(৭:১০০) পৃথিবীর পূর্ববর্তী অধিবাসীদের পর যারা তার উত্তরাধিকারী হয়, তারা কি এ বাস্তবতা থেকে ততটুকুও শেখেনি যে আমি চাইলে তাদের অপরাধের দরুন তাদেরকে পাকড়াও করতে পারি৷ ৭৯ (কিন্তু তারা শিক্ষনীয় বিষয়াবলীর ব্যাপারে অবজ্ঞা ও অবহেলা প্রদর্শন করে থাকে৷) আর আমি তাদের অন্তরে মোহর মেরে দেই৷ ফলে তার কিছুই শোনে না৷ ৮০
(৭:১০১) যেসব জাতির কাহিনী আমি তোমাদের শুনাচ্ছি (যাদের দৃষ্টান্ত তোমাদের সামনে রয়েছে) তাদের রসূলগণ সুষ্পষ্ট প্রমাণসহ তাদের কাছে আসে , কিন্তু যে জিনিসকে তারাএকবার মিথ্যা বলেছিল তাকে আবার মেনে নেবার পাত্র তারা ছিল না৷ দেখো, এভাবে আমি সত্য অস্বীকারকারীদের দিলে মোহর মেরে দেই৷ ৮১
(৭:১০২) তাদের অধিকাংশের মধ্যে আমি অংগীকার পালনের মনোভাব পাইনি৷ বরং অধিকাংশকেই পেয়েছি ফাসেক ও নাফরমান৷ ৮২
(৭:১০৩) তারপর এ জাতিগুলোর পর (যাদের কথা ওপরে বলা হয়েছে) আমার নিদর্শনসমূহ সহকারে মূসাকে পাঠাই ফেরাউন ও তার জাতির প্রধানদের কাছে৷ ৮৩ কিন্তু তারাও আমার নিদর্শনসমূহের ওপর জুলুম করে৷ ৮৪ ফলতঃ এ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কি হয়েছিল একবার দেখো৷
(৭:১০৪) মূসা বললোঃ “হে ফেরাউন! ৮৫ আমি বিশ্বজাহানের প্রভুর নিকট থেকে প্রেরিত৷
(৭:১০৫) আমার দায়িত্বই হচ্ছে,আল্লাহর নামে সত্য ছাড়া আর কিছুই বলবো না৷ আমি তোমাদের রবের পক্ষ থেকে নিযুক্তির সুষ্পষ্ট প্রমাণসহ এসেছি৷ কাজেই তুমি বনী ইসরাঈলকে আমার সাথে পাঠিয়ে দাও৷” ৮৬
(৭:১০৬) ফেরাউন বললোঃ “তুমি যদি কোন প্রমাণ এনে থাকো এবং নিজের দাবীর ব্যাপারে সত্যবাদী হও, তাহলে তা পেশ করো৷”
(৭:১০৭) মূসা নিজের লাঠিটি ছুড়ে দিল৷ অমনি তা একটি জ্বলজ্যান্ত অজগরের রূপ ধারণ করলো৷
(৭:১০৮) সে নিজের হাত বের করলো তৎক্ষণাত দেখা গেলো সেটি দর্শকদের সামনে চমকাচ্ছে৷ ৮৭
৭৯. অর্থাৎ একটি পতিত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থানে অন্য যে জাতিটির উত্থান ঘটে তার জন্যে নিজের পূর্ববর্তী জাতির পতনের মধ্যে যথেষ্ট পথনির্দশনা থাকে৷ কিছুকাল পূর্বে যে জাতিটি এ স্থানে বিলাস বসনে লিপ্ত ছিল এবং যাদের শ্রেষ্ঠত্ব ও গৌরবের ঝাণ্ডা এখানে পত্ পত করে উড়তো, চিন্তা ও কর্মের কোন ধরনের ত্রুটি ও ভ্রান্তি তাদেরকে ধ্বংস করেছে, নিজেদের বিবেক -বুদ্ধির যথার্থ ব্যবহারের মাধ্যমে তারা একথা সহজেই অনুধাবন করতে পারে৷তারা এটাও অনুভব করতে পারে, যে উচ্চতর শক্তি পূর্ববর্তী জাতিদেরকে তাদের অপরাধের কারণে ইতিপূর্বে পাকড়াও করেছিল এবং তাদেরকে এ স্থান থেকে সরিয়ে দিয়ে স্থানটি শূন্য করেছিল সে শক্তি এখনো যথা স্থানে বহাল আছে এবং তার কাছ থেকে এ ক্ষমতা ও কেউ ছিনিয়ে নেয়নি যে, এ স্থানের পূর্ববর্তী অধিবাসীরা যে ধরনের ভুল করে আসছিল সেই ধরনের ভুল যদি এ স্থানের বর্তমান অধিবাসীরা করতে থাকে, তাহলে পূর্ববর্তীদেরকে যেমন এ জায়গা থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল তেমনি এদেরকে সরিয়ে দেয়া যেতে পারবে না৷
৮০. অর্থাৎ যখন তারা ইতিহাস জেনে এবং শিক্ষনীয় ধ্বংসস্তুপ প্রত্যক্ষ করেও শিক্ষা গ্রহণ করে না এবং নিজেরাই নিজেদের কে বিস্মৃতির মধ্যে নিক্ষেপ করে তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের চিন্তা করার বুঝার ও কোন উপদেশ দাতার উপদেশ শুনার সুযোগ মেলে না৷ যে ব্যক্তি নিজের চোখ বন্ধ করে নেয়, প্রখর সূর্যালোকেও তার চোখ আলো ছড়াতে পারে না এবং যে ব্যক্তি নিজে শুনতে চায় না তাকে আর কেউ শুনাতে পারে না, এটিই আল্লাহর অমোঘ প্রাকৃতিক আইন৷
৮১. আগের আয়াতে বলা হয়েছিলঃ আমি তাদের দিলে মোহর মেরে দেই, তারপর তারা কিছুই শুনতে পায় না- এর ব্যাখ্যা আল্লাহ নিজেই এ আয়াতটিতে করে দিয়েছেন৷এ ব্যাখ্যা থেকে একথা সুষ্পষ্ট হয়ে যায় যে, দিলে মোহর মারার অর্থ হচ্ছেঃ মানবিক বুদ্ধিবৃত্তির এমন একটি মনস্তাত্বিক নিয়মের আওতাধিন হয়ে যাওয়া যার দৃষ্টিতে একবার জাহেলী বিদ্বেষ বা হীন ব্যক্তি স্বার্থের ভিত্তিতে সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবার পর মানুষ নিজের জিদ ও হঠকারিতার শৃংখলে এমনভাবে আবদ্ধ হয়ে যেতে থাকে যে, তারপর কোন প্রকার যুক্তি-প্রমাণ প্রত্যক্ত পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা- নিরীক্ষাই সত্যকে গ্রহণ করার জন্যে তার মনের দুয়ার খুলে দেয় না৷
৮২. কারোর মধ্যে অংগীকার পালনের মনোভাব পাইনি অর্থাৎ কোন ধরনের অংগীকার পালনের পারোয়াই তাদের নেই৷ আল্লাহর পালিত বান্দা হবার কারণে জন্মগতভাবে প্রত্যেকটি মানুষ আল্লাহর সাথে যে অঙ্গীকারে আবদ্ধ, তা প্রতিপালনের কোন পরোয়াই তাদের নেই৷তারা সামাজিক অংগীকার পালনেরও কোন পরোয়া করে না, মানব সমাজের একজন সদস্য হিসেবে প্রত্যেক ব্যক্তি যার সাথে একটি সুদৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ অন্যদিকে নিজের বিপদ -আপদ ও দুঃখ-কষ্টের মূহূর্তগুলোতে অথবা কোন সদিচ্ছা ও মহৎ বাসনা পোষনের মূহুর্তে মানুষ ব্যক্তিগতভাবে আল্লাহর সাথে যে অংগীকারে আবদ্ধ হয়, তাও তারা পালন করে না৷ এ তিন ধরনের অংগীকার ভংগ করাকে এখানে ফাসেকী বলা হয়েছে৷
৮৩. ওপরের বর্ণিত ঘটনাগুলোর উদ্দেশ্যে হচ্ছে একথা ভালভাবে মানসপটে গেঁথে দেয়া যে, যে জাতি আল্লাহর পয়গাম পাওয়ার পর তা প্রত্যাখ্যান করে, ধ্বংসই তার অনিবার্য পরিণতি৷ এরপর এখন মূসা ,ফেরাউন ও বনি ইসরাঈলের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে ধারাবাহিকভাবে কয়েক রুকূ পর্যন্ত৷ এর মধ্যে কুরাইশ বংশীয় কাফের , ইহুদী ও মুমিনদের কে উপরোক্ত বিষয়বস্তুটি ছাড়াও আরো কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়া হয়েছে৷

এ কাহিনীর মাধ্যমে কুরাইশ বংশোদ্ভুত কাফেরদেরকে একথা বুঝাবার চেষ্টা করা হয়েছে যে, সত্যের দাওয়াতের প্রাথমিক স্তরে সত্য ও মিথ্যার শক্তির যে অনুপাত ব্যাহ্যত দেখা যায় তাতে প্রতারিত না হওয়া উচিত৷সত্যের সমগ্র ইতিহাসেই সাক্ষ্য দেয় যে, সুচনা বিন্দুতে তার সংখ্যা এত কম থাকে যে, শুরুতে সারা দুনিয়ার মোকাবিলায় মাত্র এক ব্যক্তি সত্যের অনুসারী এবং কোন প্রকার সাজ-সরঞ্জাম ছাড়াই সে মিথ্যার বিরুদ্ধে একাকী যুদ্ধ শুরু করে দেয়৷ এমন এক মিথ্যার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে দেয় যার পেছনে রয়েছে বড় বড় জাতি ও রাষ্ট্রের বিপুল শক্তি৷ তারপরও শেষ পর্যন্ত সত্যই বিজয় লাভ করে৷ এ ছাড়াও এ কাহিনীতে তাদের একথাও জানানো হয়েছে যে, সত্যের আহবায়কের মোকাবেলায় যেসব কৌশল অবলম্বন করা হয় এবং যেসব পন্থায় তার দাওয়াতকে দাবিয়ে দেবার চেষ্টা করা হয় তা কিভাবে বুমোরাং হয়ে যায়৷এ সংগে তাদেরকে একথাও জানানো হয় যে, সত্যের দাওয়াত প্রত্যাখ্যানকারীদের ধ্বংসের শেষ সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে সর্বশক্তিমাল আল্লাহ তাদের সংশোধিত হবার ও সঠিক পথ অবলম্বন করার জন্যে কত দীর্ঘ সময় দিয়ে থাকেন এবং এরপরও যখন কোন প্রকার সতর্ক বাণী , কোন শিক্ষনীয় ঘটনা এবং কোন উজ্জ্বল নিদর্শন থেকে তারা শিক্ষা গ্রহণ করে না ও প্রভাবিত হয় না তখন তিনি তাদেরকে কেমন দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি দান করেন৷

যারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ঈমান এনেছিল এ কাহিনীর মাধ্যমে তাদেরকে দ্বিবিধ শিক্ষা দেয়া হয়েছে৷ এক, নিজেদের সংখ্যাল্পতা ও দুর্বলতা এবং সত্য বিরোধীদের বিপুল সংখ্যা ও শক্তি যেন তাদেরকে হিম্মাতহারা না করে এবং আল্লাহর সাহায্য বিলম্বিত হতে দেখে যেন তাদের মনোবল ভেংগে না পড়ে৷ দুই, ঈমান আনার পর যে দলই ইহুদিদের মত আচরণ করে তারা অবশ্যি ইহুদিদের মতই আল্লাহর লানতের শিকার হয়৷

বনী ইসরাঈলের সামনে তাদের শিক্ষানীয় ইতিহাস পেশ করে তাদের কে মিথ্যার পূজারী সাজার ক্ষতিকর পরিণাম থেকে সাবধান করা হয়েছে৷ তাদেরকে এমন এক নবীর প্রতি ঈমান আনার দাওয়াত দেয়া হয়েছে৷ যিনি পূর্বের নবীগণের প্রচলিত দীনকে নব রকমের মিশ্রণ মুক্ত করে আবার তার আসল আকৃতিতে পেশ করেছিলেন৷
৮৪. "নিদর্শনসমূহের সাথে জুলুম করে"৷ অর্থাৎ সেগুলো মানে না এবং যাদুকরের কারসাজি গণ্য করে সেগুলো এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করে ৷ যেমন কোন উচ্চাংগের কবিতাকে কবিতাই নয় বরং তাকে দুর্বল বাক্য বিন্যাস গণ্য করা এবং তা নিয়ে বিদ্রূপ করা কেবল সেই কবিতাটির প্রতিই নয় বরং সমগ্র কাব্য জগত ও কাব্য চিন্তার প্রতিই জুলুমের নামান্তর৷ অনুরূপভাবে যেসব নিদর্শন নিজেই আল্লাহর পক্ষ থেকে হবার ব্যাপারে সুষ্পষ্ট সাক্ষ্য প্রমাণ পেশ করে এবং যেগুলোর ব্যাপারে যাদুর সাহায্যের এমনি ধরনের নিদর্শনের প্রকাশ ঘটতে পারে বলে কোন বিবেক বুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তি ধারণাও করতে পারে না বরং যাদু বিদ্যা বিশারদগণ যেগুলো সম্পর্কে তাদের বিদ্যার সীমানার আওতায় অনেক উর্ধের বলে সাক্ষ্য দেয় সেগুলোকেও যাদু গণ্য করা কেবল ঐ নিদর্শনগুলোর প্রতিই নয় বরং সুস্থ বিবেক বুদ্ধিও ও প্রকৃত সত্যের প্রতিও বিরাট জুলুম৷
৮৫. ফেরাউন শব্দের অর্থ "সূর্য দেবতার সন্তান"৷প্রাচীন কালে মিসরীয়রা সূর্যকে তাদের মহাদেব বা প্রধান দেবতা মনে করতো৷ এ অর্থে তারা তাকে বলতো (রাও) ফেরাউন এ রাও এর সাথে সম্পর্কযুক্ত ছিল৷ মিসরীয়দের বিশ্বাস অনুযায়ী কোন শাসনকর্তা সার্বভৌম ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অধিকারী হতে হলে তাকে রাও এর শারীরিক অবতার এবং তার দুনিয়াবী প্রতিনিধি হওয়া অপরিহার্য ছিল৷ এ জন্যেই যতগুলো রাজ পরিবার মিসরের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে তাদের প্রত্যেকেই নিজেকে সূর্য বংশীয় হিসেবে পেশ করেছে৷ শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবার পর প্রত্যেকটি শাসক নিজেদের জন্যে ফেরাউন (ফারাও) উপাধী গ্রহণ করে দেশবাসীর সামনে একথা প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করেছে যে, আমি ই তোমাদের প্রধান রব বা মহাদেব৷ এখানেও একথাটিও মনে রাখতে হবে যে, কুরআন মজীদে হযরত মূসার ঘটনা বর্ণানা প্রসংগে দুজন ফেরাউনের কথা বলা হয়েছে৷ একজন ফেরাউনের আমলে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন এবং তার গৃহে প্রতিপালিত হন৷ আর দ্বিতীয় জনের কাছে তিনি ইসলামের দাওয়াত ও বনী ইসরাঈলের মুক্তির দাবী নিয়ে উপস্থিত হন এবং এ দ্বিতীয় ফেরাউনই অবশেষে জলমগ্ন হয়৷বর্তমান যুগের গবেষকদের অধিকাংশের মতে প্রথম ফেরাউন ছিল দ্বিতীয় রামেসাস৷ তার শাসকালে ছিল ১২৯২থেকে ১২২৫খৃষ্টপূর্বদ্দ৷ পিতা দ্বিতীয় রামেসাসের জীবনকালেই সে শাসন কর্তৃত্বের অংশগ্রহন করে এবং পিতার মুত্যুর পর পুরোপুরি রাষ্ট্র ক্ষমতার অধিকারী হয়৷ এ ধারণা বাহ্যত সন্দেহযুক্ত মনে হচ্ছে৷ কারণ ইসরাঈলী ইতিহাসের হিসেব অনুযায়ী হযরত মূসা (আ) ইন্তিকাল করেন ১২৭২ খৃস্টাপূর্বাব্দে৷ তবুও যা হোক আমাদের মনে রাখতে হবে,এগুলো নেহাত ঐতিহাসিক ধারণা ও আন্দজ অনুমান আর মিসরীয় , ইসরাঈলী ও খৃস্টীয় পঞ্জিকার সাহায্যে একেবারে নির্ভুল সময়কালের হিসেব করা কঠিন৷
৮৬. হযরত মূসা আলাইহিস সালামকে দুটি জিনিসের দাওয়াত সহকারে ফেরাউনের কাছে পাঠানো হয়েছিল ৷ এক, আল্লাহ বন্দেগী তথা ইসলাম গ্রহণ করো৷ দুই, বনী ইসরাঈল সম্প্রদায় , যারা আগে থেকেই মুসলমান ছিল, তাদের প্রতি জুলুম -নির্যাতন বন্ধ করে তাদেরকে মুক্ত করে দাও৷ কুরআনের কোথাও এ দুটি দাওয়াতের উল্লেখ করা হয়েছে এক সাথে আবার কোথাও স্থান-কাল বিশেষ আলাদা আলাদা ভাবে এদের উল্লেখ এসেছে৷
৮৭. হযরত মূসা যে বিশ্ব জাহানের শাসক ও সর্বময় কর্তৃত্বশালী আল্লাহর প্রতিনিধি, একথার প্রমাণ স্বরূপ এ দুটি নিদর্শন তাকে দেয়া হয়েছিল৷ ইতিপূর্বেও আমি বলেছি যে, নবী রসূলগণ যখনই নিজেদেরকে রব্বুল আলামীনের প্রেরিত হিসেবে পেশ করেছেন তখনই লোকদের পক্ষ থেকে এ দাবীই জানানো হয়েছে যে, সত্যই যদি তুমি রব্বুল আলামীনের প্রতিণিধি হয়ে থাকো তাহলে তোমার মাধ্যমে এমন কিছু ঘট্নার প্রকাশ হওয়া দরকার, যাতে প্রাকৃতিক আইনের সাধারণ নীতিমালার ব্যতিক্রম ঘটে এবং যার থেকে সুষ্পষ্টভাবে একথা প্রকাশ হয় যে, বিশ্বপ্রভূ তোমার সত্যতা প্রমাণ করার জন্যে নিজের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নিদর্শন হিসেবে এ ঘটনা ঘটিয়েছেন৷ এ দাবীর প্রেক্ষিতে নবীগণ বিভিন্ন নিদর্শন দেখিয়েছেন, যাকে কুরআনের পরিভাষায় আয়াত ও কালাম শাস্ত্রবিদদের পরিভাষায় মুজিযা বলা হয়ে থাকে৷ এ ধরনের মুজিযাকে যারা প্রাকৃতিক আইনের অধীনে উদ্ভুত সাধারণ ঘটনা গণ্য করার চেষ্টা করে তারা আসলে আল্লাহর কিতাবকে মানার ও না মানার মাঝামাঝি এমন একটি ভূমিকা গ্রহণ করে, যাকে কোনক্রমেই যুক্তিসংগত মনে করা যেতে পারে না৷ কারণ কুরআন যেখানে দ্ব্যর্থহীন প্রাকৃতিক আইন বিরোধী ঘটনা উল্লেখ করছে সেখানে পূর্বাপর আলোচনার সম্পূর্ণ বিরুদ্ধাচারণ করে তাকে একটি সাধারণ ঘটনা হিসেবে চিত্রিত করার প্রচেষ্টা চালানো নিছক একটি উদ্ভট বাগাড়ম্বর ছাড়া আর কিছুই নয়৷ এর প্রয়োজন হয় একমাত্র এমন ধরনের লোকদের যারা একদিকে প্রাকৃতিক আইন বিরোধী ঘটনার উল্লেখকারী কোন কিতাবের প্রতি ঈমান আনতে চায় না আবার অন্যদিকে জন্মগতভাবে পৈতৃক ধর্মের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করার কারণে এমন একটি কিতাবকে অস্বীকার করতে চায় না৷ যাতে প্রাকৃতিক আইন বিরোধী ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে৷ মুজিযার ব্যাপারে আসল ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকর প্রশ্ন কেবল একটিই এবং সেটি হচ্ছে, এই যে, মহান সর্বশক্তিমান আল্লাহ সমগ্র বিশ্ব ব্যবস্থাকে একই আইনের ভিত্তিতে সচল করে দেবার পর কি নিজে স্থবির হয়ে বসে পড়েছেন এবং বর্তমানে বিশ্ব জাহানের ব্যবস্থাপনায় কখনো কোন প্রকার হস্তক্ষেপ করতে পারেন না? অথবা তিনি কার্যত নিজের সাম্রাজ্যের যাবতীয় ব্যবস্থাপনা নিজের কর্তৃত্বাধীনে রেখেছেন , প্রতি মুহূর্তে এ বিশ্ব রাজ্যে তার বিধান জারি হচ্ছে এবং সর্বক্ষণ তিনি সকল বস্তুর আকৃতি প্রকৃতিতে এবং ঘটনাবলী স্বাভাবিক গতিধারায় আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে যেভাবে এবং যখন চান পরিবর্তন করেন? এরই প্রশ্নের জওয়াবে যারা প্রথম মতটি পোষণ করেন তাদের পক্ষে মুজিযার স্বীকৃতি দেয়া অসম্ভব৷ কারণ আল্লাহ সম্পর্কে তারা যে ধারণা পোষণ করেন তার সাথে মুজিযা খাপ খায় না৷ এবং বিশ্ব জাহানের ব্যাপারে তাদের যে ধারণা তার সাথে ও না৷ এ ধরনের লোকদের পক্ষে কুরআনের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করার পরিবর্তে পরিষ্কারভাবে কুরআন অস্বীকার করাই সংগত মনে হয়৷ কারণ কুরআন তো আল্লাহ সম্পর্কিত প্রথমোক্ত ধারণাটিকে মিথ্যা ও শেষোক্ত ধারণাটিকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যেই নিজের বর্ণনা ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা ব্যয় করেছে৷ অন্যদিকে যে ব্যক্তি কুরআনের উপস্থাপিত যুক্তি প্রমাণে নিশ্চিন্তে হয়ে শেষোক্ত মতটি গ্রহণ করেন তার জন্যে মুজিযার তাৎপর্য ও স্বরূপ অনুধাবন করা এবং তাকে স্বীকার করে নেয়া মোটেই কঠিন হয় না৷সোজা কথায় বলা যায়, কেউ যদি বিশ্বাস করে অজগর সাপের জন্ম যেভাবে হচ্ছে কেবলমাত্র সেভাবেই তার জন্ম হতে পারে,অন্য কোন পন্থায় তাকে জন্ম দেবার ক্ষমতা আল্লাহর নেই, তাহলে সে একটি লাঠি অজগরে পরিণত হয়েছে বা অজগর লাঠিতে রূপান্তরিত হয়েছে , এ মর্মে কেউ খবর দিলে তা বিশ্বাস করতে পারবে না! পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি এ বিশ্বাস পোষণ করে যে, নিষ্প্রাণ বস্তুর মধ্যে আল্লাহর হুকুমে প্রাণ সঞ্চরিত হয় এবং যে বস্তুকে আল্লাহ যেভাবে চান জীবন দান করতে পারেন,তার কাছে আল্লাহর হুকুমে লাঠির অজগরে রূপান্তরিত হয়ে যাওয়া ঠিক তেমনি স্বাভাবিক সত্য ব্যাপার যেমন সেই একই আল্লাহর হুকুমে ডিমের মধ্যে কতিপয় প্রাণহীন উপাদানের অজগরে পরিণত হওয়া৷একটি ঘটনা সবসময় ঘটে চলছে এবং অন্যটি মাত্র তিনবার ঘটেছে, শুধু মাত্র এতটুকু পার্থক্যের জন্যে একটি ঘটনাকে স্বাভাবিক ও অন্যটিকে অস্বাভাবিক বলা চলে না৷