(৬৭:১) অতি মহান ও শ্রেষ্ঠ তিনি যাঁর হাতে রয়েছে সমগ্র বিশ্ব-জাহানের কর্তৃত্ব ৷ তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতা রাখেন৷ কাজের দিক দিয়ে তোমাদের মধ্যে কে উত্তম তা পরীক্ষা করে দেখার জন্য৷
(৬৭:২) তিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন৷ আর তিনি পরাক্রমশালী ও ক্ষমাশীলও৷
(৬৭:৩) তিনিই স্তরে স্তরে সাজিয়ে সাতটি আসমান তৈরী করেছেন৷ তুমি রহমানের সৃষ্টকর্মে কোন প্রকার অসংগতি দেখতে পাবে না৷ আবার চোখ ফিরিয়ে দেখ, কোন ক্রটি দেখতে পাচ্ছ কি?
(৬৭:৪) তুমি বারবার দৃষ্টি ফিরিয়ে দেখ, তোমার দৃষ্টি ক্লান্ত ও ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসবে৷
(৬৭:৫) আমি তোমাদের কাছের আসমানকে সুবিশাল প্রদীপমালায় সজ্জিত করেছি৷ ১০ আর সেগুলোকে শয়তানদের মেরে তাড়ানোর উপকরণ বানিয়ে দিয়েছি৷ ১১ এসব শয়তানের জন্য আমি প্রস্তুত করে রেখেছি জ্বলন্ত আগুনের শাস্তি৷
(৬৭:৬) যেসব লোক তাদের রবকে অস্বীকার করেছে ১২ তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি৷ সেটি অত্যন্ত খারাব জায়গা৷
(৬৭:৭) তাদের যখন সেখানে নিক্ষেপ করা হবে তখন তারা তার ভয়ানক গর্জনের শব্দ শুনতে পাবে ১৩
(৬৭:৮) এবং তা টগবগ করে ফুটতে থাকবে৷ অত্যাধিক রোষে তা ফেটে পড়ার উপক্রম হবে৷ যখনই তার মধ্যে কোন দলকে নিক্ষেপ করা হবে তখনই তার ব্যবস্থাপকরা জিজ্ঞেস করবে, তোমাদের কাছে কি কোন সাবধানকারী আসেনি? ১৪
(৬৭:৯) তারা জবাব দেবে , হাঁ আমাদের কাছে সাবধানকারী এসেছিলো৷ কিন্তু আমরা তাকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করেছিলাম এবং বলেছিলাম আল্লাহ কিছুই নাযিল করেননি৷ তোমরাই বরং বিরাট ভুলের মধ্যে পড়ে আছো৷ ১৫
(৬৭:১০) তারা আরো বলবেঃ আহা! আমরা যদি শুনতাম এবং বিবেক -বুদ্ধি দিয়ে বুঝতাম৷ ১৬ তাহলে আজ এ জ্বলন্ত আগুণে সাজাপ্রাপ্ত দের মধ্যে গন্য হতাম না৷
(৬৭:১১) এভাবে তারা নিজেদের অপরাধ ১৭ স্বীকার করবে ৷ এ দোযখবাসীদের ওপর আল্লাহর লানত৷
(৬৭:১২) যারা না দেখেও তাদের রবকে ভয় করে, ১৮ নিশ্চয়ই তারা লাভ করবে ক্ষমা এবং বিরাট পুরষ্কার৷ ১৯
(৬৭:১৩) তোমরা নীচু স্বরে চুপে চুপে কথা বলো কিংবা উচ্চাস্বরে কথা বলো (আল্লাহর কাছে দু"টো সমান) তিনি তো মনের অবস্থা পর্যন্ত জানেন৷ ২০
(৬৭:১৪) যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনিই কি জানবেন না? ২১ অথচ তিনি সুক্ষ্মদর্শী ২২ ও সব বিষয় ভালভাবে অবগত৷
১. ------- শব্দ থেকে আধিক্য অর্থে গৃহীত ৷---------- শব্দটি শ্রেষ্ঠত্ব, বড়ত্ব, বৃদ্ধি, আধিক্য, স্থায়িত্ব, দৃঢ়তা এবং অধিক পরিমাণে কল্যাণ ও নেকী অর্থ প্রকাশক ৷ এর থেকে আধিক্য, অর্থ প্রকাশক শব্দ গঠন করে ----তাবারকা করা হলে তার অর্থ হয় তিনি অত্যাধিক সম্মানিত ও মহান, নিজের সত্তা, গুণাবলী ও কাজ-কর্মে অন্য সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ, তাঁর সত্তা থেকে অশেষ ও অগণিত কল্যাণের ধারা প্রবাহিত হচ্ছে এবং তাঁর পূর্ণতা চিরস্থায়ী৷ (আরো ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন, আলা আরাফ টীকা ৪৩; আল মু"মিনূন , টীকা ১৪; আল ফুরকান, টীকা ১ও ১৯)৷
২. ---- শব্দটি সাধারণভাবে ব্যবহৃত হয়েছে৷ তাই এখানে এর কোন সীমিত অর্থ গ্রহণ করা যেতে পারে না৷ সুতরাং নিশ্চিতভাবে এর অর্থ দাঁড়ায় গোটা বিশ্ব-জাহানের ওপর রাজকীয় ক্ষমতার অধিকারী৷ তাঁর হাতে ক্ষমতা থাকার অর্থ এটা নয় যে, দৈহিক অংগ হিসেবে তাঁর কোন হাত আছে৷ বরং বাকরীতি অনুসারে শব্দটি অধিকার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে৷ আরবী ভাষার মত আমাদের ভাষাতেও যখন বলি যে, সব ক্ষমতা অমুকের হাতে তখন তার অর্থ হয় সে-ই সব ক্ষমতার মালিক , অন্য কারো সেখানে কোন কর্তৃত্ব নেই৷
৩. অর্থাৎ তিনি যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন৷ তিনি কোন কাজ করতে চাইবেন অথচ করতে পারবেন না কোন কিছুই তাকে এরূপ অক্ষম করে দেয়ার মত নেই৷
৪. অর্থাৎ তিনি পৃথিবীতে মানুষের জীবন ও মৃত্যুর এ ধারাবাহিকতা চালু করেছেন তাকে পরীক্ষা করার জন্য, কোন মানুষটির কাজ বেশী ভাল তা দেখার জন্য৷ এ সংক্ষিপ্ত বাক্যটিতে বেশ কিছু সত্যের প্রতি ইংগিত দেয়া হয়েছে৷ প্রথম হলো, মৃত্যু এবং জীবন তাঁরই দেয়া৷ আর কেউ জীবনও দান করতে পারে না, মৃত্যুও ন৷ দ্বিতীয় হলো, মানুষ একটি সৃষ্টি, তাকে ভাল এবং মন্দ উভয় প্রকার কাজ করার শক্তি দেয়া হয়েছে৷ তার জীবন বা মৃত্যু কোনটিই উদ্দেশ্যহীন নয়, সৃষ্টা তাকে এখানে সৃষ্টি করেছেন পরীক্ষার জন্য৷ জীবন তার জন্য পরীক্ষার সময় বা অবকাশ মাত্র ৷ মৃত্যুর অর্থ হলো, তার পরীক্ষার সময় ফুরিয়ে গেছে৷ তৃতীয় হলো, এ পরীক্ষার জন্য স্রষ্টা সবাইকে কাজের সুযোগ দিয়েছেন৷ সে ভাল মানুষ না খারাপ মানুষ, এ পৃথিবীতে কাজের মাধ্যমে সে যাতে তার প্রকাশ ঘটাতে পারে সে জন্য সৃষ্টিকর্তা প্রত্যেককে কাজের সুযোগ দিয়েছেন৷ চতুর্থ হলো, কার কাজ ভাল এবং কার কাজ খারাপ প্রকৃতপক্ষে সৃষ্টিকর্তাই তার ফায়সালা করবেন৷ কাজের ভাল -মন্দ বিচার করার মানদণ্ড নির্ধারণ করা পরীক্ষার্থীর কাজ নয়, বরং পরীক্ষা গ্রহণকারীর কাজ৷ তাই যারাই পরীক্ষায় সফল হতে চাইবে , তাদেরকে জানতে হবে পরীক্ষা গ্রহণকারীর দৃষ্টিতে ভাল কাজ কি? পঞ্চম বিষয়টি পরীক্ষা কথাটির মধ্যেই নিহিত৷ তা হলো, যার কাজ যেমন হবে তাকে সে অনুপাতেই প্রতিফল দেয়া হবে৷ কারণ ফলাফলই যদি না থাকে তাহলে পরীক্ষা নেয়ার আদৌ কোন অর্থ হয় না৷
৫. এর দুটি অর্থ এবং দু"টি অর্থই এখানে প্রযোজ্য৷ একটি হলো, তিনি মহা পরাক্রমশালী এবং সবার ওপর পরিপূর্ণরূপে বিজয়ী হওয়া সত্ত্বেও নিজের সৃষ্টির প্রতি তিনি দয়াবান ও ক্ষমাশীল , তাদের প্রতি জালেম ও কঠোর নন৷ দ্বিতীয়টি হলো, দুষ্কর্মকারীদের শাস্তি দেয়ার পুরো ক্ষমতা তাঁর আছে৷ এতো শক্তি কারো নেই যে তাঁর শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে৷ কিন্তু যারা লজ্জিত হয়ে দুষ্কর্ম পরিত্যাগ এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে তাদের সাথে তিনি ক্ষমাশীলতার আচরণ করে থাকেন৷
৬. ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কোরআন, আল বাকারা, টিকা ৩৪; আর রা"দ , টীকা, ২" আল হিজ্র টীকা ৮; আল হজ্জ, টীকা ১১৩; আল মু"মিনূন,টীকা ১৫; আস সাফফাত, টীকা ৫ এবং আল মুমিন, টীকা ৯০৷
৭. মূল আয়াতে -------শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে যার অর্থ হলো সামঞ্জস্যহীনতা৷ এক বস্তুর সাথে আরেকটি বস্তুর মিল না হওয়া, অমিল হওয়া বা খাপ না খাওয়া৷ সুতরাং এ কথাটির অর্থ হলো, গোটা বিশ্ব-জাহানের কোথাও তোমরা বিশৃংখলা, অবিন্যস্ততা ও অসংগতি দেখতে পাবে না৷ আল্লাহর সৃষ্ট এ পৃথিবীতে কোন জিনিসই সামঞ্জস্যহীন ও খাপছাড়া নয়৷ এর প্রত্যেকটি অংশ পরষ্পর বাঁধা এবং সেগুলোর মধ্যে পুরো মাত্রায় সামঞ্জস্য বিদ্যমান৷
৮. মূল ব্যবহৃত শব্দটি হলো ------ এর অর্থ ফাটল, ছিদ্র, চিড়, ছেঁড়া, ভাঙাচোরা৷ অর্থাৎ সমগ্র বিশ্ব-জাহানের বাঁধন এতো মজবুত এবং পৃথিবীর একটি অণু থেকে বিশালকায় নীহারিকা মণ্ডলী পর্যন্ত প্রতিটি বস্তু এমন সুদৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ যে, বিশ্ব-জাহানের কোথাও কোন বিশৃংখলা দেখা যাবে না৷ (বেশী ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কোরআন, সূরা ক্বাফ,টীকা ৮)৷
৯. কাছের আসমান অর্থ সে আসমান যার তারকারাজি এবং গ্রহসমূহকে আমরা খালি চোখে দেখতে পাই৷ এর চেয়েও দূরে অবস্থিত যেসব বস্তুকে দেখতে যন্ত্রের সাহায্য নিতে হয় তাহলো দূরের আসমান৷ আর যন্ত্রপাতির সাহায্যও যা দেখা যায় না তাহলো অধিক দূরবর্তী আসমান৷
১০. মূলত ------(মাসাবিহা) শব্দটি এখানে অনির্দিষ্ট অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে এবং অনির্দিষ্ট অর্থে ব্যবহৃত হওয়ার কারণে এসব প্রদীপের সুবিশাল হওয়ার ধারণা সৃষ্টি হয় ৷ কথাটির অর্থ হলো, আমি এ বিশ্ব-জাহানকে অন্ধকারাচ্ছন্ন ও জনমানবহীন করে সৃষ্টি করিনি৷ বরং তারকারাজির দ্বারা খুব সুন্দর করে সাজিয়েছি৷ রাতের অন্ধকারে মানুষ যার জাঁকজমক ও দীপ্তিময়তা দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যায়৷
১১. এর অর্থ এটা নয় যে, এসব তারকাকেই শয়তানদের দিকে ছুঁড়ে মারা হয়৷ আবার এ অর্থও নয় যে, শুধু শয়তানদেরকে মারার জন্যই উল্কার পতন ঘটে৷ বরং এর অর্থ হলো তারকারাজি থেকে যে অসংখ্য উল্কাপিণ্ড নির্গত হয়ে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বিশ্ব-জাহানের সর্বত্র ঘুরে বেড়ায় এবং এরা অগণিত সংখ্যায় প্রতি মুহূর্তে ভুপৃষ্ঠের দিকে ছুটে আসে, সেগুলো পৃথিবীর শয়তানদের ঊর্ধ জগতে উঠার ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে কাজ করে৷তারা ওপরে উঠার চেষ্টা করলেও উল্কা পিণ্ডগুলো তাদেরকে মেরে তাড়িয়ে দেয়৷ এ বিষয়টি বলার প্রয়োজন এ জন্য যে, গণকদের সম্পর্কে আরবের লোকেরা এ ধারণা পোষণ করতো যে, শয়তানরা তাদের অনুগত বা শয়তানদের সাথে তাদের যোগাযোগ আছে৷ এসব শয়তানের মাধ্যমে তারা গায়েবের খবর পেয়ে থাকে এবং সঠিকভাবে মানুষের ভাগ্য গণনা করতে পারে৷ গণকরা নিজেরও এ দাবী করতো৷ তাই কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বলা হয়েছে, শয়তানদের ঊর্ধ জগতে ওঠা এবং সেখান থেকে গায়েবের খবর অবহিত হওয়ার আদৌ কোন সম্ভবনা নেই৷ অধিক ব্যাখ্যার জন্য দেখুনঃ তাফহীমুল কুরআন, আল হিজর, টীকা ৯ থেকে ১২; আস সাফফাত, টীকা ৬-৭৷ এখন একটি প্রশ্ন থেকে যায় যে, এ উল্কাগুলো আসলে কি? এ বিষয়ে মানুষের জ্ঞান চূড়ান্ত অনুসন্ধান ও গবেষণালব্ধ কোন সিদ্ধান্ত দিতে এখনো অক্ষম৷ তা সত্ত্বেও আধুনিককালে যেসব তত্ত্ব ও বাস্তব অবস্থা মানুষের জ্ঞানের আওতায় এসেছে এবং ভুপৃষ্ঠে পতিত উল্কাপিণ্ডসমূহের পর্যবেক্ষণ থেকে যে জ্ঞান অর্জিত হয়েছে তার ভিত্তিতে বিজ্ঞানীদের মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয় তাত্ত্বটি হলোঃ এসব উল্কাপিণ্ড কোন গ্রহে বিষ্ফোরণের কারণে উৎক্ষিপ্ত হয়ে মহাশূন্যে ছুটে বেড়াতে থাকে এবং কোন এক পর্যায়ে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির আওতায় এসে পৃথিবীর দিকে ছুটে আসে৷ (দেখুন ইনসাইল্কোপেডিয়া ব্রিটানিকা, ১৯৬৭ইং সংস্কারণ, ১৫ খণ্ড, শব্দ -Meteorites)
১২. অর্থাৎ মানুষ হোক কিংবা শয়তান যারাই তাদের রবের সাথে কুফরী করেছে, এটাই হয়েছে তাদের পরিণাম৷ (রবের সাথে কুফরী করা বিষয়ে বিস্তারিত জানতে হলে দেখুন তাফহীমুল কুরাআন, আল বাকারা, টীকা ১৬১; আন নিসা, টীকা ১৭৮; আল কাহাফ, টীকা ৩৯; আল মু"মিন ,টীকা৩)৷
১৩. মূল ইবারতে ------শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, যা গাধার ডাকের মত আওয়াজ বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়৷ এ বাক্যের অর্থ এও হতে পারে যে, এটা খোদ জাহান্নামের শব্দ৷ আবার এও হতে পারে যে, জাহান্নাম থেকে এ শব্দ আসতে থাকবে, ইতিমধ্যেই যেসব লোককে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়েছে তারা জোরে জোরে চিৎকার করতে থাকবে৷ সূরা হূদের ১০৬ আয়াত থেকে দ্বিতীয অর্থটির সমর্থন পাওয়া যায়৷ উক্ত আয়াতে বলা হয়েছে যে, এ দোজখীরা দোযখের মধ্যে হাঁপাতে ,গোঙ্গাতে এবং হাঁসফাস করতে থাকবে ৷ আর সূরা ফুরকানের ১২ আয়াত থেকে প্রথমোক্ত অর্থটির সমর্থন পাওয়া যায়৷ সেখানে বলা হয়েছে, দোযখের দিকে যাওয়ার পথে এসব লোক দূরে থেকেই তার ক্রোধ ও প্রচণ্ড উত্তেজনার শব্দ শুনতে পাবে৷ এসবের প্রেক্ষিতে সঠিক অর্থ দাঁড়ায় এই যে, এটি খোদ জাহান্নামের ক্রোধের শব্দ ও জাহান্নামবাসীদের চিৎকার -ধ্বনিও৷
১৪. এ প্রশ্নের ধরন আসলে প্রশ্নের মত হবে না এবং তাদের কাছে কোন সতর্ককারী এসেছিল কিনা জাহান্নামের কর্মচারীরা তাদের কাছে তা জানতেও চাইবে না৷ বরং এর উদ্দেশ্য হবে তাদের কাছ থেকে এ বিষয়ের স্বীকারোক্তি আদায় করা যে, জাহান্নামে নিক্ষেপ করে তাদের প্রতি কোন বেইনসাফী করা হচ্ছে না৷ তাই তারা তাদের মুখ থেকেই এ মর্মে স্বীকৃতি আদায় করতে চেষ্টা করবেন যে, মহান আল্লাহ তাদেরকে বেখবর রাখেননি৷ তিনি তাদের কাছে নবী পাঠিয়েছিলেন, সত্য কি ও সঠিক পথ কোনটি তা তাদেরকে জানিয়ে দিয়েছিলেন এবং এ সত্য ও সঠিক পথের বিপরীত পথে চলার পরিণাম স্বরূপ যে তাদের এ জাহান্নামের জ্বালানি হতে হবে সে সম্পর্কে তাদেরকে সাবধান করে দিয়েছিলেন৷ আজ সে জাহান্নামেই তাদেরকে নিক্ষেপ করা হয়েছে৷ কিন্তু তারা নবীদের কথা মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে৷ সুতরাং তাদেরকে এখন যে শাস্তি দেয়া হচ্ছে তারা আসলে তার উপযুক্ত৷ কুরআন মজীদে এ বিষয়টি বার বার স্মারণ করিয়ে দেয়া হয়েছে যে, মহান আল্লাহ একটি পরীক্ষার জন্য মানুষকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন৷ পরীক্ষাটি নেয়ার পদ্ধতি এমন নয় যে, মানুষকে সে সম্পর্কে অজ্ঞ ও অনবহিত রেখে সঠিক পথে সে চলে কিনা তা দেখা হচ্ছে৷ বরং তাকে সঠিক পথ চিনিয়ে দেয়ার জন্য যে সম্ভাব্য সর্বাধিক যুক্তিসঙ্গত ব্যবস্থা ছিল মহান আল্লাহ তা পুরোপুরিভাবে সম্পন্ন করেছেন৷ সে ব্যবস্থা অনুযায়ী নবী-রাসূল পাঠানো হয়েছে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে কিতাবসমূহ নাযিল করা হয়েছে৷ মানুষ আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে এবং তাঁরা যেসব কিতাব এনেছেন সেগুলোকে মেনে নিয়ে সঠিক পথে চলবে, না তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে নিজের প্রবৃত্তি ও মনগড়া ধ্যাণ-ধারণার পেছনে ছুটবে, এখন তাদের সমস্ত পরীক্ষা এ একটি মাত্র বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ৷ নবুওয়াত মহান আল্লাহর একটি প্রমাণ৷ এভাবে তিনি মানুষের সামনে তাঁর প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত করেছেন৷ এটা মানা বা না মানার ওপরে মানুষে ভবিষ্যত নির্ভর করছে৷নবী-রাসূলদের আগমনের পর কোন ব্যক্তি প্রকৃত অবস্থা না জানার ওজর পেশ করতে পারে না৷ তাকে না জানিয়ে অলক্ষেই এতো বড় পরীক্ষা নেয়ার কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে এবং এখন বিনা অপরাধেই শাস্তি দেয়া হচ্ছে, এ ওজর তার ধোপে টিকবে না৷ এ বিষয়টি এতো অধিকবার বিভিন্নভাবে কুরআন মজীদে বর্ণনা করা হয়েছে যে , তার সংখ্যা নির্ণয় করাও কঠিন৷ উদাহরণ স্বরূপ নিম্নবর্ণিত স্থানগুলোর উল্লেখ করা যায়ঃ তাফহীমুল কুরআন, আল বাকারা, আয়াত ২১৩,টীকা২৩; আন নিসা, আয়াত ৪১-৪২, টীকা৬৪, আয়াত ১৬৫, টীকা ২০৮; আল আন"আম ,আয়াত১৩০-১৩১, টীকা ৯৮ থেকে ১০০; বনী ইসরাঈল,আয়াত ১৫, টীকা১৭, ত্বাহা, আয়াত, ১৩৪, আল কাসাস, আয়াত ৪৭, টীকা ৬৬, আয়াত ৫৯, টীকা ৮৩, আয়াত ৬৫; ফাতের, আয়াত৩৭; আল মু"মিন, আয়াত ৫০,টীকা ৬৬৷
১৫. অর্থাৎ তোমরা নিজেরও বিভ্রান্ত আবার যারা তোমাদের ওপর ঈমান এনেছে তারাও চরম বিভ্রান্তিতে ডুবে আছে৷
১৬. অর্থাৎ আমরা যদি সত্যানুসন্ধিৎসু হয়ে নবীদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতাম অথবা নবীগণ আমাদের সামনে যা পেশ করেছেন তা আসলে কি বুদ্ধি-বিবেক খাটিয়ে তা বুঝার চেষ্টা করতাম৷ এখানে শোনার কাজেকে বুঝার কাজের আগে উল্লেখ করা হয়েছে৷ তার কারণ হলো, প্রথমে নবীর শিক্ষা আগ্রহ ও মনযোগ সহকারে শোনা (কিংবা তা যদি লিখিত আকারে থাকে তাহলে সত্যানুসন্ধিৎসু হয়ে তা পড়ে দেখা) হিদায়াত লাভ করার পূর্ব শর্ত ৷ চিন্তা-ভাবনা করে তাৎপর্য উপলদ্ধি করার পর্যায় আসে এর পরে৷ নবীর দিকনির্দেশনা ছাড়া নিজের বিবেক -বুদ্ধি খাটিয়ে সরাসরি সঠিক পথ লাভ করা যায় না৷
১৭. অপরাধ কথাটি এক বচনে ব্যবহৃত হয়েছে৷ তার মানে যে কারণে তারা জাহান্নামের উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়েছে তা হলো রসূলগণকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করা এবং তাঁদেরকে অনুসরণ করতে অস্বীকার করা৷ অন্যসব অপরাধ এরি ডাল -পালা মাত্র৷
১৮. ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় এটিই হলো নৈতিকতার মূল৷ কেউ যদি খারাপ কাজ থেকে শুধু এ জন্য বিরত থাকে যে, তার নিজের বিবেক-বুদ্ধি বিচারে কাজটি খারাপ কিংবা সব মানুষ সেটিকে খারাপ মনে করে কিংবা তা করলে পার্থিব জীবনে কোন ক্ষতি হওয়ার আশংকা আছে কিংবা এজন্য কোন পার্থিব শক্তির তাকে পাকড়াও করার ভয় আছে তাহলে সেটি হবে নৈতিকতার একটি স্থায়ী ভিত্তি৷ মানুষের ব্যক্তিগত বিচার বিবেচনা ভুলও হতে পারে৷ বিশেষ কোন মানসিক প্রবণতার কারণে সে একটি ভাল জিনিসকে মন্দ এবং একটি মন্দ জিনিসকে ভাল মনে করতে পারে৷ ভাল ও মন্দ যাচাই করার পার্থিব মানদণ্ড প্রথমত এক রকম নয়৷ এ ছাড়াও তা সময়ের ব্যবধানে পরিবর্তিত হয়৷ দুনিয়ার নৈতিক দর্শনে কোন বিশ্বজনীন ও স্থায়ী মানদণ্ড বর্তমানেও নেই অতীতেও ছিল না৷ পার্থিব ক্ষতির আশংকাও নৈতিকতার কোন স্বতন্ত্র মানদণ্ড নয়৷ দুনিয়ার জীবনে নিজের কোন ক্ষতি হতে পারে শুধু এ ভয়ে যে ব্যক্তি খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকে, ক্ষতি হওয়ার আশংকা নেই, এমন অবস্থায় সে ঐ কাজ থেকে বিরত থাকতে সক্ষম হবে না৷ একইভাবে কোন পার্থিব শক্তির কাছে জবাবদিহির আশংকাও এমন কিছু নয় যা একজন মানুষের ভদ্র ও সৎ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে ৷ সবাই জানে, পার্থিব কোন শক্তিই দেখা ও না দেখা বিষয়সমূহ সম্পর্কে জ্ঞানের অধিকারী নয় ৷তার দৃষ্টির বাইরে অসংখ্য অপরাধ সংঘটিত হতে পারে৷ যেকোন পার্থিব শক্তির পাকড়াও থেকে বাঁচার জন্য অসংখ্য কৌশল ও ফন্দি-ফিকির অবলম্বন সম্ভব৷ এ ছাড়াও পার্থিব শক্তির রচিত আইন ব্যবস্থা সব রকমের অপরাধকে তার আওতাধীন করতে পারে না৷ বেশীর ভাগ অপরাধই এমন পর্যায়ের , পার্থিব আইন-কানুন যার ওপর আদৌ কোন হস্তক্ষেপ করে না৷ অথচ পার্থিব আইন ব্যবস্থা যেসব অপরাধের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করে সেগুলোর চেয়ে তা জঘন্য৷ তাই ইসলামী জীবন বিধান নৈতিকতার প্রসাদ এমন একটি বুনিয়াদের ওপর নির্মাণ করেছে যার ভিত্তিতে অদৃশ্য আল্লাহর ভয়ে সব খারাপ কাজ বর্জন করতে হয়৷ যে আল্লাহ সর্বাবস্থায় মানুষকে দেখছেন, যার হস্তক্ষেপ ও পাকড়াও থেকে নিজেকে রক্ষা কররে মানুষ কোথাও যেতে সক্ষম নয়৷ যিনি মানুষকে ভাল ও মন্দ যাচাইয়ের জন্য একটি সার্বিক , বিশ্বজনীন এবং পূর্নাঙ্গ মানদণ্ড দিয়েছেন, শুধু তাঁর ভয়ে মন্দ ও অকল্যাণকে বর্জন করা এবং ভাল ও কল্যাণকে গ্রহণ করা এমন একটি কল্যাণকর নীতি যা ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত মূল্যবান৷ এ কারণটি ছাড়া যদি অন্য কোন কারণে কোন মানুষ অন্যায় না করে কিংবা বাহ্যিকভাবে যেসব কাজে নেকীর কাজ বলে গণ্য হয় তা করে তাহলে তার এ নৈতিকতা আখেরাতে কোন মূল্য ও মর্যাদালাভের উপযুক্ত বলে বিবেচিত হবে না৷ কারণ তা হবে বালির স্তুপের ওপর নির্মিত প্রাসাদের মতো৷
১৯. অর্থাৎ না দেখে আল্লাহকে ভয় করার দুটি অনির্বার্য ফল আছে৷ এক, মানবিক দুর্বলতার কারণে মানুষের যে অপরাধ ও ত্রুটি-বিচ্যুতি হয় তা মাফ করে দেয়া হবে৷ তবে তা এ শর্তে যে, তার গভীরে ও উৎসমূলে আল্লাহভীতির অনুপস্থিতি যেন কার্যকর না থাকে৷ দুই, এ আকীদা-বিশ্বাসের ভিত্তিতে মানুষ যেসব নেক আমল করবে তার জন্য সে বিরাট পুরষ্কার পাবে৷
২০. একথাটি কাফের ও মু"মিন নির্বিশেষে গোটা মানব জাতিকে লক্ষ করে বলা হয়েছে৷ এতে মু"মিনের জন্য শিক্ষা হলো, দুনিয়ায় জীবন যাপনকালে তাকে তার মন-মগজে এ অনুভুতি কার্যকর রাখতে হবে যে, তার গোপন ও প্রকাশ্য সব কথা ও কাজই শুধু নয় তার নিয়ত ও ধ্যান-ধারণা পর্যন্ত কোন কিছুই আল্লাহর অজানা নয়৷ আর কাফেরের জন্য এতে সাবধানবাণী হলো এই যে, আল্লাহকে ভয় না করে সে নিজ অবস্থানে থেকে যা ইচ্ছা তাই করতে পারে৷ কিন্তু তার কোন একটি ব্যাপারও আল্লাহর কর্তৃত্ব ও হস্তক্ষেপের আওতা বহির্ভুত নয়৷
২১. এর আরেকটি অনুবাদ হতে পারে-তিনি কি তাঁর সৃষ্টিকেই জানবেন না? মূল ইবারতে (----) ব্যবহৃত হয়েছে৷ এর মানে "যিনি সৃষ্টি করেছেন" ও হতে পারে৷ আবার "যাকে তিনি সৃষ্টি করেছেন" ও হতে পারে৷ উভয় অবস্থায় মূল অর্থ একই থাকে৷ এটি ওপরের আয়াতাংশে উল্লেখিত বক্তব্যের প্রমাণ৷ অর্থাৎ স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টি সম্পর্কে বেখবর থাকবেন তা কি করে সম্ভব? খোদ সৃষ্টি নিজের সম্পর্কে বেখবর বা অজ্ঞ থাকতে পারে৷ কিন্তু স্রষ্টা তার সম্পর্কে বেখবর থাকতে পারেন না৷ তোমাদের প্রতিটি শিরা -উপশিরা তিনিই সৃষ্টি করেছেন৷ তোমাদের হৃদপিষ্ড ও মস্তিষ্কের প্রতিটি স্নায়ূতন্ত্রীও তাঁর সৃষ্টি৷ তোমাদের প্রতিটি নিশ্বাস-প্রশ্বাস তিনি চালু রেখেছেন বলেই তা চালু আছে৷ তোমাদের প্রতিটি অঙ্গ-প্রতঙ্গ তাঁর ব্যবস্থাপনার অধিনে কাজ করছে৷ তাই তোমাদের কোন বিষয় তাঁর আগোচারে কি করে থাকতে পারে?
২২. আয়াতে ------- শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে৷ এর একটি অর্থ হলো সূক্ষ্ম ও অনুভবযোগ্য নয় এমন পন্থায় কর্ম সম্পাদনকারী এবং আরেকটি অর্থ হলো গোপন তত্ত্বসমূহ সম্পর্কে জ্ঞানের অধিকারী৷