(৭:১৩০) ফেরাউনের লোকদেরকে আমি কয়েক বছর পর্যন্ত দুর্ভিক্ষ ও ফসলহানিতে আক্রান্ত করেছি এ উদ্দেশ্যে যে, হয়তো তাদের চেতনা ফিরে আসবে৷
(৭:১৩১) কিন্তু তাদের এমনি অবস্থা ছিল যে, ভাল সময় এলে তারা বলতো এটা তো আমাদের প্রাপ্য৷আর খারপ সময় এসে মূসা ও তার সাথীদেরকে নিজেদের জন্য কূলক্ষুণে গণ্য করতো৷ অথচ তাদের কুলক্ষণ তো আল্লাহর কাছে ছিল৷ কিন্তু তাদের অধিকাংশই ছিল অজ্ঞ ৷
(৭:১৩২) তারা মূসাকে বললোঃ আমাদের যাদু করার জন্যে তুমি যে কোন নিদর্শনই আনো না কেন, আমরা তোমার কথা মেনে নেবো না৷ ৯৪
(৭:১৩৩) অবশেষে আমি তাদের ওপর দুর্যোগ পাঠালাম, ৯৫ পংগপাল ছেড়ে দিলাম, উকুন ৯৬ ছড়িয়ে দিলাম, ব্যাংগের উপদ্রব সৃষ্টি করলাম, এবং রক্ত বর্ষণ করলাম৷ এসব নিদর্শন আলাদা আলাদা করে দেখালাম ৷কিন্তু তারা অহংকারে মেতে রইলো এবং তারা ছিল বড়ই অপরাধপ্রবণ সম্প্রদায়৷
(৭:১৩৪) যখনই তাদের ওপর বিপদ আসতো তারা বলতোঃ হে মূসা ! তোমার রবের কাছে তুমি যে মর্যাদার অধিকারী তার ভিত্তিতে তুমি আমাদের জন্য দোয়া করো৷ যদি এবার তুমি আমাদের ওপর থেকে ও দুর্যোগ হটিয়ে দাও, তাহলে আমরা তোমার কথা মেনে নেবো এবং বনী ইসরাঈলকে তোমার সাথে পাঠিয়ে দেবো৷
(৭:১৩৫) কিন্তু যখনই তাদের ওপর থেকে আযাব সরিয়ে নিতাম একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অমনি, তারা সেই অংগীকার ভংগ করতো৷
(৭:১৩৬) তাই আমি তাদের থেকে বদলা নিয়েছি এবং তাদেরকে সমুদ্রে ডুবিয়ে দিয়েছি৷ কারণ তারা আমার নিদর্শনগুলোকে মিথ্যা বলেছিল এবং সেগুলোর ব্যাপারে বেপরোয়া হয়ে গিয়েছিল৷
(৭:১৩৭) আর তাদের জায়গায় আমি প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম দুর্বল ও অধোপতিত করে রাখা মানব গোষ্ঠীকে৷ অতপর যে ভুখণ্ডে আমি প্রাচুর্যে ভরে দিয়েছিলাম , তার পূর্ব ও পশ্চিম অংশকে তাদেরই করতালগত করে দিয়েছিলাম৷ ৯৭ এভাবে বনী ইসরাঈলের ব্যাপারে তোমার রবের কল্যানের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হয়েছে৷ কারণ তারা সবর করেছিল৷ আর ফেরাউন ও তার জাতি যা কিছু তৈরী করেছিল ও উচূ করছিল তা সব ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে৷
(৭:১৩৮) বনী ইসরাঈলকে আমি সাগর পার করে দিয়েছি৷ তারপর তারা চলতে চলতে এমন একটি জাতির কাছে উপস্থিত হলো যারা নিজেদের কতিপয় মূর্তির পূজায় লিপ্ত ছিল৷ বনী ইসরাঈল বলতে লাগলোঃ হে মূসা! এদের মাবূদের মত আমাদের জন্যো একটা মাবূদ বানিয়ে দাও৷৯৮ মূসা বললোঃ তোমরা বড়ই অজ্ঞের মত কথা বলছো৷
(৭:১৩৯) এরা যে পদ্ধতির অনুসরণ করছে তাতে ধ্বংস হবে এবং যে কাজ এরা করেছে তা সম্পূর্ণ বাতিল৷
(৭:১৪০) মূসা আরো বললোঃ আমি কি তোমাদের জন্য আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন ইলাহ খুজবো? অথচ আল্লাহই সারা দুনিয়ার সমস্ত জাতি গোষ্ঠির ওপর তোমাদের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন৷
(৭:১৪১) আর (আল্লাহ বলেন) সেই সময়ের কথা স্মরণ করো যখন আমি ফেরাউনের লোকদের কবল থেকে তোমাদের মুক্তি দিয়েছিলাম, যারা তোমাদেরকে কঠোর শাস্তি দিতো, তোমাদের ছেলেদের হত্যা করতো এবং মেয়েদের জীবিত রাখতো৷ আর এর মধ্যে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য ছিল মহা পরীক্ষা৷
৯৪. ফেরাউনের সভাসদরা এমন একটি জিনিসকে যাদু গণ্য করছিল, যে সম্পর্কে তারা নিজেরাও নিশ্চিতভাবে জানতো যে, তা যাদুর ফল হতে পারে না৷ এটা তাদের চরম হঠকারীতা ও বাগড়ম্বর ছাড়া আর কিছুই ছিল না৷ একটি দেশের সমগ্র এলাকায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়া এবং একনাগাড়ে কয়েক বছর কম ফসল উৎপাদন ও ফসলহানি হওয়া কোন যাদুর কারসাজি হতে পারে বলে সম্ভবত কোন নির্বোধ ও বিশ্বাস করবে না৷ এ জন্যেই কুরআন মজীদে বলছেঃ

----------------------------

"যখন আমার নিদর্শনসমূহ প্রকশ্যের তাদের দৃষ্টি সমক্ষে এসে গেলো তখন তারা বললো, এটা তো সুষ্পষ্ট যাদু৷ অথচ তাদের মন ভিতর থেকে স্বীকার করে নিয়েছিল, কিন্তু তারা নিছক জুলুম ও বিদ্রোহের কারণে তা অস্বীকার করলো"৷ (আন নামল ১৩-১৪আয়াত৷)
৯৫. সম্ভবত এখানে বৃষ্টিজনিত দুর্যোগ বুঝানো হয়েছে৷ বৃষ্টির সাথে শিলাও বর্ষিত হয়েছিল৷ যদিও অন্য ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগও হতে পারে কিন্তু বাইবেলে শিলাবৃষ্টি জনিত দুর্যোগের কথা বলা হয়েছে৷ তাই এখানে এ অর্থটিকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছি৷
৯৬. এখানে মূল শব্দ হচ্ছে---- (কুম্মালু) ৷ এর কয়েকটি অর্থ হয়৷যেমন, উকুন, ছোট মাছি, ছোট পংগপাল, মশা, ঘুণ ইত্যাদি৷ সম্ভবত এ বহু অর্থবোধ শব্দটি ব্যবহার করার কারণ হচ্ছে এই যে, একই সংগে উকুন ও মশা মানুষের ওপর এবং ঘুণ খাদ্য শস্যের ওপর আক্রমন করে থাকবে৷(তুলনামূলক পাঠের জন্যে দেখুন বাইবেলের যাত্র পুস্তক ৭-১২ অধ্যায়৷ এ ছাড়াও সূরা যুখরুফ -এর ৪৩টীকাটিও দেখুন)৷
৯৭. অর্থাৎ বনী ইসরাঈলকে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের উত্তরাধিকারী করে দিয়েছি৷ কেউ কেউ এর এ অর্থ গ্রহণ করেছেন যে, বনী ইসরাঈলকে খোদ মিসরের মালিক বানিয়ে দেয়া হয়৷ কিন্তু এ অর্থ গ্রহন করার স্বপক্ষে একে তো কুরআনের ইংগিতগুলো যথেষ্ট পরিমাণে স্পষ্ট নয়৷তদুপরি ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনাবলী থেকেও এর স্বপক্ষে কোন শাক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া যায় না৷ তাই এ অর্থ গ্রহণ করার ব্যাপারে আমি দ্বিধান্বিত ৷ (দেখুন সূরা আল কাহাফের ৫৭ টীকা এবং আশ শুআরার ৪৫ টীকা)৷
৯৮. বনী ইসরাঈল যে স্থান থেকে লোহিত সাগর অতিক্রম করেছিল সেটি ছিল সম্ভবত বর্তমান সুয়েজ ও ইসমাঈমীয়ার মধ্যবর্তী কোন একটি স্থান্ এখান থেকে লোহিত সাগর পার হয়ে তারা সিনাই উপদ্বীপের দক্ষিণ অঞ্চলের দিকে উপকূলের কিনারা ঘেষে রওয়ানা হয়েছিল৷ সে সময় সিনাই উপদ্বীপের পশ্চিম ও উত্তরাংশ মিসরের শাসনাধীন ছিল৷ দক্ষিনের এলাকায় বর্তমান তূর শহর ও আবু যানীমার মধ্যবর্তী স্থানে তামা ও নীলাম পাথরের খনি ছিল৷ এ খনিজ সম্পদ দ্বারা মিসরবাসী প্রচুর লাভবান হতো৷ এ খনিগুলো সংরক্ষন করার জন্যে মিসরীয়রা কয়েক জায়গায় টহলদার চৌকি স্থাপন করেছিল৷ মাফকাহ নামক স্থানে এ ধরনের একটি চৌকি ছিল৷ এখানে ছিল মিসরীয়দের একটি বিরাট মন্দির৷ উপদ্বিপের দক্ষিণ -পশ্চিম অঞ্চলে এখনো এর ধ্বংসাবশেষে পাওয়া যায়৷ এর কাছাকাছি আর একটি স্থানে প্রাচীন সিরিয় জাতিসমূহের চন্দ্রদেবীর মন্দির ছিল ৷সম্ভবত এরই কোন একটি জায়গা দিয়ে যাবার সময় দীর্ঘকাল মিসরীয়দের গোলামীতে জীবন যাপন করার কারণে মিসরীয় পৌত্তলিক ভাবধারায় গভীরভাবে প্রভাবিত বনী ইসরাঈল সম্প্রদায়ের মনে একটি কৃত্রিম খোদার প্রয়োজন অনুভূম হয়ে থাকবে৷

মিসরবাসীদের দাসত্ব বনী ইসরাঈলীদের মনমানসকে কিভাবে বিকৃত করে দিয়েছিল৷ নিম্নোক্ত বিষয়টি থেকে তা সহজেই অনুমান করা যায়৷ মিসর থেকে বের হয়ে আসার ৭০ বছর পর হযরত মূসার প্রথম খলীফা হযরত ইউসা ইবনে নূন বনী ইসরাঈলীদের সাধারণ সমাবেশে তাঁর শেষ ভাষনে বলেনঃ

"তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সৎ সংকল্প ও নিষ্ঠার সাথে তাঁর উপাসনা করো৷ আর তোমাদের পূর্ব-পুরুষরা বড় নদীর (ফোরাত) ওপারে ও মিসরে যেসব দেবতার পুজা করতো তাদেরকে বাদ দাও৷ আর একমাত্র আল্লাহর ইবাদত যদি তোমাদের খারাপ লাগে তাহলে তোমরা যার উপাসনা করবে আজই তাকে মনোনীত করে নাও৷…..এখনো রইলো আমার ও আমার পরিবারবর্গের কথা, আমরা শুধুমাত্র আল্লাহরই উপাসনা করতে থাকবো"৷(যিহোশূয় ২৪: ১৪-১৫)

এ থেকে বুঝা যায় যে, ফেরাউন শাসিত মিসরের দাসত্বের যুগে এ জাতির শিরা উপশিরা পৌত্তিকতার যে প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল, ৪০ বছর পর্যন্ত হযরত মূসার এবং ২৮ বছর পর্যন্ত হযরত ইউশার অধীনে শিক্ষা ও অনুশীলন লাভ এবং তাঁদের নের্তৃত্ব জীবন পরিচালনা করার পরও তা দূর করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি৷ এ অবস্থায় তারা নিজেদের সাবেক প্রভুদেরকে এসব মূর্তির পদতলে মাথা ঘষতে দেখেছে, মিসর থেকে বের হয়ে সাথে সাথেই সেই ধরনের মূর্তি দেখে তার সামনে মাথা নোয়াতে এসব বিকৃতমনা ও পথভ্রষ্ট মুসলমানরা যে উদগ্রীক হয়ে উঠবে না, সেটা কেমন করেই বা সম্ভব৷