(৭:৭৩) আর সামূদের ৫৭ কাছে পাঠাই তাদের ভাই সালেহকে৷ সে বলেঃ হে আমার সম্প্রদায়ের ভাইয়েরা! তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো৷ তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোন ইলাহ নেই৷ তোমাদের কাছে তোমাদের রবের সুষ্পষ্ট প্রমাণ এসে গেছে৷ আল্লাহর এ উটনীটি তোমাদের জন্য একটি নিদর্শন৷ ৫৮ কাজেই তাকে আল্লাহর জমিতে চরে খাবার জন্যে ছেড়ে দাও৷ কোন অসদুদ্দেশ্যে এর গায়ে হাত দিয়ো না৷ অন্যথায় একটি যন্ত্রনাদায়ক আযাব তোমাদের ওপর আপতিত হবে৷
(৭:৭৪) স্মরণ করো সেই সময়ের কথা যখন আল্লাহ আদ জাতির পর তোমাদেরকে তার স্থলাভিষিক্ত করেন এবং পৃথিবীতে তোমাদেরকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন যার ফলে আজ তোমরা তাদের সমতলভূমিতে বিপুলায়তন প্রাসাদ ও তার পাহাড় কেটে বাসগৃহ নির্মাণ করছো৷ ৫৯ কাজেই তাঁর সর্বময় ক্ষমতার স্মরণ থেকে গাফেল হয়ে যেয়ো না এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না৷ ৬০
(৭:৭৫) তার সম্প্রদায়ের স্বঘোষিত প্রতাপশালী নেতারা দুর্বল শ্রেনীর মুমিনদেরকে বললোঃ “তোমরা কি সত্যি জানো, সালেহ ও তার রবের প্রেরিত নবী? ” তারা জবাব দিলোঃ “নিশ্চয়ই, যে বাণী সহকারে তাঁকে পাঠানো হয়েছে আমরা তা বিশ্বাস করি৷”
(৭:৭৬) ঐ শ্রেষ্ঠত্বের দাবীদাররা বললো , “তোমরা যা বিশ্বাস কর আমরা তা অস্বীকার করি৷”
(৭:৭৭) তারপর তারা সেই উটনীটিকে মেরে ফেললো,৬১ পূর্ণদাম্ভিকতা সহকারে নিজেদের রবের হুকুম অমান্য করলোএবং সালেহকে বললোঃ “নিয়ে এসো সেই আযাব যার হুকমি তুমি আমাদের দিয়ে থাকো, যদি সত্যিই তুমি নবী হয়ে থাকো৷”
(৭:৭৮) অবশেষে একটি প্রলয়ংকর দুর্যোগ তাদেরকে গ্রাস করলো ৬২ এবং তারা নিজেদের ঘরের মধ্যে মুখ থুবড়ে পড়ে রইল৷
(৭:৭৯) আর সালেহ একথা বলতে বলতে তাদের জনপদ থেকে বের হয়ে গেলোঃ “হে আমার সম্প্রদায়! আমার রবের বাণী আমি তোমাদের কাছে পৌছিয়ে দিয়েছি এবং আমি তোমাদের জন্য যথেষ্ট কল্যাণ কামনা করেছি৷ কিন্তু আমি কি করবো, তোমরা তো নিজেদের হিতাকাংখীকে পসন্দই কর না৷”
(৭:৮০) আর লূতকে আমি পয়গম্বর করে পাঠাই৷ তারপর স্মরণ করো, যখন সে নিজের সম্প্রদায়ের ৬৩ লোকদেরকে বললোঃ “তোমরা কি এতই নির্লজ্জ হয়ে গেলে যে, দুনিয়ার ইতিপূর্বে কেউ কখনো করেনি এমন অশ্লীল কাজ করে চলেছো?
(৭:৮১) তোমরা মেয়েদের বাদ দিয়ে পুরুষদের দ্বারা কামপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করছো? ৬৪প্রকৃতপক্ষে তোমরা একেবারেই সীমালংঘনকারী গোষ্ঠী৷”
(৭:৮২) কিন্তু তার সম্প্রদায়ের জওয়াব এ ছাড়া আর কিছুই ছিল না যে, “এদেরকে তোমাদের জনপদ থেকে বের করে দাও৷ এরা বড়ই পবিত্রার ধ্বজাধারী হয়েছে৷” ৬৫
(৭:৮৩) শেষ পর্যন্ত আমি লুতের স্ত্রীকে ছাড়া -যে পেছনে অবস্থানকারীদের অন্তরভুক্ত ছিল ৬৬ তাকে ও তার পরিবারবর্গকে উদ্ধার করে নিয়ে আসি
(৭:৮৪) এবং এ সম্প্রদায়ের ওপর বৃষ্টি বর্ষণ করি৷ ৬৭ তারপর সেই অপরাধীদের কী পরিণাম হয়েছিল দেখো ৷ ৬৮
৫৭. এটি আরবের প্রাচীন জাতিগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় জাতি৷ আদের পরে এরাই সবচেয়ে বেশী খ্যাতি ও পরিচিত অর্জন করে৷ কুরআন নাযিলের পূর্বে এদের কাহিনী সাধারণ মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত ছিল৷ জাহেলী যুগের কবিতা, ও খুতবা সাহিত্যে এর ব্যাপক উল্লেখ পাওয়া যায়৷ আসিরিয়ার শিলালিপি, গ্রীস, ইসকানদারীয়া ও রোমের প্রাচীন ঐতিহাসিক ও ভুগোলবিগণও এর উল্লেখ করেছেন৷ ঈসা আলাইহিস সালামের জন্মের কিছুকাল পুর্বে ও এ জাতির কিছু কিছু লোক বেঁচেছিল৷ রোমীয় ঐতিহাসিকগণের মতে, এরা রোমীয় সেনাবাহিনীতে ভর্তি হয়ে এদের শত্রু নিবতীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে৷ উত্তর পশ্চিম আরবের যে এলাকটি আজো 'আল হিজর' নামে খ্যাত সেখানেই ছিল এদের আবাস৷ আজকের সউদী আরবের অন্তর্গত মদীনা ও তাবুকের মাঝখানে হিজায রেলওয়ের একটি ষ্টেশন রয়েছে, তার নাম মাদায়েনে সালেহ৷এটিই ছিল সামুদ জাতির কেন্দ্রীয় স্থান৷ প্রাচীনকালে এর নাম ছিল হিজর৷সামূদ জাতির লোকেরা পাহাড় কেটে যেসব বিপুলায়তন ইমারত নির্মাণ করেছিল এখনো হাজার হাজার একর এলাকা জুড়ে সেগুলো অবস্থান করছে৷ এ নিঝুম পুরীটি দেখে আন্দাজ করা যায় যে এক সময়ে এ নগরীর জনসংখ্যা চার পাঁচ লাখের কম ছিল না৷ কুরআন নাযিল হওয়ার সময়কালে হেজাযের ব্যবসায়ী কাফেলা এ প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের মধ্যে দিয়ে অতিক্রম করতো৷ তাবুক যুদ্ধের সময় নবী সাল্লাল্লাহু আল্লাইহি ওয়া সাল্লাম যখন এ এলাকা অতিক্রম করছিলেন তখন তিনি মুসলমানদেরকে এ শিক্ষানীয় নিদর্শনগুলো দেখান এবং এমন শিক্ষা দান করেন যা এ ধরনের ধ্বংসাবশেষে থেকে একজন বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ ব্যক্তির শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত৷এ জায়গায় তিনি একটি কুয়ার দিকে অংগুলি নির্দেশ করে বলেন, এ কুয়াটি থেকে হযরত সালেহের উটনী পানি পান করতো৷ তিনি মুসলমানদেরকে একমাত্র এ কুয়াটি থেকে পানি পান করতে বলেন এবং অন্য সমস্ত কুয়া থেকে পানি পান করতে নিষেধ করেন৷ একটি গিরিপথ দেখিয়ে তিনি বলেন, এ গিরিপথ দিয়ে হযরত সালেহের উটনীটি পানি পান করতে আসতো৷তাই সেই স্থানটি আজো ফাজ্জুন নাকাহ বা উটনীর পথ নামে খ্যাত হয়ে আছে৷ তাদের ধ্বংসস্তুপগুলোর মধ্যে যেসব মুসলমান ঘোরাফেরা করছিল তাদেরকে একত্র করে তিনি একটি ভাষণ দেন৷ এ ভাষণে সামুদ জাতির ভয়াবহ পরিণাম তাদেরকে শিক্ষা গ্রহণের উপদেশ দিয়ে তিনি বলেন, এটি এমন একটি জাতির এলাকা যাদের ওপর আল্লাহর আযাব নাযিল হয়েছিল৷ কাজেই এ স্থানটি দ্রুত অতিক্রম করে চলে যাও৷ এটা ভ্রমনের জায়গা নয় বরং কান্নার জায়গা৷
৫৮. আয়াতটির আপাত বক্তব্য দৃষ্টে পরিস্কার অনুভূত হয় যে, পূর্বের বাক্যটিতে আল্লাহর যে সুষ্পষ্ট প্রমাণের কথা বলা হয়েছে, তা দ্বারা এ পরবর্তী বাক্যটিতে নিদর্শন, হিসেবে উল্লেখিত উটনীটিই বুঝানো হয়েছে৷ সূরা শুআরার ৮ রুকূতে সুষ্পষ্টভাবে উল্লেখিত হয়েছে যে, সামুদ জাতির লোকেরা নিজেরাই হযরত সালেহের কাছে এমন একটি নিদর্শনের দাবী করেছিল যা তাঁর আল্লাহর পক্ষ থেকে নিযুক্তির দ্ব্যর্থহীন ও অকাট্য প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং এরি জবাবে হযরত সালেহ উটনীটি হাজির করেন৷ এ থেকে একথা চূড়ান্তভাবে প্রমানিত হয় যে, উটনীর আবির্ভাব হয়েছিল মুজিযা হিসেবে এবং কোন কোন নবী তাঁদের নবুওয়াতের প্রমাণ স্বরূপ নবুওয়াত অস্বীকারকারীদের দাবীর জবাবে যেসব মুজিযা পেশ করেছিলেন এটি ছিল সেই ধরনেরই একটি মুজিযা৷তাছাড়া হযরত সালেহ এই উটনীটি হাজির করার পর যে বক্তব্য রেখেছিলেন তাও এর অলৌকিক জন্মের প্রমাণ৷ তিনি নবুওয়াত অস্বীকারকারীদেরকে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, এখন এ উটনীটির প্রাণের সাথে তোমাদের জীবন জড়িত হয়ে গেছে৷ উটনীটি স্বাধীনভাবে তোমাদের ক্ষেতে চরে বেড়াবে৷একদিন সে একাই পানি পান করবে এবং অন্যদিন সমগ্রজাতির যত পশু আছে সবাই পানি পান করবে৷ আর যদি তোমরা তার গায়ে কোনভাবে হাত উঠাও তাহলে অকস্মাত তোমাদের ওপর আল্লাহর আযাব নেমে আসবে৷ বলা বাহুল্য যে জিনিসটির অস্বাভাবিকতা লোকেরা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছিল একমাত্র সেই জিনিসটি সম্পর্কেই এভাবে কথা বলা সম্ভব৷উপরন্তু এ কথাও প্রনিধানযোগ্য যে, দীর্ঘদিন ধরে সামুদ জাতির লোকেরা তার স্বাধীনভাবে চরে বেড়ানো এবং একদিন তার একাকী পানি পান করা অন্যদিন সমগ্র জাতির সমস্ত পশুদের পানি পান করার বিষয়টি অনিচ্ছা সত্ত্বেও বরদাশত করে এসেছে৷ অবশেষে অনেক শলা-পরামর্শ ও ষড়যন্ত্রের পর তারা তাকে হত্যা করে৷ অথচ তাদের হযরত সালেহকে ভয় করার কিছুই ছিল না৷ কারণ তাঁর কোন ক্ষমতা বা প্রতাপ ছিল না৷ এ অকাট্য ও জ্বলন্ত সত্য দ্বারা আরো প্রমাণিত হচ্ছে যে, তারা এ উটনীর ভয়ে ভীত -সস্ত্রস্ত ছিল৷ তারা জানতো, এর পেছনে নিশ্চয়ই কোন শক্তি আছে, তারই জোরে সে তাদের মধ্যে দোর্দণ্ড প্রতাপে ঘুরে বেড়ায়৷ উটনীটি কেমন ছিল এবং কিভাবে জন্ম লাভ করলো,তার কোন বর্ণনা কুরআন দেয়নি৷ কোন নির্ভরযোগ্য সহীহ, হাদীসেও এর বিস্তারিত কোন বিবরণ নেই ৷ তাই এ উটনীটির জন্মবৃত্তান্ত সম্পর্কে যেসব বর্ণনা মুফাসসিরগণ উদ্ধৃত করেছেন তা মেনে নেয়া অপরিহার্য নয়৷ কিন্তু এর জন্ম যে, কোন না কোনভাবে মুজিযা ও অলৌকিক ঘটনার পর্যায়ভুক্ত তা অবশ্যি কুরআন থেকে প্রমাণিত৷
৫৯. সামূদদের এ গৃহ নির্মাণ শিল্পটি ছিল ভারতের ইলোরা , অজন্তা গূহাও অন্যান্য স্থানে প্রাপ্ত পর্বত গাত্রের গৃহের ন্যায়৷ অর্থাৎ তারা পাহাড় কেটে তার মধ্য বিরাট বিরাট ইমারত তৈরী করতো৷ মাদায়েনে সালেহ এলাকায় এখনো তাদের এসব ইমারত সম্পূর্ণ অবিকৃত অবস্থায় রয়ে গেছে৷ সেগুলো দেখে এ জাতি স্থাপত্য বিদ্যায় কেমন বিস্ময়কর উন্নতি সাধন করেছিল, তা অনুমান করা যায়৷
৬০. অর্থাৎ আদ জাতির পরিণাম থেকে শিক্ষা গ্রহণ করো৷ তোমরা যদি আদদের মতো বিপর্যয় সৃষ্টি করতে থাকো, তাহলে যে মহান আল্লাহর অসাধারণ ক্ষমতা এ বিপর্যয় সৃষ্টিকারী জাতিকে ধ্বংস করে দিয়ে তার জায়গায় তোমাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছিলেন, সেই মহা শক্তিধর আল্লাহই আবার তোমাদেরকে ধ্বংস করে দিয়ে অন্যদেরকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করতে পারেন৷ (টীকা ৫২ দ্রষ্টব্য৷)
৬১. সূরা কামার ও সূরা শাসম-এর বর্ণনা অনুযায়ী যদিও এক ব্যক্তিই মেরেছিল তবুও যেহেতু সমগ্র জাতি এ অপরাধীর পেছনে ইন্ধন যুগিয়েছিল এবং অপরাধী লোকটি ছিল নিছক তার জাতির ক্রীড়নক মাত্র,তাই অভিযোগ আনা হয়েছে সমগ্র জাতির বিরুদ্ধে৷ জাতির ইচ্ছা ও আকাংখা অনুযায়ী যে সমস্ত গুনাহ করা হয় অথবা যে সমস্ত গুনাহ করার ব্যাপারে জাতির সম্মতি ও সমর্থন থাকে কোন ব্যক্তি বিশেষ সেগুলো করলেও জাতীয় গুনাহেরই পর্যায়ভুক্ত৷ শুধু তাই নয়, কুরআন বলে, জাতীয় অংগনে প্রকাশ্যে যে গুনাহ করা হয় এবং জাতি তা বরদাশত করে নেয় তাও জাতীয় পাপ হিসেবে বিবেচিত৷
৬২. এ দুর্যোগকে এখানে -------(প্রলয়ংকর ও ভূকম্পনের সাহায্যে মৃত্যুদানকারী) বলা হয়েছে৷ অন্য স্থানে এ জন্যে ---------(চীৎকার,)-----(বজ্রপাত) ও --------(বিকট শব্দ) শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়েছে৷
৬৩. বর্তমানে যে এলাকাটিকে ট্রান্স জর্ড বলা হয় সেখানেই ছিল এ জাতিটির বাস৷ ইরাক ও ফিলিস্তিনের মধ্যবর্তী স্থানে এ এলাকাটি অবস্থিত৷ বাইবেলে সাদূম কে এ জাতির কেন্দ্রস্থল বলা হয়েছে৷ মৃত সাগরের (Dead sea) নিকটবর্তী কোথাও এর অবস্থান ছিল৷ তালমূদে বলা হয়েছে, সাদূম ছাড়া তাদের আরো চারটি বড় বড় শহর ছিল৷ এ শহরগুলোর মধ্যবর্তী এলাকাসমূহ এমনই শ্যামল সবুজে পরিপূর্ণ ছিল যে, মাইলের পর মাইল জুড়ে এ বিস্তৃত এলাকা যেন একটি বাগান মনে হতো৷ এ এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মানুষকে মুগ্ধ ও বিমোহিত করতো৷ কিন্তু আজ এ জাতির নাম- নিশানা দুনিয়ার বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে৷ এমনকি তাদের জনপদগুলো কোথায় কোথায় অবস্থিত ছিল তাও আজ সঠিকভাবে জানা যায় না৷ মৃত সাগরই তাদের একমাত্র স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে টিকে আছে৷ বর্তমানে এটি 'লুত সাগর' নামে পরিচিত৷

হযরত লূত আলাইহিস সালাম ছিলেন ইবরাহীম আলাইহিস সালামের ভাইপো৷ তিনি চাচার সাথে ইরাক থেকে বের হন এবং কিছু কাল সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও মিসর সফর করে দাওয়াত ও তাবলীগের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে থাকেন৷ অতপর স্বতন্ত্রভাবে রিসালাতের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়ে এ পথ ভ্রষ্ট জাতিটির সংস্কার ও সংশোধনের দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত হন৷সাদূমবাসীদের সাথে সম্ভবত তাঁর আত্মীয়তার সম্পর্কের কারণে তাদেরকে তার সম্প্রদায় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে৷

ইহুদীদের হাতে বিকৃত বাইবেলে হযরত লূতের চরিত্রের বহুতর কলংক কালিমা লেপন করা হয়েছে৷ এর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, তিনি নাকি হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সাথে ঝগড়াঝাঁটি করে সাদূম এলাকায় চলে গিয়েছিলেন৷ (আদিপুস্তক ১৩:১-১২) কিন্তু কুরআন এ মিথ্যাচারের প্রতিবাদ করছে৷ কুরআনের বক্তব্য মতে আল্লাহ তাকে রসূল নিযুক্ত করে এ জাতির কাছে পাঠান৷
৬৪. অন্যান্য স্থানে এ জাতির আরো কয়েকটি নৈতিক অপরাধের কথা বর্ণনা করা হয়েছে৷ কিন্তু এখানে কেবলমাত্র তাদের সবচেয়ে বড় অপরাধটির উল্লেখ করেই ছেড়ে দেয়া হয়েছে৷ এ অপরাধটির ফলে তাদের ওপর আল্লাহর আযাব আপতিত হয়৷ এ ঘৃণ্য অপকর্মটির বদৌলতে এ জাতি যদিও দুনিয়ার বুকে চিরদিনই দিক্কার ও কুখ্যাতি কুড়িয়েছে৷ কিন্তু অসৎ ও দুষ্কর্মশীল লোকেরা এ অপকর্মটি থেকে কখনো বিরত থাকেনি৷ তবে একমাত্র গ্রীকরাই এ একক কৃতিত্বের অধিকারী হয়েছে যে, তাদের দার্শনিকরা এ জঘন্য অপরাধটিকে উৎকৃষ্ট নৈতিক গুণের পর্যায়ে পৌছে দেবার চেষ্টা করেছে৷ এরপর আর যেটুকু বাকি ছিল, আধুনিক ইউরোপ তা পূর্ণ করে দিয়েছে৷ ইউরোপে এর স্বপক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়েছে৷ এমনকি একটি দেশের (জার্মানী) পার্লামেণ্ট একে রীতিমতো বৈধ গণ্য করেছে৷ অথচ সমকামিতা যে সম্পূর্ণ প্রকৃতি বিরোধী একথা একটি অকাট্য সত্য৷ মহান আল্লাহ শুধুমাত্র সন্তান উৎপাদন ও বংশরক্ষার উদ্দেশ্যই সকল প্রানীর মধ্যে নর-নারীর পার্থক্য সৃষ্টি করে রেখেছেন৷ আর মানব জাতির মধ্যে এ বিভিন্নতার আর একটি বাড়তি উদ্দেশ্য হচ্ছে নর ও নারী মিলে এক একটি পরিবারের জন্ম দেবে এবং তার মাধ্যমে সমাজ-সভ্যতা -সংস্কৃতির ভিত গড়ে উঠবে৷ এ উদ্দেশ্যেই নারী ও পুরুষের দুটি পৃথক লিংগের সৃষ্টি করা হয়েছে৷তাদের মধ্যে যৌন আকর্ষণ সৃষ্টি করা হয়েছে৷ পারষ্পরিক দাম্পত্য উদ্দেশ্য পূর্ণ করার উপযোগী করে তাদের শারীরিক ও মানসিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে৷ তাদের পারস্পরিক আকর্ষণ ও মিলনের মধ্যেএমন একটি আনন্দ মধুর স্বাদ রাখা হয়েছে যা প্রকৃতির উদ্দেশ্য পূর্ণ করার জন্যে একই সংগে আকর্ষনকারী ও আহবায়কের কাজ করে এবং এ সংগে তাদেরকে দান করে এ কাজের প্রতিদানও৷ কিন্তু যে ব্যক্তি প্রকৃতির এ পরিকল্পনার বিরুদ্ধাচারণ করে সমমৈথুনের মাধ্যেম যৌন আনন্দ লাভ করে সে একই সংগে কয়েকটি অপরাধ করে৷ প্রথমত সে নিজের এবং নিজের স্বাভাবিক দৈহিক ও মানসিক কাঠামোর সাথে যুদ্ধ করে এবং তার মধ্যে বিরাট বিপর্যয় সৃষ্টি করে৷ এর ফলে তাদের উভয়ের দেহ, মন ও নৈতিক বৃত্তির ওপর অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে৷ দ্বিতীয়ত, সে প্রকৃতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে৷ কারণ প্রকৃতি তাকে যে আনন্দ স্বাদ মানব জাতির ও মানসিক সংস্কৃতির সেবায় প্রতিদান হিসেবে দিয়েছিল, এবং যা অর্জন করাকে তার দায়িত্ব, কর্তব্য ও অধিকারের সাথে শর্তযুক্ত করেছিল, সেই স্বাদ ও আনন্দ সে কোন প্রকার সেবামূলক কার্যক্রম , কর্তব্য পালন, অধিকার আদায় ও দায়িত্ব সম্পাদন ছাড়াই ভোগ করে৷ তৃতীয়ত সে মানব সমাজের সাথে প্রকাশ্যে বিশ্বাসঘাতকা করে৷ কারণ সমাজে যে সমস্ত তামাদ্দুনিক প্রতিষ্ঠান তৈরী করেছে সেগুলোকে সে ব্যবহার করে এবং তার সাহায্যে লাভবান হয়৷ কিন্তু যখন তার নিজের দেবার পালা আসে তখন অধিকার ,দায়িত্ব ও কর্তব্যের বোঝা বহন করার পরিবর্তে সে নিজের সমগ্র শক্তিকে নিরেট স্বার্থপরতার সাথে এমনভাবে ব্যবহার করে, যা সামাজিক সংস্কৃত ও নৈতিকতার জন্যে কেবলমাত্র অপ্রয়োজনীয় ও অলাভজনকই হয় না বরং নিদারুনভাবে ক্ষতিকরও হয়৷ সে নিজেকে বংশ ও পরিবারের সেবার অযোগ্য করে তোলে৷নিজের সাথে অন্ততপক্ষে একজন পুরুষকে নারী সূলভ আচরনের লিপ্ত করে৷ আর এই সংগে কমপক্ষে দুটি মেয়ের জন্যে যৌন ভ্রষ্টতা ও নৈতিক অধপতনের দরজা উন্মুক্ত করে দেয়৷
৬৫. এ থেকে জানা যায়,এ লোকগুলো কেবল নির্লজ্জ, দুষ্কৃতিকারী, ও দুশ্চরিত্রই ছিল না বরং তারা নৈতিক অধাপতনের এমন চরমে পৌছে গিয়েছিল যে, নিজেদের মধ্যে কতিপয় সৎব্যক্তির ও সৎকর্মের দিকে আহবানকারী ও অসৎকর্মের সমালোচনাকারীর অস্তিত্ব পর্যন্ত বরদাশত করতে প্রস্তুত ছিল না৷তারা অসৎকর্মের মধ্যে এতদূর ডুবে গিয়েছিল যে, সংশোধনের সামান্যতম আওয়াজও ছিল তাদের সহ্যের বাইরে৷ তাদের জঘন্যতম পরিবেশে পবিত্রতার যে সামান্যতম উপাদান অবশিষ্ট থেকে গিয়েছিল তাকেও তারা উৎখাত করতে চাইছিল৷ এ ধরনের একটি চুড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যাবার পর আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদেরকে উৎখাত করার সিদ্ধান্ত হয়৷ কারণ যে জাতির সমাজ জীবনে পবিত্রতার সামান্যতম উপাদানও অবশিষ্ট থাকে না তাকে পৃথিবীর বুকে বাঁচিয়ে রাখার কোন কারণই থাকতে পারে না৷ পচা ফলের ঝুড়িতে যতক্ষণ কয়েকটি ভাল ফল থাকে ততক্ষণ ঝুড়িটি যত্নের সাথে রেখে দেয়া যেতে পারে৷ কিন্তু এ ভাল ফলগুলো ঝুড়ি থেকে বের করে নেয়ার পর এই ঝুড়িটি যত্নের সাথে সংরক্ষিত করে রাখার পরিবর্তে পথের ধারে কোন আবর্জনার স্তুপে নিক্ষেপ করারই যোগ্য হয়ে পড়ে৷
৬৬. অন্যান্য স্থানে সুস্পষ্টভাবে বলে দেয়া হয়েছে যে, হযরত লূতের এ স্ত্রীটি সম্ভবত এ সম্প্রদায়েই কন্যা ছিল , সে তার নিজের কাফের আত্মীয়গোষ্ঠির কণ্ঠে কণ্ঠ মিলায় এবং শেষ পর্যন্তও তাদের সংগ ছাড়েনি৷ তাই আযাব আসার পূর্বে মহান আল্লাহ যখন হযরত লূত ও তাঁর ঈমানদান সাথীদেরকে হিজরত করার নির্দেশ দেন তখন তাঁর ঐ স্ত্রীকে সংগে নিতে নিষেধ করেন৷
৬৭. বৃষ্টি মানে এখানে পানি -বৃষ্টি নয় বরং পাথর-বৃষ্টি ৷ কুরআনের অন্যান্য স্থানে এ কথাটি সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে ৷ তাছাড়া কুরআনে একথাও বলা হয়েছে যে, তাদের জনপদের উল্টিয়ে দিয়ে তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হয়৷
৬৮. এখানে এবং কুআনের আরো বিভিন্ন স্থানে কেবল এতটুকুন বলা হয়েছে, যে, লূত জাতি একটি অতি জঘন্য ও নোংরা পাপ কাজের অনুশীলন করে যাচ্ছিল ৷ এবং এ ধরনের পার কাজের পরিণামে এ জাতির ওপর আল্লাহর গযব নেমে আসে৷ তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশনা থেকে আমরা একথা জানতে পেরেছি যে, এটি এমন একটি অপরাধ সমাজ অংগনকে যার কুলুষমুক্ত রাখার চেষ্টা করা ইসলামী রাষ্ট্রের দায়ীত্বের অন্তর্ভুক্ত এবং এ ধরনের অপরাধকারীদেরকে কঠোর শাস্তি দেয়া উচিত৷এ প্রসংগে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে যে সমস্ত হাদীস বর্ণিত হয়েছে তার কোনটিতে বলা হয়েছেঃ----------(এঅপরাধকারী ও যার সাথে সে অপরাধ করেছে তাদের উভয়কে হত্যা করো)আবার কোনটিতে এর ওপর এতটুকু বৃদ্ধি করা হয়েছেঃ

------------(বিবাহিত হোক বা অবিবাহিত )৷আবার কোথাও এও বলা হয়েছেঃ ----------------(ওপরের ও নীচের উভয়কে পাথর মেরে হত্যা করো৷) কিন্তু যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে এ ধরনের কোন মামলা আসেনি তাই এর শাস্তি কিভাবে দেয়া হবে, তা অকাট্যভাবে চিহ্নিত হতে পারেনি৷সাহাবীগণের মধ্যে হযরত আলীর(রা) মতে অপরাধীকে তরবারীর আঘাতে হত্যা করতে হবে এবং কবরস্থ করার পরিবর্তে তার লাশ পুড়িয়ে ফেলতে হবে৷ হযরত আবু বকর(রা) এ মত সমর্থন করেন৷হযরত উমর(রা) ও হযরত উসমানের (রা) মতে কোন পতনোন্মুখ ইমারতের নীচে তাকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে ইমারতটিকে তার ওপর ধ্বসীয়ে দিতে হবে৷ এ ব্যাপারে ইবনে আব্বাসের (রা) ফতোয়া হচ্ছে, মহল্লার সবচেয়ে উঁচু বাড়ির ছাড় থেকে তাকে পা উপরের দিকে এবং মাথা নিচের দিকে করে নিক্ষেপ করতে এবং এই সংগে উপর থেকে তার ওপর পাথর নিক্ষেপ করতে হবে৷ফকীহদের মধ্যে ইমাম শাফেঈ(র) বলেন, অপরাধী ও যার সাথে অপরাধ করা হয়েছে তারা বিবাহিত হোক বা অবিবাহিত , তাদের উভয়কে হত্যা করা ওয়াজিব৷শাবী যুহরী, মালিক ও আহমদ (রাহেমাহুল্লাহুর)মতে তাদের শাস্তি হচ্ছে রজম অর্থাৎ পাথর মেরে হত্যা করা৷ সাঈদ ইবনুল মুসাইয়েব,আতা, হাসান বসরী, ইবরাহীম নাখঈ, সুফিয়ান সওরী , ও আওযাঈর (রাহেমাহুমুল্লাহুর )মতে যিনার অপরাধে যে শাস্তি দেয়া হয় এ অপরাধের সেই একই শাক্তি দেয়া হবে৷ অর্থাঃ অবিবাহিতকে একশত বেত্রাঘাত করে দেশ থেকে বহিস্কার করা হবে, এবং বিবাহিতকে রজম করা হবে৷ ইমাম আবু হানিফার(র) মতে,তার ওপর কোন দণ্ডবিধি নির্ধারিত নেই বরং এ কাজটি এমন যে, সরকার তার বিরুদ্ধে অবস্থা ও প্রয়োজন অনুপাতে যে কোন শিক্ষনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন৷এর সমর্থনে ইমান শাফেঈর একটি বক্তব্যও পাওয়া যায়৷

উল্লেখ্য যে, কোন ব্যক্তির তার নিজের স্ত্রীর সাথেও লূত জাতির কুকর্ম করা চূড়ান্তভাবে হারাম৷ আবু দাউদে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ উক্তি উদ্বৃত হয়েছেঃ--------- (যে ব্যক্তি তার স্ত্রীর পশ্চাদ্দেশে যৌন কার্য করে সে অভিশপ্ত৷) ইবনে মাজাহ ও মুসনাদে আহমদে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ বানী উদ্বৃত হয়েছেঃ -----------(যে ব্যক্তি নিজের স্ত্রীর পশ্চাদ্দেশে যৌন সংগমে লিপ্ত হয় আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার প্রতি দৃষ্টিপাত করবেন না৷) ইমাম তিরমিযী তাঁর আর একটি নির্দেশ উদ্ধৃত করেছেন৷ তাতে বলা হয়েছেঃ

--------------------------------------

"যে ব্যক্তি ঋতুবতী অবস্থায় স্ত্রী সহবাস করে অথবা নিজের স্ত্রীর পশ্চাদ্দেশে যৌন কার্য করে বা কোন গণকের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে , সে মুহাম্মাদের (সা) প্রতি অবতীর্ণ বিধান অস্বীকার করে"৷