(৬৫:৮) কত জনপদ ২০ তাদের রব ও তাঁর রসূলদের নির্দেশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল৷ আমি তাদের কড়া হিসেব নিয়েছিলাম এবং কঠোর শাস্তি দিয়েছিলাম৷
(৬৫:৯) তারা তাদের কৃতকর্মের শাস্তি ভোগ করেছে৷ তাদের কৃতকর্মের পরিণাম ছিল শুধু ক্ষতি আর ক্ষতি৷
(৬৫:১০) আল্লাহ (আখেরাতে) তাদের জন্য কঠিন শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন৷ অতএব, হে ঐ সব জ্ঞানীরা যারা ঈমান এনেছো, আল্লাহকে ভয় করো৷ আল্লাহ তোমাদের কাছে এক নসীহত নাযিল করেছেন,
(৬৫:১১) এমন এক রসূল, ২১ তিনি তোমাদেরকে আল্লাহর আয়াত পড়ে শোনান, যা তোমাদের সুস্পষ্ট হিদায়াত দান করে৷ যাতে তিনি ঈমান গ্রহণকারী ও সৎকর্মশীলদের অন্ধকার থেকে বের করে আলোতে নিয়ে আসেন৷ ২২ যে ব্যক্তিই আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে এবং নেককাজ করবে আল্লাহ তাকে এমন সব জান্নাতে প্রবেশ করাবেন৷ যার নীচে দিয়ে ঝরণা বয়ে চলবে৷ এসব লোক সেখানে চিরদিন থাকবে৷ এসব লোকের জন্য আল্লাহ সর্বোত্তম রিযিক রেখেছেন৷
(৬৫:১২) আল্লাহ সেই সত্তা যিনি সাত আসমান বানিয়েছেন এবং যমীনের শ্রেণী থেকেও ঐগুলোর অনুরূপ৷ ২৩ ঐগুলোর মধ্যে হুকুম নাযিল হতে থাকে৷ ( এ কথা তোমাদের এ জন্য বলা হচ্ছে) যাতে তোমরা জানতে পার, আল্লাহ সব কিছুর ওপরে ক্ষমতা রাখেন এবং আল্লাহর জ্ঞান সব কিছুকে পরিব্যপ্ত করে আছে৷
২০. এখানে মুসলমানদেরকে এই বলে সর্তক করা হচ্ছে যে, আল্লাহর রসূল এবং তাঁর কিতাবের মাধ্যমে যেসব আদেশ নিষেধ তাদের দেয়া হয়েছে যদি তারা অমান্য করে তাহলে দুনিয়া ও আখেরাতে কি পরিণতির সম্মুখীন হবে ৷ আর যদি আনুগত্যের পথ অনুসরণ করে তাহলে কি ধরনের পুরস্কার লাভ করবে ৷
২১. মুফাস্সিরদের মধ্যে কেউ কেউ এখানে নসীহত শব্দের অর্থ করেছেন, কুরআন এবং রসূল অর্থ হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ৷ আবার কেউ কেউ বলেন নসীহত অর্থ খোদ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ৷ অর্থাৎ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের গোটা ব্যক্তি সত্তাই ছিল নসীহত ৷ আমাদের মতে, এই দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটিই অধিক বিশুদ্ধ ও যথাযথ ৷ কারণ, প্রথম ব্যাখ্যা মেনে নিলে বাক্যাংশের বিন্যাস হবে এভাবেঃ আমি তোমাদের কাছে একটি নসীহত নাযিল করেছি এবং একজন রসূল পাঠিয়েছি ৷ এই পরিবর্তন ছাড়াই কুরআনের বাক্য যখন সম্পূর্ণ অর্থ প্রকাশ করছে এবং শুধু অর্থ প্রকাশ করছে না বরং অধিক সুস্পষ্টভাবে করছে, তখন কুরআনের ইবারতে এই পরিবর্তনের প্রয়োজন কি?
২২. অর্থাৎ জাহেলিয়াতের অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোতে নিয়ে এসেছেন ৷ মানুষ যখন তালাক, ইদ্দত এবং খোরপোষের ব্যাপারে পৃথিবীর অন্যান্য প্রাচীন ও আধুনিক পারিবারিক আইনসমূহ অধ্যয়ন করে তখন এ কথাটির পুরো গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারে ৷ এই তুলনামূলক অধ্যয়ন থেকে জানা যায় যে, বার বার পরিবর্তন ও নিত্য নতুন আইন রচন সত্ত্বেও কোন জাতি যুক্তসংগত, স্বভাবসম্মত ও সমাজের জন্য কল্যাণকর এমন কোন আইন রচনা করতে পারেনি যা এই আসমানী কিতাব এবং তার বাহক রসূল (সা) দেড় হাজার বছর পূর্বে আমাদের দিয়েছিলেন এবং কোনদিনও যা পুনর্বিবেচনা করার প্রয়োজন দেখা দেয়নি এবং দেখা দিতে পারে ও না ঐ সব আইনের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনার কোন অবকাশ এখানে নেই ৷ আমি আমার "স্বামী স্ত্রীর অধিকার" গ্রন্থের শেষাংশে এর একটা সংক্ষিপ্ত নমুনা মাত্র পেশ করেছি ৷ কোন জ্ঞানী ব্যক্তি ইচ্ছা করলে পৃথিবীর অন্যান্য ধর্মীয় ও ধর্মহীন আইনের সাথে কুরআন ও সুন্নাহর এই আইনের তুলনামূলক অধ্যায়ন করে নিজেই দেখতে পারেন ৷
২৩. "ঐগুলোর অনুরূপ" কথাটির অর্থ এ নয় যে, যতগুলো আসমান বানিয়েছেন যমীনও ততগুলোই বানিয়েছেন ৷ বরং এর অর্থ হলো, তিনি বহুসংখ্যক আসমান যেমন বানিয়েছেন তেমনি বহুসংখ্যক যমীনও বানিয়েছেন ৷ আর যমীনের শ্রেনী থেকেও কথাটার অর্থ হচ্ছে, যে পৃথিবীতে মানুষ বাস করছে সেই পৃথিবী যেমন তার ওপর বিদ্যমান সব কিছুর জন্য বিছানা বা দোলনার মত ঠিক তেমনি আল্লাহ তা'আলা এই বিশ্ব-জাহানে আরো অনেক যমীন বা পৃথিবী বানিয়ে রেখেছেন যা তার ওপর অবস্থানকারী সবকিছুর জন্য বিছানা ও দোলনার মত ৷ এমন কি কুরআনের কোন কোন স্থানে এ ইংগিত পর্যন্ত দেয়া হয়েছে যে, জীবন্ত সৃষ্টি কেবল যে এই পৃথিবীতে আছে তাই নয়, বর উর্ধজগতেও জীবন্ত সৃষ্টি বা প্রাণী বিদ্যমান ৷ উদাহরণ স্বরূপ দেখুন, তাফহীমুল কুরআন আশ শুরা, আয়াত -২৯, টীকা -৫০ ৷ অন্য কথায় আসমানে যে অসংখ্য তারকা এবং গ্রহ-উপগ্রহ দেখা যায় তার সবই বিরাণ অনাবাদী পড়ে নেই ৷ বরং তার মধ্য থেকেও বহু সংখ্যক গ্রহ উপগ্রহ এমন আছে যা এই পৃথিবীর মতই আবাদ ৷

প্রাচীনযুগের মুফাসসিরদের মধ্যে শুধুমাত্র ইবনে আব্বাসই (রা) এমন একজন মুফাসসির যিনি সেই যুগেও এই সত্যটি বর্ণনা করেছিলেন , যখন এই পৃথিবী ছাড়া বিশ্ব-জাহানের আর কোথাও বুদ্ধিমান শ্রেনীর মাখলুক বাস করে এ কথা কল্পনা করতেও কোন মানুষ প্রস্তুত ছিল না ৷ বর্তমানেও যেখানে এই যুগের অনেক বৈজ্ঞানিক পর্যন্ত এর সত্যতা বাস্তবতা সম্পর্কে সন্দিহান সে ক্ষেত্রে ১৪শত বছর পুর্বের মানুষ একে সহজেই কিভাবে বিশ্বাস করতে পারত ৷ তাই ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আলহু সাধারণ মানুষের সামনে এ কথা বলতে আশংকা করতেন যে, এর দ্বারা মানুষের ঈমান নড়বড়ে হয়ে না যায় ৷ মুজাহিদ বর্ণনা করেছেন যে, তাঁর এ আয়াতের অর্থ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেনঃ "আমি যদি তোমাদের কাছে এ আয়াতের ব্যাখ্যা পেশ করি তাহলে তোমরা কাফের হয়ে যাবে ৷ তোমাদের কুফরী হবে এই যে, তোমরা তো বিশ্বাস করবে না, মিথ্যা বলে গ্রহণ করবে " ৷ সাঈদ ইবনে যুবায়ের থেকেও প্রায় অনুরূপ বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে ৷ তিনি বলেন ইবনে আব্বাস বলেছেন, "আমি যদি তোমাদেরকে এর অর্থ বলি তাহলে তোমরা কাফের হয়ে যাবে না এমন আস্থা কি করে রাখা যায় " ৷ (ইবনে জারীর, আবদ ইবনে হুমায়েদ) তা সত্ত্বেও ইবনে জারীর, ইবনে আবী হাতেম, ও হাকেম এবং বায়হাকী শুয়াবুল ঈমান ও কিতাবুল আসমা ওয়াস সিফাত গ্রন্থে আবুদ দোহার মাধ্যমে শাব্দিক তারতম্য সহ ইবনে আব্বাস বর্ণিত এই তাফসীর উদ্ধৃত করেছেন যে,

-----------

"ঐ সব গ্রন্থের প্রত্যেকটিতে তোমাদের নবীর (সা) মত নবী আছেন, তোমাদের আদমের (আ) মত আদম আছেন, নূহের (আ) মত নূহ আছেন, ইবরাহীমের (আ) মত ইবরাহীম আছেন এবং ঈসার (আ) মত ঈসা আছেন " ৷ ইবনে হাজার (র) তাঁর ফাতহুল বারী গ্রন্থে এবং ইবনে কাসীর তাঁর তাফসীরেও এ হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন ৷ ইমাম যাহাবী বলেছেন যে, এর সনদ বিশুদ্ধ ৷ তবে আমার জানা মতে, আবুদ দোহা ছাড়া আর কেউ এটি বর্ণনা করেননি ৷ তাই এটি বিরল ও অপরিচিত হাদীস ৷ অপর কিছু সংখ্যক আলেম একে মিথ্যা ও বানোয়াট বলে আখ্যায়িত করেছেন ৷ মোল্লা আলী কারী তাঁর "মাওদুয়াতে কাবীর"গ্রন্থে (পৃষ্ঠা-১৯ ) একে বানোয়াট বলে উল্লেখ করে লিখেছেন, এটি যদি খোদ ইবনে আব্বাসের বর্ণিত হাদীসও হয়ে থাকে তবুও তা ইসরাঈলী পৌরণিকতার অন্তরভুক্ত ৷ তবে প্রকৃত সত্য ও বাস্তব হলো, মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধির অগম্যতাই এটিকে প্রত্যাখ্যান করার মূল কারণ ৷ অন্যথায় এর মধ্যে যুক্তি ও বিবেক বুদ্ধি বিরোধী কোন কথাই নেই ৷ এ কারণে আল্লামা আলুসী এ বিষয়ে তাঁর তাফসীরে আলোচনা করতে গিয়ে লিখছেনঃ বিবেক বুদ্ধিও শরীয়াতের দৃষ্টিতে এ হাদীসটি মেনে নিতে কোন বাধা নেই ৷ এ হাদীসের অর্থ দাঁড়াচ্ছে, প্রত্যেক যমীনে একটি মাখলুক আছে ৷ তারা একটি মূল বা উৎসের সাথে সম্পর্কিত -এই পৃথিবীতে আমরা যেমন আমাদের মূল উৎস আদম আলাইহিস সালামের সাথে সম্পর্কিত ৷ তাছাড়া প্রত্যেক যমিনে এমন কিছু ব্যক্তিবর্গ আছেন যাঁরা সেখানে অন্যদের তুলনায় বৈশিষ্টমন্ডিত যেমন আমাদের এখানে নূহ ও ইবরাহীম আলাইহিস সালাম বৈশিষ্টমন্ডিত ৷ তিনি আরো বলেনঃ হয়তো যমীনের সংখ্যা সাতের অধিক হবে এবং অনুরূপভাবে আসমানও শুধু সাতটিই হবে না ৷ সাত একটি পূর্ণ বা অবিভাজ্য সংখ্যা ৷ এ সংখ্যাটি উল্লেখ করায় তার চেয়ে বড় সংখ্যা রহিত হয়ে যাওয়া অনিবার্য নয় ৷ তাছাড়া কোন কোন হাদীসে যেখানে এক আসমান থেকে অপর আসমানের মধ্যবর্তী দূরত্ব পাঁচ শত বছর বলা হয়েছে সে সম্পর্কে তিনি বলেছেনঃ() অর্থাৎ এর দ্বারা হুবহু দূরত্বের পরিণাম বা মাপ বর্ণনা করা হয়নি ৷ বরং কথাটি যাতে মানুষের জন্য অধিকতর বোধগম্য হয় সে উদ্দেশ্যে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে ৷

এখানে উল্লেখ্য যে, সম্প্রতি আমেরিকার র‌্যাণ্ড কার্পোরেশন (Rand corporation) মহাশূণ্য পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অনুমান করেছে যে, পৃথিবী যে ছায়াপথে অবস্থিত শুধু তার মধ্যেই প্রায় ৬০ কোটি এমন গ্রহ দেখা যায় আমাদের পৃথিবীর সাথে যার প্রাকৃতিক অবস্থার অনেকটা সাদৃশ্য আছে এবং সম্ভবত সেখানেও জীবন্ত মাখলুক বা প্রাণী বসবাস করছে ৷ (ইকনমিষ্ট, লন্ডন, ২৬ শে জুলাই , ৬৯ ইং) ৷