(৫৮:৭) আল্লাহ যে আকাশ ও পৃথিবীর প্রতিটি জিনিস সম্পর্কে অবগত, সে ব্যাপারে তুমি কি সচেতন নও? ১৮ যখনই তিন ব্যক্তির মধ্যে কোন গোপন কানাঘুষা হয়, তখন সেখানে আল্লাহ অবশ্যই চতুর্থজন হিসেবে উপস্থিত থাকেন৷ যখনই পাঁচজনের মধ্যে গোপন সলাপরামর্শ হয় তখন সেখানে ষষ্ঠ জন হিসেবে আল্লাহ অবশ্যই বিদ্যমান থাকেন৷ ১৯ গোপন সলাপরামর্শকারীরা সংখ্যায় এর চেয়ে কম হোক বা বেশী হোক, এবং তারা যেখানেই থাকুক, আল্লাহ তাদের সাথে থাকেন৷২০ তারপর কিয়ামতের দিন তিনি তাদেরকে জানিয়ে দেবেন তারা কি কি করেছে৷ আল্লাহ সর্বজ্ঞ৷
(৫৮:৮) তুমি কি তাদেরকে দেখনি, যাদেরকে কানাঘুষা করতে নিষেধ করা হয়েছিল৷ তথাপি তারা সে নিষিদ্ধ কাজ করে চলেছে? ২১ তারা লুকিয়ে লুকিয়ে পরস্পরে গোনাহ, বাড়াবাড়ি এবং রসূলের অবাধ্যতার কথাবার্তা বলাবলি করে, আর যখন তোমার কাছে আসে তখন তোমাকে এমনভাবে সালাম করে যেভাবে আল্লাহ তোমাকে ছালাম করেনি৷ ২২ আর মনে মনে বলে যে, আমাদের এসব কথাবার্তার জন্য আল্লাহ আমাদেরকে শাস্তি দেয় না কেন? ২৩ তাদের জন্য জাহান্নামই যথেষ্ট৷ তারা তাতেই দগ্ধ হবে৷ তাদের পরিণাম অত্যন্ত শোচনীয়৷
(৫৮:৯) হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখণ পরস্পরে গোপন আলাপ-আলোচনায় লিপ্ত হও তখন পাপ, জুলুম ও রসূলের অবাধ্যতার কথা বলাবলি করো না, বরং সততা ও আল্লাহভীতির কথাবার্তা বল এবং যে আল্লাহর কাছে হাশরের দিন তোমাদের উপস্থিত হতে হবে, তাঁকে ভয় কর৷২৪
(৫৮:১০) কানাঘুষা একটা শয়তানী কাজ এবং ঈমানদার লোকদের মনে কষ্ট দেয়ার উদ্দেশ্যেই তা করা হয়৷ অবশ্য আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া তারা তাদের কোন ক্ষতি করতে সক্ষম নয়৷ আর মু’মিনদের কর্তব্য হচ্ছে শুধুমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করা৷২৫
(৫৮:১১) হে ঈমানদারগণ! মজলিসে জায়গা করে দিতে বলা হলে জায়গা করে দিও, আল্লাহ তোমাদেরকে প্রশস্ততা দান করবেন৷ ২৬ আর যখন চলে যেতে বলা হবে, তখন চলে যেও৷২৭ তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার ও যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, তাদের মর্যাদা আল্লাহ উন্নীত করবেন৷২৮ বস্তুত আল্লাহ তোমাদের কার্যলাপ সম্পর্কে অবগত৷
(৫৮:১২) হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখণ রসুলের সাথে গোপন আলাপ কর তখণ আলাপ করার আগে কিছু সাদকা দিয়ে নাও৷ ২৯ এটা তোমাদের জন্য অপেক্ষাকৃত ভালো ও পবিত্র৷ তবে যদি সদকা দিতে কিছু না পাও তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়াময়৷
(৫৮:১৩) গোপন আলাপ-আলোচনা করার আগে সাদকা দিতে হবে ভেবে তোমরা ঘাবড়ে গেলে না কি? ঠিক আছে, সেটা যদি না করতে চাও-বস্তুত আল্লাহ তোমাদেরকে তা থেকে অব্যাহতি দিয়ে দিয়েছেন৷ -তাহলে নামায কায়েম করতে ও যাকাত দিতে থাকো এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আদেশ নিষেধ মেনে চলতে থাকো৷ মনে রোখো তোমাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে আল্লাহ ওয়াকিফহাল৷৩০
১৮. এখান থেকে ১০ নং আয়াত পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে মুসলিম সমাজে মুনাফিকরা যে কর্মধারা চালিয়ে যাচ্ছিল তার সমালোচনা করা হয়েছে ৷ বাহ্যত তারা মূসলমানদের সমাজে বসবাস করলেও ভেতরে ভেতরে তারা মুমিনদের থেকে স্বতন্ত্র নিজেদের একটা জোট বানিয়ে রেখেছিল৷ মুসলমানরা যখনই তাদেরকে দেখতো, এটাই দেখতো যে, তারা পরস্পরে কানে কানে ফিস্ ফিস্ করে কথা বলছে৷ এসব গোপন সলাপরামর্শের মধ্য দিয়ে তারা মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি এবং রকমারি ফিতনা-বিভ্রান্তি ও ভয়ভীতি ছড়ানোর জন্য নানা ধরনের চক্রান্ত আঁটতো এবং গুজব রটাতো৷
১৯. এখানে প্রশ্ন জাগে যে, এ আয়াতে দুই ও তিনের বদলে তিন ও পাঁচের উল্লেখের রহস্য কি?প্রথমে দুই এবং তার পরে চার বাদ দেয়া হলো কেন? তাফসীরকারগণ এর অনেকগুলো জবাব দিয়েছেন৷ তবে আমার মতে সঠিক জবাব এই যে, আসলে পবিত্র কুরআনের সাহিত্যিক সৌন্দর্য ও ভাষাগত মাধুর্য বাজায় রাখার জন্যই এই বর্ণনাভংগী অবলম্বন করা হয়েছে৷ এটা না করা হলে বর্ণনা ভংগীটা এ রকম দাঁড়াতোঃ

-----------------------------

এতে () কথাটার শেষ বিন্যাস যেমন সুন্দর হতো না তেমনি () ও () শব্দ দুটির পর পর আসাও শ্রুতিমধুর হতো না৷ () এরপর () বলাটাও একই রকমের শ্রুতিকটু লাগতো৷ এ জন্য প্রথমে তিন ও পাঁচজন ফিসফিসকারীর উল্লেখ করার পর পরবর্তী বাক্যে এই বলে শূন্যতা পূরণ করা হয়েছে যে,

--------------------

"ফিসফিসকারীরা চাই তিনের চেয়ে কম বা পাঁচের চেয়ে বেশী হোক, সর্বাবস্থায় আল্লাহ তাদের সংগে থাকেন৷ "
২০. বান্দার সংগে আল্লাহর এই অবস্থান বা সাহচর্য মূলত আল্লাহর সর্বজ্ঞ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা এবং সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হওয়াকেই বুঝায়৷ এরূপ নয় যে, (নাউজুবিল্লাহ) তিনি কোন ভৌতিক বা জৈবিক ব্যক্তি এবং পাঁচ ব্যক্তির বৈঠকে ষষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে কোথাও আত্মাগোপণ করে অবস্থান করেন৷ আসলে একথা দ্বারা মানুষকে এ মর্মে সচেতন করাই আল্লাহ তা'আলার উদ্দেশ্য যে, সে যতই সুরক্ষিত স্থানে বসে গোপন সলাপরামর্শ করুক না কেন, তাদের কথাবার্তা দুনিয়ার আর কোন কর্ণগোচর না হোক আল্লাহর গোচরীভূত না হয়ে পারে না৷ পৃথিবীর আর কোন শক্তি তাদেরকে পাকড়াও করতে না পারুক আল্লাহর পাকড়াও থেকে তারা কিছুতেই বাঁচতে পারবে না৷
২১. এ বক্তব্য থেকে বুঝা যায় যে, এ আয়াত নাযিল হবার আগে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে এ কাজ করতে নিষেধ করেছিলেন৷ তা সত্ত্বেও যখন তারা এ থেকে নিবৃত্ত হয়নি, সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে এ ভৎসনাপূর্ণ বাণী নাযিল হয়৷
২২. ইহুদী ও মুনাফিক -উভয় গোষ্ঠী এ ধরনের আচরনে লিপ্ত ছিল৷ একাধিক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে কিছু সংখ্যক ইহুদী রসূল (সা) এর দরবারে উপনীত হয়ে বললোঃ () অর্থাৎ "আসাসামু আলাইকা ইয়া আবাল কাসেম"কথাটা এমনভাবে উচ্চারণ করলো যে, শ্রোতা মনে করতে পারে যে, তারা তাকে সালাম দিয়েছে৷ অথচ আসলে তারা আসসামু আলাইকা অর্থাৎ তোমার মৃত্যু হোক৷ রসূল (সা) জবাবে বললেনঃ () অর্থাৎ "তোমাদের ওপরও"৷ হযরত আয়েশা (রা) আত্মরসম্বরণ করতে পারলেন না৷ তিনি বললেন, "তোমাদের মৃত্যু হোক এবং আল্লাহ গযব ও অভিশাপ পড়ুক৷ "রসূল (সা) বললেনঃ হে আয়েশা, আল্লাহ তা'আলা কটু বাক্য পসন্দ করেন না৷ হযরত আয়েশা (রা) বললেনঃ হে রসূল, ওরা কি বলেছে তা কি আপনি শোনেননি? রসূল (সা) বললেনঃ আর আমি কি জবাব দিয়েছি তা তুমি শোনোনি? আমি তাদেরকে বলে দিয়েছে "তোমাদের ওপরও"৷ (বুখারী, মুসলিম, ইবনে জারীর, ইবনে আবী হাতেম) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বলেন, যে মুনাফিক ও ইহুদী উভয় গোষ্ঠী এভাবেই সালাম দিতো৷ (ইবনে জারীর) ৷
২৩. অর্থাৎ তারা এ জিনিসটাকে রসূল (সা) এর রসূল হওয়ার প্রমাণ মনে করতো৷ তারা ভাবতো যে, তিনি রসূল হতেন, তাহলে যে মুহূর্তে আমরা "আসসালামু আলাইকা"র পরিবর্তে "আসসামু আলাইহিকা" বলেছি সে মুহুর্তে আমাদের ওপর আযাব এসে যেতো, আমরা দিনরাত এরূপ আচরণ করা সত্ত্বেও যখণ কোন আযাব আসেনি, তখন ইনি রসূল নন৷
২৪. এ বক্তব্য থেকে বুঝা গেল যে, পরস্পর আলাপ-আলোচনা করা মূলত কোন নিষিদ্ধ কাজ নয়৷ যারা এধরনের আলাপ আলোচনা করে তারা কেমন চরিত্রের লোক, যে পরিবেশে ও পরিস্থিতেতে এরূপ আলোচনা করা হয় তা কি ধরনের পরিবেশ ও পরিস্থিতি এবং যে কথাবার্তা এভাবে গোপনে অনুষ্ঠিত হয় তা কি ধরনের কথাবার্তা, তার ওপরই এর বৈধতা বা অবৈধতা নির্ভরশীল৷ সমাজে যাদের সততা, ন্যায়নিষ্ঠতা ও নির্মল চরিত্রের সর্বব্যাপী -খ্যাতি ও পরিচিতি বিরাজমান, তারা কোথাও গোপন পরামর্শে লিপ্ত দেখলে কারো মনে এরূপ সন্দেহ জন্মে না যে, তারা কোন দুরভিসন্ধিতে বা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে৷ পক্ষান্তরে সমাজে যারা অনাচার ও অপকর্মের হোতা এবং দুশ্চরিত্র রূপে খ্যাত, তাদের গোপন সলাপরামর্শ যে কোন মানুষের মনে এরূপ খটকা ও শংকার জন্ম দেয় যে, একটা কিছু গোলযোগ পাকানোর প্রস্তুতি নিশ্চয়ই চলেছে৷ ঘটনাচক্রে কখনো দুচার ব্যক্তি কোন ব্যাপারে চুপিসারে কিছু আলোচনা সেরে নিলে সেটা কোন আপত্তিকর ব্যাপার হয় না৷ কিন্তু লোক যদি নিজেদের একটা আলাদা স্থায়ী দল বানিয়ে নেয় এবং সাধারণ মুসলামানদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে হরহামেশা গোপন সলাপরামর্শ চালাতে থাকে, তাহলে সেটা অবশ্যই একটা সুর্যোগের পূর্বলক্ষণ৷ আর না হোক, এ দ্বারা অন্তত একটুকু ক্ষতি অবশ্যম্ভাবী যে এতে মুসলমানদের মধ্য দলাদলির ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে৷ সর্বোপরি, যে জিনিসের ওপর এসব গোপন সলাপরামর্শের বৈধ বা অবৈধ হওয়া নির্ভর করে ৷ তা হচ্ছে এ গোপন সলাপরামর্শের উদ্দেশ্যে ও বিষয়বস্তু৷ দুই ব্যক্তি যদি কোন ঝগড়া বিবাদের মীমাংসা করিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে কারো কোন ন্যায্য প্রাপ্য আদায় করিয়ে দেয়ার মানসে অথবা কোন ভালো কাজে অংশ গ্রহণের লক্ষে গোপন আলাপ আলোচনা করে, তবে তা কোন অন্যায় কাজ নয়, বরং তা সওয়াবের কাজ৷ পক্ষান্তরে একাধিক ব্যক্তির সলাপরামর্শের উদ্দেশ্য যদি হয় কোন গোলযোগ ও নাশকতা সংঘটিত করার চক্রান্ত করা, কারো অধিকর নষ্ট করা কিংবা কোন পাপকাজ সংঘটিত করার ফন্দি আঁটা -তাহলে এরূপ অসদুদ্দেশ্য পোষন করাটাই যে এক দুষ্কৃতি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না৷ আর এই অসদুদ্দেশ নিয়ে গোপন সলাপরামর্শ করা দ্বিগুণ পাপ ও দুষ্কৃতি ৷

এ ব্যাপারে যে মজলিসী রীতিনীতি রসূল (সা) শিক্ষা দিয়েছেন তা এই যে,

------------------------------------

"যখন তিন ব্যক্তি এক জায়গায় বসা থাকবে তখন, তাদের মধ্য থেকে দুজনের তৃতীয় জনকে বাদ দিয়ে গোপন সলাপরামর্শ করা উচিত নয়৷ কেননা, এটা তৃতীয় ব্যক্তির মনোকষ্টের কারণ হবে৷ (বুখারী, মুসলিম, মুসনাদে আহমাদ, তিরমিযী, আবু দাউদ৷)

অপর হাদীসে রসূল (সা) বলেনঃ

-----------------------

"তৃতীয় ব্যক্তির অনুমতি না নিয়ে তাকে বাদ দিয়ে দুজনে গোপনে আলোচনা করা চাই না ৷ কারণ সেটা তার জন্য মনোপীড়াদায়ক হবে৷" (মুসলিম) ৷

দুই ব্যক্তি যদি তৃতীয় ব্যক্তির উপাস্থিতিতেই সে বুঝতে পারে না এমন ভাষায় কথা বলে, তাবে সেটাও এ অবৈধ গোপন সংলাপের আওতায় আসে৷ এরচেয়েও জঘন্য অবৈধ কাজ-হলো গোপন সংলাপের সময় কারো দিকে এমনভাবে তাকানো বা ইশারা করা, যাতে বুঝা যায় যে, তাকে নিয়েই তাদের কথাবার্তা চলেছে৷
২৫. একথা বলার উদ্দেশ্য এই যে, কতিপয় ব্যক্তির গোপন সলাপরামর্শ দেখে কোন মুসলমানের মনে যদি এরূপ সন্দেহ জন্মেও যায় যে, এসব সলাপরামর্শ তার বিরুদ্ধেই চলেছে, তা হলেও তার এতটা দুঃখ পাওয়া ও ঘাবড়ে যাওয়া উচিত নয় যে, নিছক সন্দেহের বশেই কোন পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণের চিন্তা তাকে পেয়ে বসে, অথবা তার মনে কোন দুশ্চিন্তা, বিদ্বেষ অথবা অস্বাভাবিক উদ্বেগ ও উৎকন্ঠার সঞ্চার হতে থাকে৷ তার বুঝা উচিত যে, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কেউ তার কোন ক্ষতি করতে পারে না৷ এ আস্থা ও প্রত্যয় তার মনে এমন দুর্জয় শক্তির জন্ম দেবে যে, অনেক ভিত্তিহীন শংকা এবং কাল্পনিক ভয়ভীতি ও উৎকণ্ঠা থেকে সে মুক্তি পেয়ে যাবে৷ দুষ্কৃতিকারীদের চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে সে সম্পূর্ণ নিরুদ্বিগ্ন ও নিশ্চিন্তে মনে আপন কাজে নিয়োজিত থাকবে৷ আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল মু'মিন ব্যক্তি এমন অস্থিরচিত্ত হয় না যে, যে কোন ভীতি ও আশংকা তার মনকে বিচলিত ও অশান্ত করে তুলবে৷ সে এতটা হীনমনাও হয় না যে, দুষ্কৃতিকারীদের উস্কানীতে উত্তেজিত ও ধৈর্যহারা হয়ে নিজেও ইনসাফ বিরোধী কার্যকলাপ করতে আরম্ভ করবে৷
২৬. সূরার ভূমিকায় এর ব্যাখ্যা করা হয়েছে৷ কতক মুফাসির এ আদেশকে শুধুমাত্র রসূল (সা) এর মজলিসের মধ্যে সীমিত মনে করেছেন৷ তবে ইমাম মালেক প্রমুখের এ মতটিই সঠিক যে, মুসলমানদের সকল বৈঠকাদির জন্য এটি একটি স্থায়ী বিধি৷ আল্লাহ ও তার রসূল মুসলিম জাতিকে যে সামাজিক রীতিনীতি, আদব আখলাক ও আচার ব্যবহার শিখিয়েছেন৷ এটি তার অন্যতম৷ আগে থেকে কিছু লোক বসে আছে এমন একটি মজলিসে যখন আরো কিছু লোক যোগ দেবে, তখন আগের সমবেত লোকদের মধ্যে এ সৌজন্য বোধ থাকা বাঞ্ছনীয় যে, স্বতপ্রবৃত্ত হয়ে নবাগতদের জন্য জায়গা করে দেবে এবং নিজেরা যথাসম্ভব চেপে বসে তাদের বসার সুযোগ করে দেবে৷ আবার নবাগতের মধ্যেও এতটা ভদ্রতা থাকা উচিত যে, তারা যেন জোর জবরদস্তির সাথে ভেতরে না ঢোকে এবং একজনকে উঠিয়ে দিয়ে তার জায়গায় বসার চেষ্টা না করে৷ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর ও হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত হাদীসে রসূল (সা) বলেছেনঃ

-----------------------------

"কেউ যেন কাউকে উঠিয়ে তার জায়গায় না বসে৷ তোমরা বরং স্বেচ্ছায় অন্যদের জন্য জায়গা করে দাও৷ " (মুসনাদে আহমাদ, বুখারী মুসলিম) ৷

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস বর্ণনা করেন যে, রসূল (সা:) বলেছেন যে,

-------------

"দুজনের মাঝখানে তাদের অনুমতি ছাড়া জোর পূর্বক চেপে বসা বৈধ নয়৷ "(মুসনাদে আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী) ৷
২৭. আবদুর রহমান বিন যায়েদ বিন আসলাম জানান যে, লোকেরা রসূল (সা) এর মজলিসে দীর্ঘ সময় বসে থাকতো এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বসে থাকার চেষ্টা করতো৷ এতে অনেক সময় রসূল (সা) কষ্ট হতো৷ তাঁর বিশ্রামের যেমন বিঘ্ন ঘটতো, তেমনি কাজকর্মেও অসুবিধার সৃষ্টি হতো৷ এজন্য এ আদেশ নাযীল হয় যে, যখন চলে যেতে বলা হয় তখন চলে যাও৷ (ইবনে জারীর ও ইবনে কাসীর) ৷
২৮. অর্থাৎ এরূপ ভেবো না যে, রসূল (সা) এর মজলিসে অন্যদেরকে জায়গা করে দিতে গিয়ে যদি তোমাদের তার কাছ থেকে একটু দুরে গিয়ে বসতে হয় তাহলে তোমাদের সম্মান হানি ঘটবে, কিংবা তোমাদেরকে চলে যেতে বলা হলে তোমাদের অবমাননা হবে৷ মর্যাদা বৃদ্ধির আসল উৎস হলো ঈমান ও ইসলামী জ্ঞান৷ রসূল (সা) এর মাজলিসে কে তার কতটা নিকটে বসলো এবং কে কত বেশী সময় বসে কাটালো, তা দ্বারা কারো সম্মান নিরূপিত হয় না৷ কেউ যদি রসূল (সা) এর খুব কাছাকাছি বসতে পারে৷ তাহলেই যে তার মর্যাদা বেড়ে যাবে তা নয়৷ মর্যাদা বাড়বে তারই যার ঈমানও ইসলামী জ্ঞান বেশী হবে৷ অনুরূপভাবে কেউ যদি বেশী সময় বসে থেকে আল্লাহর রসূলকে বিব্রত করে তাহলে সে বরঞ্চ মূর্খতার কাজই করে৷ শুধুমাত্র রসুলের (সা) কাছে অধিকতর মর্যদা হবে সে ব্যক্তির যে রসূল (সা) এর সাহচর্য় দ্বারা ঈমান ও ইসলামী জ্ঞানের মত অমূল্য সম্পদ আহরণ করেছে এবং মু'মিন সূলভ স্বভাব ও চরিত্র অর্জন করেছে৷
২৯. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের বর্ণনা অনুসারে এ আদেশের কারণ এই যে, মুসলমানরা রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে (নির্ভৃতে কথা বলার আবেদন জানিয়ে) এত বেশী জিজ্ঞাসাবাদ করতো যে, তিনি বিরক্ত হয়ে ওঠেন৷ অবশেষে আল্লাহ তাঁর ওপর থেকে এ বোঝা হালকা করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন৷ (ইবনে জারীর) যায়েদবিন আসলাম বলেন যে, যে কেউ রসূল (সা) এর সাথে নিভৃতে কথা চলতে চাইতো, তিনি তাতে অসম্মতি জ্ঞাপন করতেন না৷ যার ইচ্ছা হতো, এসে বলতো, আমি একটু নিভৃতে কথা বলতে চাই৷ আর রসূল (সা) তাতে সম্মতি দিতেন৷ এতে পরিস্থিতি এত দূর গড়ালো যে, নিভৃত বলার আদৌ প্রয়োজন হয় না এমন ব্যপারেও অনেকে রসূল (সা) কে কষ্ট দিতে লাগলো৷ এ সময়টা ছিল এমন যে, সমগ্র আরব মদীনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল৷ কখনো কখনো এমনও হতো যে, কোন ব্যক্তি এভাবে রসূল (সা) এর অমুক গোত্র কবে মদিনায় আক্রমণ চালাবে সে খবর দিয়ে গেল৷ এভাবে মদীনার গুজবের ছড়াছড়ি হতো৷ অপর দিকে মুসলমানদের এরূপ আচরণের দরুন মুনাফিকরা একথা বলার সুযোগ পেয়ে যেতো যে, মুহাম্মাদ (সা) যে যা বলে তাই শোনেন, সত্য মিথ্যার বাছবিচার করেন না৷ এসব কারণে আল্লাহ এ বিধিনিষেধ আরোপ করলেন যে, যে ব্যক্তি রসূল (সা) এর সাথে গোপনে কথা বলতে চাইবে, তার আগে সাদকা, দিতে হবে৷ (আহকামুল কুরআন ইবনুল আরাবী) কাতাদাহ বলেন যে, অন্যদের ওপর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার উদ্দেশ্যে কেউ কেউ রসূল (সা) এর সাথে নিভৃতে কথা বলতো৷ হযরত আলী (রা) বলেনঃ এ আদেশ নাযিল হবার পর রসূল (সা) আমাকে জিজ্ঞেস করলেন যে, সাদকা কত ধার্য করা উচিত? এক দীনার? আমি বললাম, এটা মানুষের সাধ্যের বাইরে হবে৷ তিনি বললেনঃ আধা দীনার? আমি বললাম, এটাও তাদের ক্ষমতার আওতাবহির্ভুত৷ তিনি বললেন, তাহলে কত? আমি বললাম, একটা জবের দানা পরিমাণ স্বর্ণ৷ তিনি বললেন, () অর্থাৎ তুমি খুবই কম পরিমাণের পরামর্শ দিলে৷ (ইবনে জারীর, তিরমিযী, মুসনাদে আবু ইয়া'লা) অপর এক বর্ণনা মতে হযরত আলী (রা) বলেনঃ এটি কুরআনের এমন এক আয়াত যা আমি ছাড়া আর কেউ বাস্তবায়িত করেনি৷ এ আদেশ আশা মাত্রই আমি একটি সাদকা দিয়ে রসূল (সা) এর কাছ থেকে একটি মাসায়ালা গোপনে জেনে নেই৷ (ইবনে জারীর, হাকেম, ইবনুল মুনযির, আবদ বিন হুমাইদ৷)
৩০. উপরোক্ত নির্দেশের অল্প দিন পরে এ দ্বিতীয় নির্দেশটি নাযিল হয়৷ এর দ্বারা সাদকার বাধ্যবাধকতা রহিত হয়৷ সাদকার বাধ্যবাধকতা কতদিন ছিল, সে বিষয়ে মতভেদ রয়েছে৷ কাতাদাহ বলেন, একদিনের চেয়েও কম সময় চালু ছিল, তারপর রহিত হয়ে যায়৷ মুকাতেল বিন হাইয়ান বলেন, দশদিন ছিল৷ এটাই এ আদেশ বহাল থাকার সর্বোচ্চা বর্ণিত মেয়াদ৷