(৫৭:২৬) আমি ৪৮ নূহকে ও ইবরাহীমকে পাঠিয়েছিলাম এবং তাদের উভয়ের বংশধরের মধ্যে নবুওয়াত ও কিতাবের প্রচলন করেছিলাম ৷ ৪৯ তারপর তাদের বংশধরদের কেউ কেউ হিদায়াত গ্রহণ করেছিল এবং অনেকেই ফাসেক হয়ে গিয়েছিল ৫০
(৫৭:২৭) তাদের পর আমি একের পর এক আমার রসূলগণকে পাঠিয়েছি৷ তাদের সবার শেষে মারয়ামের পুত্র ঈসাকে পাঠিয়েছি, তাকে ইনজীল দিয়েছি এবং তার অনুসারীদের মনে দয়া ও করুণার সৃষ্টি করেছি৷ ৫১ আর বৈরাগ্যবাদ তো তারা নিজেরাই উদ্ভাবন করে নিয়েছে৷ ৫২ আমি ওটা তাদের ওপর চাপিয়ে দেইনি৷ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় তারা নিজেরাই এ বিদয়াত বানিয়ে নিয়েছে৷ ৫৩ তারপর সেটি যেভাবে মেনে চলা দরকার, সেভাবে মেনেও চলেনি ৷৫৪ তাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছিল, তাদের প্রতিদান আমি দিয়েছি৷ তবে তাদের অধিকাংশই পাপী৷
(৫৭:২৮) হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর রসুল (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর ওপর ঈমান আনো৷ ৫৫ তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে দ্বিগুণ রহমত দান করবেন, তোমাদেরকে সেই জ্যোতি দান করবেন যার সাহায্যে তোমরা পথ চলবে ৫৬ এবং তোমাদের ত্রুটি -বিচ্যুতি মাফ করে দেবেন৷ ৫৭ আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু৷
(৫৭:২৯) (তোমাদের এ নীতি অবলম্বন করা উচিত) যাতে কিতাবধারীরা, জানতে পারে যে, আল্লাহর অনুগ্রহের ওপর তাদের একচেটিয়া অধিকার নেই, বরং আল্লাহর অনুগ্রহ নিরংকুশভাবে আল্লাহরই হাতে নিবদ্ধ ৷ তিনি যাকে চান তা দেন৷ তিনি বড়ই অনুগ্রহশীল৷
৪৮. মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পূর্বে যে রসূলগণ 'বাইয়েনাত' কিতাব ও মিযান নিয়ে এসেছিলেন তাদের অনুসারীদের মধ্যে কি বিকৃতি সৃষ্টি হয়েছিলো৷ এখানে তাই বলা হয়েছে৷
৪৯. অর্থাৎ যে রসূলই কিতাব নিয়ে এসেছিলেন তারা হযরত নূহ (আ) ও তাঁর পরবর্তীগণ হযরত ইবরাহীমের বংশধর ছিলেন৷
৫০. অর্থাৎ অবাধ্য হয়ে গিয়েছিলো৷ এবং আল্লাহর আনুগত্যের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলো৷
৫১. মুল আয়াতে ব্যবহৃত শব্দ হচ্ছে () ও () ৷ এ দুটি শব্দ প্রায় সমার্থক কিন্তু দুটি শব্দই যখন একসাথে বলা হয় তখন () এর অর্থ হয় মনের নম্র ও সদয় অনুভূতি যা কাউকে দুঃখ কষ্ট ও বিপদের মধ্যে দেখে কারো মনে সৃষ্টি হয়৷ আর () অর্থ সেই আবেগ যার কারণে সে তাকে সাহায্য করতে চেষ্টা করে৷ হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম যেহেতু অত্যন্ত দয়াদ্র হৃদয় এবং আল্লাহর সৃষ্টির জন্য অত্যন্ত দয়ালু ও স্নেহ প্রবল ছিলেন৷ তাই তাঁর অনুসারীদের মধ্যেও তাঁর চরিত্রের এ প্রভাব সৃষ্টি হয়েছিলো৷ যার কারনে আল্লাহর বান্দাদের জন্য তাদের মনে দয়া সৃষ্টি হতো এবং সহানুভূতির সাথে তাদের সেবা করতো৷
৫২. এ শব্দটির উচ্চারণ 'রাহবানিয়াত'ও 'রুহবানিয়াত' দুই রকমই করা হয়ে থাকে৷ এর শব্দমূল () যার অর্থ হচ্ছে ভয়৷ রাহবানিয়াত অর্থ ভীত হওয়ার পথ ও পন্থা এবং রুহবানিয়াত অর্থ ভীতদের পথ ও পন্থা৷ এর পারিভাষিক অর্থ হচ্ছে ভয়ের কারণে কোন ব্যক্তির (কারো জুলুম নির্যাতনের ভয়ে হোক বা দুনিয়ার ফিতনার ভয়ে হোক কিংবা নিজের প্রবৃত্তির দুর্বলতার ভয়ে হোক৷ ) দুনিয়াত্যাগী হয়ে যাওয়া এবং দুনিয়ার জীবন থেকে পালিয়ে বন-জংগলে বা পাহাড়ে আশ্রয় নেয়া কিংবা নির্জন নিভৃতে যেয়ে বসা৷
৫৩. মূল আয়াতে ব্যবহৃত বাকাংশ হচ্ছে () ৷ এর দুটি অর্থ হতে পারে৷ একটি অর্থ হচ্ছে আমি তাদের জন্য রাহবানিয়াত বা বৈরাগ্যবাদ ফরয করেছিলাম না৷ বরং আমি তাদের ওপর যা ফরয করেছিলাম তা ছিলো এই যে, তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করবে৷ আর অপর অর্থটি হচ্ছে, এ বৈরাগ্যবাদ আমার ফরযকৃত ছিল না৷ বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিমিত্তে তারা তা নিজেরাই নিজেদের ওপর ফরয করে নিয়েছিলো৷ দুটি অবস্থাতেই এ আয়াতটি একথা স্পষ্ট করে তুলে ধরছে যে, বৈরাগ্যবাদ একটি অনৈসলামিক রীতি৷ এটি কখনো দীনে ইসলামের অংগীভূত ছিল না৷ এ প্রসংগেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে, () "ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই" (মুসনাদে আহমাদ) ৷ অন্য একটি হাদীসে নবী (সা) বলেছেনঃ () "আল্লাহর পথে জিহাদই হচ্ছে এ উম্মতের বৈরাগ্যবাদ৷ " (মুসনাদে আহমাদ, মুসনাদে আবু ইয়া'লা ) অর্থাৎ দুনিয়া বর্জন করা এ উম্মতের আধ্যাত্মিক উন্নতির পথ নয়, বরং এর আধ্যাত্মিক উন্নতির পথ হচ্ছে আল্লাহর পথে জিহাদ৷ আর এ উম্মত ফিতনার ভয়ে ভীত হয়ে বন-জংগল ও পাহাড়-পর্বতে পালিয়ে যায় না বরং আল্লাহর পথে জিহাদের মাধ্যেমে তার মোকাবিলা করে৷ বুখারী ও মুসলিম উভয়ের বর্ণিত হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছে যে, সাহাবীদের একজন বললেনঃ আমি সব সময় সারা রাত নামায পড়বো৷ দ্বিতীয়জন বললোঃ আমি সব সময় রোযা রাখবো, কখনো বিরতি দেব না৷ তৃতীয় জন বললো, আমি কখনো বিয়ে করবো না এবং নারীর সাথে কোন সম্পর্ক রাখবো না৷ তাদের এসব কথা শুনতে পেয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ

-------------------

"আল্লাহর শপথ, আমি আল্লাহকে তোমাদের চেয়ে বেশী ভয় করি এবং তাকওয়া অবলম্বন করে চলি৷ আমার নীতি হলো, আমি রোযা রাখি এবং রোযা না রেখেও থাকি, রাতের বেলা নামাযও পড়ি, আবার নিদ্রাও যাই এবং নারীদের বিয়েও করি৷ যে আমার নীতি পছন্দ করে না তার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই৷ "

হযরত আনাস বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেনঃ

----------------------------------------

"নিজের প্রতি কঠোর হয়ো না তাহলে আল্লাহও তোমাদের প্রতি কঠোর হবেন৷ একটি কওম কঠোরতা অবলম্বন করলে আল্লাহও তাদেরকে কঠোরভাবে পাকড়াও করলেন৷ দেখে নাও, তারা এবং তাদের অবশিষ্টরা গীর্জা ও উপসনালয়ে বর্তমান৷ "(আবু দাউদ) ৷
৫৪. অর্থাৎ তারা দ্বিবিধ ভ্রান্তিতে ডুবে আছে৷ একটি ভ্রান্তি হচ্ছে তারা নিজেদের ওপর এমন সব বাধ্য বাধকতা আরোপ করে নিয়েছিল যা করতে আল্লাহ কোন নির্দেশ দেননি৷ দ্বিতীয় ভ্রান্তি হচ্ছে, নিজেদের ধারণা মতে যেসব বাধ্য বাধকতাকে তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির উপায় বলে মনে করে নিজেদের ওপর আরোপ করে নিয়েছিলো তার হক আদায় করেনি এবং এমন সব আচরণ করেছে যার দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে তার গযব খরিদ করে নিয়েছে৷

এ বিষয়েটিকে ভালভাবে বুঝতে হলে খৃষ্টীয় বৈরাগ্যবাদের ইতিহাসের প্রতি একবার দৃষ্টিপাত করে নেয়া দরকার৷

হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের পর খৃস্টান গীর্জাসমূহ দুই'শ বছর পর্যন্ত বৈরাগ্যবাদের সাথে অপরিচিতি ছিল৷ কিন্তু শুরু থেকেই খৃস্টান ধর্মে এর বিষাক্ত জীবাণু বিদ্যমান ছিল এবং যেসব ধ্যান ধারণা এর জন্ম দেয়া তাও এর মধ্যে বর্তমান ছিল৷ সংসার বর্জন ও নিসঙ্গ জীবন যাপনকে নৈতিক আদর্শ মনে করা এবং বিয়ে শাদী ও প্রার্থিব কায় কারবারমূলক জীবনের তুলনায় দরবেশী জীবন ধারাকে অধিক উন্নত ও ভাল মনে করাই বৈরাগ্যবাদের ভিত্তি৷ খৃস্টান ধর্মে এ দুটি জিনিস শুরু থেকেই ছিল৷ বিশেষ করে কৌমার্য বা নিসঙ্গ জীবন যাপনকে পবিত্রতার সম পর্যায়ের মনে করার কারণে গীর্জায় ধর্মীয় কাজ কর্ম সম্পাদনকারী ব্যক্তিদের জন্য বিয়ে করা, তাদের সন্তানাদি থাকা এবং সাংসারিক ঝামেলায় জড়িয়ে পড়াকে অপছন্দনিয় মনে করা হতো৷ তৃতীয় শতাব্দীর আগমনের পূর্বেই এটি একটি ফিতনার রূপ ধারণা করে এবং বৈরাগ্যবাদ মহামারীর আকারে খৃষ্ট ধর্মের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে থাকে৷ ঐতিহাসিক ভাবে এর তিনটি বড় কারণ ছিল৷

একটি কারণ হচ্ছে, প্রাচীন মুশরিক সমাজে যৌনতা, চরিত্রহীনতার ও দুনিয়া পূজা যে চরম আকারে বিস্তার লাভ করেছিল তা উচ্ছেদ করার জন্য খৃস্টান পাদ্রীরা মধ্যপন্থা অবলম্বনের পরিবর্তে চরম পন্থার নীতি গ্রহণ করে৷ তারা সতীত্ব ও পবিত্রতার ওপর এমন গুরুত্ব আরোপ করে যে, বিয়ের মাধ্যমে নারী ও পুরুষের সম্পর্ক হলেও তা মূলত অপবিত্র বলে গণ্য হয়৷ তারা দুনিয়া পূজার বিরুদ্ধে এমন কঠোরতা অবলম্বন করে যে, একজন দীনদার ও ধর্মভীরু লোকের পক্ষে কেন প্রকার সম্পদের মালিক হওয়া গোনাহর কাজ বলে গণ্য হয় এবং একেবারে নিসম্বল ও সব দিক দিয়ে দুনিয়াত্যাগী হওয়াটাই ব্যক্তির জন্য নৈতিক মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়৷ অনুরূপ মুশরিক সমাজের ভোগবাদী নীতির প্রতিবাদ তারা এমন চরম পন্থার আশ্রয় নেয় যে, ভোগ সুখ বর্জন, যৌন বাসনাকে হত্যা করা এবং প্রবৃত্তির মূলোৎপাটন করাই নৈতিকতার উদ্দেশ্য হয়ে যায় এবং নানা রকম সাধনা দ্বারা শরীরকে কষ্ট দেয়ার ব্যক্তির আধ্যাত্মিক পূর্ণতা ও তার প্রমাণ হিসেবে মনে করা হতে থাকে৷

দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, খৃস্ট ধর্ম যখন সফলতার যুগে প্রবেশ করে জনগণের মধ্যে বিস্তার লাভ করতে থাকে, গীর্জা তখন তার ধর্মের প্রসার ও প্রচারের আকাংখায় জনপ্রিয় প্রতিটি খারাপ জিনিসকেও তার গণ্ডিভুক্ত করতে থাকে৷ ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের পূজা প্রাচীন উপাস্যদের স্থান দখল করে নেয়৷ হোরাস (HORUS) ও আইসিস (ISIS) এর মূর্তির বদলে যীশু ও মারয়ামের মূর্তির পূজা শুরু হয়৷ স্যাটারনেলিয়া (Saturnalia) এর পরিবর্তে বড় দিনের উৎসব পালন শুরু হয়৷ খৃস্টান দরবেশগণ প্রাচীন যুগের তাবিজ ও বালা পরা, আমল-তদবীর করা, শুভ-অশুভ লক্ষণ নির্ণয় ও অদৃশ্য বলা, জিন ভূত, তাড়ানোর আমল সব কিছুই করতে শুরু করে৷ অনুরূপ যে ব্যক্তি নোংরা, অপরিস্কার ও উলঙ্গ থাকতো এবং কোন কুঠরি বা গুহায় বসবাস করতো জনগণ যেহেতু তাকে ধার্মিক মনে করতো তাই খৃস্টান গীর্জাসমূহ এটাই আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী বা ওলী হওয়ার একমাত্র পথ বলে ধরে নেয়া হয়৷ এ ধরনের লোকদের 'কারামত'বা অলৌকিক ক্রিয়া কাণ্ডের কাহিনী দ্বারা খৃস্টানদের মধ্যে তাযাকিরাতুল আওলিয়া ধরনের প্রচুর বই -পুস্তক বহুল প্রচারিত হয়৷

তৃতীয় কারণ হচ্ছে, ধর্মের সীমা নির্ণয়ের জন্য খৃস্টানদের কাছে কোন বিস্তারিত শরীয়াত এবং কোন সুস্পষ্ট 'সুন্নাত'বর্তমান ছিল না৷ মূসার শরীয়াতকে তারা পরিত্যাগ করেছিল, কিন্তু এককভাবে শুধু ইনজীলের মধ্যে কোন পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনামা ছিল না৷ এ কারণে খৃষ্টান পণ্ডিতগণ কিছুটা বাইরের দর্শন ও রীতিনীতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এবং কিছুটা নিজেদের মানসিক প্রবণতার কারণে ধর্মের মধ্যে নানা ধরনের বিদআতকে অন্তরভুক্ত করতে থাকে৷ বৈরাগ্যবাদ ও সব বিদআতেরই একটি৷ খৃস্টান ধর্মের পণ্ডিত পুরোহিত ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ এ ধর্মের দর্শন ও এর কর্মপদ্ধতি বৌদ্ধ ধর্মের ভিক্ষু, হিন্দু যোগী-সন্নাসী, প্রাচীন মিসরীয় সংসার ত্যাগী (Anchorits) সন্নাসী পারস্যের মানেবীয়া এবং প্লেটো ও প্লেটোনিক দর্শনের অনুসারীদের থেকে গ্রহণ করেছে এবং একেই আত্মার পরিশুদ্ধির পন্থা, আধ্যাত্মিক উন্নতির উপায় ও আল্লাহর নৈকট্যলাভের অসীলা হিসেবে গণ্য করেছে৷ যারা এ ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত হয়েছিল তারা কোন সাধারণ লোক ছিল না৷ খৃস্টীয় তৃতীয় শতাব্দী থেকে সপ্তম শতাব্দী (অর্থাৎ কুরআন নাযিল হওয়ার সময়) পর্যন্ত তারা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে খৃস্ট খর্মের বড় বড় পণ্ডিত-পুরোহিত এবং ধর্মীয় নেতা ও পথ প্রদর্শক ছিল ৷ অর্থাৎ সেন্ট আথানাসিউয়াস, সেন্ট বাসেল, সেন্ট গ্রগারী নাযিয়ানযিন, সেন্ট করাই সুষ্টাম, সেন্ট আয়ম ব্রোজ, সেন্ট জিরুম, সেন্ট অগাষ্টাইন, সেন্ট বেনডিক্ট, মহান গ্রেগরী৷ এঁরা সবাই ছিলেন সংসার বিরাগী দেরবেশ এবং বৈরাগ্যবাদের বড় প্রবক্তা৷ এদের প্রচেষ্টায়ই গীর্জাসমূহে বৈরাগ্যবাদ চালু হয়৷

ইতিহাস থেকে জানা যায়, খৃস্টানদের মধ্যে বৈরাগ্যবাদের সূচনা হয় মিরস থেকে৷ সেন্ট এন্থনী (St. Anthony) ছিলেন এর প্রবর্তক৷ তিনি ২৫০ খৃস্টাব্দে জন্ম গ্রহণ করেন এবং ৩৫০ খৃস্টাব্দে মারা যান৷ তাঁকেই সর্ব প্রথম খৃস্টান দরবেশ বলে আখ্যায়িত করা হয়৷ তিনি 'কাইয়ূম'অঞ্চলে 'পাসপীর' নামক স্থানে (যা বর্তমানে দাইর আল -মাইমূন নামে পরিচিত) প্রথম খানকাহ প্রতিষ্ঠিত করেন৷ এরপর তিনি লোহিত সাগরের তীরে দ্বিতীয় খানকাহ প্রতিষ্ঠিত করেন, যাকে বর্তমানে দাইর মার আনতিনিউস বলা হয়৷ খৃস্টানদের মধ্যে বৈরাগ্যবাদের মৌলিক নিয়ম -কানুন তাঁর লেখা ও নির্দেশাবলী থেকেই গৃহীত হয়েছে৷ এভাবে সূচনা হওয়ার পর গোটা মিসরে তা প্লাবনের ন্যায় ছড়িয়ে পড়ে এবং স্থানে স্থানে পুরুষ ও মহিলা দরবেশ ও সংসার বিরাগীদের জন্য স্বতন্ত্র খানকাহ গড়ে ওঠে যার কোন কোনটিতে তিন হাজার পর্যন্ত দরবেশ ও সন্ন্যাসী থাকতো৷ ৩২৫ খৃস্টাব্দে মিসরেই পাখোমিউস নামের আরো একজন খৃস্টান অলীর আবির্ভাব ঘটে, যিনি নারী ও পুরুষ সন্ন্যাসী -দরবেশের জন্য দশটি বড় খানকাহ নির্মাণ করেন৷ এরপর এ ধারা সিরিয়া, ফিলিস্তিন, এবং আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিস্তার লাভ করতে থাকে৷ গীর্জা, কর্তৃপক্ষ প্রথম প্রথম এ বৈরাগ্যবাদের ব্যপারে কঠিন দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে যায়৷ কারণ গীর্জাসমূহ দুনিয়া, বর্জন, নিসঙ্গ ও কুমার জীবন যাপন এবং দারিদ্র, অভাব অনটনকে আধ্যাত্মিক জীবনের আদর্শ মনে করতো ঠিকই কিন্তু সন্ন্যাসীদের বিয়ে শাদী করা, সন্তান উৎপাদন করা এবং সম্পদের মালিকানা লাভকে গোনাহর কাজ বলে আখ্যায়িত করতে পারতো না৷ অবশেষে সেন্ট আথানিসিউস (মৃত্যু ৩৭৩ খৃস্টাব্দে, ) সেন্ট বাসেল (মৃত্যু ৩৭৯ খৃস্টাব্দে, ) সেন্ট, অগাস্টাইন, (মৃত্যু ৪৩০খৃস্টাব্দে) এবং মহান গ্রেগরী (মৃত্যু ৬০৯ খৃস্টাব্দে) এর মত ব্যক্তিদের প্রভাবে বৈরাগ্যবাদের অনেক নিয়ম-কানুন চার্চ ব্যবস্থায় যথারীতি প্রবেশ লাভ করে৷

এই বৈরাগ্যবাদী বিদআতের কতিপয় বৈশিষ্ট ছিল৷ আমারা সংক্ষেপে সেগুলো বর্ণনা করছিঃ

একঃ কঠোর সাধনা ও নিত্য নতুন পন্থায় নিজের দেহকে নানা রকম কষ্ট দেয়া৷ এ ব্যাপারে প্রত্যেক দরবেশেই অন্যদের পেছনে ফেলার চেষ্টা করতো৷ খৃস্টান আওলিয়া দরবেশদের কিস্সা-কাহিনীতে তাদের কামালিয়াতের যেসব বর্ণনা আছে তা কতকটা এখানে বর্ণনা করা হলোঃ

আলেকজান্দ্রিয়ার সেন্ট মাকারিউস তার দেহের ওপর সব সময় ৮০ পাউণ্ড ওজনের বোঝা বহন করতো৷ ৬ মাস পর্যন্ত সে কর্দমাক্ত মাটিতে শয়ন করতে থাকে এবং বিষাক্ত মক্ষিকাসমূহ তার উদোম শরীরে দংশন করতে থাকে৷ তার সাগরেদ সেন্ট ইউসিবিউস গুরুর চেয়েও অধিক সাধনায় মগ্ন হয়৷ সে সব সময় ১৫০ পাউণ্ড ওজনের বোঝা বহন করতো এবং তিনবছর পর্যন্ত এটি শুষ্ক কূপের মধ্যে অবস্থান করেছিলো৷ সেন্ট সাবিউস শুধু এমন জোয়ারের রুটি খেতেন যা গোটা মাস পানিতে ভিজে থাকার কাণে গন্ধযুক্ত হয়ে যেতো৷ সেন্ট বাইসারিউন ৪০ দিন পর্যন্ত কন্টকাকীর্ণ ঝোপের মধ্যে পড়েছিলো এবং ৪০ বছর পর্যন্ত সে মাটিতে পিঠ ঠেকায়নি৷ সেন্ট পাখোমিউস ১৫ বছর অপর একটি বর্ণনা অনুসারে পঞ্চাশ বছর মাটিতে পিঠ না ঠেকিয়ে অতিবাহিত করেছে৷ সেন্ট জন নামক একজন ওলী তিন বছর পর্যন্ত উপাসনারত অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল৷ পুরো এই সময়টাতে সে কখনো বসেও নাই কিংবা শয্যা গ্রহণও করে নাই৷ আরাম করার জন্য একটি বড় পাথরে হেলান দিত এবং প্রতি রবিবারে তার জন্য 'তাবাররুক'হিসেবে যে খাদ্য আনা হতো কেবল তাই ছিল তার খাদ্য৷ সেন্ট সিমিউন স্টায়লাইট (৩৯০-৪৪০ খৃঃ) খৃস্টানদের বড় বড় ওলী দরবেশের অন্যতম৷ প্রত্যেক ইস্টারের আগে সে পুরা চল্লিশ দিন না খেয়ে কাটিয়ে দিত৷ একবার সে পুরো এক বছর পর্যন্ত এক পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল৷ মাঝে মধ্যে সে তার খানকাহ থেকে বেরিয়ে একটি কূপের মধ্যে গিয়ে থাকতো৷ অবশেষ সে উত্তর সিরিয়ার সীমান দূর্গের সন্নিকটে ৬০ ফূট উঁচু একটি স্তম্ভ নির্মাণ করিয়ে নেয় যার ওপরের অংশের পরিধি ছিল মাত্র তিন ফুট৷ এরই উপরে তার জন্য একটি ঘেরা নির্মাণ করে দেয়া হয়েছিল৷ এই স্তম্ভটির ওপরে সে পুরো তিনটি বছর কাটিয়ে দেয়৷ রোদ-বৃষ্টি ও শীত-গ্রীষ্ম সব কিছুই তার ওপর দিয়ে চলে যেতো কিন্তু স্তম্ভ থেকে সে কখনো নিচে নামতো না৷ তার শিষ্য সিড়ি লিগিয়ে তাকে লাগিয়ে তাকে খাবার পৌছাতো এবং তার ময়লা অবর্জনা সাফ করতো৷ তার পর সে রশি দিয়ে নিজেকে স্তম্ভের সাথে বেঁধে নেয়৷ এমনকি রশি তার শরীরের মাংসের মধ্যে ঢুকে যায়্ এতে মাংসে পচন ধরে এবং তাতে পোকা পড়ে৷ তার ফোঁড়া থেকে যখনই কোন পোকা নীচে পড়ে যেতো তখনই সে তা উঠিয়ে ফোঁড়ার মধ্যে রাখতো এবং বলতোঃ"আল্লাহ তোকে যা খেতে দিয়েছেন খা"৷ সাধারণ খৃস্টানরা বহুদূর দূরন্ত থেকে তার সাক্ষাত লাভের জন্য আসতো৷ সে মারা গেলে খৃস্টান জনতা তার সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেয় যে, সে খৃস্টান অলী দরবেশেদের মধ্যে সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত৷

এ যুগের খৃস্টান আওলিয়াদের যেসব গুণাবলী বর্ণনা করা হয়েছে তা এ ধরনের দৃষ্টান্তে ভরা৷ অলীদের মধ্য কারো পরিচয় ছিল এই যে, সে ৩০ বছর পর্যন্ত সম্পূর্ণ নিশ্চুপ ছিল, তাকে কখনো কথা বলতে দেখা যায়নি৷ কেউ নিজেকে একটি বড় পাথরের সাথে বেঁধে রেখেছিল৷ কেউ জংগলে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতো এবং ঘাস ও লতাপাতা খেয়ে জীবন ধারণ করতো৷ কেউ সব সময় ভারী বোঝা বহন করে বেড়াতো৷ কেউ শৃঙ্খল নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বেঁধে রাখতো৷ কিছু সংখ্যক অলী আবার জীব-জন্তুর গুহায়, শুষ্ক বিরান কূপে কিংবা পুরনো করবে গিয়ে বাস করতো৷ আরো কিছু সংখ্যক বুর্যগ সব সময় উলঙ্গ থাকতো, লম্বা চুল দিয়ে নিজেদের লজ্জাস্থান ঢাকতো৷ এবং বুজে হেঁটে চলতো৷ সবখানে এ ধরনের ওলী দরবেশদের কারামতের চর্চা হতো এবং মৃত্যুর পর তাদের হাড্ডিসমূহ খানকাহসমূহে সংরক্ষণ করা হতো৷ আমি নিজে সিনাই পর্বতের পাদদেশে সেন্ট ক্যাথারইনের খানকায় এ ধরনের হাড় গোড়ে সজ্জিত গোটা একটা লাইব্রেরী দেখেছি সেখানে এক জায়গায় ওলীদের মাথার, খূলী, এক জায়গায় পায়ের হাড় এবং এক জায়গায় হাতের হাড় সাজানো ছিল৷ একজন ওলীর গোটা কংকালই কাঁচের আলমারীতে রাখা ছিল৷

দুইঃ তাদের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট ছিল এই যে, তারা সব সময় নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন থাকতো এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতাকে চরমভাবে বর্জন করে চলতো৷ তাদের দৃষ্টিতে গোসল করা বা শরীরে পানি লাগানো আল্লাহ ভীরুতার পরিপন্থী৷ দেহের পরিচ্ছন্নতাকে তারা আত্মার অপবিত্রতা বলে মনে করতো৷ সেন্ট আথানাসিউস অত্যন্ত ভক্তির সাথে সেন্ট ত্র্যানথোনীর এই বৈশিষ্টটি বর্ণনা করেছেন যে, মৃত্যু পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত সে তার নিজের পা ৫০ বছর পর্যন্ত সে মুখ বা পা কিছুই ধোয়নি৷ এক বিখ্যাত খৃস্টান সন্ন্যাসীনী কুমারী সিলভিয়া আঙ্গুল ছাড়া জীবনভর দেহের অন্য কেন অংশ পানি লাগাতে দেয়নি৷ একটি কনভেন্টের ১৩০ জন সন্ন্যাষিনীর প্রশংসায় লেখা হয়েছে যে, তারা কখনো নিজেদের পা ধোয়নি৷ আর গোসলের তো নাম শুনলেই তাদের দেহে কম্পন সৃষ্টি হতো৷

তিনঃ এ বৈরাগ্যবাদ দাম্পত্য জীবনকে কার্যত পুরোপুরি হারাম করে দেয় এবং বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলার ব্যপারে অত্যন্ত নির্মমভাবে কাজ করে৷ চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীর সমস্ত ধর্মীয় রচনাবলী এ ধারণায় ভরা যে, নিসঙ্গ জীবন বা কৌমার্য সর্বাপেক্ষা বড় নৈতিক মূল্যবোধ৷ পবিত্রতার অর্থ হচ্ছে ব্যক্তি যৌন সম্পর্ককে একেবারেই বর্জন করবে৷ এমনকি তা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার যৌন সম্পর্কে হলেও৷ এমন একটি অবস্থাকে পুতঃপবিত্র আধ্যাত্মিক জীবনের পরিপূর্ণতা মনে করা হতো, যে ক্ষেত্রে ব্যক্তি তার প্রবৃত্তিকে পুরোপুরি হত্যা করে এবং তার মধ্যে দৈহিক ভোগাকাংখার লেশ মাত্রও অবশিষ্ট না থাকে৷ প্রবৃত্তিকে হত্যা করা তাদের দৃষ্টিতে এজন্য জরুরী ছিল যে, তা দ্বারা পশুত্ব শক্তি লাভ করে৷ তাদের কাছে ভোগ এবং গোনাহ ছিল সমার্থক৷ এমনকি তাদের দৃষ্টিতে আনন্দ প্রকাশ করাও আল্লাহকে ভুলে যাওয়ার নামান্তর ছিল৷ সেন্ট বাসেল শব্দ করে হাসা এমনকি মুচকি হাসা পর্যন্ত নিষেধ করেছেন৷ এসব ধ্যান-ধারণার ভিত্তিতে তাদের কাছে নারী ও পুরুষের বৈবাহিক সম্পর্ক একেবারেই অপবিত্র বলে গণ্য হয়েছিলো৷ বিয়ে তো দূরের কথা নারীর চেহারা না দেখা এবং বিবাহিত হলে স্ত্রীকে ফেলে চলে যাওয়া সন্ন্যাসীর জন্য অত্যন্ত জরুরী ছিল৷ পুরুষদের মত নারীদের মনেও একথা বদ্ধমুল করে দেয়া হয়েছিল যে, তারা যদি আসমানী বাদশাহীতে প্রবেশ করতে চায় তাহলে যেন চির কুমারী থাকে এবং বিবাহিতা হলে স্বামীদের থেকে আলাদা হয়ে যায়৷ সেন্ট জিরুমের মত বিশিষ্ট খৃস্টান পণ্ডিত বলেন, যে নারী যীশু খৃস্টের কারণে সন্ন্যাসীনী হয়ে সারা জীবন কুমারী থাকবে সে খাস্টান সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী আর সেই নারীর মা, খোদা অর্থাৎ খৃস্টের শ্বাশুড়ী, (Mother in law of god) হওয়ার মর্যাদা লাভ করবে৷ সেন্ট জিরুম অন্য একস্থানে বলেনঃ "পবিত্রতার কুঠার দিয়ে দাম্পত্য বন্ধনের কাষ্ঠ খন্ড কেটে ফেলাই আধ্যাত্মিক পথের অনুসারীর সর্ব প্রথম নারীর মধ্যে এর সর্ব প্রথম যে প্রতিক্রিয়া হয় তা হচ্ছে, তার মধুর দাম্পত্য জীবন চিরদিনের জন্য ধ্বংস হয়ে যায়৷ আর খৃস্টান ধর্মে যেহেতু তালাক ও বিচ্ছেদের কোন ব্যবস্থা ছিল না৷ তাই বৈবাহিক বন্ধনের মধ্য থেকেই স্বামী-স্ত্রী পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতো৷ সেন্ট নাইলাস (St. Nilus) ছিল দুই সন্তানের পিতা৷ সে বৈরাগ্যবাদের খপ্পরে পড়লে তার স্ত্রী কাঁদতে শুরু করে৷ কিন্তু তা সত্ত্বেও সে স্ত্রী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়৷ সেন্ট আম্মুন (St. Ammon) বিয়ের রাত বাসর শয্যায়ই তার নব বধুকে দাম্পত্য সম্পর্কের অপবিত্রতা সম্পর্ক উপদেশ দেয় এবং উভয়ে একমত হয়ে সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা আজীবন পরস্পর আলাদা থাকবে৷ সেন্ট ত্র্যালেক্সিসও (St. Alexis) এই একই কাজ করেছিলো৷ খৃস্টান আওলিয়া -দরবেশদের জীবন -কথা এ ধরনের কাহিনীতে ভরপুর৷

গীর্জা কর্তৃপক্ষ তার গণ্ডির মধ্যে তিনশত বছর পর্যন্ত কোন না কোনভাবে এ চরমপন্থী ধ্যান-ধারণা প্রতিরোধ করতে থাকে৷ সেই সময় একজন পাদ্রীর জন্য নিসংগ বা অবিবাহিত হওয়া জরুরী ছিল না৷ সে যদি পাদ্রীর পদ মর্যাদায় অভিষিক্ত হওয়ার আগেই বিবাহিত হয়ে থাকে তাহলে সে স্ত্রীর সাথেই থাকতে পারতো৷ তবে পাদ্রী হিসেবে নিয়োজিত হওয়ার পর তার বিয়ে নিষেধ ছিল৷ তাছাড়া এমন কোন ব্যক্তিকে পাদ্রী নিয়োগ করা যেতো না যে কোন বিধবা কিংবা তালাক প্রাপ্তাকে বিয়ে করেছে এবং যার দুই স্ত্রী আছে, কিংবা যার ঘরে দাসী আছে৷ ক্রমান্বয়ে চতুর্থ শতাব্দীতে এ ধরণের জোরদার হয়ে ওঠে যে, যে ব্যক্তি গীর্জায় ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করে তা বিবাহিত হওয়া অত্যন্ত ঘৃণার ব্যাপার৷ ৩৯২ খৃস্টাব্দের গেংরা কাউন্সিল ছিল এ ব্যাপারে সর্বশেষ সম্মেলন যেখানে এ ধরনের ধ্যান-ধারণনাকে ধর্মের পরিপন্থী বলে গণ্য করা হয় ৷ কিন্তু এর অল্প কিছুকাল পরেই ৩৮৬ খৃস্টাব্দে রোমান সিনোড (Synod) সমস্ত পাদ্রীকে পরামর্শ দেয় যে, তারা যেন বৈবাহিক বন্ধন থেকে দূরে থাকে৷ পরের বছর পোপ সাইরিকিয়াস (Siricius) নির্দেশ জারী করে যে, যে পাদ্রী বিয়ে করবে, কিংবা পূর্ব বিবাহিত হওয়ার ক্ষেত্রে স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক রাখবে, তাকে তার পদ থেকে অপসারিত করা হোক৷ সেন্ট জিরুম, সেন্ট ত্র্যানম্ব্রুজ ও সেন্ট অগাস্টাইনের মত বড় বড় পণ্ডিত ও মনীষী অত্যন্ত জোরালোভাবে এই সিদ্ধান্ত সমর্থন করে এবং যৎ সামান্য প্রতিরোধের পর পাশ্চত্য গীর্জাসমূহে অত্যন্ত কঠোরভাবে তা চালু হয়৷ পূর্ব বিবাহিত লোকেরা ধর্মীয় দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত হওয়ার পরও নিজেদের স্ত্রীর সাথে "অবৈধ" সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছে এ ধরনের অনেক অভিযোগ নিয়ে চিন্তা -ভাবনা করার জন্য সে সময় অনেকগুলো কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়৷ অবশেষে তাদের সংশোধনের জন্য নিয়ম করে দেয়া হয় যে, তারা উন্মুক্ত স্থানে ঘুমাবে, স্ত্রীদের সাথে কখনে একাকী সাক্ষাত করবে না, এবং তাদের সাক্ষাতের সময় কমপক্ষে দুই জন লোক উপস্থিত থাকবে৷ সেন্ট গ্রগরী একজন পাদ্রীর প্রশংসা করে লিখছেন যে, সে ৪০ বছর পর্যন্ত তার স্ত্রী থেকে দূরে ছিল এবং মৃত্যুর সময় তার স্ত্রী যখন তার কাছে যায় তখন সে বলেঃ "নারী, তুই দূর হ৷ "

চারঃ এ বৈরাগ্যবাদের সব চাইতে বেদনাদায়ক দিক ছিল এই যে, তা মা-বাপ, ভাইবোন ও সন্তানদের সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক ছিন্ন করে দিয়েছিল৷ খৃস্টান আওলিয়া দরবেশের দৃষ্টিতে সন্তানদের জন্য মা বাবার স্নেহ-ভালবাসা, ভাইয়ের জন্য ভাই-বোনের স্নেহ-ভালবাসা এবং বাপের জন্য ছেলেমেয়ের ভালাবাসাও ছিল একটি পাপ৷ তাদের মতে আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য এসব সম্পর্ক ছিন্ন করা অপরিহার্য৷ খৃস্টান আওলিয়া দরবেশদের জীবন কথায় এর এমন সব হৃদয় বিদারক কাহিনীদেখা যায় যা পাঠ করে কোন মানুষের পক্ষে ধৈর্যধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে৷ একজন সন্ন্যাসী ইভাগ্রিয়াস (Evagrius) বছরের পর বছর মরুভূমিতে গিয়ে সাধনা করছিল৷ তার বাবা মা বহু বছর ধরে তার জন্য অস্থিরতা প্রকাশ করেছিল৷ একদিন হঠাৎ তার কাছে তার মা বাবার পত্র পৌছলো৷ এ পত্র পাঠ করে তার মনে মানবিক ভালবাসার আবেগ উদ্বেলিত হয়ে উঠতে পারে এ আংশকা দেখা দিল ৷ তাই সে ঐ পত্রগুলো না খুলেই আগুনে নিক্ষেপ করলো৷ সেন্ট থিউডোরসের মা ও বোন বহুসংখ্যক পাদ্রীর সুপারিশ পত্র নিয়ে যে খানকায় সে অবস্থান করতো সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলো এবং পুত্র ও ভাইকে এক নজর দেখার আকাংখা প্রকাশ করলো৷ কিন্তু সে তাদের সস্মুখে আসতে পর্যন্ত অস্বীকার করলো৷ সেন্ট মার্কাসের (St. Marcus) মা তার সাথে সাক্ষাতের জন্য তার খানকায় যায় এবং খানকায় প্রধানকে অনুনয় বিনয় করে ছেলেকে মায়ের সামনে আসার নির্দেশ দিতে রাজি করায়৷ কিন্তু ছেলে কোনক্রমেই মায়ের সাথে সাক্ষাত করতে চাচ্ছিলো না৷ শেষ পর্যন্ত সে খানকা প্রধানের নির্দেশ পালন করে এভাবে যে, বেশভুষা পরিবর্তন করে মায়ের সামনে যায় এবং চোখ বন্ধ করে থাকে৷ এভাবে মাও ছেলেকে চিনতে পারেনি, ছেলেও মায়ের চেহারা দেখতে পারেনি৷ আরো একজন অলী সেন্ট পোমেন (St. Poemen) ও তার ৬ ভাই মিসরের একটি মরু খানকায় থাকতো৷ বহু বছর পর তাদের বৃদ্ধা মা তা খোঁজ পায় এবং তাদের সাথে সাক্ষাতের জন্য সেখানে গিয়ে হাজির হয়৷ ছেলে দূর থেকে মাকে দেখা মাত্রই দৌড়িয়ে গিয়ে তার হুজরায় প্রবেশ করে এবং দরজা বন্ধ করে দেয়৷ মা বাইরে বসে কাঁদতে থাকলো এবং চিৎকার করে বললোঃ এই বৃদ্ধাবস্থায় এত দীর্ঘ পথ হেটে আমি কেবল তোমাকে দেখতে এসেছি৷ আমি যদি তোমার চেহারা দেখি তাহলে তোমার কি ক্ষতি হবে? আমি কি তোমার মা নই? কিন্তু সেসব অলী-দরবেশরা দরজা খুললো না৷ তারা মাকে বলে দিল যে, আমারা আল্লাহর কাছে তোমার সাথে সাক্ষাত করবো৷ সেন্ট সিমিউন স্টায়লাইটসের (St. Simeon Stylites) কাহিনী এর চেয়েও বেদনাদায়ক৷ সে তার মাকে ছেড়ে ২৭ বছর নিরুদ্দেশ থাকে৷ বাপ তার বিচ্ছেদে মারা যায়৷ মা জীবিত থাকে৷ ছেলের আল্লাহর অলী হওয়ার কথা যখন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে তখন মা ছেলের অবস্থান জানতে পারে৷ বেচারী মা তার সাথে সাক্ষাতের জন্য তার খানকায় গিয়ে হাজির হয়৷ কিন্তু কোন নারীর জন্য সেখানে প্রবেশের অনুমতি ছিল না৷ ছেলে হয় তাকে ভেতরে ডেকে নিক কিংবা বাইরে এসে তাকে দর্শন দিক এ ব্যপারে মা অশেষ-কাকুতি-মিনুতি জানায়৷ কিন্তু সেই অলী তা করতে সুস্পষ্টভাবে অস্বীকৃতি জানায়৷ এ অবস্থায় হতভাগিনী মা তিনদিন তিন রাত খানকার দরজার সামনে পড়ে থাকে এবং শেষ সেখানেই শুয়ে শুয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে৷ তখন অলী সাহেব বেরিয়ে এসে মায়ের লাশের পাশে অশ্রুপাত এবং তার ক্ষমার জন্য দোয়া করে৷

এসব অলীরা তাদের বোন ও সন্তানদের সাথেও এ ধরনের নিষ্ঠুরতা দেখিয়েছে৷ এক ব্যক্তি মিউটিয়াসের কাহিনী লিপিবদ্ধ করেছেন যে, সে ছিল একজন সুখী -স্বচ্ছল মানুষ৷ হঠাৎ তাকে ধর্মীয় আবেগে পেয়ে বসে এবং সে তার ৮ বছর বয়সের একমাত্র পুত্রকে নিয়ে এক খানকায় গিয়ে হাজির হয়৷ সেখানে তার আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য মন থেকে পুত্রের প্রতি স্নেহ -ভালবাসা দুর করা একান্ত আবশ্যক ছিল৷ সেজন্য প্রথমে তাকে পুত্রের নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়৷ অতপর তার চোখের সামনে দীর্ঘদিন পর্যন্ত তার সে নিষ্পাপ শিশু সন্তানকে নানাভাবে নির্মম কষ্ট দেয়া হতে থাকে এবং সে তার দেখতে থাকে এরপর খানকায় পুরোহিত তাকে তার ঐ সন্তানকে নিজ হাতে সমুদ্রে নিক্ষেপ করতে নির্দেশ দেয়৷ সে যখন এ নির্দেশও পালন করতে প্রস্তুত হয় এবং শিশুটিকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করতে উদ্যত হয় ঠিস সে মুহুর্তে সন্ন্যাসীরা এসে তার জীবন রক্ষা করে ৷ এরপর স্বীকৃতি দেয়া হয় যে, সত্যিই সে অলী হওয়ার মর্যাদা লাভ করেছে৷

এসব ব্যাপারে খৃস্টীয় বৈরাগ্যবাদের দৃষ্টিকোণ ছিল এই যে, আল্লাহর ভালবাসা যে ব্যক্তি চায় তাকে মানবীয় ভালবাসা সেসব শৃঙ্খল কেটে ফেলতে হবে যা পৃথিবীতে তাকে তার মা বাবা, ভাইবোন এবং সন্তান -সন্তুতির সাথে মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ করে৷ সেনট জিরুম, বলেনঃ "তোমার ভাজিতা যদি তোমার গলায় বাহু জগিয়েও থাকে, তোমার মা যদি তোমাদের দুধের দোহাই দিয়ে বিরত রাখতে চায়, তোমাকে বিরত রাখার জন্য তোমার বাবা যদি সামনে লুটিয়ে পড়ে, তারপরও তুমি সবাইকে পরিত্যাগ করে এবং বাবার দেহকে পদদলিত করে এক ফোটাও অশ্রুপাত না করে ক্রুশের ঝাণ্ডার দিকে ছুটে যাও৷ এ ক্ষেত্রে নিষ্ঠুরতাই তাকওয়া৷ " সেন্ট গ্রেগরী লিখেছেনঃ "এক যুবক সন্ন্যাসী মন থেকে মা বাবার প্রতি ভালবাসা দূর করতে পারেনি৷ সে এক রাত চুপে চুপে তাদের সাথে সাক্ষাত করতে যায়৷ আল্লাহ তাকে এ অপরাধের সাজা দেন৷ সে খানকায় ফিরে আসা মাত্রই মারা যায়৷ তার লাশ দাফন করা হলে মাটি তা গ্রহণ করে না৷ কবরে বার বার তার লাশ রাখা হয় কিন্তু মাটি তা বাইরে নিক্ষেপ করে৷ অবশেষে সেন্ট বেনডিক্ট তার বুজের ওপর তাবাররুক রাখলে কবর তাকে গ্রহণ করে৷ " এক সন্ন্যাসীনী সম্পর্কে লিখেছেন যে, সে মারা যাওয়ার পর তিনদিন পর্যন্ত আযাব হতে থাকে৷ কারণ সে মন থেকে তাঁর মায়ের ভালবাসা দূর করতে পারেনি৷ একজন অলীর প্রশংসায় লিখেছেন যে, নিজের আত্মীয় -স্বজন ছাড়া সে কখনো অন্য কারো সাথে নিষ্ঠুর আচরণ করেনি৷

পাঁচঃ নিজের নিকটাত্মীয়দের সাথে নির্দয়তা, নিষ্ঠুরতা, এবং কঠোরতা প্রদর্শনের যে অনুশীলন তারা করতো তাতে তাদের মানবিক আবেগ-অনুভূতি মরে যেতো৷ এর স্বাভাবিক ফল দাঁড়িয়েছিল এই যে, যাদের সাথে তাদের ধর্মিয় বিরোধ দেখা দিতো এরা তাদের ওপর জুলুম -অত্যাচারের চরম পন্থা গ্রহণ করতো ৷ চতুর্থ শতাব্দীর আগমন পর্যন্ত খৃস্টবাদের মধ্য ৮০-৯০ টি ফিরকা সৃষ্টি হয়েছিল৷ সেন্ট আগাস্টাইন তার সময়ে ৮৮টি ফিরকা গণনা করেছেন৷ এসব ফিরকা পরস্পরের বিরুদ্ধে চরম ঘৃণা ও হিংসা বিদ্বেষ পোষন করতো৷ হিংসা বিদ্বেষের এ আগুণের ইন্ধন যোগানদাতাও ছিল সন্ন্যাসীরা৷ এ আগুনে বিরোধী ফিরকাসমূহকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে নিঃশেষ করে দেয়ার প্রচেষ্টায়ও এসব খানকাবাসী সন্ন্যাসীরাই অগ্রনী ভূমিকা পালন করতো৷ এ সম্প্রদায়িক সংঘাতের একটি বড় আখড়া ছিল আলোকজান্দ্রিয়া৷ সেখানে প্রথমে এরিয়ান ফিরকাহ বিশপ আথানিসিউসের দলের ওপর হামলা করে৷ তার খানকা থেকে কুমারী সন্ন্যাসীদের ধরে ধরে বের করে আনা হয়৷ তাদেরকে উলংগ করে কাঁটা যুক্ত ডাল পালা দিয়ে প্রহার করা হয় এবং শরীরে দাগ লাগানো হয় যাতে তারা নিজেদের আকীদা-বিশ্বাস বর্জন করে তাওবা করে ৷ এর পর মিসরে ক্যাথলিক গোষ্ঠী বিজয় লাভ করলে এরিয়ান ফিরকার সাথে একই আচরণ করে৷ এমনকি খুব সম্ভবত খোদ এরিয়াস (Arius) কেও বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়৷ আলোকজান্দ্রিয়াতেই সেন্ট সাইরিল (Cyril) এর মুরীদ সন্ন্যাসীরা ব্যপাক হাংগামার সৃষ্টি করে৷ এমনকি তারা বিরোধী ফিরকার এক সন্ন্যাসীকে ধরে তাদের গীর্জায় নিয়ে হত্যা করে এবং লাশ টুকরো টুকরো করে কেটে আগুনে নিক্ষেপ করে৷ রোমের পরিস্থিতিও এর থেকে ভিন্ন কিছু ছিল না৷ ৩৬৬ খৃস্টাব্দে পোপ লিবিরিয়াস (Liberius) এর মৃত্যু হলে দুই গোষ্ঠীই পোপের পদের জন্য নিজ নিজ প্রার্থী দাঁড় করায়৷ উভয় গোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক খুনাখুনি ও রক্তপাত হয়৷ এমনকি একটি চার্চ থেকে একদিনে ১৩৭ টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়৷

ছয়ঃ দুনিয়া বর্জন ও নিসঙ্গ জীবন যাপন এবং কৃচ্ছ্রতা ও দরবেশীর জীবন যাপনের পাশাপাশি পার্থিব, ধন-সম্পদ উপার্জনও কম করা হয়নি৷ পঞ্চম শতাব্দীর শুরুতেই পরিস্থিতি এ দাঁড়িয়েছিল যে, রোমের বিশপ তার মহলে রাজা-বাদশাহদের মত বসবাস করতো৷ আর সে যখন সওয়ারীতে আরোহণ করে শহরে বের হতো তখন তার জাঁকজমক কাইজারের চাইতে কম হতো না৷ সেন্ট জিরুম তার সময়ে (চতুর্থ শতাব্দীর শেষযুগ) অভিযোগ করেছেন যে, বহু সংখ্যাক বিশপের খাওয়ার অনুষ্ঠানসমূহ জাঁকজমকের দিক দিয়ে গভর্ণরদের খাওয়া অনুষ্ঠানসমূহ লজ্জা দিত৷ খানকাহ ও গীর্জাসমূহের প্রতি সম্পদের এই প্রবাহ সপ্তম শতাব্দীর প্রারম্ভকাল (কুরআন নাযিল হওয়ার যুগ) পর্যন্ত প্লাবনের আকার ধারণ করছিলো৷ জনসাধারণের মনে একথা বদ্ধমূল করে দেয়া হয়েছিলো যে, কোন ব্যক্তির দ্বারা কোন বড় গোনাহের কাজ সংঘটিত হলে কোন না কোন অলীর দরগায় নজরানা পেশ করে কিংবা কোন খানকাহ বা চার্চকে ভেট ও উপঢৌকন দিয়েই কেবল ক্ষমা পাওয়া যেতে পারে ৷ যে পার্থিব স্বার্থ ও ঐশ্বর্য পরিত্যাগ করাই ছিল পাদ্রী -সন্ন্যাসীদের বিশেষ বৈশিষ্ট তা-ই এখন তাদের পদতলে লুটিয়ে পড়লো৷ যে জিনিস বিশেষ ভাবে এ অধপতনের কারণ হয় তা ছিল সন্ন্যাষীদের অস্বাভাবিক আধ্যাত্মিক সাধনা ও প্রবৃত্তি দমনের চরম প্রচেষ্টা দেখে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে চরম ভক্তি -শ্রদ্ধা সৃষ্টি হয়োছিলো তাতে বহু দুনিয়াদার লোক দরবেশের পোশাক পরে পাদ্রী-সন্ন্যাসীদের দলে অন্তরভুক্ত হয়েছিলো৷ তারা পার্থিব, স্বার্থ বর্জনের মুখোশ পরে দুনিয়া অর্জনের কারবার এমনভাবে জাঁকিয়ে বসেছিল যে, বড় বড় দুনিয়াদারও তাদের কাছে হার মানতে বাধ্য হয়৷

সাতঃ সতীত্বের ক্ষেত্রেও বৈরাগ্যবাদের প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করে বারবার পরাজয় বরণ করেছে আর সে পরাজয়ও বারণ করতে হয়েছে অত্যন্ত শোচনীয়ভাবে৷ খানকাসমূহে প্রবৃত্তি দমনের এমন কিছু অনুশীলনও ছিল যে, ক্ষেত্রে সন্ন্যাষী ও সন্ন্যাসীনীরা মিলে এই জায়গায় থাকতো এবং কোন কোন সময় কিছুটা কঠিন অনুশীলনের জন্য একই বিছানায় রাত কাটাতো৷ বিখ্যাত দরবেশ সেন্ট ইভাগ্রিয়াস (Evagrius) অত্যন্ত প্রশংসামুখর হয়ে ফিলিস্তিনের কিছু সংখ্যক সন্ন্যাসী -দরবেশের আত্ম সংযমের উল্লেখ করে বলেছেনঃ "তারা তাদের আবেগ অনুভূতিকে এতটা কাবু করতে সক্ষম হয়েছিল যে, নারীদের সাথে এক জায়গায় গোসল করতো কিন্তু তাদেরকে দেখে, তাদের স্পর্শ পেয়ে এমনকি তাদের সাথে আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়েও তাদের প্রবৃত্তি সাড়া দিতো না৷ "বৈরাগ্যবাদের দৃষ্টিতে গোসল যদিও অত্যন্ত অপছন্দনীয় ব্যাপার ছিল৷ কিন্তু প্রবৃত্তি দমনের উদ্দেশ্যে এ ধরনের গোসলও করা হতো৷ শেষ পর্যন্ত এ ফিলিস্তিন সম্পর্কেই নাইসার (Nyssa) সেন্ট গ্রগরী যিনি ৩৯৬ খৃস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন লিখেছেন যে, ফিলিস্তিন অসৎ ও দুশ্চরিত্রের আখড়ায় পরিণত হয়েছে৷ যারা মানব -প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করে মানব -প্রকৃতি তাদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ না করে ক্ষান্ত হয়নি৷ বৈরাগ্যবাদ এর বিরুদ্ধে লড়াই করে অবশেষে লাম্পট্যের যে গহ্বরে পতিত হয়েছে তার কাহিনী খৃস্টীয় অষ্টম শতাব্দী থেকে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত সময়ের ধর্মীয় ইতিহাসের একটি কুৎসিত কলঙ্ক৷ দশম শতাব্দীর একজন ইতালীর বিশপ লিখেছেনঃ চার্চে ধর্মীয় দায়িত্ব পালনকারীদের বিরুদ্ধে যদি লাম্পট্য ও চরিত্রহীনতার শাস্তিমূলক আইন কার্যকর করা হয় তাহলে চার্চের কাজে নিয়োজিত লোকদের মধ্যে কেবল বালকরা ছাড়া আর কেউ তা থেকে রক্ষা পাবে না৷ আর যদি অবৈধ সন্তানদেরকেও ধর্মিয় কাজের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়ার নিয়ম চালু করা হয় তাহলে হয়তো চার্চের কাজে নিয়োজিত কোন বালকই সেখানে থাকতে পারবে না৷ মধ্য যুগের লেখকদের গ্রন্থসমূহ এ ধরনের অভিযোগ ও কাহিনীতে ভরা যে, সন্ন্যাসীদের খানকাসমূহ চরিত্রহীনতার আখড়া তথা বেশ্যালয়ে পরিণত হয়েছে, চতুর্দেয়ালের মধ্যে নবজাতক শিশুদের গণহত্যা চলেছে, পাদ্রী এবং চার্চের ধর্মীয় কাজ সম্পাদনকারী কর্মীদের মধ্যে "মুহরেম" বা যেসব নারীর সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম তাদের সাথে পর্যন্ত অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন ও খানকাসমূহে সমকামিতার অপরাধ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে এবং গীর্জাসমূহে পাপ স্বীকারের (Confession) অনুষ্ঠান দুক্ষর্ম ও চরিত্রহীনতার সহায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছে৷

কুরআন মজীদ এখানে বৈরাগ্যবাদরূপী বিদআত আবিস্কার করা এবং পরে তা যথাযর্থভাবে মেনে চলতে না পারার কথা বলে খৃস্টান ধর্মের কোন বিকৃতির প্রতি ইংগিত করেছে বিস্তারিত এসব বর্ণনা থেকে তা সঠিকভাবে অনুমান করা যেতে পার৷
৫৫. এ আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে৷ একদল মুফাসসির বলেনঃ এখানে () কথাটি দ্বারা যারা হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের ওপর ঈমান এনেছিলো তাদের সম্বোধন করা হয়েছে৷ তাদের বলা হচ্ছে, এখন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর ঈমান আনো৷ এজন্য তোমাদেরকে দ্বিগুণ পুরস্কার দেয়া হবে৷ একটি পুরস্কার দেয়া হবে হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের ওপর ঈমান আনার জন্য এবং আরেকটি পুস্কার দেয়া হবে হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর ঈমান আনার জন্য৷ অপর দল বলেনঃ যারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর ঈমান এনেছে এখানে তাদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে৷ তাদের বলা হচ্ছে, তোমরা শুধু মৌখিকভাবে তার নবুওয়াতকে স্বীকার করেই ক্ষান্ত হয়ো না বরং সরল মনে নিষ্ঠার সাথে ঈমান গ্রহণ করো এবং ঈমান গ্রহণের হক আদয় করে৷ এভাবে তোমরা দ্বিগুণ পুরস্কার লাভ করবে৷ একটি পুরস্কার কুফরী ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণের জন্য এবং আরেকটি পুরস্কার নিষ্ঠা ও ঐকান্তিকতা সহ ইসলামের খেদমত করার ও তার ওপর দৃঢ়পাদ থাকার জন্য৷ সূরা কাসাসের ৫২ থেকে ৫৪ পর্যন্ত আয়াত প্রথম তাফসীরের সমর্থন করে৷ তাছাড়া হযরত আবু মুসা আশআরী বর্ণিত হাদীস থেকেও এর সমর্থন পাওয়া যায়৷ হাদীসটিতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ তিন ব্যক্তির জন্য দ্বিগুণ পুরস্কার রয়েছে ৷ উক্ত তিন ব্যক্তির মধ্যে একজন হচ্ছে

---------------------

"আহলে কিতাবদের মধ্য থেকে সে ব্যক্তি যে পূর্ববর্তী নবীর প্রতি ঈমান পোষণ করতো এবং পরে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর ঈমান এনেছে৷ " (বুখারী ও মুসলিম) ৷

সূরা সাবার ৩৭ আয়াত দ্বিতীয় তাফসীরের সমর্থন করে যাতে বলা হয়েছে; সৎকর্মশীল ঈমানদারদের জন্য দ্বিগুণ পুরস্কার রয়েছে৷ দলীল-প্রমাণের দিক দিয়ে দুটি তাফসীরই সমান গুরুত্বপূর্ণ৷ কিন্তু পরবর্তী বিষয়বস্তু সম্পর্কে চিন্তা -ভাবনে করলে বুঝা যায় যে, এখানে দ্বিতীয় তাফসীরটিই অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ৷ প্রকৃতপক্ষে এ সূরার বিষয়বস্তু প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এ তাফসীরকেই সমর্থন করে৷ যারা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রিসালাতকে স্বীকার করে ইসলাম গ্রহণ করেছিলো এ সূরার শুরু থেকে সেসব লোককেই সম্বোধন করা হয়েছে৷ গোটা সূরায় তাদেরকেই সম্বোধন করে এ আহবান জানানো হয়েছে যে, তারা যেন শুধু মৌখিকভাবে স্বীকৃতি দান করে ঈমানদার না হয়, বরং নিষ্ঠার সাথে সরল মনে ঈমান গ্রহণ করে৷
৫৬. অর্থাৎ পৃথিবীতে জ্ঞান ও দুরদৃষ্টির এমন 'নূর' দান করবেন যার আলোতে তোমরা প্রতি পদক্ষেপে স্পষ্ট দেখতে পাবে জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাহেলীয়াতের বাঁকা পথ-সমূহের মধ্যে ইসলামের সরল সোজা পথ কোনটি৷ আর আখেরাতে এমন 'নূর' দান করবেন যার উল্লেখ ১২ আয়াতে করা হয়েছে৷
৫৭. অর্থাৎ ঈমানের দাবী পূরণের আন্তরিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও মানবিক দূর্বলতার কারণে তোমাদের দ্বারা যে ভুল ক্রটিই সংঘটিত হোক না কেন তিনি তা ক্ষমা করে দেবেন৷ আর ঈমান গ্রহণের পূর্বে জাহেলিয়াতের সময় তোমাদের দ্বারা যেসব ভুল -ত্রুটি সংঘটিত হয়েছে তাও ক্ষতা করে দেবেন৷