(৫৪:১) কিয়ামতের সময় নিকটবর্তী হয়েছে এবং চাঁদ বিদীর্ণ হয়েছে৷
(৫৪:২) কিন্তু এসব লোকের অবস্থা হচ্ছে তারা যে নিদর্শনই দেখে, তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে এ তো গতানুগতিক যাদু৷
(৫৪:৩) এরা (একেও) অস্বীকার করলো এবং নিজেদের প্রবৃত্তিরই অনুসরণ করলো৷ প্রত্যেক বিষয়কে শেষ পর্যন্ত একটা পরিণতি লাভ করতে হয়৷
(৫৪:৪) এসব লোকদের কাছে (পূর্ববর্তী জাতি সমূহের ) সেসব পরিণতির খবর অবশ্যই এসেছে যার মধ্যে অবাধ্যতা থেকে নিবৃত্ত রাখার মত যথেষ্ট শিক্ষনীয় বিষয় আছে৷
(৫৪:৫) আরো আছে এমন যুক্তি যা নসীহতের উদ্দেশ্যকে পূর্ণ মাত্রায় পূরণ করে৷ কিন্তু সাবধানবাণী তাদের জন্য ফলপ্রদ হয় না৷
(৫৪:৬) অতএব হে নবী, এদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও৷ যেদিন আহবানকারী একটি অত্যন্ত অপন্দনীয়
(৫৪:৭) জিনিসের দিকে আহবান জানাবে, লোকেরা ভীত বিহবল দৃষ্টি নিয়ে নিজ নিজ কবর থেকে এমনভাবে উঠে আসবে যেন তারা বিক্ষিপ্ত পতঙ্গরাজি৷
(৫৪:৮) তারা আহবানকারীর দিকে দৌড়িয়ে যেতে থাকবে৷ আর সেসব অস্বীকারকারী (যারা দুনিয়াতে তা অস্বীকার করতো) সে সময় বলবে, এ তো বড় কঠিন দিন৷
(৫৪:৯) এদের পূর্বে নূহের (আ) জাতিও অস্বীকার করেছে৷ তারা আমার বান্দাকে মিথ্যাবাদী বলে আখ্যায়িত করেছে, এবং বলেছে, এ লোকটি পাগল৷ উপরন্তু তাকে তীব্রভাবে তিরষ্কার ও করা হয়েছে৷ ১০
(৫৪:১০) অবশেষে সে তার রবকে উদ্দেশ্য করে বললো; আমি পরিভূত হয়েছি, এখন তুমি এদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করো৷
(৫৪:১১) তখন আমি আসমানের দরজাসমূহ খুলে দিয়ে মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করলাম
(৫৪:১২) এবং যমীন বিদীর্ণ করে ঝর্ণাধারায় রূপান্তরিত করলাম৷ ১১ এ পানির সবটাই সেই কাজ পূর্ণ করার জন্য সংগৃহীত হলো যা আগে থেকেই সুনিদিষ্ট ছিল৷
(৫৪:১৩) আর নূহকে (আ) আমি কাষ্ঠফলক ও পেরেক সম্বলিত ১২ বাহনে আরোহন করিয়ে দিলাম
(৫৪:১৪) যা আমার তত্ত্বাবধানে চলছিলো৷ এ ছিলো সে ব্যক্তির জন্য প্রতিশোধ যাকে অস্বীকার ও অবমাননা করা হয়েছিলো৷ ১৩
(৫৪:১৫) সে নৌকাকে আমি একটি নিদর্শন বানিয়ে দিয়েছি৷ ১৪ এমতাবস্থায় উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছ কি?
(৫৪:১৬) দেখো, কেমন ছিল আমার আযাব আর কেমন ছিল সাবধান বাণী৷
(৫৪:১৭) আমি এ কুরআনকে উপদেশ লাভের সহজ উৎস বানিয়ে দিয়েছি৷১৫ এমতাবস্থায় উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি?
(৫৪:১৮) আদ জাতি অস্বীকার করেছিলো৷ দেখো, কেমন ছিল আমার আযাব এবং কেমন ছিল আমার সাবধানবাণী৷
(৫৪:১৯) আমি এক, বিরামহীন অশুভ দিনে ১৬ তাদের ওপর প্রচন্ড ঝড়ো বাতাস পাঠালাম
(৫৪:২০) যা তাদেরকে উপরে উঠিয়ে এমনভাবে ছুঁড়ে ফেলেছিলো যেন তারা সমূলে উৎপাটিত খেজুর বৃক্ষের কাণ্ড৷
(৫৪:২১) দেখো, কেমন ছিল আমার আযাব এবং কেমন ছিল আমার সাবধানবাণী৷
(৫৪:২২) আমার এ কুরআনকে উপদেশ গ্রহণের সহজ উৎস বানিয়ে দিয়েছি৷ অতপর উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছ কি?
১. অর্থাৎ যে কিয়ামতের সংঘটিত হওয়ার খবর তোমাদের দিয়ে আসা হচ্ছে তার সময় যে ঘনিয়ে এসেছে এবং বিশ্ব ব্যবস্থা ধ্বংস ও ছিন্ন ভিন্ন হওয়ার সূচনা যে হয়ে গিয়েছে চাঁদ বিদীর্ণ হওয়াই তার প্রমাণ৷ তাছাড়া চাঁদের মত একটি বিশাল জ্যোতিষ্কের বিদীর্ণ হয়ে যাওয়ার ঘটনা এ বিষয়ের সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, যে কিয়ামতের কথা তোমাদের বলা হচ্ছে তা সংঘটিত হওয়া সম্ভব৷ এ কথা সুষ্পষ্ট যে, চাঁদ যখন বিদীর্ণ হতে পারে তখন পৃথিবীও বিদীর্ণ হতে পরে, তারকা ও গ্রহরাজির কক্ষপথ ও পরিবর্তিত হতে পারে, উর্ধজগতের গোটা ব্যবস্থাই ধ্বংস ও ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যেতে পারে৷ এর মধ্যেকার কোনটিই অনাদি, চিরস্থায়ী এবং স্থির ও স্বয়ংসস্পূর্ণ নয় যে, কিয়ামত সংঘটিত হতে পারে না৷

কেউ কেউ এ আয়াতাংশের ব্যাখ্যা করেছেন যে, "চাঁদ বিদীর্ণ হবে" আরবী ভাষায় বাকরীতি অনুসারে এ অর্থ গ্রহণ সম্ভব হলেও বাক্যের পূর্বাপর প্রসংগের সাথে এ অর্থ একেবারেই অগ্রহণযোগ্য৷ প্রথমত এ অর্থ গ্রহণ করলে আয়াতের প্রথম অংশ অর্থহীন হয়ে পড়ে৷ এ আয়াত নাযিল হওয়ার সময় চাঁদ যদি বিদীর্ণ না হয়ে থাকে বরং ভবিষ্যতে কোন এক সময় বিদীর্ণ হয় তাহলে তার ভিত্তিতে একথা বলা একেবারেই নিরর্থক যে, কিয়ামতের সময় সন্নিকটবর্তী হয়েছে৷ ভবিষ্যতে সংঘটিত হবে এমন ঘটনা কিয়ামত সন্নিকটবর্তী হওয়ার প্রমাণ হতে পারে কি করে যে তাকে প্রমাণ হিসেবে পেশ করা যুক্তিযুক্ত হবে? দ্বিতীয়ত এ অর্থ গ্রহণ করার পর যখন আমরা পরবর্তী বাক্য পাঠ করি তখন বুঝা যায় যে, এর সাথে তার কোন মিল নেই৷ পরবর্তী আয়াত সুস্পষ্টভাবে বলছে যে, লোকেরা সে সময় কোন নিদর্শন দেখেছিল যা ছিল কিয়ামতের সম্ভাব্যতার স্পষ্ট প্রমাণ৷ কিন্তু তারা তাকে যাদুর তেলেসমাতি আখ্যায়িত করে অস্বীকার করেছিলো এবং কিয়ামত সংঘটিত হওয়া সম্ভব নয় বলে নিজেদের বদ্ধমূল ধারণা আঁকড়ে ধরে পড়েছিলো৷ যদি () কথাটির অর্থ "চাঁদ বিদীর্ণ হয়েছে" গ্রহণ করা হয় তাহলেই কেবল পূর্বাপর প্রসংগের মাঝে তা খাপ খায়৷ কিন্তু এর অর্থ যদি "বিদীর্ণ হবে" গ্রহণ করা হয় তাহলে সে ক্ষেত্রে পরবর্তী সব কথাই সামঞ্জস্যহীন হয়ে পড়ে৷ বক্তব্যের ধারাবাহিকতার মাঝে এ অংশটি জুড়ে দিয়ে দেখুন, আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন যে, একথাটির কারণে গোটা বক্তব্যই অর্থহীন হয়ে পড়েছে৷

"কিয়ামতের সময় নিকটবর্তী হয়েছে এবং চাঁদ বিদীর্ণ হবে৷ কিন্তু এসব লোকের অবস্থা হচ্ছে , তারা যে নিদর্শনই দেখে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে, এতো গতানুগতিক যাদু৷ এরা অস্বীকার করলো এবং নিজেদের প্রবৃত্তিরই অনুসরণ করলো৷ "

সুতরাং প্রকৃত সত্য এই যে, চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার ঘটনা কুরআনের সুস্পষ্ট বক্তব্য থেকেই প্রমাণিত তা কেবল হাদীসের বর্ণনা সমূহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়৷ তবে হাদীস সমূহের বর্ণনা থেকে এ বিষয়টি সবিস্তরে জানা যায় এবং তা কবে ও কোথায় সংঘটিত হয়েছিলো তাও অবহিত হওয়া যায়৷ বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, আহমদ, আবু 'উওয়ানা, আবু দাউদ তায়ালেসী, আবদুর রাযযাক, ইবনে জারীর, বায়হাকী, তাবারানী, ইবনে মারদুইয়া ও আবু নু'য়াইম ইস্পাহানী বিপুল সংখ্যক সনদের মাধ্যমে হযরত আলী, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, হযরত আবুল্লাহ ইবনে আব্বাস, হযরত ইবনে উমর, হযরত হুযাইফা, হযরত আনাস ইবনে মালেক ও হযরত জুবাইর ইবনে মুত'এম থেকে এসব হাদীস বর্ণনা করেছেন৷

এসব সম্মানিত সাহাবা কিরামের মধ্যে তিনজন অর্থাৎ আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, হযরত হুযাইফা ও হযরত জুবাইর ইবনে মুত'এম স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, তাঁরা এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী৷ তাছাড়া তাঁদের মধ্যে দু'জন এমন ব্যক্তি আছেন যারা প্রত্যক্ষদর্শী নন৷ কারণ এটি তাদের মধ্যে একজনের (আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস) জন্মের পূর্বের ঘটনা৷ আর অপরজন ঘটনার সময় শিশু ছিলেন৷ কিন্তু তারা উভয়েই যেহেতু সাহাবী ৷ তাই যেসব বয়স্ক সাহাবা এ ঘটনা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল ছিলেন তাঁদের নিকট থেকে শুনেই হয়তো তারা এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন৷

সমস্ত রেওয়ায়াত একত্রিত করলে এ ঘটনার যে বিস্তারিত বিবরণ জানা যায় তা হচ্ছে, এটি হিজরতের প্রায় পাঁচ বছর পূর্বের ঘটনা৷ সেদিন ছিল চান্দ্র মাসের চতুর্দশ রাত্রি৷ চাঁদ তখণ সবে মাত্র উদিত হয়েছিলো৷ অকস্মাত তা দ্বিখণ্ডিত হলো এবং তার একটি অংশ সম্মুখের পাহাড়ের এক দিকে আর অপর অংশ অপরদিকে পরিদৃষ্ট হলো৷ এ অবস্থা অল্প কিছু সময় মাত্র স্থিতি পায়৷ এর পরক্ষণেই উভয় অংশ আবার পরস্পর সংযুক্ত হয়৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে সময় মিনাতে অবস্থান করেছিলেন৷ তিনি লোকদের বললেনঃ দেখো এবং সাক্ষী থাকো৷ কাফেররা বললোঃ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের ওপর যাদু করেছিলো তাই আমাদের দৃষ্টি ভ্রম ঘটেছিল৷ অন্যরা বললোঃ মুহাম্মাদ আমাদের ওপর যাদু করতে পারে, তাই বলে সমস্ত মানুষকে তো যাদু করতে সক্ষম নয়৷ বাইরের লোকদের আসতে দাও৷ আমরা তাদেরকেও জিজ্ঞেস করবো, তারাও এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে কি না৷ বাইরে থেকে কিছু লোক আসলে তারা বললো যে, তারাও এ দৃশ্য দেখেছে৷

হযরত আনাস থেকে বর্ণিত কোন কোন রেওয়ায়াতের ভিত্তিতে এরূপ ভুল ধারণার সৃষ্টি হয় যে, চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হওয়ার ঘটনা একবার নয়, দুইবার সংঘটিত হয়েছিলো৷ কিন্তু প্রথমত সাহাবীদের মধ্যে আর কেউ এ কথা বর্ণনা করেননি ৷ দ্বিতীয়ত হযরত আনাসের কোন কোন রেওয়ায়াতে () দুইবার কথাটি উল্লেখিত হয়েছে৷ এবং কোনটিতে () বা () দুই খণ্ড শব্দ উল্লেখিত হয়েছে৷ তৃতীয়ত, কুরআন মজীদে শুধু একবার খণ্ডিত হওয়ার কথা উল্লেখিত হয়েছে৷ এ দিক দিয়ে সঠিক কথা এটিই যে, এ ঘটনা শুধু একবারই সংঘটিত হয়ছিলো৷

এ সম্পর্কে সমাজে কিছু কিচ্ছাকাহিনীও প্রচলিত আছে৷ ওগুলোতে বলা হয়েছে যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আঙুল দিয়ে চাঁদের দিকে ইশারা করলেন আর তা দ্বি-খণ্ডিত হয়ে গেল৷ তাছাড়া চাঁদের একটি অংশ নবীর (সা) জামার গলদেশ দিয়ে প্রবেশ করে হাতার মধ্য দিয়ে বেরিয়ে গেল৷ এসব একেবারেই ভিত্তিহীন কল্পকাহিনী৷

এখানে প্রশ্ন দেখা দেয় যে, এ ঘটনার সত্যিকার ধরন ও প্রকৃতি কি ছিল? এটা কি কোন মু'জিযা ছিল যা মক্কার কাফেরদের দাবীর প্রেক্ষিতে রিসালাতের প্রমাণ হিসেবে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখিয়েছিলেন? নাকি এটা কোন দুর্ঘটনা ছিল যা আল্লাহর কুদরত বা অসীম ক্ষমতায় চাঁদের বুকে সংঘটিত হয়েছিল এবং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেদিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন শুধু এই জন্য যে, তা কিয়ামতের সম্ভাব্যতাও সন্নিকটবর্তী হওয়ার একটি নিদর্শন৷ মুসলিম মনীষীদের একটি বিরাট গোষ্ঠী এ ঘটনাকে নবীর (সা) মু'জিযা হিসেবে গণ্য করেন৷ তাঁদের ধারণা অনুসারে মক্কার কাফেরদের দাবীর কারণে এ মু'জিযা দেখানো হয়েছিলো৷ কিন্তু হযরত আনাস বর্ণিত হাদীসসমূহের দু'য়েকটির ওপর ভিত্তি করেই এ অভিমত ব্যক্ত করা হয়েছে৷ তিনি ছাড়া অন্য আর কোন সাহাবীই এ কথা বর্ণনা করেননি৷ ইবনে হাজার তাঁর ফাতহুল বারী গ্রন্থে বলেছেনঃ "যতগুলো সূত্রে এ ঘটনার বর্ণনা দেয়া হয়েছে তার মধ্যে হযরত আনাস বর্ণিত হাদীস ছাড়া আর কোথাও এ কথা আমার চোখে পড়েনি যে, মুশরিকদের দাবীর কারণে চন্দ্র দ্বি-খণ্ডিত হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল৷ "() ৷ আবু নুয়াইম ইস্পাহানী "দালায়েলুন নবুওয়াত" গ্রন্থে হযরত আবদুল্লাহ উবনে আব্বাস থেকেও একই বিষয়ে একটি হাদীস উদ্ধৃত করেছেন৷ কিন্তু তার সনদ দুর্বল৷ মজবুত সনদে হাদীস গ্রন্থসমূহে যতগুলো হাদীস হযরত ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়েছে তার কোনটিতেই একথার উল্লেখ নেই৷ তাছাড়া হযরত আনাস ও হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস উভয়ই এ ঘটনার সম সাময়িক ছিলেন না৷ অপর দিকে যেসব সাহাবাকিরাম সে সময় বর্তমান ছিলেন- যেমনঃ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ(রা) , হযরত হুযাইফা (রা) , হযরত জুবাইর (রা) , ইবনে মুত'এম , হযরত আলী (রা) ও হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর, তাঁদের কেউ-ই এ কথা বলেননি যে, মক্কার মুশরিকরা নবীর (সা) নবুওয়াতের সত্যতার প্রমাণ হিসেবে কোন নির্দশনের দাবী করেছিলো এবং সে কারণেই তাদেরকে চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হওয়ার এ মু'জিযা দেখানো হয়েছিলো৷ সব চেয়ে বড় কথা, কুরআন মজীদ এ ঘটনাকে মুহাম্মাদের (সা) রিসালাতের নিদর্শন হিসেবে পেশ করছে না, বরং কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার নিদর্শন হিসেবে পেশ করছে৷ তবে নবী (সা) লোকদেরকে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার যে খবর দিয়েছিলেন এ ঘটনা তার সত্যতা প্রমাণ করেছিলো৷ সুতরাং এদিক দিয়ে এ ঘটনা অবশ্যই তাঁর নবুওয়াতেরও সত্যতার স্পষ্ট প্রমাণ ছিল৷

বিরুদ্ধবাদীরা এ ক্ষেত্রে দুই ধরনের আপত্তি উত্থাপন করে থাকে৷ প্রথমত, তাদের মতে এরূপ ঘটা আদৌ সম্ভব নয় যে, চাঁদের মত বিশালায়তন একটি উপগ্রহ বিদীর্ণ হয়ে দুই খণ্ড হয়ে যাবে এবং খণ্ড দুটি পরস্পর শত সহস্র মাইল দূরত্বে চলে যাওয়ার পর আবার পরস্পর সংযুক্ত হবে৷ দ্বিতীয়ত, তারা বলে এ ঘটনা যদি ঘটেই থাকে তাহলে তা দুনিয়াময় প্রচার হয়ে যেতো, ইতিহাসে তার উল্লেখ দেখা যেতো এবং জ্যোতিষ-শাস্ত্রের গ্রন্থসমূহে তার বর্ণনা থাকতো৷ কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ দুটি আপত্তি গুরুত্বহীন৷ চন্দ্র বিদীর্ণ হওয়ার সম্ভাব্যতার প্রশ্নে বলা যায় , তা সম্ভব নয়, একথা প্রাচীন কালে হয়তো বা গ্রহণযোগ্য হতে পারতো৷ কিন্তু গ্রহ-উপগ্রহসমূহের গঠন প্রকৃতি সম্পর্কে বর্তমানে মানুষে যে জ্ঞান ও তথ্য লাভ করেছে তার ভিত্তিতে একটি গ্রহ তার আভ্যন্তরীণ অগ্ন্যৎপাতের কারণে বিদীর্ণ হতে পারে৷ এ ভয়ানক বিস্ফোরণের ফলে তা দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে পরস্পর বহুদূরে চলে যেতে পারে এবং তার কেন্দ্রের চৌম্বুক শক্তির কারণে পুনরায় পরস্পর সংযুক্ত হতে পারে৷ এটা সম্পূর্ণরূপে সম্ভব৷ এরপর দ্বিতীয় আপত্তির গুরুত্বহীন হওয়া সম্পর্কে বলা যায়, এ ঘটনা অকস্মাৎ এবং মুহূর্তের জন্য সংঘটিত হয়েছিল৷ সে বিশেষ মুহূর্তে সারা পৃথিবীর দৃষ্টি চাঁদের দিকে নিবদ্ধ থাকবে এটি জরুরী নয়৷ সে মূহুর্তে বিস্ফোরণের কোন শব্দ হয়নি যে, সেদিকে মানুষের দৃষ্টি আকৃষ্ট হবে৷ এ উদ্দেশ্যে পূর্বাহ্নেই কোন ঘোষণা দেয়া হয়নি যে, লোকজন তার অপেক্ষায় আকাশের দিকে চেয়ে থাকবে৷ ভূ-পৃষ্ঠের সর্বত্র ত দৃষ্টিগোচর হওয়াও সম্ভব ছিল না৷ সে সময় শুধু আরব ও তার পূর্বাঞ্চল সন্নিহিত দেশ সমূহেই চন্দ্র উদিত হয়েছিল৷ সে সময় ইতিহাস চর্চার রুচি ও প্রবণতা ছিল না এবং স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবেও সে সময় তা এতটা উন্নত ছিল না যে, পূর্বাঞ্চলীয় দেশসমূহের যেসব লোক তা দেখেছিলো তারা তা লিপিবদ্ধ করে নিতো , কোন ঐতিহাসিকের কাছে এসব প্রমাণাদি সংগৃহীত থাকতো এবং কোন গ্রন্থে সে তার লিপিবদ্ধ করতো৷ তা সত্ত্বেও মালাবারের ইতিহাস উল্লেখ আছে যে, সে রাতে সেখানকার একজন রাজা এ দৃশ্য দেখেছিলেন৷ জ্যোতিশ শাস্ত্রীয় গ্রন্থাদি ও পঞ্জিকাসমূহে এ ঘটনার উল্লেখ কেবল তখনই থাকা জরুরী হতো যদি এর দ্বারা চন্দ্রের গতি, তার পরিক্রমণের পথ এবং উদয়াস্তের সময়ে কোন পরিবর্তন সূচিত হতো৷ কিন্তু তা যেহেতু, হয়নি, তাই প্রাচীনকালের জ্যোতির্বিদদের দৃষ্টিও এদিকে আকৃষ্ট হয়নি৷ সে যুগের মানমন্দিরসমূহও এতটা উন্নত ছিল না যে, নভোমণ্ডলে সংঘটিত প্রতিটি ঘটনাই তারা পর্যবেক্ষণ ও রেকর্ডভুক্ত করতে পারতেন৷
২. মূল ইবারতে () শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে৷ এর কয়েকটি অর্থ হতে পারে৷ এক, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাতদিন একের পর এক যে যাদু চালিয়ে যাচ্ছেন, নাউযুবিল্লাহ-এটিও তার একটি৷ দুই, এটা পাকা যাদু৷ অত্যন্ত নিপুণভাবে এটি দেখানো হয়েছে৷ তিন, অন্য সব যাদু যেভাবে অতীত হয়ে গিয়েছে এটিও সেভাবে অতীত হয়ে যাবে, এর দীর্ঘস্থায়ী কোন প্রভাব পড়বে না৷
৩. অর্থাৎ কিয়ামত বিশ্বাস না করার যে সিদ্ধান্ত তারা নিয়ে রেখেছে এ নিদর্শন দেখার পরও তারা সেটিকেই আঁকড়ে ধরে আছে৷ কিয়ামতকে বিশ্বাস করা যেহেতু তাদের প্রবৃত্তির আকাংখার পরিপন্থী ছিল, তাই সুস্পষ্ট নিদর্শন দেখার পরও এরা তা মেনে নিতে রাজী হয়নি৷
৪. এর অর্থ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাদের ন্যায় ও সত্যের দিকে আহবান জানাতে থাকবেন আর তোমরা হঠকারীতা করে নিজেদের বাতিল মত ও পথের ওপর অবিচল থাকবে, এ অবস্থা অনির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত চলতে পারে না৷ তাঁর ন্যায় ও সত্যপন্থী হওয়া এবং তোমাদের বাতিল পন্থী হওয়া কখনো প্রমাণিত হবে না, তা হতে পারে না৷ সব কিছুই শেষ পর্যন্ত একটা পরিণতি লাভ করে৷ অনুরূপভাবে তোমাদের ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব সংঘাত চলেছে তারও একটি অনিবার্য পরিণাম আছে৷ তাকে অবশ্যই সে পরিণাম লাভ করতে হবে৷ এমন একটি সময় অবশ্যই আসবে যখন প্রকাশ্যে প্রমাণিত হবে যে, তিনি ন্যায় ও সত্যের পথে ছিলেন আর তোমরা বাতিলের অনুসরণ করেছিলে৷ অনুরূপভাবে যারা ন্যায় ও সত্যপন্থী, তারা ন্যায় ও সত্যপন্থা অনুসরণের এবং যারা বাতিল পন্থী, তারা বাতিল পন্থা অনুসরণের ফলও একদিন অবশ্যই লাভ করবে৷
৫. অন্য কথায় এদের আপন অবস্থায় ছেড়ে দাও৷ আখেরাত অস্বীকৃতির পরিণাম ও ফলাফল কি এবং অপরাপর জাতিসমূহ নবী -রসূলদের কথা না মানার যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ভোগ করেছে তা যখন এদেরকে অধিকতর যুক্তিগ্রাহ্য পন্থায় বুঝানো হয়েছে এবং মানবেতিহাস থেকে উদাহরণ পেশ করে বলে দেয়া হয়েছে, তারপরও এরা যদি হঠকারীতা পরিহার না করে তাহলে তাদেরকে এ বোকার স্বর্গেই বাস করতে দাও৷ এরপর এরা কেবল তখনই কথা মেনে নেবে যখন মৃত্যুর পর কবর থেকে উঠে নিজের চোখে দেখবে, কিয়ামত শুরু হয়ে গিয়েছে৷ তখন স্বচক্ষেই দেখতে পাবে যে, যে কিয়ামত সম্পর্কে তাদেরকে আগে ভাগেই সাবধান করে দিয়ে সঠিক পথ অনুসরণের পরামর্শ দেয়া হতো তা যথারীতি শুরু হয়ে গেছে৷
৬. আরেকটি অর্থ অজানা-অচেনা জিনিসও হতে পারে৷ অর্থাৎ এমন জিনিস যা কখনো তাদের কল্পনায়ও স্থান পায়নি, যার কোন চিত্র বা ধরণ তাদের মগজে ছিল না, কোন সময় এ ধরনের কোন কিছুর মুখোমুখি হতে হবে সে অনুমানও তারা করতে পারনি৷
৭. মূল শব্দ হচ্ছে () অর্থাৎ তাদের দৃষ্টি আনত থাকবে৷ এর কয়েকটি অর্থ হতে পারে৷ এক, ভীত ও আতঙ্ক তাদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেলবে ৷ দুই, তাদের মধ্যে লজ্জা ও অপমানবোধ জাগ্রত হবে এবং চেহারায় তার বর্হিপ্রকাশ ঘটবে৷ কারণ, কবর থেকে বেরিয়ে আসামাত্র তারা বুঝতে পারবে যে, এটিই সে পরকালিন জীবন যা আমরা অস্বীকার করতাম৷ যে জীবনের জন্য আমরা কোন প্রস্তুতি গ্রহণ করে আসিনি৷ এবং যে জীবনে এখন আমাদেরকে অপরাধী হিসেবে আল্লাহর সামনে হাজির হতে হবে৷ তিন, তারা হতবুদ্ধি হয়ে তাদের চোখের সামনে বিদ্যমান সে ভয়াবহ দৃশ্য দেখতে থাকবে৷ তা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়ার হুঁশও তাদের থাকবে না৷
৮. কবর বলতে শুধুমাত্র সেসব কবরই বুঝানো হয়নি মাটি খুঁড়ে যার মধ্যে কাউকে যথারীতি দাফন করা হয়েছে৷ বরং এর দ্বারা বুঝানো হয়ছে, সেখানেই কোন ব্যক্তি মৃত্যু বরণ করেছে কিংবা যেখানেই তার দেহ পড়েছিল হাশরের ময়দানের দিকে আহবানকারীর একটি আওয়াজ শুনেই সে সেখান থেকে উঠে দাঁড়াবে৷
৯. অর্থাৎ আখেরাত সংঘটিত হবে সেখানে মানুষকে তার কাজ কর্মের হিসেব দিতে হবে এবং একথাই তারা অবিশ্বাস করেছে, যে নবী তাঁর জাতিকে এ সত্য সম্পর্কে অবহিত করে আসছিলো সে নবীকেও অস্বীকার করেছে, আখেরাতের জিজ্ঞাসাবাদে সফলকাম হওয়ার জন্য মানুষকে কিরূপ আকীদ বিশ্বাস পোষণ করতে হবে, কি ধরনের কাজ করতে হবে, এবং কোন জিনিস পরিহার করে চলতে হবে এসব সম্পর্কে নবী যা শিক্ষা দিতেন তাও তারা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে৷
১০. অর্থাৎ এ লোকেরা নবীকে অস্বীকার ও অমান্যই শুধু করেনি, তাঁকে পাগল বলে আখ্যায়িত করেছে, তাঁকে হুমকিও ভীতি প্রদর্শন করেছে, তাঁর প্রতি অভিশাপ ও তিরস্কার বর্ষণ করেছে, হুমকি-ধমকি, ও ভয়ভীতি দেখিয়ে সত্য প্রচার থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেছে এবং তাঁর জীবন ধারণ অসম্ভব করে তুলেছে৷
১১. অর্থাৎ আল্লাহর নির্দেশে ভূ-পৃষ্ঠ ফেটে এমনভাবে ঝর্ণাধারাসমূহ প্রবাহিত হতে থাকলো , যেন তা ভু-পৃষ্ঠ নয়, অসংখ্য ঝর্ণাধারা৷
১২. অর্থাৎ প্লাবন আসার পূর্বেই আল্লাহর নির্দেশে হযরত নূহ (আ) যে জাহাজ নির্মাণ করেছিলেন৷
১৩. মুল ইবারত হচ্ছে () অর্থাৎ এসব করা হয়েছে সে ব্যক্তির কারণে প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্য যাকে অবমাননা ও অসম্মান করা হয়েছিল৷ () শব্দটিকে যদি অস্বীকৃতি অর্থে গ্রহণ করা হয় তাহলে অর্থ হবে "যার কথা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানানো হয়েছিল৷ আর যদি নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা বা অস্বীকৃতি অর্থে গ্রহণ করা হয় তাহলে তার অর্থ হয়" যার সত্তা ছিল একটি নিয়ামত স্বরূপ তার প্রতি অকৃজ্ঞতা ও অস্বীকৃতির আচরণ করা হয়েছিল৷
১৪. এ অর্থও হতে পারে যে, আমরা এ আযাবকে শিক্ষণীয় নিদর্শন বানিয়ে দিয়েছি৷ কিন্তু আমাদের মতে সর্বাধিক অগ্রধিকার যোগ্য অর্থ হচ্ছে, সে জাহাজকে শিক্ষনীয় নিদর্শন বানিয়ে দেয়া হয়েছে৷ একটি সুউচ্চ পর্বতের ওপরে তার অস্তিত্ব টিকে থাকা হাজার হাজার বছর ধরে মানুষকে আল্লাহর গযব সম্পর্কে সাবধান করে আসছে৷ তাদেরকে স্বরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, এ ভূ-খণ্ডে আল্লাহর নাফরমানদের জন্য কি দুর্ভাগ্য নেমে এসেছিল এবং ঈমান গ্রহণকারীদের কিভাবে রক্ষা করা হয়েছিল৷ ইমাম বুখারী, ইবনে আবী হাতেম, আবদুর রাযযাক ও ইবনে জারীর কাতাদা থেকে যেসব হাদীস বর্ণনা করেছেন তা থেকে জানা যায় যে, মুসলমানদের ইরাক ও আল -জাযিরা বিজয়ের যুগে এ জাহাজ জুদী পাহাড়ের ওপর (অন্য একটি রেওয়ায়াত অনুসারে "বা-কিরদা" নামক জনপদের সন্নিকটে ) বর্তমান ছিল এবং প্রাথমিক যুগের মুসলমানগণ তা দেখেছিলেন৷ বর্তমান যুগেও বিমান ভ্রমনের সময় কেউ কেউ এ এলাকার একটি পর্বত শীর্ষে জাহাজের মত বস্তু পড়ে থাকতে দেখেছেন৷ সেটিকে নূহের জাহাজ বলে সন্দেহ করা হয়৷ আর এ কারণেই তা অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যে মাঝে মধ্যে অভিযাত্রী দল অভিযান পরিচালনা করে আসছে৷ (আরো বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন , আল আ'রাফ, টীকা -৪৭, হূদ, টীকা -৪৬; আল আনকাবূত , টীকা -২৫) ৷
১৫. কেউ কেউ () কথাটির ভুল অর্থ গ্রহণ করেছে৷ অর্থাৎ কুরআন একখানা সহজ গ্রন্থ৷ এ গ্রন্থ বুঝার জন্য কোন জ্ঞানের প্রয়োজন নেই৷ এমনকি আরবী ভাষা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ ছাড়াই যে কোন ব্যক্তি ইচ্ছা করলে এর তাফসীর করতে পারে এবং হাদীস ও ফিকাহর সাহায্য ছাড়াই কুরআনের আয়াত থেকে যে কোন আইন ও বিধান উদ্ভাবন করতে পারে৷ অথচ পূর্বাপর যে প্রসংগে একথাটি বলা হয়েছে সে দিকে লক্ষ রেখে বিবেচনা করলে বুঝা যায় , একথাটির উদ্দেশ্য মানুষকে এ বিষয়টি উপলব্ধি করানো যে, উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণের একটি উৎস হচ্ছে বিদ্রোহী জাতিসমূহের ওপর নাযিল হওয়া দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং আরেকটি উৎস হলো এ কুরআন যা যুক্তি প্রমাণ ও ওয়াজ নসীহতের মাধ্যমে তোমাদেরকে সরল সহজ পথ দেখিয়ে দিচ্ছে৷ প্রথমোক্ত উৎসের তুলনায় নসীহতের এ উৎস অধিক সহজ৷ এতদত্ত্বেও কেন তোমরা এ থেকে কল্যাণ লাভ করছো না এবং আযাব দেখার জন্যই গোঁ ধরে আছ? এটা সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর মেহেরবানী যে, তিনি তাঁর নবীর মাধ্যমে এ কিতাব পাঠিয়ে তোমাদের সাবধান করে দিচ্ছেন যে তোমরা যে পথে চলছো তা চূড়ান্ত ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়৷ তাছাড়া তোমাদের কল্যাণ কোন পথে তাও বলে দেয়া হয়েছে৷ নসীহতের এ পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে এজন্য যাতে ধ্বংসের গহবরে পতিত হওয়ার আগেই তোমাদেরকে তা থেকে রক্ষা করা যায়৷ সহজভাবে বুঝানোর পরও যে ব্যক্তি মানে না এবং গর্তের মধ্যে পতিত হওয়ার পরই কেবল স্বীকার করে যে, এটি সত্যিই গর্ত তার চেয়ে নির্বোধ আর কে আছে?
১৬. অর্থাৎ এমন একটি দিন যার দুর্যোগ একাধারে কয়েকদিন ধরে চলেছিল৷ সূরা হা -মীম -আস সিজদা এর ১৬ আয়াতে () কথাটি ব্যবহৃত হয়েছে এবং সূরা আল হাক্কার ৭ আয়াতে বলা হয়েছে যে, এ ঝাঞ্চা বাত্যা একাধারে সাত রাত ও আট দিন পর্যন্ত চলেছিল৷ সাধারণভাবে প্রসিদ্ধ কথা হলো, এ আযাব যেদিন শুরু হয়েছিল সেদিন ছিল বুধবার৷ এ কারণে মানুষের মধ্যে এ ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে যে, বুধবার দিনটি হচ্ছে অশুভ৷ তাই এ দিনে কোন কাজ করা শুরু করা উচিত নয়৷ এ বিষয়ে কিছু যয়ীফ হাদীসও উদ্ধৃত করা হয়েছে যার কারণে এ দিনটির অশুভ হওয়ার বিশ্বাস সাধারণের মনমগজে বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছে৷ উদাহরণ হিসেবে ইবনে মারদুইয়া ও খতীব বাগদাদীর বর্ণিত এ হাদীসটিও আছে যে, () মাসের শেষ বুধবার অশুভ, যার অশুভ প্রভাব একাধারে চলতে থাকে৷ ইবনে জাওযী একে 'মাওযু' অর্থাৎ জাল ও মনগড়া হাদীস বলেছেন৷ ইবনে রজব বলেছেন, এ হাদীস সহীহ নয়৷ হায়েজ সাখাবী বলেনঃ এ হাদীস যতগুলো সুত্রে বর্ণিত হয়েছে তা সবই একেবারে ভিত্তিহীন৷ অনুরূপভাবে তাবারানী বর্ণিত এই হাদীস () বুধবার দিনটি অশুভ দিন যার অকল্যাণ ক্রমাগত চলতে থাকে) ৷ আরো কিছু সংখ্যক হাদীসে এ কথাও বর্ণিত হয়েছে যে, বুধবার দিন যেন ভ্রমণ না করা হয়, লেনদেন না করা হয়৷ নখ না কাটানো হয় এবং রোগীর সেবা না করা হয়৷ কুষ্ঠ ও শ্বেত রোগ এ দিনেই শুরু হয়৷ কিন্তু এসব হাদীসের সব কটিই যয়ীফ৷ এর ওপরে কোন আকিদা-বিশ্বাসের ভিত্তি স্থাপন করা যায় না৷ বিশেষজ্ঞ মুনাভী বলেনঃ

-------------------------------------------

"অশুভ লক্ষণসূচক মনে করে বুধবারের দিনকে পরিত্যাগ করা এবং এ ক্ষেত্রে জ্যোতিষদের ন্যায় বিশ্বাস পোষণ করা কঠোরভাবে হারাম৷ কেননা, সব দিনই আল্লাহর৷ কোন দিনই দিন হিসেবে কল্যাণ বা অকল্যাণ কিছুই সাধন করতে পারে না৷ "

আল্লামা আলুসী বলেনঃ "সবদিন সমান৷ বুধবারের বিশেষ কোন বৈশিষ্ট নেই৷ রাত ও দিনের মধ্যে এমন কোন মুহূর্ত নেই যা কারো জন্য কল্যাণকর এবং কারো জন্য অকল্যাণকর নয়৷ আল্লাহ তা'আলা প্রতিটি মুহূর্তেই কারো জন্য অনুকূল এবং কারো জন্য প্রতিকূল অবস্থা সৃষ্টি করে থাকেন৷ "