(৫৭:২০) ভালভাবে জেনে রাখো দুনিয়ার এ জীবন, একটা খেলা, হাসি তামাসা, বাহ্যিক চাকচিক্য, তোমাদের পারস্পরিক গৌরব ও অহংকার এবং সন্তান সন্তুতি ও অর্থ-সম্পদে পরস্পরকে অতিক্রম করার চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়৷ এর উপমা হচ্ছে, বৃষ্টি হয়ে গেল এবং তার ফলে উৎপন্ন উদ্ভিদরাজি দেখে কৃষক আনন্দে উৎফূল্ল হয়ে উঠলো৷ তারপর সে ফসল পেকে যায় এবং তোমরা দেখতে পাও যে, তা হলদে বর্ণ ধারণ করে এবং পরে তা ভূষিতে পরিণত হয়৷ পক্ষান্তরে আখেরাত এমন স্থান যেখানে রয়েছে কঠিন আযাব, আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি৷ পার্থিব জীবন প্রতারণার উপকরণ ছাড়া আর কিছুই নয়৷ ৩৬
(৫৭:২১) দৌড়াও এবং একে অপরের চেয়ে অগ্রগামী হওয়ার চেষ্টা করো ৩৭ - তোমার রবের মাগফিরাতের দিকে এবং সে জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি আসমান ও যমীনের মত৷ ৩৮ তা প্রস্তুত রাখা হয়েছে সে লোকদের জন্য যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলদের প্রতি ঈমান এনেছে৷ এটা আল্লাহর অনুগ্রহ ৷ যাকে ইচ্ছা তিনি তা দান করেন৷ আল্লাহ বড়ই অনুগ্রহশীল
(৫৭:২২) পৃথিবীতে এবং তোমাদের নিজেদের ওপর যেসব মুসিবত আসে তার একটিও এমন নয় যে, তাকে আমি সৃষ্টি করার পূর্বে ৩৯ একটি গ্রন্থে লিখে রাখিনি৷ ৪০ এমনটি করা আল্লাহর জন্য খুবই সহজ কাজ৷ ৪১
(৫৭:২৩) (এ সবই এজন্য) যাতে যে ক্ষতিই তোমাদের হয়ে থাকুক তাতে তোমরা মনক্ষুন্ন না হও৷ আর আল্লাহ তোমাদের যা দান করেছেন ৷ সেজন্য গর্বিত না হও৷ ৪২ যারা নিজেরা নিজেদের বড় মনে করে এবং অহংকার করে,
(৫৭:২৪) নিজেরাও কৃপণতা করে এবং মানুষকেও কৃপণতা করতে উৎসাহ দেয় ৪৩ আল্লাহ তাদের পছন্দ করেন না৷ এরপর ও যদি কেউ মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে আল্লাহ অভাবশূন্য ও অতি প্রশংসিত৷৪৪
(৫৭:২৫) আমি আমার রসূলদের সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ এবং হিদায়াত দিয়ে পাঠিয়েছি৷ তাদের সাথে কিতাব ও মিযান নাযিল করেছি যাতে মানুষ ইনসাফের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে৷ ৪৫ আর লোহা নাযিল করেছি যার মধ্যে বিরাট শক্তি এবং মানুষের জন্য বহুবিধ কল্যাণ রয়েছে৷ ৪৬ এটা করা হয়েছে এজন্য যে, আল্লাহ জেনে নিতে চান কে তাঁকে না দেখেই তাঁকে ও তাঁর রসূলদেরকে সাহায্য করে৷ নিশ্চিতভাবেই আল্লাহ অত্যন্ত শক্তিধর ও মহাপরাক্রমশালী৷ ৪৭
৩৬. এ বিষয়টি পুরোপুরি বুঝার জন্য কুরআন মজীদের নিম্নবর্ণিত স্থানগুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবেঃ সূরা আলে ইমরান, আয়াত, ১৪-১৫, ইউনুস, আয়াত ২৪, ২৫ ইবরাহীম, ১৮, আল কাহাফ, ৪৫-৪৬, আন নূর, ৩৯৷ এসব স্থানে মানুষের মনে যে বিষয়টি বদ্ধমুল করার চেষ্টা করা হয়েছে তা হচ্ছে এ পৃথিবীর জীবন প্রকৃত পক্ষে একটি ক্ষণস্থায়ী জীবন৷ এখানকার বসন্তকাল যেমন অস্থায়ী তেমনি শরতকালও অস্থায়ী৷ এখানে চিত্ত হরণের বহু উপকরণ আছে৷ কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা এত নিকৃষ্ট এবং এত নগণ্য যে, নিজেদের নির্বুদ্ধিতার কারণে মানুষ ঐগুলোকে বড় বড় জিনিস বলে মনে করে এবং প্রতারিত হয়ে মনে করে ঐগুলো লাভ করতে পারাই যেন চরম জিনিস বলে মনে করে এবং প্রতারিত হয়ে মনে করে ঐগুলো লাভ করতে পারাই যেন চরম সফলতা অর্জন করা৷ অথচ যেসব বড় বড় স্বার্থ এবং আনন্দের উপকরণই এখানে লাভ করা সম্ভব তা নিতান্তই নগণ্য এবং কেবল কয়েক বছরের ধার করা জীবন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ৷ তার অবস্থাও আবার এমন যে, ভাগ্যের একটি বিপর্যয় ও বিড়ম্বনা এ পৃথিবীতেই ওগুলোকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট৷ পক্ষান্তরে আখেরাতের জীবন এক বিশাল ও স্থায়ী জীবন৷ সেখানকার কল্যাণও বিশাল ও স্থায়ী এবং ক্ষতিও বিশাল এবং স্থায়ী৷ সেখানে কেউ যদিআল্লাহর মাগফিরাত ও সন্তুষ্টি পেয়ে যায় তাহলে সে চিরদিনের জন্য এমন নিয়ামত লাভ করলো যার সামনে গোটা পৃথিবীর ধন-সম্পদ এবং রাজত্ব ও অতিশয় নগণ্য ও হীন৷ আর সেখানে যে আল্লাহর আযাবে গ্রেফতার হলো, সে যদি দুনিয়াতে এমন কিছুও পেয়ে যায় যা সে নিজে বড় মনে করতো৷ তবুও সে বুঝতে পারবে যে, সে ভয়ানক ক্ষতিকর কারবার করেছে৷
৩৭. মূল আয়াতে () শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে৷ শুধু দৌড়াও কথা দ্বারা এর সঠিক অর্থ প্রকাশ পায় না৷ () শব্দের অর্থ প্রতিযোগিতায় অন্যদের পেছনে ফেলে আগে চলে যাওয়ার চেষ্টা করা অর্থাৎ তোমরা পৃথিবীর ধন-সম্পদ, আনন্দ ও সুখ এবং কল্যাণসমূহ হস্তগত করার জন্য যে চেষ্টা করছো তা পরিত্যাগ করে এ জিনিসকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে নাও৷ এবং এ দিকে দৌড়িয়ে সফলতা লাভের চেষ্টা করো৷
৩৮. মূল আয়াতাংশ হচ্ছে () ৷ কোন কোন মুফাসির () শব্দটিকে প্রস্থ অর্থে গ্রহণ করেছেন৷ কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এখানে এ শব্দটি বিস্তৃতি ও প্রশস্ততা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে৷ আরবী ভাষায় () শব্দটি দৈর্ঘ্যের বিপরীত প্রস্থ বুঝাতেই শুধু ব্যবহৃত হয় না, বরং শুধুমাত্র বিস্তৃতি বুঝাতেও ব্যবহৃত হয়৷ যেমনঃ কুরআন মজীদের অন্য একস্থানে বলা হয়েছে () "মানুষ তখন লম্বা চওড়া দোয়া করতে শুরু করে৷ (হা মীম, আস সাজদা ৫১) ৷ এক্ষেত্রে একথাও বুঝে নিতে হবে যে, একথা দ্বারা জান্নাতের আয়তন বুঝাতে চাওয়া হয়নি, বরং তার বিস্তৃতির ধারণা দিতে চাওয়া হয়েছে৷ এখঅনে বলা হয়েছে, তার বিস্তৃতি আসমান ও যমীনের মত ব্যাপক ৷ আর সূরা আলে ইমরানে বলা হয়েছেঃ

------------------------

"দৌড়াও তোমাদের রবের মাগফিরাত ও সেই জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি গোটা বিশ্ব -জাহান জুড়ে, যা মুত্তাকীদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে৷ (আয়াত ১৩৩) ৷

এ দুটি আয়াত এক সাথে পড়লে মাথায় এমন একটা ধারণা জন্মে যে, একজন মানুষ জান্নাতে যে বাগান এবং প্রাসাদসমূহ লাভ করবে তার অবস্থান স্থল কেবল তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ৷ কিন্তু প্রকৃতপ্কষে গোটা বিশ্ব-জাহান হবে তার বিচরণ ক্ষেত্র৷ সে কোথাও সীমাবদ্ধ থাকবে না৷ সেখানে তার অবস্থা এ পৃথিবীর মত হবে না যে, চাঁদের মত সর্বাধিক নিকটবর্তী উপগ্রহ পর্যন্ত পৌছতেও তাকে বছরের পর বছর ধরে একের এক এক বহু কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে এবং সামান্য পথ ভ্রমণের কষ্ট দূর করার জন্য অজস্ত্র সম্পদ ব্যয় করতে হয়েছে৷ কিন্তু সেখানে গোটা বিশ্ব-জাহান তার জন্য উন্মুক্ত হবে, যা চাইবে নিজের জায়গায় বসে বসেই দেখতে পারবেএবং যেখানে ইচ্ছা বিনা বাধায় যেতে পারবে৷
৩৯. 'তাকে' কথাটি দ্বারা মুসিবতের প্রতিও ইংগিত করা হতে পারে, পৃথিবীর প্রতিও ইংগিত করা হতে পারে, নিজেদের কথাটির প্রতিও ইংগিত করা হতে পারে এবং বাক্যের ধারা অনসারে সৃষ্টিকূলের প্রতিও ইংগিত করা হতে পারে৷
৪০. কিতাব অর্থ ভাগ্য লিপি৷
৪১. অর্থাৎ নিজের সৃষ্টিকূলের মধ্যে প্রত্যেকের ভাগ্য আগেই লিখে দেয়া আল্লাহর জন্য কোন কঠিন কাজ নয়৷
৪২. বর্ণনার এই ধারাবাহিকতার মধ্যে যে উদ্দেশ্যে এ কথাটি বলা হয়েছে তা বুঝার জন্য এ সূরা নাযিল হওয়ার সময় ঈমানদারগণ যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছিলেন তা সামনে রাখা দরকার৷ প্রতি মুহুর্তে শত্রুদের হামলার আশংকা একের পর এক যুদ্ধ বিগ্রহ, সর্বদা অবরোধ পরিস্থিতি, কাফেরদের অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে চরম দূরবস্থা, গোটা আরবের সর্বত্র ইসলাম গ্রহণকারীদের ওপর কাফেরদের জুলুম নির্যাতন এ পরিস্থিতির মধ্যে তখনকার মুসলামানদের সময় অতিবাহিত হচ্ছিলো৷ কাফেররা একে মুসলমানদের লঞ্ছিত ও অভিশপ্ত হওয়ার প্রমাণ মনে করতো৷ এ পরিস্থিতিকে মুনাফিকরা তাদের সন্দেহের সমর্থনে ব্যবহার করতো৷ আর একনিষ্ঠ মুমিনগণ যদিও অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছিলেন৷ তবুও বিপদ মসিবতের আধিক্য কোন কোন সময় তাদের জন্যও চরম ধৈর্য পরিক্ষার কারণ হয়ে দাঁড়াতো৷ এ কারণে মুসলমানদের সান্ত্বনা দেয়ার জন্য বলা হচ্ছে, তোমাদের ওপর কোন বিপদই তোমাদের রবের অবগতির বাইরে নাযিল হয়নি৷ যা কিছু হচ্ছে তা সবই আল্লাহর পূর্ব পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত মোতাবেক হচ্ছে-যা তাঁর দফতরে লিখিত আছে৷ তোমাদের প্রশিক্ষণের জন্যই এসব সঠিক পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে তোমাদের অগ্রসর করানো হচ্ছে৷ আল্লাহ তা'আলা তোমাদের দিয়ে যে বিরাট কাজ আঞ্জাম দিতে চান তার জন্য এ প্রশিক্ষণ অত্যন্ত জরুরী৷ এসব পরীক্ষা ছাড়াই যদি তোমাদেরকে সফলতার স্বর্ণ দুয়ারে পৌছিয়ে দেয়া হয় তাহলে তোমাদের চরিত্রে এমন সব দুর্বলতা থেকে যাবে যার কারণে তোমরা না পারবে মর্যাদা ও ক্ষমতার গুরুপাক খাদ্য হজম করতে, না পারবে বাতিলের প্রলয়ংকারী তুফানের চরম আঘাত সহ্য করতে৷
৪৩. সে সময় মুসলিম সমাজের মুনাফিকদের যে চরিত্রের সবারই চোখে পড়ছিলে এখানে সেদিকে ইংগিত করা হয়েছে৷ ঈমানের বাহ্যিক স্বীকারোক্তি অনুসারে মুনাফিকও খাঁটি মুসলমানদের মধ্যে কোন পার্থক্য ছিল না৷ কিন্তু নিষ্ঠা ও ঐকান্তিকতা না থাকার কারণে খাঁটি ঈমানদারদের যে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছিলো, তারা তাতে শামিল হয়নি৷ তাই তাদের অবস্থা ছিল এই যে, আরবের অতি সাধারণ একটা শহরে যে নাম মাত্র স্বচ্ছলতা ও পৌরহিত্য তারা লাভ করেছিলো তাতেই তারা যেন গর্বে স্ফীত হয়ে উঠেছিলো, এবং ফেটে পড়ার উপক্রম হয়েছিলো৷ তাদের মনের সংকীর্ণতা এমন পর্যায়ের ছিল যে, তারা যে আল্লাহর ওপর ঈমান আনার যে, রসূলের অনুসারী হওয়ার এবং যে দীন মানার দাবী করতো, তার জন্য নিজেরা একটি পয়সাও ব্যয় করবে কি, অন্য দাতাদেরও একথা বলে ব্যয় করা থেকে বিরত রাখতো, যে তোমরা নিজের অর্থ এভাবে অপচয় করছো কেন? স্পষ্ট কথা দুঃখ কষ্টের উত্তপ্ত কুণ্ডে যদি জ্বালানো না হতো, তাহলে এইকৃত্রিম পদার্থগুলো -যা আল্লাহর কেনা কাজে লাগার মত ছিল না-খাঁটিসোনা থেকে পৃথক করা যেতো না৷ আর তাকে আলাদা করা ছাড়া দুর্বল ও খাঁটি মুসলমানদের এই সংমিশ্রিত সমাবেশকে দুনিয়ার নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ মহান পদটি অর্পণ করা যেতো না, যার বহুবিধ মহতী কল্যাণ খিলাফতে রাশেদার যুগে দুনিয়া অবলোকন করেছিলো৷
৪৪. অর্থাৎ উপদেশবাণী শোনার পরও যদি কোন ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর দীনের জন্য আন্তরিকতা, আনুগত্য এবং ত্যাগ ও কুরবানীর পন্থা অবলম্বন না করে এবং নিজের বক্রতা আঁকড়ে ধরে থাকতে চায় যা আল্লাহ অপছন্দ করেন- তাহলে আল্লাহর তাতে কেন পরোয়া নেই৷ তিনি অভাব শুন্য এসব লোকের কাছে তাঁর কোন প্রয়োজন আটকে নেই, আর তিনি অতিশয় প্রশংসিত, তাঁর কাছে উত্তম গুণাবলীর অধিকারী লোকেরাই গ্রহনযোগ্য হতে পার৷ দুষ্কর্মশীল লোকেরা তাঁর কৃপা দৃষ্টিলাভের উপযুক্ত হতে পারে না৷
৪৫. এ সংক্ষিপ্ত আয়াতাংশে নবী -রসূলের মিশনের পুরা সার সংক্ষেপ বর্ণনা করা হয়েছে, যা ভালভাবে বুঝে নিতে হবে৷ এতে বলা হয়েছে, আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে পৃথিবীতে যত রসূল এসেছেন, তারা সবাই তিনটি বিষয় নিয়ে এসেছিলেনঃ

একঃ () অর্থাৎ স্পষ্ট নিদর্শনাবলী যা থেকে স্পষ্টরূপে প্রতিভাত হচ্ছিলো, যে তাঁরা সত্যিই আল্লাহর রসূল৷ তাঁরা নিজেরা রসূল সেজে বসেননি৷ তাঁরা যা সত্য বলে পেশ করেছেন তা সত্যিই সত্য আর যে জিনিসকে বাতিল বলে উল্লেখ করেন তা যে সত্যিই বাতিল তা প্রমাণ করার জন্য তাঁদের পেশকৃত উজ্জ্বল নিদর্শনসমূহই যথেষ্ট৷ সুস্পষ্ট হিদায়াতসমূহ, যাতে কোন সন্দেহ-সংশয় ছাড়া বলে দেয়া হয়েছিল-আকায়েদ, আখলাক, ইবাতদ-বন্দেগী এবং আদান -প্রদানে ক্ষেত্রে মানুষের জন্য সঠিক পথ কি- যা তারা অনুসরণ করবে এবং ভ্রান্ত পথসমূহ কি যা তারা বর্জন করবে৷

দুইঃ কিতাব, মানুষের শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সব দিক নির্দেশনা এতে বর্তমান যাতে মানুষ পথ নির্দেশনার জন্য তার স্বরণাপন্ন হতে পারে৷

তিনঃ মিযান, অর্থাৎ হক ও বাতিলের মানদণ্ড যা দাঁড়ি পাল্লার মতই সঠিকভাবে ওজন করে বলে দিবে চিন্তা ও ধ্যান -ধারণা, নৈতিকতা ও পারস্পরিক লেনদেনে প্রাচুর্য ও অপ্রতুলতার বিভিন্ন চরম পন্থার মধ্যে ইনসাফ ও ন্যায় বিচার কোনটি৷

নবী ও রসূলদেরকে এ তিনটি জিনিস দিয়ে যে উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছে তা হচ্ছে পৃথিবীতে মানুষের আচরণ এবং মানব জীবনের বিধি-বিধান ব্যক্তিগতও সাময়িগ্রিকভাবেও যেন ন্যায় বিচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে৷ একদিকে প্রতিটি মানুষ তার আল্লাহর অধিকার, নিজের অধিকার এবং আল্লাহর সেসব বান্দাদের অধিকার সঠিকভাবে জানবে এবং ইনসাফের কথা আদায় করবে যার সাথে কোন না কোনভাবে তাকে জড়িত হতে হয়৷ অপর দিক সামাজিক জীবনের বিধি-বিধান এমন নীতিমালার ওপর নির্মাণ করতে হবে যাতে সমাজে কোন প্রকার জুলুম অবশিষ্ট না থাকে৷ সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতিটি দিক ভারসাম্যহীনতা থেকে রক্ষা পায়, সমাজ জীবনের প্রতিটি বিভাগে সঠিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সমাজের সবাই যেন ইনসাফ মত যার অধিকার লাভ করে এবং নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে পারে৷ অন্য কথায় ব্যক্তিগত ও সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত ছিল নবী-রসূলদের প্রেরণের উদ্দেশ্য৷ তারা প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিগত জীবনেও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে উদগ্রীব হয়৷ তারা গোটা মানব সমাজেও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী ছিলেন যাতে ব্যক্তি এবং ব্যষ্টি উভয়েই পরস্পরের আত্মিক, নৈতিক ও বৈষয়িক উন্নতির পথে প্রতিবন্ধক ও সাংঘর্ষিক হওয়ার পরিবর্তে সহযোগী ও সাহায্যকারী হয়৷
৪৬. লোহা নাযিল করার অর্থ মাটির অভ্যন্তরে লোহা সৃষ্টি করা৷ যেমন কুরআন মজীদের অন্য এক জায়াগায় বলা হয়েছে৷ () তিনি তোমাদের জন্য গবাদী পশুর আটটি জোড়া নাযিল করেছেন৷ (আয যুমার ৬) ৷ পৃথিবীতে যা কিছু পাওয়া যায় তা যেহেতু আপনা থেকেই সৃষ্টি হয়নি, আল্লাহর নির্দেশে এখানে এসেছে৷ সুতরাং কুরআন মজীদে তা সৃষ্টি করাকে নাযিল করা বলে উল্লেখ করা হয়েছে৷ নবী-রসূলদের মিশন কি তা বর্ণনা করার পর পরই আমি লোহা নাযিল করেছি, তার মধ্য বিপুল শক্তি ও মানুষের জন্য বহুবিধ কল্যাণ রয়েছে৷ বলায় আপনা থেকেই এ বিষয়ে ইংগিত পাওয়া যায় যে, এখানে লোহা অর্থে রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিকে বুঝানো হয়েছে৷ বাক্যের প্রতিপাদ বিষয় হচ্ছে আল্লাহ তা'আলা ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু একটা পরিকল্পনা পেশ করার উদ্দেশ্যে রসূলদের পাঠান নাই৷ কার্যত তা প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা চালানো ও সে উদ্দেশ্যে শক্তি সঞ্চয় করাও তাদের মিশনের অন্তরভুক্ত ছিল৷ যাতে এ প্রচেষ্টার ধ্বংস সাধনকারীদের শাস্তি দেয়া যায় এবং এর বিরুদ্ধে বাধা সৃষ্টিকারীদের শক্তি নির্মূল করা যায়৷
৪৭. অর্থাৎ আল্লাহ দুর্বল, তিনি আপন শক্তিতে এ কাজ করতে সক্ষম নন, তাই তার সাহায্য প্রয়োজন, ব্যাপারটা তা নয়৷ তিনি মানুষকে পরীক্ষার জন্য এ কর্ম পন্থা গ্রহণ করেছেন৷ এ পরীক্ষার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েই মানুষ তার উন্নতি ও সফলতার পথে এগিয়ে যেতে পারে৷ আল্লাহ তা'আলার সব সময় এ ক্ষমতা আছে যে, যখন ইচ্ছা তিনি তাঁর একটি ইংগিতেই সমস্ত কাফেরদের পরাস্ত করে তাদের ওপর তার রসূলদের আধিপত্য দান করতে পারেন৷ কিন্তু তাতে রসূলদের ওপর ঈমান আনয়নকারীদের কি কৃতিত্ব থাকবে যে, তারা পুরস্কারের যোগ্য বলে বিবেচিত হবে? তাই আল্লাহ তা'আলা এ কাজকে তাঁর বিজয়ী শক্তির সাহায্যে আঞ্জাম দেয়ার পরিবর্তে এ কর্মপন্থা গ্রহণ করেছেন যে, তাঁর রসূলদের 'বাইয়েনাত' স্পষ্ট নিদর্শনাদী, কিতাব ও মিযান দিয়ে মানুষের কাছে প্রেরণ করেছেন৷ তাদেরকে আদেশ দিয়েছেন যে, তারা যেন মানুষের সামনে ন্যায়নীতির বিধান পেশ করেন এবং জুলুম-নির্যাতন ও বে-ইনসাফী থেকে বিরত থাকার জন্য আহবান জানান৷ মানুষকে এ ব্যাপারে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন যে, যার ইচ্ছা রসূলদের দাওয়াত কবুল করবে এবং যার ইচ্ছা প্রত্যাখ্যান করবে৷ যারা কবুল কারলো তাদের আহবান জানিয়েছেন;এসো এই ন্যায়বিচারপূর্ণ জীবন বিধান প্রতিষ্ঠা করতে আমার ও আমার রসূলদের সহযোগী হও এবং যারা জুলুম ও নির্যাতনমূলক বিধান টিকিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর, তাদের বিরুদ্ধে প্রাণপণ সংগ্রাম করো৷ আল্লাহ তা'আলা এভাবে দেখতে চান, মানুষের মধ্যে কারা ইনসাফ ও ন্যায় বিচারের বাণী প্রত্যাখান করে আর কারা ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের মোকাবিলায় বে-ইনসাফী কায়েম রাখার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছে৷ ইনসাফের বাণী গ্রহণ করার পর তার সাহায্য -সহযোগিতা ও সে উদ্দেশ্যে সংগ্রাম করা থেকে পালিয়ে বেড়ায়৷ আর কারা আল্লাহকে না দেখেও তাঁরই কারণে এ ন্যায় ও সত্যকে বিজয়ী করার জন্য প্রাণ-সম্পদও বাচিয়ে রাখছে৷ যার পরীক্ষায় সফল হবে, ভবিষ্যতে তাদের জন্যই বহুবিধ উন্নতির পথ খুলে যাবে৷