(৭:১৪৮) মূসার অনুপস্থিতিতে ১০৬ তার জাতির লোকেরা নিজেদের অলংকার দিয়ে বাছুরের মুর্তি তৈরী করলো৷ তার মুখ দিয়ে গরুর মত হাম্বা রব বের হতো৷ তারা কি দেখতে পেতো না যে, ঐ বাছুর তাদের সাথে কথাও বলে না আর কোন ব্যাপারে তাদের কে পথনির্দেশনাও দেয় না? কিন্তু এরপর ও তাকে মাবুদে পরিণত করলো৷ বস্তুত তারা ছিল বড়ই জালেম৷ ১০৭
(৭:১৪৯) তারপর যখন তাদের প্রতারণার জাল ছিন্ন হয়ে গেলো এবং তারা দেখতে পেলো যে, আসলে তারা পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে তখন বলতে লাগলোঃ যদি আমাদের রব আমাদের প্রতি অনুগ্রহ না করেন এবং আমাদের ক্ষমা না করেন, তাহলে আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো৷
(৭:১৫০) ওদিকে মূসা ফিরে এলেন তার জাতির কাছে ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ অবস্থায়৷ এসেই বললেনঃ আমার অনুপস্থিতিতে তোমরা আমার বড়ই নিকৃষ্ট প্রতিনিধিত্ব করছো! তোমরা কি নিজেদের রবের হুকুমের অপেক্ষা করার মত এতটুকু সবরও করতে পারলে না? সে ফলকগুলো ছুঁড়ে দিল এবং নিজের ভাইয়ের (হারুন ) মাথার চুল ধরে টেনে আনলো৷ হারুন বললোঃ হে আমার সহোদর! এ লোকগুলো আমাকে দুর্বল করে ফেলেছিল এবং আমাকে হত্যা করার উপক্রম করেছিল৷ কাজেই তুমি শত্রুর কাছে আমাকে হাস্যম্পদ করো না এবং আমাকে এ জালেম সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত করো না৷ ১০৮
(৭:১৫১) তখন মূসা বললোঃ হে আমার রব! আমাকে ও আমার ভাইকে ক্ষমা করো এবং তোমার অনুগ্রহের মধ্যে আমাদের দাখিল করে নাও, তুমি সবচাইতে বেশী অনুগ্রহকারী৷
১০৬. অর্থাৎ ৪০ দিন পর্যন্ত হযরত মূসা আলাইহিস সালাম যখন আল্লাহর ডাকে সিনাই পাহাড়ে গিয়ে অবস্থান করেছিলেন এবং তার জাতি পাহাড়ের পাদদেশে আর রাহা প্রান্তরে অবস্থান করছিল সেই সময়৷
১০৭. বনী ইসরাঈলীরা যে মিসরীয় কৃষ্টি নিয়ে মিসর ত্যাগ করেছিল এটি তার দ্বিতীয় প্রকাশ৷ মিসরে গো-পূজা ও গরুর পবিত্রার যে ধারণা প্রচলিত ছিল তাতে এ জাতিটি এমন গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিল যে, এ সম্পর্কে কুরআনে বলছেঃ ----------অর্থাৎ "তাদের মনের গভীরে গো-বৎসের ভাবমূর্তি বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল" ৷ সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে এই যে, সবেমাত্র তিন মাস হলো তারা মিসর ত্যাগ করেছিল৷সাগরের দ্বিধা বিভক্ত হয়ে যাওয়া, সাগর বুকে ফেরাউনের সলিল সমাধি লাভ করা, এমন একটি দাসত্বের নিগড় ভেঙে তাদের বেরিয়ে আসা যা ভাঙার কোন আশাই ছিল না এবং এ ধরনের আরো বিভিন্ন ঘটনা এখনো তাদের স্মৃতিতে জীবন্ত ছিল৷তারা খুব ভাল করেই জানতো , এসব কিছুই আল্লাহর অসীম ক্ষমতা বলেই সম্ভব হয়েছিল৷ অন্য কারোর শক্তির সামান্যতম অংশও এতে ছিল না৷ কিন্তু এরপরও তারা প্রথমে নবীর কাছে একটি কৃত্রিম ইলাহের চাহিদা পেশ করলো, তারপর নবীর অনুপস্থিতির প্রথম সুযোগেই বনী ইসরাঈলের কোন একটি মূর্তি বানিয়ে ফেললো৷ এ ধরনের কার্যকলাপের কারণেই বনী ইসরাঈলের কোন কোন নবী নিজের জাতিকে এমন এক ব্যভিচারী নারীর সাথে তুলনা করেছেন, যে নিজের স্বামী ছাড়া অন্য কোন পুরুষের সাথে প্রেম করে এবং বিয়ের প্রথম রাতেই যে স্বামীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে দ্বিধা করে না৷
১০৮. ইহুদীরা জোরপূর্বক হযরত হারুনের ওপর একটি জঘণ্য অপবাদ আরোপ করে আসছিল৷ কুরআন মজীদ এখানে তা খণ্ডন করেছে৷ বাইবেলে বাছুর পূজার ঘটনাটি নিম্নোক্তভাবে বর্ণিত হয়েছেঃ হযরত মূসার যখন পাহাড় থেকে নেমে আসতে দেরি হলো তখন বনী ইসরাঈলীরা অবৈধ হয়ে হযরত হারুনকে বললো আমাদের জন্যে একটি মাবুদ বানিয়ে দাও৷ হযরত হারুন তাদের ফরমায়েশ অনুযায়ী একটি সোনার বাছুর বানিয়ে দিলেন৷ বাছুরটিকে দেখেই বনী ইসরাঈলীরা বলে উঠলো, হে বনী ইসরাঈল! এ তো তোমাদের সেই খোদা, যা তোমাদেরকে মিসর থেকে বের করে নিয়ে এসেছে৷ তারপর হযরত হারুন তার জন্যে একটি বেদী নির্মাণ করলেন, এক ঘোষনার মাধ্যমে পরের দিন সমস্ত বনী ইসরাঈলকে একত্রিত করলেন এবং সেই গো-দেবতার বেদীমূলে কুরবানী দিলেন৷ (যাত্রা পুস্তক ৩২: ১-৬) কুরআন মজীদের একাধিক স্থানে এ মিথ্যা বর্ণনার প্রতিবাদ করা হয়েছে, এবং যথার্থ সত্য ঘটনা বর্ণনা করে সেখানে বলা হয়েছে, আল্লাহর নবী হারুন এ ঘৃণ্য অপরাধটি করেননি বরং এটি করেছিল আল্লাহর দুশমন ও বিদ্রোহী সামেরী৷ (বিস্তারিত জানার জন্যে দেখুন সূরা ত্বা-হা ৯০-৯৪আয়াত)৷ আপাতদৃষ্টিতে ব্যাপারটি বড় বিস্ময়কর মনে হয়৷ বনী ইসরাঈলীরা যদেরকে আল্লাহর নবী বলে মানে তাদের মধ্য থেকে কারোর চরিত্রে তার কলংক লেপন না করে ছাড়েনি, আবার কলংক লেপনও করেছে এমন বিশ্রীভাবে , যা শরীয়াত ও নৈতিকতার দৃষ্টিতে নিকৃষ্টতম অপরাধ বিবেচিত হয়৷ যেমন ,শিরক, যাদু, ব্যভিচার, মিথ্যাচার, প্রতারণা এবং এমনি ধরনের আরো বিভিন্ন জঘণ্য গুনাহের কাজ, যেগুলোতে লিপ্ত হওয়া একজন নবী তো দূরের কথা সাধারণ মুমিন ও ভদ্রলোকের পক্ষেও মারাত্মক লজ্জার ব্যাপার মনে করা হয়৷বাহ্যত কথাটি বড়ই অদ্ভুত মনে হয়৷ কিন্তু বনী ইসরাঈলীদের নৈতিকতার ইতিহাস অধ্যায়ন করলে জানা যায়,আসলে এ জাতিটির ব্যাপারে এটি মোটেই বিস্ময়কর নয়৷ এ জাতিটি যখন নৈতিক ও ধর্মীয় অধপতনের শিকার হলো এবং তাদের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ পর্যন্ত এমনকি উলামা, মাশায়েখ ও দীনী পদাধীকারী ব্যক্তিরাও গোমরাহী ও চরিত্রহীনতার সয়লাবে ভেসে গেলো তখন তাদের অপরাধী বিবেক নিজেদের এ অবস্থার জন্য ওযর তৈরী করতে শুরু করে দিল এবং যেসব অপরাধ তারা নিজেরা করে চলছিল সেগুলো সবই নবীদের সাথে সংশ্লিষ্ট করে তাদের নবীদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিল৷ এভাবে তারা বলতে চাইলো যে, নবীরাই যখন এসব থেকে নিজেদেরকে বাঁচাতে পারেন নি তখন অন্যেরা আর কেমন করে বাঁচতে পারে? এ ব্যাপারে হিন্দুদের সাথে ইহুদীদের অবস্থার মিল রয়েছে৷ হিন্দুদের মধ্যেও যখন নৈতিক অধপতন চরম পর্যায়ে পৌছে তখন এমন ধরনের সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছিল, যেখানে দেবতা, মুনি-ঋষি, অবতার তথা জাতির যারা সর্বোত্তম আদর্শ ব্যক্তিত্ব ছিল তাদের সবার গায়ে কলংক লেপন করে দেয়া হয়েছিল৷এভাবে তারা বলতে চেয়েছিল যে, এত বড় মহান ব্যক্তিত্বরাই যখন এসব খারাপ কাজে লিপ্ত হতে পারে তখন আমরা সাধারণ মানুষরা আর কোন ছার? আর এ কাজগুলো যখন এ ধরনের মহীম মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্যে লজ্জাকর নয় তখন আমাদের জন্যেই বা তা কলংকজন হতে যাবে কেন?