(৭:১৪২) মূসাকে আমি তিরিশ রাত-দিনের জন্য (সিনাই পর্বতের ওপর) ডাকলাম এবং পরে দশ দিন আরো বাড়িয়ে দিলাম৷ এভাবে তার রবের নির্ধারিত সময় পূর্ণ চল্লিশ দিন হয়ে গেলো৷ ৯৯ যাওয়ার সময় মূসা তার ভাই হারুনকে বললোঃ আমার অনুপস্থিতিতে তুমি আমার জাতির মধ্যে আমার প্রতিনিধিত্ব করবে, সঠিক কাজ করতে থাকবে এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পথে চলবে না৷ ১০০
(৭:১৪৩) অতপর মূসা যখন আমার নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হলো এবং তার রব তার সাথে কথা বললেন তখন সে আকূল আবেদন জানালো, হে প্রভু! আমাকে দর্শনের শক্তি দাও, আমি তোমাকে দেখবো৷তিনি বললেনঃ তুমি আমাকে দেখতেপারো না৷ হাঁ সামনের পাহাড়ের দিকে তাকাও ৷ সেটি যদি নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারে তাহলে অবশ্যি তুমি আমাকে দেখতে পাবে৷ কাজেই তার রব যখন পাহাড়ে জ্যোতি প্রকাশ করলেন তখন তা তাকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিল এবং মূসা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে গেলো৷ সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে মূসা বললোঃ পাক-পবিত্র তোমার সত্তা৷ আমি তোমার কাছে তাওবা করছি এবং আমিই সর্বপ্রথম মুমিন৷
(৭:১৪৪) বললেন হে মূসা! আমি সমস্ত লোকদের ওপর অগ্রাধিকার দিয়ে তোমাকে নির্বাচিত করেছি যেন আমার নবুওয়াতের দায়িত্ব পালন করতে পারো এবং আমার সাথে কথা বলতে পারো৷ কাজেই আমি তোমাকে যা কিছু দেই তা নিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো৷
(৭:১৪৫) এরপর আমি মূসাকে কতকগুলো ফলকে জীবনের সকল বিভাগ সম্পর্কে উপদেশ এবং প্রত্যেকটি দিক সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশ লিখে দিলাম ১০১ এবং তাকে বললামঃ “এগুলো শক্ত হাতে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরো এবং তোমার জাতিকে এর উত্তম তাৎপর্যের অনুসরণ করার হুকুম দাও৷ ১০২ শীঘ্রই আমি তোমাদের দেখাবো ফাসেকদের গৃহ৷” ১০৩
(৭:১৪৬) কোন প্রকার অধিকার ছাড়াই যারা পৃথিবীতে বড়াই করে বেড়ায়, ১০৪ শীঘ্রই আমার নিদর্শনসমূহ থেকে আমি তাদের দৃষ্টি ফিরিয়ে দেবো৷ তারা আমার যে কোন নিদর্শন দেখলেও তার প্রতি ঈমান আনবে না৷ তাদের সামনে যদি সোজা পথ এসে যায় তাহলে তারা তা গ্রহণ করবেনা৷ আর যদি বাঁকা পথ দেখতে পায় তাহলে তারা ওপর চলতে আরম্ভ করবে৷ কারণ তারা আমার নিদর্শনসমূহকে মিথ্যা বলেছে এবং সেগুলোর ব্যাপারে বেপরোয়া থেকেছে৷
(৭:১৪৭) আমার নিদর্শনসমূহকে যারাই মিথ্যা বলছে এবং আখেরাতের সাক্ষাতের কথা অস্বীকার করেছে তাদের সমস্ত কর্মকাণ্ড ব্যর্থ হয়ে গেছে ৷ ১০৫ যেমন কর্ম তেমন ফল- এ ছাড়া লোকেরা কি আর কোন প্রতিদান পেতে পারে?
৯৯. মিসর থেকে বের হবার পর বনী ইসরাঈলীদের দাসসূলভ জীবনের অবসান ঘটলো৷ তারা একটি স্বাধীন জাতির মর্যাদা লাভ করলো৷ এ সময় বনী ইসরাঈলীদেরকে একটি শরীয়াত দান করার জন্যে মহান আল্লাহর হুকুমে মূসা (আ) কে সিনাই পাহাড়ে ডাকা হলো৷ কাজেই ওপরে যে ডাকের কথা বলা হয়েছে তা ছিল এ ব্যাপারে প্রথম ডাক৷ আর এর জন্যে চল্লিশ দিনের মেয়াদ নির্দিষ্ট করার বিশেষ কারণ ছিল৷ হযরত মূসা চল্লিশ দিন পাহাড়ের ওপর কাটাবেন৷রোযা রাখবেন৷দিনরাত ইবাদত -বন্দেগী চিন্তা -গবেষণা করে মন-মস্তিষ্কেকে একমূখী ও একনিষ্ঠ করবেন এবং এভাবে তার ওপর যে গুরুত্বপূর্ণ বাণী নাযিল হতে যাচ্ছিল তাকে যথাযতভাবে গ্রহণ করার যোগ্যতা নিজের মধ্যে সৃষ্টি করতে পারবেন৷ হযরত মূসা এ নির্দেশ পালন করার উদ্দেশ্যে সিনাই পাহাড়ে যাবার সময় বর্তমান মানচিত্রে বনী সালেহ ও সিনাই পাহাড়ের মধ্যবর্তী ওয়াদি আল শায়খ (আল শায়খ উপত্যকা) নামে অভিহিত স্থানটিতে বনী ইসরাঈলকে রেখে গিয়েছিলেন৷ এ উপত্যকার যে অংশে বনী ইসরাঈল তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করেছিল বর্তমানে তার নাম আল রাহা প্রান্তর৷ উপত্যকার এক প্রান্তে একটি ছোট পাহাড় অবস্থিত৷ স্থানীয় বর্ণনা অনুযায়ী হযরত সালেহ আলাইস সালাম সামূদের এলাকা থেকে হিজরত করে এখানে এসে অবস্থান করেছিলেন৷বর্তমানে সেখানে তাঁর স্মৃতি চিহ্ন হিসেবে একটি মসজিদ নির্মিত হয়েছে৷অন্যদিকে রয়েছে জাবাল -ই -হারুণ নামে আর একটি ছোট পাহাড়৷ কথিত আছে ,হযরত হারুন আলাইহিস সালাম বনী ইসরাঈলদের বাছুর পূজায় অসন্তুষ্ট ও ক্ষুদ্ধ হয়ে এখানে এসে বসেছিলেন৷ তৃতীয় দিকে রয়েছে সিনাইয়ের উঁচু পর্বত ! এর ওপরের ভাগ সবসময় মেঘে আচ্ছন্ন থাকে৷ এর উচ্চতা ৭৩৫৯ ফুট৷ এ পাহাড়ের শিখর দেশে অবস্থিত একটি গুহা আজো তীর্থ যাত্রীদের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়ে আছে৷ এ গুহায় হযরত মূসা (আ) চিল্লা দিয়েছিলেন অর্থাৎ চল্লিশ দিন রোযা রেখে দিনরাত আল্লাহর ইবাদত বন্দেগী ও চিন্তা -গবেষণায় কাটিয়েছিলেন৷ এর কাছেই রয়েছে মুসলমানদের একটি মসজিদ ও খৃষ্টানদের একটি গীর্জা৷অন্যদিকে পাহাড়ের পাদদেশে রোম সম্রাট জস্টিনিনের আমলের একটি খানকাহ আজো সশরীরে বিরাজ করছে৷ (বিস্তারিত জানার জন্যে দেখুন সূরা আন নামল ৯-১০ টীকা)৷
১০০. হযরত হারুন আলাইহিস সালাম ছিলেন হযরত মূসা আলাইহিস সালামের চেয়ে তিন বছরের বড়৷ তবুও নবুওয়াতের দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে তিনি ছিলেন তাঁর সাহায্যকারী৷ তাঁর নবুওয়াত স্বতন্ত্র ছিল না ৷ বরং হযরত মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর কাছে আবেদন জানিয়ে তাকে নিজের উজীর নিযুক্ত করতে চেয়েছিলেন৷ কুরআন মজীদের সামনের দিকের আলোচনায় এ বিষয়টি সুষ্পষ্ট হয়ে উঠেছে৷
১০১. বাইবেলে এ দুটি ফলক সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এ দুটি ছিল প্রস্তর ফলক৷ এ ফলকে লেখার কাজটিকে কুরআন ও বাইবেল উভয় কিতাবেই স্বয়ং আল্লাহর কীর্তি বলে অভিহিত করা হয়েছে৷ তবে আল্লাহ নিজের কুদরত তথা অসীম ক্ষমতা বলে নিজেই সরাসরি এ ফলকে লেখার কাজ সম্পাদন করেছিলেন, না কোন ফেরেশতাকে দিয়ে এ কাজ সম্পন্ন করেছিলেন অথবা এ কাজে হযরত মূসার হাত ব্যবহার করেছিলেন, এ ব্যাপারটি জানার কোন মাধ্যম আমাদের হাতে নেই৷ (তূলনামূলক অধ্যায়নের জন্যে পড়ুনঃবাইবেল, যাত্রা পুস্তক, ৩১: ১৮,৩২:১৫-১৬এবং দ্বিতীয় বিবরণ ৫:৬-২২)৷
১০২. অর্থাৎ আল্লাহর বিধানের সরল, সোজা, ও সুষ্পষ্ট মর্ম ও তাৎপর্য গ্রহণ করো৷ একজন সহজ সরল বিবেক সম্পন্ন মানুষ , যার মনে কোন অসৎ উদ্দেশ্য ও বক্রতা নেই, সে সাধারণ বুদ্ধি দ্বারা যে অর্থ বোঝে , এখানে তার কথাই বলা হয়েছে৷ যারা আল্লাহর বিধানের সরল সোজা অর্থবোধক শব্দগুলো থেকে জটিল আইনগত মার প্যাঁচ এবং বিভ্রাট বিভ্রান্তি ও কলহ কোন্দাল সৃষ্টির পথ খুঁজে বের করে তাদের সেই সব কূটতর্ককে যাতে আল্লাহর কিতাবের অনুমোদিত বিষয় মনে না করা হয় তাই এ শর্ত আরোপ করা হয়েছে৷
১০৩. অর্থাৎ সামনে অগ্রসর হয়ে তোমরা এমন সব জাতির প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ দেখবে যারা আল্লাহর বন্দেগী ও আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল৷ এবং ভুল পথে চলার ব্যাপারে অবিচল ছিল৷ সেই ধ্বংসাবশেষগুলো দেখে এ ধরনের কর্মনীতি অবলম্বনের পরিণাম কি হয় তা তোমরা নিজেরাই জানতে পারবে৷
১০৪. অর্থাৎ আমার প্রাকৃতিক আইন অনুযায়ী এ ধরনের লোকেরা কোন শিক্ষাপ্রদ ঘটনা অনুধাবন করতে এবং কোন শিক্ষানীয় বিষয় থেকে শিক্ষা লাভ করতে পারে না৷ "বড়র আসন গ্রহণ করা" বা "বড়াই করে বেড়ানো" বাকাংশটি কুরআন মজিদে এমন এক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে , যা থেকে বুঝা যায় যে, বান্দা নিজেকে আল্লাহর বন্দেগী করার ঊর্ধে স্থান দেয়, আল্লাহর আদেশ নিষেধের কোন ধার ধারে না এবং এমন একটি কর্মপদ্ধতি অবলম্বন করে যাতে মনে হয়, সে আল্লাহর বান্দা নয় এবং আল্লাহ তার রব নয়৷ একটি মিথ্যা ও ভূয়া আত্মম্ভরিতা ছাড়া এ ধরনের অহংকারের কোন অর্থ হয় না৷ কারণ আল্লাহর যমীনে বাস করে কোন মানুষের অন্যের বান্দা হয়ে থাকার কোন অধিকার নেই ৷ তাই এখানে বলা হয়েছেঃ "কোন প্রকার অধিকার ছাড়াই যারা পৃথিবীতে বড়াই করে বেড়ায়"৷
১০৫. ব্যর্থ হয়ে গেছে অর্থাৎ ফলদায়ক হয়নি এবং তা অলাভজনক ও অর্থহীন হয়ে পড়েছে৷কারণ আল্লাহর দরবারে মানুষের সমস্ত প্রচেষ্টা ও কর্ম সফল হওয়া নির্ভর করে দুটি বিষয়ের ওপর৷এক, সেই প্রচেষ্টা ও কর্মটি অনুষ্ঠিত হতে হবে শরীয়তের আইনের আওতাধীন৷ দুই, দুনিয়ার পরিবর্তে আখেরাতের সাফল্য হবে সেই প্রচেষ্টা ও কর্মের লক্ষ্য৷ এ শর্ত দুটি পূর্ণ না হলে অনিবার্যভাবেই সমস্ত কৃতকর্ম পণ্ড বা বৃথা হয়ে যাবে৷যে ব্যক্তি আল্লাহর হেদায়াত গ্রহণ করে না বরং তা থেকে মুখ ফিরিয়ে বিদ্রোহত্মক পদ্ধতিতে দুনিয়ায় কাজ করে, সে কোনক্রমেই আল্লাহর কাছে কোন প্রকার প্রতিদানের আশা করার অধিকার রাখে না৷আর যে ব্যক্তি দুনিয়ার জন্যেই সব কিছু করে এবং আখেরাতের জন্যে কিছুই করে না, সোজা কথা বলা যায়, আখেরাত তার কোন সুফল লাভের আশা করা উচিত নয়৷ এবং সেখানে তার কোন ধরনের সুফল লাভ করার কোন কারণও নেই৷ আমার মালিকানাধীন জমিকে কোন ব্যক্তি যদি আমার অনুমোদন ছাড়াই আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে থাকে তাহলে আমার পক্ষ থেকে শাস্তি পাওয়া ছাড়া সে আর কিসের প্রত্যাশা করতে পারে? আর সেই জমির ওপর অন্যায়ভাবে নিজের দখলী স্বত্ব বহাল রাখার সময় যদি এ সমস্ত কাজ সে নিজে এ উদ্দেশ্যেই করে থাকে যে, যত দিন আসল মালিক তার অন্যায় ধৃষ্টতাকে প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে ততদিন পর্যন্ত সে এ দ্বারা লাভবান হতে থাকবে এবং জমি পুনরায় মালিকের দখলে চলে যাওয়ার পর সে আর তা থেকে লাভবান হবার আশা করবে না বা লাভবান, হতে চাইবে না, তাহলে এ ধরনের অবৈধ দখলদারের কাছ থেকে নিজের জমি ফেরত নেবার পর কি কারণে আমি আবার নিজের উৎপন্ন ফসলের কিছু অংশ অনর্থক তাকে দিতে থাকবো?