(৭:৯৪) আমি যখনই কোন জনপদে নবী পাঠিয়েছি, সেখানকার লোকেদেরকে প্রথমে অর্থকষ্ট ও দুঃখ -দুর্দশায় সম্মুখীন করেছি, একথা ভেবে যে, হয়তো তারা বিনম্র হবে ও নতি স্বীকার করবে৷
(৭:৯৫) তারপর তাদের দুরবস্থাকে সমৃদ্ধিতে ভরে দিয়েছি৷ ফলে তারা প্রাচুর্যে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে এবং বলতে শুরু করেছে আমাদের পূর্বপুরুষদের ওপরও দুর্দিন ও সুদিনের আনাগোনা চলতো৷ অবশেষে আমি তাদেরকে সহসাই পাকড়াও করেছি৷ অথচ তারা জানতেও পারেনি৷ ৭৭
(৭:৯৬) যদি জনপদের লোকেরা ঈমান আনতো এবং তাকওয়ার নীতি অবলম্বন করতো, তাহলে আমি তাদের জন্য আকাশ ও পৃথিবীর রবকতসমূহের দুয়ার খুলে দিতাম৷ কিন্তু তারা তো প্রত্যাখ্যান করেছে৷ কাজেই তারা যে অসৎকাজ করে যাচ্ছিলো তার জন্যে আমি তাদেরকে পাকড়াও করেছি৷
(৭:৯৭) জনপদের লোকেরা কি এখন এ ব্যাপারে নির্ভয় হয়ে গেছে যে, আমার শাস্তি কখনো অকস্মাত রাত্রিকালে তাদের ওপর এসে পড়বে না, যখন তারা থাকবে নিদ্রামগ্ন?
(৭:৯৮) অথবা তারা নিশ্চিন্তে হয়ে গেছে যে, আমাদের মজবুত হাত কখনো দিনের বেলা তাদের ওপর এসে পড়বে না, যখন তারা খেলা ধুলায় মেতে থাকবে?
(৭:৯৯) এরা কি আল্লাহর কৌশলের ব্যাপারে নির্ভীক হয়ে গেছে? ৭৮ অথচ যে সব সম্প্রায়ের ধ্বংস অবধারিত তারা ছাড়া আল্লাহর কৌশলের ব্যাপারে আর কেউ নির্ভীক হয় না৷
৭৭. এক একজন নবী ও এক একটি সম্প্রয়ের ব্যাপার আলাদা আলাদা ভাবে বর্ণনা করার পর একটি সাধারণ ও সর্বব্যাপী নিয়ম ও বিধান বর্ণনা করা হচ্ছে৷ প্রতি যুগে প্রত্যেক নবীকে প্রেরণ করার সময় মহান আল্লাহ এ নিয়মটি অবলম্বন করেন৷ নিয়মটি হচ্ছে, যখনই কোন সম্প্রদায়ের মধ্যে কোন নবী পাঠানো হয়েছে তখনই প্রথমে সেই সম্প্রদায়ের বাহ্যিক পরিবেশকে নবীর দাওয়াত গ্রহণের জন্যে সর্বাধিক অনুকূল ও উপযোগী বানানো হয়েছে৷ অর্থাৎ তাদেরকে রকমরি দুর্যোগ দুর্বিপাক ও বিপদের মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে৷ দুর্ভিক্ষ , মহামারী, বানীজ্যিক , ক্ষয়ক্ষতি, সামরিক পরাজয় ও এ ধরনের আরো নানান, দুর্ভোগ, তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে যাতে তাদের মন নরম হয়ে যায়, অহংকার ও ঔদ্ধত্যের দৃপ্ত গ্রীবা নত হয়, শক্তিমদত্ততা, ও ধনলিপ্সা নিস্তেজ হয়ে পড়ে৷নিজেদের উপায় -উপকরণ, শক্তি, ও যোগ্যতার ওপর নির্ভরতা ভেংগে পড়ে এবং তারা যাতে অনুভব করতে পারে যে,ওপরে অন্য কোন শক্তিধর সত্তা আছে এবং তারই হাত রয়েছে, তাদের ভাগ্যের লাগাম৷এভাবে উপদেশের বানী শোনার জন্যে তাদের কান খুলে যাবে এবং নিজেদের প্রভু পরওয়ারদিগারের সামনে সবিনয়ে শির আনত করার জন্যে তারা প্রস্তুত হয়ে যাবে৷তারপর এ ধরনের উপযোগী পরিবেশেও তাদের মন সত্যকে গ্রহণ করতে উদ্যেগী না হলে সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্যের পরীক্ষার মধ্যে তাদেরকে ঠেলে দেয়া হয়৷ এখান থেকেই শুরু হয় তাদের ধ্বংসের প্রক্রিয়া৷ প্রাচুর্য ও সমৃদ্ধির মধ্যে জীবন যাপন করার সময় তারা নিজেদের দুর্দিনের কথা ভূলে যায়৷ তাদের বিকৃত বিবেকবুদ্ধি সম্পন্ন নেতৃতবর্গ তাদের মনোজগতে ইতিহাসের এ নির্বোধ সুলভ দারণা ঢুকিয়ে দেয় যে, জগতে যা কিছু উত্থান পতন ও ভাংগা -গড়া চলেছে, তা কোন বিচক্ষন কুশলী সত্তার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় হচ্ছে না এবং কোন নৈতিক কারণেও হচ্ছে না৷ বরং একটি অচেতন ও অন্ধ প্রকৃতি সম্পূর্ণ নীতি বিবর্জিত কার্যকরণের ভিত্তিতে কখনো ভালো ও কখনো মন্দ দিনের উদ্ভব ঘটাতে থাকে৷ কাজেই ঝড় ঝনঝা ও বিপদ -আপদের আবতারণা থেকে কোন নৈতিক শিক্ষা গ্রহণ করা এবং কোন শুভাকাংখীর দেয়া উপদেশ মেনে নেয়া এক ধরনের মানসিক দুর্বলতা ছাড়া আর কিছুই নয়৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ নির্বোধসূলভ মানসিকতারই নকশা একেছেন নিম্নোক্ত হাদীসটিতে৷

---------------------------------

"বিপদ-মুসিবত তো মুমিনকে পর্যায়ক্রমে সংশোধন করতে থাকে, অবশেষে যখন সে এ চুল্লী থেকে বের হয়ে তখন তার সমস্ত ভেজাল ও খাদ পুড়ে সে পরিচ্ছন্ন ও খাটি হয়ে বেরিয়ে আসে৷ কিন্তু মুনাফিকের অবস্থা হয় ঠিক গাধার মতো৷ সে কিছুই বোঝে না , তার মালিক কেন তাকে বেঁধে রেখেছিল , আবার কেনইবা তাকে ছেড়ে দিল"৷

কাজেই যখন কোন জাতির অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌছে যায় যে, বিপদেও তার হৃদয় আল্লাহর সামনে নত হয় না, আল্লাহর অপরিসীম অনুগ্রহে ও ধন -সম্পদের প্রাচুর্যেও তার হৃদয়ে কৃতজ্ঞতাবোধ জাগে না এবং কোন অবস্থায়ই সে সংশোধিত হয় না৷ তখন ধ্বংস তার মাথার ওপর এমনভাবে চক্রাকারে ঘুরতে থাকে যেন তা যে কোন সময় তার ওপর নেমে আসবে৷ ঠিক যেমন সন্তান ধারণের সময় পূর্ণ হয়ে গেছে,এমন একজন গর্ভবতী নারীর যে কোন সময় সন্তান প্রসব হতে পারে৷

এখানে আরো একটি কথা ও জেনে নেয়া উচিত্৷ এ আয়াতগুলোতে আল্লাহ নিজে যে নিয়মের কথা উল্লেখ করেছেন নবী (সা) এর আবির্ভাবকালেও ঠিক সেই নিয়মটিই কার্যকর করা হয়৷ ভাগ্য বিড়ম্বিত জাতিগুলোর যেসব কর্মকাণ্ডের দিকে ইংগিত করা হয়েছে সূরা আরাফ অবতীর্ণ হওয়ার দিনগুলোতে মক্কার কুরাইশরা ঠিক সেই একই ধরনের কর্মকাণ্ডের প্রকাশ ঘটিয়ে চলছিল৷আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা)ও আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) উভয়েই একযোগে রেওয়াত করেছেন যে, নবী (সা) এর নবুওয়াতের লাভের পর যখন কুরাইশরা তাঁর দাওয়াতের বিরুদ্ধে চরম উগ্র মনোভাব অবলম্বন করতে শুরু করে তখন নবী (সা) দোয়া করেন,হে আল্লাহ!ইউসুফের যুগে যেমন সাত বছর দুর্ভিক্ষ হয়েছিল তেমনি ধরনের দুর্ভিক্ষের সাহায্যে এ লোকদের মোকাবিলা করার ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করো৷ ফলে আল্লাহ তাদেরকে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন করেন৷ অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌছে যায় যে, লোকেরা মৃত প্রানীর গোশত খেতে শুরু করে, এমন কি চামড়া, হাড়, ও পশম পর্যন্ত খেয়ে ফেলে৷অবশেষে মক্কার লোকেরা আবু সুফিয়ানের নের্তৃত্বের নবী (সা) এর কাছে তাদের জন্যে আল্লাহর দরবারের দোয়া করার আবেদন জানায়৷কিন্তু তাঁর দোয়ায় আল্লাহ যখন সেই মহা সংকট থেকে তাদেরকে উদ্ধার করেন, এবংলোকেরা আবার সুদিনের মুখ দেখে তখন তাদের বুক অহংকারের আগের চাইতে আরো বেশী স্ফীত হয়ে উঠে৷তাদের মধ্যে থেকে যে গুটিকয় লোকের মন নরম হয়ে গিয়েছিল দুষ্টলোকেরা তাদেরকেও এ বলে ঈমানের পথ থেকে ফিরিয়ে নিতে থাকেঃ আরে মিয়া!এসব তো সময়ের উত্থান পতন ও কালের আবর্তন ছাড়া আর কিছুই নয়৷ এর আগেও দুর্ভিক্ষ এসেছে৷ এবারের দুর্ভিক্ষ দীর্ঘ দিন স্থায়ী হয়েছে এটা কোন নতুন কথা নয়৷ কাজেই এসব বাপারে প্রতারিত হয়ে মুহাম্মাদের ফাঁদে পা দিয়ো না৷ এ সূরা আরাফ যে সময় নাযিল হয় সে সময় মুশরিকরা এ বাগাড়ম্বর করে বেড়াচ্ছিল৷ কাজেই কুরআন মজীদের এসব আয়াত অত্যন্ত সময়োপযোগী ও চলতি ঘটনাবলীর সাথে সামঞ্জস্যশীল ছিল৷এ পটভূমিকার আলোকে এ আয়াতগুলোর নিগূঢ় অর্থ ও তাৎপর্য পুরোপুরি অনুধাবন করা যেতে পারে৷ (বিস্তারিত জানার জন্যে দেখুন ,সূরা ইউনুস ২১ আয়াত , আন নহল ১১২ আয়াত, আল মুমিনূন ৫ও ৭৬, আদ দুখান,৯-১৬)৷
৭৮. মূলে------ (মকর) শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে৷ আরবীতে এর অর্থ হচ্ছে, গোপনে গোপনে কোন চেষ্টা তদবীর করা৷ অর্থাৎ কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে এমনভাবে গুটি চালানো, যার ফলে তার ওপর চরম আঘাত না আসা পর্যন্ত সে জানতেই পারে না যে, তার ওপর এক মহা বিপদ আসন্ন ৷রবং বাইরের অবস্থা দেখে সে একথাই মনে করতে থাকে যে, সব কিছু ঠিকমতই চলছে৷