(৫৮:১৪) তুমি কি তাদের দেখনি যারা এমন এক গোষ্ঠীকে বন্ধু বানিয়ে নিয়েছে যারা আল্লাহর গযবে নিপতিত৷ ৩১ তারা তোমাদেরও নয়, তাদেরও নয়৷৩২ তারা জেনে ও বুঝে মিথ্যা বিষয় কসম করে৷৩৩
(৫৮:১৫) আল্লাহ তাদের জন্য কঠিন শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন৷ তারা যা করেছে তা অত্যন্ত মন্দ কাজ৷
(৫৮:১৬) তারা নিজেদের কসমকে ঢাল বানিয়ে রেখেছে৷ এর আড়ালে থেকে তারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বাধা দেয়৷৩৪ এ কারণে তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর আযাব৷
(৫৮:১৭) আল্লাহর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য তাদের অর্থ-সম্পদ যেমন কাজে আসবে না, তেমনি সন্তান-সন্তুতিও কোন কাজে আসবে না৷ তারা দোযখের উপযুক্ত, সেখানেই তারা চিরদিন থাকবে৷
(৫৮:১৮) যেদিন আল্লাহ তাদের সবাইকে জীবিত করে উঠাবেন সেদিন তাঁর সামনেও তারা ঠিক সেভাবে কসম করবে যেমন তোমাদের সামনে কসম করে থাকে ৩৫ এবং মনে করবে এভাবে তাদের কিছু কাজ অন্তত হবে৷ ভাল করে জেরে রাখো, তারা যারপর নাই মিথ্যাবাদী৷
(৫৮:১৯) শয়তান তাদের ওপর চেপে বসেছে এবং তাদের অন্তর থেকে আল্লাহর স্মরণ মুছে দিয়েছে৷ তারা শয়তানের দলভুক্ত লোক৷ সাবধান! শয়তানের দলভুক্ত লোকেরাই ক্ষতিগ্রস্থ হবে৷
(৫৮:২০) যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের মোকাবিলা করে নিসন্দেহে তারা নিকৃষ্টতর সৃষ্টি৷
(৫৮:২১) আল্লাহ লিখে দিয়েছেন যে, তিনি এবং তাঁর রসূল অবশ্যই বিজয়ী হবেন৷ ৩৬ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ মহা শক্তিমান ও পরাক্রমশালী৷
(৫৮:২২) তোমরা কখনো এমন দেখতে পারে না যে, যারা আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি ঈমান পোষণ করে তারা এমন লোকদের ভাল বাসছে যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরোধিতা করেছে৷ তারা তাদের পিতা, অথবা পুত্র অথবা ভাই অথবা গোষ্ঠীভুক্ত ৩৭ হলেও তাতে কিছু এসে যায় না৷ আল্লাহ এসব লোকদের হৃদয়-মনে ঈমান বদ্ধমুল করে দিয়েছেন এবং নিজের পক্ষ থেকে একটি ‘রূহ’ দান করে তাদের শক্তি যুগিয়েছেন৷ তিনি তাদেরকে এমন জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাবেন যার পাদদেশ দিয়ে নহরসমূহ প্রবাহিত হতে থাকবে৷ তারা সেখানে চিরদিন অবস্থান করবে৷ আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে৷ তারা আল্লাহর দলের লোক৷ জেনে রেখো আল্লাহর দলের লোকেরাই সফলকাম৷
৩১. এখানে মদীনার ইহুদীদের প্রতি ইংগিত করা হয়েছে, মুনাফিকরা এসব ইহুদীদেরকেই বন্ধু বানিয়ে রেখেছিল৷
৩২. অর্থাৎ মুসলমান বা ইহুদী কারো সাথেই তাদের আন্তরিক সম্পর্ক ছিল না ৷ নিজেদের স্বার্থের কারণেই তারা উভয়ের সাথে সম্পর্ক পাতিয়ে রেখেছিল৷
৩৩. অর্থাৎ তারা এই বলে মিথ্যামিথ্যি কসম খায় যে, তারা ঈমান এনেছে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাদের নেতা ও পথ প্রদর্শনকারী হিসেবে মেনে নিয়েছে এবং ইসলাম ও ইসলামের অনুসারীদের প্রতি বিশ্বস্ত আছে৷
৩৪. এর অর্থ একদিকে তারা নিজেদের ঈমান ও বিশ্বস্ততা সম্পর্কে কসম খেয়ে মুসলমানদের আক্রোশ থেকে নিজেদের রক্ষা করে, অপরদিকে মানুষের মধ্যে ইসলাম, ইসলামের অনুসারী এবং ইসলামের নবীর বিরুদ্ধে নানা রকম সন্দেহ ও সংশয় সৃস্টি করে যাতে মানুষ এ কথা চিন্তা করে ইসলাম গ্রহণ থেকে বিরত থাকে যে, ইসলামের ঘরের লোকেরাই যখন একথা বলছে তখন এর মধ্যে ব্যাপার কিছু একটা অবশ্যই আছে৷
৩৫. অর্থাৎ তারা শুধু দুনিয়াতেই এবং শুধু মানুষের সামনেই মিথ্যা মিথ্যা শপথ করে না৷ আখেরাতে আল্লাহ তা'আলার সামনেও তারা মিথ্যা শপথ করা থেকে বিরত হবে না৷ মিথ্যা এবং প্রতারণা তাদের মনের এত গভীরে স্থান করে নিয়েছে যে, মৃত্যুর পরও এরা তা থেকে মুক্ত হতে পারবে না৷
৩৬. ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, আস, সাফ্ফাত, টীকা-৯৩৷
৩৭. এ আয়াতে দুইটি কথা বলা হয়েছে৷ একটি নীতি কথা৷ অন্যটি প্রকৃত ঘটনার বর্ণনা৷ নীতি কথায় বলা হয়েছে যে, সত্য দীনের প্রতি ঈমান এবং দীনের শত্রুদের সাথে বন্ধুত্ব ও ভালবাসা দুটি সম্পুর্ণ পরস্পর বিরোধী জিনিস৷ এ দুটি জিনিসের একত্র সমাবেশ বা অবস্থান কোনভাবে কল্পনাও করা যায় না৷ ঈমান এবং আল্লাহ তাঁর রসূলের শত্রুদের সাথে ভালবাসা ও বন্ধুত্ব একই হৃদয়ে একত্রিত হওয়া একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার ৷ কোন মানুষের হৃদয়ে যখন একই সাথে নিজের প্রতি ভালবাসা এবং শত্রুর প্রতি ভালবাসা একত্রিত হতে পারে না তখন এটাও ঠিক অনুরূপ ব্যপার৷ অতএব তোমরা যদি কাউকে দেখো, সে ঈমানের দাবীও করে এবং সাথে সাথে ইসলাম বিরোধী লোকদের সাথে ভালবাসা ও বন্ধুত্বের সম্পর্কও রাখে তাহলে তোমাদর মনে কখনো যেন এ ভূল ধারণা না জন্মে যে, এ আচরণ সত্ত্বেও সে তার ঈমানের দাবীতে সত্যবাদী৷ অনুরূপ যেসব লোক একই সাথে ইসলাম ও ইসলাম বিরোধীদের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছে সে নিজেও যেন তার এ অবস্থান ভালভাবে চিন্তা ভাবনা করে দেখে যে, প্রকৃতপক্ষে সে কি, মুমিন, না মুনাফিক? সে প্রকৃতপক্ষে কি হতে চায়, মু'মিন হয়ে থাকতে চায়? নাকি মুনাফিক হয়ে? তার মধ্যে যদি সততার লেশমাত্রও থেকে থাকে এবং মুনাফিকীর আচরণ যে নৈতিক দিক দিয়ে মানুষের জন্য নিকৃষ্টতম আচরণ এ বিষয় তার মধ্যে সামান্যতম অনূভূতিও থাকে তা হলে তার উচিত একই সাথে দুই নৌকায় আরোহণের চেষ্টা পরিত্যাগ করা ৷ ঈমান এ ব্যাপারে তার কাছে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত দাবী করে৷ সে যদি মু'মিন থাকতে চায় তাহলে যেসব সম্পর্ক বন্ধন ইসলামের সংগে তার সম্পর্ক ও বন্ধনের সাথে সাংঘর্ষিক তার সবই তাকে বর্জন করতে হবে৷ ইসলামের সাথে সম্পর্কের চাইতে অন্য কোন সম্পর্ক প্রিয়তর হয়ে থাকলে ঈমানের মিথ্যা দাবী ছেড়ে দেয়াই উত্তম৷

এটি ছিল নীতিগত কথা৷ কিন্তু এখানে আল্লাহ তা'আলা শুধু নীতি বর্ণনা করাই যথেষ্ট মনে করেননি৷ বরং ঈমানের দাবীদারদের সামনে নমুনা স্বরূপ এ বাস্তব ঘটনাও পেশ করেছেন যে, সত্যিকার ঈমানদারগণ বাস্তবে সবার চোখের সামনে সে সম্পর্ক ও বন্ধন ছিন্ন করেছিল যা আল্লাহর দীনের সাথে সম্পর্কের পথে প্রতিবন্ধক ছিল্ এটা ছিল এমন একটা ঘটনা যা বদর ও উহুদ যুদ্ধের সময় সমগ্র আরব জাতি প্রত্যক্ষ করেছিল৷ যেসব সাবাহায়ে কিরাম মক্কা থেকে হিজরত করে এসেছিলেন তারা শুধু আল্লাহ এবং দীনের খাতিরে নিজেদের গোত্র এবং ঘনষ্টতর নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন৷ হযরত আবু উবাদাহ তাঁর নিজের পিতা আবদুল্লাহ ইবনে জাররাহকে হত্যা করেছিলেন৷ হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের আপন ভাই উবাদাহ ইবনে উমায়েরকে হত্যা করেছিলেন৷ হযরত উমর (রা) তাঁর মামা আস ইবনে হিশাম ইবনে মুগীরাহকে হত্যা করেন৷ হযরত আবু বকর (রা) তার পুত্র আবদুর রহমানের বিরুদ্ধে লড়তে প্রস্তুত হয়েছিলেন৷ হযরত আলী, হযরত হামযা এবং হযরত উবাইদা ইবনুল হারেস তাদের নিকটাত্মীয় উতবা, শায়বা, এবং ওয়ালীদ ইবনে উতবাকে হত্যা করেছিলেন৷ বদর যুদ্ধের বন্দীদের ব্যাপারে হযরত উমর (রা (রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে তাদের সবাইকে হত্যা করার আবেদন করে বলেছিলেন, আমাদের মধ্যে প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিকটাত্মীয়কে হত্যা করবে৷ এ বদর যুদ্ধেই এক আনসারী হযরত মুসআব ইবনে উমায়েরের আপন ভাই আবু আযীয ইবনে উমায়েরকে পাকড়াও করে বাঁধছিলেন৷ তা দেখে হযরত মুসআব চিৎকার করে বললেনঃ বেশ শক্ত করে বাঁধো৷ এর মা অনেক সম্পদশালিনী৷ এর মুক্তির জন্য সে তোমাদেরকে অনেক মুক্তিপণ দিবে৷ একথা শুনে আব আযীয বললোঃ তুমি ভাই হয়ে একথা বলছো? জবাবে হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের বললেনঃ এ মুহুর্তে তুমি আমার ভাই নও, বরং যে আনসারী তোমাকে পাকড়াও করছে সে আমার ভাই৷ বদর যুদ্ধেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জামাতা আবুল আস বন্দি হয়ে আসলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জামাতা হওয়ার কারণে তার সাথে অন্য সব কয়েদী থেকে ভিন্ন বিশেষ কোন সৌজন্যমূলক আচরণ করা হয়নি৷ খাঁটি ও নিষ্ঠাবান মুসলমান কাকে বলে এবং আল্লাহ ও তাঁর দীনের সাথে তাদের সম্পর্ক কি এভাবে বাস্তবে তা দুনিয়াকে দেখানো হয়েছে৷

দায়লামী হযরত মুয়ায থেকে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ দোয়টি উদ্ধৃত করেছেনঃ

----------------------------

"হে আল্লাহ আমাকে কোন পাপী লোকের দ্বারা (অপর একটি বর্ণনায় আছে ফাসেক) উপকৃত হতে দিও না৷ তাহলে আমার মনে তার প্রতি ভালবাসা সৃষ্টি হবে৷ কারণ, তোমার নাযিলকৃত অহীর মধ্যে আমি একথাও পেয়েছি যে, আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি ঈমান পোষণকারী লোকদেরকে তোমার আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরোধিদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবে না৷ "