(৫৮:১) আল্লাহ অবশ্যই সে মহিলার কথা শুনছেন যে তার স্বামীর ব্যাপারে তোমার কাছে কাকুতি মিনতি করেছে, এবং আল্লাহর কাছে অভিযোগ করছে৷ আল্লাহ তোমাদের দু’জনের কথা শুনছেন তিনি সবকিছু শুনে ও দেখে থাকেন৷
(৫৮:২) তোমাদের মধ্যে যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে “যিহার” করে তাদের স্ত্রীরা তাদের মা নয়৷ তাদের মা কেবল তারাই যারা তাদেরকে প্রসব করেছে৷ এসব লোক একটা অতি অপছন্দনীয় ও মিথ্যা কথাই বলে থাকে৷ প্রকৃত ব্যাপার হলো, আল্লাহ মাফ করেন, তিনি অতীব ক্ষমাশীল৷
(৫৮:৩) যারা৭ নিজের স্ত্রীর সাথে “যিহার” করে বসে এবং তারপর নিজের বলা সে কথা প্রত্যাহার করে এমতাবস্থায় তারা পরস্পরকে স্পর্শ করার পূর্বে একটি ক্রীতদাসকে মুক্ত করতে হবে৷ এর দ্বারা তোমাদের উপদেশ দেয়া হচ্ছে৷ তোমরা যা করো আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত৷
(৫৮:৪) যে মুক্ত করার জন্য কোন ক্রীতদাস পাবে না সে বিরতিহীনভাবে দুই মাস রোযা রাখবে- উভয়ে পরস্পরকে স্পর্শ করার পূর্বেই৷ যে তাও পারবে না সে ষাট জন মিসকীনকে খাবার দেবে৷১০ তোমাদেরকে এ নির্দেশ দেয়া হচ্ছে এ জন্য যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের ওপর ঈমান আনো৷ ১১ এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত ‘হদ’৷ কাফেরদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শাস্তি৷১২
(৫৮:৫) যারা আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের বিরোধীতা করে ১৩ তাদেরকে ঠিক সেইভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করা হবে যেভাবে তাদের পূর্ববর্তীদের লাঞ্ছিত ও অপমানিত করা হয়েছে৷ ১৪ আমি পরিস্কার ও স্পষ্টভাবে সব নির্দেশ নাযিল করেছি৷ কাফেরদের জন্য রয়েছে অপমানকর শাস্তি৷১৫
(৫৮:৬) (এই অপমানকর শাস্তি হবে) সেই দিন যেদিন আল্লাহ তাদের সবাইকে জীবিত করে উঠাবেন এবং তারা কি কাজ করে এসেছে তা জানিয়ে দেবেন৷ তারা ভুলে গিয়েছে কিন্তু আল্লাহ তাদের সব কৃতকর্ম সযত্নে সংরক্ষণ করেছেন৷ ১৬ আল্লাহ সব বিষয়ে সর্বাধিক অবহিত৷
১. এখানে শোনা অর্থ শুধুমাত্র শোনা নয়, বরং বিপদে সাহায্য করা৷ যেমন আমরা সাধারণভাবে বলি, আল্লাহ দোয়া শুনেছেন৷ এর অর্থ আল্লাহ দোয়া কবুল করেছেন৷
২. অনুবাদকগণ সাধারণভাবে এ স্থানে অনুবাদ করেছেন, মহিলা ঝগড়া করছিল, অভিযোগ করছিল৷ আর এ অনুবাদ পড়ে পাঠক এ অর্থ গ্রহণ করে যে, মহিলাটি তার অভিযোগ পেশ করে হয়তো চলে গিয়েছিল এবং পরে কোন এক সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর অহী নাযিল হয়েছিল৷ তাই আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, আমি সে মহিলার কথা শুনেছি, যে তোমার কাছে অনুনয় বিনয় ও ফরিয়াদ করছিল৷ সে সময় আমি তোমাদের উভয়ের কথাবার্তা শুনছিলাম৷ কিন্তু এ ঘটনা সম্পর্কে হাদীসমূহে যেসব বর্ণনা আছে তার অধিকাংশ বর্ণনাতেই বলা হয়েছে, যে সময় সেই মহিলা তার স্বামীর "যিহারের" ঘটনা শুনিয়ে নবীর (সা) কাছে বারবার এ বলে আবেদন করছিল যে তাদের মধ্যে যদি বিচ্ছেদ হয়ে যায় তাহলে সে বিপদগ্রস্থ হয়ে পড়বে এবং তার সন্তান-সন্তুতি ধ্বংস হয়ে যাবে৷ ঠিক এ সময়েই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর অহী নাযিল হওয়ার লক্ষণ পরিষ্ফুট হয়ে উঠলো এবং এ আয়াতগুলো নাযিল হলো৷ এ কারণে আমরা বর্তমান কাল বোধক শব্দ দিয়ে এর অনুবাদ করেছি৷ যে মহিলা সম্পর্কে এ আয়াতগুলো নাযিল হয়েছিল তিনি ছিলেন খাযরাজ গোত্রের খাওলা বিনতে সা'লাবা৷ তাঁর স্বামী ছিলেন আওস গোত্রের নেতা আওস ইবনে সামেত আনসারীর ভাই৷ তাঁর যিহারের ঘটনা আমরা পরে সবিস্তারে বর্ণনা করবো৷ এখানে উল্লেখযোগ্য ব্যপার হলো, আল্লাহর দরবারে এ সাহাবিয়ার অভিযোগে গৃহীত হওয়া এবং আল্লাহর তরফ থেকে সংগে সংগে তাঁর অভিযোগের প্রতিকার করে নির্দেশ নাযিল হওয়া ছিল এমন একটি ঘটনা যার কারণে সাহাবী কিরামের মধ্যে তিনি বিশেষ একটি সম্মান ও মর্যাদার স্থান লাভ করেছিলেন৷ ইবনে আবী হাতেম ও বায়হাকী একটি হাদীসে বর্ণনা করেছেন যে, একবার হযরত 'উমর (রা) কিছুসংখ্যক সংগী-সাথীর সাথে কোথাও যাচ্ছিলেন৷ পথে এক মহিলার সাথে দেখা হলে সে তাঁকে থামতে বললে তিনি সংগে সংগে থেমে গেলেন৷ মাথা নিচু করে দীর্ঘ সময় তার কথা শুনলেন এবং সে নিজে কথা শেষ না করা পর্যন্ত তিনি দাঁড়িয়ে থাকলেন৷ সংগীদের মধ্যে একজন জিজ্ঞেস করলোঃ হে আমীরুল মু'মিনীন, এ বুড়ীর জন্য আপনি কুরাইশ নেতৃবৃন্দকে এত সময় থামিয়ে রেখেছেন কেন? তিনি বললেনঃ সে কে তার কি জান? এ যে, খাওলা বিনতে সা'লাবা৷ এ তো সে মহিলা, সাত আসমানের ওপরে যার অভিযোগ গৃহীত হয়েছে৷ আল্লাহর কসম, তিনি যদি আমাকে সারা রাত দাঁড় করিয়ে রাখতেন তাহলে আমি সারা রাতই দাঁড়িয়ে থাকতাম৷ শুধু নামাযের সময় ওজর পেশ করতাম৷ ইবনে আব্দুল বার তাঁর 'ইসতিয়াব' গ্রন্থে কাতাদার একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন যে, রাস্তায় হযরত উমরের (রা) সাথে এ মহিলার সাক্ষাত হলে তিনি তাকে সালাম দিলেন৷ সালামের জবাব দেয়ার পর তিনি বলতে থাকলেনঃ "ওহ্ উমর এমন এক সময় ছিল যখন আমি তোমাকে "উকাযের" বাজারে দেখেছিলাম৷ তখন তোমাকে উমায়ের বলে ডাকা হতো ৷ তখন তুমি লাঠি হাতে নিয়ে বকরী চরিয়ে বেড়াতে৷ এর অল্প দিন পর তোমাকে "উমর' নামে ডাকা হতে থাকলো৷ অতপর এমন এক সময় আসলো যখন তোমাকে 'আমীরুল মু'মিনীন'বলে সম্বোধন করা শুরু হলো৷ প্রজাদের ব্যপারে অন্তত কিছুটা আল্লাহকে ভয় করো ৷ মনে রেখো, যে আল্লাহর আযাব সম্পর্কিত সাবধানবাণীকে ভয় পায় দূরের মানুষও তাঁর নিকটাত্মীয়ের মত হয়ে যায়৷ আর যে মৃত্যুকে ভয় পায় তার ব্যাপারে আশংকা হয় যে, সে এমন জিনিসও হারিয়ে ফেলবে যা সে রক্ষা করতে চায়"৷ হযরত উমরের (রা) সাথে ছিলেন জারুদ আবদী৷ একথা শুনে তিনি বললেনঃ হে নারী, তুমি আমীরুল মু'মিনের সাথে অনেক বে-আদবী করেছো৷ হযরত 'উমর বললেনঃ তাকে বলতে দাও৷ তুমি কি জান সে কে? তাঁর কথা তো সাত আসমানের ওপরে গৃহীত হয়েছিল৷ 'উমরকে (রা) তো তাঁর কথা শুনতেই হবে৷ 'ইমাম বুখারী ও তাঁর লিখিত ইতিহাস গ্রন্থে সংক্ষেপে এ ঘটনার প্রায় অনুরূপ উদ্ধৃত করেছেন৷
৩. আরবে অনেক সময় এমন ঘটনা ঘটতো যে, স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া বিবাদ হলে স্বামী ক্রোধান্বিত হয়ে বলতো () এর আভিধানিক অর্থ হলো, "তুমি আমার জন্য ঠিক আমার মায়ের পিঠের মত" কিন্তু এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে, আমার তোমার সাথে সহবাস ঠিক আমার মায়ের সাথে সহবাস করার মত৷ এযুগেও বহু নির্বোধ মানুষ স্ত্রীর সাথে ঝগড়া বিবাদ করে তাদের মা, বোন ও মেয়ের মত বলে ফেলে৷ এর স্পষ্ট অর্থ দাঁড়ায় স্বামী এখন আর তাকে স্ত্রী মনে করে না, বরং যেসব স্ত্রীলোক তার জন্য হারাম তাদের মত মনে করে৷ এরূপ করাকেই "যিহার" বলা হয়৷ যিহার আরবী ভাষায় রূপক অর্থে বাহনকে বলা হয়৷ উদাহরণ স্বরূপ সওয়ারী জন্তুকে যিহার বলা হয়৷ কেননা, মানুষ তার পিঠে আরোহণ করে৷ মানুষ যেহেতু স্ত্রীকে নিজের জন্য হারাম করে নেয়ার উদ্দেশ্যে বলতো যে, যিহার বানানো আমার জন্য আমার মাকে যিহার বানানোর মতই হারাম৷ সুতরাং তাদের মুখ থেকে এসব কথা উচ্চারণ করাকেই তাদের ভাষায় "যিহার" বলা হতো৷ জাহেলী যুগে আরবদের কাছে এটা তালাক বা তার চেয়ে অত্যন্ত কঠোর প্রকৃতির সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা বলে মনে করা হতো৷ কারণ, তাদের দৃষ্টিতে এর অর্থ ছিল এই যে, স্বামী তার স্ত্রীর সাথে দাম্পত্য সম্পর্কই ছিন্ন করছে না, বরং তাকে নিজের মায়ের মত হারাম করে নিচ্ছে৷ এ কারণে আরবদের মতে তালাক দেয়ার পর তা প্রত্যাহার করা যেতো৷ কিন্তু "যিহার" প্রত্যাহার করার কোন সম্ভাবনাই অবশিষ্ট থাকতো না৷
৪. এটা যিহার সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা প্রথম ফায়সালা৷ এর অর্থ হলো, কেউ যদি মুখ ফুটে স্ত্রীকে মায়ের মত বলে বসে তাহলে তার বলার কারণ, স্ত্রী তার মা হতে পারে না৷ কোন মহিলার কারো মা হওয়া একটা সত্য ও বাস্তব প্রমাণ ব্যপার৷ কারণ, সে তাকে প্রসব করেছে৷ এ কারণে সে স্থায়ীভাবে হারাম হওয়ার মর্যাদা লাভ করেছে৷ কিন্তু যে নারী তাকে প্রসব করেনি, শুধু মৌখিক কথাতেই সে কিভাবে তার মা হয়ে যাবে? বুদ্ধি-বিবেক, নৈতিকতা এবং আইন-কানুন যে কোন বিচারেই হোক সে কিভাবে প্রকৃত প্রসবকারিনী মায়ের মত হারাম হবে? আল্লাহ তা'আলা এভাবে এ কথাটি ঘোষণা করে সেসব জাহেলী আইন-কানুনকে বাতিল করে দিয়েছেন যার ভিত্তিতে যিহারকারী স্বামীর সাথে তার স্ত্রীর সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যেতো এবং স্ত্রীকে স্বামীর জন্য মায়ের মত অলংঘনীয় হারাম মনে করা হতো৷
৫. অর্থাৎ স্ত্রীকে মায়ের সাথে তুলন করা প্রথমত এমন একটি অর্থহীন ও লজ্জাজনক কথা যা মুখে উচ্চরণ করা তো দূরের কথা কোন শরীফ মানুষের যার কল্পনাও করা উচিত নয়৷ দ্বিতীয়ত, এটি একটি মিথ্যা কথাও বটে৷ কারণ, যে এরূপ কথা বলছে সে যদি এর দ্বারা বুঝিয়ে থাকে যে, তার স্ত্রী এখন তার মা হয়ে গিয়েছে তাহলে সে মিথ্যা বলছে৷ আর সে যদি এ কথাটি তার সিদ্ধান্ত হিসেবে শুনিয়ে থাকে যে, আজ থেকে সে তার স্ত্রীকে মায়ের মর্যাদা দান করেছে তাহলেও তার এ দাবী মিথ্যা৷ কারণ, আল্লাহ তাকে অধিকার দেননি যে, যতদিন ইচ্ছা সে একজন নারীকে স্ত্রী হিসেবে রাখবে এবং যখন ইচ্ছা তাকে মায়ের মর্যাদা দান করবে৷ সে নিজে আইন রচয়িতা নয় বরং আইন রচয়িতা হলেন আল্লাহ৷ আল্লাহ তা'আলা প্রসবকারিনী মায়ের সাথে দাদী, নানী, শ্বাশুড়ী, দুধমা এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীগণকেও মাতৃত্বের মর্যাদা দান করেছেন৷ নিজের স্ত্রীকে তো দূরের কথা নিজের পক্ষ থেকে অন্য কেন নারীকেও এ মর্যাদার অন্তরভুক্ত করার অধিকার কারোই নেই৷ একথা থেকে আরো একটি আইনগত বিধান যা পাওয়া যায় তাহলো, 'যিহার' করা একটি গুরুতর গোনাহ এবং হারাম কাজ৷ যে এ কাজ করবে সে শাস্তির উপযুক্ত৷
৬. অর্থাৎ এটি এমন একটি কাজ যে জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কঠিন শাস্তি পাওয়া উচিত৷ কিন্তু আল্লাহ তা'আলার মেহেরবাণী যে, তিনি প্রথমত যিহারের ব্যাপারে জাহেলী আইন-কানুন বাতিল করে তোমাদের পারিবারিক জীবনকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছেন৷ দ্বিতীয়ত এ অপরাধে অপরাধী ব্যক্তির জন্য সর্বাধিক লঘু শাস্তির ব্যবস্থা করেছেন৷ তার সবচেয়ে বড় মেহেরবানী এই যে, জেল খাটা বা মারপিট আকারে এ অপরাধের শাস্তি বিধান করেননি৷ বরং এমন কিছু ইবাদত ও নেকীর কাজকে এ অপরাধের শাস্তি নির্ধারিত করেছেন যা তোমাদের প্রবৃত্তির সংশোধণ করে এবং সমাজে কল্যাণ ও সুকৃতির বিস্তার ঘটে৷ এ ক্ষেত্রে এ বিষয়টিও বুঝা উচিত যে, কোন কোন অপরাধ এ গোনাহর জন্য যেসব ইবাদতকে কাফ্ফারা নির্ধারণ করা হয়েছে তা ইবাদতের চেতনাবিহীন নিরেট শাস্তি নয়৷ আবার নিছক এমন ইবাদতও নয় যে, তার মধ্যে শাস্তির কষ্টকর কোন দিক আদৌ নেই৷ এর মধ্যে ইবাদাত ও শাস্তি উভয়টিই একত্রিত করা হয়েছে, যাতে ব্যক্তি যুগপত কষ্টও ভোগ করে এবং সাথে সাথে একটি ইবাদাত ও নেকীর কাজ করে তার কৃত গোনাহরও প্রতিকার করে৷
৭. এখান থেকে যিহারের আইনগত আদেশ নিষেধ শুরু হয়েছে৷ এসব বিধি-বিধান সঠিকভাবে উপলব্ধি করার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র যুগে যিহারের যেসব ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল তা সামনে থাকা জরুরী৷ কেননা, যিহারের বিধি-বিধান সম্পর্কিত এসব আয়াত নাযিল হওয়ার পর সংঘটিত ঘটনাসমূহের ক্ষেত্রে নবী (সা) যেসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন তা থেকেই ইসলামে যিহার সম্পর্কিত বিস্তারিত বিধি-বিধা গৃহীত হয়েছে৷

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের বর্ণনা অনুসারে আওস ইবনে সামেত আনসারীর ঘটনাই ইসলামে যিহার সম্পর্কিত সর্ব প্রথম ঘটনা৷ তাঁর স্ত্রী খাওলার ফরিয়াদের জওয়াবে আল্লাহ তা'আলা এসব আয়াত নাযিল করেছেন৷ বিভিন্ন বর্ণনাকারীর নিকট থেকে মুহাদ্দিসগণ এ ঘটনার যে বিস্তারিত বিবরণ উদ্ধৃত করেছেন তাতে অনেক খুঁটি-নাটি মতভেদ আছে৷ তবে আইনগত গুরুত্ব বহন করে এরূপ উপাদান সম্পর্কে সবাই প্রায় একমত৷ এসব বর্ণনার সার কথা হলো, বৃদ্ধাবস্থায় হযতর আওস ইবনে সামেত কিছুটা খিটমিটে মেজাজের হয়ে গিয়েছিলেন৷ কোন কোন বর্ণনা অনুসারে তার মধ্যে কতকটা পাগলামী ভাব সৃষ্টি হয়েছিল৷ এ বিষয়টি বুঝানোর জন্য বর্ণনাকারীগণ () বাক্য ব্যবহার করেছেন৷ আরবী ভাষায় () শদ্ব দ্বারা পাগলামী বুঝানো হয় না, বরং এমন একটি অবস্থাকে বুঝানো হয় যাকে আমরা বাংলায়, "ক্রোধে পাগল হয়ে যাওয়া" কথাটি দ্বারা বুঝিয়ে থাকি৷ এ অবস্থায় তিনি পূর্বেও কয়েকবার স্ত্রীর সাথে যিহার করেছিলেন৷ কিন্তু স্ত্রীর সাথে ঝগড়া বিবাদ করে তার দ্বারা পুনরায় এ ঘটনা সংঘটিত হওয়া ছিল ইসলামে সর্ব প্রথম ঘটনা৷ এ ঘটনার পর তার স্ত্রী রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে হাজির হয় এবং পূরা ঘটনা বর্ণনা করার পর বলেন হে আল্লাহর রসূল, আমার এবং আমার সন্তানাদির জীবনকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার কোন অবকাশ আছে কি? নবী (সা) এর জওয়াব দিয়েছিলেন বিভিন্ন বর্ণনাকারী তা বিভিন্ন বক্তব্যের মাধ্যমে উদ্ধৃত করেছেন৷ কোন কোন বর্ণনার ভাষা হলো, "এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত আমাকে কোন নির্দেশ দেয়া হয়নি৷ " কোন কোন বর্ণনার ভাষা হলো, "আমার ধারণা তুমি তার জন্য হারাম হয়ে গিয়েছো৷ " আবার কোন কোন বর্ণনায় আছে, তিনি বললেন, "তুমি তার জন্য হারাম হয়ে গিয়েছো৷ " এ জবাব শুনে তিনি কাকুতি ও আহাজারী করতে শুরু করলেন৷ তিনি বারবার নবীকে (সা) বললেনঃ সে তো তালাকের শব্দ বলেনি৷ আপনি এমন কোন পন্থা বলুন যার দ্বারা আমি আমার সন্তানাদি এবং বুড়ো স্বামীর জীবন ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা পায়৷ কিন্তু নবী (সা) প্রতিবার তাকে একই জবাব দিচ্ছিলেন৷ ইতিমধ্যে নবীর (সা) ওপর অহী নাযিল হওয়ার অবস্থা দেখা দিল এবং এ আয়াতগুলো নাযিল হলো৷ এরপর তিনি তাকে বললেন, কোন কোন বর্ণনা অনুসারে তার স্বামীকে ডেকে বললেনঃ একটি ক্রীতদাসকে মুক্ত করতে হবে৷ সে এতে তার অক্ষমতা প্রকাশ করলে বললেনঃ লাগাতার দুইমাস রোযা রাখতে হবে৷ সে বললো তার অবস্থা এমন যে, দিনে তিনবার পানাহার না করলে তার দৃষ্টি শক্তি ক্ষীণতর হতে থাকে৷ তিনি বললেনঃ তাহলে ৬০জন মিসকীনকে খাদ্য খাওয়াতে হবে৷ সে বললো তার সে সামর্থ নেই৷ তবে আপনি যদি সাহায্য করেন তাহলে পারবো৷ তিনি তাকে ৬০ জন মিসকীনকে দু'বার খাওয়ানেরা মত খাদ্য দিলেন৷ বিভিন্ন রেওয়ায়াতে প্রদত্ত এ খাদ্যের বিভিন্ন পরিমাণ বর্ণনা করা হয়েছে৷ কোন কোন বর্ণনায় আছে, নবী (সা) যে পরিমাণ খাদ্য দিয়েছিলেন হযরত খাওলা নিজেও তার স্বামীকে সে পরিমাণ খাদ্য দিয়েছিলেন যাতে তিনি কাফ্ফারা আদায় করতে পারেন (ইবনে জারীর, মুসনাদে আহমাদ, আবু দাউদ, ইবনে আবী হাতেম) ৷

যিহারের দ্বিতীয় ঘটনা ছিল সালামা ইবনে সাখার বায়দীর ঘটনা৷ তাঁর যৌন শক্তি ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে কিছু বেশী৷ রমযান মাস আসলে সে আশংকায় রমযানের শেষ অবধি সময়ের জন্য স্ত্রীর সাথে যিহার করলো যাতে রোযা অবস্থায় দিনের বেলায় অধৈর্যের কাজ করে না বসে৷ কিন্তু সে নিজের এ সংকল্প রক্ষা করতে পারেনি৷ এক রাতে সে স্ত্রীর কাছে চলে যায় এবং তারপর লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সব কিছু খুলে বলে৷ তিনি বললেন, একজন ক্রীতদাস মুক্ত করো৷ সে বললো, আমার কাছে আমার স্ত্রী ছাড়া আর কেউ নেই যাকে আমি মুক্ত করতে পারি৷ তিনি বললেন, একাধারে দুই মাস রোযা রাখো৷ সে বললো, রোযা অবস্থায় অধৈর্য হয়েই তো আমি এ মসিবতে জড়িয়ে পড়েছি৷ নবী (সা) বললেন, তাহলে ৬০ জন মিসকীনকে খেতে দাও৷ সে বললো, আমি এত দরিদ্র যে, উপোস করে রাত কাটিয়েছি৷ তখন নবী (সা) বনী যুরাইকের যাকাত আদায়কারীর নিকট থেকে তাকে একটা খাদ্য দিলেন যাতে সে তা ৬০ জন মিসকীনকে বন্টন করে দিতে পারে এবং নিজের সন্তানাদির প্রয়োজন পূরণ করার জন্যও কিছু রাখতে পারে৷ (মুসনাদে আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী) ৷

নাম উল্লেখ না করে তৃতীয় ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে যে, এক ব্যক্তি তার স্ত্রীর সাথে যিহার করলো এবংকাফ্ফারা আদায় করারা পূর্বেই তার সাথে সহবাস করলো৷ পরে নবী (সা) এর কাছে এ বিষয়ের সমাধান জানতে চাইলে তিনি তাকে নির্দেশ দিলেন কাফ্ফারা আদায় না করা পর্যন্ত স্ত্রীর নিকট থেকে দূরে থাকো৷ (আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ) ৷

চতুর্থ ঘটনাটি হলো, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুনলেন এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে বোন সম্বোধন করে ডাকছে৷ এতে তিনি রাগান্বিতভাবে বললেনঃ সে কি তোমার বোন? তবে এটেকে তিনি যিহার হিসেবে গণ্য করলেন না৷ (আবু দাউদ) ৷

এ চারটি ঘটনার নির্ভরযোগ্য বর্ণনা সূত্রে বর্ণিত হাদীসসমূহে পাওয়া যায়৷ পরবর্তী আয়াতসমূহে কুরআন মজীদের 'যিহার' সম্পর্কিত যে নির্দেশ আছে সব হাদীসের সাহায্যে তার ভালভাবে বুঝা যেতে পারে৷
৮. মুল আয়াতাংশ হচ্ছে, () ৷ একথাটির শাব্দিক অনুবাদ হবে, "তারা যা বলেছে যদি সেদিকে ফিরে যায়" কিন্তু আরবী ভাষা ও বাকরীতি অনুসারে এর অর্থ নিরূপণে বড় রকমের মতভেদ হয়েছে৷

এর একটি অর্থ হতে পারে, যিহারের শব্দাবলী একবার মুখ থেকে বের হওয়ার পর পুনরায় তা বলবে৷ জাহেরিয়া, বুকাইর ইবনুল আশাজ্জ এবং ইয়াহইয়া ইবনে যিহাদ আল ফাররা এ অর্থের সমর্থন৷ আতা ইবনে আবী রাবাহর একটি মতও এর সমর্থন করে বলে বর্ণিত হয়েছে৷ তাঁদের মতে একবার যিহার করলে তা ক্ষমার যোগ্য৷ তবে কেউ যদি বার বার তা করে তাহলে তাকে কাফ্ফারা দিতে হবে৷ তবে দুটি কারণে এ ব্যাখ্যা স্পষ্ট ভুল৷ একটি কারণ হলো, আল্লাহ তা'আলা যিহারের অর্থহীন ও মিথ্যা কথা ঘোষণা করে তার জন্য শাস্তি নির্ধারণ করেছেন৷ এখন একথা কি কল্পনা করা যায় যে, কেউ একবার মিথ্যা এবং অর্থহীন কথা বললে তা মাফ হবে কিন্তু দ্বিতীয়বার বললে শাস্তির উপযুক্ত হবে? এটি ভূল হওয়ার দ্বিতীয় কারণ হলো, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যিহারকারী কোন লোককেই একথা জিজ্ঞেস করেননি যে, সে একবার যিহার করেছে না দুইবার৷

এ আয়তাংশের দ্বিতীয় অর্থ হলো, জাহেলী যুগে যেসব লোক এ কাজ করতে অভ্যস্ত ছিল তারা যদি ইসলামের যুগেও তা করে তাহলে এটা হবে তাদের শাস্তি৷ এক্ষেত্রে এর অর্থ হবে যিহার করা মূলত একটা শাস্তিযোগ্য কাজ ৷ যে ব্যক্তিই তার স্ত্রীর উদ্দেশ্যে মুখ থেকে যিহারের শব্দাবলী উচ্চারণ করবে সে পরে তার স্ত্রীকে তালাক দিক বা তার স্ত্রী মারা যাক কিংবা সে তার স্ত্রীর সাথে দম্পত্য সম্পর্ক রক্ষা না করার সংকল্প করুক তাকে কিছু আসে যায় না৷ সর্বাবস্থায় তাকে কাফ্ফারা দিতে হবে৷ ফকীহদের মধ্যে তাউস, মুহাজিদ, শা'বী যুহরী, সুফিয়ান সাওরী এবং কাতাদা এমত পোষণ করেছেন৷ তাঁদের মতে যিহার করার পর স্ত্রী যদি মারা যায় তাহলে কাফ্ফারা আদায় না করা পর্যন্ত স্বামী তার পরিত্যক্ত সম্পদের উত্তরাধীকারী হবে না৷

এ আয়াতাংশের তৃতীয় অর্থ হচ্ছে, যিহারের শব্দাবলী মুখ থেকে উচ্চারণের পর ব্যক্তি যা বলেছে তা প্রত্যাহার করে এবং যদি তার প্রতিকার করতে চায়৷ অন্য কথায় () অর্থ সে যদি তার কথা থেকে ফিরে যায়৷

এর চতুর্থ অর্থ হলো, যিহার করার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তার জন্য যে জিনিস হারাম করে নিয়েছিল তা যদি আবার নিজের জন্য হালাল করে নিতে চায়৷ অন্য কথায় () অর্থ হচ্ছে, যে ব্যক্তি হারাম করে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এখন সে পুনরায় তা হালাল করে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷

অধিকাংশ ফিকাহবিদ শেষোক্ত দুটি অর্থের মধ্যে যে কোন একটিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন৷
৯. অন্য কথায় তোমাদেরকে শিষ্ট ও ভদ্র আচরণ শিখানোর জন্য এ নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যাতে মুসলিম সমাজের মানুষ এ জাহেলী কু আচরণ পরিত্যাগ করে এবং তোমাদের মধ্যে থেকে কেউই যেন এ অর্থহীন কাজ না করে৷ যদি স্ত্রীর সাথে বিবাদ না করে কোন উপায় না থাকে তাহলে সভ্য ও রুচিশীল মানুষের মত বিবাদ করো৷ যদি তালাকই দিতে হয় তাহলে সরাসরি তালাক দিয়ে দাও৷ স্ত্রীর সাথে বিবাদ হলে তাকে মা অথবা বোন বানিয়ে ছাড়তে হবে এটা কি ধরনের ভদ্রতা?
১০. অর্থাৎ কেউ যদি বাড়িতে স্ত্রীর সাথে চুপে চুপে যিহার করে বসে এবং পরে কাফ্ফারা আদায় করা ছাড়াই স্বামী স্ত্রির মধ্যে আগের মতই দাম্পত্য সম্পর্ক চলতে থাকে তাহলে সে সম্পর্কে দুনিয়াতে কেউ অবহিত থাক আর না থাক আল্লাহ সর্বাবস্থায়ই তা জানেন৷ তার জন্য আল্লাহর পাকড়াও থেকে রক্ষা পাওয়া কোনভাবেই সম্ভব নয়৷
১১. এটি যিহার সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ৷ মুসলিম ফিকাহবিদগণ এ আয়াতের শব্দাবলী, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সিদ্ধান্তসমূহ এবং ইসলামের সাধারণ নীতিমালা থেকে এ বিষয়ে যেসব আইন-কানুন রচনা করেছেন তার বিস্তারিত বিরবণ নিম্নরূপঃ

একঃ আবর জাহেলিয়াতের যেসব রসম-রেওয়াজ অনুসারে যিহার বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করে দিত এবং স্ত্রী স্বামীর জন্য চিরতরে হারাম হয়ে যেতো যিহার সম্পর্কিত এসব ইসলামী আইন-কানুন তা বাতিল করে দেয়৷ অনুরূপভাবে যেসব আইনকানুন ও রসম-রেওয়াজ যিহারকে অর্থহীন ও প্রতিক্রিয়াহীন মনে করে এবং স্ত্রীকে মা কিংবা বিয়ে করা হারাম এমন মহিলাদের সাথে তুলনা করা সত্ত্বেও স্বামী তার সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রাখা বৈধ করে দেয় ইসলামী আইন-কানুন সে সবকেও বাতিল করে দেয়৷ কারণ ইসলামের দৃষ্টিতে মা এবং বিয়ে করা হারাম এমন অন্য সব মহিলার হারাম হওয়ার ব্যাপারটা মামুলি কোন বিষয় নয়৷ তাই স্ত্রী এবং তাদের মধ্য তুলনা করার বিষয়টা মুখে উচ্চারণ করা তো দূরের কথা তা কল্পনাও করা যায় না৷ এ ব্যাপারে দুটি চরম পন্থার মধ্যে ইসলামী আইন যে ভূমিকা গ্রহণ করেছে তা তিনটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ৷ প্রথম ভিত্তি হলো, যিহার দ্বারা বিবাহ বন্ধন ছিন্ন হয়না৷ বরং মহিলা যথারীতি স্বামীর স্ত্রীই থাকে৷ দ্বিতীয় ভিত্তি হলো, যিহার দ্বারা স্ত্রী সাময়িকভাবে স্বামীর জন্য হারাম হয়ে যায়৷ তৃতীয় ভিত্তি হলো, স্বামী কাফ্ফারা আদায় না করা পর্যন্ত এই 'হুরমত' অবশিষ্ট থাকে এবং শুধু কাফ্ফারাই এই 'হুরমত' রহিত করতে পারে৷

দুইঃ যিহারকারী স্বামী সম্পর্কে এ ব্যাপারে সবাই একমত যে, যে স্বামী সুস্থ বুদ্ধি ও প্রাপ্ত বয়স্ক এবং সুস্থ ও সজ্ঞানে যিহারের শব্দাবলী মুখ থেকে উচ্চারণ করবে কেবল তার যিহার গ্রহণযোগ্য হবে৷ শিশু ও বিকৃত মস্তিষ্ক ব্যক্তির যিহার গ্রহণযোগ্য নয়৷ তাছাড়া যিহারের শব্দাবলী উচ্চারণের সময় যার বিবেক -বুদ্ধি ও মস্তিষ্ক সুস্থ নাই তার যিহারও গ্রহণযোগ্য হবে না৷ যেমন কেউ ঘুমন্ত অবস্থা অস্ফুট স্বরে কিছু বললো অথবা কোন প্রকার সংজ্ঞানহীনতায় আক্রন্ত হলো৷ এগুলো ছাড়া নিম্ব বর্ণিত বিষয়সমূহে ফিকাহবিদদের মতভেদ আছেঃ

(ক) নেশাগ্রস্থ অবস্থায় যিহারকারী সম্পর্কে চার ইমামসহ ফিকাহবিদদের ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের মত হচ্ছে, কেউ যদি জেনে শুনে মাদকদ্রব্য ব্যবহার করে তাহলে তালাকের মত তার যিহারও আইনত সঠিক বলে ধরে নেয়া হবে৷ কারণ সে নিজেই নিজের ওপর এ অবস্থা চাপিয়ে নিয়েছে৷ তবে কেউ যদি রোগের জন্য কোন ওষুধ ব্যবহার করে এবং তা দ্বারা নেশা ও মাদকতা সৃষ্টি হয়ে থাকে অথবা তীব্র পিপাসায় জীবন রক্ষার জন্য শরাব পান করতে বাধ্য হয়ে থাকে তবে এভাবে সৃষ্ট নেশার তার যিহার ও তালাক কার্যকর করা হবে না৷ হানাফী, শাফেয়ী, ও হাম্বলী মাযহাবের অনুসারীগণ এ মতটিই গ্রহণ করেছেন৷ সাধারণভাবে সাহাবা কিরামের মতও এটিই ছিল৷ পক্ষান্তরে হযরত উসমানের (রা) মত হলো, নেশাগ্রস্থ অবস্থায় তালাক ও যিহার গ্রহণযোগ্য নয়৷ হানাফীদের মধ্য থেকে ইমাম তাহাবী (র) ও কারখী (র) এ মতটিকে অগ্রাধিকার দান করেন এবং ইমাম শাফেয়ীদের (র) একটি মতও এর সমর্থন করে৷ মালেকীদের মতে ব্যক্তি যদি সম্পূর্ণরূপে বিচার বুদ্ধি খুইয়ে না বসে বরং সংলগ্ন ও সাজানো গোছানো কথাবার্তা বলতে থাকে এবং কি বলেছে সে উপলব্ধি থাকে তাহলে নেশাগ্রস্থ অবস্থায় যিহারও গ্রহণযোগ্য হবে৷

(খ) ইমাম আবু হানিফা (র) ও ইমাম মালেকের (র) মত কেবল মুসলমান স্বামীর যিহারই গ্রহণযোগ্য হবে৷ যিহার সম্পর্কিত এসব বিধি-নিষেধ যিম্মিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় না৷ কারণ কুরআন মজীদে () বলে মুসলমানদের সম্বোধন করা হয়েছে৷ তাছাড়া কুরআন মজীদে যিহারের যে তিন প্রকার কাফ্ফারার কথা বলা হয়েছে তার মধ্যে রোযাও অন্তরভুক্ত আছে৷ একথা সুস্পষ্ট যিম্মিদের জন্য প্রযোজ্য হতে পারে না৷ ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমাদের মতে এসব আদেশ নিষেধ যিম্মী ও মুসলমান উভয়ের যিহারের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে৷ তবে যিম্মীদের রোযা রাখতে হবে না৷ তারা শুধু একজন ক্রিতদাসকে মুক্ত করবে অথবা ৬০ জন মিসকীনকে খেতে দেবে৷

(গ) পুরুষের মত নারীও কি যিহার করতে পারে? যেমনঃ সে যদি স্বামীকে বলে, তুমি আমার জন্য আমার বাপের মত অথবা আমি তোমার জন্য তোমার মায়ের মত তাহলে কি তা 'যিহার' বলে গণ্য হবে? চার ইমামের মতে এটা যিহার হবে না৷ এবং এক্ষেত্রে যিহারের আইনগত বিধি বিধান আদৌ প্রযোজ্য হবে না৷ কেননা, স্বামী যদি স্ত্রীর সাথে যিহার করে কেবল তখনই এই বিধি বিধান প্রযোজ্য হবে বলে কুরআন মজীদে স্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা করেছে () এবং যিহার করার ইখতিয়ার কেবল তারই থাকবে যার তালাক দেয়ার অধিকার আছে৷ ইসলামী শরীয়াত স্বামীকে তালাক দেয়ার ইখতিয়ার যেমন স্ত্রীকে দেয়নি ঠিক তেমনি নিজেকে স্বামীর জন্য হারাম করে নেয়ার ইখতিয়ারও দেয়নি৷ সুফিয়ান সাওরী, ইসহাক ইবনে রাহবিয়া, আবু সাওর এবং লাইস ইবনে সাদ এমতটিই পোষণ করেছেন৷ তাদের মতে, স্ত্রীর এরূপ কথা অযথা ও অর্থহীন৷ ইমাম আবু ইউসূফ বলেন, এতে যিহার হবে না৷ তবে এর দ্বারা স্ত্রীর ওপর কসমের কাফ্ফারা দেয়া অত্যাবশ্যকীয় হবে৷ কারণ স্ত্রীর একথা বলার অর্থ হচ্ছে সে তার স্বামীর সাথে সম্পর্ক না রাখার শপথ করেছে৷ ইবনে কুদামাহ উদ্ধৃত করেছেন যে, এটি ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বালের (র) ও মত৷ ইমাম আওযায়ী (র) বলেন, স্ত্রী যদি বিয়ে হওয়ার আগে একথা বলে থাকে যে, তার যদি অমুক ব্যক্তির সাথে বিয়ে হয় তাহলে সে তার জন্য তার বাপের মত তা যিহার বলে গন্য হবে৷ আর যদি বিয়ের পর বলে থাকে তাহলে কসম বলে গণ্য হবে৷ এক্ষেত্রে শুধু কসমের কাফ্ফারা দিতে হবে৷ তবে কাফ্ফারা আদায়ের পূর্বে স্বামীকে কাছে আসতে বাধা দেয়ার কোন অধিকার নারীর থাকবে না৷ এর সমর্থনে ইবরাহীম নাখয়ী একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন৷ ঘটনাটি হলো, তালহার (রা) কণ্যা আয়েশাকে বিয়ে করার জন্য হযরত যুবায়েরের পুত্র মুসআব প্রস্তাব দিলে সে প্রত্যাখান করে বলে; আমি যদি তাকে বিয়ে করি তাহলে () সে আমার পিতার পিঠের মত৷ এর কিছুকাল পর সে তার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে সম্মত হয়৷ এব্যাপারে মদীনার উলামাদের নিকট থেকে ফতোয়া চাওয়া হলে বহু সংখ্যক ফকীহ ফতোয়া দিলেন যে, আয়েশাকে যিহারের কাফ্ফারা দিতে হবে৷ এসব ফকিদের মধ্যে কয়েকজন সাহাবীও অন্তরভুক্ত ছিলেন৷ এ ঘটনা বর্ণনা করার পর হযরত ইবরাহীম নাখয়ী মত প্রকাশ করেছেন যে, আয়েশা যদি বিয়ের পর একথা বলতে তাহলে কাফ্ফারা দিতে হতো না৷ কিন্তু তিনি এ কথা বলেছিলেন বিয়ের পূর্বে, যখন তাঁর বিয়ে করা বা না করার অধিকার ছিল তাই তার ওপর কাফ্ফারা দেয়া ওয়াজিব৷

তিনঃ সুস্থ বিবেকবুদ্ধি সম্পন্ন ও প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তি যদি সজ্ঞানে সুস্থ শরীরে যিহারের শব্দাবলী মুখ থেকে উচ্চারণ করে এবং পরে যুক্তি দেখিয়ে বলে যে, সে ক্রুদ্ধ হয়ে, হাসি তামাসা করে অথবা আদর সোহাগ করে এরূপ বলেছে কিংবা তার যিহারের নিয়ত ছিল না তাহলে এ ওপর গ্রহনযোগ্য হবে না৷ তবে যেসব শব্দ থেকে স্পষ্টপভাবে যিহার বুঝায় না এবং যেসব শব্দের ভিন্ন ভিন্ন অর্থের অবকাশ আছে সেসব শব্দের ধরন ও প্রকৃতির ওপর তার সিদ্ধান্ত নির্ভর করে৷ যিহারের স্পশ্ট শব্দ কোনগুলো এবং অস্পষ্ট শব্দ কোনগুলো সে সম্পর্কে আমরা পরে আলোচনা করবো৷

চারঃএটা সর্বসম্মত ব্যাপার যে, বিবাহিত স্ত্রীর সাথেই কেবল যিহার করা যায়৷ অতএব স্ত্রী ছাড়া অন্য কোন নারীর সাথে যিহার করা যায় কিনা সে বিষয়ে মতভেদ আছে৷ এ বিষয়ে বিভিন্ন মত নিম্নরূপঃ

হানাফীদের মতে কেউ যদি অপর কোন নারীকে বলে, "আমি যদি তোমাকে বিয়ে করি তাহলে তুমি আমার জন্য ঠিক আমার মায়ের পিঠের মত৷ " এক্ষেত্রে সে যখনই তাকে বিয়ে করুক না কেন, কাফ্ফারা আদায় করা ছাড়া তাকে স্পর্শ করতে পারবে না৷ এটি হযরত 'উমরের (রা)ও ফতোয়া৷ তাঁর খিলাফত যুগে এক ব্যক্তি এক মহিলাকে একথা বলেছিল এবং পরে তাকে বিয়ে করেছিল৷ হযরত উমর (রা) বললেন, তাকে যিহারের কাফ্ফারা দিতে হবে৷

মালেকী এবং হাম্বলী মাযহাবের অনুসারীগণও এ কথাই বলেন৷ এর সাথে তারা অতিরিক্ত এতটুকু সংযোজিত করেন যে, যদি নির্দিষ্ট করে কোন মহিলার কথা না বলে এভাবে বলে যে, সমস্ত নারীই আমার জন্য এরূপ, এমতাবস্থায় সে যে নারীকেই বিয়ে করুক না কেন তাকে স্পর্শ করার আগেই কাফ্ফারা দিতে হবে৷ সাঈদ ইবনুল মুসাইয়েব, উরওয়া ইবনে যুবায়ের, আতা ইবনে আবী রাবাহ, হাসান বাসরী এবং ইসহাক ইবনে রাহবিয়া এমতটিই পোষণ করেছেন৷

শাফেয়ী মাযহাবের ফকীহদের মতে, বিয়ের পূর্বে যিহার অর্থহীন৷ ইবনে আব্বাস এবং কাতাদাও এ মতটিই পোষণ করেন৷

পাঁচঃ যিহার কি একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত হতে পারে? হানাফী এবং শাফেয়ী মাযহাবের ফকীহদের মতে, কেউ যদি নির্দিষ্ট সময় উল্লেখ করে যিহার করে তাহলে সেই সময়ের স্ত্রীকে স্পর্শ করলে কাফ্ফারা দিতে হবে৷ তবে সেই সময় অতিক্রম হলে যিহার অকার্যকর হয়ে পড়বে৷ এর প্রমাণ সালামা ইবনে সাখর বায়াদীর ঘটনা৷ তিনি তাঁর স্ত্রীর সাথে রমযান মাসের জন্য যিহার করেছিলেন কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলেননি, যে সময় নির্দিষ্ট করা অর্থহীন৷ পক্ষান্তরে ইমাম মালেক এবং ইবনে আবী লায়লা, বলেনঃ যিহার যখনই করা হোক না কেন তা সব সময়ের জন্য হবে৷ এক্ষেত্রে সময় নির্দিষ্ট করার কোন কার্যকারিতা থাকবে না৷ কারণ, যে 'হুরমত, কার্যকর হয়েছে সময় অতিক্রান্ত হওয়ার সাথে সাথে তা আপনা থেকেই শেষ হয়ে গিয়েছে৷

ছয়ঃ শর্তযুক্ত যিহার করা হয়ে থাকলে যখনই শর্ত ভঙ্গ হবে কাফ্ফারা দিতে হবে৷ যেমনঃ কেউ যদি স্ত্রীকে বলে, "আমি যদি ঘরে প্রবেশ করি তাহলে তুমি আমার জন্য আমার মায়ের পিঠের মত" এমতাবস্থায় সে যখনই ঘরে প্রবেশ করবে কাফ্ফারা আদায় করা ছাড়া সে স্ত্রীকে স্পর্শ করতে পারবে না৷

সাতঃ একই স্ত্রীর উদ্দেশ্যে কয়েকবার যিহারের শব্দাবলী বলা হয়ে থাকলে তা একই বৈঠকে বলা হয়ে থাক বা ভিন্ন ভিন্ন বৈঠকে বলা হয়ে থাক, সর্বাবস্থায়ই তা যথবার বলা হয়েছে ততবার কাফ্ফারা দিতে হবে৷ তবে যিহারের শব্দাবলী ব্যবহারকারী যদি তা একবার ব্যবহার করার শুধু পূর্বের কথার ওপর জোর দেয়ার উদ্দেশ্যে তা বারবার বলে তাহলে ভিন্ন কথা৷ পক্ষান্তরে ইমাম মালেক ও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল বলেনঃ কথাটি বারবার বলার নিয়তে বলা হোক কিংবা জোর দেয়ার জন্য বলা হোক, যতবারই বলা হোক না কেন সেজন্য একবারই কাফ্ফারা দিতে হবে৷ শা'বী, তাউস, আতা ইবনে আবী রাবাহ, হাসান বাসরী, এবং আওযায়ী রাহিমাহুমুল্লাহ এ মতেরই অনুসারী৷ এ বিষয়ে হযরত আলীর ফতোয়া হলো, কথাটি যদি একই বৈঠকে বার বার বলা হয়ে থাকে তাহলে সেজন্য একবার মাত্র কাফ্ফারা দিতে হবে ৷ কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন বৈঠকে বলা হলে যত সংখ্যক বৈঠকে বলা হয়েছে ততবার কাফ্ফারা দিতে হবে৷ এটি কাতাদা এবং আ'মর ইবনে দীনারেরও মত৷

আটঃ দুই বা দুয়ের অধিক সংখ্যক স্ত্রীর সাথে একসাথে যিহার করা হলে, যেমনঃ স্বামী তাদেরকে উদ্দেশ্যে করে বললো যে, তোমরা আমার জন্য ঠিক আমার মায়ের পিঠের মত, তাহলে হানাফী, ও শাফেয়ীদের মতে, প্রত্যেককে হালাল করার জন্য আলাদা আলাদা কাফ্ফারা দিতে হবে৷ এটি হযরত 'উমর' (রা) , হযরত আলী (রা) , উরওয়া ইবনে যুবায়ের, তাউস, আতা, হাসান বাসরী, ইবরাহীম নাখয়ী, সুফিয়ান সাওরী, এবং ইবনে শিহাব যুহরীর মত৷ ইমাম মালেক (র) এবং ইমাম আহমাদ (র) বলেন, এক্ষেত্রে সবার জন্য একবারই কাফ্ফারা দিতে হবে৷ রাবীয়া, আওযায়ী, ইসহাক ইবনে রাহবিয়া এবং আবু সাওরও এমতের অনুসারী৷

নয়ঃ কেউ যদি এক যিহারের কাফ্ফারা দেয়ার পর পুনরায় যিহার করে বসে তাহলে পুনরায় কাফ্ফারা দেয়া ছাড়া স্ত্রী তার জন্য হালাল হবে না৷

দশঃ কেউ যদি কাফ্ফারা দেয়ার আগেই স্ত্রীকে স্পর্শ করে বসে তাহলে চার ইমামের মতে যদিও একাজ গোনাহ কিন্তু তাকে একটি কাফ্ফারা দিতে হবে৷ তবে তার ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত এবং পুনরায় এ কাজ না করা উচিত৷ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে যারা এরূপ করেছিল তিনি তাদের বলেছিলেন৷ ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং যতক্ষণ কাফ্ফারা না দিবে ততক্ষণ স্ত্রী থেকে আলাদ থাকো৷ কিন্তু এজন্য তিনি যিহারের কাফ্ফারা ছাড়া আর কোন কাফ্ফারা দিতে হবে বলে নির্দেশ দেননি৷ হযরত আমর ইবনুল আস, কাবিসা ইবনে যুয়াইব, সাঈদ, ইবনে জুবায়ের যুহরী এবং কাতাবা বলেন, তাকে দুইটি কাফ্ফারা দিতে হবে৷ এবং হাসান বাসরী ও ইবরাহীম নাখয়ীর মতে তিনটি কাফ্ফারা দিতে হবে৷ এ বিষয়ে যেসব হাদীসে নবীর (সা) কায়সালা বর্ণিত হয়েছে উক্ত মনিষীদের কাছে সম্ভবত সে সব হাদীস পৌছেনি৷

এগারঃ স্ত্রীকে কাদের সাথে তুলনা করলে যিহার হবে? এ বিষয়ে ফিকাহবিদদের মধ্যে মতভেদ আছেঃ

আমের শা'বী বলেন, কেবলমাত্র মায়ের সাথে তুলনা করলেই যিহার হবে৷ জাহেরিয়াগণ বলেনঃ মায়েরও শুধু পিঠের সাথে তুলনা করলে যিহার হবে৷ অন্য কোন কথার ওপর এ নির্দেশ প্রযোজ্য হবে না৷ কিন্তু এ বিষয়ে ফিকাহবিদদের কোন গোষ্ঠিই তাঁর ঐকমত্য পোষণ করেননি৷ কারণ মায়ের সাথে স্ত্রীর তুলনা করাকে কুরআন কর্তৃক গোনাহর কাজ বলার কারণ হলো, এটা একটা চরম অর্থহীন ও মিথ্যা কথা৷ এখন একথা সুস্পষ্ট যে, যেসব নারী মায়ের মতই হারাম, তাদের সাথে স্ত্রীকে তুলনা করা অর্থহীনতা ও মিথ্যাবাদীতার দিক থেকে এর চেয়ে কোন অংশ কম নয়৷ তাই মায়ের সাথে তুলন করার ক্ষেত্রে বিধান প্রযোজ্য এ ক্ষেত্রেও সেই একই বিধান প্রযোজ্য না হওয়ার কোন কারণ থাকতে পারে না৷

হানাফীদের মতে যেসব নারী বংশ, দুগ্ধদান অথবা দাম্পত্য সম্পর্কের কারণে কারো জন্য চিরস্থায়ী হারাম তারা সবাই এ বিধানের অন্তুরভুক্ত৷ কিন্তু যেসব নারী অস্থায়ীভাবে, হারাম এবং যে কোন সময় হালাল হতে পারে তারা এর অন্তরভুক্ত না৷ যেমন, স্ত্রীর বোন, খালা, ফুফু, অন্যান্য নারী যারা তার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ নয়৷ চিরস্থায়ী হারাম মহিলাদের মধ্যে থেকে কোন মহিলার যে অংগের প্রতি দৃষ্টিপাত করা কারো জন্য হালাল নয় তার সাথে তুলনা করাই যিহার বলে গণ্য হবে৷ তবে স্ত্রীর হাত, পা, মাথা, চুল, দাঁত, ইত্যাদিকে চিরস্থায়ী হারাম নারীর পিঠের সাথে অথবা স্ত্রীকে তার মাথা, হাত ও পায়ের মত দৈহিক অংগ-প্রত্যাংগের সাথে তূলনা করা যিহার বলে গণ্য হবে না৷ কারণ, মা ও বোনের এসব অংগ প্রত্যাংগের প্রতি তাকানো হারাম নয়৷ অনুরূপভাবে তোমার হাত আমার মায়ের হাতের মত অথবা তোমার পা আমার মায়ের পায়ের মত বলায় যিহার হবে না৷

শাফেয়ীদের মতে, কেবল সেসব নারীই এ নির্দেশের অন্তরভুক্ত হবে যারা চিরদিন হারাম ছিল এবং চিরদিন হারাম থাকবে৷ অর্থাৎ মা, বোন, মেয়ে ইত্যাদি৷ কিন্তু যেসব নারী কোন সময় হালাল ছিল যেমন, দুধ, মা, দুধ বোন, শাশুড়ী, এবং পুত্রবধু অথবা যে সব নারী কোন সময় হালাল হতে পারে৷ যেমন শ্যালিকা৷ এসব বিশেষ কারণে হারাম বা সাময়িক ও অস্থায়ী হারাম নারী ছাড়া স্থায়ী হারাম নারীদের প্রতি সম্মান ও মর্যাদা দেখানো জন্য সাধারণত যে সব অংগের কথা উল্লেখ করা হয় না স্ত্রীকে যদি সেসব অংগের সাথে তূলনা করা হয় তাহলে সে ক্ষেত্রে তার যিহার বলে গণ্য হবে৷ তবে যেসব অংগ-প্রত্যাংগের উল্লেখ সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শনের জন্য করা হয় তার সাথে তুলনা করা কেবল তখনই যিহার হবে যখন তা যিহারের নিয়তে বলা হবে৷ যেমন, স্ত্রীকে একথা বলা, তুমি আমার মায়ের চোখ অথবা জানের মত অথবা মার হাত অথবা পা অথবা পেটের মত, অথবা মায়ের পেট অথবা বক্ষস্থলে স্ত্রীর সাথে পেট অথবা বক্ষস্থলের সাথে তুলন করা, অথবা স্ত্রীর মাথা, পিঠ, অথবা হাতকে নিজের জন্য মায়ের হাতের মত মনে করা, অথবা স্ত্রীকে একথা বলা যে, তুমি আমার জন্য আমার মায়ের মত৷ এসব কথা যদি যিহারের নিয়তে বলা হয়ে থাকে তাহলে যিহার হবে, আর যদি সম্মান দেখানো নিয়তে বলা হয়ে থাকে তাহলে সম্মান প্রদর্শনই হবে৷

মালেকীগণ বলেন, যেসব নারী পুরুষের জন্য হারাম তাদের সাথে স্ত্রীকে তুলন করাই যিহার৷ এমন কি তাদের মতে, স্বামী যদি বলে, তুমি আমার জন্য অমুক পরনারীর পিঠের মত তাহলে তাও যিহারের সংজ্ঞায় পড়ে৷ তারা আরো বলেন, মা এবং চিরস্থায়ী হারাম মহিলাদের কোন অংগের সাথে স্ত্রীকে কিংবা স্ত্রীর কোন অংগকে তুলনা করা যিহার৷ এ ক্ষেত্রে এমন কোন শর্ত নেই যে, সেসব অংগ এমন হতে হবে যার প্রতি দৃষ্টিপাত করা হালাল নয়৷ কারণ স্ত্রীর প্রতি যেভাবে দৃষ্টিপাত করা হয় সেভাবে মায়ের কোন অংগের প্রতিই দৃষ্টিপাত করা হালাল নয়৷

হাম্বলী মাযহাবের ফিকাহবিদগণ হারাম মহিলাদের সবাইকে এ নির্দেশের অন্তরভুক্ত বলে মনে করেন৷ তাই চাই স্থায়ী হারাম হোক অথবা ইতিপূর্বে কখনো হালাল ছিল এখন চিরদিনের জন্য হারাম হয়ে গিয়েছে৷ যেমনঃ শ্বাশুড়ী ও দুধমা৷ তবে যেসব মহিলা পরবর্তী কোন সময় হালাল হতে পারে যেমনঃ শ্যালিকা৷ তাদের ব্যাপারে ইমাম আহমাদের একটি মত হলো, তাদের সাথে যিহার হবে না৷ তাছাড়াও হাম্বলী মাযহাবের অনুসারীদের মতে স্ত্রীর কোন অংগকে হারাম মেয়েদের কোন অংগের সাথে তুলনা করা যিহারের সংজ্ঞায় পড়ে৷ তবে চুল, নখ ও দাঁতের মত শরীরের অস্থায়ী অংগসমূহ এ নির্দেশের বহির্ভূত৷

বারঃ এ ব্যপারে সমস্ত ফিকাহবিদগণ একমত যে, কেউ যদি তার স্ত্রীকে বলে, "তুমি আমার জন্য আমার মায়ের পিঠের মত"তাহলে তা স্পষ্ট যিহার হবে৷ করণ, আরবদের মধ্যে এটাই যিহারের নিয়ম হিসেবে প্রচলিত ছিল৷ আর এ বিষয়টি সম্পর্কেই কুরআনের নির্দেশ নাযিল হয়েছে৷ অন্য সব বাক্যের কোনটি দ্বারা স্পষ্ট যিহার হবে আর কোনটি দ্বারা যিহার হবে না, বরং সেক্ষেত্রে যিহার হওয়া না হওয়ার সিদ্ধান্ত বক্তার নিয়ত অনুসারে করা হবে৷ এ ব্যাপারে ফিকাহবিদদের মধ্যে মতভেদ আছে৷

হানাফীদের মতে, যেসব বাক্য দ্বারা হালাল নারীকে (স্ত্রী) স্পষ্টভাবে হারাম নারীর (স্থায়ী হারাম নারীদের কোন একজন) সাথে তুলনা করা হয়েছে, অথবা যে অংগের দিকে দৃষ্টিপাত করা হালাল নয় এমন অংগের সাথে তুলনা করা হয়েছে৷ যেমন কেউ তার স্ত্রীকে বললোঃ তুমি আমার জন্য মা অথবা অমুক হারাম নারীর পেট অথবা উরুর মত৷ এছাড়া অন্য সব বাক্য সম্পর্কে মতভেদ করার অবকাশ আছে৷ কেউ যদি বলেঃ "তুমি আমার জন্য আমার মায়ের পিঠের মত হারাম৷ ইমাম আবু হানিফার মতে এটা স্পষ্ট যিহার৷ কিন্তু ইমাম আবু ইউসূফ ও ইমাম মুহাম্মাদের মতে এক্ষেত্রে যিহারের নিয়ত থাকলে যিহার হবে এবং তালাকের নিয়ত থাকলে তালাক হবে৷ যদি বলে, তুমি যেন আমার মা অথবা আমার মায়ের মত তাহলে এক্ষেত্রে সাধারণভাবে হানাফীদের ফতোয়া হলো, যিহারের নিয়তে একথা বলা হয়ে থাকলে যিহার হবে এবং তালাকের নিয়তে বলা হয়ে থাকলে বায়েন তালাক হবে এবং উদ্দেশ্যহীনভাবে বলা হয়ে থাকলে অর্থহীন বাক্য হবে৷ কিন্তু ইমাম মুহাম্মাদের মতে এটা অকাট্যভাবে যিহার৷ কেউ যদি স্ত্রীকে মা অথবা বোন অথবা কন্যা বলে সম্বোধন করে তাহলে এটা চরম অর্থহীন ও বাজে কথা৷ এরূপ কথায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ক্রোধ প্রকাশ করেছিলেন৷ কিন্তু তাকে যিহার বলে গন্য করেননি৷ কেউ যদি বলে "তুমি আমার জন্য মায়ের মতই হারাম" যদি যিহারের নিয়তে বলে তাহলে যিহার হবে তালাকের নিয়তে বললে, তালাক হবে৷ আর কোন নিয়ত না থাকলে যিহার হবে৷ যদি বলে "তুমি আমার জন্য মায়ের অনুরূপ অথবা মায়ের মত" তাহলে উদ্দেশ্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে৷ যদি সম্মান ও মর্যাদা বুঝানোর জন্য বলে থাকে তাহলে সম্মান মর্যাদা দেখানো বলে গণ্য হবে ৷ যিহারের নিয়তে বলা হয়ে থাকলে যিহার হবে৷ তালাকের নিয়তে বলে থাকলে তালাক হবে৷ কোন নিয়ত না থাকলে এবং এমনি বলে থাকলে ইমাম আবু হানিফার মতে অর্থহীন কথা হবে, ইমাম আবু ইউসূফের মতে মতে তাকে যিহারের কাফ্ফারা দিতে হবে না তবে কসমের কাফ্ফারা দিতে হবে এবং ইমাম মুহাম্মাদের মতে যিহার হবে৷

শাফেয়ী ফিকাহবিদদের মতে যিহারের স্পষ্ট বাক্য হলো, "তুমি আমার কাছে অথবা আমার সংগে অথবা আমার জন্য মায়ের পিঠের মত, অথবা তুমি আমার মায়ের পিঠের মত৷ অথবা তোমার দেহ বা শরীর অথবা তোমার সত্তা, আমার জন্য আমার মায়ের দেহ বা শরীর অথবা সত্তার মত৷ এছাড়া অবশিষ্ট সমস্ত বাক্যের ব্যাপারে বাক্য প্রয়োগকারীর নিয়ম অনুসারে সিদ্ধান্ত হবে৷

হাম্বলী ফিকাহবিদদের মতে, কেউ যদি তার স্ত্রীকে অথবা তার স্বতন্ত্র কোন অংগকে বিয়ে করা হারাম এমন কোন মহিলার সাথে অথবা তার দেহের স্বতন্ত্র কোন অংগের সাথে স্পষ্ট ভাষায় তুলনা করে তাহলে তা যিহারের স্পষ্ট বাক্য বলে গণ্য হবে ৷ মালেকী মাযহাবের অনুসৃত মতও প্রায় অনুরূপ৷ তবে বিস্তারিত খুটিনাটিতে গিয়ে তাদের মধ্যে মতভেদ হয়েছে৷ যেমন কেউ যদি তার স্ত্রীকে বলে ৷ তুমি আমার জন্য আমার মায়ের তুল্য অথবা আমার মায়ের মত তাহলে মালেকীদের মতে যিহারের নিয়ত থাকলে যিহার হবে ৷ তালাকের নিয়ম থাকলে তালাক হবে এবং কোন নিয়ত না থাকে যিহার হবে৷ হাম্বলীদের মতে শুধু নিয়তের শর্তে যিহার বলে গণ্য করা যেতে পারে৷ কোন ব্যক্তি যদি তার স্ত্রীকে বলে তুমি আমার মা৷ মালেকীদের মতে তা যিহার হবে৷ হাম্বলীদের মতে ঝগড়া বিবাদ বা ক্রুদ্ধবস্থায় বলা হয়ে থাকলে যিহার হবে এবং আদর সোগাগপূর্ণ পরিবেশে বলা হয়ে থাকলে তা খুবই খারাপ কথা৷ কিন্তু তা যিহার হিসেবে গণ্য হবে না৷ কেউ যদি স্ত্রীকে বলেঃ তোমাকে তালাক, তুমি আমার মায়ের মত, তাহলে হাম্বলীদের মতে এতে তালাক হবে যিহার নয়৷ তবে যদি বলেঃ তুমি আমার মায়ের মত, তোমাকে তালাক তাহলে যিহার ও তালাক উভয়টিই হয়ে যাবে৷ আর যদি বলেঃ তুমি আমার জন্য আমার মায়ের পিঠের মত হারাম তাহলে মালেকী ও হাম্বলী উভয় মাযহাবের ফিকাহবাদদের মতে এ বাক্য তালাকের নিয়তে বলা হোক বা আদৌ কোন নিয়ত না থাক এতে যিহার হবে৷

যিহারের বাক্য সম্পর্কিত এ আলোচনায় এ বিষয়টি ভালভাবে বুঝতে হবে যে, এ বিষয়ে ফিকাহবিদগণ যত আলোচনা করেছেন তা সবই আরবী ভাষায় বাক্য ও বাকরীতি সম্পর্কে৷ একথা সবারই জানা যে, পৃথিবীর অন্য ভাষাভাষী লোকেরা যিহার করার সময় আরবী ভাষা ব্যবহার করবে না, কিংবা যিহার করার সময় আরবী বাক্য ও বাক্যাংশের হুবহু অনুবাদে উচ্চারণ করবে না৷ সুতরাং কোন শব্দ বা বাক্যাংশ যিহারের সংজ্ঞায় পড়ে কিনা সে বিষয়ে যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয় তাহলে ফিকাহবিদদের বর্ণিত বাক্যসমূহের কোনটির সঠিক অনুবাদ শুধু সেটিই বিচার বিবেচনা করা ঠিক হবে না বরং শুধু এ বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে যে, বক্তা বা শব্দ ব্যবহারকারী ব্যক্তি স্ত্রীকে যৌন () সম্পর্কের দিক দিয়ে হারাম নারীদের কারো সাথে সুস্পষ্টভাবে তুলনা করেছে নাকি ঐ সব বাক্যের অন্য কোন অর্থ হওয়ার অবকাশ আছে? আরবী ভাষার () তুমি আমার জন্য আমার মায়ের পিঠের মত বাক্যটি এর সুস্পষ্ট উদাহরণ৷ ফিকাহবিদ এবং মুফাসসিরগণ এ বিষয়ে একমত যে, আরবে যিহার করার জন্য এ বাক্যটিই ব্যবহার করা হতো এবং এ বাক্যটি সম্পর্কেই কুরআন মজীদের নির্দেশ নাযিল হয়েছে৷ সম্ভবত দুনিয়ার কোন ভাষাতেই- উর্দু ভাষা সম্পর্কে তো আমরা অন্তত নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি -যিহারকারী কোন ব্যক্তি এমন বাক্য ব্যবহার করতে পারে না যা এই আরবী বাক্যটির হুবহু শাব্দিক অনুবাদ হতে পারে৷ তবে তারা নিজের ভাষার এমন সব বাক্য অবশ্যই ব্যবহার করতে পারে যার অর্থ অবিকল তাই যা একজন আরব এইটি দ্বারা প্রকাশ করতো৷ একথাটি বলার অর্থ ছিল, তোমার সাথে সহবাস করা আমার জন্য আমার মায়ের সাথে সহবাস করার মত৷ অথবা কোন কোন মূর্খ ব্যক্তি তার স্ত্রীকে বলে বসে যে, "আমি যদি তোমার কাছে যাই তাহলে তাহলে আমার মায়ের কাছেই গেলাম৷ "

তেরঃ কুরআন মজীদের যে জিনিসকে কাফ্ফারা আবশ্যিক হওয়ার কারণ বলা হয়েছে তা শুধু যিহার করা নয়, বরং যিহারের পরবর্তী () ৷ অর্থাৎ ব্যক্তি যদি শুধু যিহার করে এবং () ৷ না করে তাহলে তাকে কাফ্ফারা দিতে হবে না৷ এখন প্রশ্ন হলো () কি যা কাফ্ফারা দেয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়? এ ব্যাপারে ফিকাহবাদিদের মতামত নিম্বরূপঃ হানাফীদের মতে () অর্থ সহবাস করার ইচ্ছা৷ তবে তার অর্থ এই নয় যে, শুধু ইচ্ছা বা আকাংখা করলেই কাফ্ফারা দেয়া জরুরী হবে৷ এমন কি ব্যক্তি যদি শুধু ইচ্ছা করেই থেমে থাকে এবং কার্যত কেন পদক্ষেপ না নেয় তাহলেও তাকে কাফ্ফারা দিতে হবে ব্যাপার এমন নয়৷ বরং এর সঠিক অর্থ হচ্ছে যে, ব্যক্তি যিহার করার দ্বারা স্ত্রীর সাথে একান্ত দাম্পত্য সম্পর্কের ব্যাপারে যে 'হুরতম' বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল প্রথমে কাফ্ফারা তা দূর করে৷ কারণ এই 'হুরতম' বা নিষেধাজ্ঞা কাফ্ফারা দেয়া ছাড়া দূরীভূত হতে পারে না৷

এ বিষয়ে ইমাম মালেকের (র) তিনটি মত আছে৷ তবে এ ব্যপারে ওপরে হানাফীদের যে মত বর্ণিত হয়েছে সেটিই মালেকীদের সর্বাধিক প্রসিদ্ধি ও বিশুদ্ধতম মত৷ তাঁদের মতে যিহার দ্বারা স্বামী নিজের জন্য যে জিনিসটি হারাম করে নিয়েছিল তা হচ্ছে স্ত্রীর সাথে সহবাসের সম্পর্ক৷ এরপর () করা অর্থ পুনরায় তার সাথে সেই সম্পর্ক স্থাপনের জন্য ফিরে যাওয়া৷

এ বিষয়ে ওপরে দুই ইমামের যে মতামত বর্ণনা করা হয়েছে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের (রা) মতও প্রায় অনুরূপ বলে ইবনুল কুদামা উদ্ধৃত করেছেন৷ তিনি বলেনঃ যিহার করার পর সহবাস হালাল হওয়ার জন্য কাফ্ফারা দেয়া শর্ত৷ যিহারকারী যে ব্যক্তিই তা হালাল করতে চায় সে যেন হারাম করে নেয়া থেকে ফিরতে চায়৷ তাই তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, হালাল করে নেয়ার পূর্বে সে যেন কাফ্ফারা আদায় করে৷ কোন ব্যক্তি কোন নারীকে নিজের জন্য হালাল করে নিতে চাইলে তাকে হালাল করার পূর্বে যেমন বিয়ে করতে বলা হবে এটা যেন ঠিক তাই৷

ইমাম শাফেয়ীর (র) মত এ তিনটি মতামত থেকে ভিন্ন৷ তিনি বলেনঃ কারো নিজের স্ত্রীর সাথে যিহার করার পর তাকে পূর্বের মত স্ত্রী হিসেবে রাখা, কিংবা অন্য কথায় তাকে স্ত্রী হিসেবে কাছে রাখাটাই () ৷ কারণ, সে যে সময় যিহার করেছে সে সময় থেকেই যেন তাকে স্ত্রীকে হিসেবে রাখা হারাম করে নিয়েছে৷ সুতরাং সে যদি যিহার করার সাথে সাথেই তালাক না দিয়ে থাকে এবং তালাকের শব্দগুলো উচ্চারণ করার মত সময়টুকু পর্যন্ত তাকে স্ত্রী হিসেবে রাখে তাহলে সে () করলো এবং তার ওপর কাফ্ফারা দেয়া ওয়াজিব হয়ে গেল৷ এর অর্থ হচ্ছে, কেউ এক নিশ্বাসে যিহার করার পর পরবর্তী নিশ্বাসেই যদি তালাক না দেয় তাহলে কাফ্ফারা ওয়াজিব হয়ে যাবে৷ এক্ষেত্রে পরে তাকে স্ত্রী হিসেবে না রাখার এবং দাম্পত্য সম্পর্ক রক্ষা না করার সিদ্ধান্ত না হলেও কিছু এসে যায় না৷ এমনকি এর পর সে কয়েক মিনিট চিন্তাভাবনা করে যদি সে স্ত্রীকে তালাক দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে ইমাম শাফেয়ীর (র) মতানুসারে তবুও তাকে কাফ্ফারা দিতে হবে৷

চৌদ্দঃ কুরআনের নির্দেশ হচ্ছে, স্বামী স্ত্রী পরস্পর () স্পর্শ করার পুর্বেই যিহারকারীকে কাফ্ফারা দিতে হবে৷ এ আয়াতের উল্লেখিত () শব্দের অর্থ স্পর্শ করা এ বিষয়ে চার ইমামই একমত৷ সুতরাং কাফ্ফারা দেয়ার পূর্বেই শুধু সহবাসই হারাম নয় বরং স্বামী কোনভাবেই স্ত্রীকে স্পর্শ করতে পারবে না৷ শাফেয়ী মাযহাবের ফিকাহবিদগণ বলেনঃ যৌন ইচ্ছা সহ স্পর্শ করা হারাম৷ হাম্বলী মাযহাবের ফিকাহবিদগণ সব রকম উপভোগকেই না জায়েজ বলেন৷ তাঁদের মতে এ অবস্থায় কেবল মুখমণ্ডল ও হাতের দিকে তাকানো যেতে পারে৷

পনেরঃ যিহার করার পর স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাক দেয়, তাহলে 'রিজয়ী'তালাকের ক্ষেত্রে 'রুজু' করার পরও কাফ্ফারা দেয়া ছাড়া স্বামী স্ত্রীকে স্পর্শ করাতে পারবে না৷ বায়েন তালাক হওয়ার ক্ষেত্রে সে যদি তাকে পুনরায় বিয়ে করে তখনও স্পর্শ করার পূর্বে কাফ্ফারা দিতে হবে৷ এমনকি যদি তিন তালাকও দিয়ে থাকে এবং স্ত্রী অন্য পুরুষের সাথে বিবাহিতা হওয়ার পর বিধবা অথবা তালাক প্রাপ্তা হয় এবং তারপর যিহারকারী স্বামী তাকে নতুন করে বিয়ে করে, তাহলেও কাফ্ফারা ছাড়া সে তার জন্য হালাল হবে না৷ কেননা, মা বা অন্যান্য চিরনিষিদ্ধ মহিলাদের সাথে স্ত্রীর সাদৃশ্য বর্ণনা করে সে ইতিপূর্বে একবার তাকে নিজের ওপর হারাম বা নিষিদ্ধ করে নিয়েছে৷ কাফ্ফারা ছাড়া সেই হারাম বা নিষিদ্ধাবস্থার অবসান ঘটা সম্ভব নয়৷ চার ইমামের সকলেই এ ব্যাপারে একমত৷

ষোলঃ যে স্বামী স্ত্রীর সাথে যিহার করেছে কাফ্ফারা না দেয়া পর্যন্ত তাকে তার শরীর স্পর্শ করতে না দেয়া স্ত্রীর কর্তব্য৷ যেহেতু দাম্পত্য সম্পর্ক চালু থাকা স্ত্রীর একটি অধিকার বিশেষ এবং তা থেকে স্বামী তাকে বঞ্চিত করেছে, তাই সে যদি কাফ্ফারা না দেয় তবে স্ত্রী আদালতের আশ্রয় নিতে পারে৷ আদালত তার স্বামীকে সে বাধা অপসারণে বাধ্য করবে৷ যা সে নিজের ও তার স্ত্রীর মাঝখানে দাঁড়া করিয়েছে৷ আর যদি সে তা না মানে, তবে আদালত তাকে প্রহার বা কারাদণ্ড বা উভয় প্রকারের দণ্ড দিতে পারে৷ চার মাযহাবই এ ব্যাপারে পূর্ণ মতৈক্য রয়েছে৷ তবে পার্থক্য শুধু এই যে, হানাফী মাযহাবের স্ত্রীর জন্য আদালতের সরণাপন্ন হওয়া ছাড়া আর কোন পথ খোলা নেই৷ আদালত যদি স্ত্রীকে এ সংকট থেকে উদ্ধার না করে তবে সে আজীবন ঝূলন্ত অবস্থায়ই থেকে যাবে৷ কেননা, হানাফী মাযহাব অনুসারে যিহার দ্বারা বিয়ে বাতিল হয় না, বরং কেবল স্বামীর সংগমের অধিকার রহিত হয়৷ মালেকী মাযহাবের স্বামী যদি স্ত্রীকে নির্যাতন করার জন্য যিহার করে ঝুলিয়ে রাখে৷ তাহলে সে ক্ষেত্রে "ইলার" বিধান বলবত হবে৷ অর্থাৎ সে চার মাসের বেশী স্ত্রীকে আটকে রাখতে পারে না৷ ("ইলা"র বিধান তাফহীমুল কুরআন, সূরা বাকারা ২৪৫ থেকে ২৪৭ টীকায় দ্রষ্টব্য) ৷ আর শাফেয়ী মাযহাবে যদিও স্বামী কেবল নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য যিহার করলেই এবং সে মেয়াদ চার সামের বেশী হলেই ইলার বিধান কার্যকর হবে৷ কিন্তু যেহেতু শাফেয়ী মাযহাবের স্বামী স্ত্রীর সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রাখলেই কাফ্ফারা দিতে হয়৷ তাই তার পক্ষে দীর্ঘদিন পর্যন্ত স্ত্রীকে ঝুলন্ত রাখা সম্ভব হয় না৷

সতেরঃ কুরআন ও হাদীসে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা হয়েছে, যে যিহারের প্রথম কাফ্ফারা হচ্ছে দাস মুক্ত করা৷ এটা করতে অসমর্থ হলেই দু'মাস ব্যাপী রোযা রাখা এবং তাতেও অসমর্থ হলে ৬০ জন দরিদ্র মানুষকে আহার কারানো যেতে পারে৷ কিন্তু কেউ যদি এ তিন ধরনের কাফ্ফারার কোনটিই দিতে সমর্থন হয় তাহলে শরীয়াতের কাফ্ফারার অন্য কোন ব্যবস্থা না থাকা হেতু সে যতক্ষণ পর্যন্ত এ তিন ধরনের কাফ্ফারার কোন একটি দেয়ার সমর্থ লাভ না করে ততক্ষন পর্যন্ত তাকে অপেক্ষা করতে হবে৷ তবে হাদীস থেকে প্রমাণিত যে, এ ধরনের ব্যক্তি যাতে তৃতীয় কফ্ফারাটি দিতে পারে সে জন্য তাকে সাহায্য করা উচিত৷ যারা নিজেদের ভুলের কাণে এরূপ সমস্যার জালে আটকা পড়েছিল এবং এ তিন প্রকারের কাফ্ফারার কোনটিই দিতে সমর্থ ছিলনা৷ তাদেরকে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাইতুল মাল থেকে সাহায্য করেছিলেন৷

আঠারঃ পবিত্র কুরআনের কাফ্ফারা হিসেবে যে কোন পরাধীন মানুসকে মুক্ত করার আদেশ দেয়া হয়েছে চাই সে দাস হোক অথবা দাসী হোক৷ এ ক্ষেত্রে দাস-দাসীর বয়সেরও কোন কড়াকড়ি নেই৷ দুধ খাওয়া শিশুও যদি গোলামীতে আবদ্ধ হয়ে থাকে তবে তার মুক্তির ব্যবস্থা করাও কাফ্ফারার জন্য যথেষ্ট৷ তবে মুসলিম ও অমুসলিম উভয় ধরনের দাস-দাসী মুক্ত করা চলবে, না শুধু মুসলিম দাস-দাসী মুক্ত করতে হবে, সে ব্যপারে মুসলিম ফিকাহবিদগণের মতভেদ রয়েছে৷ হানাফী ও যাহেরী মাযাহাবের মতানুসারে দাস-দাসী মুসলিম কিংবা অমুসলিম যাই হোক না কেন, তাকে মুক্ত করা যিহারের কাফ্ফারার জন্য যথেষ্ট হবে৷ কেননা, কুরআন শরীফে শ
১২. এখানে "ঈমান আনা" দ্বারা খাঁটি ও একনিষ্ঠ মু'মিন সূলভ আচরণকে বুঝানো হয়েছে৷ এ আয়াতের সম্বোধন যে, কাফের ও মুশরিকদের প্রতি নয় বরং আগে থেকেই ঈমান আনার মুসলমানদের প্রতি করা হয়েছে, তা সুস্পষ্ট৷ তাদেরকে শরীয়াতের একটি নির্দেশ প্রদানের পর একথা বলা যে, "তোমরা যাতে আল্লাহ ও তার রসূলের প্রতি ঈমান আনো যে, সে জন্য তোমাদেরকে এ নির্দেশ দেয়া হচ্ছে" স্পষ্টতই এ তাৎপর্য বহন করে যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর এ আদেশ শ্রবণের পরও প্রাচীন জাহেলী রসম রেওয়াজ মেনে চলতে থাকে, তার এ আচরণ ঈমানের পরিপন্থী৷ এটা কোন মু'মিনের কাজ নয় যে, আল্লাহ ও তার রসূল যখন তার জন্য জীবনের কোন ব্যাপারে কোন আইন নির্ধারত করে দেন, তখন সে তা বাদ দিয়ে দুনিয়ার অন্য কোন আইন মেনে চলবে কিংবা নিজের প্রবৃত্তির ইচ্ছা ও খায়েশ মোতাবেক কাজ করবে৷
১৩. এখানে কাফের অর্থ আল্লাহ ও রসূলকে অস্বীকারকারী নয়৷ এখানে কাফের শব্দটি দ্বারা সেই ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে যে, আল্লাহ ও রসুলকে মান্য করার স্বীকৃতি ও ঘোষণা দেয়ার পরও একজন কাফেরের উপযোগী আচরণ করতে থাকে৷ অন্য কথায় এ উক্তির মর্ম এই যে, আল্লাহ ও তার রসূলের আদেশ শোনার পরও নিজের খেয়াল খুশীমত চলা অথবা জাহেলী রীতি প্রথা ও রসম রেওয়াজের অনুসরণ করতে থাকা আসলে কাফেরদের কাজ৷ সাচ্চা দিলে ঈমান এনেছে কোন ব্যক্তি এ ধরনের আচরণ করতে পারে না৷ সূরা আলে ইমরানের যেখানে হজ্জ ফরয করার বিধান ঘোষনা করা হয়েছে সেখানেও ঐ ঘোষণাটির অব্যবহিত পর বলা হয়েছে যে,

-------------------------------

"আর যে ব্যক্তি কুফরী করবে (অর্থাৎ এ আদেশে অমান্য করবে) তার জেনে রাখা উচিত যে, আল্লাহ জগতবাসীর মোটেই মুখাপেক্ষী নন৷ "

এ উভয় জায়গায় "কুফর" শব্দটির অর্থ এটা নয় যে, যে ব্যক্তি যিহার করার পর কাফ্ফারা না দিয়ে স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখে, অথবা এরূপ মনে করে যে যিহার দ্বারাই স্ত্রীর ওপর তালাক কার্যকর হয়ে গেছে অথবা ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও হজ্জ করে না, শরীয়াতের আদালত তাকে কাফের ও মুরতাদ ঘোষণা করবে এবং সকল মুসলামন তাকে ইসলাম বহিভূত মনে করবে৷ বরঞ্চ এর অর্থ এইযে, আল্লাহর নিকট এ ধরনের লোকের মুমিন বলে গণ্য হবে না৷ যারা তার আদেশ নিষেধের কথা বা কাজের মাধ্যমের প্রত্যাখ্যান করে এবং আল্লাহ মানুষের জন্য কি কি সীমা নির্ধারণ করেছেন কোন কোন কাজকে ফরয করেছেন কোন জিনিসকে হালাল এবং কোন কোন জিনিসকে হারাম করেছেন তার কোন ধার ধারে না৷
১৪. বিরোধীতা করার অর্থ হলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমরেখা বা বিধিনিষেধ না মেনে তার পরিবর্তে অন্য কতকগুলো মনগড়া সীমারেখা ও বিধি নিষেধ নির্ধারণ করা৷

ইবনে জারীর তাবারী এ আয়াতের তাফসীর করেছেন এভাবেঃ

------------------

"তারা আল্লাহর সীমানা ও তর বিধানসমূহের ব্যাপারে তার বিরোধিতা করে এবং আল্লাহর নির্ধারিত সীমার পরিবর্তে অন্যান্য সীমা নির্ধারণ করে৷"

আল্লামা বায়যাবী এর তাফসীর প্রসংগে বলেনঃ

------------------------------------

"আল্লাহ ও তার রসূলের সাথে দুশমনি ও বিবাদে লিপ্ত হয়, অথবা আল্লাহ ও রসূলের নির্ধারিত সীমারেখার পরিবর্তে অন্যান্য সীমারেখা নির্ধারণ করে৷ অথবা অন্যদের নির্ধারিত সীমারেখাকে মেনে নেয়৷"

আল্লামা আলূসী রুহুল মায়ানীতে বায়যাবীর উক্তি তাফসীরের সাথে মতৈক্য প্রকাশ করে শায়খুল ইসলাম সা'দুল্লা চালপীর এই বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন যে, "এ আয়াতে সেসব রাজা বাদশাহ ও স্বেচ্চাচারি শাসকদের বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারিত হয়েছে, যারা শরীয়াতের নির্ধারিত আইনবিধির পরপন্থী বহু আইনবিধি প্রবর্তন করেছে এবং তাকে আইন নামে আখ্যায়িত করেছে৷ " এ প্রসংগে আল্লাম আলূসী শরীয়াতী আইনের মোকাবিলায় মানব রচিত আইনের সাংবিধানিক অসারতা (অর্থাৎ ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সাংবিধানিক অসারতা) সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেনঃ

"সে ব্যক্তিতো নিসন্দেহে কাফের, যে মানব রচিত আইনকে উত্তম ও শরীয়াতের চেয়ে ভালো বলে আখ্যায়িত করে এবং বলে যে, এ আইন অপেক্ষাকৃত বিজ্ঞজনোচিত ও জাতির জন্য অধিকতর উপযোগী৷ অধিকন্তু তাকে যখন কোন ব্যাপারে বলা হয় যে, শরীয়াতের আদেশ এ ব্যাপারে এরূপ তখন সে রাগে ফেটে পড়ে৷ এ ধরনের চরিত্র সম্পন্ন কিছু লোক আমরা দেখেছি, যাদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ পড়েছে৷ "
১৫. মুল আয়াতে ব্যবহৃত শব্দটি হচ্ছে () অর্থ হচ্ছে লাঞ্ছিত করা, ধ্বংস করা৷ অভিসম্পাত দেয়া দরবার থেকে বিতাড়িত করা, ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়া, অপমানিত করা৷ আল্লাহর এ উক্তির মর্মার্থ এই যে, আল্লাহ ও তার রসূলের বিরোধিতা এবং তার আইন লংঘনের যে পরিণতি পূর্ববর্তী নবীগণের উম্মতেরা ভোগ করেছে, আজকের মুসলমানদের মধ্য থেকে যারা সে আচরণ করবে তারা সে পরিণতি থেকে কোনমতেই রক্ষা পাবে না৷ তারাও যখন আল্লাহর শরীয়াতের বিরুদ্ধে নিজেদের মনগড়া আইন অনুসরণ করেছে অথবা অন্যদের কাছ থেকে মানব রচিত আইন গ্রহণ করেছে, তখন তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও অনুকম্পা থেকে বঞ্চিত হয়েছে৷ অধিকন্তু এর ফলে তাদের জীবন এমন সব বিভ্রান্তি, অনাচার এবং নৈতিক ও সামাজিক -সাংস্কৃতিক অপকীর্তি ও পাপাচারে ভরাক্রান্ত হয়ে পড়েছে যে, দুনিয়ার জীবনই তারা চরম লাঞ্ছনা গাঞ্জনার শিকার হয়েছে৷ উম্মতের মুহাম্মাদী যদি আজ এই একই ভ্রান্তিতে লিপ্ত হয়, তাহলেও তারা আল্লাহর প্রিয়ই থাকবে এবং আল্লাহ তাদেরকে লাঞ্চনা গাঞ্জনার গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা করতেই থাকবেন -এর কোনই কারণ নেই৷ পূর্ববর্তী রসূলগণের উম্মতদের সাথেও আল্লাহর কোন শত্রুতা ছিল না, আর শেষ নবীর উম্মতের সাথেও আল্লাহর কোন বিশেষ আত্মীয়তা নেই৷
১৬. বাক্যের প্রেক্ষিতে নিয়ে চিন্তাভাবনা করলে বুঝা যায় যে, এখানে এ আচারণের দুটো শাস্তির উল্লেখ করা হয়েছে৷ একটি হচ্ছে অবমাননা ও লাঞ্ছনা -যার শিকার এ দুনিয়াতেই হতে হয়েছে এবং হতে হবে৷ অপরটি হচ্ছে অপমানজনক আযাব -যা আখেরাতে ভোগ করতে হবে৷
১৭. অর্থাৎ তারা ভুলে গেছে বলেই ব্যাপারটা মিটে যায়নি৷ আল্লাহর অবাধ্যতা ও তাঁর বিধানের বিরুদ্ধাচারণ তাদের কাছে এমন মামুলী বিষয় বিবেচিত হতে পারে যা করে তারা মনেও রাখেনা এমনকি তাদের আদৌ কোন আপত্তিকর জিনিসই মনে করে না যে, তারা তার কিছুমাত্র পরোয়া করবে৷ কিন্তু আল্লাহর কাছে তা মোটেই মামুলী জিনিস নয়৷ তার কাছে তাদের প্রতিটি তৎপরতা নিবন্ধিত হয়ে গেছে৷ কোন ব্যক্তি কখন, কোথায় কি কাজ করেছে তা করার পর নিজের প্রতিক্রিয়া কি ছিল আর অন্যত্র কোথায় কোথায় তার কি কি ফলাফল কি কি আকারে দেখা দিয়েছে এই সবই সবিস্তরে তার রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে৷