(৬৪:১১) আল্লাহর ২৩ অনুমোদন ছাড়া কখনো কোন মুসিবত আসে না৷২৪ যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমান পোষণ করে আল্লাহ তার দিলকে হিদায়াত দান করেন৷ ২৫ আল্লাহ সব কিছু জানেন৷ ২৬
(৬৪:১২) আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রসূলের আনুগত্য করো৷ কিন্তু তোমরা যদি আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও তাহলে সত্যকে স্পষ্টভাবে পৌঁছিয়ে দেয়া ছাড়া আমার রসুলের আর কোন দায়িত্ব নেই৷ ২৭
(৬৪:১৩) তিনিই আল্লাহ যিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই৷ ঈমানদারদের আল্লাহ ওপরেই ভরসা করা উচিত৷২৮
(৬৪:১৪) হে সেই সব লোক যারা ঈমান এসেছো, তোমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্যে কেউ কেউ তোমাদের শত্রু৷ তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাক৷ আর যদি তোমরা ক্ষমা ও সহনশীলতার আচরণ করো এবং ক্ষমা করে দাও তাহলে আল্লাহ অতিব ক্ষমাশীল, অতিব দয়ালু৷ ২৯
(৬৪:১৫) তোমাদের অর্থ-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি একটি পরীক্ষা৷ আর কেবলমাত্র আল্লাহর কাছে আছে বিরাট প্রতিদান৷ ৩০
(৬৪:১৬) তাই যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় করে চলো৷ ৩১ শোন, আনুগত্য করো এবং নিজেদের সম্পদ ব্যয় করো৷ এটা তোমাদের জন্যই ভাল৷ যে মনের সংকীর্ণা থেকে মুক্ত থাকলো সেই সফলতা লাভ করবে৷৩২
(৬৪:১৭) যদি তোমরা আল্লাহকে করযে হাসানা দাও তাহলে তিনি তোমাদেরকে তা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেবেন ৩৩ এবং তোমাদের ভূল-ত্রুটি ক্ষমা করবেন৷ আল্লাহ সঠিক মূল্যায়ণকারী ও অতিব সহনশীল৷ ৩৪
(৬৪:১৮) সামনে উপস্থিত ও অনুপস্থিত সবকিছুই তিনি জানেন৷ তিনি মহাপরাক্রমশালী ও মহাজ্ঞানী৷
২৩. এখান থেকে ঈমানাদাদের উদ্দেশ্য করে কথা বলা হয়েছে ৷ এ পর্যায়ে কথাগুলো পড়ার সময় একথা মনে রাখতে হবে যে, এসব আয়াত যে সময়ে নাযিল হয়েছিল তা ছিল মুসলমানদের কঠোর বিপদ ও দুঃখের সময় ৷ তারা মক্কায় বছরের পর বছর জুলুম-অত্যাচার সহ্য করার পর নিজেদের সবকিছু ছেড়ে মদীনায় চলে এসেছিলেন ৷ যেসব ন্যায় ও সত্যপন্থী লোক তাদেরকে মদীনায় আশ্রয় দিয়েছিলেন তাদের ওপরও দ্বিগুণ মুসিবত আপতিত হয়েছিল ৷ একদিকে তাদেরকে আরবের বিভিন্ন অংশ থেকে তাদের কাছে চলে আসা শত শত মুহাজিরকে সহায়তা দিতে হচ্ছিল ৷ অপরদিকে ইসলামের শত্রু সমগ্র আরবের লোকজন তাদের ওপর নিপীড়ন চালাতে বদ্ধপরিকর হয়েছিল ৷
২৪. এ বিষয়টি সূরা আল হাদীদের ২২-২৩ আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে এবং সেখানে ৩৯ থেকে ৪২ নম্বর টীকায় আমরা এর ব্যাখ্যা পেশ করেছি ৷ যে পরিস্থিতিতে এবং যে উদ্দেশ্যে সেখানে এ কথাটি বলা হয়েছিল ঠিক অনুরূপ পরিস্থিতিতে একই উদ্দেশ্য এখানেও তা পুনরায় বলা হয়েছে ৷ এখানে যে সত্যটি মুসলমানদের হৃদয় মনে বদ্ধমূল করে দেয়া উদ্দেশ্য তা হচ্ছে, বিপদ-আপদ নিজেই আসে না ৷ আর পৃথিবীতে কারো এমন শক্তিও নেই যে, সে যার ওপরে ইচ্ছা কোন বিপদ চাপিয়ে দেবে ৷ কারো ওপর কোন বিপদ আসতে দেয়া না দেয়া সরাসরি আল্লাহর অনুমোদনের ওপর নির্ভর করে ৷ আল্লাহর অনুমোদন সর্বাবস্থায় কোন না কোন বৃহত্তর কল্যাণ ও উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে হয় যা মানুষ জানে না বা বুঝে উঠতে পারে না ৷
২৫. অর্থাৎ বিপদ-আপদের ঘনঘটার মধ্যেও যে জিনিস মানুষকে সঠিক পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখে এবং কঠিন থেকে কঠিনতর পরিস্থিতিতে পদস্খলন হতে দেয় না সেই একমাত্র জিনিসটি হচ্ছে আল্লাহ প্রতি ঈমান ৷ যার আন্তরে আল্লাহর প্রতি ঈমান নেই সে এসব বিপদ -আপদকে হয় আকস্মিক দুর্ঘটনার ফল মনে করে অথবা এসব বিপদ-আপদ দেয়ার ও দূর করার ব্যাপারে পার্থিব শক্তিসমূহকে কার্যকর বলে বিশ্বাস করে কিংবা সেসবকে এমন কাল্পনিক শক্তিসমূহের কাজ বলে মনে করে যাদেরকে মানুষের কুসংস্কারজনিত বিশ্বাস ক্ষতি ও কল্যাণ করতে সক্ষম বলে ধরে নিয়েছে অথবা তারা আল্লাহকে সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী বলে নিখাদ ও নির্ভেজাল ঈমানের সাথে মানে না ৷ ভিন্ন ভিন্ন এসব ক্ষেত্র ও পরিস্থিতিতে মানুষ নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দেয় ৷ একটি বিশেষ সীমা পর্যন্ত সে বিপদ-আপদ বরদাশত করে বটে কিন্তু তার পরই সে পরাজয় স্বীকার করে নেয় ৷ তখন সেসব আস্তানায়ই মাথা নত করে, সব রকম আপমান ও লাঞ্ছনা স্বীকার করে নেয় ৷ এ সময় সে যে কোন হীন কাজ ও আচরণ করতে পারে ৷ সব রকম ভ্রান্ত কাজ করতে প্রস্তুত হয়ে যায় ৷ আল্লাহকে গালি দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেনা ৷ এমনকি আত্মহত্যা পর্যন্ত করে বসে ৷ অপরদিকে যে ব্যক্তি একথা জানে এবং আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ তা'আলার হাতেই সবকিছু ৷ তিনিই এই বিশ্ব-জাহানের মালিক ও শাসক ৷ তাঁর অনুমোদনক্রমেই বিপদ-মসিবত আসতে এবং দূরীভূত হতে পারে ৷ এই ব্যক্তির মনকে আল্লাহ তা'আলা ধৈর্য ও আনুগত্য এবং তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্ট থাকার 'তাওফীক' দান করেন ৷ তাকে সাহস ও দৃঢ় মনোবল নিয়ে সব রকম পরিস্থিতিতে মোকাবিলা করার শক্তি দান করেন ৷ অন্ধকার থেকে অন্ধকারতর পরিস্থিতিতেও তার সামনে আল্লাহর দয়া ও সাহসহারা করতে পারে না যে, সে সত্য ও সঠিক পথ থেকে সরে যাবে বা বাতিলের সামনে মাথা নত করবে কিংবা আল্লাহ ছাড়া আর কারো দরবারে তার দুঃখ -বেদনার দাওয়াই বা প্রতিকার তালাশ করবে ৷ এভাবে প্রতিটি বিপদ মসিবতই তার জন্য অধিক কল্যাণের দরজা উন্মুক্ত করে দেয় ৷ প্রকৃতপক্ষে কোন মসিবতই তার মসিবত থাকে না বরং পরিণামের দিক থেকে সরাসরি রহমতে পরিণত হয় ৷ কেননা সে এই মসিবতে নিঃশেষ হয়ে যাক বা সফলভাবে উৎরিয়ে যাক-উভয় অবস্থায়ই সে তার প্রভুর দেয়া পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়ে যায় ৷ এ বিষয়টিই বুখারী ও মুসলিমের বর্ণিত একটি হাদীসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ

----------------

" মু'মিনের ব্যাপারটিই বড় অদ্ভুত ৷ আল্লাহ তার জন্য যে ফায়সালাই করুন না কেন তা সর্বাবস্থায় তার জন্য কল্যাণকর হয়ে থাকে ৷ বিপদ-আপদ সে ধৈর্য অবলম্বন করে ৷ এটা তার জন্য কল্যাণকর ৷ সুখ-শান্তি ও সচ্ছলতা আসলে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে ৷ এটাও তার জন্য কল্যাণকর ৷ মু'মিন ছাড়া আর কারো ভাগ্যেই এরূপ হয় না" ৷
২৬. পূর্বাপর প্রসংগের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এ কথাটির দুটি অর্থ হতে পারে ৷ একটি অর্থ এই যে, আল্লাহ তা'আলা জানেন কোন ব্যক্তি প্রকৃতই ঈমানদার এবং সে কিরূপ ঈমানের অধিকারী? তাই তিনি তার জ্ঞানের ভিত্তিতে সেই সব হৃদয়মনের অধিকারীকে হিদায়াত দান করেন যার মধ্যে ঈমান আছে এবং তার মধ্যে যে মর্যাদার ও প্রকৃতির ঈমান আছে সেই পর্যায়ের হিদায়াত তাকে দান করেন ৷ অপর অর্থটি এও হতে পারে যে, আল্লাহ তাঁর সেই মু'মিন বান্দার অবস্থা সম্পর্কে অনবহিত নন ৷ তিনি তাকে ঈমান গ্রহণের আহবান জানিয়ে এবং ঈমান গ্রহণের সাথে দুনিয়ার কঠিন পরীক্ষাসমূহের মধ্যে ফেলে দিয়ে তাদেরকে ঐ অবস্থায়ই পরিত্যাগ করেননি ৷ পৃথিবীতে কোন ঈমানদারদের ওপর কি মসিবত চলছে আর কোন কোন পরিস্থিতিতে সে কিভাবে তার ঈমানের দাবীসমূহ পূরণ করছে তা তিনি জানেন ৷ তাই এ বিষয়ে আস্থা রাখো যে, আল্লাহর অনুমোদনক্রমে যে মসিবতই তোমাদের ওপর আসুক না কেন আল্লাহর কাছে তার বৃহত্তর কোন কল্যাণকর উদ্দেশ্য অবশ্যই আছে এবং তার মধ্যে বৃহত্তর কোন কল্যাণ লুক্কায়িত আছে ৷ কেননা , আল্লাহ তাঁর ঈমানদার বান্দার কল্যাণকামী ৷ তিনি তাদেরকে বিনা কারণে বিপদে ফেলতে চান না ৷
২৭. এখানে এ কথার অর্থ হলো, অবস্থা ভাল বা মন্দ যাই হোক না কেন সর্বাবস্থায় আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের আনুগত্য করবে কিন্তু বিপদের ঘনঘটায় ঘাবড়ে গিয়ে যদি তোমরা আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও তাহলে কেবল নিজেরই ক্ষতি করবে আমার রসূলের দায়িত্ব শুধু তোমাদেরকে ঠিকমত সত্য ও সঠিক পথটির সন্ধান বলে দেয়া ৷ আর রসূল সে কাজটি ভালভাবেই করেছেন ৷
২৮. অর্থাৎ খোদায়ীর সর্বময় ক্ষমতা ও ইখতিয়ার একমাত্র আল্লাহ তা'আলার হাতে ৷ এই ক্ষমতা ও ইখতিয়ার অন্য কারো আদৌ নেই ৷ তাই সে তোমাদের জন্য ভাল বা মন্দ ভাগ্য গড়তে পারে না ৷ তিনি আনলেই কেবল সুসময় আসতে পারে এবং তিনি দূর করলেই কেবল দুঃসময় দূর হতে পারে ৷ তাই যে ব্যক্তি আল্লাহকে মনে প্রাণে একমাত্র ইলাহ বলে স্বীকার করে সে আল্লাহর ওপর ভরসা করবে এবং একজন ঈমানদার হিসেবে এই বিশ্বাস রেখে দুনিয়াতে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে থাকবে যে, আল্লাহ যে পথ দেখিয়েছেন কেবল সে পথেই কল্যাণ নিহিত ৷ এ ছাড়া তার জন্য আর কোন পথ নেই ৷ এ পথে সফলতা লাভ হলে তা আল্লাহর সাহায্য, সহযোগীতা ও তাওফিকের মাধ্যমেই হবে; অপর কোন শক্তির সাহায্যে তা হওয়ার নয় ৷ আর এ পথে যদি কঠোর পরিস্থিতি, বিপদাপদ, ভয়ভীতি ও ধ্বংস আসে তাহলে তা থেকেও কেবল তিনিই রক্ষা করতে পারেন, অন্য কেউ নয় ৷
২৯. এ আয়াতের দুটি অর্থ ৷ একটি অর্থ অনুসারে আল্লাহর পথে চলতে গিয়ে বহুসংখ্যক ঈমানদার পুরুষকে তাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে, স্ত্রীদেরকে তাদের স্বামীদের পক্ষ থেকে এবং পিতামাতাকে তাদের সন্তানদের পক্ষ থেকে যেসব কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় সেই সব পরিস্থিতির ক্ষেত্রে এ আয়াতটি প্রযোজ্য ৷ ঈমান ও সত্য সঠিক পথে চলার ক্ষেত্রে একে অপরের পুরোপুরি বন্ধু ও সহযোগী হতে পারে একজন স্বামীর এরূপ স্ত্রী, একজন স্ত্রীর এরূপ স্বামী লাভ করা এবং আকীদা-বিশ্বাস , আমল -আখলাক ও চরিত্রের দিক দিয়ে সকল সন্তান-সন্তুতিই চোখ জুড়ানোর মত হওয়া, পৃথিবীতে খুব কমই ঘটে থাকে ৷ বরং সাধারণত দেখা যায় যে, স্বামী যদি নেক্কার ও ঈমানদার হয় তাহলে সে এমন স্ত্রী ও সন্তান-সন্তুতি লাভ করে থাকে যারা তার দীনদারী, আমানতদারী এবং সততাকে নিজদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক বলে মনে করে ৷ তারা চায় যে, তাদের স্বামী ও পিতা তাদের জন্য জাহান্নাম খরিদ করুক এবং হালাল ও হারামের বাছবিচার না করে যে কোন পন্থায় আরাম-আয়েশ , আমোদ-ফূর্তি এবং গোনাহ ও পাপের উপকরণ এনে দিক ৷ কোন কোন সময় আবার এর ঠিক উল্টোটাও ঘটে থাকে ৷ একজন নেক্কার ঈমানদার নারীকে এমন স্বামীর পাল্লায় পড়তে হয় যে স্ত্রীর শরীয়াত অনুসারে জীবন যাপন দুই চোখে দেখতে পারে না ৷ আর সন্তানরাও পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে নিজেদের গোমরাহী ও দুষ্কর্ম দ্বারা মায়ের জীবনকে অতিষ্ট করে তোলে ৷ বিশেষ করে কুফর ও ঈমানের দ্বন্দ্ব -সংঘাতের সময় যখন একজন মানুষের ঈমান দাবী করে যে, আল্লাহ এবং তাঁর দীনের জন্য সেই ক্ষতি স্বীকার করবে, দেশ ছেড়ে হিজরাত করবে কিংবা জিহাদে অংশগ্রহণ করে নিজের জীবন পর্যন্ত বিপন্ন করবে তখন তার পথে তার স্ত্রী ও পরিবার -পরিজনই সর্বপ্রথম বাধা হয়ে দাঁড়ায় ৷

এ আয়াতগুলো নাযিল হওয়ার সময় বিপুল সংখ্যক মুসলমানদের জন্য যে বিশেষ অবস্থা ও পরিস্থিতি দেখা দিচ্ছিল এবং কোন অমুসলিম সমাজে ইসলাম গ্রহণকারী যে কোন ব্যক্তির জন্য আজও দেখা দেয় এ আয়াতটির দ্বিতীয় অর্থটি সেই বিশেষ অবস্থা ও পরিস্থিতির সাথে সম্পর্কিত ৷ সেই সময় মক্কা মুয়াযযাম ও আরবের অন্যান্য অংশে সাধারণভাবে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হতো যে, একজন লোক ঈমান এনেছে কিন্তু তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা ঈমান আনতে প্রস্তুত নয় শুধু তাই না বরং তারা তাকে ইসলাম থেকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য সচেষ্ট ৷ যেসব মেয়েরা তাদের পরিবারে একাকী ইসলাম গ্রহণ করত ৷ তাদের জন্যও ঠিক একই পরিস্থিতির উদ্ভব হতো ৷

যেসব ঈমানদার নারী ও পুরুষ এ দুটি পরিস্থিতির সম্মুখীন হতেন তাদের উদ্দেশ্য করে তিনটি কথা বলা হয়েছেঃ

সর্বপ্রথম তাদের এই বলে সাবধান করা হয়েছে যে, পার্থিব সম্পর্কের দিক দিয়ে যদিও তারা মানুষের অতি প্রিয়জন কিন্তু দীন ও আদর্শের দিক দিয়ে এরা তোমাদের 'দুশমন' ৷ তারা তোমাদের সৎকাজে বাধা দেয় এবং অসৎকাজের প্রতি আকৃষ্ট করে, কিংবা তোমাদের ঈমানের পথে বাধা সৃষ্টি করে এবং কুফরীর পথে সহযোগীতা করে কিংবা তারা কাফেরদের প্রতি সহানুভূতি পোষণ করে মুসলমানদের সামরিক গোপণ তথ্য সম্পর্কে তারা তোমাদের নিকট থেকে যাই জানতে পারে তা ইসলামের শত্রুদের কাছে পৌছিয়ে দেয় ৷ এর যে কোন পন্থায়ই তারা দুশমনী করুক না কেন তাদের দুশমনীর ধরন ও প্রকৃতিতে অবশ্যই পার্থক্য হয় ৷ কিন্তু সর্বাবস্থায়ই তা দুশমনী ৷ ঈমান যদি তোমাদের কাছে প্রিয় হয়ে থাকে তাহলে সেই বিচারে তাদেরকে দুশমনই মনে করতে হবে ৷ তাদের ভালবাসায় আবদ্ধ হয়ে এ বিষয়টি কখনো ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, তোমাদের ও তাদের মধ্যে ঈমান ও কুফর বা আনুগত্য ও অবাধ্যতার প্রাচীন আড়াল করে আছে ৷

এরপর বলা হয়েছে যে, তাদের ব্যাপারে সাবধান থাক ৷ অর্থাৎ তাদের পার্থিব স্বার্থের জন্য নিজেদের পরিণাম তথা আখেরাতকে বরবাদ করো না ৷ তোমাদের অন্তরে তাদের প্রতি ভালবাসাকে এতটা প্রবল হতে দিও না যে, তারা আল্লাহ ও রসূলের সাথে তোমাদের সম্পর্ক এবং ইসলামের প্রতি তোমাদের বিশ্বস্ত ও অনুগত থাকার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় ৷ তাদের প্রতি এতটা বিশ্বাস ও আস্থা রেখো না যাতে তোমাদের অসাবধানতার কারণে মুসলমানদের দলের গোপনীয় বিষয়সমূহ তারা অবগত হয়ে যেতে পারে এবং তা দুশমনদের হাতে পৌছে যায় ৷ একটি হাদীসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদেরকে এ বিষয়টি সম্পর্কেই সাবধান করে দিয়েছেন এই বলে যে,

-------------------------------

"কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে হাজির করা হবে ৷ বলা হবে, তার সন্তান-সন্তুতিরা তার সব নেকী ধ্বংস করে ফেলেছে" ৷

সর্বশেষ বলা হয়েছে যে, তোমরা যদি ক্ষমা ও সহনশীলতা দেখাও এবং ক্ষমা করে দাও তাহলে আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু ৷ এর অর্থ হলো, তাদের শত্রুতা সম্পর্কে তোমাদেরকে অবহিত করা হচ্ছে শুধু এই জন্য যে, তোমরা সতর্ক থাকবে এবং নিজেদের আদর্শকে তাদের থেকে রক্ষা করার চিন্তা-ভাবনা করবে ৷ এই সতর্কীকরণের অর্থ কখনো এ নয় যে, যা করতে বলা হলো তার চেয়ে আরো অগ্রসর হয়ে তোমারা স্ত্রী ও সন্তানদের মারতে শুরু করবে অথবা তাদের সাথে রূঢ় আচরণ করবে অথবা সম্পর্ক এমন তিক্ত করে তুলবে যে, তোমাদের এবং তাদের পারিবারিক জীবন আযাবে পরিণত হবে ৷ কারণ এরূপ করার দুটি স্পষ্ট ক্ষতি আছে ৷ একটি হলো, এভাবে স্ত্রী ও সন্তান-সন্তুতির সংশোধনের পথ চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যাওয়ার আশংকা আছে ৷ দ্বিতীয়টি হলো, এভাবে সমাজে ইসলামের বিরুদ্ধে উল্টা খারাপ ধারণা সৃষ্টি হতে পারে ৷ তাছাড়া এভাবে আশেপাশের লোকদের দৃষ্টিতে মুসলামানদের আখলাক ও চরিত্রের এমন একটি চিত্র ভেসে উঠে যাতে তারা মনে করতে শুরু করে যে, ইসলাম গ্রহণ করার সাথে সাথে সে নিজের ঘরের ছেলেমেয়েদের জন্য পর্যন্ত কঠোর ও বদমেজাজী হয়ে যায় ৷

এ প্রসংগে এ কথাটিও মনে রাখা উচিত যে, ইসলামের প্রথম যুগে মানুষ যখন সবেমাত্র মুসলমান হতো এবং যদি তাদের পিতামাতা কাফেরই থেকে যেত তাহলে একটি সমস্যা দেখা দিত এই যে, তারা তাদের সন্তানদেরকে নতুন দীন পরিত্যাগ করার জন্য চাপ সৃষ্টি করত ৷ তাদের জন্য আরো একটি সমস্যা দেখা দিত তখন যখন তাদের স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা (কিংবা মেয়েদের ক্ষেত্রে তাদের স্বামী এবং সন্তানরা) কুফরকেই আঁকড়ে ধরে থাকত এবং সত্য দীনের পথ থেকে তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করত ৷ প্রথমোক্ত পরিস্থিতির মোকাবেলার জন্য সূরা আনকাবূতের (১৮ আয়াত) এবং সূরা লোকমান(১৪ ও ১৫ আয়াত) এ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে যে, দীনের ব্যাপারে কখনো পিতামাতার কথা অনুসরণ করবে না ৷ তবে পার্থিব ব্যাপারে তাদের সাথে উত্তম আচরণ করবে ৷ এখানে দ্বিতীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, নিজের দীনকে নিজের সন্তান-সন্তুতির হাত থেকে রক্ষা করার চিন্তা অবশ্যই করবে কিন্তু তাই বলে তাদের সাথে কঠোর আচরণ করবে না ৷ বরং নমনীয় আচরণ করো এবং ক্ষমা ও উদারতা দেখাও ৷ (অধিক ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহিমূল কুরআন, সূরা আত তাওবা, আয়াত, ২৩ , ২৪; আল মুজাদালা, টীকা ৩৭; আল মুমতাহিনা, টীকা ১ থেকে ৩; আল মুনাফিকূন, টীকা ১৮) ৷
৩০. ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন, আল আনফাল, টীকা ২৩ ৷ এ ক্ষেত্রে তাবারানী হযরত আবু মালেক আশআরী (রা) থেকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন সেটিও মনে রাখা দরকার ৷ তিনি বলেছেনঃ "তুমি যে শত্রুকে হত্যা করতে পারার কারণে সফল হলে কিংবা সে তোমাকে হত্যা করলে তুমি জান্নাত লাভ করলে সে তোমার আসল শত্রু নয় ৷ বরং তোমার ঔরষজাত সন্তানই হয়তো তোমার আসল শত্রু ৷ এরপর তোমার শত্রু হচ্ছে তোমার মালিকাধীন অর্থ সম্পদ ৷" তাই এখানে এবং সূরা আনফালের উভয় জয়গাতেই বলা হয়েছে যে, যদি তোমার অর্থ -সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতির ফিতনা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পার এবং আল্লাহর প্রতি ভালবাসাকে তাদের প্রতি ভালবাসার ওপর প্রাধান্য দিতে সক্ষম হও তাহলে আল্লাহর কাছে তোমাদের জন্য বিরাট পুরস্কার রয়েছে ৷
৩১. কুরআন মজীদে এক স্থানে বলা হয়েছে "আল্লাহকে ভয় করার মত ভয় কর ৷ " (আলে ইমরান, ১০২) অন্য এক স্থানে বলা হয়েছে "আল্লাহ কারো ওপর তার সাধ্যাতীত বোঝা চাপিয়ে দেন না ৷"(আল বাকারাহ, ২৮৬) এখানে বলা হচ্ছে, সাধ্যমত আল্লাহকে ভয় করতে থাকো ৷ এ তিনটি আয়াতের বিষয়বস্তু এক সাথে মিলিয়ে চিন্তা করলে বুঝা যায়, প্রথম আয়াতে আমাদের সামনে একটি মানদন্ড পেশ করা হয়েছে সেখানে পৌছার জন্য প্রত্যেক মুমিনের চেষ্টা করা উচিত ৷ দ্বিতীয় আয়াত আমাদেরকে এই মৌলিক নীতি অবহিত করছে যে, কোন ব্যক্তির নিকট থেকেই তার সাধ্যাতীত কোন কাজ দাবী করা হয়নি ৷ বরং আল্লাহর দীনের অধীনে মানুষ ততটুকুই করার জন্য আদিষ্ট যা করার সমার্থ তার আছে ৷ আর এ আয়াতটি প্রত্যেক ঈমানদারকে এ মর্মে পথনির্দেশনা দিচ্ছে যে, সে যেন সাধ্যানুসারে তাকওয়ার পথ অনুসরণে কোন ত্রুটি না করে ৷ তার পক্ষে যতটা সম্ভব আল্লাহর হুকুম আহকাম পালন করা এবং তার নাফরমানী থেকে দূরে থাকা কর্তব্য ৷ এ ক্ষেত্রে সে যদি অলসতা করে তাহলে পাকড়াও থেকে বাঁচতে পারবেনা ৷ তবে যে জিনিস তার সাধ্যের অতীত (অবশ্য কোন জিনিস তার সাধ্যের অতীত তার ফায়সালা আল্লাহই ভালভাবে করতে পারেন) সে বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না ৷
৩২. ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, আল হাশর, টীকা ১৯ ৷
৩৩. ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহিমুল কুরআন, আল বাকারাহ, টীকা ২৬৭; আল মায়েদা, টীকা ৩৩; আল হাদীদ, টীকা ১৬ ৷
৩৪. ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহিমুল কুরআন, সূরা ফাতির টীকা ৫২-৫৯; আশ শূরা, টীকা ৪২৷