(৫৭:১) যমীন ও আসমানসমূহের প্রতিটি জিনিসই আল্লাহর তাসবীহ করেছে৷ তিনি মহা পরাক্রমশালী ও অতিশয় বিজ্ঞ৷
(৫৭:২) পৃথিবী ও আকাশ সাম্রাজ্যের সার্বভৌম মালিক তিনিই৷ তিনিই জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান৷ তিনি সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান ৷
(৫৭:৩) তিনিই আদি তিনি অন্ত এবং তিনিই প্রকাশিত তিনিই গোপন ৷ তিনি সব বিষয়ে অবহিত৷
(৫৭:৪) তিনিই আসমান ও যমীনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন এবং তারপর আরশে সমাসীন হয়েছেন৷ যা কিছু মাটির মধ্যে প্রবেশ করে, যা কিছু তা থেকে বেরিয়ে আসে এবং যা কিছু আসমান থেকে অবতীর্ণ হয় আর যা কিছু আসমানে উঠে যায় তা তিনি জানেন৷
(৫৭:৫) তোমরা যেখানেই থাক তিনি তোমাদের সাথে আছেন৷ তোমরা যা করছো আল্লাহ তা দেখছেন৷ আসমান ও যমীনের নিরংকুশ সার্বভৌম মালিকানা একমাত্র তাঁরই৷ সব ব্যাপারের ফায়সালার জন্য তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হয়৷
(৫৭:৬) তিনিই রাতকে দিনের মধ্যে এবং দিনকে রাতের মধ্যে প্রবিষ্ট করেন৷ তিনি অন্তরের গোপন কথা পর্যন্ত জানেন৷
(৫৭:৭) আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর এবং ব্যয় কর সে জিনিস যার প্রতিনিধিত্বমূলক মালিকানা তিনি তোমাদের দিয়েছেন৷ তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনবে ও অর্থ -সম্পদ খরচ করবে ১০ তাদের জন্য বড় প্রতিদান রয়েছে৷
(৫৭:৮) তোমাদের কি হয়েছে যে, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি ঈমান আনছো না৷ অথচ তোমাদের রবের প্রতি ঈমান আনার জন্য রসূল তোমাদের প্রতি আহবান জানাচ্ছেন ১১ অথচ তিনি তোমাদের থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন৷ ১২ যদি তোমরা সত্যিই স্বীকার করে নিতে প্রস্তুত হও৷
(৫৭:৯) সেই মহান সত্তা তো তিনিই যিনি তাঁর বান্দার কাছে স্পষ্ট আয়াতসমূহ নাযিল করছেন যাতে তোমাদেরকে অন্ধাকার থেকে বের করে আলোর দিকে নিয়ে আসতে পারেন৷ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তোমাদের প্রতি অতীব দয়ালু ও মেহেরবান৷
(৫৭:১০) কি ব্যাপার যে, তোমরা আল্লাহর পথে খরচ করছো না, অথচ যমীন ও আসমানের উত্তরাধিকার তাঁরই৷১৩ তোমাদের মধ্যে যারা বিজয়ের পরে অর্থ ব্যয় করবে ও জিহাদ করবে তারা কখনো সেসব বিজয়ের সমকক্ষ হতে পারে না যারা বিজয়ের পূর্বে ব্যয় করেছে ও জিহাদ করেছে৷ বিজয়ের পরে ব্যয়কারী ও জিহাদকারীদের তুলনায় তাদের মর্যাদা অনেক বেশী৷ যদিও আল্লাহ উভয়কে ভাল প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন৷ ১৪ তোমরা যা করছো আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত৷ ১৫
১. অর্থাৎ বিশ্ব-জাহানের প্রত্যেকটি বস্তু সদা সর্বদা এ সত্য প্রকাশ এবং ঘোষণা করে চলেছে যে, এ বিশ্ব-জাহানের স্রষ্টা ও পালনকর্তা সব রকম দোষ-ত্রুটি, অপূর্ণতা, দুর্বলতা, ভুল ভ্রান্তি ও অকল্যাণ থেকে পবিত্র৷ তার ব্যক্তি সত্তা পবিত্র, তাঁর গুণাবলী পবিত্র, তাঁর কাজকর্ম পবিত্র এবং তাঁর সমস্ত সৃষ্টিমূলক বা শরীয়াতের বিধানসম্পর্কিত নির্দেশাবলীও পবিত্র৷ এখানে অতীতকাল নির্দেশক শব্দরূপে () ব্যবহার করা হয়েছে এবং অন্য কিছু ক্ষেত্রে বর্তমান ও ভবিষ্যত কাল নির্দেশক শব্দ () ব্যবহার করা হয়েছে৷ এর অর্থ দাঁড়ায় এই যে, বিশ্ব-জাহানের প্রতিটি অনু পরামাণু চিরদিন তার স্রষ্টার পবিত্রতা বর্ণনা করেছে, আজও করছে এবং ভবিষ্যতেও চিরদিন করতে থাকবে৷
২. মূল আয়াতে () বাক্যটি ব্যবহৃত হয়েছে৷ এ বাক্যের শুরুতেই () শব্দ ব্যহার করায় আপনা থেকেই এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে এই যে, তিনি মহা পরাক্রমশালী ও অতিশয় বিজ্ঞ শুধু তাই নয়, বরং প্রকৃত পক্ষে কেবলমাত্র তিনিই এমন সত্তা যিনি মহা পরাক্রমশালী ও অতিশয় বিজ্ঞ৷ আযীয শব্দের অর্থ পরাক্রমশালী, শক্তিমান ও অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতার অধিকারী যার সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন পৃথিবীর কোন শক্তিই রোধ করতে পারে না, যার সাথে টক্কর নেয়ার সাধ্য নেই, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় যার আনুগত্য সবাইকে করতে হয়, যার অমান্যকারী কোনভাবেই তার পাকড়াও থেকে রক্ষা পায় না৷ আর হাকীম শব্দের অর্থ হচ্ছে, তিনি যাই করেন জ্ঞান ও যুক্তি বুদ্ধির সাহায্যে করেন৷ তাঁর সৃষ্টি, তাঁর ব্যবস্থাপনা, তাঁর শাসন, তাঁর আদেশ নিষেধ, তাঁর নির্দেশনা সব কিছুই জ্ঞান ও যুক্তি নির্ভর ৷ তাঁর কোন কাজেই অজ্ঞতা, বোকামি ও মুর্খতার লেশমাত্র নেই৷

এখানে আরো একটি সুক্ষ্ম বিষয় আছে যা ভালভাবে বুঝতে হবে৷ কুরআন মজীদের অতি অল্প সংখ্যক স্থানে আল্লাহ তা'আলার গুণবাচক নাম আযীয (মহাপরাক্রমশালী) এর সাথে () নিরংকুশ শক্তির অধিকারী, () ক্ষমতাধর, () আপন নির্দেশাবলী বাস্তবায়নকারী এবং () প্রতিশোধ গ্রহণকারী শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়েছে যার সাহায্যে তাঁর নিরংকুশ ক্ষমতার প্রকাশ ঘটে৷ যেখানে বাক্যের ধারাবাহিকতা জালেম ও অবাধ্যদের জন্য আল্লাহর আযাবের ভীতি প্রদর্শন দাবী কররে কেবল সেখানেই এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ এ ধরনের হাতে গোনা কতিপয় স্থানে বাদ দিলে আর যেখানে আযীয শব্দ ব্যবহার হয়েছে সেখানেই তার সাথে সাথে হাকীম (অতিশয় বিজ্ঞ), আলীম (সর্বজ্ঞতা) , রহিম (দয়ালু, নিয়মতদানকারী), গাফূর (ক্ষমাশীল), ওহ্হাব (সার্বক্ষণিক দানকারী) এবং হামিদ (প্রশংসিত) শব্দগুলোর মধ্যে থেকে কোন শব্দ অবশ্যই ব্যবহার করা হয়েছে৷ কারণ, যে সত্তা অসীম ক্ষমতার অধিকারী সে যদি নির্বোধ হয়, মুর্খ হয়, দয়া মায়াহীন হয়, ক্ষমা ও মার্জনা আদৌ না জানে, কৃপণ হয় এবং দুশ্চরিত্র হয় তাহলে তার ক্ষমতার পরিণাম জুলুম নির্যাতন ছাড়া আর কিছু হতে পারে৷ পৃথিবীতে যেখানেই জুলুম নির্যাতন হচ্ছে তা মূল কারণ এই যে, যে ব্যক্তি অন্যদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছে সে তার শক্তি ও ক্ষমতাকে হয় মুর্খতার সাথে ব্যবহার করছে, নয়তো সে দয়ামায়াহীন, কঠোর হৃদয় অথবা কৃপণ ও সংকীর্ণমনা কিংবা দুশ্চরিত্র ও দুষ্কর্মশীল৷ যে ক্ষেত্রেই শক্তির সাথে এসব দোষ একত্রিত হবে সে ক্ষেত্রেই কোন কল্যাণের আশা করা যায় না৷ এ কারণে কুরআন মজীদে আল্লাহর গুনবাচক নাম আযীয এর সাথে তাঁর (হাকীম, আলীম, রাহিম, গাফুর, হামীদ, ও ওয়াহ্হাব ) হওয়ার কথাও অবশ্যই উল্লেখ করা হয়েছে যাতে মানুষ জানতে পারে, যে আল্লাহ এ বিশ্ব-জাহান শাসন ও পরিচালনা করেছেন একদিন তিনি এমন ক্ষমতার অধিকারী, যে যমীন থেকে নিয়ে আসমান পর্যন্ত কেউ তাঁর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাধা দিতে পারে না, অপর দিকে তিনি হাকীক বা মহাজ্ঞানী ও বটে৷ তাঁর প্রত্যেকটি সিদ্ধান্ত সরাসরি জ্ঞান ও বিজ্ঞতার ভিত্তিতে হয়ে থাকে৷ তিনি আলীমও৷ যে ফায়সালাই তিনি করেন জ্ঞান অনুসারেই করেন৷ তিনি হাকীমও৷ নিজের অসীম ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের নির্দয়ভাবে ব্যবহার করেন না৷ তিনি গাফুরও ৷ অধিনস্তদের সাথে ছিদ্রান্বেষণ বা খুঁত ধরা মানসিকতার নয়, বরং ক্ষমাশীলতার আচরণ করে থাকেন৷ তিনি ওয়াহ্হাবও৷ নিজের অধিনস্তদের সাথে কৃপণতার আচরণ করেন না৷ বরং চরমদানশীলতা ও বদান্যতার আচরণ করেছেন এবং তিনি হামীদও৷ তাঁর সত্তার প্রশংসার যোগ্য সমস্ত গুণাবলীর ও পূর্ণতার সমাহার ঘটেছে৷

যার সার্বভৌমত্বের (Sovereignty) ওপর রাষ্ট্র দর্শন ও আইন দর্শনের আলোচনা সম্পর্কে অবহিত, তারা কুরআনের এ বক্তব্যের প্রকৃত গুরুত্বকে ভালভাবে বুঝতে পারবেন৷ সাবভৌমত্ব বলতে বুঝায়, সার্বভোম ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তি, অসীম ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের মালিক হবে৷ তার আদেশ ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টিকারী, তা পরিবর্তনকারী বা পুনর্বিবেচনাকারী কোন আভ্যন্তরীণ বা বাইরের শক্তি থাকবে না এবং তার আনুগত্র করা ছাড়া কারো কোন উপায় ও থাকবে না৷ এ অসীম ক্ষমতাও কর্তৃত্বের ধারণার সাথে মানুষের বিবেক-বুদ্ধি অনিবার্যরূপেই দাবী করে যে, যিনি এ ধরনের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অধিকারী হবেন তাকে নিষ্কলুষ এবং জ্ঞান-বুদ্ধিতে পূর্ণাংগ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে৷ কারণ, এরূপ ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব সম্পন্ন লোক নির্বোধ, মুর্খ, দয়ামায়াহীন এবং দুশ্চরিত্র হলে তার সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হওয়া সর্বাত্মক জুলুম ও বিপর্যয় সৃষ্টি করবে৷ এ কারনে যেসব দার্শনিক কোন মানুষ বা মানবীয় প্রতিষ্ঠান কিংবা কোন একদল মানুষকে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী বলে মনে করেছে তাদেরকে একথাও ধরে নিতে হয়েছে যে, তারা ভূল ক্রুটির উর্ধে হবে৷ কিন্তু এ কথা স্পষ্ট যে, কোন মানবীয় কর্তৃত্ব বাস্তবে যেমন কখনো এরূপ নিরস্কুশও সীমাহীন সার্বভৌম ক্ষমতা লাভ করতে পারে না তেমনি কোন বাদশাহ বা পার্লামেণ্ট, জাতি কিংবা পার্টি সীমিত পরিসরে যে সার্বভৌম ক্ষমত লাভ করে থাকে তা নির্ভুল পন্থায় কাজে লাগানো ও তার পক্ষে সম্ভব নয়৷ কারণ, এমন যুক্তিবুদ্ধি যার মধ্যে অজ্ঞতার লেশমাত্র নেই এবং এমন জ্ঞান যা সংশ্লিষ্ট সব সত্যকে পরিব্যাপ্ত করে- কোন একজন মানুষ, একক কোন প্রতিষ্ঠান বা কোন জাতির ভাগ্যে জুটে যাওয়া তো দূরের কথা, সম্মিলিতভাবে গোটা মানব জাতিও লাভ করেনি৷ অনুরূপভাবে মানুষ যতক্ষণ মানুষ ততক্ষণ তার পক্ষে নিজের স্বার্থপরতা, ইন্দ্রিয়পরায়ণতা, ভয়ভীতি, লোভ লালসা, ইচ্ছা আকাংখা, পক্ষপাতিত্ব, আবেগ তাড়িত সন্তুষ্টি ও ক্রোধ এবং ভালবাসা ও ঘৃণা করা থেকে উর্ধে উঠাও সম্ভবপর নয়৷ এসব সত্যকে সামনে রেখে কেউ যদি গভীরভাবে চিন্তা করে তাহলে সে উপলব্ধি করবে যে, এ বক্তব্যের মধ্যে কুরআন প্রকৃতপক্ষে সার্বভৌমত্বের সঠিক ও পূর্ণাংগ ধারণা পেশ করেছে৷ কুরআন বলছেঃ আযীয এ বিশ্ব-জাহানে অর্থাৎ নিরংকুশ ও অসীম ক্ষমতার অধিকারী আল্লাহ তা'আলা ছাড়া আর কেউ নেই৷ আর কেবল তিনিই সীমাহীন এই ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অধিকারী একমাত্র সত্তা যিনি 'নিষ্কলুষ'হাকীম'ও আলীম' রাহীম' ও গাফুর' এবং হামীদ' ও ওয়াহ্হাব'৷
৩. অর্থাৎ যখন কিছুই ছিল না তখন তিনি ছিলেন এবং যখন কিছুই থাকবে না তখন তিনি থাকবেন৷ তিনি সব প্রকাশ্যের চেয়ে অধিক প্রকাশ্য৷ কারণ পৃথিবীতে যে জিনিসের প্রকাশ দেখা যায় তা তাঁরই গুণাবলী, তাঁরই কার্যাবলী৷ এবং তাঁরই নূরের প্রকাশ৷ আর তিনি সব গুপ্ত জিনিসের চেয়ে অধিক গুপ্ত৷ কারণ, ইন্দ্রীয়সমূহ দ্বারা তাঁর সত্তাকে অনুভব ও উপলব্ধি করা তো দূরের কথা বিবেক-বুদ্ধি, চিন্তাভাবনা ও কল্পনা পর্যন্ত তাঁর রহস্য ও বাস্তবতাকে স্পর্শ করতে পারে ৷ ইমাম আহমাদ, মুসলিম, তিরমিযী ও বায়হাকী হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে এবং হাফেজ আবু ইয়া'লা মুসেলী তার মুসনাদ গ্রন্থে হযরত আয়েশা (রা) থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি দোয়া সম্বলিত যে হাদীস বর্ণনা করেছেন তার নিম্নোক্ত কথাগুলোই এ আয়াতের সর্বোত্তম ব্যাখ্যাঃ

--------

"তুমিই সর্ব প্রথম৷ তোমার পূর্বে আর কেউ নেই৷ তুমিই সর্বশেষ৷ তোমার পরে আর কেউ নেই৷ তুমিই প্রকাশ্য তোমার চেয়ে প্রকাশ্য কেউ নেই৷ তুমি গুপ্ত ৷ তোমার চেয়ে অধিক গুপ্ত আর কেই নেই৷"

এখানে প্রশ্ন দেখা দেয় যে, কুরআন মজীদে জান্নাত ও দোযখবাসীদের জন্য যে চিরস্থায়ী জীবনের কথা বলা হয়েছে আল্লাহ তা'আলাই সর্বশেষ অর্থাৎ যখন কিছুই থাকবে না তখন তিনি থাকবেন -তার সাথে এ কথা কি করে খাপ খায়? এর জবাব কুরআন মজীদের মধ্যেই বিদ্যমান৷ (সূরা কাছাছ আয়াত ৮৮) "অর্থাৎ আল্লাহর সত্তা ছাড়া আর সব জিনিসই নশ্বর ও ধ্বংসশীল৷ "অন্য কথায় কোন সৃষ্টিরই নিজস্ব স্থায়িত্ব নেই৷ যদি কোন জিনিস স্থায়ী হয় বা স্থায়ী থাকে তাহলে আল্লাহ তা'আলা স্থায়ী রাখার করেণেই তা স্থায়ী হয়ে আছে এবং থাকতে পারে৷ অন্যথায় আল্লাহ ছাড়া স্ব স্ব ক্ষেত্রে আর সবাই নশ্বর ও ধ্বংসশীল৷ কেউ আপন ক্ষমতা ও বৈশিষ্টে অবিনশ্বর বিধায় জান্নাত বা দোযখে চিরস্থায়িত্ব লাভ করবে- এমনটা নয়৷ বরং সেখানে তার স্থায়িত্ব লাভ করার কারণ হচ্ছে আল্লাহ তা'আলা তাকে চিরস্থায়ী জীবন দান করবেন৷ ফেরেশতাদের ব্যাপারটাও ঠিক তাই৷ তারা আপন ক্ষমতা ও বৈশিষ্টে অবিনশ্বর নয়৷ আল্লাহ যখন ইচ্ছা করেছেন তখন তারা অস্তিত্ব লাভ করেছে এবং যত সময় পর্যন্ত তিনি চাইবেন তত সময় পর্যন্তই তারা বেঁচে থাকতে পারে৷
৪. অর্থাৎ বিশ্বজাহানের স্রষ্টাও তিনি শাসনকর্তাও তিনি৷ (আরো ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, আল আ'রাফ টীকা ৪১-৪২, ইউনুস, টীকা-৪, আর রা'দ, টিকা ২ থেকে ৫, হামীম, আস সাজদা, টীকা ১১ থেকে ১৫) ৷
৫. অন্য কথায় তিনি শুধু সামগ্রিক জ্ঞানের অধিকারী নন, খূঁটি নাটি বিষয়েও জ্ঞানের অধিকারী৷ এক একটি শস্যদানা ও বীজ যা মাটির গভীরে প্রবিষ্ট হয়, এক একটি ছোট পাতা ও অঙ্কুর যা মাটি ফুঁড়ে, বের হয়, বৃষ্টির এক একটি বিন্দু যা আসমান থেকে পতিত হয় এবং সমুদ্র ও খালবিল থেকে যে বাষ্পরাশি আকাশের দিকে উত্থিত হয়, তার প্রতিটি মাত্রা তাঁর জানা আছে৷ কোন দানাটি ও বীজটি পৃথিবীর কোনখানে কিভাবে পড়ে আছে তা তিনি জানেন বলেই সেটিকে বিদীর্ণ করে অঙ্কুরোদগম করেন এবং তাকে লালন পালন করে বড় করেন৷ কি পরিমাণ বাষ্প কোন কোন স্থানে থেকে উত্থিত হয়েছে এবং কোথায় কোথায় পৌছেছে তা তিনি জানেন বলেই সেগুলো একত্রিত করে মেঘমালা সৃষ্টি করেন এবং ভূপৃষ্ঠর বিভিন্ন অংশের জন্য তা বন্টন করে দিয়ে একটি হিসেব অনুসারে বৃষ্টিপাত ঘটান৷ আর যেসব জিনিস মাটিতে প্রবেশ করে ও তা থেকে বেরিয়ে আসে এবং যেসব জিনিস আসমানের দিকে উঠে যায় ও তা থেকে নেমে আসে তা বিস্তারিত দিকও এর আলোকে অনুমান ও অনুধাবন করা যেতে পারে৷ আল্লাহর জ্ঞান যদি এসব বিষয়ে পরিব্যপ্ত না হতো, তাহলে প্রতিটি জিনিসই আলাদা আলাদা, ব্যবস্থাপনা এবং প্রত্যেকটি জিনিসই এমন নিপুন, নিখূঁত ও বিজ্ঞোচিত পন্থায় ব্যবস্থাপনা করা কিভাবে সম্ভব হতো?
৬. অর্থাৎ তোমরা কোন জায়গায়ই তাঁর জ্ঞান, তাঁর অসীম ক্ষমতা, তাঁর শাসন কর্তৃত্ব এবং তাঁর ব্যবস্থাপনার আওতা বহির্ভূত নও৷ মাটিতে, বায়ুতে, পানিতে, অথবা কোন নিভৃত কোণে যেখানেই তোমরা থাক না কেন, সর্বাবস্থায়ই আল্লাহ জানেন, তোমরা কোথায় আছো৷ সেখানে তোমাদের বেঁচে থাকাটাই একথা প্রমাণ করে যে, আল্লাহ ঐ স্থানেও তোমাদের জীবন ধারণের উপকরণ সরবরাহ করেছেন৷ তোমাদের হৃদপিণ্ডে যে স্পন্দন উঠেছে, তোমাদের ফূসফূস যে শ্বাস প্রশ্বাস গ্রহণ করেছে, তোমাদের শ্রবণ শক্তি ও দৃষ্টিশক্তি যে কাজ করছে এসব কিছুরই কারণ হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার প্রত্যক্ষ ব্যবস্থাপনায় তোমাদের দেহের সব যন্ত্রপাতি ঠিকমত কাজ করছে৷ কোন সময় যদি তোমাদের মৃত্যু আসে তাহলে এ কারণে আসে যে, আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তোমাদের বেঁচে থাকার ব্যবস্থাপনার পরিসমপ্তি ঘটিয়ে তোমাদেরকে প্রত্যাহার করে নেয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে৷
৭. অমুসলিমদের সম্বোধন করে একথা বলা হয়নি৷ বরং পরবর্তী গোটা বক্তব্য থেকে একথাই প্রকাশ পাচ্ছে যে, এখানে সেই সব মুসলমানদের সম্বোধন করা হয়েছে যারা ইসলামের বাণী স্বীকার করে ঈমান গ্রহণকারীদের সাথে শামিল হয়েছিলেন৷ কিন্তু ঈমানের দাবী পূরণ করা এবং মু'মিনের মত জীবন পদ্ধতি গ্রহণ করা থেকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিলেন৷ একথা সবারই জানা যে, অমুসলিমদেরকে ঈমানের দাওয়াত দেয়ার সাথে সাথেই একথা বলা যায় না, যে আল্লাহর পথে জিহাদের খাতে উদার মনে সাহায্য করো৷ কিংবা তাদেরকে একথাও বলা না যে, তোমাদের মধ্যে যারা বিজললাভের পূর্বে জিহাদ ও আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় করবে তাদের মর্যাদা যারা বিজয়লাভের পরে এসে কাজ করবে তাদের চেয়ে অনেক বেশী হবে৷ অমুসলিমদের দাওয়াত দেয়ার ক্ষেত্রে প্রথমে তাদের সামনে ইসলামের প্রাথমিক দাবী পেশ করা হয়ে থাকে, চূড়ান্ত দাবী নয়৷ এ কারণে বক্তব্যের ধারা অনুসারে এখানে () বলার অর্থ হচ্ছে, যে সেই সব লোক, যারা ঈমানের দাবী করে মুসলমানদের দলে শামিল হয়েছো- আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে সরল মনে সত্যিকার অর্থে মেনে নাও এবং এমন কর্মপন্থা গ্রহণ করো যা নিষ্ঠাবান মু'মিনদের করা উচিত৷
৮. এখানে ব্যয় করার অর্থ সাধারণ কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা নয়৷ বরং ১০ নম্বর আয়াতের ভাষা স্পষ্টভাবে বলেছে যে, এখানে এর অর্থ ঐ সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নেতৃত্বে কুফরী শক্তির বিরুদ্ধে ইসলামকে সমুন্নত করার যে সংগ্রাম চলছিলো সে উদ্দেশ্যে ব্যয় করা৷ বিশেষ করে সে সময় এমন দুটি প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল যে জন্য ইসলামী সরকার চরমভাবে আর্থিক সাহায্যের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছিল৷ এর একটি ছিল সামরিক প্রয়োজন৷ আর অপরটি ছিল সেসব নির্যাতিত মুসলমানদের সাহায্য সহযোগিতা করা যারা কাফেরদের জুলুম নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে আরবের প্রতিটি অংশ থেকে হিজরত করে মদিনায় চলে এসেছিলো এবং আরো আসছিলো৷ এ ব্যয় মেটানোর জন্য সত্যকার মু'মিনগণ তাঁদের শক্তি ও সমার্থের চেয়ে বেশী বোঝা নিজেরা বহন করেছিল৷ পরবর্তী ১০, ১২, ১৮, ও ১৯ আয়াতে এজন্য তাদের প্রশংসা করা হয়েছে৷ কিন্তু মুসলমানদের মধ্যে বহুসংখ্যক এমন স্বচ্ছল লোকও ছিল যারা কুফর ও ইসলামের এ সংঘাতকে নিছক দর্শক হয়ে দেখছিলো৷ যে জিনিসের প্রতি ঈমান পোষনের দাবী তারা করেছিলো তার কিছু কর্তব্য ও দায় -দায়িত্ব যে তাদের প্রাণ ও সম্পদের ওপর বর্তায়, সে বিষয়ে কোন অনুভূতিই তাদের ছিল না৷ এ দ্বিতীয় প্রকারের লোকদেরকেই এ আয়াতে সম্বোধন করা হয়েছে৷ তাদের বলা হচ্ছে, খাঁটি মু'মিন হও এবং আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় কর৷
৯. এর দুটি অর্থ এবং দুটি অর্থই এখানে প্রযোজ্য৷ একটি অর্থ হচ্ছে, তোমাদের কাছে যে সম্পদ আছে তা মূলত তোমাদের নিজের সম্পদ নয়, তা আল্লাহর দেয়া সম্পদ৷ তোমরা নিজেরা এর মালিক নও৷ আল্লাহ তাঁর নিজের প্রতিনিধি হিসেবে এ সম্পদ তোমাদের অধিকারে দিয়েছেন৷ অতএব, সম্পদের মূল মালিকের কাজে তা ব্যয় করতে কুণ্ঠিত ও পিছপা হয়ো না৷ মালিকের সম্পদ মালিকের কাজে ব্যয় করতে টালবাহানা করা প্রতিনিধির কাজ নয়৷ দ্বিতীয় অর্থ হলো, এ অর্থ চিরদিন তোমাদের কাছে ছিল না এবং চিরদিন তোমাদের কাছে থাকবেও না৷ কাল তা তোমাদের হাতে সোপর্দ করেছেন৷ আবার এমন এক সময় আসবে যখন তা তোমাদের কাছে থাকবে না৷ অন্য লোকেরা তোমাদের স্থলাভিষিক্ত হবে৷ সাময়িক কর্তৃত্বের এ সংক্ষিপ্ত সময়ে যখন এ সম্পদ তেমাদের অধিকার ও কর্তৃত্ব থাকে তখন আল্লাহর কাছে তা খরচ করো, যাতে আখেরাতে তোমরা তার স্থায়ী প্রতিদান লাভ করতে পার৷ একটি হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ কথাটিই বর্ণনা করেছেন৷ তিরমিযী, বর্ণনা করেছেনঃ একবার নবীর (সা) বাড়ীতে একটি বকরী জবাই করে তার গোশত বন্টন করা হলো৷ ঘরে গিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ বকরীর কি অবশিষ্ট আছে? হযরত আয়েশা বললেনঃ () "একটি হাত ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই৷ "নবী (সা) বললেনঃ () "একটি হাত ছাড়া গোটা বকরীই অবশিষ্ট আছে"৷ অর্থাৎ আল্লাহর পথে যা ব্যয়িত হলো প্রকৃতপক্ষে সেটাই অবশিষ্ট রইলো ৷আরো একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলোঃ হে আল্লাহর রসূল কোন প্রকার দানের সওয়াব সবচেয়ে বেশী? তিনি বললেনঃ

-----------------------

"যদি তুমি এমন পরিস্থিতিতে দান করো যে, তুমি সুস্থ সবল সম্পদের প্রাচুর্যের কারণে তা বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজন অনুভর করছো এবং তা কোন কাজে খাটিয়ে অধিক উপার্জনের আশা করো৷ সে সময়ের অপেক্ষায় থেকো না যখন প্রাণ ওষ্ঠাগত হবে আর তুমি ওসিয়ত করবে যে, এটা অমুককে দিতে হবে এবং এটা অমুককে দিতে হবে৷ সে সময় তো এ সম্পদ অমুক অমুকের কাছেই চলে যাবে৷ " (বুখারী, ও মুসলিম) ৷

অন্য একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে৷ নবী (সা) বলেছেনঃ

----------------------

"মানুষ বলে আমার সম্পদ, আমার সম্পদ৷ অথচ তোমার সম্পদের যতটা তুমি খেয়ে নিঃশ্বেষ করলে কিংবা পরিধান করে পুরনো করে ফেললে অথবা দান করে ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করলে তা ছাড়া তোমার সম্পদে তোমার আর কোন অংশ নেই৷ এ ছাড়া আর যাই আছে একদিন তা তোমার হাত থেকে চলে যাবে আর তুমি অন্যদের জন্য তা রেখে যাবে৷ "- (মুসলিম)
১০. এখানে পুনরায় জিহাদে অর্থ সম্পদ ব্যয় করাকে ঈমানের অনিবার্য দাবী এবং আন্তরিকতাপূর্ণ ঈমানের আবশ্যিক প্রমাণ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে৷ অন্য কথায় যেন বলা হয়েছে৷ প্রকৃত ও নিষ্ঠাবান মু'মিন সে-ই, যে এরূপ পরিস্থিতিতে অর্থ ব্যয় করতে টালবাহানা করে না৷
১১. অর্থাৎ এমন এক পরিস্থিতিতে তোমরা ঈমানের পরিপন্থী এই কর্মপন্থা গ্রহণ করছো যখন আল্লাহর রসূল নিজে তোমাদের মাঝে আছেন এবং তোমাদেরকে কোন দূরবর্তী মাধ্যমের সাহায্যে ঈমানের দাওয়াত দেয়া হচ্ছে না, বরং তোমাদের কাছে সে দাওয়াত সরাসরি আল্লাহর রসূলের মুখ থেকে পৌছুচ্ছে৷
১২. কিছু সংখ্যক মুফাসসির এ প্রতিশ্রুতি বলতে অর্থ করেছেন আল্লাহর দাসত্ব করার সে প্রতিশ্রুতি যা সৃষ্টির সূচনা পূর্বে আদম আলাইহিস সালামের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাঁর সমস্ত সন্তানকে বের করে তাদের সবার নিকট থকে নেয়া হয়েছিল৷ কিন্তু অপর কিছু সংখ্যক তাফসীরকার এর অর্থ করেছেন সে প্রতিশ্রুতি যা প্রত্যেক মানুষের প্রকৃতি ও প্রকৃতিগত বিবেক-বুদ্ধিতে আল্লাহর দাসত্বের জন্য বর্তমান৷ কিন্তু সঠিক কথা হলো, এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্যের সচেতন প্রতিশ্রুতি ঈমান গ্রহণ করার মাধ্যমে প্রত্যেক মুসলমান আল্লাহর সাথে যে প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হয়৷ কুরআন মজীদের অন্য এক স্থানে যে ভাষায় এ প্রতিশ্রুতির উল্লেখ করা হয়েছে তা হচ্ছে:

---------------------------

"আল্লাহ তোমাদের যেসব নিয়ামত দান করেছেন সেসব নিয়ামতের কথা মনে কর এবং তোমাদের কাছ থেকে যে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছেন তার কথাও মনে কর৷ সে সময় তোমরা বলেছিলেঃ আমরা শুনলাম এবং আনুগত্য করলাম৷ আর আল্লাহকে ভয় কর৷ আল্লাহ মনের কথাও জানেন৷"

হযরত উবাদা ইবনে সামেত থেকে বর্ণিত হাদীসে তিনি বলেছেনঃ

-------------------------

"রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের থেকে এই মর্মে বাইয়াত গ্রহন করেছিলেন যে, আমরা যেন সক্রিয়তা ও নিষ্ক্রিয়তা উভয় অবস্থায় শুনি ও আনুগত্য করে যাই এবং স্বচ্ছলতা ও অস্বচ্ছলতা উভয় অবস্থায় আল্লাহর পথে খরচ করি, ভাল কাজের আদেশ করি এবং মন্দ কাজের নিষেধ করি, আল্লাহ সম্পর্কে সত্য কথা বলি এবং সেজন্য কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারকে ভয় না করি৷ " (মুসনাদে আহমাদ) ৷
১৩. এর দুটি অর্থ৷ একটি অর্থ হচ্ছে, এ অর্থ সম্পদ চিরদিন তোমাদের কাছে থাকবে না৷ একদিন তা ছেড়ে তোমাদেরকে অবশ্যই যেতে হবে এবং তখন আল্লাহই হবেন এর উত্তরাধিকারী৷ তাহলে নিজের জীবদ্দশায় নিজের হাতে কেন তা আল্লাহর পথে ব্যয় করবে না? এভাবে ব্যয় করলে আল্লাহর কাছে তোমাদের পুরস্কার প্রাপ্য হবে৷ ব্যয় না করলেও তা আল্লাহর কাছেই ফিরে যাবে৷ তবে পার্থক্য হবে এই যে, সে ক্ষেত্রে তোমরা কোন পুরস্কার লাভ করবে না৷ আরেকটি অর্থ হচ্ছে, আল্লাহর পথে অর্থ খরচ করতে গিয়ে তোমাদের কোন রকম দারিদ্র বা অস্বচ্ছলতার আশংকা করা উচিত নয়৷ কেননা, যে আল্লাহর উদ্দেশ্যে তা খরচ করবে তিনি পৃথিবী ও উর্ধ জগতের সমস্ত ভাণ্ডারের মালিক৷ আজ তিনি তোমাদরকে যা দান করে রেখেছেন তাঁর কাছে দেয়ার শুধু ঐ টুকুই ছিল না৷ কাল তিনি তোমাদের তার চেয়েও অনেক বেশী দিতে পারেন৷ একথাটাই অন্য একটা স্থানে এভাবে বলা হয়েছেঃ

-------------------

"হে নবী তাদের বলো, আমার রব তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা অঢেল রিযিক দান করেন এবং এবং যার জন্য ইচ্ছা তা সংকীর্ণ করে দেন৷ আর তোমরা যা খরচ করো তার পরিবর্তে তিনিই তোমাদেরকে আরো রিযিক দান করেন৷ তিনি সর্বত্তম রিযিক দাতা৷ " (সাবা-৩৯)
১৪. অর্থাৎ উভয়ের পুরস্কার লাভের যোগ্য৷ কিন্তু এক গোষ্ঠীর মর্যাদা অপর গোষ্ঠীর চেয়ে নিশ্চিতভাবেই অনেক উচ্চতর৷ কারণ, অত্যন্ত কঠিন পরিস্তিতিতে তারা আল্লাহ তা'আলার জন্য এমন সব বিপদাপদের সম্মুখীন হয়েছিলো যার সম্মুখীন অন্য গোষ্ঠিকে হতে হয়নি৷ তারা এমন পরিস্থিততে অর্থ খরচ করেছে যখন কোথাও এ সম্ভাবনা পরিদৃষ্ট হচ্ছিলো না যে, বিজয়ের মাধ্যমে এ ব্যয়ের ক্ষতিপূরণ হবে৷ তাছাড়া তারা এমন নাজুক সময়ে কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে যখন প্রতি মুহূর্তে এ আশংকা ছিল যে, শত্রু বিজয় লাভ করে ইসলামের অনুসারীদের পিষে মারবে৷ মুফাসসিরদের মধ্যে মুজাহিদ, কাতাদা এবং যায়েদ ইবনে আসলাম বলেনঃ এ আয়াতের বিজয় শব্দটি যে ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়েছে সেটি হচ্ছে মক্কা বিজয়৷ আমের শা'বী বলেনঃ এর দ্বারা হুদায়বিয়ার সন্ধিকে বুঝানো হয়েছে৷ অধিকাংশ মুফাসসির প্রথম মতটি গ্রহণ করেছেন৷ দ্বিতীয় মতটির সমর্থনে হযরত আবু সাঈদ খুদরী বর্ণিত এই হাদীসটি পেশ করা হয় যে, হুদায়বিয়ার সন্ধিকালে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের বললেনঃ অচিরেই এমন লোক জন আসবে যাদের আমল বা কাজকর্ম দেখে তোমরা নিজেদের কাজকর্মকে নগণ্য মনে করবে ৷ কিন্তু

----------------------

"তাদের কারো কাছে যদি পাহাড় পরিমাণও স্বর্ণও থাকে আর সে তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে তবুও সে তোমাদের দুই রতল এমন কি এক রতল পরিমাণ ব্যয় করার সমকক্ষও হতে পারবে না৷ " (ইবনে জারীর, ইবনে আবী হাতেম, ইবনে মারদুইয়া, আবু নুআইম ইসফাহানী) ৷

তাছাড়া ইমাম আহমাদ কর্তৃক হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত হাদিসেও এ মতের প্রতি সমর্থন পাওয়া যায়৷ তিনি বলেনঃ একবার হযরত খালেদ (রা) ইবনে ওয়ালীদ এবং হযরত আবদুর রহমান (রা) ইবনে আওফের মধ্যে ঝগড়া হয়৷ ঝগড়ার মুহুর্তে হযরত খালেদ (রা) হযরত আবদুর রহমান কে বলেনঃ "তোমরা তোমাদের অতীত কাজ কর্মের কারণেই আমাদের কাছে গর্ব কর এবং বড় হতে চাও৷ " এ কথা নবীর (সা) কাছে পৌছলে তিনি বললেনঃ "যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর শপথ!যদি তোমরা উহুদের সমপরিমাণ বা পাহাড়গুলোর সমপরিমাণ স্বার্ণও খরচ করো তবুও এসব লোকের আমলের সমান হতে পারবে না৷ " এ থেকে প্রমাণ পেশ করা হয় যে, বিজয় অর্থ হুদাইবিয়ার সন্ধি৷ হযরত খালেদ হুদাইবিয়ার এ সন্ধির পরে ঈমান এনেছিলেন এবং মক্কা বিজয়ে অংশ গ্রহণ করেছিলেন৷ কিন্তু এ বিশেষ ক্ষেত্র বিজয় বলতে হুদাইবিয়ার সন্ধি কিংবা মক্কা বিজয় যা-ই বুঝানো হোক না কেন সর্বক্ষেত্রে এ আয়াতের অর্থ এ নয় যে, এ একটি মাত্র বিজয় মর্যাদার পার্থক্যের পরিসমাপ্তি ঘটেছে৷ বরং এ থেকে নীতিগত যে কথাটি জানা যায় তা হচ্ছে, ইসলামের জন্য যখনই এমন কোন প্রতিকূল পরিস্থিতির উদ্ভব হবে যখন কুফর ও কাফেরদের পাল্লা অনেক ভারী হবে এবং বাহ্যত ইসলামের বিজয় লাভ করার কোন সুদূর সম্ভবনা দৃষ্টি গোচর হবে না সে সময় যারা ইসলামের সহযোগিতায় জীবনপাত ও অর্থ-সম্পদ খরচ করবে তাদের সমমর্যাদা সেসব লোক লাভ করবে না যারা কুফর ও ইসলামের মধ্যকার ফায়সালা ইসলামের অনুকূরে হয়ে যাওয়ার পর ত্যাগ ও কুরবানী পেশ করবে৷
১৫. অর্থাৎ আল্লাহ যাকে যে প্রতিদান দেন ও মর্যাদা দান করেন তাই এই দেখে দান করেন যে সে কোন পরিস্থিতিতে কোন ধরনের আবেগ অনুভূতি নিয়ে কাজ করেছে৷ তিনি অন্ধভাবে বন্টন করেন না৷ তিনি জেনে শুনেই প্রত্যেককে মর্যাদা ও তার কাজের প্রতিদান নির্ধারণ করে থাকেন৷