(৬৯:৩৮) অতএব তা নয়৷ ২১ আমি শপথ করছি ঐ সব জিনিসের ও যা তোমরা দেখতে পাও
(৬৯:৩৯) এবং ঐসব জিনিসের যা তোমরা দেখতে পাওনা৷
(৬৯:৪০) এটা একজন সম্মানিত রসূলের বাণী ২২
(৬৯:৪১) কোন কবির কাব্য নয়৷ তোমরা খুব কমই ঈমান পোষণ করে থাকো৷ ২৩
(৬৯:৪২) আর এটা কোন গণকের গণনাও নয়৷ তোমরা খুব কমই চিন্তা-ভাবনা করে থাকো৷
(৬৯:৪৩) এ বাণী বিশ্ব-জাহানের রবের পক্ষ থেকে নাযিলকৃত৷ ২৪
(৬৯:৪৪) যদি এ নবী নিজে কোন কথা বানিয়ে আমার কথা বলে চালিয়ে দিতো
(৬৯:৪৫) তাহলে আমি তার ডান হাত ধরে ফেলতাম
(৬৯:৪৬) এবং ঘাড়ের রগ কেটে দিতাম৷
(৬৯:৪৭) তোমাদের কেউ-ই (আমাকে ) এ কাজ থেকে বিরত রাখতে পারতো না৷ ২৫
(৬৯:৪৮) আসলে এটি আল্লাহভীরু লোকদের জন্য একটি নসীহত৷ ২৬
(৬৯:৪৯) আমি জানি তোমাদের মধ্য থেকে কিছু সংখ্যক লোক মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে থাকবে৷
(৬৯:৫০) নিশ্চিতভাবে তা এসব কাফেরদের জন্য অনুতাপ ও আফসোসের ২৭ কারণ হবে৷
(৬৯:৫১) এটি অবশ্যই এক নিশ্চিত সত্য৷
(৬৯:৫২) অতএব হে নবী, তুমি তোমার মহান রবের পবিত্রতা ঘোষণা করো৷
২১. অর্থাৎ তোমরা যা মনে করে নিয়েছো ব্যাপার তা নয়৷
২২. এখানে সম্মলিত রসূল মানে হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ৷ কিন্তু সূরা তাকবীরে (আয়াত ১৯ ) সম্মানিত রসূলের যে উল্লেখ আছে তার অর্থ হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম৷ এখানে যে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেই সম্মানিত রসূল বলা হয়েছে তার প্রমাণ হলো, কুরআনকে সম্মানিত রসূলের বাণী বলার পরেই বলা হয়েছে যে তা কোন কবি ব গণকের কথা নয়৷ আর একথা সবারই জানা যে, মক্কার কাফেররা হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেই কবি বা গণক বলতো৷ তারা জিবরাঈল আলাইহিস সলামকে কবি বা গণক বলতো না৷ পক্ষান্তরে সূরা তাকবীরে কুরআন মজীদকে সম্মানিত রসূলের বাণী বলার পরে বলা হয়েছে যে, সে রসূল অত্যন্ত শক্তিশালী, আরশের অধিপতির কাছে উচ্চা মর্যাদার অধিকারী, সেখানে তাঁর কথা গ্রহণ করা হয়, তিনি বিশ্বস্ত ও আমানতদার এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে পরিস্কর দিগন্তে দেখেছেন৷ সূরা নাজমের ৫থেকে ১০ আয়াতে জিবরাঈল আলাইহিস সাল্লাম সম্পর্কে প্রায় এ একই বিষয় বর্ণিত হয়েছে৷ এখানে একটি প্রশ্ন জাগে৷ তাহলো, কুরআনকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও জিবরাঈল আলাইহি সালামের বাণী বলার তাৎপর্য কি? এর জওয়াব হলো, মানুষ কুরআনের এ বাণী শুনতো রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখ থেকে এবং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুনতেন জিবরাঈল আলাহিস সালামের মুখ থেকে৷ তাই এক বিচারে এটি ছিল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বানী এবং আরেক বিচারে এটি হযরত জিবরাঈল আলাহিস সালামের বাণী৷ কিন্তু পরক্ষণেই বিষয়টি ষ্পস্ট করে বলে দেয়া হয়েছে৷ বলা হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে এ হচ্ছে সমগ্র বিশ্ব-জাহানের রবের নাযিলকৃত বাণী৷ তবে তা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিবরাঈলের মুখ থেকে এবং লোকদেরকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখ থেকে শুনানো হচ্ছে৷ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিজের কথা থেকেও এ সত্যটিই ফুটে উঠে৷ তিনি বলেছেন যে, এসব তাদের দুজনের কথা নয়৷ বরং বার্তাবাহক হিসেবে তাঁর এ বাণী মূল বাণী প্রেরকের পক্ষ থেকে পেশ করেছেন৷
২৩. "কমই ঈমান পোষণ করে থাকো" প্রচলিত আরবী বাকরীতি অনুসারে এর একটি অর্থ হতে পারে তোমরা আদৌ ঈমান পোষণ করো না৷ এর আরেকটি অর্থ এও হতে পারে যে, কুরআন শুনে কোন সময় তোমাদের মন হয়তো স্বতষ্ফূর্তভাবেই বলে ওঠে যে, এটা মানুষের কথা হতে পারে না৷ কিন্তু তোমরা নিজেদের হঠকারিতার ওপর অবিচল রয়েছ এবং এ বানীর ওপর ঈমান আনতে অস্বীকৃতি জানিয়ে থাকো৷
২৪. সারকথা হলো তোমরা যা কিছু দেখতে পাও এবং যা কিছু দেখতে পাও না তার কসম আমি এ জন্য করছি যে, এ কুরআন কোন কবি বা গণকের কথা নয়৷ বরং সারা বিশ্ব-জাহানের রবের নাযিলকৃত বাণী৷ এ বাণী এমন এক রসূলের মুখ থেকে উচ্চারিত হচ্ছে যিনি মর্যাদাবান (অত্যন্ত সম্মানিত ও ভদ্র)৷ এখন দেখা যাক কসম করার উদ্দেশ্য কি? লোকজন যা কিছু দেখতে পাচ্ছিল তাহলোঃ

একঃএ বাণী এমন ব্যক্তি পেশ করেছিলেন যার মার্জিত ও ভদ্র স্বভাবের বিষয়টি মক্কা শহরের কারোই অজানা ছিল না৷ সমাজের সবাই একথা জানতো যে, নৈতিক চরিত্রের দিক দিয়ে তিনি তাদের জাতির মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি৷ এরূপ লোক আল্লাহর বিরুদ্ধে মিথ্যা আরোপ করবে এবং নিজে কোন কথা বানিয়ে মহান আল্লাহর কথা বলে তা চালিয়ে দেবে, এত বড় মিথ্যার বেসাতি এ লোকের কাছ থেকে আশা করা যায় না৷

দুইঃ তারা আরো দেখছিল যে, এ ব্যক্তিগত স্বার্থের বশবর্তী হয়ে এ বানী পেশ করছে না৷ বরং এ কাজ করতে গিয়ে সে নিজের স্বার্থকেই জলাঞ্জলী দিয়েছে৷ এ কাজ করতে গিয়ে সে নিজের ব্যবসায় -বাণিজ্য ধ্বংস করেছে, আরাম-আয়েশ ত্যাগ করেছে, যে সমাজে তাকে অভাবনীয় সম্মান দেখানো হতো সেখানেই তাকে গালাগালিজের সম্মুখীন হতে হচ্ছে, আর এসব করে নিজেই যে শুধু দুঃখ-দুর্দশার মুখে ঠেলে দিয়েছে৷ ব্যক্তি স্বার্থের পূজারী হলে সে নিজেকে এ দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে টেনে আনবে কেন?

তিনঃ তারা নিজের চোখে এও দেখেছিলো যে, তাদের সমাজের যেসব লোক ঐ ব্যক্তির প্রতি ঈমান আনছিলো তাদের জীবনে হঠাৎ একটি বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয়ে যাচ্ছে৷ কোন কবি অথবা গণকের কথার এতটা প্রভাব কি কখনো দেখা গিয়েছে যে তা মানুষের মধ্যে ব্যাপক নৈতিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে আর তার অনুসারীরা এ জন্য সব রকমের বিপদাপদ ও দুঃখ-কষ্ট বরদাশত করতে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছে?

চারঃ কবিদের ভাষা কেমন হয়ে থাকে এবং গণকদের কথাবার্তা কিরূপ হয় তাও তাদের অজানা ছিল না৷ কুরআনের ভাষা, সাহিত্য ও বিষয়বস্তুকে কবির কাব্য এবং গণকের গণনা সদৃশ বলা একমাত্র হঠকারি ব্যক্তি ছাড়া আর কারো পক্ষে সম্ভব ছিল না৷ (আমি এ বিষয়ে তাফহীমুল কোরআনের সূরা আম্বিয়ার ৭নং টীকায় সূরা শুআরার ১৪২ থেকে ১৪৫নং টীকায় এবং সূরা আত্ তূরের ২২ নং টীকায় বিস্তারিত আলোচনা করেছি)৷

পাঁচঃ সমগ্র আরব ভূমিতে উন্নত ভাষাশৈলীর অধিকারী এমন কোন ব্যক্তি ছিল না যার চমকপ্রদ ও অলংকারময় ভাষাকে কুরআনের মোকাবিলায় পেশ করা যেতো৷ কুরআনের সমকক্ষ হওয়া তো দূরের কথা কারো ভাষার বিশুদ্ধতা ও শ্রুতিমাধুর্য কুরআনের উন্নত ভাষাশৈলীর ধারে কাছে ঘেঁষারও যোগ্যতা রাখতো না৷ এ বিষয়টিও তাদের জানা ছিল৷

ছয়ঃ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লাম নিজের কথাবার্তা ও ভাষার সাহিত্যিক উৎকর্ষ ও কুরআনের সাহিত্যিক মান ও উৎকর্ষ থেকে যে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ছিল তাও তাদের আগোচরে ছিল না৷ আরবী ভাষাভাষী কোন ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বক্তৃতা এবং কুরআন শোনার পর বলতে পারতো না যে, এ দুটি একই ব্যক্তির মুখের কথা৷

সাতঃ যেসব বিষয়বস্তু ও জ্ঞান-বিজ্ঞান কুরআনে পেশ করা হয়েছে নবুওয়াত দাবী করার একদিন আগেও মক্কার লোকেরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখ থেকে তা শোনেনি৷ তার এও জানতো যে তাঁর কাছে এসব তথ্য ও বিষয়বস্তু জানার কোন উপায় -উপকরণ ও নেই ৷ তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন গোপনীয় সূত্র থেকে এসব তথ্য ও জ্ঞান লাভ করেছেন বলে তাঁর বিরোধীরা তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করলেও মক্কার কেউ-ই তা বিশ্বাস করতো না৷ (আমি তাফহীমুল কোরআনের সূরা আন নাহলের ১০৭ নং টীকা এবং সূরা আল ফুরকানের ১২ নং টীকায় এর বিস্তারিত ব্যাখ্যাপেশ করেছি৷)

আটঃ এ পৃথিবী থেকে সুদূর আসমান তথা মহাশূন্য পর্যন্ত বিস্তৃত এ বিরাট-বিশাল বিশ্ব-জাহানকে তারা নিজ চোখে সুচারু রূপে পরিচালিত হতে দেখছিল৷ তারা এও দেখছিলো যে, এ বিশাল বিশ্বলোক একটি জ্ঞানগর্ভ আইন-বিধান এবং সর্বব্যাপী নিয়ম-শৃংখলা দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে৷ আরবের লোকেরা শিরকে লিপ্ত ছিল এবং আখেরাত অস্বীকার করতো৷ এটা ছিল তাদের আকীদা-বিশ্বাসের অন্তর্গত৷ কিন্তু এ বিশাল বিশ্বলোকের পরিচালনা ও নিয়ম-শৃংখলার কোন ক্ষেত্রেই তারা শিরক ও আখেরাত অস্বীকৃতির পক্ষে কোন সাক্ষ -প্রমাণ খুঁজে পেতো না৷ বরং কুরআন তাওহীদ ও আখেরাতের যে ধারণা পেশ করছে সর্বত্র তারই সত্যতার সাক্ষ্ প্রমাণ পাওয়া যায়৷

এসবই তারা দেখতে পাচ্ছিল৷ কিন্তু যেসব জিনিস তারা দেখতে পাচ্ছিল না তাহলো, প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাআলাই এ বিশ্ব-জাহানের স্রষ্টা, মালিক এবং শাসক,বিশ্ব-জাহানের সবাই তাঁর বান্দা একমাত্র তিনি ছাড়া আর কেউ ইলাহ নয়, কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে, আল্লাহ তাআলাই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রসূল করে পাঠিয়েছেন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকেই তাঁর ওপর কুরআন নাযিল হচ্ছে৷ পূর্বোক্ত আয়াতগুলোতে যা বলা হয়েছে তা বলা হয়েছে এ দুধরনের সত্যের কসম খেয়ে৷
২৫. নিজের পক্ষ থেকে অহীর মধ্যে কম বেশী করার ইখতিয়ার নবীর নেই, নবী যদি এ কাজ করে তাহলে আমি তাকে কঠিন শাস্তি দেবো, একথাটি বলাই এ আয়াতের মূল উদ্দেশ্য৷ কিন্তু এথাটি বলতে যে বাচনভংগী গ্রহণ করা হয়েছে তাতে চোখের সামনে এমন একটি চিত্র ভেসে উঠে যে, বাদশাহর নিযুক্ত কর্মচারী বাদশাহের নামে জালিয়াতী করলে তিনি তাকে পাকড়াও করে তার গর্দান মেরে দেবেন৷ কিছু লোক এ আয়াত থেকে এ ভূল সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, কোন ব্যক্তি নবুওয়াতের দাবী করলে তৎক্ষণাৎ আল্লাহর তরফ থেকে যদি তার গর্দানের রগ কেটে দেয়া না হয় তাহলে এটা হবে তার নবী হওয়ার প্রমাণ৷ অথচ এ আয়াতে যা বলা হয়েছে তা সত্য নবী সম্পর্কে বলা হয়েছে৷ নবুওয়াতের মিথ্যা দাবীদার সম্পর্কে তা প্রযোজ্য নয়৷ মিথ্যা দাবীদার তো শুধু নবুওয়াতের দাবীই করে না, খোদায়ীর দাবী পর্যন্ত করে বসে এবং দীর্ঘদিন পর্যন্ত পৃথিবীতে বুক ফুলিয়ে চলে৷ এটা তাদের সত্য হওয়ার কোন প্রমাণ নয়৷ (আমি তাফহিমূল কোরআনের সূরা ইউনুসের ২৩ নং টীকায় এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি৷)
২৬. অর্থাৎ যারা ভুল-ভ্রান্তিও তার খারাপ পরিণাম থেকে রক্ষা পেতে চায় কুরআন তাদের জন্য উপদেশ বানী৷ (আরো বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, তাফহিমুল কোরআন, সূরা আল বাকারাহ, টীকা ৩)
২৭. অর্থাৎ পরিশেষে তাদেরকে এ জন্য অনুশোচনা করতে হবে যে, কেন তারা কুরআনকে মিথ্যা মনে করেছিল!