(৬১:১) আসমান ও যমীনে যা কিছু আছে তা সবই আল্লাহর তাসবীহ করেছে৷ তিনি মাহাপরাক্রমশালী ও মহাজ্ঞানী৷
(৬১:২) হে মু’মিনগণ! তোমরা এমন কথা কেন বল যা নিজেরা করো না?
(৬১:৩) আল্লাহর কাছে এটা অত্যন্ত অপছন্দনীয় কাজ যে, তোমরা এমন কথা বলো যা করো না৷
(৬১:৪) আল্লাহ সেই সব লোকদের ভালবাসেন যারা তাঁর পথে এমনভাবে কাতারবন্দী হয়ে লড়াই করে যেন তারা সিসা গলিয়ে ঢালাই করা এক মজবুত দেয়াল৷
(৬১:৫) তোমরা মূসার সেই কথাটি স্মরণ করো যা তিনি তাঁর কওমকে বলেছিলেন৷ “ হে আমার কাওমের লোক, তোমরা কেন আমাকে কষ্ট দাও? অথচ তোমরা ভাল করেই জানো যে, আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর প্রেরিত রসূল৷ এরপর যেই তারা বাঁকা পথ ধরলো অমনি আল্লাহও তাদের দিল বাঁকা করে দিলেন৷ আল্লাহ কাফেকদের হিদায়াত দান করেন না৷
(৬১:৬) আর স্মরণ করো ঈসা ইবনে মারয়ামের সেই কথা যা তিনি বলেছিলেন : হে বনী ইসরাঈল, আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর প্রেরিত রসূল৷ আমি সেই তাওরাতের সত্যতা প্রতিপাদনকারী যা আমার পূর্বে এসেছে এবং একজন রসূলের সুসংবাদদাতা যিনি আমার পরে আসবেন, যার নাম আহমাদ৷ কিন্তু যখন তিনি তাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ পেশ করলেন তখন তারা বলল : এটা তো স্পষ্ট প্রতারণা৷
(৬১:৭) সেই ব্যক্তির চেয়ে বড় জালেম আর কে হবে যে আল্লাহর বিরুদ্ধে মিথ্যা বানিয়ে বলে৷ ১০ অথচ তাকে শুধু ইসলামের (আল্লাহর আনুগত্য করার) দিকে আহ্বান করা হচ্ছে৷ ১১ আল্লাহ এ রকম জালেমদের হিদায়াত দেন না৷
(৬১:৮) এরা তাদের মুখের ফুঁ দিয়ে আল্লাহর নূরকে নিভিয়ে দিতে চায়৷ অথচ আল্লাহর ফায়সালা হলো তিনি তার নূরকে পূর্নরূপে বিকশিত করবেন৷ কাফেররা তা যতই অপছন্দ করুক না কেন৷১২
(৬১:৯) তিনিই সেই মহান সত্তা যিনি তাঁর রসূলকে হিদায়াত এবং ‘দীনে হক’ দিয়ে পাঠিয়েছেন যাতে তিনি এ দীনকে অন্য সকল দীনের ওপর বিজয়ী করেন, চাই তা মুশরিকদের কাছে যতই অসহনীয় হোক না কেন৷১৩
১. এটা এই ভাষণের সংক্ষিপ্ত ভূমিকা ৷ ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কোরআন, সূরা হাদীদের তাফসীর, টীকা ১ ও ২ ৷ এ ধরনের ভূমিকা দিয়ে বক্তব্য শুরু করার কারণ হলো, পরে যা বলা হবে তা শোনা বা পড়ার আগে মানুষ যাতে একথা ভালভাবে বুঝে নেয়, যে আল্লাহ তা'আলা অভাবহীন এবং অমুখাপেক্ষী ৷ তাঁর প্রতি কারো ঈমান আনা, সাহায্য করা এবং ত্যাগ ও কুরবানী করার ওপর তাঁর কর্তৃত্ব নির্ভরশীল নয় ৷ তিনি এর অনেক উর্ধে ৷ তিনি যখন ঈমান গ্রহণকারীদের ঈমানের ব্যাপারে একনিষ্ঠ হওয়ার শিক্ষা দেন এবং বলেন সত্যকে উন্নতির করা জন্য জান ও মাল দিয়ে জিহাদ করো তখন এ সব তাদের নিজেদের কল্যাণের জন্যেই বলেন ৷ তাঁর ইচ্ছা তাঁর নিজের শক্তি ও ব্যবস্থাপনার সাহায্যেই বাস্তব রূপ লাভ করে ৷ কোন বান্দা তাঁর ইচ্ছা বাস্তাবায়নের সামান্যতম তৎপরতাও যদি না চালায় বরং গোটা পৃথিবী সে পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে বদ্ধপরিকরও হয় তবুও তার নিজের শক্তি ও ব্যবস্থাপনা দ্বারা তা বাস্তবরূপ লাভ করে ৷
২. একথাটির একটি সাধারণ উদ্দেশ্য ও লক্ষ আছে যা এর শব্দসমূহ থেকেই প্রতিভাত হচ্ছে ৷ এ ছাড়া একটি বিশেষ উদ্দেশ্য ও লক্ষও আছে যা পরবর্তী আয়াতের সাথে এটিকে মিলিয়ে পড়লে বুঝা যায় ৷ প্রথম উদ্দেশ্য ও লক্ষ হলো, একজন খাঁটি মুসলমানের কথা ও কাজে মিল থাকা উচিত ৷ সে যা বলবে তা করে দেখাবে ৷ আর করার নিয়ত কিংবা সৎ সাহস না থাকলে তা মুখেও আনবে না ৷ এক রকম কথা বলা ও অন্য রকম কাজ করা মানুষের এমন একটি জঘন্য দোষ যা আল্লাহ তা'আলার দৃষ্টিতে অত্যন্ত ঘৃণিত ৷ যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমান পোষণ করার দাবী করে তার পক্ষে এমন নৈতিক দোষ ও বদ স্বভাবে লিপ্ত হওয়া আদৌ সম্ভব নয় ৷ নবী (সা) ব্যাখ্যা করে বলেছেনঃ কোন ব্যক্তির মধ্যে এরূপ স্বাভাব থাকা প্রমাণ করে যে, সে মু'মিন নয় বরং মুনাফিক ৷ কারণ তার এই স্বভাব মুনাফিকির একটি আলামত ৷ একটি হাদীসে নবী (সা) বলেছেনঃ

----------------

"মুনাফিকের পরিচয় বা চিহ্ন তিনটি (যদিও সে নামায পড়ে এবং মুসলমান হওয়ার দাবী করে) ৷ তাহলো, সে কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করে এবং তার কাছে কোন আমানত রাখলে তা খিয়ানত করে ৷ "(বুখারী ও মুসলিম) ৷

তিনি অন্য একটি হাদীসে বলেছেনঃ

------------------

"চারটি স্বভাব এমন যা কোন ব্যক্তির মধ্যে পাওয়া গেলে সে হবে খাঁটি মুনাফিক ৷ আর যার মধ্যে এর কোন একটি স্বভাব পাওয়া যাবে তা পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকীর একটি স্বভাব বিদ্যমান ৷ স্বভাবগুলো হলো , তার কাছে আমানত রাখা হলে সে খিয়ানত করে, কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে, এবং কারো সাথে ঝগড়া-বিবাদ করলে নৈতিকতা ও দীনদারীর সীমালংঘন করে ৷ " (বুখারী ও মুসলিম)

ইসলামী ফিকাহ শাস্ত্রবিদগণ এ বিষয়ে মোটামুটি একমত যে, কোন ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার সাথে যদি কোন ওয়াদা করে (যেমন কোন জিনিসের মানত করল) কিংবা মানুষের সাথে কোন চুক্তিতে আবদ্ধ হয় অথবা কারো সাথে কোন বিষয়ে ওয়াদা করে আর তা যদি গোনাহের কাজের কোন প্রতিশ্রুতি বা ওয়াদা না হয় তাহলে পালন করে অবশ্য কর্তব্য ৷ তবে যে কাজের প্রতিশ্রুতি বা ওয়াদা করা হয়েছে তা গোনাহর কাজ হলে সে কাজ করবে না ঠিকই কিন্তু তার বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য কসমের কাফ্ফারা আদায় করতে হবে ৷ সূরা মায়েদার ৮৯ আয়াতে একথাটিই বলা হয়েছে ৷ (আহকামুল কুরআন -জাস্সাস ও ইবনে আরাবী) ৷

এটা হলো এ আয়াতগুলোর সাধারণ উদ্দেশ্য ও লক্ষ ৷ এরপর থাকে এর সেই বিশেষ উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য যে জন্য এ ক্ষেত্রে আয়াত কয়টি পেশ করা হয়েছে ৷ পরবর্তী আয়াতটিকে এর সাথে মিলিয়ে পড়লেই সেই বিশেষ উদ্দেশ্য ও লক্ষ জানা যায় ৷ যারা ইসলামের জন্য জীবনপাত করার লম্বা লম্বা ওয়াদা করতো কিন্তু চরম পরীক্ষার সময় আসলে জান নিয়ে পালাতো সেই সব বাক্যবাগিশদের তিরষ্কার করাই এর উদ্দেশ্য ৷ দুর্বল ঈমানের লোকদের এই দুর্বলতার জন্য কুরআন মজীদের কয়েকটি স্থানে তাদের সমালোচনা করা হয়েছে ৷ যেসন সূরা নিসার ৭৭ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ তোমরা সেই সব লোকদের প্রতি কি লক্ষ করেছ যাদের বলা হয়েছিল, নিজেদের হাতকে সংযত রাখা, নামায কায়েম কর এবং যাকাত দাও ৷ এখন যেই তাদেরকে লড়াই করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে অমনি তাদের একটি দল মানুষকে এমন ভয় করতে আরম্ভ করেছে যা আল্লাহকে করা উচিত, কিংবা তার চেয়েও অধিক ৷ তারা বলেঃ হে আল্লাহ, আমাদের জন্য লড়াইয়ের নির্দেশ কেন লিপিবদ্ধ করে দিলে? আমাদেরকে আরো কিছুদিনের জন্য অবকাশ দিলে না কেন? সূরা মুহাম্মাদের ২০ আয়াতে বলেছেনঃ যারা ঈমান এনেছে তারা বলেছিল, এমন কোন সূরা কেন নাযিল হচ্ছে না (যার মধ্যে হুকুম থাকবে) , কিন্তু যখন একটি সুস্পষ্ট অর্থবোধক সূরা নাযিল করা হলো যাতে যুদ্ধের উল্লেখ ছিল তখন তোমরা দেখলে যাদের মনে রোগ ছিল তারা তোমাদের দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছে যেন কাউকে মৃত্যু আচ্ছন্ন করে ফেলেছে ৷ বিশেষ করে ওহুদ যুদ্ধের সময় এসব দুর্বলতা প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছিল ৷ সূরা আলে ইমরানের ১৩ থেকে ১৭ রুকূ' পর্যন্ত একাধারে এ বিষয়ের প্রতিই ইংগিত দেয়া হয়েছে ৷

এ আয়াতগুলোতে যেসব দুর্বলতার সমালোচনা করা হয়েছে আয়াতগুলোর শানে নুযূল বর্ণনা প্রসংগে মুফাস্সিরগণ তার বিভিন্ন ধরন ও প্রকৃতি বর্ণনা করেছেন ৷ ইবনে আব্বাস বলেনঃ মুলমানদের মধ্যে কিছু লোক ছিল যারা জিহাদ ফরয হওয়ার পূর্বে বলতঃ হায়! আল্লাহ তা'আলার কাছে যে কাজটি সবচেয়ে বেশী প্রিয় তা যদি আমরা জানতাম তাহলে তাই করতাম ৷ কিন্তু যখন বলে দেয়া হলো, যে সেই কাজটি হলো জিহাদ, তখন নিজেদের কথা রক্ষা করা তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ল ৷ মুকাতিল ইবনে হাইয়ান বলেনঃ ওহুদের যুদ্ধে এসব লোক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হলে তারা নবীকে(সা) ফেলে রেখে জান নিয়ে পালিয়েছিল ৷ ইবনে যায়েদ বলেনঃ বহু লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এই মর্মে আশ্বাস দিত যে, আপনাকে যদি শত্রুর মুখোমুখি হতে হয় তাহলে আমরা আপনার সাথে থাকব ৷ কিন্তু শত্রুর সাথে মুখোমুখি হওয়ার সময় আসলে তাদের ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি মিথ্যা প্রমাণিত হত ৷ কাতাদা এবং দাহহাক বলেনঃ কোন কোন লোক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করত ঠিকই, কিন্তু তারা কোন কাজই করত না ৷ কিন্তু যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে বড় গলায় বলতঃ আমি এভাবে লড়াই করেছি, আমি এভাবে হত্যা করেছি ৷ এ আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা'আলা এই প্রকৃতির লোকদের তিরষ্কার করেছেন ৷
৩. এর দ্বারা প্রথমত জানা গেল যে, কেবল সেই ঈমানদারই আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জনে সফল হয় যারা তাঁর পথে মরণপণ করে কাজ করতে এবং বিপদ আপদ মাথা পেতে নিতে প্রস্তুত থাকে ৷ দ্বিতীয়ত, জানা গেল যে, আল্লাহ যে সেনাদলকে পছন্দ করেন তার মধ্যে তিনটি গুণ থাকা আবশ্যক ৷ এক, তারা বুঝে শুনে ভালভাবে চিন্তা-ভাবনা করে আল্লাহর পথে লড়াই করবে এবং এমন কোন পথে লড়াই করবে না যা ফী সাবীলিল্লাহ, অর্থাৎ আল্লাহর পথের সংজ্ঞায় পড়ে না ৷ দুই, তারা বিচ্ছিন্নতা ও শৃঙ্খলাহীনতার শিকার হবে না, বরং মজবুত সংগঠন সুসংহত অবস্থায় কাতারবন্দী বা সুশৃঙ্খল হয়ে লড়াই করবে ৷ তিন, শত্রুর বিরুদ্ধে তার অবস্থা হবে, "সুদৃঢ় দেয়ালের" মত ৷ এই শেষ গুণটি আবার অর্থের দিক থেকে অত্যন্ত ব্যাপক ৷ যুদ্ধের ময়দানে কোন সেনাবাহিনীই ততক্ষণ পর্যন্ত সুদৃঢ় দেয়ালের মত দুর্ভেদ্য হয়ে দাঁড়াতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত তার মধ্যে নিম্নবর্ণিত গুণাবলী সৃষ্টি না হবেঃ

-আকীদা-বিশ্বাস এবং উদ্দেশ্য ও লক্ষের মধ্যে পূর্ণ ঐক্য ৷ এ গুণটিই কোন সেনাবাহিনীর প্রতিটি সৈনিক অফিসারকে পূর্ণরূপে ঐক্যবদ্ধ করে ৷

-পরস্পরের নিষ্ঠা ও ঐকান্তিকতার ওপর আস্থা ৷ প্রকৃতপক্ষে সবাই নিজ নিজ উদ্দেশ্য ও লক্ষে নিষ্ঠাবান এবং অসদুদ্দেশ্যে থেকে মুক্ত না হলে এ গুণ সৃষ্টি হতে পারে না ৷ আর এ গুণটি যদি সৃষ্টি না হয় তাহলে যুদ্ধের মত কঠিন পরীক্ষা কারো কোন দোষ-ত্রুটি গোপন থাকতে দেয় না ৷ আর আস্থা নষ্ট হয়ে গেলে সেনাবাহিনীর প্রতিটি সদস্য পরস্পরের ওপর নির্ভর করার পরিবর্তে একে অপরকে সন্দেহ করতে শুরু করে ৷

- নৈতিক চরিত্রের একটি উন্নত মান থাকতে হবে ৷ সেনাবাহিনীর অফিসার এবং সাধারণ সৈনিক যদি সেই মানের নীচে চলে যায় তাহলে তাদের মনে পরস্পরের প্রতি ভালবাসা ও সম্মানবোধ সৃষ্টি হতে পারে না ৷ তারা পারস্পরিক কোন্দাল ও দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ থেকেও রক্ষা পেতে পারে না ৷

-উদ্দেশ্য ও লক্ষের প্রতি এমন অনুরাগ ও ভালবাসা এবং তা অর্জনের জন্য এমন দৃঢ় সংকল্প থাকা চাই যা গোটা বাহিনীর মধ্যে জীবনপাত করার অদম্য আকাংখা সৃষ্টি করে দেবে আর যুদ্ধের ময়দানে তা প্রকৃতই মজবুত দেয়ালের মত দাঁড়িয়ে থাকবে ৷

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নেতৃত্বের যে শক্তিশালী সামরিক সংগঠনটি গড়ে উঠেছিল, যার সাথে সংঘর্ষে বড় বড় শক্তি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী কোন শক্তি যার মোকাবিলায় দাঁড়াতে পারেনি এ সব গুণ ও বৈশিষ্ট ছিল তার ভিত্তি ৷
৪. At several places in the Qur'an details have been given of how the Israelites in spite of acknowledging the Prophet Moses as a Prophet of God and their own benefactor maligned him and proved disloyal to him. For this see Al Baqarah: 51,55,60, 67-71 An-Nisa': 153; AI-Ma'idah: 20-26; AI-A'raf: 138-141; 148-151; Ta Ha: 86-98. In the Bible too, the Jewish history written by the Jews themselves is replete with such events; for instance, sec Exodus, 5: 20-21, 14: 11- 12, 16: 2-3, 17: 3-4; Numbers, 11: 1-15, 14: 1-10, ch.l6, 20: 1-5. Here, allusion to these events is meant to warn the Muslims that they should not adopt the same attitude towards their Prophet as the Israelites had adopted towards their Prophet: otherwise they would meet the same fate as was met by the Israelites.
৫. অর্থাৎ যেসব মানুষ ইচ্ছা করে বাঁকা পথে চলতে চায় অথবা তাদেরকে সোজা পথে চালান এবং যারা আল্লাহর নাফরমানী করার জন্য বদ্ধপরিকর তাদেরকে জোর করে হিদায়াত দান করা আল্লাহর নিয়ম বা রীতি নয় ৷ এর দ্বারা একথা আপনা থেকেই স্পষ্ট হয়ে গেল যে, কোন ব্যক্তি বা জাতির গোমরাহীর সূচনা আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয় না বরং স্বয়ং সেই ব্যক্তি বা জাতির পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে ৷ তবে এ ক্ষেত্রে আল্লাহর নিয়ম বা বিধান হলো, যারা গোমরাহীকে গ্রহণ করে তিনি তাদের জন্য সঠিক পথে চলার উপায় -উপকরণ নয়, বরং গোমরাহীর উপায় -উপকরণেই সরবরাহ করেন যাতে যেসব পথে তারা নিজেদেরকে নিয়ে যেতে চায় সেসব পথে যেন অবাধে যেতে পারে ৷ আল্লাহ তো মানুষকে বাছাই করে নেয়ার স্বাধীনতা (Freedom of choice) দিয়েছেন ৷ এরপর এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রতিটি মানুষের বা মানুষের দলও গোষ্ঠীর নিজের কাজ যে, তারা তাদের রবের আনুগত্য করবে কি করবে না এবং সঠিক পথ গ্রহণ করবে না বাঁকা পথের কোন একটিতে চলবে ৷ এই বাছাই ও গ্রহণ-বর্জনের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে কোন জবরদস্তি নেই ৷ কেউ যদি আনুগত্য ও হিদায়াতের পথ বেছে নেয় তাহলে আল্লাহ তা'আলা তাকে জোর করে গোমরাহী ও নাফরমানীর পথে ঠেলে দেন না ৷ আর কেউ যদি নাফরমানী করা এবং সঠিক পথ অনুসরণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে তাহলে তাকে জোর করে আনুগত্য ও হিদায়াতের পথে নিয়ে আসাও আল্লাহর নিয়ম নয় ৷ কিন্তু এটাও একটি বাস্তব ব্যাপার যে, কেউ নিজের জন্য যে পথই বেচে নিক না কেন সে পথে চলার জন্য উপায়-উপকরণ আল্লাহ তা'আলা যতক্ষণ সরবরাহ না করেন এবং অনুকূল অবস্থা ও পরিবেশ -পরিস্থিতি সৃষ্টি না করেন ততক্ষণ পর্যন্ত সে ঐ পথে কার্যত এক পাও অগ্রসর হতে পারে না ৷ এটাই হলো আল্লাহর দেয়া তাওফীক বা আনুকূল্য যার ওপর মানুষের প্রতিটি চেষ্টা -সাধনা ফলপ্রসূত হওয়া নির্ভর করে ৷ কিন্তু কোন ব্যক্তি যদি ভাল কাজের তাওফীক আদৌ না চায় বরং উল্টা মন্দ ও পাপ কাজের তাওফীক চায় তাহলে সে তাই লাভ করবে ৷ আর যখন সে মন্দ ও পাপ কাজের তাওফীক লাভ করে তখন তার মন-মানসিকতার গোটা ছাঁচ এবং চেষ্টা -সাধনা ও কাজকর্মের পথও বাঁকা হয়ে যেতে থাকে ৷ এমন কি ভাল ও কল্যাণকে গ্রহণ করার ক্ষমতা ও যোগ্যতা ধীরে ধীরে তার মধ্যে থেকে নিঃশেষ হয়ে যায় ৷ "তারা বাঁকা পথ ধরলে আল্লাহও তাদের দিল বাঁকা করে দিলেন" কথাটির অর্থ এটাই ৷ এ অবস্থায় যে ব্যক্তি নিজে গোমরাহী কামনা করে গোমরাহীর জন্য তৎপর থাকে এবং গোমরাহীতে নিমজ্জিত থেকে অধিকতর গোমরাহীর দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য সমস্ত চিন্তা-ভাবনা ও চেষ্টা -সাধনা নিয়োজিত করে তাকে জোর করে হিদায়াতের দিকে ফিরিয়ে দেয়া আল্লাহর আইন ও নিয়ম-নীতির পরিপন্থী ব্যাপার ৷ কারণ যে পরীক্ষার জন্য মানুষকে দুনিয়ায় বাছাইয়ের স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে এরূপ কাজ সেই উদ্দেশ্য লক্ষকেই নস্যাত করে দেবে ৷ আর এভাবে হিদায়াত লাভ করে মানুষ সঠিক পথে চললেও সে জন্য তার কোন প্রকার বিনিময় বা উত্তম প্রতিদান লাভের উপযুক্ত বিবেচিত হওয়ারও যুক্তিসংগত কোন কারণ নেই ৷ এ ক্ষেত্রে তো বরং যে ব্যক্তি বাধ্যতামূলক হিদায়াত লাভ করেনি এবং গোমরাহীর মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে তারাও কোন প্রকার শাস্তি লাভ না করা উচিত ৷ কারণ এমতাবস্থায় তার গোমরাহীর মধ্য থেকে যাওয়ার সমস্ত দায়-দায়িত্ব আল্লাহর উপরই বর্তায় ৷ সে বরং আখেরাতে জবাবদিহির সময় এ যুক্তি পেশ করতে পারে যে, আপনার কাছে বাধ্যতামূলকভাবে হিদায়াত দান করার ব্যবস্থা যখন ছিল তখন আপনি আমাকে এই কৃপা থেকে বঞ্চিত রেখেছিলেন কেন?'আল্লাহ তা'আলা ফাসেকদের হিদায়াত দান করেন না' বাণীটির তাৎপর্য এটাই ৷ অর্থাৎ যেসব মানুষ নিজেরাই তাদের জন্য গোনাহ ও নাফরমানীর পথ বেছে নিয়েছি তিনি তাদেরকে আনুগত্যের পথে চলার 'তাওফীক' দেন না ৷
৬. এটা বনী ইসরাঈল জাতির দ্বিতীয়বারের নাফরমানীর কথা ৷ তারা একটি নাফরমানী করেছিল তাদের উত্থান যুগের শুরুতে ৷ আর এটি হলো তাদের দ্বিতীয় নাফরমানী যা তারা এই যুগেরই শেষ দিকে , সর্বশেষ পর্যায়ে করেছিলেন ৷ এরপর চিরদিনের জন্য তাদের ওপর আল্লাহর গযব নাযিল হলো ৷ এ দুটি ঘটনা বর্ণনা করার উদ্দেশ্য হলো মুসলমানদেরকে আল্লাহর রসূলের সাথে বনী ইসরাঈলের মত আচরণ করার পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়া ৷
৭. এই আয়াতাংশের তিনটি অর্থ ৷ আর এ তিনটি অর্থই যথাযথ ও সঠিক ৷

এর একটি অর্থ হলো , আমি কোন স্বতন্ত্র এবং অভিনব দীন বা জীবন বিধান নিয়ে আসিনি ৷ বরং হযরত মূসা, আলাইহিস সালাম যে দীন এনেছিলেন আমিও সেই দীন এনেছি ৷ আমি তাওরাতকে রহিত বা বাতিল করতে আসিনি বরং তার সত্যতা প্রতিপাদনকারী হিসেবে এসেছি ৷ আল্লাহর রসূলগণ যেমন চিরদিনই তাদের পূর্বের নবী-রসূলদের সত্য হওয়ার কথা ঘোষণা করে এসেছেন আমিও তেমনি পূর্ববর্তী নবী-রসূলদের সত্যতা ঘোষণা করছি ৷ তাই আমার রিসালাত মেনে নিতে দ্বিধা -সংকোচ করার কোন কারণ তোমাদের জন্য নেই ৷

দ্বিতীয় অর্থ হলো, আমার আগমণ সম্পর্কে তাওরাতে যেসব সুসংবাদ বিদ্যমান আমি তার বাস্তব রূপ ৷ তাই তোমাদের কর্তব্য আমার বিরোধিতা না করে এই ভেবে স্বাগত জানান যে, পূর্ববর্তী নবীগণ যার আগমনের সুসংবাদ আগে দিয়েছিলেন তিনি এখন এসে গিয়েছেন ৷

আর এই আয়াতাংশই পরবর্তী আয়াতাংশের সাথে মিলিয়ে পড়লে তৃতীয় আরেকটি অর্থ দাঁড়ায় এই যে, তাওরাতে আল্লাহর রসূল আহমাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর আগমনের সুসংবাদ দিচ্ছি ৷ এই তৃতীয় অর্থ অনুসারে হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের এই বাণী রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে হযরত মুসা আলাইহিস সালামের দেয়া সেই সুসংবাদের প্রতি ইংগিত যা তিনি তাঁর কওমের সামনে ভাষণ দেয়ার সময় বলেছিলেন ৷ সেই ভাষনে তিনি বলেছিলেনঃ

"তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু তোমার মধ্য হইতে , তোমরা ভ্রাতৃগণের মধ্যে হইতে, তোমার জন্য আমার সদৃশ এক ভাববাদী উৎপন্ন করিবেন ৷ তাঁহারই কথায় তোমার কর্ণপাত করিবে ৷ কেননা হোরেবে সমাজের (সমাবেশ) দিবসে তুমি আপন ঈশ্বর সদাপ্রভুর কাছে এই প্রার্থনাই তো করিয়াছিলে, যথা আমি যেন আপন ইশ্বর সদাপ্রভুর রব পুনর্ব্বার শুনিতে ও এই মহাগ্নি আর দেখিতে না পাই, পাছে আমি মারা পড়ি ৷ তখন সদাপ্রভু আমাকে কহিলেন , উহারা ভালই বলিয়াছে ৷ আমি উহাদের জন্য উহাদের ভ্রাতৃগণের মধ্য হইতে তোমার সদৃশ এক ভাববাদী উৎপন্ন করিব, ও তাহার মুখে আমার বাক্য দিব; আর আমি তাহাকে যাহা যাহা আজ্ঞা করিব, তাহা তিনি উহাদিগকে বলিবেন ৷ আর আমার নামে তিনি আমার যে সকল বাক্য বলিবেন, তাহাতে যে কেহ কর্ণপাত না করিবে, তাহার কাছে আমি পরিশোধ লইব ৷ "(দ্বিতীয় বিবরণ , অধ্যায় ১৮: শ্লোক-১৫ থেকে ১৯)

এটা তাওরাতের এমন একটি স্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী যা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাড়া আর কারো ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে না ৷ এ ভাষনে হযরত মূসা (আ) তাঁর কওমকে আল্লাহ তা'আলার এ বাণী শুনাচ্ছেন যে, আমি তোমার জন্য তোমার ভাইদের মধ্য থেকে একজনকে নবী করে পাঠাবো ৷ একথা সবার কাছেই স্পষ্ট যে, কোন কওমের 'ভাই' কথার অর্থ ঐ কওমেরই কোন গোত্র বা খান্দান হতে পারে না ৷ বরং তার অর্থ কেবল এমন কোন জাতিই হতে পারে যার সাথে তার বংশগত নিকট সম্পর্ক বিদ্যমান ৷ এর অর্থ যদি খোদ বনী ইসরাঈলের মধ্য থেকেই কোন নবীর আগমণ হতো তাহলে তার ভাষা হতো, আমি তোমাদের জন্য তোমাদের নিজেদের মধ্য থেকেই একজনকে নবী করে পাঠাব ৷ অতএব বনী ইসরাঈলের ভাই অর্থ অনিবার্যভাবে হযরত ইসমাঈলের বংশধরগণই হতে পারে ৷ আর হযরত ইবরাহীমের সন্তান হওয়ার কারণে হযরত ইসমাঈল ও তাঁর বংশধরগণ তাদের বংশগত আত্মীয় হিসেবে গণ্য ৷ তাছাড়া বনী ইসরাঈলের কোন নবী এই ভবিষ্যদ্বানীর বাস্তব রূপ হতে পারেন না ৷ এর আরো একটি কারণ এই যে, হযরত মুসার পরে বনী ইসরাঈলের মধ্য কোন একজন নবী নয় বরং বহু সংখ্যক নবী এসেছেন বাইবেলে যার ভুরি ভুরি বর্ণনা রয়েছে ৷

এই ভবিষ্যদ্বানীতে দ্বিতীয় যে কথাটি বলা হয়েছে তাহলো, যাকে নবী বানিয়ে পাঠান হবে তিনি হবেন হযরত মূসার মত ৷ এ কথাই স্পষ্ট যে, এর অর্থ আকার -আকৃতি এবং জীবনের ঘটনাবলীর সাথে সাদৃশ্য মোটেই নয় ৷ কারণ এ দিক দিয়ে বিচার করলে কোন ব্যক্তিই অপর কোন ব্যক্তির মত হয়না ৷ আবার এর দ্বারা শুধু নবুওয়াতের গুণাবলীর দিক দিয়ে সাদৃশ্য বুঝায় না ৷ কারণ হযরত মুসার পরে যত নবীর আগমণ ঘটেছে তাদের সবারই নবীসুলভ গুণাবলী ছিল এক অভিন্ন ৷ তাই কোন একজন নবীর এরূপ বৈশিষ্ট হতে পারে না যে, তিনি এই গুণের ক্ষেত্রে তার অনুরূপ হবেন ৷ তাই এ দুটি দিক দিয়ে সাদৃশ্য বাদ পড়ার পর অপর কোন সাদৃশ্য দ্বারা যদি আগমণকারী নবীকে নির্দিষ্ট ও চিহ্নিত করা বোধগম্য হতে পারে তবে সেই সাদৃশ্য এ ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না যে, আগমনকারী নবী একটি স্বতন্ত্র শরীয়াত নিয়ে আসবেন ৷ একমাত্র এদিক দিয়েই তিনি হতে পারেন হযরত মূসার অনুরূপ ৷ আর এ বৈশিষ্ট হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাড়া তিনি অন্য কোন নবীর মধ্যে নেই ৷ কারণ তাঁর আগে বনী ইসরাঈলের মধ্যে যত নবীই এসছেন তাঁরা ছিলেন হযরত মুসার শরীয়াতের অনুসারী ৷ তাদের কেউ-ই স্বতন্ত্র কোন শরীয়াত নিয়ে আসেননি ৷ ভবিষ্যদ্বানী নিম্নবর্ণিত বক্তব্য দ্বারা এ ব্যাখ্যা আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠেঃ

" এটা তোমার (অর্থাৎ বনী ইসরাঈলের ) সেই প্রার্থনা অনুসারে হবে যা তুমি আপন ঈশ্ব সদাপ্রভুর কাছে সমাবেশের দিন হোরেবে করেছিলে, যেন আমি আপন ঈশ্বর সদাপ্রভুর রব পুনর্বার শুনিতে এবং এই মহাগ্নি আর দেখতে না পাই আমি মারা পড়ি ৷ তখন সদাপ্রভু আমাকে বললেন, তারা ভালই বলেছে ৷ আমি তাদের জন্য তাদের ভ্রাতৃগনের মধ্যে থেকে তোমার সদৃশ এক ভাববাদী উৎপন্ন করবো ও তার মুখে আমার বাক্য দিব" ৷

এই বাক্যটির মধ্যে উল্লেখিত হোরেব অর্থ সেই পাহাড় হযরত মূসাকে প্রথমবার যেখানে শরীয়াতের আহকাম বা বিধিবিধান দেয়া হয়েছিল ৷ আর এর মধ্যে বনী ইসরাঈলদের যে প্রার্থনার কথা বলা হয়েছে তার অর্থ হলো, ভবিষ্যতে যদি আমাদেরকে কোন শরীয়াত দেয়া হয় তাহলে যেন সেই ভীতিকর অবস্থার মধ্যে না দেয়া হয়, যা শরীয়াত দেয়ার সময় হোরেব পাহাড়ের পাদদেশে সৃষ্টি করা হয়েছিল ৷ কুরআন মজীদ ও বাইবেল উভয় গ্রন্থে সেই সব অবস্থার উল্লেখ বিদ্যামান ৷ (দেখুন, সূরা আল বাকারাহ, আয়াত ৫৫, ৫৬, ৬৩; আল আরাফ, আয়াত ১৫৫ ১৭১; বাইবেল যাত্রাপুস্তক ১৯:১৭, ১৮; ) এর জবাবে হযরত মুসা বনী ইসরাঈলকে বলেছেনঃ আল্লাহ তোমাদের এ প্রার্থনা কবুল করেছেন ৷ তিনি বলেছেনঃ আমি তাদের জন্য এমন একজন নবী পাঠাবো, যার মুখে আমার কথা দিব ৷ অর্থাৎ হোরেব পাহাড়ের পাদদেশে যে ভয়ঙ্কর অবস্থার সৃষ্টি করা হয়েছিল পরবর্তী শরীয়াত দেয়ার সময় সেই অবস্থার সৃষ্টি করা হবে না ৷ বরং এর পরে যে নবীকে এই পদমর্যাদায় অভিষিক্ত করা হবে তার মুখে আল্লাহর বাণী দিয়ে দেয়া হবে এবং তিনি আল্লাহর বান্দাদের তা শুনিয়ে দেবেন ৷ এই স্পষ্ট কথাগুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা ও বিচার-বিবেচানার পর এ ব্যাপারে কি কোন সন্দেহ থাকে যে, এ বাণীর বাস্তব রূপ হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাড়া অন্য কেউ নয়? হযরত মূসার পরে স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ শরীয়াত কেবল তাকেই দেয়া হয়েছে ৷ হোরেব পাহাড়ের পাদদেশে বনী ইসরাঈলের যেমন সমাবেশ হয়েছিল তাকে শরীয়াত দেয়ার সময় এমন কোন সমাবেশ হয়নি এবং শরিয়াতের বিধিবিধান দেয়ার সময় কোন ক্ষেত্রেই সেইরূপ অবস্থার সৃষ্টি করা হয়নি যা সেখানে করা হয়েছিল ৷
৮. এটি কুরআন মজীদের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত ৷ ইসলাম বিরোধীরা এ আয়াত নিয়ে যেমন অনেক অপপ্রচার চালিয়েছে তেমনি জঘন্যতম বিশ্বাসঘাতকতার অপরাধও করেছে ৷ কারণ এ আয়াতে বলা হয়েছে যে, হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম স্পষ্টভাবে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম উল্লেখ করে তাঁর আগমণের সুসংবাদ দিয়েছিলেন ৷ তাই বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা আবশ্যক ৷

একঃ এতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র নাম বলা হয়েছে 'আহমাদ' ৷ আহমাদ শব্দের দু'টি অর্থ ৷ এক, আল্লাহর সর্বাধিক প্রশংসাকারী ৷ দুই, সবচেয়ে বেশী প্রশংসিত অথবা আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশী প্রশংসার যোগ্য ৷ সহীহ হাদীসসমূহ থেকে প্রমাণিত যে এটি ছিল নবী সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লামের একটি নাম ৷ মুসলিম ও আবু দাউদ তায়ালিসীতে হযরত আবু মুসা আশ'আরী (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী (সা) বলেছেনঃ"আমি মুহাম্মাদ, আমি আহমাদ, এবং আমি সমবেতকারী………………. হযরত যুবাইর ইবনে মুতয়িম থেকে ইমাম মালেক , বুখারী , মুসলিম, দরেমী, তিরমিযী এবং নাসায়ী একই বক্তব্য সম্বলিত অনেকগুলো হাদীস উদ্ধৃত করেছেন ৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই নামটি সাহাবীদের মধ্যেও পরিচিত ছিল ৷ হযরত হাসসান ইবনে সাবেতের কবিতার একটি ছত্রে বলা হয়েছেঃ

------------------

"মহান আল্লাহ, তাঁর আরশের চারপাশে সমবেত ফেরেশতারা এবং সব পবিত্র সত্তা বরকত ও কল্যানময় আহমাদের ওপর দরুদ পাঠিয়েছেন" ৷

এ বিষয়টি ইতিহাস থেকে প্রমাণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লামের নাম শুধু মুহাম্মাদ ছিল না বরং আহমাদও ছিল ৷ আরবদের গোটা সাহিত্যে কোথাও এ কথার উল্লেখ নেই, নবীর(সা) পূর্বে কারো নাম আহমাদ রাখা হয়েছিল ৷ কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরে এত অধিক সংখ্যক লোকের নাম আহমাদ ও গোলাম আহমাদ রাখা হয়েছে যে, তা হিসেব করাও অসম্ভব ৷ এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কি হতে পারে যে, নবুওয়াতের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত সমগ্র উম্মাতের মধ্যে তাঁর এই পবিত্র নামটি সুপরিচিত ও সুবিদিত ৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নাম যদি আহমাদ না হয়ে থাকে তাহলে যারা তাদের ছেলেদের নাম গোলাম আহমাদ রেখেছে তারা তাদের ছেলেদেরকে কোন আহমাদের গোলাম হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল?

দুইঃ যোহন লিখিত সুসমাচারে সাক্ষ দেয় যে, হযরত ঈসা মাসীহর আগমনের সময় বনী ইসরাঈল জাতি তিনজন মহাব্যক্তিত্বের আগমনের অপেক্ষায় ছিল ৷ এক, মাসীহ, দুই, এলিয় (অর্থাৎ হযরত ইলিয়াসের পুনরায় আগমন) এবং তিন, "সেই নবী" ৷ যোহনের সুসমাচারের ভাষা হলোঃ

"আর যোহনের (ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম) সাক্ষ এই, -যখন যিহুদিগণ কয়েকজন যাজক লেবীয়কে দিয়া যিরূশালেম হইতে তাঁহার কাছে এই কথা জিজ্ঞেস করিয়া পাঠাইল, 'আপনি কে?'তখন তিনি স্বীকার করিলেন, অস্বীকার করিলেন, না; তিনি স্বীকার করিলেন যে, আমি সেই খ্রীষ্ট নই ৷ তাহারা তাঁহাকে জিজ্ঞেস করিল, তবে কি? আপনি কি এলিয়? তিনি বললেন আমি নই ৷ আপনি কি সেই ভাববাদী?তিনি উত্তর করিলেন না ৷ তখন তাহারা তাহাকে কহিল, আপনি কে? যাহারা আমাদিগকে পাঠাইয়াছেন, তাহাদিগকে যেন উত্তর দিতে পারি ৷ আপনার বিষয়ে আপনি কি বলেন? তিনি কহিলেন, আমি "প্রান্তরে এক জনের রব, যে ঘোষণা করিতেছে, তোমারা প্রভুর পথ সরল কর" …………………তাহারা তাঁহাকে জিজ্ঞেস করিল, আপনি যদি সেই খ্রীষ্ট নহেন, এলিয়ও নহেন, সেই ভাববাদীও নহেন তবে বাপ্তাইজ করিতেছেন কেন? (অধ্যায় -১,পদ ১৯ থেকে ২৫)

এসব কথা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, বনী ইসরাঈল হযরত ঈসা মাসীহ এবং হযরত ইলিয়াস ছাড়াও আরো একজন নবীর আগমণের প্রতীক্ষায় ছিল ৷ হযরত ইয়াহইয়া সেই নবী ছিলেন না ৷ সেই নবীর আগমণ সম্পর্কে আকীদা-বিশ্বাস বনী ইসরাঈল জাতির মধ্যে এতটা প্রসিদ্ধ ও সর্বজনবিদিত ছিল যে, তাঁকে বুঝানোর জন্য সেই নবী কথাটা বলাই যেন যথেষ্ট ছিল ৷ পুনরায় একথা বলার আর প্রয়োজনই হতো না যে, তাওরাতের যার সুসংবাদ দেয়া হয়েছে ৷ তাছাড়া এসব কথা থেকে এও জানা গেল যে, তিনি যে নবীর প্রতি ইংগিত করেছিলেন তাঁর আগমনের বিষয়টি অকাট্যভাবে প্রমাণিত ছিল ৷ কেননা, হযরত ইয়াইহিয়াকে যখন বিভিন্নভাবে প্রশ্ন করা হলো, তখন তিনি একথা বলেননি যে, তোমরা কোন নবী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছ, আর কোন নবী তো আসবেন না?

তিনঃ এবার সেই সব ভবিষ্যদ্বাণীর প্রতি একটু লক্ষ করুন যা যোহনের সুসমাচারের ১৪ থেকে ১৬ পর্যন্ত অধ্যায়ে একাধারে উদ্ধৃত হয়েছেঃ

" আর আমি পিতার নিকট নিবেদন করিব, এবং তিনি আর এক সহায় তোমাদিগকে দিবেন, যেন তিনি চিরকাল তোমাদের সঙ্গে থাকেন; তিনি সত্যের আত্মা; জগত তাঁহাকে গ্রহণ করিতে পারে না; কেননা সে তাঁহাকে দেখেনা, তাঁহাকে জানেও না; তোমরা তাঁহাকে জান, কারণ তিনি তোমাদের নিকটে অবস্থিতি করেন ও তোমাদের অন্তরে থাকিবেন" (১৪:১৬, ১৭)

"তোমাদের নিকটে থাকিতে থাকিতেই আমি এইসকল কথা কহিলাম ৷ কিন্তু সেই সহায়, পবিত্র আত্মা, যাঁহাকে পিতা আমার নামে পাঠাইয়া দিবেন, তিনি সকল বিষয়ে তোমাদিগকে শিক্ষা দিবেন, এবং আমি তোমাদিগকে যাহা যাহা বলিয়াছি, সে সকল স্মরণ করাইয়া দিবেন" ৷ (১৪:২৫, ২৬) ৷

"এর পর আমি তোমাদের সহিত আর অধিক করা বলিব না; করণ জগতের অধিপতি আসিতেছে , আর আমাতে তাহার কিছুই নাই ৷ "(১৪: ৩০)

"যাঁহাকে আমি পিতার নিকট হইতে তোমাদের কাছে পাঠাইয়া দিব, সত্যের সেই আত্মা, যিনি পিতার নিকট হইতে বাহির হইয়া আইসেন-যখন সেই সহায় আসিবেন -তিনিই আমার বিষয়ে সাক্ষ্য দিবেন ৷ "(১৫:২৬) ৷

"তথাপি আমি তোমাদিগকে সত্য বলিতেছি, আমার যাওয়া তোমাদের পক্ষে ভাল, কারণ আমি না গেলে সেই সহায় তোমাদের নিকটে আসিবেন না ৷ কিন্তু আমি যদি যাই, তবে তোমাদের নিকটে তাঁহাকে পাঠাইয়া দিব ৷ " (১৬: ৭) ৷

"তোমাদিগকে বলিবার আমার আরও অনেক কথা আছে, কিন্তু তোমরা এখন সে সকল সহ্য করিতে পার না ৷ পরন্তু তিনি, সত্যের আত্মা, যখন আসিবেন তখন পথ দেখাইয়া তোমাদিগকে সমস্ত সত্যে লইয়া যাইবেন; কারণ তিনি আপনা হইতে কিছু বলিবেন না কিন্তু যাহা শুনেন, তাহাই বলিবেন, এবং আগামী ঘটনাও তোমাদিগকে জানাইবেন ৷ তিনি আমাকে মহিমান্বিত করিবেন; কেননা যাহা আমার , তাহাই লইয়া তোমাদিগকে জানাইবেন ৷ পিতার যাহা যাহা আছে সকলই আমার; এই জন্য বলিলাম , যাহা আমার , তিনি তাহাই লইয়া থাকেন, ও তোমাদিগকে জানাবেইন ৷ "(১৬: ১২-১৫) ৷

চারঃ বাইবেলের এসব উদ্বৃতির সঠিক অর্থ নিরূপণের জন্য সর্বপ্রথম জানা দরকার যে, হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম এবং তাঁর সমকালীন ফিলিস্তিনবাসীদের ভাষা ছিল আরামীয় ভাষায় সেই কথ্য রূপ যাকে সুরিয়ানী ( প্রাচীন সিরীয় ভাষা ) বলা হয় ৷ ঈসা আলাইহিস সালামের জন্মের দুই আড়াই শত বছর পূর্বেই সালুকী (Seleucide) শাসন আমলে এ অঞ্চল থেকে ইব্রিয় বা হিব্রু ভাষা বিদায় নিয়েছিল এবং সুরিয়ানী ভাষা তার স্থান দখল করেছিল ৷ যদিও প্রথমে সালুকী এবং পরে রোমান সাম্রাজ্যের প্রভাবে গ্রীক ভাষাও এ অঞ্চলে পৌছেছিল কিন্তু যে শ্রেণীটি সরকার ও রাজদরবারে স্থান করে নিয়েছিল কিংবা স্থান করে নেয়ার জন্য গ্রীক ভাবধারা পন্থী হয়ে গিয়েছিল কেবল তাদের মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ ছিল ৷ ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষ সুরিয়ানী ভাষার একটি বিশেষ কথ্য রূপ (Dialect) ব্যবহার করত, যার ধ্বনি, কথনভঙ্গি, উচ্চরণরীতি, এবং বাকধারা দামেশক অঞ্চলে প্রচলিত সুরিয়ানী ভাষারূপ থেকে ভিন্ন ছিল এবং এ দেশের সাধারণ মানুষ গ্রীক ভাষার সাথে এতটা অপরিচিত ছিল যে, ৭০ খৃস্টাব্দে যিরুশালেম দখলের পর রোমান জেনারেল টিটুস (Titus) যিরুশালেমের অধিবাসীদের সামনে গ্রীক ভাষায় বক্তৃতা করলে তা সুরিয়ানী ভাষায় অনুবাদ করতে হয়েছিল ৷ এ থেকে আপনা আপনি প্রমাণিত হয় যে, হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম তাঁর শাগরিদদের যা বলেছিলের তা অবশ্যই সুরিয়ানী ভাষায় হবে ৷

দ্বিতীয় যে, বিষয়টি জানা জরুরী তা এই যে, বাইবেলের চারটি পুস্তক বা সুসমাচারই সেই সব গ্রীক ভাষাভাষী খৃস্টানদের লেখা যারা হযরত ঈসার পর এ ধর্ম গ্রহণ করেছিল ৷ হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের বাণী ও কাজকর্মের বিস্তারিত বিবরণ তাদের কাছে সুরিয়ানী ভাষী কোন খৃস্টানদের মাধ্যমে লিখিত আকারে নয় বরং মৌখিক বর্ণনার আকারে পৌছেছিল এবং সুরিয়ানী ভাষার এই বর্ণনাসমূহকে তারা নিজেদের ভাষায় অনুবাদ করে লিপিবদ্ধ করেছিল ৷ এসব পুস্তক বা সুসমাচারের কোনটিই ৭০ খৃস্টাব্দের পূর্বে লিখিত নয় ৷ আর যোহন লিখিত সুসমাচার তো হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের একশত বছর পরে সম্ভবত এশিয়া মাইনরের এফসুস শহরে বসে লেখা ৷ তাছাড়াও গ্রীক ভাষায় সর্বপ্রথম লিখিত সুসমাচারের মূল কোন কপিও সংরক্ষিত নাই ৷ মুদ্রণযন্ত্র আবিস্কারের পূর্বে গ্রীক ভাষায় লিখিত যেসব পাণ্ডুলিপি বিভিন্ন জায়গা থেকে খুঁজে খুঁজে এনে একত্রিত করা হয়েছিল তার কোনটিই চতুর্থ শতাব্দির পূর্বের নয় ৷ তাই তিন শতাব্ধীকাল সময়ে এসবের মধ্যে কি কি রদবদল এবং পরিবর্তন -পরিবর্ধন হয়েছে তা বলা মুশকিল ৷ যে জিনিস এ বিষয়টিকে বিশেষভাবে সন্দেহজনক করে তোলে তা হলো, খৃস্টানরা তাদের পছন্দ মাফিক জেনে বুঝে তাদের সুসমাচারের পরিবর্তন ও পরিবর্ধনকে বৈধ মনে করে এসেছে ৷ ইনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকা (১৯৪৬ সনের সংস্কারণে ) এর বাইবেল শীর্ষক প্রবন্ধে প্রবন্ধের রচয়িতা লিখছেনঃ

"বাইবেলের সুসমাচারসমূহে অনেক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বাক্য যা পদকেই অন্য কোন সূত্র থেকে এনে গ্রন্থের মধ্যে শামিল করার মত সুস্পষ্ট পরিবর্তন করা হয়েছে জেনে শুনে…………………. স্পষ্টত উদ্দেশ্যমূলকভাবে এসব পরিবর্তন সাধন করা হয়েছে ৷ তা করেছে এমন সব লোক যারা মূল গ্রন্থে অন্তরভূক্ত করার জন্য কোন জায়গা থেকে কিছু তথ্য লাভ করেছে এবং গ্রন্থকে উন্নত ও অধিক কল্যাণকর বানানোর জন্য নিজের পক্ষ থেকে তার মধ্যে সেই সব তথ্য শামিল করার অধিকারী বলে নিজেদেরকে মনে করেছে…………………এরূপ বহুসংখ্যক সংযোজন দ্বিতীয় শতকেই হয়েছিল ৷ কিন্তু তার উৎস সম্পর্কে জানা যায়নি ৷ "

বর্তমানে বাইবেলের সুসমাচারসমূহে আমরা হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের যেসব বাণী দেখতে পাই তা সম্পূর্ণ নির্ভুল ও সঠিকভাবে উদ্ধৃত হয়েছে এবং তাতে কোন রদবদল ও পরিবর্তন পরিবর্ধন সাধিত হয়নি এমন কথা বলা উপরোক্ত পরিস্থিতির আলোকে নিশ্চিতভাবেই অত্যন্ত কঠিন ৷

তৃতীয় এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মূসলমানদের বিজয়ের পরেও প্রায় তিন শতাব্দীকাল পর্যন্ত ফিলিস্তিনের খৃস্টান অধিবাসীদের ভাষা ছিল সুরিয়ানী এবং খৃস্টীয় নবম শতকে গিয়ে আরবী ভাষা সে স্থান দখল করে ৷ সুরিয়ানী ভাষাভাষী ফিলিস্তিনবাসীদের মাধ্যমে খৃস্টীয় ঐতিহ্য বা ধর্মাচারণ, আচার, -অনুষ্ঠান ও ইতিহাস সম্পর্কে যেসব তথ্য প্রথম তিন শতাব্দীতে মুসলিম মনীষীগণ লাভ করেছিলেন তা সেই সব লোকদের লব্দ তথ্যের তুলনায় অনেক বেশী নির্ভরযোগ্য হওয়া উচিত যা তাদের কাছে সুরিয়ানী থেকে গ্রীক এবং গ্রীক থেকে ল্যাটিক ভাষায় অনুবাদের পর অনুবাদ হয়ে পৌছেছিল ৷ কেননা হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের মুখ থেকে উচ্চারিত মূল সুরিয়ানী শব্দসমূহ মুসলিম মনীষীদের কাছে সংরক্ষিত থাকার সম্ভবনাই বেশী ছিল ৷

পাঁচঃ অনস্বীকার্য এসব ঐতিহাসিক সত্যের প্রতি লক্ষ করে দেখুন ওপরে উদ্ধৃত যোহন লিখিত সুসমাচারের পদগুলোতে হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম এমন একজন আগমনকারীর আগমনের সুসংবাদ দিচ্ছেন যিনি তাঁর পরে আসবেন ৷ তিনি তাঁর সম্পর্কে বলেছেনঃ তিনি হবেন গোটা বিশ্বের নেতা (সরওয়ারে আলম) , চিরকাল থাকবেন , সত্যের সবগুলো পথ দেখাবেন এবং নিজে তাঁর (হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম ) সম্পর্কে সাক্ষ দিবেন ৷ যোহন লিখিত সুসমাচারের এসব বাক্যের মধ্যে "পবিত্র আত্মা"এবং "সত্যের আত্মা" ইত্যাদি কথাগুলো অন্তরভুক্ত করে মূল বিষয় ও বক্তব্যকে বিকৃত করার পুরোপুরি চেষ্টা করা হয়েছে ৷ কিন্তু তা সত্ত্বেও গভীর মনোযোগ সহকারে বাক্যগুলো পড়লে পরিস্কার বুঝা যায় যে, যে আগমনকারীর আগমনের কথা বলা হয়েছে তিনি কোন আত্মা নন বরং মানুষ ৷ তিনি এমন এক বিশিষ্ট বক্তিত্ব যাঁর শিক্ষা হবে বিশ্বজনীন, সর্বব্যাপী এবং কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী সেই বিশেষ ব্যক্তিকে বুঝানোর জন্য বাইবেলের বাংলা অনুবাদের 'সহায়' শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে এবং যোহন লিখিত মূল সুসমাচারের গ্রীক ভাষার যে শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছিল সে ব্যাপারে খৃস্টানদের অনড় দাবী হচ্ছে, যে শব্দটি ছিল Paracletisকিন্তু শব্দটির অর্থ নিরূপণ খোদ খৃস্টান পণ্ডিতগণকে যথেষ্ট জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে ৷ মূল গ্রীক ভাষায় Paracletশব্দটির কয়েকটি অর্থ হয় ৷ কোন স্থানের দিকে ডাকা, সাহায্যের জন্য ডাকা, ভীতি প্রদর্শন করা , সাবধান করা , উৎসাহিত করা , প্ররোচিত করা , আশ্রয় প্রার্থনা করা বা আবেদন নিবেদন করা এবং দোয়া করা ৷ তাছাড়াও গ্রীক বাগবিধি অনুসারে শব্দটির অর্থ হয় সান্ত্বনা দেয়া, পরিতৃপ্ত করা , সাহস যোগানো ৷ বাইবেলের যেসব জায়গায় এ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে সেসব জায়গায় এর কোন একটি অর্থও খাপ খায় না ৷ ওরাইজেন(Origen) কোথাও এর অনুবাদ করেছেন Consolator আবার কোথাও অনুবাদ করেছেন Deprecator ৷ কিন্তু অন্যান্য ব্যাখ্যাকারগণ এ দুটি অনুবাদ প্রত্যাখ্যান করেছেন ৷ কেননা প্রথমত গ্রীক ভাষার ব্যাকারণ অনুসারে এটি শুদ্ধ নয় ৷

দ্বিতীয়ত, সবগুলো বাক্যের যেখানে যেখানে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে সেখানে এই অর্থ খাপ খায় না ৷ আরো কিছু সংখ্যক অনুবাদক এর অনুবাদ করেছেন Teacher. কিন্তু গ্রীক ভাষার ব্যবহার রীতি অনুসারে এ অর্থও গ্রহণ করা যেতে পারে না ৷ এর অনুবাদে তার তুলিয়ান এবং অগাষ্টাইন Advocate শব্দটিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন ৷ আরো কিছু সংখ্যক লোক Assistant, Camforterএবং Consolerইত্যাদি শব্দ গ্রহণ করেছেন ৷ (দেখুন ইনসাইক্লোপেডিয়া অব বাইবেলিক্যাল লিটারেচার, শব্দ -প্যারাক্লিটাস) ৷

এখন মজার ব্যাপার হলো , গ্রীক ভাষাতেই অন্য একটি শব্দ আছে Perilytos যার অর্থ প্রশংসিত ৷ এ শব্দটি সম্পূর্ণরূপে মুহাম্মাদ () শব্দের সামার্থক ৷ উচ্চারণের ক্ষেত্রেও Periclytos এবং Paracletusএর মধ্যে বেশ মিল আছে ৷ অসম্ভব নয় যে, যেসব খৃস্টান মহাত্মনরা তাদের ধর্মগ্রন্থসমূহে নিজেদের মর্জি ও পছন্দ মাফিক নির্দ্বিধায় পরিবর্তন পরিবর্ধন করতে অভ্যস্ত ছিলেন তারা যোহন কর্তৃক বর্ণিত ভবিষ্যদ্বাণীর এই শব্দটিকে নিজেদের আকীদা-বিশ্বাসের পরিপন্থী দেখতে পেয়ে তা লিপিবদ্ধ করার সময় কিছুটা রদবদল করে দিয়েছে ৷ এ বিষয়টি যাঁচাই করার জন্য যোহন কর্তৃক লিখিত আদি গ্রীক ভাষায় সুসমাচার গ্রন্থ কোথাও বর্তমান নেই ৷ তাই দুটি শব্দের মধ্যে মূলত কোনটি ব্যবাহার করা হয়েছিল তা অনুসন্ধান করে দেখার সুযোগ নেই ৷

ছয়ঃ কিন্তু যোহন কোন গ্রীক শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন তার ওপরে এ বিষয়ে চূড়ান্ত ফায়সালা নির্ভর করে না ৷ কেননা তাও অনুবাদ ৷ পূর্বেই আমরা উল্লেখ করেছি যে, ফিলিস্তিনের সুরিয়ানী ভাষা ছিল হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের ভাষা ৷ তাই তিনি তাঁর সুসংবাদ বাণীতে যে শব্দ ব্যবহার করে থাকবেন তা অবশ্যই সুরিয়ানী ভাষারই কোন শব্দ হবে ৷ সৌভাগ্যবশত আমরা সুরিয়ানী ভাষার সেই মূল শব্দটি পাচ্ছি ইবনে হিশামের সীরাত গ্রন্থে এবং তার সমার্থক গ্রীক শব্দটি কি তাও সাথে সাথে ঐ একই গ্রন্থ থেকে জানা যাচ্ছে ৷ মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাকের বরাত দিয়ে ইবনে হিশাম ইউহান্নাস (যোহন ) -এর সুসমাচারের ১৫ অধ্যায়ের ২৩ থেকে ২৭ পদ এবং ১৬ অধ্যায়ের পুরো অংশের অনুবাদ উদ্ধৃত করেছেন এবং তাতে গ্রিক ভাষার () শব্দের জায়গায় সুরিয়ানী ভাষায় () শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে ৷ অতপর ইবনে ইসহাক অথবা ইবনে হিশাম এভাবে তার ব্যাখ্যা করেছেন যে, মুনহামান্না() শব্দের সুরিয়ানী ভাষায় মুহাম্মাদ এবং গ্রীক ভাষায় বারকালীতুস() হয় ৷ (ইবনে হিশাম, ১ ম খন্ড, পৃষ্ঠা ২৪৮) ৷

এখন দেখুন, ইতিহাস থেকে একথা প্রমাণিত যে, খৃস্টীয় নবম শতক পর্যন্ত ফিলিস্তিনের খৃস্টান জনগোষ্ঠীর ভাষা ছিল সুরিয়ানী ৷ সপ্তম শতাব্দীর প্রথমার্ধ থেকেই এ অঞ্চল ইসলামবিজিত অঞ্চলের অন্তরভুক্ত ছিল ৷ ইবনে ইসহাক ৭৬৮ খৃস্টাব্দে এবং ইবনে হিশাম ৮২৮ খৃস্টাব্দে ইনতিকাল করেন ৷ এর অর্থ হলো, তাঁদের উভয়ের যুগেই ফিলিস্তিনের খৃস্টানরা সুরিয়ানী ভাষায় কথা বলত ৷ আর ইবনে ইসহাক ও ইবনে হিশামের জন্য তাদের নিজ দেশের খৃস্টান নাগরিকদের সাথে যোগাযোগ বা সম্পর্ক স্থাপন মোটেই কোন কঠিন বিষয় ছিল না ৷ তা ছাড়াও সে সময় লক্ষ লক্ষ গ্রীক ভাষা খৃস্টান ইসলামী ভূখন্ডে বসবাস করত ৷ তাই সুরিয়ানী ভাষার কোন শব্দ গ্রীক ভাষার কোন শব্দের সমর্থক তা চেনে নেয়াও তাদের জন্য কঠিন ছিল না ৷ এখন কথা হলো ইবনে ইসহাকের উদ্ধৃত অনুবাদের যদি সুরিয়ানী শব্দ () মুনহামান্না ব্যবহৃত হয়ে থাকে আর ইবনে ইসহাক বা ইবনে হিশাম যদি তার ব্যাখ্যা এই করে থাকেন যে, আরবী ভাষায় তার সমার্থক শব্দ "মুহাম্মাদ" এবং গ্রীক ভাষায় "বারকালীতুস" তাহলে এ ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করার কোন অবকাশই আর থাকে না যে, হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সাল্লামের পবিত্র নাম নিয়েই তার আগমনের সুসংবাদ দিয়েছিলেন ৷ সাথে সাথে একথাও জানা যায় যে, যোহন কর্তৃক গ্রিক ভাষায় লিখিত সুসমাচারে মূলত Periclytosশব্দটিই ব্যবহৃত হয়েছিল যা পরবর্তীকালে কোন এক সময়ে খৃস্টানরা পরিবর্তন করে Paracletus বানিয়ে দিয়েছে ৷

সাতঃ এর চেয়েও প্রাচীন ঐতিহাসিক প্রমাণ হলো হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ একটি বর্ণনা ৷ তাতে তিনি বলেছেন, নাজ্জাশী যখন তাঁর দেশ হাবশায় হিজরাতকারী মুহাজিরদের তাঁর দরবারে ডেকে পাঠালেন এবং হযরত জা'ফর ইবনে আবু তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহুর মুখে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সাল্লামের শিক্ষাসমূহ সম্পর্কে শুনলেন তখন তিনি বলে উঠলেনঃ

-----------------

"স্বাগত জানাই তোমাদেরকে আর স্বাগত জানাই তাঁকেও যার নিকট থেকে তোমরা এসেছ ৷ আমি সাক্ষ দিচ্ছি, তিনি আল্লাহর রসূল ৷ আর তিনিই সেই সত্তা যাঁর উল্লেখ আমরা ইনজীলে দেখতে পাই এবং তিনিই সেই সত্তা যার সুসংবাদ ঈসা ইবনে মারয়াম দিয়েছিলেন ৷ "

বিভিন্ন হাদীসে এ কাহিনী খোদ হযরত জা'ফর (রা) এবং হযরত উম্মে সালমা (রা) কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে ৷ এ থেকে শুধু এ কথাই প্রমাণিত হয় না যে, সপ্তম শতাব্দির শুরুতে নাজ্জাশী জানতেন, হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম একজন নবীর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন ৷ বরং একথাও প্রমাণিত হয় যে, বাইবেলের সুসমাচারে সেই নবীর এমন সব সুস্পষ্ট লক্ষণাদিরও উল্লেখ ছিল যার ভিত্তিতে হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই যে সেই নবী সে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে নাজ্জাসী একটুও দ্বিধাগ্রস্ত হয়নি ৷ তবে হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের এ সুসংবাদ সম্পর্কে নাজ্জাশীর জ্ঞানের সুত্র ও উৎস যোহন লিখিত এই সুসমাচার ছিল , না অন্য আর কোন উৎস ও সুত্র সে সময় বর্তামান ছিল, এ বর্ণনা থেকে তা জানা যায় না ৷

আটঃ সত্য কথা হলো , খৃস্টান গীর্জাসমূহ কর্তৃক নির্ভরযোগ্য ও সর্বসমর্থিত (CanonicalGospels ) বলে ঘোষিত চারখানি সুসমাচার যে কেবল রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কেই হযরত ঈসা (আ) ভবিষ্যদ্বাণীসমূহ জানার নির্ভরযোগ্য উৎস হতে পারে না, তাই নয় বরং তা খোদ হযরত ঈসা (আ) নিজের সঠিক জীবন বৃত্তান্ত ও শিক্ষাসমূহ সম্পর্কে অবগত হওয়ারও নির্ভরযোগ্য উৎস নয় ৷ বরং তা জানার অধিক নির্ভরযোগ্য উৎস হচ্ছে বার্নাবাসের সেই সুসমাচার যাকে গীর্জাসমূহ বেআইনী ও অনিভরযোগ্য (Apocryphal) বলে উড়িয়ে দিয়ে থাকে ৷ খৃস্টানরা তা গোপন করার যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন ৷ শত শত বছর পর্যন্ত তা লোকচক্ষুর অন্তরালে গোপন করে রাখা হয়েছিল ৷ ইটালিয় ভাষায় অনূদিত এর একটি মাত্র কপি ষোড়শ শতাব্দিতে পোপ সিক্সটাসের (Sixtus) লাইব্রেরীতে পাওয়া যেত ৷ কিন্তু তা পড়ার অনুমতি কারো ছিল না ৷ অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে তা জন টোলেন্ড নামক এক ব্যক্তির হাতে আসে ৷ অতপর বিভিন্ন হাত ঘুরে ১৭৩৮ খৃস্টাব্দে তা ভিয়েনার ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরীতে পৌছে ৷ ১৯০৭ খৃস্টাব্দে এ গ্রন্থের ইংরেজী অনুবাদ অক্সফোর্ডের ক্লোরিন্ডন প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়েছিল ৷ কিন্তু প্রকাশিত হওয়ার পর পরই সম্ভবত খৃস্টান জগত আচ করতে পারে যে, যে ধর্মকে হযরত ঈসার নামে নামকরণ করা হয় এ গ্রন্থ তারই মূলোৎপাট্ন করছে ৷ তাই এর মুদ্রিত কপিসমূহ বিশেষ কোন ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে উধাও করে দেয়া হয় ৷ এরপর তা আর কখনো প্রকাশিত হতে পারেনি ৷ এ গ্রন্থেরই ইটালিয়ান ভাষার অনুবাদ থেকে স্প্যানিশ ভাষায় অনুদিত আরেকটি কপি অষ্টাদশ শতাব্দিতে পাওয়া যেত ৷ জর্জ সেল তাঁর কুরআনের ইংরেজী অনুবাদের ভূমিকায় এ গ্রন্থের উল্লেখ করেছেন ৷ কিন্তু সেটাও কোথাও গায়েব করে দেয়া হয়েছিল ৷ এবং বর্তামানে কোথাও তার সন্ধান পাওয়া যায় না ৷ অক্সফোর্ড থেকে প্রকাশিত ইংরেজী অনুবাদের একটি ফটোষ্ট্যাট কপি দেখার সুযোগ আমার হয়েছে ৷ আমি এর প্রতিটি শব্দ পড়েছি ৷ আমার মনে হয়, এটা অতি বড় একটা নিয়ামত ৷ খৃস্টানরা কেবল হিংসা-বিদ্বেষ ও হঠকারিতার কারণে এর থেকে নিজেদেরকে বঞ্চিত করে রেখেছে ৷

খৃস্টীয় সাহিত্যে যেখানেই এই ইনজিল বা সুসমাচারের উল্লেখ দেখা যায়, সেখানেই একথা বলে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে যে, এটা কোন মুসলমানের রচিত নকল সুসমাচার যা বার্নাবাসের নামে চালিয়ে দেয়া হয়েছে ৷ কিন্তু এটা একটা নির্জলা মিথ্যা কথা ৷ এত বড় একটা মিথ্যা বলার কারণ এই যে, এ গ্রন্থে বিভিন্নস্থানে স্পষ্টভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী আছে ৷ প্রথমত এই সুসমাচার গ্রন্থখানি পড়লে পরিষ্কার বুঝা যায় যে, এ গ্রন্থ কোন মুসলমানদের রচনা হতে পারে না ৷ দ্বিতীয়ত , এ গ্রন্থ যদি কোন মুসলমানের রচিত হতো তাহলে মুসলমানদের মধ্যে তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ত এবং মুসলিম মনীষী ও পন্ডিতদের রচনায় ব্যাপকভাবে এর উল্লেখ থাকত ৷ কিন্তু এ ক্ষেত্রে অবস্থা হলো জর্জ সেলে কোরআনের ইংরেজী অনুবাদের ভূমিকার পূর্বে এর অস্তিত্ব সম্পর্কেই মুসলমানদের আদৌ জানা ছিল না ৷ তাবারয়ী, ইয়া'কূবী , মাস'উদী, আল বিরুনী ও ইবনে হাযম এবং অন্যান্য গ্রন্থকারগণ ছিলেন খৃস্টীয় সাহিত্য সম্পর্কে গভীর পান্ডত্যের অধিকারী মুসলিম মনীষী ৷ তাদের কারো রচনাতেই খৃস্টান ধর্ম সম্পর্কিত আলোচনায় বার্নাবাসের সুসমাচারের আভাস-ইংগিত পর্যন্ত পাওয়া যায় না ৷ ইসলামী বিশ্বের গ্রন্থাগারসমূহে যেসব গ্রন্থরাজী ছিল ইবনে নাদীম রচিত "আল ফিহরিস্ত" এবং হাজী খলীফা রচিত "কাশফুয যুনুন"গ্রন্থেই তার ব্যাপরক ও সর্বোত্তম তালিকা গ্রন্থ ৷ এ দুটি গ্রন্থেও তার কোন উল্লেখ নেই ৷ ঊনবিংশ শতাব্দীর আগে কোন মুসলমান পণ্ডিতই বার্নাবাসের সুসমাচারের না পর্যন্ত উচ্চারণ করেননি ৷ একথাটি মিথ্যা হওয়ার তৃতীয় এবং সর্বাপেক্ষা বড় প্রমাণ হলো, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মেরও ৭৫ বছর আগে পোপ গ্লাসিয়াসের (Gelasius) যুগে খারাপ আকীদা ও বিভ্রান্তিকর (Heretical) গ্রন্থরাজির যে তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছিল এবং পোপের দেয়া একটি ফতোয়ার জোরে যা পড়তে নিষেধ করা হয়েছিল তার মধ্যে বার্নাবাসের সুসমাচার(Evangelium Barnabe) গ্রন্থখানিও অন্তরভুক্ত ছিল ৷ প্রশ্ন হলো, তখন মুসলমান এসেছিল কোথা থেকে যে এই নকল ইনজীল বা সুসমাচার রচনা করেছিল? খোদ খৃস্টান পন্ডিত পুরোহিতগণও একথা স্বীকার করেছেন যে, সিরিয়া স্পেন, মিসর, প্রভূতি দেশে প্রাথমিক যুগের খৃস্টান গীর্জাসমূহে দীর্ঘদিন পর্যন্ত বার্নাবাসের সুসমাচার প্রচলিত ছিল ৷ কিন্তু পরবর্তী সময়ে ষষ্ঠ শতাব্দীতে এসে তা নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছে ৷

নয়ঃ এই সুসমাচার থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে হযরত ঈসার সুসংবাদসমূহ উদ্ধৃত করার আগে গ্রন্থখানির সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা প্রয়োজন যাতে তার গুরুত্ব সম্পর্কে সম্যক অবহিত হওয়া যায় এবং একথাও জানা যায় যে, খৃস্টানরা এর প্রতি এত মারমুখী কেন?

যে চারখানি সুসমাচারকে আইনসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য বলে গ্রহণ করে বাইবেলের অন্তরভুক্ত করা হয়েছে তার কোনটিরই লেখক হযরত ঈসা সাহাবী ছিলেন না ৷ তাঁরা কেউ একথা দাবীও করেননি যে, তিনি হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের সাহাবীদের নিকট থেকে তথ্য নিয়ে তাঁর সুসমাচারে লিপিবদ্ধ করেছেন ৷ যেসব উৎস থেকে তাঁরা তথ্য গ্রহণ করেছেন তার কোন বরাতও তারা উল্লেখ করেননি ৷ যদি তাঁরা বরাত উল্লেখ করতেন তাহলে তা থেকে জানা যেতো যে, বর্ণনাকারী যেসব ঘটনা বর্ণনা করেছেন এবং যেসব বাণী উদ্ধৃত করেছেন তা তিনি নিজে দেখেছেন এবং শুনেছেন না একজন বা কয়েকজনের মাধ্যমে তা তাঁর কাছে পৌছেছে? পক্ষান্তরে বার্নাবাসের সুসমাচারের লেখক বলেছেন আমি হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের প্রথম বারজন হওয়ারীর একজন ৷ প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আমি হযরত ঈসা মাসীহর সাথে ছিলাম এবং নিজের চোখে দেখা ঘটনা এবং নিজের কানে শোনা বাণী এ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছি ৷ শুধু এতটুকুই নয়, বরং গ্রন্থের শেষ পর্যায়ে তিনি বলেছেন , পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়ার সময় হযরত মাসীহ আমাকে বলেছিলেনঃ আমার ব্যাপারে যেসব ভুল ধারণা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে তা বিদূরিত করা এবং দুনিয়ার সামনে সঠিক অবস্থা তুলে ধরা তোমার দায়িত্ব ৷

কে ছিলেন এই বার্নাবাস? বাইবেলের "প্রেরিতদের কার্য" পুস্তকে এই নামের এক ব্যক্তির উল্লেখ বার বার এসেছে ৷ এ ব্যক্তি ছিল সাইপ্রাসের এক ইহুদী পরিবারের লোক ৷ খৃস্টান ধর্মের প্রচার এবং ঈসা মাসীহর অনুসারীদের সাহায্য -সহযোগীতার ক্ষেত্রে তার সেবা ও অবদানের অনেক প্রশংসা করা হয়েছে ৷ কিন্তু কখন সে মাসীহর ধর্ম গ্রহণ করেছিল তা কোথাও বলা হয়নি এবং প্রাথমিক যুগের বারজন হাওয়ারীর যে তালিকা তিনটি সুসমাচারে দেয়া হয়েছে তার মধ্যে কোথাও তার নামের উল্লেখ নেই ৷ তাই উক্ত সুসমাচারের লেখক সেই বার্নাবাস নিজে না অন্য কেউ তা বলা কঠিন ৷ মথি এবং মার্ক হাওয়ারীদের (Apostles) নামের যে তালিকা দিয়েছেন বার্নাবাসের দেয়া তালিকা শুধু দুটি নামের ক্ষেত্রে তাদের থেকে ভিন্ন ৷ ঐ দুটি নামের একটি হলো 'তূমা' ৷ এ নামটির পরিবর্তে বার্নাবাস নিজের নাম উল্লেখ করেছেন ৷ দ্বিতীয়টি হলো, 'শামউন কানানী' ৷ এ নামটির পরিবর্তে তিনি ইয়াহুদা ইবনে ইয়া'কূবের নাম উল্লেখ করেছেন ৷ লুক লিখিত সুসমাচারে এই দ্বিতীয় নামটিরও উল্লেখ আছে ৷ তাই এরূপ ধারণা করা যুক্তিসংগত যে, পরবর্তীকালে কোন এক সময় শুধু বার্নাবাসকে হাওয়ারীদের তালিকা থেকে বাদ দেয়ার জন্য তূমার নাম অন্তরভুক্ত করা হয়েছে যাতে তার সুসমাচার গ্রন্থের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায় ৷ আর নিজেদের ধর্মগ্রন্থসমূহে এ ধরনের রদবদল ও পরিবর্তন পরিবর্ধন করে নেয়া ঐ সব মহাত্মনদের দৃষ্টিতে কোন অন্যায় ও অবৈধ কাজ ছিল না ৷

কেউ যদি বার্নাবাসের এই ইনজীল বা সুসমাচার গ্রন্থখানি পক্ষপাত শূন্য ও বিদ্বেষমুক্ত মনে চোখ খুলে পড়ে এবং বাইবেল নতুন নিয়মের চারখানি সুসমারের সাথে তার তুলনা করে তাহলে সে একথা উপলদ্ধি না করে পারবে না যে, এই গ্রন্থখানি উক্ত চারখানি গ্রন্থের চেয়ে অনেক উন্নত মানের ৷ এতে হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের জীবনের ঘটনাবলী অধিক বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়ছে এবং এমনভাবে বর্ণিত হয়েছে যেন কেউ প্রকৃতপক্ষে সেখানকার সবকিছু দেখছিল এবং নিজেও তাতে শরীক ছিল ৷ চারখানি সুসমাচারের অসংবদ্ধ ও খাপ ছাড়া কাহিনীসমূহের তুলনায় এর ঐতিহাসিক বর্ণনা অধিক সুসংহত এবং ঘটনাসমূহের ধারাবাহিকতারও আরো ভালভাবে বোধগম্য ৷ এতে হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের শিক্ষাসমূহ বাইবেলের চারখানি সুসমাচারের তুলনায় অধিক স্পষ্ট, বিস্তারিত এবং মর্মস্পর্শীরূপে বর্ণিত হয়েছে ৷ এতে তাওহীদের শিক্ষা, শিরক খণ্ডন, আল্লাহ তা'আলার গুণাবলী, ইবাদতের প্রাণসত্তা এবং উত্তম ও উন্নত চরিত্রের বিষয়াবলী অত্যান্ত জোরালো ভাবে যুক্তি ও প্রমাণসহ সবিস্তারে বর্ণিত হয়েছে ৷ যেসব শিক্ষানীয় উপমা ও উদাহরণের মাধ্যমে মাসীহ আলাইহিস সালাম যেসব বিষয় বর্ণনা করেছেন , চারখানি সুসমাচারে তার ছিঁটে ফোঁটাও নেই ৷ তিনি কি ধরনের বিজ্ঞোচিত পন্থায় তাঁর শাগরিদদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিতেন এ গ্রন্থ থেকে সে বিষয়টিও অধিক বিস্তারিতভাবে জানা যায় ৷ হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের ভাষা, বাচনভঙ্গি এবং মেজাজ প্রকৃতি সম্পর্কে যার সামান্য পরিমাণও জ্ঞান আছে সে এই সুমাচার গ্রন্থখানি পাঠ করিলে একথা স্বীকার না করে পারবে না যে, এটা পরবর্তীকালে কারো রচিত কোন নকল কাহিনী নয় ৷ বরং চারখানি সুসমাচারের তুলনায় এতে হযরত ঈসা তার প্রকৃত মর্যাদায় অধিকতর স্পষ্ট হয়ে আমাদের সামনে ফুটে ওঠেন ৷ তাছাড়া সুসমাচার চতুষ্টয়ে তাঁর বিভিন্ন বানীর মধ্যে যে বৈপরীত্য লক্ষ করা যায় এ গ্রন্থে তার নামগন্ধ পর্যন্ত নেই ৷

হযরত ঈসার জীবন ও শিক্ষা হিসেবে এ গ্রন্থে যা বর্ণিত হয়েছে তা সঠিক অর্থে একজন নবীর জীবন ও শিক্ষা বলেই মনে হয় ৷ এতে তিনি নিজেকে একজন নবী হিসেবেই পেশ করেছেন ৷ পূর্ববর্তী সমস্ত নবী এবং আসমানী কিতাবসমূহকে সত্য বলে ঘোষণা করেছেন ৷ এতে তিনি পরিস্কার ভাষায় বলেছেন যে, নবী-রাসূলের (আলাইহিমুস সালাম) শিক্ষা ছাড়া সত্যকে জানার জন্য কোন মাধ্যম নেই ৷ যারা নবী-রাসূলের পরিত্যাগ করে তারা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহকেই পরিত্যাগ করে ৷ সমস্ত নবী -রাসূল তাওহীদ, রিসালাত ও আখেরাতের যে শিক্ষা দিয়েছেন তিনি হুবহু সেই শিক্ষাই দিয়েছেন ৷ এ গ্রন্থে তিনি নামায, রোযা, এবং যাকাতের শিক্ষা দিচ্ছেন ৷ এ গ্রন্থে বার্নাবাস বহুস্থানে তাদের নামাযের যে উল্লেক করেছেন তা থেকে জানা যায় যে, এই ফজর, যোহর, আসর, মাগরিব, এশা, ও তাহাজ্জুদের সময়ই তারা নামায পড়তেন এবং সর্বদা নামাযের আগে অযু করতেন ৷ নবী -রাসূলের মধ্যে থেকে হযরত দাউদ ও সুলায়মানকেও তিনি নবী বলে স্বীকৃতি দিতেন ৷ অথচ ইহুদী ও খৃস্টানরা তাঁদেরকে নবীদের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে রেখেছে ৷ তিনি হযরত ইসমাঈলকেই 'যাবীহ' (যাঁকে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম আল্লাহর নির্দেশে যবেহ করতে নিয়ে গিয়েছিলেন-অনুবাদক) বলে ঘোষণা করেন, একজন ইহুদী আলেমকে তিনি স্বীকার করান যে, প্রকৃতপক্ষে হযরত ইসমাঈল ছিলেন 'যাবীহ' কিন্তু বনী ইসরাঈলরা জোড়াতালি দিয়ে জোর করে হযরত ইসহাককে যাবীহ বানিয়ে রেখেছে ৷ কুরআন মজীদে আখেরাত, কিয়ামাত, জান্নাত ও দোযখ সম্পর্কে যা বর্ণিত হয়েছে তাঁর শিক্ষাও প্রায় তার কাছাকাছি ৷

দশঃ বার্নাবাসের সুসমাচারে বিভিন্নস্থানে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে স্পষ্ট সুসংবাদের উল্লেখ থাকার কারণে যে খৃস্টানরা এর বিরোধী তা নয় ৷ কারণ নবীর (সা) জন্মেরও বহু আগে তারা এ গ্রন্থকে প্রত্যাখ্যান করেছিল ৷ তাদের উষ্মা ও অসন্তুষ্টির প্রকৃত কারণ উপলব্ধি করতে হলে বিষয়টি সম্পর্কে কিছুটা বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন ৷

হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের প্রথম যুগের অনুসারীগণ তাঁকে কেবল একজন নবী হিসেবে স্বীকার করতেন, হযরত মূসার শরীয়াতের অনুসরণ করতেন, আকীদা-বিশ্বাস, হুকুম-আহকাম ও ইবাদত -বন্দেগীর ক্ষেত্রে নিজেদেরকে বনী ইসরাঈল জাতির অন্য সবার থেকে মোটেই আলাদা কিছু মনে করতেন না এবং ইহুদীদের সাথে তাদের বিরোধ ছিল শুধু এতটুকু যে, তাঁরা হযরত ঈসাকে 'মাসীহ' হিসেবে মেনে নিয়ে তার প্রতি ঈমান এনেছিলেন , কিন্তু ইহুদীরা তাকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানাতো ৷ পরবর্তীকালে সেন্টপল এই দলে শামিল হলে সে রোমা
৯. মূল আয়াতে () শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে ৷ এখানে () শব্দটি যাদু অর্থে নয়, বরং ধোঁকা ও প্রতারণা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে ৷ আরবী ভাষায় যাদু অর্থে এ শব্দটির ব্যবহার যেমন পরিচিত তেমনি ধোঁকা ও প্রতারণা অর্থে ব্যবহারও পরিচিতি ৷ যেমনঃ আরবীতে বলা হয়() সে অমুক ব্যক্তিকে যাদু করেছে অর্থাৎ ধোঁকা দিয়েছে ৷ যে দৃষ্টি ও চাহনি মন কেড়ে নেয় তাকে বলা হয় () যাদুমীয় চোখ ৷ যে প্রান্তরে চারদিকে কেবল মরীচিকা আর মরীচিকাই চোখে পড়ে তাকে () যাদুর প্রান্তর বলে ৷ রৌপ্যকে পালিশ করে স্বর্ণের মত উজ্জ্বল করা হলে তাকে বলা হয় () ৷ সুতরাং আয়াতের অর্থ হলো, যখন সেই নবী, যার আগমনের সুসংবাদ হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম দিয়েছিলেন স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ নিয়ে আস বলেন তখন নবী ইসরাঈল এবং হযরত ঈসার উম্মাতগণ তাঁর নবুওয়াতের দাবীকে খোলাখুলি প্রতারণা ও জালিয়াতি বলে ঘোষণা করল ৷
১০. অর্থাৎ আল্লাহর প্রেরিত নবীকে নবুওয়াতের মিথ্যা দাবীদার বলে অভিহিত করা এবং নবীর ওপর আল্লাহর যে বাণী নাযিল হচ্ছে তাকে নবীর নিজের তৈরী কথা বলে ধরে নেয়া ৷
১১. অর্থাৎ আল্লাহর এই সত্য নবীকে নবুওয়াতের মিথ্যা দাবীদার বলাটাই কোন ছোট খাট জুলুম নয় ৷ কিন্তু সেটা আরো বড় জুলুম হয়ে দাঁড়ায় যখন তিনি আল্লাহর দাসত্ব আনুগত্যের প্রতি আহবান জানান আর জবাবে শ্রোতা তাঁকে গালি দিতে থাকে এবং তাঁর দাওয়াত ও আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য মিথ্যা কলঙ্ক লেপন ও অপবাদ আরোপের কৌশল অবলম্বন করে ৷
১২. স্মরণ রাখা দরকার যে, এ আয়াতটি ৩ হিজরী সনে ওহুদ যুদ্ধের পরে নাযীল হয়েছিল ৷ সে সময় ইসলাম কেবল মদীনা শহরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, মুসলমানদের সংখ্যা কয়েক হাজারের বেশী ছিল না এবং গোটা আরবভূমি দীন ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলার জন্য পুরোপুরি সংকল্পবদ্ধ ছিল ৷ ওহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের যে ক্ষতি হয়েছিল তার কারণে তাদের প্রভাব -প্রতিপত্তি ক্ষুন্ন হয়েছিল এবং আশেপাশের গোত্রসমূহ তাদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সাহসী হয়ে উঠেছিল ৷ এরূপ পরিস্থিতিতে বলা হয়েছে, আল্লাহর এই 'নূর' কারো নিভিয়ে দেয়াতে নিভবে না, বরং পূর্ণরূপে উদ্ভাসিত হবে এবং সারা পৃথিবী ব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে ক্ষান্ত হবে ৷ এটা একটা স্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী, যা অক্ষরে অক্ষরে সত্যে প্রমাণিত হয়েছে ৷ ইসলামের ভবিষ্যত কি একমাত্র আল্লাহ ছাড়া সেই সময় আর কে তা জানতো? মানুষ তো তখন দিব্যি দেখছিল, এটা একটা নিভু নিভু প্রদীপ যা নিভিয়ে ফেলার জন্য প্রচণ্ড ঝড়ে বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে ৷
১৩. মুশরিকদের জন্য অসহনীয় হলেও ৷ অর্থাৎ যারা আল্লাহর দাসত্বের সাথে অন্যদের দাসত্বও করে থাকে এবং আল্লাহর দীনের সাথে অন্য সব দীন ও বিধানকে সংমিশ্রিত করে, শুধু এক আল্লাহর আনুগত্য ও হিদায়াতের ওপর গোটা জীবনব্যবস্থা কায়েম হোক তারা তা চায় না ৷ যারা ইচ্ছামত যে কোন প্রভু ও উপাস্যের দাসত্ব করতে সংকল্পাবদ্ধ এবং যে কোন দর্শন ও মতবাদের ওপর নিজেদের আকীদা-বিশ্বাস, নৈতিকতা এবং তাহযীব তামুদ্দুনের ভিত্তিস্থাপন করতে প্রস্তুত এমনসব লোকের বিরোধিতার মুখেও বলা হচ্ছে যে, তাদের সাথে আপোষ করার জন্য আল্লাহর রসূলকে পাঠানো হয়নি ৷ বরং তাকে পাঠানো হয়েছে এ জন্য যে, তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে যে হিদায়াত ও জীবনব্যবস্থা এনেছেন তাকে গোটা জীবনের সব দিক ও বিভাগের ওপর বিজয়ী করে দেবেন ৷ অবস্থা যাই হোক না কেন, তাঁকে এ কাজ করতেই হবে ৷ কাফের ও মুশরিকরা তা মেনে নিক আর না নিক এবং এ বিরোধিতায় সর্বশক্তি নিয়োগ করলেও সর্বাবস্থায় রসূলের এ মিশন সফলকাম হবে এবং পূর্ণতা লাভ করবে ৷ ইতিপূর্বে কুরআন মজীদের আরো দুটি স্থানে এ ঘোষণা এসেছে এক, সূরা তাওবার ৩৩ আয়াতে ৷ দুই, সূরা ফাতহের ২৮ আয়াতে ৷ এ স্থানে তৃতীয়বারের মত এ ঘোষণার পুনরুক্তি করা হচ্ছে ৷ (আরো ব্যাখার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন আত তাওবা টীকা, ৩২; সূরা আল ফাতহ টীকা ৫১ ৷ )