(৬৯:১) অবশ্যম্ভাবী ঘটনাটি ৷
(৬৯:২) কি সে অবশ্যম্ভাবী ঘটনাটি?
(৬৯:৩) তুমি কি জান সে অবশ্যম্ভাবী ঘটনাটি কি?
(৬৯:৪) সামুদ ও আদ আকস্মিকভাবে সংঘটিতব্য সে মহা ঘটনাকে অস্বীকার করেছিলো
(৬৯:৫) তাই সামূদকে একটি কঠিন মহা বিপদ দিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে৷
(৬৯:৬) আর আদকে কঠিন ঝঞ্ঝাবাত্যা দিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে৷
(৬৯:৭) যা তিন সাত রাত ও আট দিন ধরে বিরামহীনভাবে তাদের ওপর চাপিয়ে রেখেছিলেন৷ (তুমি সেখানে থাকলে ) দেখতে পেতে তারা ভূলণ্ঠিত হয়ে পড়ে আছে যেন খেজুরের পুরানো কাণ্ড৷
(৬৯:৮) তুমি তাদের কাউকে অবশিষ্ট দেখতে পাচ্ছো কি?
(৬৯:৯) ফেরাউন, তার পূর্ববর্তী লোকেরা এবং উলটপালট হয়ে যাওয়া জনপদসমূহও একই মহা অপরাধে অপরাধী হয়েছিলো৷
(৬৯:১০) তারা সবাই তাদের রবের প্রেরিত রসূলের কথা অমান্য করেছিল৷ তাই তিনি তাদের অত্যন্ত কঠোরভাবে পাকড়াও করেছিলেন৷
(৬৯:১১) যে সময় পানির তুফান সীমা অতিক্রম করলো তখন আমি তোমাদেরকে জাহাজে সওয়াব করিয়েছিলাম
(৬৯:১২) যাতে এ ঘটনাকে আমি তোমাদের জন্য একটি শিক্ষনীয় স্মৃতি বানিয়ে দেই যেন স্বরণকারী কান তা সংরক্ষণ করে৷
(৬৯:১৩) অতপর ১০ যে সময় শিংগায় ফূৎকার দেয়া হবে-
(৬৯:১৪) একটি মাত্র ফুৎকার৷আর পাহাড়সহ পৃথিবীকে উঠিয়ে একটি আঘাতেই চুর্ণ-বিচুর্ণ করে দেয়া হবে৷
(৬৯:১৫) সেদিন সে মহা ঘটনা সংঘটিত হয়ে যাবে৷
(৬৯:১৬) সেদিন আসমান চৌচির হয়ে যাবে এবং তার বন্ধন শিথিল হয়ে পড়বে৷
(৬৯:১৭) ফেরেশতারা এর প্রান্ত সীমায় অবস্থান করবে৷ সেদিন আটজন ফেরেশতা তাদের ওপরে তোমার রবের আরশ বহন করবে৷ ১১
(৬৯:১৮) সেদিনটিতে তোমাদেরকে পেশ করা হবে৷ তোমাদের কোন গোপনীয় বিষয়ই আর সেদিন গোপন থাকবে না৷
(৬৯:১৯) সে সময় যাকে তার আমলনামা ডান হতে দেয়া হবে, ১২ সে বলবেঃ নাও, আমার আমলনামা পড়ে দেখো৷ ১৩
(৬৯:২০) আমি জানতাম, আমাকে হিসেবের সম্মুখীন হতে হবে৷ ১৪
(৬৯:২১) তাই সে মনের মত আরাম আয়েশের মধ্যে থাকবে৷
(৬৯:২২) উন্নত মর্যাদার জান্নাতে৷
(৬৯:২৩) যার ফলের গুচ্ছসমূহ নাগালের সীমায় অবনমিত হয়ে থাকবে
(৬৯:২৪) (এসব লোকদের কে বলা হবেঃ) অতীত দিনগুলোতে তোমরা যা করে এসেছো তার বিনিময়ে তোমরা তৃপ্তির সাথে খাও এবং পান করো৷
(৬৯:২৫) আর যার আমলনামা তার বাঁ হাতে দেয়া হবে ১৫ সে বলবেঃ হায়! আমার আমলনামা যদি আমাকে আদৌ দেয়া না হতো ১৬
(৬৯:২৬) এবং আমার হিসেব যদি আমি আদৌ না জানতাম তাহলে কতই না ভাল হত৷ ১৭
(৬৯:২৭) হায়! আমার সেই মৃত্যুই (যা দুনিয়াতে এসেছিলো) যদি চূড়ান্ত হতো৷ ১৮
(৬৯:২৮) আজ আমার অর্থ-সম্পদ কোন কাজে আসলো না৷
(৬৯:২৯) আমার সব ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি বিনাশ প্রাপ্ত হয়েছে৷ ১৯
(৬৯:৩০) (আদেশ দেয়া হবে) পাকড়াও করো ওকে আর ওর গলায় বেড়ি পরিয়ে দাও৷
(৬৯:৩১) তারপর জাহান্নামে নিক্ষেপ করো৷
(৬৯:৩২) এবং সত্তর হাত লম্বা শিকল দিয়ে বেঁধে ফেলো৷
(৬৯:৩৩) সে মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান পোষণ করতো না
(৬৯:৩৪) এবং দুস্থ মানুষের খাদ্য দিতে উৎসাহিত করতো না৷ ২০
(৬৯:৩৫) তাই আজকে এখানে তার সমব্যথী কোন বন্ধু নেই৷
(৬৯:৩৬) আর কোন খাদ্যও নেই ক্ষত নিসৃত পূঁজ-রক্ত ছাড়া৷
(৬৯:৩৭) যা পাপীরা ছাড়া আর কেউ খাবে না৷
১. মূল আয়াত -------(আলহাক্কাতু) শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে৷ এর অর্থ এমন ঘটনা যা অবশ্যই সংঘটিত হবে৷ যার সংঘটিত হওয়া একান্ত বাস্তব, যার সংঘটিত হওয়ার কোন সন্দেহের অবকাশ নেই৷ কিয়ামতের জন্য এ ধরনের শব্দ ব্যবহার এবং তা দিয়ে বক্তব্য শুরু করা প্রমাণ করে যে, এ বক্তব্য এমন লোকদের উদ্দেশ করে পেশ করা হয়েছে৷ যারা কিয়ামতের আগমনকে অস্বীকার করেছিলো৷ তাদেরকে সম্বোধন করে বলা হচ্ছে, যে বিষয়কে তোমরা অস্বীকার করছো তা অবশ্যম্ভাবী৷ তোমরা অস্বীকার করলেই তার আগমন ঠেকে থাকবে না৷
২. শ্রোতাদেরকে সজাগ ও সতর্ক করে দেয়ার জন্য পরপর দুটি প্রশ্ন করা হয়েছে৷ যাতে করে তারা বিষয়টির গুরুত্ব উপলদ্ধি করে এবং পূর্ণ মনোযোগ সহকারে পরবর্তী বক্তব্য শ্রবণ করে৷
৩. মক্কার কাফেররা যেহেতু কিয়ামতকে অস্বীকার করেছিলো এবং তা সংঘটিত হওয়ার বিষয়টিকে একটি তামাশা বলে মনে করেছিলো, তাই প্রথমে তাদেরকে এ মর্মে সাবধান করা হয়েছে যে, কিয়ামতের একটি অবশ্যম্ভাবী ঘটনা৷ তোমরা বিশ্বাস করো আর নাই করো তা অবশ্যই সংঘটিত হবে৷ একথা বলার পর তাদের বলা হচ্ছে, এ বিষয়টি এতটা সাদামাটা বিষয় নয় যে, কেউ একটি সম্ভাব্য ঘটনার খবরকে মেনে নিচ্ছে কিংবা মেনে নিচ্ছে না৷ বরং জাতিসমূহের নৈতিক চরিত্র এবং তাদের ভবিষ্যতের সাথে এর অত্যন্ত গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান৷ তোমাদের পূর্বের জাতিগুলোর ইতিহাস সাক্ষ দেয়, যে জাতিই আখেরাতেকে অস্বীকার করেছে এবং এ দুনিয়ার জীবনকে প্রকৃত জীবন বলে মনে করেছে পরিশেষে আল্লাহর আদালতে হাজির হয়ে নিজের কৃতকর্মের হিসেব দেয়ার বিষয়টি মিথ্যা বলে মনে করেছে সেসব জাতিই মারাত্মক নৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে পতিত হয়েছে৷ অবশেষে আল্লাহর আযাব এসে তাদের অস্তিত্ব থেকে দুনিয়াকে পবিত্র করে দিয়েছে৷
৪. মূল শব্দ হলো --------৷---কারয়া শব্দটি আরবী ভাষায় খট্খট্ শব্দ করা, হাতুড়ি পিটিয়ে শব্দ করা, কড়া নেড়ে শব্দ করা এবং একটি জিনিসকে আরেকটি জিনিস দিয়ে শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷
৫. সূরা আরাফের ৭৮ আয়াতে একে -----------(প্রচণ্ড ভূমিকম্প) বলা হয়েছে৷ সূরা হূদের ৬৭ আয়াতে এ জন্য ---------(প্রচণ্ড বিষ্ফোরণ ) শব্দ ব্যবহৃত হয়ে হয়েছে৷ সূরা হা-মীম আস সাজদার ১৭ আয়াতে বলা হয়েছে যে, তাদেরকে --------------(আযাবের বজ্র ধ্বনি) এসে পাকড়াও করলো৷ এখানে সে একই আযাবকে -------(অতিশয় কঠিন দুর্ঘটনা) বলে উল্লেখ করা হয়েছে৷ এটি একই ঘটনার বিভিন্ন অবস্থার বর্ণনা মাত্র৷
৬. অর্থাৎ লূতের কওমের জনবসতিসমূহ৷ এসব জনবসতি সম্পর্কে সূরা হূদ (৮২আয়াত ) এবং সূরা হিজরে (৭৪ আয়াত) বলা হয়েছে, আমি ঐগুলোকে ওলটপালট করে দিলাম৷
৭. নূহের সময়ের মহা প্লাবনের কথা বলা হয়েছে৷ এ মহা প্লাবনে গোটা একটি জাতিকে এ একই মহা অপরাধের কারণে ডুবিয়ে ধ্বংস করা হয়েছিল৷ শুধু তারাই বেঁচে ছিল যারা আল্লাহর রসূলের কথা মেনে নিয়েছিলো৷
৮. যেসব লোককে জাহাজে উঠিয়ে নেয়া হয়েছিলো তারা হাজার হাজার বছর পর্বে অতিক্রন্ত হয়ে গিয়েছে৷ পরবর্তীকালের গোটা মানব গোষ্ঠী যেহেতু এ মহা প্লাবন থেকে রক্ষা পাওয়া লোকদের সন্তান-সন্তুতি, তাই বলা হয়েছঃ আমি তোমাদেরকে জাহাজে উঠিয়ে নিয়েছিলাম৷ অর্থাৎ আজ তোমরা পৃথিবীতে এ কারণে বিচরণ করতে পরছো যে, মহান আল্লাহ ঐ মহা প্লাবন দ্বারা শুধু কাফেরদের ডুবিয়ে মেরেছিলেন এবং ঈমানদারদের তা থেকে রক্ষা করেছিলেন৷
৯. অর্থাৎ এমন কান নয় যা শুনেও শোনে না এবং যে কানের পর্দা স্পর্শ করেই শব্দ অন্যত্র সরে যায়৷ বরং এমন কান যা শোনে এবং কথাকে মনের গভীরে প্রবিষ্ট করিয়ে দেয়৷ বাহ্যত এখানে কান শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ কিন্তু অর্থ হলো শ্রবণকারী মানুষ যারা এ ঘটনা শুনে তা মনে রাখে, তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে অতপর আখরাতকে অস্বীকার এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার পরিণাম কত ভয়াবহ তা কখনো ভূলে যায় না৷
১০. পরবর্তী আয়াত পড়ার সময় এ বিষয়টি দৃষ্টিতে থাকা দরকার যে, কিয়ামতের তিনটি পর্যায় আছে৷ এ তিনটি পর্যায়ের ঘটনাবলী একের পর এক বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত হবে ৷ কুরআন মজীদের কোন কোন জায়গায় এ তিনটি পর্যায় আলাদাভাবে বর্ণনা করা হয়েছে৷ আবার কোন কোন জায়গায় প্রথম পর্যায় থেকে শেষ পর্যন্ত একসাথে বর্ণনা করা হয়েছে৷ উদাহরণ হিসেবে সূরা নামলের ৮৭নং আয়াতের উল্লেখ করা যায়৷এ আয়াতটিতে প্রথমবার শিংগায় ফুৎকারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে যখন সারা পৃথিবীর মানষ একটি ভয়ানক বিকট শব্দে এক সাথে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে৷ সেই সময় গোটা বিশ্ব-জাহানের লষ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়ার যে অবস্থা সূরা হজ্জের ১ও২ আয়াতে, সূরা ইয়াসীনের ৪৯ও ৫০আয়াতে এবং সূরা তাকবীরের ১থেকে ৬ পর্যন্ত আয়াতে বর্ণিত হয়েছে তা তাদের চোখের সামনে ঘটতে থাকবে৷ সূরা যুমারের ৬৭ থেকে ৭০ আয়াতে শিংগায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় ফুৎকারে কথা বলা হয়েছে৷ এখানে বলা হয়েছে একবারের ফুৎকার সব মানুষ মৃত্যু মুখে পতিত হবে৷ কিন্তু পরপর আবার শিংগায় ফুৎকার দিলে সব মানুষ জীবিত হয়ে যাবে এবং আল্লাহর আদালতে বিচারের সম্মুখীন হবে৷ সূরা ত্বা-হা ১০২ থেকে ১১২ আয়াত, সূরা আম্বিয়ার ১০১ থেকে ১০৩ আয়াত, সূরা ইয়াসীনের ৫১ থেকে ৫৩ আয়াত এবং সূরা ক্বাফের ২০ থেকে ২২আয়াতে শুধু শিংগায় তৃতীয়বারের ফুঃকারের কথা উল্লেখিত হয়েছে৷ (ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কোরআন, সূরা ত্বা-হা ,টীকা ৭৮;সূরা হজ্জ ,টীকা১ এবং সূরা ইয়াসীন,টীকা৪৬ ও ৪৭ )কিন্তু কুরআন মজীদের এ জায়গায় এবং অন্য আরো অনেক জায়গায় শিংগায় প্রথম ফুৎকার থেকে শুরু করে মানুষের জান্নাত ও জাহান্নামে প্রবেশ করা পর্যন্ত কিয়ামতের সমস্ত ঘটনাবলীএকই সাথে বর্ণনা করা হয়েছে৷
১১. এ আয়াতটি মুতাশাবেহাত আয়াত শ্রেনীর অন্তরভুক্ত৷ এর নির্দিষ্ট কোন অর্থ বলা কঠিন৷ আরশ কি বস্তু আমরা জানি না৷ কিয়ামতের দিন আটজন ফেরেশতার আরশ বহন করার ধরন কি হবে তাও আমরা বুঝি না৷ তবে কোন অবস্থায়ই এ ধারণা করা যাবে না যে, আল্লাহ তাআলা আরশের ওপর উপবিষ্ট থাকবেন আর আটজন ফেরেশতা তাকে সহ আরশ বহন করবে৷ সেই সময় আল্লাহ আরশের ওপর উপবিষ্ট থাকবেন, এমন আয়াতও বলা হয়নি৷ মহান আল্লাহ দেহসত্তাহীন এবং দিক ও স্থানের গণ্ডি থেকে মুক্ত৷ এমন এক সত্তা কোন স্থানে অধিষ্ঠিত থাকবেন আর কোন মাখলুক তাকে বহন করবে এটা ভাবা যায় না৷ আল্লাহর মহান সত্তা সম্পর্কে কুরআন মজীদের দেয়া ধারণা আমাদেরকে এরূপ কল্পনা করতে বাধা দেয়৷ এ জন্য খুঁজে খুঁজে এর অর্থ বের করার প্রচেষ্টা চালানো নিজেকে গোমরাহী ও বিভ্রান্তির গহবরে নিক্ষেপ করার শামিল৷ তবে এ বিষয়টি বুঝা দরকার যে, আল্লাহ তাআলার শাসন ও শাসন কর্তৃত্ব এবং তাঁর যাবতীয় বিষয়ের একটা ধারণা দেয়ার জন্য কুরআন মজীদে আমাদের জন্য এমন একটি চিত্র পেশ করা হয়েছে যা দুনিয়ার কোন বাদশার বাদশাহীর চিত্রের অনুরূপ৷ মানুষের ভাষায় রাষ্ট্র ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়াদির জন্য যে পরিভাষা ব্যবহার করা হয় এ জন্য অনুরূপ পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে৷ কারণ, মানুষের বুদ্ধি-বিবেক এরূপ চিত্র এবং পরিভাষার সাহায্যই গোটা বিশ্ব -সাম্রাজ্যের বিভিন্ন বিষয় কিছুটা উপলদ্ধি করতে সক্ষম৷ বিশ্ব-জাহানের ইলাহী ব্যাবস্থাপনাকে মানুষের বোধগম্যতার সীমায় নিয়ে আসাই এ ধরনের বর্ণনাভঙ্গি গ্রহণের উদ্দেশ্য৷ তাই এর আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ করা ঠিক নয়৷
১২. ডান হাতে আমলনামা দেয়ার অর্থই হবে তার হিসেব -নিকেশ অত্যন্ত পরিষ্কার৷আর সে আল্লাহ তাআলার আদালতে অপরাধী হিসেবে নয়, বরং একজন সৎ ও সত্যনিষ্ঠ মানুষ হিসেবে উপস্থিত হতে যাচ্ছে৷ অধিকতর সম্ভবনা হলো, আমলনামা দেয়ার সময়ই সৎ ও সত্যনিষ্ঠ মানুষগুলো নিজেরাই ডান হাত বাড়িয়ে আমলনামা গ্রহণ করবে কারণ মৃত্যুর সময় থেকে হাশরের ময়দানে উপস্থিত হওয়ার সময় পর্যন্ত তার সাথে যে আচরণ করা হবে তাতে তার মনে এতটা আস্থা ও প্রশান্তি থাকবে যে, সে মনে করবে আমাকে এখানে পুরষ্কার প্রদানের জন্য হাজির করা হচ্ছে, শাস্তিদানের জন্য নয়৷ একজন মানুষ সৎ ও সত্যনিষ্ঠ মানুষ হিসেবে পরপারে যাত্রা করছে, না অসৎ ও পাপী হিসেবে যাত্রা করছে মৃত্যুর সময় থেকেই তা তার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়৷ একথাটি কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে৷ তাছাড়া মৃত্যুর সময় থেকে নিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত একজন নেককার মানুষের সাথে সম্মানিত মেহমানের মত আচরণ করা হয়৷ কিন্তু একজন অসৎ ও বদকার মানুষের সাথে আচরণ করা হয় অপরাধে অভিযুক্ত কয়েদীর মত৷ এরপর কিয়ামতের দিন আখেরাতের জীবনের সূচনালগ্ন থেকেই নেককার মানুষের জীবন যাপনের ধরন-ধারণাই পাল্টে যায়৷ একইভাবে কাফের, মুনাফিকও পাপীদের জীবন যাপনের ধরনও ভিন্ন রূপ হয়ে যায়৷(বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কোরআন, সূরা আনফাল,আয়াত ৫০;আল নাহল,আয়াত২৮ও ৩২ এবং টীকা ২৬; বনী ইসরাঈল, আয়াত ৯৭; ত্বা-হা আয়াত ১০২, ১০৩ও ১২৪থেকে ১২৬ এবং টীকা ৭৯,৮০ ও ১০৭; আল আম্বিয়া ,আয়াত ১০৩ টীকা ৯৮;আল ফুরকান, আয়াত ২৪ও টীকা ৩৮; আন নামল, আয়াত ৮৯ ও টীকা ১০৯; সাবা আয়াত ৫১ ও টীকা৭২; ইয়াসীন , আয়াত ২৬ও ২৭ এবং টীকা ২২-৩২; আল মুমিন আয়াত ৪৫ ও ৪৬ এবং টীকা ৬৩; মুহাম্মাদ ,আয়াত ২৭ এবং টীকা ৩৭;ক্বাফ, আয়াত ১৯থেকে ২৩ পর্যন্ত টীকা ২২,২৩ ও ২৫)৷
১৩. অর্থাৎ আমলনামা পাওয়ার সাথে সাথেই তারা আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠবে এবং নিজের বন্ধু -বান্ধবদের তা দেখাবে ৷সূরা ইনশিকাকের ৯ আয়াতে বলা হয়েছে যে,"সে আনন্দচিত্তে আপনজনদের কাছে ফিরে যাবে৷"
১৪. অর্থাৎ তারা তাদের এ সৌভাগ্যের কারণ হিসেবে বলবে যে, দুনিয়ার জীবনে তারা আখেরাতকে ভুলে ছিল না৷ রবং একদিন তাদেরকে আল্লাহর সামনে হাজির হয়ে সব কৃতকর্মের হিসেবে দিতে হবে এ বিশ্বাস নিয়েই তারা সেখানে জীবন যাপন করেছিল৷
১৫. সূরা ইনশিকাকে বলা হয়েছে, "আর যাকে পিছন দিক থেকে আমলনামা দেয়া হবে" ৷ সম্ভবত তা হবে এভাবে, অপরাধীর প্রথম থেকেই তার অপরাধী হওয়ার বিষয়টি জানা থাকবে৷ তার আমলনামায় কি আছে তাও ঠিকঠাক তার জানা থাকবে৷ তাই সে অত্যন্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাঁ হাত বাড়িয়ে তা গ্রহণ করবে এবং সংগে সংগেই নিজের পেছনের দিকে লুকিয়ে ফেলবে যাতে কেউ তা দেখতে না পায়৷
১৬. অর্থাৎ হাশরের ময়দানে প্রকশ্যে আমার হাতে এ আমলনামা দিয়ে সবার সামনে লাঞ্ছিত ও অপমানিত না করে যে শাস্তি দেয়ার তা দিয়ে ফেললেই ভালো হতো৷
১৭. অর্থাৎ পৃথিবীতে আমি যা করে এসেছি তা যদি আমাকে আদৌ বলা না হতো৷ এ আয়াতের আরেকটি অর্থ এও হতে পারে যে, আমি ইতিপর্বে আদৌ জানতাম না যে, হিসেব কি জিনিস৷ কোনদিন আমার কল্পনাও আসেনি যে, আমাকে একদিন আমার কার্যাবলীর হিসেব দিতে হবে এবং আমার অতীত কাজ-কর্ম সব আমার সামনে পেশ করা হবে৷
১৮. অর্থাৎ দুনিয়ার জীবন আমার মৃত্যুবরণের পর সবকিছু যদি নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতো৷ এবং আর কোন জীবন যদি না থাকতো৷
১৯. মূল আয়াতে আছে------------(হালাকা আন্নি সুলতানিয়া)৷ সুলতান শব্দটি দলীল-প্রমাণ অর্থেও ব্যবহৃত হয় আবার ক্ষমতা, কর্তৃত্ব প্রভাব প্রতিপত্তি অর্থেও ব্যবহৃত হয়৷ দলিল-প্রমাণ অর্থে গ্রহণ করলে তার অর্থ হবে,আমি দলীলও যুক্তি -প্রমাণের যে তুবড়ি ছুটতাম তা আর এখানে চলবে না৷ এখন আত্মপক্ষ সমর্থনের মত কোন প্রমাণই আমার কাছে নেই৷ আর ক্ষমতা, কর্তৃত্ব ও প্রভাব প্রতিপত্তি অর্থে গ্রহণ তার অর্থ হবে, আমি যে শক্তিতে বলিয়ান হয়ে পৃথিবীতে বুকটান করে চলতাম তা খতম হয়ে গিয়েছে৷ এখানে আমরা কোন দলবল বা সেনাবাহিনী নেই, আমার আদেশ মেনে চলারও কেউ নেই৷ এখানে তো আমি এমন একজন অসহায় মানুষের মত দাঁড়িয়ে আছি যে আত্মরক্ষার জন্যও কিছু করতে সক্ষম নয়৷
২০. অর্থাৎ নিজে কোন দরিদ্রকে খাবার দেয়া তো দূরের কথা কাউকে এতটুকু কথা বলাও পছন্দ করতো না যে, আল্লাহর ক্ষুধাক্লিষ্ট বান্দাদের খাদ্য দান করো৷