(৫৬:১) যখন সেই মহা ঘটনা সংঘটিত হবে
(৫৬:২) তখন তার সংঘটিত হওয়াকে কেউ-ই মিথ্যা বলতে পারবে না৷
(৫৬:৩) তা হবে উলট-পালটকারী মহা প্রলয়৷
(৫৬:৪) পৃথিবীকে সে সময় অকস্মাত ভীষণভাবে আলোড়িত করা হবে
(৫৬:৫) এবং পাহাড়কে এমন টুকরো টুকরো করে দেয়া হবে
(৫৬:৬) যে, তা বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত হবে৷
(৫৬:৭) সে সময় তোমরা তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে যাবে৷ ডান দিকের লোক৷
(৫৬:৮) ডান দিকের লোকদের (সৌভাগ্যের) কথা আর কতটা বলা যাবে৷
(৫৬:৯) বাম দিকের লোক বাম দিকের লোকদের (দুর্ভাগ্যের) পরিণতি আর কি বলা যাবে৷
(৫৬:১০) আর অগ্রগামীরা তো অগ্রগামীই৷
(৫৬:১১) তারাই তো নৈকট্য লাভকারী৷
(৫৬:১২) তারা নিয়ামতের ভরা জান্নাতে থাকবে৷
(৫৬:১৩) পূর্ববর্তীদের মধ্য থেকে হবে বেশী
(৫৬:১৪) এবং পরবর্তীদের মধ্য থেকে হবে কম৷
(৫৬:১৫) তারা মণিমুক্তা খচিত আসনসমূহে হেলান দিয়ে
(৫৬:১৬) সামনা সামনি বসবে৷
(৫৬:১৭) তাদের মজলিসে চির কিশোররা৷
(৫৬:১৮) বহমান ঝর্ণার সূরায় ভরা পান পাত্র, হাতল বিশিষ্ট সূরা পাত্র এবং হাতলবিহীন বড় সূরা পাত্র নিয়ে সদা ব্যস্ত থাকবে
(৫৬:১৯) - যা পান করে মাথা ঘুরবে না৷ কিংবা বুদ্ধিবিবেক লোপ পাবে না৷ ১০
(৫৬:২০) তারা তাদের সামনে নানা রকমের সুস্বাদু ফল পরিবেশন করবে যাতে পছন্দ মত বেছে নিতে পারে৷
(৫৬:২১) পাখীর গোশত পরিবেশন করবে, যে পাখীর গোশত ইচ্ছামত ব্যবহার করতে পারবে৷ ১১
(৫৬:২২) তাদের জন্য থাকবে সুনয়না হুর
(৫৬:২৩) এমন অনুপম সুন্দরী যেন লুকিয়ে রাখা মুক্তা৷ ১২
(৫৬:২৪) দুনিয়াতে তারা যেসব কাজ করেছে তার প্রতিদান হিসেবে এসব লাভ করবে৷
(৫৬:২৫) সেখানে তারা কোন অর্থহীন বা গোনাহর কথা শুনতে পাবে না৷১৩
(৫৬:২৬) বরং যে কথাই শুনবে তা হবে যথাযথ ও ঠিকঠাক৷ ১৪
(৫৬:২৭) আর ডান দিকের লোকেরা৷ ডান দিকের লোকদের সৌভাগ্যের কথা আর কতটা বলা যাবে৷
(৫৬:২৮) তাঁরা কাঁটাবিহীন কুল গাছের কুল, ১৫
(৫৬:২৯) থরে বিথরে সজ্জিত কলা,
(৫৬:৩০) দীর্ঘ বিস্তৃত ছায়া,
(৫৬:৩১) সদা বহমান পানি,
(৫৬:৩২) অবাধ লভ্য অনিশেষ যোগ্য
(৫৬:৩৩) প্রচুর ফলমূল ১৬
(৫৬:৩৪) এবং সুউচ্চ আসনসমূহে অবস্থান করবে৷
(৫৬:৩৫) তাদের স্ত্রীদেরকে আমি বিশেষভাবে নতুন করে সৃষ্টি করবো
(৫৬:৩৬) এবং কুমারী বানিয়ে দেব৷ ১৭
(৫৬:৩৭) তারা হবে নিজের স্বামীর প্রতি আসক্ত ১৮ ও তাদের সময়বস্কা৷ ১৯
(৫৬:৩৮) এসব হবে ডান দিকের লোকদের জন্য৷
১. এ আয়াতাংশ দ্বারা বক্তব্য শুরু করা স্বতসিদ্ধভাবেই প্রমাণ করে যে, সে সময় কাফেরদের মজলিস-সমূহে কিয়ামতের বিরুদ্ধে যেসব কাহিনী ফাঁদা হতো এবং গালগপ্প করা হতো, এটা তার জবাব৷ যখন মক্কার লোক রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখ থেকে সবেমাত্র ইসলামের দাওয়াত শুনছে এটা ঠিক সেই সময়ের কথা৷ এর মধ্যে তাদের কাছে যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশী অদ্ভুত, অযৌক্তিক ও অসম্ভব বলে মনে হতো তা হচ্ছে, এক দিন আসমান যমীনের এ ব্যবস্থাপনা ধ্বংস হয়ে যাবে এবং তারপর অন্য একটি জগত সৃষ্টি হবে যেখানে পূর্ববর্তী ও পরবর্তীকালের সমস্ত মৃত মানুষকে পুনরায় জীবিত করা হবে৷ একথা শুনে তাদের চোখ বিস্ময়ে বিস্ফোরিত হয়ে যেতো৷ তারা বলতোঃ এটা হওয়া একেবারেই অসম্ভব৷ তাহলে এ পৃথিবী, পাহাড়, পর্বত, সমুদ্র, চন্দ্র, এবং সূর্য কোথায় যাবে৷ শত শত হাজার হাজার বছরের করবস্থ মৃতরা কিভাবে জীবিত হয়ে উঠবে? মৃত্যুর পরে পুনরায় জীবনলাভ, তারপর সেখানে থাকবে বেহেশের বাগান ও দোযখের আগুণ এসব স্বপ্নচারিতা ও আকাশ কুসুম কল্পনা মাত্র৷ বুদ্ধিবিবেক ও সুস্থ মস্তিষ্কে আমরা এসব কি করে মেনে নিতে পারি? মক্কার সর্বত্র তখন এই গালগপ্পকে কেন্দ্র করে আসর জমছিলো৷ এ পটভূমিতে বলা হয়েছে, যখন সে মহা ঘটনা সংঘটিত হবে তখন তা অস্বীকার করার মত কেউ থাকবে না৷ এ বাণীর মধ্যে কিয়ামত বুঝার () শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে এর অর্থ যা অনিবার্য ও অবধারিত৷ অর্থাৎ তা এমন জিনিস যা অনিবার্যরূপেই সংঘটিত হতে হবে৷ এর সংঘটিত হওয়াকে আবার ওয়াকি'আ শব্দ দিয়ে বুঝানো হয়েছে৷ আরবী ভাষায় এ শব্দটি আকস্মিকভাবে কোন বড় দুর্ঘটন সংঘটিত হওয়া বুঝাতে ব্যবহৃত হয়৷ () কথাটির দুটি অর্থ হতে পারে৷ এক, এর সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা তিরোহিত হওয়া, আগমন থেমে যাওয়া কিংবা এর আগমন ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব হবে না৷ অন্য কথায়, এ বাস্তব ঘটনাকে অবাস্তব ও অস্তিত্বহীন বানিয়ে দেয়ার মত কেউ থাকবে না৷ দুই, কোন জীবন্ত সত্তাই তখন এ মিথ্যা কথা বলবে না যে, এ ঘটনা আদৌ সংঘটিত হয়নি৷
২. মূল আয়াতে ব্যবহৃত শব্দ হচ্ছে () "নীচুকারী ও উঁচুকারী" এর একটি অর্থ হতে পারে সেই মহা ঘটনা সব কিছু উলট-পালট করে দেবে৷ নীচের জিনিস উপরে উঠে যাবে এবং উপরের জিনিস নীচে নেমে যাবে৷ অরেকটি অর্থ এও হতে পারে যে, তা নীচে পতিত মানুষদেরকে উপরে উঠিয়ে দেবে এবং উপরের মানুষদেরকে নীচে নামিয়ে দেবে৷ অর্থাৎ তা আসার পর মানুষের মধ্যে মর্যাদা ও অমর্যাদার ফায়সালা হবে সম্পূর্ণ আলাদা ভিত্তি ও দৃষ্টিকোণ থেকে৷ যারা পৃথিবীতে নিজেদেরকে অতি সম্মানিত বলে দাবী করে বেড়াতো তারা লাঞ্ছিত হবে আর যাদের নীচে ও হীন মনে করা হতো তারা মর্যাদা লাভ করবে৷
৩. অর্থাৎ তা কোন আঞ্চলিক সীমিত মাত্রার ভূমিকম্প হবে না৷ বরং যুগপৎ সমগ্র পৃথিবীকে গভীর আলোড়ন প্রকম্পিত করবে৷ পৃথিবী হঠাৎ করে এমন বিরাট ঝাঁকুনি খাবে যার ফলে তা লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে৷
৪. যাদেরকে এ বক্তব্য শুনানো হচ্ছিলো কিংবা এখন যারা তা পড়বে বা শুনবে, বাহ্যত কেবল তাদেরকে সম্বোধন করা হলেও প্রকৃতপক্ষে গোটা মানব জাতিকেই সম্বোধন করা হয়েছে৷ সৃষ্টির প্রথম দিন থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ সৃষ্টি হয়েছে তারা সবাই কিয়ামতের দিন তিন ভাগে বিভক্ত হবে৷
৫. মূল আয়াতে () শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে ৷ আরবী ব্যাকরণ অনুসারে মাইমানা শব্দটি ইয়ামীন শব্দ থেকে গৃহীত হতে পারে- যার অর্থ ডান হাত৷ আবার () শব্দ থেকেও গৃহিত হতে পারে যার অর্থ শুভ লক্ষণ৷ যদি ধরে নেয়া যায় যে, এ শব্দটির উৎপত্তি ইয়ামীন শব্দ থেকে হয়েছে তাহলে () এর অর্থ হবে, "ডান হাতের অধিকারী" ৷ কিন্তু এখন এর আভিধানিক অর্থ অভিপ্রেত নয়৷ এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন লোক ডান হাতকে আরবের লোকেরা শক্তি, মহত্ব ও মর্যাদার প্রতীক বলে মনে করতো৷ যাকে মর্যাদা প্রদর্শন উদ্দেশ্য হতো মজলিসের মধ্যে তাকে ডান হাতের দিকে বসাতো৷ আমার কাছে অমুক ব্যক্তির অনেক সম্মান ও মর্যাদা একথা বুঝানোর প্রয়োজন হলে বলতোঃ () সে তো আমার ডান হাতের পাশে৷ আমাদের ভাষাতেও কাউকে কোন বিশিষ্ট ব্যক্তির 'দক্ষিণ হস্ত' বলার অর্থ সে তার ঘনিষ্ঠ জন৷ আর যদি ধরে নেয়া যায় যে, এর উৎপত্তি () শব্দ থেকে হয়েছে তাহলে আসহাবুল মাইমানাএর অর্থ হবে, 'খোশ নসীব' ও সৌভাগ্যবান৷
৯. মূল ইবারতে " ()" শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে৷ মাশআমা শব্দের উৎপত্তি হয়েছে () থেকে৷ এর অর্থ, দুর্ভাগ্য, কুলক্ষণ, অশুভ লক্ষণ৷ আরবী ভাষায় বাঁ হাতকেও () বলা হয়৷ আরবরা বাঁ হাত এবং () অশুভ লক্ষণ, শব্দ দু'টিকে সমার্থন বলে মনে করতো৷ তাদের কাছে বাঁ হাত দুর্বলতা ও লাঞ্ছনার প্রতীক৷ সফরে রওয়ান হওয়ার সময় যদি পাখী তাদের বাঁ হাতের দিক দিয়ে উড়িয়ে যেতো তাহলে তারা একে অশুভ লক্ষণ বলে মনে করতো৷ কাউকে বাঁ পাশে বসালে তার অর্থ হতো সে তাকে নীচু মর্যাদার লোক মনে করে৷ আমার কাছে তার কোন মর্যাদা নেই কারো সম্পর্কে যদি একথা বলতে হয় তাহলে বলা হয় () সে আমার বাঁ পাশের লোক৷ বাংলা ভাষাতেও খুব হালকা ও সহজ কাজ বুঝাতে বলা হয়, এটা আমার বাঁ হাতের খেলা৷ অতএব, () অর্থ দুর্ভাগা লোক অথবা এমন লোক যারা আল্লাহর কাছে লাঞ্ছনার শিকার হবে এবং আল্লাহর দরবারে তাদেরকে বাঁ দিকে দাঁড় করানো হবে৷
৭. সাবেকুন (অগ্রগামীগণ) অর্থ যারা সৎকাজ ও ন্যায়পরায়ণতায় সবাইকে অতিক্রম করেছে, প্রতিটি কল্যাণকর কাজে সবার আগে থেকেছে৷ আল্লাহ ও রসূলের আহবানে সবার আগে সাড়া দিয়েছে, জিহাদের ব্যাপারে হোক কিংবা আল্লাহর পথে খরচের ব্যাপারে হোক কিংবা জনসেবার কাজে হোক কিংবা কল্যাণের পথে দাওয়াত কিংবা সত্যের পথে দাওয়াতের কাজে হোক মোট কথা পৃথিবীতে কল্যাণের প্রসার এবং অকল্যাণের উচ্ছেদের জন্য ত্যাগ ও কুরবানী এবং শ্রমদান জীবনপনের যে সুযোগই এসেছে তাতে সে -ই অগ্রগামী হয়ে কাজ করেছে৷ এ কারণে আখেরাতেও তাদেরকেই সবার আগে রাখা হবে৷ অর্থাৎ আখেরাতে আল্লাহ তা'আলার দরবারের চিত্র হবে এই যে, ডানে থাকবে 'সালেহীন' বা (নেককারগণ, বাঁয়ে থাকবে ফাসেক বা পাপীরা এবং সবার আগে আল্লাহ তা'আলার দরবারের নিকটে থাকবেন 'সাবেকীন'গণ৷ হাদীসে হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, যে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি জান কিয়ামতের দিন কারা সর্বপ্রথম পৌছবে এবং আল্লাহর ছায়ায় স্থান লাভ করবে? সবাই বললেনঃ আল্লাহ এবং আল্লাহর রসূলই ভাল জানেন৷ তিনি বললেনঃ"যাদের অবস্থা ছিল এই যে, তাদের সামনে যখনই সত্য পেশ করা হয়েছে, তা গ্রহণ করেছে৷ যখনই তাদের কাছে প্রাপ্য চাওয়া হয়েছে, তখনই তা দিয়ে দিয়েছে৷ আর তারা নিজেদের ব্যাপারে যে ফায়সালা করেছে অন্যদের ব্যাপারেও সেই ফায়সালা করেছে৷" (মুসনাদে আহমাদ) ৷
৮. 'আওয়ালীন' ও আখেরীন' অর্থাৎ অগ্রবর্তী ও পরবর্তী বলতে কাদের বুঝানো হয়েছে সে ব্যাপারে তাফসীরকারদের মধ্যে মতানৈক্য আছে৷ এক দলের মতে আদম আলাইহিস সালাম থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াত প্রাপ্তি পর্যন্ত যত উম্মত অতিক্রান্ত হয়েছে তারা 'আওয়ালীন' আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াত লাভের পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষের আগমন ঘটবে তারা সবাই আখেরীন৷ এ দৃষ্টিকোণ থেকে আয়াতের অর্থ হবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতের পূর্ববর্তী হাজার হাজার বছরে যত মানুষ চলে গিয়েছে তাদের মধ্যে থেকে 'সাবেকীন'দের সংখ্যা বেশী হবে৷ আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতের পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী মানুষদের মধ্যে যারা 'সাবেকীন'দের মর্যাদা লাভ করবে তাদের সংখ্যা হবে কম৷ দ্বিতীয় দল বলেন, এখানে 'আওয়ালীন' ও 'আখেরীন' অর্থ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মতের 'আওয়ালীন'ও 'আখেরীন'৷ অর্থাৎ তাঁর উম্মতের প্রাথমিক যুগের লোকেরা হচ্ছে 'আওয়ালীন'৷ তাদের মধ্যে 'সাবেকীন'দের সংখ্যা হবে বেশী৷ পরবর্তী যুগের লোকেরা হচ্ছে 'আখেরীন'৷ তাদের মধ্যে সাবেকীদের সংখ্যা হবে কম৷ তৃতীয় দল বলেন, এর অর্থ প্রত্যেক নবীর উম্মাতের 'আওয়ালীন' ও 'আখেরীন'৷ অর্থাৎ প্রত্যেক নবীর প্রাথমিক যুগের অনুসারীদের মধ্যে আওয়ালীনদের সংখ্যা বেশী হবে এবং পরবর্তীকালের অনুসারীদের মধ্যে তাদের সংখ্যা কম হবে৷ আয়াতের শব্দাবলী এ তিনটি অর্থ ধারণ করেছে৷ এখানে এ তিনটি অর্থই প্রযোজ্য হওয়া বিচিত্র নয়৷ প্রকৃত পক্ষে এসব অর্থের মধ্যে কোন বৈপরীত্য নেই৷ এছাড়াও এসব শব্দ থেকে আরো একটি অর্থ পাওয়া যায়৷ সেটিও নির্ভুল অর্থ৷ অর্থাৎ প্রতিটি প্রাথমিক যুগে মানব গোষ্ঠীর মধ্যে 'সাবেকীন'দের অনুপাত থাকবে বেশী এবং পরবর্তী যুগে সে অনুপাত থাকবে কম৷ তাই মানুষকের সংখ্যা যত দ্রুত বৃদ্ধি পায় নেক কাজে অগ্রগামী মানুষের সংখ্যা সে গতিতে বৃদ্ধি পায় না৷ গণনার দিক দিয়ে তাদের সংখ্যা প্রথম যুগের সাবেকীনদের চেয়ে অধিক হলেও পৃথিবীর সমস্ত জনবসতির বিচারে তাদের অনুপাত ক্রমন্বয়ে হ্রাস পেতে থাকে৷
৯. অর্থাৎ এমন সব বালক যারা চিরদিনই বালক থাকবে৷ তাদের বয়স সব সময় একই অবস্থায় থেকে থাকবে৷ হযরত আলী (রা) ও হযরত হাসান বাসরী (র) বলেনঃ এরা দুনিয়ার মানুষের সেসব শিশু সন্তান যারা বয়োপ্রাপ্ত হওয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করেছিলো৷ সূতরাং তাদের এমন কোন নেকী থাকবে না যার প্রতিদান দেয়া যেতে পারে এবং এমন কোন বদ কাজও থাকবে না যার শাস্তি দেয়া যেতে পারে ৷ তবে একথা সুষ্পষ্ট যে, তারা হবে পৃথিবীর এমন লোকদের সন্তান যাদের ভাগ্যে জান্নাত জোটেনি৷ অন্যথায় নেককার মু'মিনদের মৃত অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা কুরআন মজীদে নিশ্চয়তা দিয়েছেন যে, তাদের সন্তানদেরকেও জান্নাতে তাদের সাথে একত্রিত করে দেয়া হবে৷ (আত তূর, আয়াত ২১) আবু দাউদ তায়ালেসী, তাবারানী, ও বাযযার কর্তৃক হযরত আনাস (রা) ও হযরত সামুরা ইবনে জুনদুব হতে বর্ণিত হাদীস থেকেও এর সমর্থন পাওয়া যায়৷ উক্ত হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে, মুশরিকদের সন্তানরা জান্নাতবাসীদের খাদেম হবে৷ (অধিক জানার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন সূরা, সাফ্ফাতের তাফসীর, টীকা ২৬, আত তূর, টীকা ১৯) ৷
১০. ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, সূরা সাফ্ফাতের তাফসীর৷ টীকা ২৭; সূরা মুহাম্মাদ, টীকা ২২, আত তূর টীকা ১৮৷
১১. ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, সূরা তূর, এর তাফসীর, টীকা ১৭৷
১২. ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, সূরা সাফ্ফাতের তাফসীর, টীকা ২৮ ও ২৯ আদ দুখান, টীকা ৪২, আর রাহমান, টীকা ৫১৷
১৩. এটি জান্নাতের বড় বড় নিয়ামতের একটি৷ এসব নিয়ামত সম্পর্কে কুরআন মজীদের কয়েকটি স্থানে বর্ণনা করা হয়েছে যে, মানুষের কান কোন সেখানে কোন অনর্থক ও বাজে কথা, মিথ্যা, গীবত ও চোগলখুরী, অপবাদ, গালি, অহংকার ও বাজে গালগপ্প বিদ্রুপ ও উপহাস, তিরস্কার ও বদনামমূলক কথাবার্তা শোনা থেকে রক্ষা পাবে৷ সেটা কটুভাষী ও অভদ্র লোকদের সমাজ হবে না যে, পরস্পরে কাদা ছুঁড়াছুঁড়ি করবে৷ সেটা হবে সভ্য ও ভদ্র লোকদের সমাজ যেখানে এসব অর্থহীন ও বেহুদা কথাবার্তার নামগন্ধ পর্যন্ত থাকবে না৷ আল্লাহ তা'আলা কাউকে যদি সামান্য কিছু শিষ্টতা বোধ ও সরুচির অধিকারী করে থাকেন তাহলে তিনি ভালভাবেই উপলব্ধি করতে পারবেন যে পার্থিব জীবনে এটা কত বড় কষ্টদায়ক ব্যাপার৷ জান্নাতে মানুষকে এ থেকে মুক্তির আশ্বাস দেয়া হবে৷
১৪. মূল আয়াতটি হচ্ছে, () কিছুসংখ্যক মুফাসসির ও অনুবাদক এর অর্থ করেছেন সেখানে সব দিক থেকেই কেবল 'সালাম' 'সালাম' শব্দ শুনা যাবে৷ কিন্তু এর সঠিক অর্থ হচ্ছে সঠিক, সুস্থ ও যথাযথ কথা৷ অর্থাৎ এমন কথাবার্তা যা দোষ-ত্রুটি মুক্ত, যার মধ্যে পূর্ববর্তী বাক্যে উল্লেখিত মন্দ দিকগুলো নেই৷ ইংরেজীতে safe শব্দটি যে অর্থে ব্যবহৃত এখানে সালাম শব্দটি প্রায় সেই একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে৷
১৫. অর্থাৎ কাঁটাবিহীন কুল বৃক্ষের কুল৷ কেউ এ কথা ভেবে বিস্ময় প্রকাশ করতে পারেন যে, কুল আবার এমন কি উৎকৃষ্ট ফল যা জান্নাতে থাকবে বলে সুখবর দেয়া যেতে পারে৷ কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার হলো, জান্নাতের কুল নয়, এ পৃথিবীর কোন কোন অঞ্চলে এ ফলটি এমন সুস্বাদু, খোশবুদার ও মিষ্টি হয় যে, একবার মুখে দিলে রেখে দেয়া কঠিন হয়ে যায়৷ তাছাড়া কুল যত উন্নতমানের হবে তার গাছ তত কম কাঁটাযুক্ত হবে৷ তাই জান্নাতের কুল বৃক্ষের পরিচয় দেয়া হয়েছে এই বলে যে, তাতে মোটেই কাঁটা থাকবে না ৷ অর্থাৎ তা হবে এমন উন্নত জাতের কুল যা এই পৃথিবীতে নেই৷
১৬. মূল আয়াত হচ্ছে () ৷ () অর্থ তা কোন মওসূমী ফল হবে না যে, মওসূম শেষ হওয়ার পর আর পাওয়া যাবে না৷ তার উৎপাদন কোন সময় বন্ধ হবে না যে, কোন বাগানের সমস্ত ফল সংগ্রহ করে নেয়ার পর একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বাগান ফলশূন্য থাকবে৷ বরং যতই খাওয়া হোক না কেন সেখানে প্রতিটি মওসূমে প্রতিটি ফল পাওয়া যাবে এবং লাগাতার উৎপন্ন হতে থাকবে৷ আর () অর্থ দুনিয়ার ফল বাগানসমূহের মত সেখানে কোন বাধা বিঘ্ন থাকবে না ৷ ফল আহরণ ও খাওয়ার ব্যাপারে যেমন কোন বাধা থাকবে না তেমনি গাছে কাঁটা না থাকা এবং ফল অধিক উচ্চতায় না থাকার কারণে আহরণ করতেও কোন কষ্ট হবে না৷
১৭. অর্থাৎ দুনিয়ার সেসব সৎকর্মশীলা নারী যারা তাদের ঈমান ও নেক আমলের ভিত্তিতে জান্নাত লাভ করবে৷ পৃথিবীতে তারা যত বৃদ্ধাবস্থায়ই মৃত্যুবরণ করুক না কেন সেখানে আল্লাহ তা'আলা তাদের সবাইকে যুবতী বানিয়ে দেবেন৷ পৃথিবীতে তারা সুন্দরী থাক বা না থাক সেখানে আল্লাহ তাদের পরমা সুন্দরী বানিয়ে দেবেন৷ পৃথিবীতে তারা কুমারী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে বা সন্তানবতী হয়ে মৃত্যুরবণ করে থাকুক, আল্লাহ তাদের কুমারী বানিয়ে দেবেন৷ তাদের সাথে তাদের স্বামীরাও যদি জান্নাত লাভ করে থাকে তাহলে তাদেরকে একত্রিত করা হবে৷ অন্যথায় আল্লাহ তা'আলা জান্নাতবাসী অন্য কারো সাথে তাদের বিয়ে দিয়ে দিবেন৷ এ আয়াতের এ ব্যাখ্যা কতিপয় হাদীসের মাধ্যমে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে উদ্ধৃত হয়েছে৷ 'শামায়েলে তিরমিযী' গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে, এক বৃদ্ধা নবীর (সা) কাছে এসে বললোঃ আমি যেন জান্নাতে যেতে পারি সেজন্য দোয়া করুণ৷ নবী (সা) বললনঃ কোন বৃদ্ধা জান্নাতে যাবে না৷ সে কাঁদতে কাঁদতে ফিরে যেতে থাকলে তিনি উপস্থিত সবাইকে বললেনঃ তাকে বলে দাও, সে বৃদ্ধাবস্থায় জান্নাতে প্রবেশ করবে না ৷ আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ "আমি তাদেরকে বিশেষভাবে পুনরায় সৃষ্টি করবো এবং কুমারী বানিয়ে দেবো"৷ ইবনে আবী হাতেম হযরত সালামা ইবনে ইয়াযীদ থেকে হাদীস উদ্ধৃত করেছেন যে, এ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ এর দ্বারা পৃথিবীর মেয়েদের বুঝানো হয়েছে-তারা কুমারী বা বিবাহিতা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে থাকুক তাতে কিছু যায় আসে না৷ তাবারানীতে হযরত উম্মে সালামা থেকে একটি দীর্ঘ হাদীস বর্ণিত হয়েছে৷ উক্ত হাদীসে তিনি নবীর (সা) কাছে জান্নাতের মেয়েদের সম্পর্কে কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানের আয়াতসমূহের অর্থ জিজ্ঞেস করেছেন৷ এ ক্ষেত্রে এ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসংগে নবী (সা) বলেনঃ

-----------------------

"এরা সেসব মেয়ে যারা দুনিয়ার জীবনে খুন খুনে বুড়ী, পিচুটি গলা চোখ ও পাকা সাদা চুল নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলো৷ এ বার্ধক্যের পরে আল্লাহ তা'আলা পুনরায় তাদেকে কুমারী বানিয়ে সৃষ্টি করবেন৷"

হযরত উম্মে সালামা জিজ্ঞেস করেন, পৃথিবীতে কোন মেয়ের যদি একাধিক স্বামী থেকে থাকে তাহলে কে তাকে লাভ করবে? নবী (সা) বলেনঃ

"তাকে যাকে ইচ্ছা বেছে নেয়ার স্বাধীনতা দেয়া হবে৷ যার আখলাক ও আচরণ সবার চেয়ে ভাল ছিলো সে তাকেই বেছে নেবে৷ সে আল্লাহ তা'আলাকে বলবেঃ "হে আমার রব, আমার সাথে তার আচরণ ছিলো সবচেয়ে ভাল৷ অতএব আমাকে তার স্ত্রী বানিয়ে দিন৷ হে উম্মে সালামা, উত্তম আচরণ দুনিয়ার সমস্ত কল্যাণ অর্জন করলো৷" (আরো ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন সূরা আর রাহমানের তাফসীর, টীকা ৫১)
১৮. মূল আয়াতে ওরুবান শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে৷ আরবী ভাষায় এ শব্দটি মেয়েদের সর্বোত্তম মেয়েসূলভ গুণাবলী বুঝাতে বলা হয়৷ এ শব্দ দ্বারা এমন মেয়েদের বুঝানো হয় যারা কমনীয় স্বভাব ও বিনীত আচরণের অধিকারীনি, সদালাপী, নারীসূলভ আবেগ অনুভূতি সমৃদ্ধ মনে প্রাণে স্বামীগত প্রাণ এবং স্বামীও যার প্রতি অনুরাগী৷
১৯. এর দুটি অর্থ হতে পারে৷ একটি অর্থ হচ্ছে তারা তাদের স্বামীদের সমবয়সী হবে৷ অণ্য অর্থটি হচ্ছে, তারা পরস্পর সমবয়স্কা হবে৷ অর্থাৎ জান্নাতের সমস্ত মেয়েদের একই বয়স হবে এবং চিরদিন সেই বয়সেরই থাকবে৷ যুগপৎ এ দু'টি অর্থই সঠিক হওয়া অসম্ভব নয়৷ অর্থাৎ এসব জান্নাতী নারী পরস্পরও সমবয়সী হবে এবং তাদের স্বামীদেরকেও তাদের সমবয়সী বানিয়ে দেয়া হবে৷ একটি হাদীসে বলা হয়েছেঃ"জান্নাতবাসীরা জান্নাতে প্রবেশ করলে তাদের শরীরে কোন পশম থাকবে না৷ মোচ ভেজা ভেজা মনে হবে৷ কিন্তু দাড়ি থাকবে না৷ ফর্সা শ্বেত বর্ণ হবে৷ কুঞ্চিত কেশ হবে৷ কাজল কাল চোখ হবে এবং সবার বয়স ৩৩ বছর হবে" (মুসনাদে আহমাদ, আবু হুরাইরায় বর্ণিত হাদীস) ৷