল আজো সেগুলোই বহাল রয়ে গেছে৷আর তোমাদের এ নবীর প্রতি ঈমান আনার ব্যাপারটি আসলে সেই শর্তগুলোরই দাবী৷ তোমারদের বলা হয়েছিল, যারা আল্লাহর নাফরমানী থেকে দূরে থাকে আল্লাহর রহমত তাদেরই প্রাপ্য৷ তাইতো যে নবীকে আল্লাহ নিযুক্ত করেছেন তার নেতৃত্ব গ্রহণ করতে অস্বীকার করাই হচ্ছে আজকের সবচেয়ে বড় মৌলিক নাফরমানি৷ কাজেই যতদিন তোমরা এ নাফরমানী থেকে বিরত হবে না ততদিন তোমরা খুটিনাটি ও ছোটখাটো তাকওয়ার বিষয় নিয়ে যতই মাতামাতি কর না কেন তাকওয়ার ভিত্তিমূল প্রতিষ্ঠিত হবে না৷ তোমাদের বলা হয়েছিল যাকাতও আল্লাহর রহমতের অংশ পাওয়ার একটি শর্ত ৷ তাইতো আজ এ নবীর নেতৃত্বে দীন প্রতিষ্ঠার যে সংগ্রাম চলছে যতদিন তার সাথে সেই সংগ্রাম অংশগ্রহন করা হবে না ততদিন কোন প্রকার অর্থ ব্যয় যাকাতের সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত হবে না৷ কাজেই তোমরা যতই দান খয়রাত করো, এবং নজর-নিয়াজ দাও না কোন এ পথে অর্থ ব্যয় না করা পর্যন্ত যাকাতের মৌলিক ভিত্তিই প্রতিষ্ঠিত হবে না৷ তোমাদের বলা হয়েছিল , যারা আল্লাহর আয়াতের প্রতি ঈমান আনে আল্লাহর নিজের রহমত কেবল তাদের জন্যেই লিখে রেখেছেন৷ তাইতো আজ এ নবীর ওপর যেসব আয়াত নাযিল হচ্ছে সেগুলো অস্বীকার করে তোমরা তাওরাতের প্রতি ঈমান রাখার যতই দাবী কর না কেন যতদিন তোমরা এ নবীর প্রতি ঈমান আনবে না ততদিন এ শেষ শর্তটিও পূর্ণ হবে না৷ এখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্যে "উম্মী" শব্দটি ব্যবহারও বড়ই তাৎপর্যপূর্ণ৷ বনী ইসরাঈলীরা নিজেদের ছাড়া দুনিয়ার অন্য জাতিদেরকে উম্মী (Gentiles)বলতো ৷ কোন উম্মীর নেতৃত্ব গ্রহণ করা তো দূরের কথা উম্মীদের জন্য নিজেদের সমান মানবিক অধিকার স্বীকার করাও ছিল তাদের জাতিয় মর্যাদা ও অহংকারের পরিপন্থী৷তাই করআনেই বলা হয়েছেঃ ---------(উম্মীদের ধন-সম্পদ ভোগ দখল করার জন্যে আমাদের কোন জবাবদিহি করতে হবে না৷(আলে ইমরান ৭৫ আয়াত)কাজেই আল্লাহ এ ক্ষেত্রে তাদেরই পরিভাষা ব্যবহার করে বলছেন, এখন তো এ উম্মীর সাথে তোমাদের ভাগ্য জুড়ে দেয়া হয়েছে৷ এর আনুগত্য স্বীকার করলে তোমরা আমার অনুগ্রহের অংশ লাভ করবে, নয়তো শত শত বছর থেকে তোমরা আমার যে ক্রোধের শিকার হয়ে আসছো এখনো তাই তোমাদের কপালে লেখা হবে৷
১১৩. দৃষ্টান্ত স্বরূপ তাওরাত ও ইনজীলের নিম্নোক্ত স্থানগুলো দেখুন৷ এসব স্থানে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনের ব্যাপারে ইঙ্গিত করা হয়েছে৷ যেমন,দ্বিতীয় বিবরণ ১৮:১৫-১৯,মথি ২১:৩৩-৪৬,যোহন ১:১৯-২১,যোহন ১৪:১৫-১৭ এবং ২৫-৩০,যোহন ১৫:২৫-২৬,যোহন ১৬:৭-১৫)
১১৪. অর্থাৎ যে পাক-পবিত্র জিনিসগুলো তারা হারাম করে রেখেছে সেগুলো তিনি হালাল করে দেন এবং যেসব নাপাক ও অপবিত্র জিনিস তারা হালাল করে নিয়েছে সেগুলো তিনি হারাম গণ্য করেন৷
১১৫. অর্থাৎ তাদের ফকীহরা নিজেদের আইনগত সূক্ষ্মতম বিশ্লেষণের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক নেতৃবর্গ নিজেদের ধার্মিকতা ও পরহেজগারীর অতি বাড়াবাড়ি সাহায্যে এবং মূর্খ সাধারণ মানুষ নিজেদের কল্প কুসংস্কার ও মনগড়া নীতি -নিয়মের বেড়াজালে আটকে তাদের জীবনকে যেসব বোঝার নীচে দাবিয়ে রাখে এবং যেসব বাঁধনে তাদেরকে বেঁধে রাখে এ নবী সেই সমস্ত বোঝা নামিয়ে দেন এবং সমস্ত বাঁধন খুলে দেন৷